December 10, 2017

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস




অর্চিষ্মান একবার বলার চেষ্টা করেছিল, রিভিউ ভালো নয় কিন্তু। কিন্তু ও-ও জানত, 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' সিনেমা হয়ে বেরিয়েছে যখন আমি দেখব। ক্রিটিকে, দর্শকে কী বলল তোয়াক্কা না করেই। শনিবার সাড়ে বারোটার শোয়ের টিকিটের দাম মোটামুটি ভদ্রলোকের মতো দেখে আমরা রওনা দিলাম। টিকিট অনলাইন কাটা যেত, কিন্তু সে ক্ষেত্রে ‘কনভেনিয়েন্স ফি’ বলে একটা জিনিস হয়, সেটা আমার চরম অসুবিধেজনক লাগে। তাছাড়া আমার ভরসা ছিল, ফুকরে রিটার্নস রিলিজ করেছে, থরঃ রাগনারোক চলছে, এই বাজারে বেশি লোক পোয়্যারো নিয়ে উৎসাহী হবে না। ভরসা বিফলে যায়নি,হলে গিয়ে টিকিট পেতে কোনও অসুবিধেই হয়নি। 

প্রায় আধঘণ্টা ধরে ট্রেলার আর অ্যাড চলার পর মার্গসংগীতের ছোঁয়া লাগানো জনগণমন বাজিয়ে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি করে সিনেমা শুরু হল। পবিত্র শহর জেরুজালেমে একটি রহস্যের সাফল্যের সঙ্গে সমাধা করে (বইয়ের সমস্যাটির সঙ্গে সিনেমার সমস্যাটির মিল নেই) পোয়্যারো লন্ডনে ফিরছেন, ইচ্ছে ফেরার আগে ইস্তানবুলে ক’টা দিন বিশ্রাম নিয়ে যান। কিন্তু খবর আসে, আরেকটি রহস্য সমাধানের জন্য পোয়্যারোকে অবিলম্বে লন্ডনে ফিরতে হবে। ট্রেন কোম্পানির কর্তা মঁসিয়র বুকের ভাইপোর (ইনিও মঁসিওর বুক, যদিও বইয়ে এই ভূমিকায় সিনিয়র মঁসিয়র বুকই ছিলেন) সহৃদয়তায় টইটম্বুর ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের ক্যালে কোচে পোয়্যারোর একটি সিটের বন্দোবস্ত হয়। যাত্রার শুরুতেই স্যামুয়েল র‍্যাচেট নামের একজন অ্যামেরিকান বড়লোক পোয়্যারোকে নিজের ‘বডিগার্ড’ হিসেবে নিযুক্ত করতে চান, বলেন কেউ বা কারা তাকে হুমকি চিঠি পাঠিয়ে খুন করতে চাইছে। পোয়্যারো ‘না’ করে দেন। সেই রাতেই র‍্যাচেট নৃশংসভাবে খুন হন, আর তুষারঝড়ে ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস আটকা পড়ে যায়। মঁসিওর বুকের ভাইপো পোয়্যারোর হাতে পায়ে পড়ে খুনিকে ধরে দেওয়ার অনুরোধ করেন, না হলে কোম্পানির বড়বাবু হিসেবে তাঁর একেবারে নাককাটা যাবে।

'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' আগাথা ক্রিস্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখা, প্লটের অভিনবত্বের জন্য তো বটেই, কিন্তু সে অভিনবত্ব তো ক্রিস্টির সব বইতেই কমন। মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' স্পেশাল এই জন্য যে এই বইতেই ঠিক আর ভুল, ন্যায় এবং অন্যায়, শাস্তি এবং ক্ষমার মাঝামাঝির ধোঁয়াটে জায়গাটা হারক্যুল পোয়্যারোর কাছে প্রথম প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়। টিভি সিনেমার পরিচালক প্রযোজকদের কাছে এই গল্প তাই চিরকালই লোভনীয়। সিনেমার পর্দায় উনিশশো চুয়াত্তরে সিডনি লুমের পরিচালনায় 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এ পোয়্যারোর ভূমিকায় ছিলেন অ্যালবার্ট ফিনি। এই ছবিতেই একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান সেরা সহঅভিনেত্রীর অস্কার জিতেছিলেন। টিভির পর্দায় দুহাজার দশ সালে ডেভিড সুশে ছাড়াও 'মার্ডার ইন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এ পোয়্যারোর ভূমিকায় নেমেছিলেন আলফ্রেড মলিনা, দুহাজার এক সালে।

দু'হাজার সতেরোর 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' পরিচালনা করেছেন কেনেথ ব্রানা, পোয়্যারোর ভূমিকাতেও তিনিই অভিনয়ও করেছেন। র‍্যাচেটের ভূমিকায় জনি ডেপ, গ্রেটা অলসন (যে ভূমিকায় অভিনয় করে ইংগমার বার্গম্যান অস্কার পেয়েছিলেন) চরিত্রের নাম বদলে হয়ে গেছে পিলার এস্ত্রাভাদোস (এই চরিত্রের নাম নেওয়া হয়েছে 'হারক্যুল পোয়্যারো’স ক্রিসমাস' বই থেকে), অভিনয় করেছেন পেনেলোপি ক্রুজ, প্রিন্সেস দ্রাগোমিরফের ভূমিকায় আছেন ডেম জুডি ডেঞ্চ। দু’চারটে চরিত্র এবং তাদের ভূমিকা অদলবদল করা হয়েছে। কর্নেল আরবাথনট আর ডাক্তার মিলিয়ে তৈরি হয়েছেন ডাক্তার আরবাথনট, গল্পে ডাক্তারের ভূমিকাও বদলেছে। এ ছাড়া গল্পের কাঠামো তেমন কিছু বদলায়নি।

বদলেছে গল্পের ফোকাস। 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এ থিম (ন্যায়অন্যায় ঠিকবেঠিকের সংজ্ঞায়ন) জরুরি, কিন্তু ক্রিস্টির বাকি সব গল্পের মতোই প্লট আরও জরুরি। ব্রানার 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' প্লট প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মেনেছে, বইয়ের প্রতিটি ক্লু, রেড হেরিং আছে সিনেমাতেও, কিন্তু সেগুলোকে যথেষ্ট খেলিয়ে ব্যবহার করা হয়নি, তাদের পেছনে যথেষ্ট সময় খরচ করা হয়নি। সম্ভবত এই ভেবে যে এত চেনা গল্পে কী হবে, কেন হবে, কী করে হবে এসব সবাই জানে, কাজেই সে সবের গভীরে না গেলেও চলবে। তার থেকে বরং পোয়্যারোর দোলাচল, অন্যান্য চরিত্রদের অন্তর্লীন টানাপোড়েনে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। কথাটা সত্যি, কিন্তু আরও সত্যি কথাটা হচ্ছে, ওই ক্লুয়ের লেজ ধরে ধরে, রেড হেরিংয়ের পিছু নিয়ে পথ ভুল করে আবার ঠিক পথে ফিরে আসার খেলাটা বাদ দিলে গোয়েন্দাগল্পের পনেরো আনা মজা মাটি।

সামান্য বদল এসেছে পোয়্যারোর চরিত্রেও। আগাথা ক্রিস্টির পোয়্যারো দৌড়োদৌড়ি তো দূরে থাক, জুতোর পালিশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বাড়ি থেকে বেরোন না, গুলিগোলা মারাত্মক অপছন্দ করেন। সেই পোয়্যারো বিপজ্জনক ব্রিজ বেয়ে অপরাধীকে ধাওয়া করছেন, হাতে গুলি খেয়ে টসকাচ্ছেন না। বিশ্বাস করা শক্ত। তবে এসব বদলে আমার আপত্তি নেই। এর থেকে ঢের আপত্তিজনক ব্যাখ্যা এর আগে হয়েছে (পিটার উস্তিনভ, অ্যালবার্ট ফিনি, আলফ্রেড মলিনা) যেখানে পোয়্যারো রীতিমত ভাঁড়ে রূপান্তরিত হয়েছেন। সে সব দেখে রাগ হয়েছিল খুব, কিন্তু ক্রমে বুঝেছি এইরকম আইকনিক চরিত্রের বিভিন্ন ব্যাখ্যা হবেই। না হলেই অদ্ভুত হত। 

আমার 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' ভালো লেগেছে । বরফঢাকা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ট্রেন যাওয়ার দৃশ্য ভালো লেগেছে, অভিনয় ভালো লেগেছে, মূল গল্পের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকার সিদ্ধান্ত ভালো লেগেছে। তবে ভালো যে লাগবে জানাই ছিল।


December 09, 2017

কয়েকটা লিংক ও চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের হুইলার্স স্টল






The best things in life happen to you when you’re alone. 
                                                                         —Agnes Martin


দ্য অরিজিন্যাল গন গার্ল। 

গত বছরে শেখা ৫২টি তথ্যের এই তালিকাটি ইন্টারেস্টিং। ভারতসংক্রান্ত যে তথ্যটি লেখক জেনেছেন সেটা হল,
  1. Unscrupulous mobile phone recharging stations in Uttar Pradesh, India, are selling the phone numbers of female customers to male customers, who use them to harass the women. Numbers cost from Rs 50 (60p) to Rs 500 (£6) depending on how attractive the victim is. [Snigdha Poonam]

এই সোজা কথাটা মনে রাখা শক্ত। দ্য আদার সাইড ইজ নট ডাম্ব।


গাছ পোঁতা হয়েছে, একশো বছর পরে তাদের কেটে কাগজ হবে, সেই দিয়ে বই হবে। হতে পারে অভিনব ব্যাপার, তবে আমার খবরটা শুনে মনখারাপ হল, এ যেন বলির আগে পাঁঠাকে কাঁঠালপাতা খাওয়ানো। 

ডাইনোসরের প্রতি আমার ভালোবাসা আছে (মুখোমুখি আমি পড়তে চাই না যদিও,) তাই যখন জানলাম এমন উড়ুক্কু প্রাণীর খোঁজ পাওয়া গেছে যাদের খাদ্য ছিল শিশু ডাইনোসর, আমার মোটেই ভালো লাগল না।

এই লিংকটা খুললে আপনারাও ডাইনোসরকে ভালো না বেসে পারবেন না।


এই পাঠপ্রতিক্রিয়াগুলো আগেও পড়েছেন অবান্তরে, কিন্তু আমার এবছরের প্রিয় তিনটি বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া বেরিয়েছে এ মাসের চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের হুইলার্স স্টলে। 

December 07, 2017

গত সপ্তাহে



আমি তৈরি হয়েই গিয়েছিলাম। গেট খুলতে খুলতে বারান্দাটা দেখব, যে বারান্দায় বসে বসে ঠাকুমা মশা মারতেন, দু’পাশের বাগান দেখব, ঠাকুমার লাগানো, যত্ন করা গাছে ভরা বারান্দা পেরিয়ে সদর ঘর দেখব, ঘরের তক্তপোশে আমি আর ঠাকুমা শুয়ে থাকতাম পাশপাশি, বাঁয়ে বেঁকে অযৌক্তিক বারান্দাটা পেরিয়ে আলনা দেখব আর আলনার পাশে পর্দা সরিয়ে ঠাকুমার ঘর দেখব। এ ঘরের বিছানায় গত পাঁচ বছর ধরে ঠাকুমা শুয়ে ছিলেন। শুয়ে শুয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও অনেকক্ষণ তাঁর কাছে না গেলে আমাকে ‘সোনা সোনা’ বলে ডেকেছেন। ওই ঘরের জানালার শিকের মধ্য দিয়ে বিশ্বের খবর নিয়েছেন এবং দিয়েছেন। 

আমি তৈরি ছিলাম এসব দেখলেই আমার চোখে জল আসবে।

যেটার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না (যদিও থাকা উচিত ছিল) সেটা হচ্ছে ওই বাড়িতে এখন অন্তত দশজন লোক বাড়তি থাকবেন। আরও জনা দশেক রোজ আসাযাওয়া করবেন। ঠাকুমার খাট দেওয়ালের দিকে ঠেলে দিয়ে মেঝেতে ঢালাও বিছানা পাতা হবে। তেরোদিনের জন্য যাঁদের খাটে শোওয়া বারণ হয়ে গেছে তাঁরা তো মাটিতে শোবেনই, যাদের বারণ নয় তারাও কমরেডারি দেখিয়ে বেতো হাঁটু নিয়ে এই ডিসেম্বরের শীতে মেঝেতে শয্যা পাতবেন। আতপচালের ফেনাভাত আর সাবুমাখার মহোৎসব চলবে। (শেষদিন সেজকাকু বলেছেন, ‘এই শেষ, আর লাইফে সাবু মুখে তুলব না, বাপ রে বাপ রে বাপ।’ )

যেটার জন্য আমার তৈরি থাকা উচিত ছিল সেটা হচ্ছে বাড়ি গেলে শোক করার মতো ফুরসৎই থাকবে না আমার।

ভালোই হয়েছে না থেকে। আমার তো শখের শোক, আমার বাবামার না হলে বড্ড কষ্ট হত।

*****

আমার শোকের অনুপস্থিতির জন্য দায়ী আরও একটা ফ্যাক্টরের কথা আমি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম, সেটা হচ্ছে দুজন মানুষের উপস্থিতি। তাদের ছবি আগের পোস্টেও দেখিয়েছি আপনাদের, আবার দেখাচ্ছি। 


মাঝের জন্য হচ্ছেন মনা। আর ডানের জন্য টুনা। এ দুজন যথাক্রমে আমার জেঠতুতো দিদি এবং বোন। তিনে মিলে আমরা মনাসোনাটুনা। মনাদিদি ভীষণ ভালো গল্প করতে পারে, তেতোচচ্চড়ি খাইয়ে মাংস ভুলিয়ে দিতে পারে, একবার চোখ বড় করে তাকিয়ে অতি বাঁদর বাচ্চাকে শান্ত করতে পারে, কিন্তু আস্তে হাসতে পারে না। 

টুনার জীবনের সবথেকে বড় আফসোস, ওর আশেপাশে সবার চশমা আছে, খালি টুনার নেই। ছোটবেলায় বাবামায়ের সঙ্গে দুয়েকবার ডাক্তারখানায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, বড় বয়সে টুনা মরিয়া হয়ে নিজেই ডাক্তারখানায় গেছে এবং চোখে আবছা দেখার কাল্পনিক কমপ্লেন করেছে। বলেছে, ‘ভালো করে দেখুন না ডাক্তারবাবু, যদি খুঁজেটুজে একটুখানি পাওয়ার পাওয়া যায়।’ ডাক্তার বলেছেন, ‘অসম্ভব। এত স্বাস্থ্যবান চোখ আমি লাইফে কমই দেখেছি।’ এখন টুনার একমাত্র আশা বুড়ো হওয়া। তবে যদি চশমা পাওয়া যায়।

মনাটুনা এসে পড়ার পর আমার শোকের যেটুকু সম্ভাবনা ছিল তাও আর রইল না। নেমন্তন্ন বাড়িতে গল্প করার মতো জিনিসের অভাব থাকে না। ব্যান্ডের গান থেকে শুরু করে ফিল্মের হিরোহিরোইন পর্যন্ত আমাদের পছন্দঅপছন্দ মোটামুটি একইরকম, আত্মীয়স্বজনের ক্ষেত্রেও বিশেষ অমিল নেই। অর্থাৎ যাকে পছন্দ তাকে তিনজনেরই পছন্দ, যাকে দেখলে গা জ্বলে তাকে দেখলে তিনজনেরই গা জ্বলে। গায়ের দোষ নেই, কিছু কিছু লোকের স্বভাবই ওই রকম। কাকে কী জিজ্ঞাসা করলে বিব্রত হতে পারে বুঝে নিয়ে তাকে ঠিক সেই প্রশ্নটা করে। আমাদের তিনজনকেই সেরকম প্রশ্ন করার পর আমরা প্রতিশোধ নেওয়া ঠিক করলাম। গাজ্বলার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যাকে দেখলে গা জ্বলে, তার সবকিছু দেখলেই গা জ্বলে, এমনকি বেগুনভাজা খাওয়ার রকম দেখলেও। 

প্রথমে যখন হাসির হররা ওঠে সবাই আঁতকে ওঠে। শ্রাদ্ধবাড়িতে এত জোরে হাসতে নেই, নিমন্ত্রিতরা কী বলবে? আর মনাদিদির হাসি তো তিনটে বাড়ির পরের লোকেরাও শুনতে পাচ্ছে। মাজেঠি রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে মুখ চেপে ধরার চেষ্টা করেন। তারপর আশেপাশের ঘরে যারা ভয়ানক গম্ভীর মুখ করে বসে ছিল তারা গুটি গুটি আমাদের ঘরে এসে ভিড় জমায়। গোল বড় হয়, খাটে তিলধারণের জায়গা থাকে না, সবাই ঝুলি ঝেড়ে মজার গল্প বার করে। সবাই জোরে জোরে হাসে।

সন্ধ্যেবেলা বাইরের লোকেরা চলে গেলে, ঠাকুমার ঘরে বড়দের আড্ডা বসে। আমরা এ ঘর থেকে শুনতে পাই মা বহুদিন বাদে গান গাইছেন। পিসিরা গলা মিলিয়েছে।

*****

অনুষ্ঠানবাড়ির অন্যতম কঠিন ব্যাপার হচ্ছে লোক চেনা। একতুতো, দুইতুতো, তিনতুতো কাকা জেঠু, পিসে, কারও কারও মুখ মনে আছে, কাউকে কোনওদিন দেখেছি কি না সন্দেহ। আমার তিনতুতো ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে জীবনে দু’বার, নাম ভুলে গেছি। কান খাড়া করে ঘুরছি, যদি কেউ নাম ধরে ডাকে, শুনে নেব। কেউ ডাকল না, তখন দায়িত্বজ্ঞানহীন ননদের মতো স্বীকার করতেই হল, ‘তোমার নামটা বল না, ভুলে গেছি।’

পাড়ার লোকদের আমি একসময় সবাইকে চিনতাম, এখন সেখানেও হয়েছে মুশকিল, বুড়োদের চিনতে পারছি, জোয়ানদের পারছি না। পারব কী করে? এদের আমি দেখেছি কাউকে হামা দিতে, কাউকে হাতে হাওয়াই চটি পরে দৌড়তে। তারা এখন সব বরবউ সহযোগে উপস্থিত হয়েছে। আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে, ‘চিনতে পারছ? বল তো আমি কে?’ 

অত ভিড়ের বাড়িতে অবশ্য সবাইকে না চিনলেও পার পেয়ে যাওয়া যায়। ‘ভালো করে খাবেন, লজ্জা করবেন না, যা লাগে চেয়ে নেবেন’ বলতে গেলে নামধাম না জানলেও চলে। বা সদ্য কেউ বাড়িতে ঢুকলে, ‘আসতে বেশি কষ্ট হয়নি তো’ ইত্যাদি বলতেও ট্যাক্স লাগে না। কিন্তু মা এই করতে গিয়েই বিপদে পড়েছেন, একটা ফর্সা গম্ভীর মতো ছেলেকে যেই না জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘আপনাদের আসতে কতক্ষণ লাগল?’ সে ছেলে একগাল হেসে বলেছে, ‘দেড় মিনিট, জেঠিমা।’ তারপর বেরোলো সে বুম্বা, আমাদের তিনটে বাড়ি পরের বণিকদের বাড়ির ছেলে।

তবে লোক চেনার থেকেও শক্ত কাজ হচ্ছে চা করা। আমার মতে অনুষ্ঠানবাড়ির সবথেকে শক্ত কাজ। আজকাল আবার সবার প্যাকনা, কেউ দুধ দিয়ে খায়, কেউ না দিয়ে, কেউ আধকাপ খাবে, কেউ দুই-তৃতীয়াংশের একচুমুক বেশি খেলেই পেট ফেটে মরে যাবে। আর ওয়ার্স্ট যারা তারা জিজ্ঞাসা করতে বলবে, ‘আমার কোনও ঝামেলা নাই, যা দিবা দাও।’ তারপর লিকার চা দেখে বলবেন, ‘ইস, কালাকালা চা খাই না।’ দুধ দেওয়া চা নিয়ে এলে চুমুক দিয়ে মুখব্যাদান করে বলবে, ‘চিনি ছাড়া কর নাই? না করলে অসুবিধা নাই। এই দিয়া কাম চালায়া নিমু।’ 

‘তাই নিন বরং,’ বলার মতো স্মার্ট আমার মা বা জেঠি কেউই নন, কাজেই তৃতীয়বার চা আসে।

এর ওপর যদি চায়ের কাপ ধুতে হয় তাহলেই হয়েছে। মৎস্যমুখী/নিয়মভঙ্গের দিন সকালে আবিষ্কার করা হল কাগজের কাপ শেষ, একজনকে দিয়ে আনানো হয়েছিল, সে ভয়ানক ছোট কাপ নিয়ে এসেছে, তাতে লোককে চা দিলে একেবারে নাককাটা। মা আমাকে একপাশে ডেকে চুপি চুপি বললেন, ‘বাজারে গিয়ে কাপ এনে দে সোনা।’ আমি বললাম, ‘অফ কোর্স।’ তারপর কুটকুটে সবুজ রঙের বমকাই পরে সকাল সাড়ে ন’টার সময় টোটো চেপে গেলাম কাপ কিনতে। 

ভাগ্যিস গেলাম। ওই সময়ের রিষড়া স্টেশন দেখিনি আমি বহু বহু বছর। একই রকম গোলমেলে, তবে লোক আরও বেশি। দোকানের মাথার বোর্ড আরও চকচকে। অনেক চেনা দোকান নেই। কোনওটা ভেঙে তিনখানা দোকান হয়েছে। যে দোকানগুলোকে আমার ছোটবেলায় প্রকাণ্ড মনে হত, যত দিন যাচ্ছে তত তারা চিলতে থেকে চিলতেতর প্রতিভাত হচ্ছে। দোকানের ভেতরের শিশিবয়ামের ওপাশে বসে থাকা মুখ বেশিরভাগই বদলে গেছে, তবে কাউকে কাউকে এখনও চেনা যায়। 

আমার বন্ধুর বাবার দশকর্মা ভাণ্ডার থেকে কাপ কিনলাম। কাকু চিনতে পেরেছেন আমাকে। 

*****

দুঃখ হল বাড়িটা যখন ফাঁকা হয়ে গেল। সবাই চলে গেলে, একজনের না থাকা প্রকট হয়ে ওঠে। মাবাবা প্ল্যান করেন, ‘তুমি সামনের দিকে শোবে, আমি পেছন দিকে শোব, তাহলে বাড়ির দুদিকেই নজর রাখা যাবে।’ আমার খাটের সঙ্গে মিশে যাওয়া ঠাকুমা যে বাড়ি পাহারা দেওয়ার কাজে লাগছিলেন এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে? চলে যাওয়ার আগে গৌরীপিসি খেতে বসে গ্রাস তুলতে পারে না। মামি মরে গেলে কি মামাবাড়ি ফুরিয়ে যায়? তপাকাকুর গাড়িতে উঠে পড়ে মনে হয়, এইবার সত্যি সত্যি সব ফুরোলো। ঠাকুমার ঘরের জানালাটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলি, ‘চললাম, ঠাকুমা। টা টা।’ 

*****

জি টি রোডে অবরোধ হয়েছিল। ভেতর দিয়ে অনেক ঘুরে আসতে হল। ভেতরের গলি এমনিতেই সরু, তার মধ্যে দুদিকে সবজি, ফলের ঠেলাগাড়ি, দোকানের সামনে হেলান দেওয়া বাইক, দুদিক থেকে আসা এস ইউ ভি। এইসব সময় বোঝা যায়, মফস্বলের অধিকাংশ লোকই স্বভাবগত ভাবে ট্রাফিক পুলিস। বাড়ির ছাদ থেকে, বারান্দা থেকে কত যে ডাইনে কাটাও, বাঁয়ে কাটাও,’ শোনা গেল। এমনকি রাস্তার পাশের দশফুট বাই দশফুট খুপরির সামনে হামা দেওয়া খোকাখুকু পর্যন্ত কাজলটানা চোখ পাকিয়ে ‘কাতাও কাতাও’ করছে। কপাল ভালো জ্যাম ছাড়ল আর আমরা অবরোধের লোকেশন পার করে জি টি রোডে এসে পড়লাম। তখনই দেখলাম মেরুনসবুজ আর লালহলুদ পতাকায় মোড়া টেম্পো আর প্রাইভেট গাড়িগুলোকে। ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের ম্যাচ আছে যুবভারতীতে। নিজের নিজের দলকে সমর্থন করার জন্য গাড়ি ভাড়া করে, ঠাসাঠাসি হয়ে চলেছে দুই দলের সমর্থকেরা। মাইকে চিৎকার করতে করতে, স্লোগান দিতে দিতে,  মুখে এবং হস্তমুদ্রায় যৌন নিগ্রহের আস্ফালন করতে করতে বাংলার যুবসমাজ মহান ঐতিহ্যরক্ষায় চলেছে।

*****

প্লেনে আমার পাশে যে বসেছিল সে আকারে মানুষের বাচ্চার মতোই, প্রকারে ল্যাজকাটা বাঁদর। দুরন্ত বাচ্চাদের আমি ভয় পাই এবং পারতপক্ষে ঘাঁটাই না। মুখ গম্ভীর করে প্রাণপণে ভগবানকে ডাকি যেন তারাও আমাকে না ঘাঁটায়। এর সঙ্গেও সারা রাস্তা আমি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারের কোনও চেষ্টা করিনি। নিজের কাজ করেছি, সামনের সপ্তাহের টু ডু লিস্ট বানিয়েছি, গো এয়ারের মেনু মুখস্থ করেছি, আর ফ্লাইট ম্যাগাজিন দেখে পরের বেড়াতে যাওয়ার আইডিয়া সংগ্রহ করেছি। 

শেষটা যখন ল্যান্ডিং হচ্ছে তখন শুরু হল চিৎকার। ‘মাম্মি মেরে কান মে দর্দ হো রহা হ্যায়! পাপা মেরে কান মে দর্দ হো রহা হ্যায়!’ মাম্মি পাপা যথাসম্ভব চেষ্টা করলেন তার কানের দর্দ থামাতে, একখানা কোক কেনা হয়েছিল কিছুক্ষণ আগে সেই খেতে দিলেন, নাকমুখ বন্ধ করে বসতে বললেন, কর্তৃপক্ষকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন লজেন্সটফি কিছু পাওয়া যাবে কি না, তাতে সে কানের ব্যথা ভুলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ম্যাংগো বাইট!’ ম্যাংগো বাইট পাওয়া গেল না।

তখন সে হাল ছেড়ে চুপ করল। মিনিটখানেক পর কোমরের কাছে একটা খোঁচা খেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি জন্য ছোট একখানা মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

‘আপকে কান মে ভি দর্দ হো রহা হ্যায়, আন্টি?’

আমি মাথা নেড়ে বললাম, না।

সে মায়ের দিকে ফিরে করুণ গলায় বলল, ‘কিসিকে কান মে দর্দ নহি হো রহা হ্যায়, সির্ফ মেরে কান মে কিঁউ হো রহা হ্যায়?’

আর আমি মাটিতে মিশে গেলাম। ছি ছি ছি। কী ক্ষতি হত আমার যদি বলতাম, আমি কানের ব্যাথায় মরে যাচ্ছি? সত্যভাষণের রোগ কি অবশেষে আমাকে ধরে ফেলল? এইসব ভেবে ভেবে মরমে মরছি, এমন সময় প্লেন ল্যান্ড করল। কানের ব্যথাও কমল সম্ভবত কারণ সে আমাকে দ্বিতীয় প্রশ্নটা করল। 

‘আপ দিল্লি মে রহতে হো?’

আমার উত্তর শুনে চোখ কপালে তুলে বলল, ‘ম্যায় ভি দিল্লি মে রহতা হুঁ।’ যেন এরকম আশ্চর্য সমাপতন ওর বছরপাঁচেকের জীবনে আগে ঘটেনি।

আমি প্রায়শ্চিত্তের জন্য মুখিয়ে ছিলাম, হাত তুলে বললাম, ‘ফির হো যায়ে এক হাই ফাইভ?’ 

চটাস করে হাই ফাইভ এসে পড়ল আমার হাতে।


December 03, 2017

এখনতখন



ঘণ্টাখানেক হল ঘরে ঢুকেছি। সবাইকে ফোন করে নিশ্চিন্ত করে, হাতপা ধুয়ে, জামা ছেড়ে, টিভি চালিয়ে, কেটলিতে জল বসানো হয়ে গেছে। অবান্তরে চারখানা পোস্ট লেখার মতো কথা জমেছে গত চারদিনে। সে সব কথা, মনে হওয়া, মনে পড়া, মাথার ভেতর জট পাকিয়ে, বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে রয়েছে এখন। তাদের ঝেড়েবেছে বাক্যে প্যারাগ্রাফে সাজাতে সময় লাগবে, হয়তো সাজানো হবেও না। তাই আপাতত চট করে এই কয়েকটা ছবি দেখিয়ে নিই আপনাদের। আপনারা সবাই ভালো আছেন আশা করি। শিগগিরই আগের ছন্দে দেখা হচ্ছে।











November 26, 2017

দ্য অয়েন্টমেন্ট



২০শে নভেম্বর, ২০১৭ র সকাল সাতটা তিন মিনিটে ঠাকুমা মারা গেলেন। আমি ঠাকুমার কাছে ছিলাম না। এমন দূরত্বেও ছিলাম না যে চট করে চলে আসতে পারি। কাজেই আমাকে বাবামা খবরটা তৎক্ষণাৎ জানাননি। পাছে আমার বিপদ হয়। পাছে আমি অতদূরে একলা ভেঙে পড়ি। আমি খবর পেয়েছি বাড়ি ঢুকে, অর্চিষ্মানের মুখে, সব চুকেবুকে যাওয়ার পর। 

মৃত্যুর সময় ঠাকুমার কাছে আমার বাবা ছিলেন, মা ছিলেন, আর বিজলিদি ছিল। গত কয়েকবছরে আমার ঠাকুমার সবথেকে কাছের তিনজন মানুষ। ঠাকুমা বিছানাবন্দী ছিলেন অনেক বছর। শেষদিকে সাড়া কমে এসেছিল, ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, ‘মাল্টিঅর্গ্যান ফেলিওর’ শুরু হয়েছে। অতিকষ্টে দুয়েকটা কথা বলতেন, কিন্তু চেতনা টনটনে ছিল, যেটুকু বলতেন নিখুঁত বলতেন। ছোটদাদু দিদা দেখতে এসেছিলেন, প্রথমটা চিনতে পারেননি। দৃষ্টিশক্তি ধীর হয়ে এসেছিল। ঠাকুমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়াতে পেরেছিলেন। স্মৃতি অদ্ভুতভাবে কাজ করে। জ্যান্ত লোককে চিনতে পারছেন না, অথচ কবে মরে যাওয়া তাঁর ছোটমাসির নাম জিজ্ঞাসা করাতে মুহূর্তের মধ্যে বলে উঠেছিলেন, ‘কুট্টিমাসি’। ছোটদাদু কম মৃত্যু দেখেননি তাঁর জীবনে। বলে গিয়েছিলেন বাবাকে, এখন আর বেড়াতে যেয়ো না কোথাও। 

সপ্তাহখানেক ধরে ঠাকুমার খারাপ শরীর আরও খারাপ হয়েছিল। কী একটা ইনফেকশন হয়েছিল, গালের কাছটা ফুলে গিয়ে ধুম জ্বর এসেছিল। ডাক্তারবাবু বদলে বদলে ওষুধ দিচ্ছিলেন, তাতে কাজও দিচ্ছিল। গালের ফোলাটা কমল, জ্বর নামল। সবাই ভাবল আবার সামলে নিলেন ঠাকুমা। গত প্রায় দশ বছর ধরে এই রকম সব ঝড় সামলে নিচ্ছেন ঠাকুমা। স্ট্রোক, মাথার অপারেশন, হ্যানাত্যানা। উনিশ তারিখেও একটা নতুন ওষুধ লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু, সন্ধ্যেবেলায় হাঁটতে বেরিয়ে ওষুধটা কিনে এনেছিলেন বাবামা, খাওয়ানোও হয়েছিল।

কুড়ি তারিখ সকালে মা এসে ঠাকুমার লেপ সরিয়ে শীতের জামা পরাতে গিয়ে দেখেছিলেন, কী রোগা হয়ে গেছেন ঠাকুমা। শরীরটা শুধু একটা খাঁচা। রোজই দেখছেন, কিন্তু সেদিন মায়ের নতুন করে দুঃখ হয়েছিল। মনে হয়েছিল, ঠাকুমার কত কষ্ট হচ্ছে। বিজলিদি ঠাকুমাকে দাঁত মাজিয়ে, চুল আঁচড়িয়ে দেওয়ার পর চা খেতে বসা হত সবাই মিলে। এই পর্যন্ত অন্যদিনের মতোই চলছিল, বিজলিদি ঠাকুমার দেখভাল করছিল, মা রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় ব্যতিক্রম ঘটল। বিজলিদি ডাকল, ‘বৌদি, শিগগিরি আসুন।’ মা ছাঁকনি ফেলে ঠাকুমার ঘরের পর্দা তুলে একঝলক দেখে বাবাকে দৌড়ে গিয়ে বললেন, ‘শিগগির এসো।’ বাবা এসে বসলেন ঠাকুমার পাশে। ঠাকুমার শ্বাস তখন গভীর এবং ধীর। বিজলিদির মাথা বরফের মতো ঠাণ্ডা, ঠাকুমার খাটের পাশের টেবিলে রাখা জলের ঘটি এনে দিল বাবার হাতে। বাবা এক চামচ জল দিলেন ঠাকুমার মুখে। জল ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল। মা ঠাকুমার মাথা তুলে ধরলেন, কিন্তু ততক্ষণে আরেকটা কথা মায়ের মনে পড়ে গেছে। ঠাকুরের আসনে দু’টো গঙ্গাজলের দুটো পাত্র রাখা আছে আমাদের। একটায় রিষড়ার গঙ্গার জল, অন্যটায় হরিদ্বারের। হরিদ্বারের গঙ্গার জল আনার পর সেই দিয়েই খুব পুজোটুজো হচ্ছিল, যতদিন না ঠাকুমা বললেন, রিষড়ার গঙ্গার জলেই ঠাকুর তুষ্ট হবেন এখন, হরিদ্বারের গঙ্গার জল বরং বাঁচিয়ে রাখ আমার জন্য। তখন ঠাট্টা বলেই ধরেছিল সবাই, কিন্তু ওই মুহূর্তে সবই ভয়ানক সিরিয়াস। ঠাকুমার মাথার নিচে শাল গুঁজে দিয়ে মা দৌড়লেন ঠাকুরের আসন থেকে ঠাকুরকে বঞ্চিত করে ঠাকুমার জন্য তুলে রাখা সেই জল আনতে। একেক চামচ সেই জল বাবা, মা, বিজলিদির হাত থেকে বিনা প্রতিবাদে ঢকঢক করে গিলে নিলেন ঠাকুমা, আর তাঁর চোখের পাতা দুটো স্লো মোশনে বুজে এল। যেন ভীষণ ঘুম পেয়েছে।

ডাক্তারবাবু এলেন। তেত্রিশ বছর আগে আমার ঠাকুরদা মারা যাওয়ার  সময় এই ডাক্তারবাবু সবে পাশ করে পাড়ায় চেম্বার খুলে বসেছিলেন, ঠাকুরদা বন্ধুবান্ধবের কাছে সুখ্যাতি শুনেছিলেন, খুব শখ ছিল তরুণ ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে তবে মরবেন। ঠাকুরদার সাধ মিটেছিল। সেই আমাদের বাড়িতে ডাক্তারবাবুর যাতায়াত শুরু। তেত্রিশ বছর পর, সেই ডাক্তারবাবু, এখন যাঁর চুলে পাক, চোখে চশমা, আমার ঠাকুমার ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিলেন। 

আত্মীয়স্বজন এল, তারও আগে এল পাড়ার লোক। ঠাকুমা যাঁদের সঙ্গে বসে বারান্দায় গল্পের আসর বসিয়েছেন, রাত তিনটে থেকে জেগে থেকে নিজের বাড়ির সঙ্গে যেচে যাঁদের বাড়ির ফুলগাছ পাহারা দিয়েছেন, সবাই। জেঠু, জেঠি, রত্মাকাকিমা, অমিতকাকু, শ্যামলকাকু, রাজুদা, টুকাইদা, বুচিদিদি, বুবুন। হরিবোল বলে ঠাকুমার খাট গাড়িতে তুলে দিল সবাই। আমার বাবাকাকাজেঠু তো গেলেনই, পাড়ার সবাই যারা একে অপরের বাড়ির শ্মশানবন্ধু হয়ে এসেছে বছরের পর বছর, তারাও সঙ্গে গেল। 

*****

শোক সর্বদাই স্বার্থপর। ঠাকুমার জন্য আমার যত না শোক, ঠাকুমা চলে যাওয়ার পরের আমার জন্য আমার শোক তার থেকে অনেক বেশি। মোটে একটাই জীবন বাঁচছি, কাজেই বেঁচে থাকায় আমি এক্সপার্ট নই। বেঁচে থাকতে গেলে কী কী লাগে আমি জানি না। টাকা লাগে, জামাকাপড় লাগে, প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি, এবং প্রশংসা লাগে। কার কতটা করে লাগবে তারও তারতম্য আছে, কোনও বাঁধাধরা নিয়ম নেই।

তবে যা বুঝেছি, বাঁচতে গেলে ভালোবাসার লোক লাগেই। এমন লোক যারা আমাকে ভালোবাসবে। কোনও প্রশ্ন না করে ভালোবাসবে। আমি যেমন ঠিক তেমন করে আমাকে ভালোবাসবে। আর সে রকম ভালোবাসা কেমন হয়, কাকে বলে তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন আমার ঠাকুমা। 

জীবন থেকে হঠাৎ অতখানি ভালোবাসা উধাও হওয়ার ক্ষতি হিসেব করছি আমি এখন বসে বসে। শেষবার গিয়ে ঠাকুমার গালে গাল, ঠাকুমার আঙুলে আঙুল জড়ানোর ছোঁয়াটা মনে করার চেষ্টা করছি। অপেক্ষা করছি, কখন সময় এই ক্ষতি পূরণ না করলেও, অন্তত ভুলিয়ে দেবে।

ডেথ ইজ নট দ্য ফ্লাই ইন দ্য অয়েন্টমেন্ট। ইট ইজ দ্য অয়েন্টমেন্ট। পড়লাম ক’দিন আগেই। ক’দিনের জীবন কাটিয়ে আমার ঠাকুমা সেই মৃত্যুময় জগতে ফিরে গেছেন। আমিও যাব একদিন। যদিও আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ঠাকুমা ততদিন বসে থাকবেন, তা ধরে নেওয়ার মতো নিষ্পাপ বিশ্বাস আমার আর নেই। শুধু গত সাঁইত্রিশ বছরের ঠাকুমাকে কাছে পাওয়াটুকু রইল। থাকবেও।


November 21, 2017

পথে



ইস্তানবুল থেকে বোর্ডিং প্রায় শেষ, সবাই বসে পড়েছে, ওভারহেড বিনগুলো ধপাধপ বন্ধ হওয়ার আওয়াজ কমে এসেছে, আমি একবার মিডিয়া লাইব্রেরি পরীক্ষা করে নিয়েছি, দিল্লি থেকে ইস্তানবুল আসার পথে বার্ডম্যান আর হিডেন ফিগারস দেখা হয়ে গেছে, আমি ভাবছি এবার ‘মার্ডার, শি বেকড’ দেখব না ‘লেগো ব্যাটম্যান’, ভেবে ভেবে লেগো ব্যাটম্যানের দিকেই যখন মন ঝুঁকেছে এমন সময় একটা অস্বস্তি হল।

শারীরিক অস্বস্তি নয়, গরম বা ঠাণ্ডা লাগছে না। মানসিকও যে নয় বোঝাই যাচ্ছে, লেগো ব্যাটম্যান দেখার জন্য তৈরি হচ্ছি যখন। একবার দ্রুত চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলাম। না, কেউ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে নেই, যে যার নিজের সামনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে।

অস্বস্তিটা গেল না। উল্টে একটু একটু তাকে চিনতে পারলাম। একটা কিছু যা আমার সঙ্গে থাকার কথা, কিন্তু না থাকার অস্বস্তি।

ছাতা আনিনি (যদিও বনে বৃষ্টি হবে লিখেছে), রুমাল ব্যাগের ভেতর, টিফিনবাক্সে লুচিআলুভাজা পুরে প্লেনে ওঠার জমানা গেছে, আই কার্ডও ব্যাগ থেকে বার করার প্রয়োজন হয়নি। এসব ছাড়া আর যে জিনিসটা আমার কাছে থাকার কথা, ছিলও এই কিছুক্ষণ আগে, আমার পাঁচ আঙুলে তার ছোঁয়া আমি তখনও স্পষ্ট কল্পনা করতে পারছি, আমার মেরুন কামিজের কোলে শুয়ে থাকা তার অবয়ব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ঘন নীল, চৌকো, ওপরে সোনালি কালিতে কয়েকটা শব্দ লেখা।

ঘরে আগুন লাগলে কী নিয়ে ছুটে বেরোবো এ প্রশ্ন যখনই উঠেছে, বিনা দ্বিধায় আমি বলেছি, পাসপোর্ট। ভোটার কার্ড না, আধার না, আমার অফিসের আই কার্ড না, এমনকি অর্চিষ্মানও না, পাসপোর্ট। (যদিও লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে এবার থেকে অর্চিষ্মানকে নিয়ে বেরোনোটা পাসপোর্ট নিয়ে বেরোনোর থেকে বুদ্ধিমানের হবে। পাসপোর্ট নিয়ে অর্চিষ্মানকে খুঁজতে বেরোনো অসম্ভব, কিন্তু নতুন পাসপোর্টের জন্য দৌড়োদৌড়ি করার সময় অর্চিষ্মান সঙ্গে থাকলে সুবিধে।)

সেই পাসপোর্ট আমার কাছে নেই। কোথাও আগুন লাগেনি কোথাও, কোনও বিপর্যয় ঘটেনি, আমি জাস্ট বসে বসে, একটুও কাঠখড় না পুড়িয়ে, নিজ দায়িত্বে আমার পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেছি। যেমন করে সবাই ছাতা কিংবা রুমাল কিংবা টিফিন বাক্স হারায়।

ব্যাগে দেখলাম, নেই। সামনের খোপে দেখলাম, নেই। উঠে জামা, চাদর ঝাড়লাম, পাসপোর্ট ঝরে পড়ল না। দু’পাশের সহযাত্রীদের তুলে তাঁদের সিট, সিটের মাঝের ফাঁক চেক করলাম, নেই। আইলে বেরিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ে যতদূর চোখ যায় প্লেনের মেঝে পরীক্ষা করলাম। নেই। আমার পাসপোর্ট কোথাও নেই। জাস্ট উবে গেছে। 

টেক অফের তিন মিনিট আগে যতখানি সাড়া ফেলা যায় (আমার পক্ষে) ফেললাম। প্লেনের সহকারীদের তখন তুঙ্গ ব্যস্ততা। তাঁরা জানালেন এই মুহূর্তে তাঁদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়, যা হওয়ার ল্যান্ডিং-এর পরেই হবে। যদি আমার মনে হয় পাসপোর্ট এয়ারপোর্টে ফেলে এসেছি তাহলে আমি প্লেন থেকে নেমে যেতে পারি। 

আমি নামলাম না। কারণ আমি নিরানব্বই শতাংশ নিশ্চিত ছিলাম আমি পাসপোর্ট নিয়ে প্লেনে উঠেছি। আমাকে আরও সাহস দিলেন আমার ডানদিকে বসে থাকা সহযাত্রী। বললেন, ‘আই স ইট ইন ইয়োর হ্যান্ড!’

কিছু কিছু মানুষ থাকেন যারা যে কোনও পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে ক্রাইসিসের মুহূর্তেও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারেন। আমার এই সহযাত্রী সেই গোত্রের। প্রথমেই তিনি আমাকে স্লো ব্রিদিং-এর পরামর্শ দিলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, আমি তোমার জিনিসপত্র চেক করতে পারি? মে বি আ সেকেন্ড পেয়ার অফ আইজ…আমি আমার ব্যাগ ওঁর হাতে গুঁজে দিলাম। বাঁচান আমাকে। তারপর দেখলাম সিস্টেমেটিক খোঁজা কাকে বলে। ভদ্রমহিলা আমার শালটা নিয়ে নিজের কোলে পাতলেন, তারপর ব্যাগ থেকে প্রতিটি জিনিস বার করে শালের ওপর ঝেড়ে ঝেড়ে দেখলেন। 

পাসপোর্ট বেরোলো না। 

‘বাট আই স ইট ইন ইয়োর হ্যান্ড! ইট মাস্ট বি ইনসাইড দ্য প্লেন!’

ততক্ষণে প্লেন মেঘটেঘের দুলুনি পেরিয়ে শান্ত আকাশে ভেসে চলেছে। আমার মাথার ভেতরের পরিস্থিতির সঙ্গে তার চালের কোনও মিল নেই। সিটবেল্ট বাঁধার সাইন অফ করে দেওয়া হয়েছে। আমি উঠে আবার চারদিক খুঁজে দেখলাম। সহযাত্রীরা কেউ সাহায্য করলেন, কেউ সোজা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পাসপোর্ট নেই।

আমি ফেরত গিয়ে মাথা সিটে হেলিয়ে চোখ বুজলাম। একটু আগের কনভিকশনটা, যে পাসপোর্ট কোথাও যেতেই পারে না, ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল। হয়তো আমি পাসপোর্টটা নিয়ে প্লেনে উঠিনি। বোর্ডিং-এর আগের মুহূর্তে বোর্ডিং পাসের সঙ্গে আমার পাসপোর্টটাও চেক করেছিল। তারপর আমি ভেস্টিবিউল দিয়ে দেড়শো পা হেঁটে প্লেনে উঠেছি। হয়তো সেখানে আমার হাত থেকে পাসপোর্ট পড়ে গেছে।

খাবার এল। প্লেনের খাবার সবাই দূরছাই করে, আমার দিব্যি লাগে। বাড়িতে কেমন বোরিং থালাবাটি, এখানে কেমন প্লাস্টিকের বাক্স থেকে প্লাস্টিকের কাঁটা বিঁধিয়ে খাওয়া। কোনওমতে ফয়েল তুলে কাঁটার ডগায় একখানা পাস্তা গেঁথে মুখে পুরলাম। অসম্ভব। আমার সারা শরীর টেনশনে দরজা বন্ধ করে খিল তুলে দিয়েছে, একবাটি তো দূরঅস্ত, একটা পাস্তারও জায়গা নেই।

ফ্রাংকফুর্ট এসে গেল। ওড়ার আগে পাইলট বলেছিলেন মোটে ঘণ্টা আড়াইয়ের মামলা, যদিও আমার মনে হল পাঁচঘণ্টার এক সেকেন্ড কম নয়। সবাই নেমে গেল। ডানপাশের ভদ্রমহিলা আমার হাত চেপে ধরে আমার চোখে চোখ ফেলে বলে গেলেন, ‘ইট ইজ নট লস্ট। নাথিং ইজ এভার লস্ট। রিমেমবার দ্যাট।’ আমার বাঁদিকের মেয়েটি, ওঠার পর থেকে যে জানালার দিকে তাকিয়ে মুখে রুমাল চেপে ক্রমাগত নিঃশব্দে কেঁদেছে, কান্না থামিয়ে আমার পাসপোর্ট খুঁজেছে, খোঁজা শেষ করে আবার মুখ ফিরিয়ে কেঁদেছে, বলে গেল, ‘গুড লাক’।

প্লেন খালি হয়ে গেল। আমি আবার আমার ব্যাগ, সামনের খোপ পরীক্ষা করলাম। সাষ্টাঙ্গ শুয়ে পড়ে প্লেনের মেঝে পরীক্ষা করলাম। যতদূর চোখ যায় কেবল ব্যবহৃত টিসু, বালিশের ছেঁড়া প্লাস্টিক, হেডফোন। আমার পাসপোর্ট নেই।

প্লেনের বাইরে ‘পোলিৎজাই’ লেখা বর্মের মতো কালো জ্যাকেট পরা তিনজন দাঁড়িয়ে ছিলেন, আমাকে বললেন, ‘সো, ম্যাম, ইউ ডু নট হ্যাভ ইয়োর পাসপোর্ট উইথ ইউ?’

‘নো।’ বললাম আমি।

আর বলামাত্র গোটা ঘটনাটা এই এতক্ষণ পর স্বমূর্তিতে প্রতিভাত হল। এতক্ষণ এত খোঁজাখুঁজি যেন একটা ট্রেজার হান্ট, পাসপোর্টটা কোনও খাঁজ থেকে বেরিয়ে এসে পিঠে ধাপ্পা দিলেই খেলা শেষ। কিন্তু শেষ হয়নি। খেলা সবে শুরু হয়েছে। আমি একটা অন্য দেশে এসে নেমেছি, পাসপোর্ট ছাড়া। এখন তিনজন পুলিশ আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।

যতক্ষণ আশা থাকে, ততক্ষণই ছটফটানিও থাকে। ওয়ার্স্ট যা হওয়ার হয়ে গেছে, এবার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কেউ আমাকে আর বাঁচাতে পারবে না। ঘটনাটার হাস্যকরতা, যদি কিছু থেকে থাকে, সেটার ওপর ফোকাস করলাম। পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলাম, এর পর কী কী হবে আমার। প্লেনেও এই প্রশ্নটা করেছি, সহযাত্রী এবং প্লেন কর্তৃপক্ষ কেউই সদুত্তর দিতে পারেননি। নিজেরা তো নয়ই, তাঁরা এর আগে কাউকে দেখেনওনি বা কারও কথা শোনেননি যে পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেছে। কাজেই আমার কপালে কী নাচছে সে সম্পর্কে কেউ আমাকে সাবধান করতে পারেননি। একজন বলেছিলেন, সম্ভবত তোমাকে ফিরতি প্লেনে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে, বাট আই ডোন্ট নো।

পুলিশরাও পারলেন না। বলা বাহুল্য, আমার কেস হ্যান্ডল করার জন্য সিনিয়ার অফিশিয়ালদের পাঠানো হয়নি, যারা এসেছে তারা সবাই অল্পবয়সী, নভিস পুলিশ। তাঁরা বললেন, আমরা দেখিনি, কিন্তু হতেই পারে না তোমার আগে আর কেউ কখনও পাসপোর্ট হারায়নি। ইউ আর নট দ্য ফার্স্ট (ইডিয়ট) অ্যান্ড ইউ সার্টেনলি ওন্ট বি দ্য লাস্ট।

এইটুকু সান্ত্বনাই তখন আমার কাছে যথেষ্ট।

বনে আমার পৌঁছনো দরকার সন্ধ্যে ছ’টার আগে। সেই অনুযায়ী টিকিট কাটা হয়েছে, যাতে ফ্রাংকফুর্টে দুপুরবেলা নেমে ট্রেনে চেপে বিকেলের মধ্যে বনে পৌঁছোতে অসুবিধে না হয়। এখন আর সে চান্স নেই। কিন্তু দেরি নিয়ে আমি ভাবছিলাম না। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। মনে পড়ছিল, রওনা দেওয়ার আগের সন্ধ্যেবেলায় অর্চিষ্মানের সঙ্গে দু’নম্বর মার্কেটে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে হঠাৎ কেমন মনখারাপ হয়েছিল। হলই বা সাত দিন, যে গতিতে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছি তাতে এক্সট্রা সাত দিনের অর্চিষ্মানের সঙ্গের মূল্য না বোঝার মতো বোকা আমি নই। সাত দিন একসঙ্গে থাকা যেত, মিনিমাম চোদ্দ বার একসঙ্গে চা খাওয়া যেত। জেনারেলি এ রকম বোকা বোকা মনখারাপ আমার হয় না, হয়েছিল যখন তখন কি সাবধান হওয়া উচিত ছিল যে সামনে একটা বিপদ আসতে চলেছে? মনে পড়ল ইস্তানবুল এয়ারপোর্ট দিয়ে হাঁটার সময় উল্টোদিক থেকে আসা একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে হাতে ধরা পাসপোর্ট, পাসপোর্টের ভেতরের বোর্ডিং পাস সব ছত্রাকার হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছিল, যিনি ধাক্কা দিলেন তিনি পরিণতির দিকে দৃকপাত না করে চলে গেলেন, আর আমি সব কুড়িয়ে কুড়িয়ে তুললাম, তখন লোকের অভদ্রতায় নতুন করে চমৎকৃত হওয়ার থেকে কি অশুভ ইঙ্গিতটা খেয়াল করা উচিত ছিল? যে আমার পাসপোর্ট অচিরেই আমার হাতছাড়া হতে চলেছে?

প্রথমে আমাকে এয়ারপোর্টের ওই তলারই ফেডেরাল পুলিশের শাখা অফিসে নিয়ে যাওয়া হল। ততক্ষণে আমার অন্যান্য পরিচয়পত্র (ভোটার, প্যান কার্ড) তাঁরা হস্তগত করেছেন। সেখানে আমার সমস্যা নিয়ে গুরুতর আলোচনা চলল, বলা বাহুল্য তার একটি বর্ণও আমার বোধগম্য হল না। একে তাকে ফোন করা হল, তারপর আমাকে জানানো হল যে আমাকে এয়ারপোর্টের পুলিশের হেড অফিসে যেতে হবে, সেখানে স্থির হবে আমার কী হিল্লে করা হবে।

রওনা দিলাম। এয়ারপোর্টের মধ্যে দিয়েই রাস্তা, কিন্তু আমার চেনা রাস্তা নয়। যে সব দরজায় লাল রং দিয়ে ‘ডু নট এন্টার’ লেখা থাকে দেখেছি এতদিন, সে সব দরজা পুলিশরা নিজেদের কার্ড দিয়ে খুলে ফেললেন। খাঁ খাঁ করিডর, এদিকের দরজা যতক্ষণ না বন্ধ হয় ওদিকের দরজা খোলে না, এইসব গুরুতর সিকিউরিটি পেরিয়ে পুলিশপরিবৃত হয়ে আমি চললাম। সিঁড়ি চড়লাম, নামলাম, ডায়ে বেঁকলাম, বাঁয়ে বেঁকলাম, আবার সিঁড়ি চড়লাম, আবার নামছি, এমন সময় চোখ গেল সামনে নিচের দিকে একটা ঘরের দিকে। কাচের দরজার ভেতর কোটি কোটি ইউনিফর্ম পরা পুলিশ কিলবিল করছে। নির্দেশ পাওয়া মাত্র হই হই করে ক্রিমিন্যাল নিধনে বেরিয়ে পড়বে। ওর মধ্যে আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গতি আপসে খানিকটা শ্লথ হয়ে এল। আমার সামনের পুলিশ কী হল দেখতে ঘাড় পেছনে ঘোরালেন তাই মিস করে গেলেন, কিন্তু আমি দেখতে পেলাম সামনের ঘরের ভেতর থেকে দরজা ঠেলে একজন নীল জ্যাকেট বেরিয়ে এসেছেন, হাত উঁচু করে ধরা, সে হাতে ছোট নীল রঙের একটা বই, গায়ে সোনালি রঙের ছিটে। 

আমি জানি ওগুলো কী। ওগুলো হচ্ছে কয়েকটা শব্দ। রিপাবলিক অফ ইন্ডিয়া। 

আমার পাসপোর্ট সবার হাতে হাতে ঘুরল। সবাই পাতা উল্টে উল্টে দেখল যে ওটা আমারই পাসপোর্ট কি না, ছবি তুলে ধরে ভুরু কুঁচকে আমার মুখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল, তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে পাসপোর্টটা আমার বাড়ানো হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘ইউ আর ভেরি লাকি।’

‘আই নো।’ ছাড়া আর কিছু বলার ছিল না আমার। একবার জিজ্ঞাসা করলাম, কোথা থেকে পেলে? তাতে ‘ইট ওয়াজ ইনসাইড দ্য প্লেন’ ছাড়া আর কিছু জবাব পেলাম না। মারাত্মক কৌতূহল হচ্ছিল প্লেনের এক্স্যাক্টলি কোথায় ছিল পাসপোর্টটা। যে সব জায়গায় আমি পাঁচশোবার করে খুঁজেছিলাম সেখানে? আমার সিটের নিচে? আমার সামনের খোপে? সিটের খাঁজে? সামনের রোয়ের যে লোকটা অত হল্লার মধ্যেও নির্বিকার মুখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল তার পকেটে? কিন্তু সে সবের উত্তর দেওয়ার সময় কারও ছিল না। 

পাসপোর্টটার গায়ে একবার হাত বুলিয়ে ব্যাগে পুরে নিলাম। এখন যে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, সেমিনার শুনতে শুনতে, ডিনার খেতে খেতে দশ মিনিট অন্তর অন্তর ব্যাগ খুলে পরীক্ষা করে নিচ্ছি সব ঠিকঠাক আছে কি না, তা দেখে নিশ্চয় সবাই আমাকে পাগল ভাবছে। কিন্তু আপনারা নিশ্চয় ভাববেন না।



November 18, 2017

কয়েকটা লিংক





“For me there are only two kinds of women: goddesses and doormats.”
                                                                         —Pablo Picasso  (উৎস)
    

আজকের জেওপার্ডি কুইজঃ জর্জ অরওয়েলের মতে হোয়াট ইজ the lunatic modern habit of identifying oneself with large power units and seeing everything in terms of competitive prestige.” ?

"It introduces Miss Marple who I love much more than the irritating Poirot because her reasoning is always rooted in human nature." এতে কাজ দিত, কিন্তু আরও আছে। "Christie doesn’t often get credit for the sly humour that runs through much of her work," আমি ভ্যাল ম্যাকডারমিডের কোনও বই পড়িনি, এবার পড়ে দেখতে হবে।

আমার ফেভারিট প্ল্যান? প্ল্যান ক্যানসেল করা। 




পি এইচ ডি করে কী হবে যদি কেউ বলে তাদের জবাব দেওয়া যেতে পারে, একশো বছর আগের কোনও খুনের কিনারা তো হতেই পারে।

আমি এদের বলা কোনও রকম রিডার টাইপেই পড়ি না। আপনি পড়েন কিনা দেখুন তো।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.