February 22, 2017

বার্ষিক জমাখরচ ৪/৪ঃ গত এক বছরের প্ল্যানিং থেকে আমি যা যা জেনেছি



আমি যদি কোনওদিন আত্মজীবনী লিখতে বসি (অবান্তরও একরকমের চলমান আত্মজীবনীই বটে, কিন্তু আমি বলছি রেসপেকটেবল আত্মজীবনীর কথা) তাহলে তার শুরুর লাইনটা এরকম হতে পারে। 

আই কাম ফ্রম আ লং লাইন অফ প্ল্যানারস। 

আমার পূর্বপুরুষের সকলেই প্ল্যানিং পছন্দ করতেন। আমার ঠাকুরদার বাবা, ঈশ্বর অক্ষয় বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তস্যপুত্র ঈশ্বর জগবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্ল্যানিং-এর নমুনা আমি দেখিনি, কিন্তু শুকনো কাগুজে প্রমাণের থেকে ঢের বেশি বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে রক্তমাংসের, চোখের সামনে হেঁটে চলে বেড়ানো প্রমাণ। জগবন্ধুবাবুর পুত্রের দাবিমতো যদি তিনি প্ল্যানিং করা বাবার থেকেই শিখে থাকেন,  জগবন্ধুর প্ল্যানিং-এর পক্ষে তার থেকে ভালো সার্টিফিকেট আর হতে পারে না।  

আমার বাবার মতো প্ল্যানার আমি দেখিনি। সকালের রসুন থেকে শুরু করে রাতে দুধের গ্লাস, বাবার প্ল্যান করা আছে। আজ সকালে বাবা ব্যাংকের লাইনে দাঁড়াবেন এবং তিন মাস পর বিজাপুরের গোলগম্বুজের তলায়, প্ল্যান করা আছে। জন্মে থেকে দেখছি, বিশ্বকাপ ফুটবলের সবক’টা গ্রুপ, সবক’টা ধাপ, সবক’টা গ্রুপ, সবক’টা দল বাবা ছক করে রাখেন। (সাতানব্বই সালের আগে পর্যন্ত ডায়রিতে, তারপর থেকে এক্সেল শিটে) একেকটা খেলা হয়, খোপের রং বদলে যায়, কলামের পয়েন্ট বদলে যায়। ইন্টারনেটে ওরকম ছক গণ্ডা গণ্ডা মেলে, চকচকে ছবিছাবা দিয়ে, যাকে ইনফোগ্রাফিক বলে, কিন্তু বাবা সেসবে ইমপ্রেসড হন না। বাবা নিজে হাতে প্ল্যান করবেন, কোন খেলাটা  রাত জেগে দেখবেন, কোনটা দেখবেন না।

আমিও প্ল্যানিং পছন্দ করি। প্ল্যানিং-এর মধ্যে যে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, কিংবা গোটা জীবন সুচারুভাবে কাটানোর প্রতিশ্রুতি আছে, সেটা আমার টেনশন প্রশমিত করে, মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের প্রবাহ ছোটায়। জ্ঞান হওয়া ইস্তক আমি প্ল্যানিং করে আসছি। প্ল্যানিং শব্দটা যতদিন জানতাম না বলতাম ‘রুটিন’ (তারও আগে ‘রুটিং’ বলার একটা পর্ব ছিল)। স্কুলের জন্য স্কুলের রুটিন ছিল, ছুটির জন্য আমার রুটিন। রুটিন ছিল মূলত পড়াশোনা-কেন্দ্রিক। টেস্টের রেজাল্ট দেখে চোখ মুছে কাগজে খোপ কেটে লিখতাম, সকালে ইতিহাস, দুপুরে অংক, বিকেলে বিজ্ঞান, রাতে ভূগোল। 

রুটিন করার অভ্যেস ছোটবেলায় অনেকেরই থাকে, বড় হলে অনেকেরই কেটে যায়। আমার কাটেনি। তার অন্যতম কারণ, আত্মবিশ্বাসের অভাব। আমার জীবন যে আমি নিজে অন্য কারও তত্ত্বাবধান ছাড়া (বেসিক্যালি, মা ছাড়া) চালাতে পারি এ বিশ্বাস আমার কোনওদিনও ছিল না। এবং এ অবিশ্বাসটা যে অমূলক নয়, সে আমি বারবার প্রমাণ করেছি। আর যতই প্রমাণ করেছি, ততই নিজের সময়কে রক্তচক্ষু দেখিয়ে বেঁধে রাখার চেষ্টা বেড়েছে। কী করব, কখন করব, কতক্ষণে করব। 

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, যে প্ল্যান করার মতো এত কাজ আমি পাচ্ছি কোথায়। এর উত্তর একটাই, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। রুটিন করার পথে কাজ জোগাড় বাধা হয় না। সকালে কখন দাঁত মাজব, ক’লিটার জল খাব, কখন কখন খাব, কতক্ষণ ধরে রেডি হব, কখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে কখন অফিসে ঢুকব, এই সবও প্ল্যান করার ইতিহাস আমার আছে। দৈনিক প্ল্যানিং তো আছেই, তাছাড়াও আছে নানারকম পরিস্থিতিভিত্তিক প্ল্যানিং। কোনও মাসে সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা স্বস্তির পক্ষে কম হয়ে গেলে আমি জমাখরচের প্ল্যানিং করি। রাতে দাদুর দোকানের আলুর চপ দিয়ে ডিনার সেরে সারারাত ভূগোল পরীক্ষার দিন ইতিহাস পড়ে চলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে ঘেমেনেয়ে একাকার হলে পরদিন সকালে উঠে ক্লিন ইটিং রুটিন শুরু হয়। দুধচিনি ছাড়া চা (৭), মারি বিস্কুট (২), ভাত, কুমড়োর তরকারি, ফুচকা (৬ পিস) ইত্যাদি লেখা নোটবুকে আমার বাড়ি ছয়লাপ। 

প্রতিটি প্ল্যানিং-ই শুরু হয় নতুন খাতায়। প্রতিটি প্ল্যানিং-ই এক নতুন জীবনের সূচনার আভাস আনে, কোন প্রাণে আমি তা পুরোনো খাতায় শুরু করব? খাতার রকমের বাছবিচার আমার নেই, বাঁধানো, পেপারব্যাক, রুলটানা, সাদা, পারফোরেটেড, স্পাইর‍্যাল, সেমিনারের ছাপ মারা, সবরকম খাতাতেই আমি প্ল্যানিং করতে পারি, শুধু তাদের নতুন হতে হবে। বলাই বাহুল্য, যত তেড়েফুঁড়ে প্ল্যানিং শুরু হয়, তত অগোচরেই তাদের মরণ ঘটে। দু’দিন পর আবার পুরোনো জীবনটা অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন আবার নতুন খাতা খুঁজে নতুন জীবনের নতুন নিয়ম লিখতে বসতে হয়।

এই রকমই চলছিল। নোটবুকের পাতা নষ্ট তো হচ্ছিলই, তার থেকেও খারাপ হয়ে পড়ছিল রুটিন বা প্ল্যানিং-এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আজ থেকে দশ বছর আগেও নতুন রুটিন বানাতে আমি যে উদ্যম, অনুপ্রেরণার জোয়ার অনুভব করতাম, তার কণামাত্র আর করছিলাম না। আমি মেনেই নিয়েছিলাম যে পনেরোদিনে একবার করে আমার রুটিন বানানোর ধুম পড়বে, আমি আরও একটা নোটবুকের গোটাকয় পাতা মাটি করব, এবং তার পর সে রুটিন রুটিনের মতো থাকবে, আমি আমার মতো। 

এমন সময় আমার ক্যামিলার সঙ্গে দেখা হল। ব্রাজিলের মেয়ে। সরকারি চাকরি করে। আমার মতো করে করে না, মন দিয়ে করে। রেনফরেস্টের বাঁচামরা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ক্যামিলার গলা বুজে আসে। এগ্রিকালচার বনাম এনভায়রনমেন্টের চিরন্তন লড়াইয়ে প্রত্যেকবার এনভায়রনমেন্টের হারের কথা বলতে গিয়ে ক্যামিলার মুঠো শক্ত হয়ে ওঠে। বরের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে ক্যামিলা দুই ছেলেমেয়েকে খাওয়ায় পরায়, সকার এবং ভায়োলিন প্র্যাকটিসে পাঠায়। জন্মে থেকে যত লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সবার সঙ্গে যেচে যোগাযোগ রাখে, একা চাঁদা তুলে সহকর্মীদের পিকনিকে নিয়ে যায়, ঘটকালি করে, সান্ত্বনা দেয়, ঝগড়া মেটায়, কেউ একা বসে আছে দেখলে এগিয়ে এসে পাশে বসে কথা বলে। 

আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, 'কী করে কর?' তাতে ব্যাগ হাঁটকে একটা খাটো, পেটমোটা ডায়রি বার করে ক্যামিলা বলেছিল, 'আমি করি না, করায় এ। আমি রথ এ রথী, আমি যন্ত্র এ যন্ত্রী।'

আমি বলেছিলাম, 'ওহ, প্ল্যানার। ও কোনও কাজে দেয় না।' 

ক্যামিলা বড় বড় চোখ আরও বড় বড় হয়ে গিয়েছিল। যেন আমি বলেছি গ্লোবাল ওয়ার্মিং গোটাটাই একটা ধাপ্পা। 

'নোওওওও। ইট ওয়ার্কস! ইউ হ্যাভ টু বিলিভ ইন ইট। প্রমিস মি ইউ উইল গিভ ইট অ্যানাদার ট্রাই? দিস টাইম উইথ ফুল ট্রাস্ট?' 

মূলত ক্যামিলাকে দেওয়া কথা রাখার জন্যই দু’হাজার ষোলোর শুরুতে (অ্যাকচুয়ালি, আগের বছর ঠিক এই সময় নাগাদ, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি) আমি শেষবারের মতো একটা চেষ্টা করে দেখলাম। প্ল্যানিং করার। 

ফলাফল কী হল আপনি আন্দাজ করতে পারছেন, তাই না? না হলে আমি এই পোস্টটা লিখতে বসতাম না।

দু’হাজার ষোলোয় রেজলিউশন অল্পবিস্তর রক্ষায় যে বস্তুটির অবদান আমার সমান সমান, কিংবা আমার থেকে খানিকটা বেশিই, তিনি হচ্ছেন ইনি। আমার গত বছরের প্ল্যানার। 


প্রথমেই বলি, ওই বাণীমালা অগ্রাহ্য করুন। আমি অনেক খুঁজেও এর থেকে কম খারাপ দেখতে পছন্দসই প্ল্যানার পাইনি। বাণী ছাড়া যে প্ল্যানারগুলো ছিল সেগুলো সব চামড়াবাঁধাই মোটা মোটা। ব্যাগে পুরে ঘোরা ঝকমারি। এঁর লালরং আর ভেতরের দৈনিক প্ল্যানিং-এর জন্য যথেষ্ট জায়গা আমার পছন্দ হয়েছিল। কাজেই মলাট দিয়ে ভেতর বিচার না করে কিনে ফেলেছিলাম। এঁর দ্বিতীয় অসুবিধে হচ্ছে দামটা বাড়াবাড়ি রকম বেশি। তিন নম্বর অসুবিধেটা প্ল্যানারের অরগ্যানাইজেশনসংক্রান্ত। কিন্তু প্ল্যানিং-এর ব্যাপারে আমি তখন নেহাতই নবীশ ছিলাম, কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, কোনটা আমার কাজে লাগবে কোনটা লাগবে না, সেসব বিচারের জায়গায় আমি ছিলাম না।

এখন সামান্য হলেও আছি। অন্তত আমার নিজের প্ল্যানিং কার্যকরী হওয়ার জন্য কী কী জরুরি সে সম্পর্কে আমার ধারণা আগের বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এখন অনেক স্পষ্ট। প্ল্যানিং করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু জেনেছি, তাদের মধ্যে কিছু প্ল্যানিং বিষয়ে, যেমন

দিনপিছু কাজ যথাসম্ভব কম রাখা দরকার। 
প্রতিটি কাজের বর্ণনায় যথাসম্ভব কম শব্দ খরচ করা দরকার।
প্ল্যানিং যথাসম্ভব সরল হওয়া দরকার। 
প্ল্যানিং বাবদ সময় সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট হওয়া দরকার। আমি নিজেকে সারা দিনে (সাড়ে আটটা থেকে ন’টার মধ্যে) ম্যাক্সিমাম দশ মিনিট প্ল্যানিং করতে অ্যালাউ করি। মাসিক এবং ত্রৈমাসিক প্ল্যানিং-এর ক্ষেত্রে সেটা আধঘণ্টায় দাঁড়ায়।

কিছু নিজের বিষয়ে, যেমন,
অনলাইন প্ল্যানিং আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদিও সেটা করতে পারলে আমি খুশিই হতাম। গাছ বাঁচত। অনলাইন প্ল্যানিং-এর লক্ষ লক্ষ রাস্তা আছে। সম্পূর্ণ ফ্রি গুগল ক্যালেন্ডারও যেমন আছে, মহার্ঘ অ্যাপও আছে। আমি বিনামূল্যের অ্যাপগুলো চেখে দেখেছি। এবং সিদ্ধান্তে এসেছি যে এ ব্যাপারে ইকোফ্রেন্ডলি হওয়া আমার এ জীবনে হল না। টাইপ করার থেকে কাগজের ওপর পেন দিয়ে লেখা এখনও আমার চেতনায় বেশি ছাপ ফেলে। আমার নিজের হাতের লেখা, টাইমস রোম্যান কিংবা কোহিনুর বাংলায় ছাপা অক্ষরের থেকে এখনও আমাকে বেশি উদ্বুদ্ধ করে (কিংবা অপরাধবোধে ভোগায়)। 

কিন্তু যেটা সবথেকে বেশি জেনেছি, সেটা হচ্ছে যে আগের প্ল্যানিংগুলো সব জলে যাওয়ার পেছনে আমার ইচ্ছেশক্তির অভাবই শুধু দায়ী নয়। আমার স্ট্র্যাটেজির ভুলও দায়ী। আমি এতদিন প্ল্যান করছিলাম দৈনিক ভিত্তিতে, যেটা খুব কাজের কথা নয়। যেটা কাজের সেটা হল নিজেকে একটা দীর্ঘকালীন লক্ষ্য দেওয়া, (আমার দৌড় আপাতত বার্ষিকী, সড়গড় হয়ে গেলে পঞ্চবার্ষিকী ট্রাই করে দেখব ভাবছি), তারপর সেটাকে ছোট ছোট টুকরো করে ত্রৈমাসিক, মাসিক, সাপ্তাহিক এবং দৈনিক চেহারা দেওয়া। 

ঘটা করে আমার এই আবিষ্কারটা লিখতে গিয়ে একটু লজ্জাই করছে, মনে হচ্ছে, সকলেই নিশ্চয় এটা জানতেন, কিন্তু আমি সত্যিই জানতাম না। আমি এতদিন বার্ষিক একটা রেজলিউশন নিতাম। তারপর দৈনিক টু ডু লিস্ট চলত। এই দুইয়ের মধ্যে আলাপপরিচয় প্রায় ছিল না বললেই চলে। নভেম্বর মাসে গিয়ে বেরোত, যদিও টু ডু লিস্টে বাড়ি ছয়লাপ, সেগুলোর কোনওটাই আমার বার্ষিক ইচ্ছাপূরণে অবদান রাখেনি। এবং একই ভাবে, যেহেতু দৈনিক টু ডু লিস্টও সে অর্থে কোনও বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে গাঁট বাঁধা ছিল না, সেগুলো রক্ষা করার যথেষ্ট মোটিভেশন আমি জোগাড় করে উঠতে পারিনি।

গত বছর, এবং এ বছর আরও বেশি করে, আমি সে ভুল সংশোধনের চেষ্টায় আছি। বার্ষিক রেজলিউশনের সঙ্গে সংগতি রেখে ত্রৈমাসিক, মাসিক, সাপ্তাহিক এবং আলটিমেটলি দৈনিক প্ল্যানিং করছি। সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ইত্যাদি চেকপোস্টগুলো রাখায় আরও একটা প্রকাণ্ড সুবিধে আছে। বিশেষ করে আমার মতো জন্ম-ফাঁকিবাজের জন্য, ‘আজ থাক, কাল করব” যার চরিত্রের ট্যাগলাইন। এ ধরণের প্ল্যানিং আমাকে একটা কাজ আজ না করে কাল করার প্রচ্ছন্ন অনুমতি দিয়ে রেখেছে (বা এ সপ্তাহে না হলে পরের সপ্তাহে)। 



আপাতত আমি ব্যবহার করছি এই প্ল্যানারটি। আগেরটার থেকে সস্তা এবং আমার মতে বেটার দেখতে। তাছাড়া এতে বার্ষিক, মাসিক, সাপ্তাহিক এবং দৈনিক প্ল্যানিং-এর  খোপ কাটা আছে। ইনিও পারফেক্ট নন। বার্ষিক এবং মাসিক প্ল্যানিং-এর খোপগুলো আমার মনোমতো নয়। তাছাড়া ত্রৈমাসিক প্ল্যানিং-এর ব্যবস্থাও নেই। কিন্তু গত একবছরের প্ল্যানিং থেকে আমি আরও একটা জিনিস বুঝেছি, একেবারে নিজের প্রয়োজনমতো প্ল্যানার বানাতে গেলে ডি আই ওয়াই প্ল্যানার বানানো ছাড়া গতি নেই। তার জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য বা ইচ্ছে কোনওটাই আমার নেই। কাজেই এই মন্দের ভালো দিয়েই কাজ চালাতে হবে।  

এই রকম প্ল্যানিং-এর একটা অসুবিধেও আছে। সকলের জীবনেই কিছু কিছু কাজ থাকে যেগুলো কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্যপূরণের জন্য নয়। শুধু ভালো থাকার জন্য। যেমন, গান গাওয়া। বা রোজ আধঘণ্টা খোলা আকাশের তলায় কাটানো। এই রকম লক্ষ্যভিত্তিক প্ল্যানিং-এ এই সব লক্ষ্যহীন কাজ গোঁজা মুশকিল। আমার মতে উচিতও নয়। তাহলে প্ল্যানিং অকারণ জবরজং হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এই কাজগুলো রোজ করলাম কি না সেটা পরীক্ষা করার অন্য ব্যবস্থা আছে। পরে কোনওদিন সময় হলে বলব। 

*****

এত কথা বলার পরও দুটো কথা থাকে। এক, আমি প্ল্যান না করে যদি আমি জীবন চালাতে পারতাম, তাহলে আমার থেকে খুশি কেউ হত না। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে আমার দ্বারা যা যা সম্ভব না, সে সব করার (এবং পাওয়ার) বাসনা আমাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে। ওটাই আমার টাইপ। সেটা যত তাড়াতাড়ি মেনে নেব এবং সে অনুযায়ী অ্যাকশন নেব ততই মঙ্গল।

দুই, এত প্ল্যান করে কী লাভ হচ্ছে? এখন কি আমি যা যা প্ল্যান করি সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করি? পাগল? কারণ আমি আমিই। স্বপ্ন দেখা এবং সে স্বপ্নপূরণে শ্রম না দেওয়া আমার জন্মগত অধিকার। কিন্তু এতদিন প্ল্যানিং-এর ফাঁদে ঠেকে আরও একটা জিনিস আমি বুঝেছি। যা যা করব ভেবেছিলাম তার অর্ধেকও যদি করতে পারি তাহলেই আমি সফল। আর যদি কোনও মন্ত্রবলে সে তালিকার দুই-তৃতীয়াংশ করে উঠতে পারি তবে তা সিরিয়াস সেলিব্রেশন দাবি করে। 

*****

আপনারা কি প্ল্যানিং পছন্দ করেন? নাকি ফ্রি-স্টাইলই আপনার স্টাইল?




February 19, 2017

Shopping



People swarmed through the boutiques and gourmet shops. Organ music rose from the great court. We smelled chocolate, popcorn, cologne; we smelled rugs and furs, hanging salamis and deathly vinyl. My family gloried in the event. I was one of them, shopping, at last. They gave me advice, badgered clerks on my behalf. I kept seeing myself unexpectedly in some reflecting surface. We moved from store to store, rejecting not only items in certain departments, not only entire departments but whole stores, mammoth corporations that did not strike our fancy for one reason or another. There was always another store, three floors, eight floors, basement full of cheese graters and paring knives. I shopped with reckless abandon. I shopped for immediate needs and distant contingencies. I shopped for its own sake, looking and touching, inspecting merchandise I had no intention of buying, then buying it. I sent clerks into their fabric books and pattern books to search for elusive designs. I began to grow in value and self-regard. I filled myself out, found new aspects of myself, located a person I'd forgotten existed. Brightness settled around me. We crossed from furniture to men's wear, walking through cosmetics. Our images appeared on mirrored columns, in glassware and chrome, on TV monitors in security rooms. I traded money for goods. The more money I spent, the less important it seemed. I was bigger than these sums. These sums poured off my skin like so much rain. These sums in fact came back to me in the form of existential credit. I felt expansive, inclined to be sweepingly generous, and told the kids to pick out their Christmas gifts here and now. I gestured in what I felt was an expansive manner. I could tell they were impressed. They fanned out across the area, each of them suddenly inclined to be private, shadowy, even secretive. Periodically one of them would return to register the name of an item with Babette, careful not to let the others know what it was. I myself was not to be bothered with tedious details. I was the benefactor, the one who dispenses gifts, bonuses, bribes, baksheesh. The children knew it was the nature of such things that I could not be expected to engage in technical discussions about the gifts themselves. We ate another meal. A band played live Muzak. Voices rose ten stories from the gardens and promenades, a roar that echoed and swirled through the vast gallery, mixing with noises from the tiers, with shuffling feet and chiming bells, the hum of escalators, the sound of people eating, the human buzz of some vivid and happy transaction.
                                                                                 
                                                                                            ---Don Delillo, White Noise


February 18, 2017

রুস্তম'স ক্যাফে অ্যান্ড বেকারি, খিড়কি গাঁও



সাকেতের শপিং মলত্রয়ের উল্টোদিকে খিড়কি এক্সটেনশন, তার অগোছালো, ধুলোমাখা গলির ভেতর 'খোঁজ ইন্টারন্যাশনাল আর্টিস্টস’ অ্যাসোসিয়েশন'-এর ধপধপে সাদা শৈল্পিক বাড়ির দেড়তলায় রুস্তম’স ক্যাফে অ্যান্ড বেকারি। পারসি ক্যাফের মেনুতে মাসকা পাও, বাটাটা পোহা, ভিন্দালুর দাপট। শিল্পীদের চা খাওয়ার জায়গা বলে কথা। দেওয়ালে ভিন্টেজ কাপপ্লেট, ঝাপসা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবির গ্যালারি ওয়াল। লেসের পর্দা চুঁইয়ে আসা আলো চারদিকের সাদা দেওয়ালে ঠিকরে অপূর্ব মায়া। গোল হাতল ওয়ালা কাঠের আরামকেদারার উত্তল হাতল, ফ্রিল দেওয়া কুশন। দেখলেই শখ হয় আহা আমার বাড়িতে যদি একটা থাকত। কাউন্টারের ওপর রাখা কুরুশের জামা পড়া প্রকাণ্ড কাচের বয়ামে মেলোডি চকোলেটি আর কিসমি টফির ভাণ্ডার। দেখলেই লোভ হয়, আহা আমার পড়ার টেবিলে যদি এ রকম থাকত।  

রুস্তম’স-এ এই নিয়ে আমাদের দ্বিতীয়বার। প্রথমবার খেয়েছিলাম কান্দা বাটাটা পোহা পাও দিয়ে মাটন ভিন্দালু। আর রুস্তম’স-এর বিখ্যাত উইন্টার রেমেডি অর্থাৎ মধু, লেবু, আদা দিয়ে চা। আর শেষে চকোলেট কেক। সে সবের ছবি নেই। এবারের আছে। এবারে আমরা খেলাম পারসি চা। লেমনগ্রাস আর পুদিনা দিয়ে ফোটানো পারসি চায়ের সঙ্গে গারলিক ফ্রাইস-এর টা। আলুভাজায় রসুন দিলে এমন স্বর্গীয় হয় কে জানত। আমরা এবার থেকে বাড়িতে আলু ভাজলেই রসুন দিচ্ছি, নির্ঘাত। 

চিকেন কাটলেট, পাও। 

বড়া পাও। 


রুস্তম'সে চেহারার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে রুস্তম'সের রন্ধনশিল্পীদের হাতের কাজ। 

গোটা ব্যাপারটার সেরা হচ্ছে লোকেশন। সাকেত মলে কাজে অকাজে যেতেই হয়, আর গেলে কিছু না খেয়ে ফিরতে মন চায় না। আর খেতে গেলেই হয় ফুড কোর্টের ভিড় চিৎকার গুঁতোগুঁতি, নয় দামি দোকানের ফিসফিসে ক্যান্ডললাইটের ডিনারের শেষে বাহারি এবং উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে বিলের আগমন এবং আমাদের গলা কেটে প্রস্থান। এই দুইয়ের থেকেই সেরা, তৃতীয় বিকল্প, রুস্তম। মলের কাজ সেরে রাস্তা পেরিয়ে এপারে চলে আসুন, রুস্তম’স-এ বসুন, খান, চা খান, কথা বলুন কিংবা চুপ করে থাকুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন কিংবা মগজের সুইচ নিভিয়ে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকুন লেসের পর্দার ওপারে আলোর দিকে। যাই করুন, আরাম গ্যারান্টিড।

















February 15, 2017

খালি বাড়ি



মূল গল্পঃ House of Spirits
লেখকঃ Lucy Wood

*****

শেষের জন না বলেকয়েই চলে গেল।

যতরকমের যাওয়া হয়, তার মধ্যে এই রকম যাওয়াটা আমাদের সবথেকে বেশি অপছন্দের। কিছু না বলে চলে যাওয়া। চলে যাওয়ার পর যে শূন্যতা, যে নৈঃশব্দ্য তৈরি হবে তার জন্য প্রস্তুত হওয়ার কোনও সুযোগ না দিয়ে চলে যাওয়া। যদিও বাড়ি কখনও শূন্য হয় না। নীরবও নয়। কলের মুখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তেই থাকে। টুপ টুপ টুপ। দেওয়ালে ফোটোর পেছনে টিকটিকি পোকা তাড়া করে খসখস আওয়াজ তোলে। আর ধুলো। দরজার পাল্লার তলা দিয়ে, জানালার বন্ধ পাল্লার ফাঁক দিয়ে, ঘুলঘুলি দিয়ে সূর্যরশ্মির ব্রিজ পেরিয়ে এসে বাড়ির দখল নেয়। মেঝে, টেবিল, টেবিলের ওপর ফুলদানিতে সাজানো প্লাস্টিক ফুলের পাপড়ি। আমরা দেখেও সে ধুলো পরিষ্কার করি না কেন? কারণ ওটা আমাদের কাজ না। কলের মুখ টিপে বন্ধ করাও না, কিংবা শুকনো ডিমের খোলা বা ময়ুরপেখম সাজানোর টোটকা ব্যবহার করে টিকটিকি তাড়ানোও না।

যাদের কাজ, তাদের শেষের জন না বলেকয়ে চলে গেল। অনেকদিন ধরেই যাবে যাবে করছিল। রাতে পাশের বাড়ির টিভি থেমে গেলে লোকটার শ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যেত। যেন ফুটন্ত লাভা। বিছানার পাশে কাঠের টুলের ওপর রংবেরঙের শিশি জমে উঠছিল। সকালবিকেল সে সব শিশি থেকে ছোটবড় গুলি বার করে জল দিয়ে গেলার সময় গলার ঢিবি উঠত নামত। আমরা পর্দার আড়াল থেকে দেখতাম। এগুলো সবই যাওয়ার আগের চিহ্ন। কিন্তু এই অবস্থাটা এতদিনই চলেছিল যে সত্যিটা ভুলে গিয়েছিলাম আমরা। মনে পড়ল সেদিন, যেদিন লোকটা আর বিছানা ছেড়ে উঠল না।  বুকের ওপর হাত দুটো জড়ো, চোখ বোজা, মুখ হাঁ। হাঁয়ের ভেতর লাল রঙের জিভ। লালটা ক্রমে সাদা হল, তারপর ঘোলাটে, তারপর একটা দুটো করে মাছি, কোথা থেকে এল আমরা দেখিনি, ঘুলঘুলি দিয়ে ধুলোর সঙ্গে নিশ্চয়, হাঁয়ের সামনে ঝাঁক বাঁধল। বিনবিনবিনবিন। পচা মাংসের টক, মিষ্টি, ঝাঁঝালো, দমবন্ধ করা গন্ধটা যখন বেরোলো, তখন সবাই এল লোকটাকে নিয়ে যেতে।  

মালপত্র রইল আরও কিছুদিন। যারা হাঁকডাক করে যায়, তারা মালপত্র সঙ্গে করে নিয়ে যায়। অনেক লোক, বারবার সিঁড়ি বেয়ে ওঠে নামে। খাট, আলমারি, ফ্রিজ, টিভি একে একে সরু সিঁড়ি বেয়ে সাবধানে বার করে। বাড়ি ফাঁকা হয়ে যায়। আবার হয়ও না। দেওয়ালের রং দেখে অনেকদিন পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারি, কোন জিনিসগুলো কোথায় ছিল। এই যে দেওয়ালের  গায়ে কালচে ছোপ, খাটে বসে এখানে মাথা ঠেকাতো কেউ। এই যে এখানে গাঢ় গোলাপির মধ্যে ফ্যাকাসে গোলাপি চৌকো, এখানে একটা বাঁধানো ছবি ছিল। কার ছবি? মনে নেই। মনে রাখা আমাদের কাজ নয়। একবার সবাই সব কিছু নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়ার পর ঘরের কোণে ঝুল, মাকড়সার ভাঙা জাল আর চুলের গোল্লার মধ্যে থেকে চকচকে একটা ফুল পেয়েছিলাম আমরা। ফুলটার মাঝখানে একটা লাল পাথর, চারদিকে সোনালি পাপড়ি। এই ফুলটা খুঁজতে সারাবাড়ির জামাকাপড় ঝেড়ে, ফার্নিচার উল্টে, তুলকালাম হয়েছিল। আমরা ফুলটা হাতে নিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। নিচে গাড়ি তখনও ছেড়ে যায়নি। ছাদে মালপত্রের ওপর উল্টোনো চেয়ার দড়ি দিয়ে বাঁধা। এই ফুলটা খুঁজতে যে সবথেকে বেশি উতলা হয়েছিল, চোখের জল পর্যন্ত ফেলেছিল, তার একহাতে ফুলের টব। অন্য হাত দিয়ে সে গাড়ির ছাদে বাঁধা দড়িটা টেনে দেখছে। আমরা জানালার পাশে লালসোনালি ফুলটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। যদি একবার মাথা তুলে শেষবারের মতো জানালার দিকে তাকায়, তাহলেই যাতে দেখতে পায়। তাকাল না। এই জানালার পাশে কত সন্ধ্যেবেলা ও দাঁড়িয়ে থেকেছে, যাওয়ার আগে একবারও ফিরে তাকাল না। আমরা ডাকলাম না। পিছু ডাকা আমাদের কাজ নয়। 

লোক আসে লোক যায়।  বেশিরভাগই জোড়ায় জোড়ায়। কখনও কখনও একটা কি দুটো বাচ্চা। বাচ্চারা দৌড়ে এঘর ওঘর করে, দুপদাপ আওয়াজ করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করে। কেউ কেউ দুপুরবেলা সবাই ঘুমোলে চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে এসে সময় কাটায়। চিলেকোঠার ঘর আমাদেরও পছন্দের। যে যা ফেলে যায়, আর যেগুলো কেউ চায় না, সব একে একে চিলেকোঠায় জড়ো হয়। রং চটা দোল খাওয়া চেয়ার, তালাবন্ধ বাক্স যার ভেতর কী আছে কেউ জানে না, আমরাও না, ভাঙা ক্রিকেট খেলার ব্যাট, ছেঁড়া পালকের ব্যাডমিন্টন কর্ক। 

রোজ যে সব জিনিস ব্যবহার হয়, ঝাড়ামোছা হয়, যে সব জিনিসের কথা রোজ না হলেও, সপ্তাহে অন্তত একবার কেউ মনে করে, তাদের গায়েও এমন ছায়া জমে না যেমন জমে এই চিলেকোঠার ভুলে যাওয়া জিনিসগুলোর কোণে কোণে। ঠাণ্ডা, দীর্ঘ, মায়াময় ছায়া। আমরা এ ছায়া খুব ভালোবাসি। বাড়িতে যখন অচেনা লোকের ভিড় বেশি হয়ে যায়, আমরা চিলেকোঠার ছায়ায় এসে বসি। অপেক্ষা করি বাড়ি আবার ফাঁকা হওয়ার। আবার সব কিছু আগের মতো হয়ে যাওয়ার। 

একবার একটা বাচ্চা তার সঙ্গের বড়কে বলল, আমাকে একটা বেড়াল এনে দেবে বলেছিলে যে? 

আমরা এমনিতে ভয় পাই না, সেদিন পেয়েছিলাম।  বেড়ালরা হঠাৎ হঠাৎ চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে এমন সোজা চোখে চোখ ফেলে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে আমাদের। পিঠ বেঁকে যায়, লোম খাড়া,  থাবার নখগুলো ঝকঝক করে। গলা দিয়ে মৃদু কিন্তু ভয়ংকর গরগর। আমরা দেওয়ালে সেঁটে, স্থির হয়ে থাকি। চোখ নামিয়ে রাখি মেঝের দিকে, যতক্ষণ না পিঠ সোজা হয়, গর্জন শান্ত হয়ে আসে।

বেড়াল আমাদের ভালো লাগে না।

আমাদের বেশিরভাগ মানুষকেও ভালো লাগে না। কাউকে কাউকে লাগে। এক জোড়া ছিল, কবে এসেছিল, কাদের পরে কিংবা কাদের আগে এ সব আমাদের মনে নেই, কারণ মনে রাখা আমাদের কাজ না। শুধু মনে আছে তাদের একজন সারাদিন শুয়ে থাকত, খাটের পাশে সেই অন্য লোকটার মতোই বিছানার পাশে লাল নীল শিশিবোতল, চকচকে স্ট্রিপ। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম সেই লোকটাই, কারণ আমরা মুখ চেনায় ভালো নই, তারপর ভুল ভাঙল। কারণ ওই লোকটা একা আর এর সঙ্গে আরেকজন থাকে। সেও খুব ধীরে ধীরে হাঁটে, সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় প্রতিটি ধাপে দুটো পা রাখে। এক হাত রেলিং-এ, অন্য হাতে একটা লাঠি। আমরা লাঠির পাশে পাশে চলি, হঠাৎ যদি পা ফসকায়, আমরা ধরতে পারব না, ধরা আমাদের কাজ নয়, তবু। বেশিরভাগ সময়েই এই লোকটা অন্য শুয়ে থাকা লোকটার খাটের পাশে বসে থাকে। বোতল থেকে লাল নীল জল চামচে ঢেলে অন্য লোকটার মুখে এগিয়ে দেয়। এর হাত কাঁপে, ওর ঠোঁট কাঁপে, খানিকটা জল চলকে মাটিতে পড়ে যায়। আমরা নিচু হয়ে মুছে দিতে চাই, জল ছুঁয়ে আমাদের আঙুল বেরিয়ে আসে, খটখটে শুকনো। কাজে লাগতে না পেরে আমাদের মন খারাপ হয়। আমরা সরে এসে জানালার ধারে গ্রিলের ধারে বসি। লাল রঙের পাথরগাঁথা পথ চলে গেছে বাগান চিরে মেনগেটের দিকে। এক, দুই, তিন, পাঁচ, দশ, তেরো, সতেরো। একতলা থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির ধাপও সতেরো। ছাদের রেলিং-এ কলসি, একশো বাইশ। 

ওরা কখন গেল মনে নেই, এরা কখন এল ভুলে গেছি। খালি মনে আছে দরজাটা আওয়াজ করে খুলে গেল, চৌকো রোদ্দুর ক্রমশ লম্বা হয়ে গা এলিয়ে শুলো সাদা মার্বেলের মেঝেতে। আমরা যে যেখানে ছিলাম, ফিরে গেলাম পর্দার আড়ালে, দেওয়ালের গায়ের অদৃশ্য ফাটলে, জানালার পাল্লার কোটরে, সিঁড়ির তলায়। 

ওরা জানালার কাছে দাঁড়ালো, সিঁড়ির রেলিং-এ হাত দিয়ে মুখভঙ্গি করে হাত সরিয়ে নিল। ইস, কী ধুলো। যেন আমাদের দোষ। কেন আমরা বাড়ির যত্ন নিইনি। ধুলো ঝেড়ে সাফসুতরো করে রাখিনি। কী করে বোঝাবো, ওটা আমাদের কাজ না।  ওরা সারা বাড়ি ঘুরে দেখল, এ ঘর থেকে ও ঘর।

এটা বেডরুম। ভালো হবে না? 

আমরা উদ্বিগ্ন হলাম। কিন্তু এটা তো বেডরুম নয়। বেডরুম তো পাশেরটা। যেখানে দেওয়ালের গায়ে এখনও খাটের দাগ আছে। ওই ঘরেই তো বিনবিনবিন করে মাছিরা ঘুরল। খাটের ওপর শুয়ে থেকে থেকে লোকটা চলে গেল। কিছু না বলে। আগের লোকটা? নাকি তারও আগের? ওরা ওই ঘরেই ওদের বিছানা পাতল। আমরা কিছু বললাম না, কাউকে বারণ করা আমাদের কাজ নয়। খাট নেই, খালি একটা তোশক। বসার ঘরে সোফা নেই, খালি একটা চেয়ার। রান্নাঘরে উনুন নেই, খালি একটা ইলেকট্রিক কেটলি। গোটা বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। সেই শূন্যতা জুড়ে দু’জন নেচে বেড়ায়। খেলতে খেলতে একে অপরকে ধাওয়া করে, ইচ্ছে করে ধরা দেয়, হা হা হাসে। ওই সুতো ছেঁড়া তোশকের ওপর জানুয়ারির শীতেএকে অপরকে জাপটে ঘুমিয়ে থাকে। একজন চুপ করে থাকলে অন্যজন জানতে চায়, কী ভাবছ? কোনও কোনও দিন সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, দুজনে শুয়ে থাকে বই মুখে নিয়ে, তোশকের পাশে মেঝেতে এঁটো কাপের মিছিল। সিলিং-এর কোণে ঝুল, শীতকালে পাখার ব্লেডে ধুলো, বারান্দায় ঝাঁট পড়ে না রোজ। আমরা বিরক্ত হই। এদের একে অপরের প্রতি যত নজর, তার এককণা যদি বাড়ির প্রতি থাকত। আমরা একে অপরের থেকে ওদের দৃষ্টি সরাতে চেষ্টা করি। একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে বই পড়ে যখন, আমরা গিয়ে বাথরুমের কল খুলে দিই, ওরা একে অপরকে ধাক্কায়, যাও তুমি গিয়ে কল বন্ধ করে এস। হেলমেট পরা কাঁধে লালনীল প্রকাণ্ড খাবারের ব্যাগ কাঁধে নেওয়া ছেলে বাইক থেকে নামে, আমরা জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে টাকার ব্যাগ সরিয়ে ফেলি, ঘন ঘন বেল বাজে, এরা দৌড়োদৌড়ি করতে থাকে,  ব্যাগটা কোথায় রাখলে? আমি কী জানি, তুমি রেখেছ। পাঁচ মিনিট পর ডেলিভারিম্যান টাকা নিয়ে বিরক্তি দেখিয়ে চলে যায়। এরা দরজা বন্ধ করার আগে তার গমনপথের উদ্দেশ্যে মুখ ভেংচে একে অপরকে চুমু খায়। তারপর খেতে বসে।

আমরা অপেক্ষায় থাকি, কবে দিন বদলাবে। দিন বদলায়। খাট আসে, আলমারি, টেবিল, বাহারি আলো, বাড়ি ধীরে ধীরে ভরে ওঠে। এখন আর ছোটাছুটি করার মতো জায়গা নেই, হাসি প্রতিধ্বনিত হওয়ার মতো শূন্যতা নেই। আমাদের স্বস্তি হয়। বাড়ির সঙ্গে সঙ্গে লোকগুলোরও ওজন বাড়ে। কেউ আর অকারণে হাসে না, অকারণে কথা বলে না। সিঁড়ি দিয়ে কেউ দৌড়ে নামে না। কেউ যখনতখন জিজ্ঞাসা করে ওঠে না, কী ভাবছ? এখন সকলেই ভাবছে বেশি, বলছে কম। সত্যি বলতে কি, কথা এত কমে গেছে যে আমাদের চিন্তা হয়, এরাও কি না বলে চলে গেল? মাঝরাতে দরজা ঠেলে ঘরে উঁকি মারি, না, আছে। দামি খাটে দুজন দুদিকে ফিরে শুয়ে আছে। হাতে ধরা যন্ত্র থেকে সাদা আলো এসে পড়েছে দুজনের চোখে। নির্ঘুম, নিষ্প্রাণ চোখ। যার যার নিজস্ব যন্ত্র। নিজস্ব জগৎ। 

আমরা খুশি হয়ে ফিরে যাই চিলেকোঠার ছায়ায়। রং চটা চেয়ারে বসে দোল খাই, জানালা দিয়ে বাগানের পাথর গুনি। এমন সময় আমাদের শান্তিভঙ্গ করে বাড়িতে খনখন করে কারা হেসে ওঠে। দৌড়ে যাই। দুজন, ঘরের মাঝখানে একে অপরকে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। হাসিতে শরীর ভেঙে পড়ছে দুজনের, একজন তার মধ্যেও সামলাতে চেষ্টা করছে, অন্যজনের মুখ চেপে ধরে বলছে, অ্যাই আস্তে, লোকে শুনতে পাবে। 

পেলে? ভয় পাও নাকি?

লোককে ভয় পাই না। ঝামেলাকে পাই। 

রাতে কিন্তু বাড়িটা আবার চুপচাপ হয়ে যায়। আবার দু’জন পাশাপাশি  শুয়ে থাকে একে অপরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে। এর পর ক’দিন ধরে কে যে আসে, কে যে যায়, কে যে হাসে, কে যে পাথরের মতো মুখে খাবার ফেলে টেবিল ছেড়ে উঠে যায়, সব গুলিয়ে যায় আমাদের। একদিন ঘরের মেঝেতে একটা চুলের কাঁটা খুঁজে পেয়ে আমরা সেটা ড্রেসিংটেবিলের ওপর তুলে রাখি। 

রাতে একজন বাড়ি ফিরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুল খুলতে শুরু করে, কাঁটাটার দিকে চোখ পড়তে বিনুনিতে জড়ানো তার আঙুল থেমে যায়। কয়েকমুহূর্ত স্থির হয়ে থেকে তার দু’চোখ বেয়ে জল নামে। কেন, আমরা জানি না। 

চিলেকোঠাতেও কি সেইই এসেছিল? কে জানে। দেওয়ালে ঠেস দেওয়া, ধুলোপড়া মলিন সবুজ ঢাকনার ভেতর একটা যন্ত্র রাখা ছিল, এই এনে রেখেছিল বোধহয়, আমরা খেয়ালই করিনি। পালিশ করা কাঠের লম্বা গলায় বাঁধা তারে আঙুল ছোঁয়াতেই সুর। বিষাদে মাখামাখি। কান্নার ঢেউ চিলেকোঠা উপচে ভাসিয়ে নিয়ে গেল গোটা বাড়ি ।

বাড়িটা আবার ফাঁকা হয়ে গেছে। আবার দেওয়ালের খাপছাড়া রং বেরিয়ে পড়েছে, আবার দেওয়ালে চৌকো অদৃশ্য ফোটো, আবার শোওয়ার ঘরের খাটের আড়ালে চুল আর ঝুলের বল। তবে লাল পাথর বসানো সোনালি ফুল নেই। আমরা খুঁজে দেখেছি। যদিও খোঁজা আমাদের কাজ নয়। জানালার পাশের বুনো জবা গাছে ফুল ধরা আর ঝরে পড়া চলছে যেমন চলত। অ্যাসবেসটসের ঢেউ চুঁয়ে টুপটাপ বৃষ্টির জল পড়ে চিলেকোঠার দেওয়ালে জলছাপ পড়াও থামেনি। বাগানে পোঁতা লাল পাথরের সংখ্যা এখনও সতেরো, ছাদের রেলিং-এ কলসির সংখ্যা এখনও একশো বাইশ। আশেপাশের বাড়ি ভাঙছে, খট খট, ধুম ধাম, ঠং ঠং। এ বাড়িটাও ভেঙে যাবে নাকি কোনওদিন? আমরা কোথায় যাব তখন? ভাবি না আমরা। ভাবা আমাদের কাজ নয়। মাঝে মাঝে একেকদিন সারাদিন জুড়ে একটা মিষ্টি, গম্ভীর, বিষণ্ণ সুর বাজে কোথাও, বিশেষ করে চিলেকোঠায়। আমরা দোলনা চেয়ারটায় দুলতে দুলতে চোখ বুজে শুনি। শুনি আর অপেক্ষা করি , কবে আবার বিছানা পাতবে কেউ, সিঁড়ি বেয়ে উঠবে নামবে, হাহা করে হাসবে, বেসিনের কল খুলে কান্নার শব্দ ঢাকবে। কবে আবার শেলফে জমবে রোগা মোটা বই, টুলের ওপর লালনীল বোতল। অপেক্ষায় থাকি, কবে আবার কেউ দরজা খুলে ঢুকবে। অপেক্ষায় থাকাই আমাদের কাজ।


February 13, 2017

Fascinated by Disasters



I said to him, "Why is it, Alfonse, that decent, well-meaning and responsible people find themselves intrigued by catastrophe when they see it on television?" 

I told him about the recent evening of lava, mud and raging water that the children and I had found so entertaining. 

We wanted more, more. 

"It's natural, it's normal," he said, with a reassuring nod. "It happens to everybody." 

"Why?" 

"Because we're suffering from brain fade. We need an occasional catastrophe to break up the incessant bombardment of information." 

"It's obvious," Lasher said. A slight man with a taut face and slicked-back hair. 

"The flow is constant," Alfonse said. "Words, pictures, numbers, facts, graphics, statistics, specks, waves, particles, motes. Only a catastrophe gets our attention. We want them, we need them, we depend on them. As long as they happen somewhere else. This is where California comes in. Mud slides, brush fires, coastal erosion, earthquakes, mass killings, et cetera. We can relax and enjoy these disasters because in our hearts we feel that California deserves whatever it gets. Californians invented the concept of life-style. This alone warrants their doom." 

Cotsakis crushed a can of Diet Pepsi and threw it at a garbage pail. 

"Japan is pretty good for disaster footage," Alfonse said. "India remains largely untapped. They have tremendous potential with their famines, monsoons, religious strife, train wrecks, boat sinkings, et cetera. But their disasters tend to go unrecorded. Three lines in the newspaper. No film footage, no satellite hookup. This is why California is so important. We not only enjoy seeing them punished for their relaxed life-style and progressive social ideas but we know we're not missing anything. The cameras are right there. They're standing by. Nothing terrible escapes their scrutiny." 

"You're saying it's more or less universal, to be fascinated by TV disasters." 

"For most people there are only two places in the world. Where they live and their TV set. If a thing happens on television, we have every right to find it fascinating, whatever it is."

                                                                       ---Don Delillo, White Noise

February 10, 2017

সময় চাই, সময়?



আজ আমার ছুটি। দারুণ ভালো লাগছে। পড়ে পাওয়া ছুটি বলে আরও বেশি ভালো লাগছে। আর যখন মনে পড়ছে, এই ছুটির বিকল্প ছিল সবাই মিলে বাসে চেপে গিয়ে মহার্ঘ ফার্মের অ্যাসর্টমেন্ট অফ স্টাফড পরাঠা’র ব্রেকফাস্ট খেয়ে বুলক কার্ট রাইড অ্যান্ড আদার ফান অ্যাকটিভিটিস-এ সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যেবেলা রিসর্টের বারান্দায় নিজের নিজের সংস্কৃতিচর্চা (শায়েরি, গজল) ফলিয়ে ফেরৎ আসা, তখন ডিগবাজি খেতে ইচ্ছে করছে। 

স্টাফড পরাঠার বদলে এখন আমার কপালে ছোটবেলার স্টিলের ফুলকাটা বাটিতে দুধখই। যেন মরুভূমির ফুটন্ত বালিতে ফেলে কাঁটাওয়ালা চাবুকের মারের বদলে নন্দনকাননে পারিজাতের ছায়ায় নিদ্রাযোগ। আবার গানও শুনছি। গানটা এই মুহূর্তের পক্ষে খুবই অ্যাপ্রোপ্রিয়েট, কারণ আমারও অনেক কিছু করার আছে।  মাথার মধ্যে গুছিয়ে নিচ্ছি সামনের তিনদিন (ওয়েল, পনে তিন দিন) টু ডু লিস্ট। পেপারটা শেষ করব, তিনটে উপন্যাস পড়ব আর একটা লিখবও, আর গোটা বাড়ি এমন পরিষ্কার করে ফেলব যে বাবায়াগা এসে নোড়া পিটিয়েও এককণা ধুলো বার করতে পারবে না।

রবিবার সন্ধ্যেবেলা হিসেব কী দাঁড়াবে সেটা আপনি জানেন, আমিও জানি। কিন্তু সেই জানাকে এই মুহূর্তের ফিলিংটাকে মাটি করতে আমি অ্যালাউ করছি না কিছুতেই। এই যে “এখনও অনেক টাইম আছে”র ফিলিংটা। ষড়ৈশ্বর্যের মালিকানার থেকে কোনও অংশে কম নয় এই ফিলিং। এই মুহূর্তে আমার হাতে অনেক, অগাধ সময়। আপনাদের কারও কম পড়লে, আমার থেকে নিতে পারেন।


February 08, 2017

রেখেছ বাঙালি করে



ইন্টারনেটে দ্য ব্রিটিশ ট্যাগ বলে একটা ট্যাগ আছে। আমার এ মুহূর্তে মাথা মরুভূমি, তাই ওদের টুকে 'বাঙালি' ট্যাগ বানিয়ে অবান্তরে ছাপলাম।

*****

১। দিনে ক’কাপ চাঃ  সাত থেকে আট।

২। চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য ফেভারিট টাঃ মারি বিস্কুট। অবশ্যই ব্রিটানিয়ার। 

৩। চিরঞ্জিৎ না প্রসেনজিৎঃ চিরঞ্জিৎ

৪। ঘটি না বাঙালঃ বাঙাল

৫। প্রিয় বাঙালিঃ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

৬। পশ্চিমবঙ্গের প্রিয় বেড়ানোর জায়গাঃ যা দেখেছি তার মধ্যে বিষ্ণুপুর আর মুর্শিদাবাদ দারুণ লেগেছিল। 

৭। প্রিয় বাঙালি গুণঃ আত্মবিশ্বাসের অভাব। যদিও এটা দিনে দিনে দুর্লভ হয়ে উঠছে।

৮। প্রিয় বাঙালি দোষঃ পরনিন্দা পরচর্চা। কারণ আগেও বলেছি, যার নিন্দা করা হচ্ছে তার কোনও ক্ষতি হয় না। যে করে তার মন হালকা হয়। *তবে এ জিনিস করার সময় আমি কিছু সতর্কতা অবলম্বন করি। সাধারণত এমন কারও সঙ্গে না করার চেষ্টা করি, যে অন্যের নিন্দে আমার কাছে করে। কারণ, হান্ড্রেড পার সেন্ট সে আমার নিন্দে অন্যের কাছে করবে। খুব সম্ভবত, যার নিন্দে আমার সঙ্গে করছে, তারই কাছে। দ্বিতীয়ত, চেনা কারও চর্চা করার সময় বিশ্বস্তজনের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান করার চেষ্টা করি। গণ পি এন পি সি-র জন্য সেলিব্রিটিরা আছেন।

৯। বাঙালির কোন গুণটা আমার নেইঃ তর্কপ্রিয়তা

১০। বাঙালির কোন দোষটা আমার ষোলো আনা আছেঃ আলস্য

১১। সকালের লুচি না দুপুরের মাংসঃ সকালের লুচি। বেগুনভাজা আর সুজি দিয়ে। 

১২। বাঙালি বিশ্বসেরাঃ মিষ্টিতে। আর নিরামিষ শুক্তো, চচ্চড়িতেও। 

১৩। প্রিয় বাঙালি মিষ্টিঃ টাটকা, গরম রসগোল্লা।

১৪। কোন বাংলা শব্দের প্রতিশব্দ আর কোনও ভাষায় নেই (আমি পাইনি): তরশু  ধেই ধেই (সৌজন্যে দেবাশিস)


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.