November 18, 2017

কয়েকটা লিংক





“For me there are only two kinds of women: goddesses and doormats.”
                                                                         —Pablo Picasso  (উৎস)
    

আজকের জেওপার্ডি কুইজঃ জর্জ অরওয়েলের মতে হোয়াট ইজ the lunatic modern habit of identifying oneself with large power units and seeing everything in terms of competitive prestige.” ?

"It introduces Miss Marple who I love much more than the irritating Poirot because her reasoning is always rooted in human nature." এতে কাজ দিত, কিন্তু আরও আছে। "Christie doesn’t often get credit for the sly humour that runs through much of her work," আমি ভ্যাল ম্যাকডারমিডের কোনও বই পড়িনি, এবার পড়ে দেখতে হবে।

আমার ফেভারিট প্ল্যান? প্ল্যান ক্যানসেল করা। 




পি এইচ ডি করে কী হবে যদি কেউ বলে তাদের জবাব দেওয়া যেতে পারে, একশো বছর আগের কোনও খুনের কিনারা তো হতেই পারে।

আমি এদের বলা কোনও রকম রিডার টাইপেই পড়ি না। আপনি পড়েন কিনা দেখুন তো।


November 13, 2017

হ্যাপি বার্থডে, রোহিত!




রোহিতের বয়স পাঁচ হল। রোহিত আন্টিজির নাতি। জন্মদিনে রোহিত নতুন জামা পরে চকোলেটের প্যাকেট নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল। রোহিতের সব বন্ধুরা চকোলেট পেয়েছে। আমিও বাদ পড়িনি।

November 12, 2017

কচুরি জিলিপি কুলফি চাট বান্টা



রোশনারা বাগ থেকে উবারে আধঘণ্টা মতো গেলেই এদিকে চাওরি বাজার আর ওদিকে চাঁদনি চক মেট্রো ষ্টেশন। এই দুই মেট্রো স্টেশনের আশেপাশের চত্বরটাই হচ্ছে, বড়লোক দেশের টুরিস্টদের মতে ‘রিয়েল’ দিল্লি বা ‘রিয়েল’ ইন্ডিয়া।

এই জায়গাটা ‘রিয়েল’ ফুডিদের মক্কাও বটে। ইতিহাসচর্চা শেষ হতে হতে আমাদের ক্ষিদে পেয়ে যাবে জানতাম। ঠিক করেই রেখেছিলাম সে ক্ষিদে এখানে গিয়ে মেটাব। কচুরি, জিলিপি, পরোটা, রাবড়ি যা প্রাণে চায় খাব। 

ব্যাপারটা শুনতে যতটা সোজা মনে হচ্ছে, আসলে অতটা সোজা নয়। সোজা হতে পারত, যদি না কোটি কোটি রিয়েল ফুডি এই চত্বরে গিয়ে নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার করতেন এবং কোটি কোটি টুইট, ফেসবুক স্টেটাস, ব্লগপোস্ট, ইউ টিউব ভিডিও এমনকি বই পর্যন্ত লিখে সে সব আবিষ্কারের কথা চারদিকে ফলাও করতেন।

কারও আবিষ্কারের সঙ্গে কারও আবিষ্কারের মিল নেই। কেউ বলে রামের কুলফি অথেনটিক, কেউ বলে শ্যামের, কেউ বলে যদুরটা না খেলে জীবনের সব কুলফি খাওয়া বৃথা। রিসার্চ করতে করতে মাথা ভোঁ ভোঁ, চোখে সর্ষে ফুল। ক্ষান্ত দিলাম। ঠিক করলাম, যে কোনও একজন এক্সপার্টের কথা মেনে চলব। তিনি ঠিক হোন, ভুল হোন, আমরা বিচার করব না, তাঁর পছন্দই আমাদের পছন্দ, তাঁর রেকোমেন্ডেশনই আমাদের গীতা বাইবেল কোরান।

সে এক্সপার্ট হলেন ইয়ামরাজ। পুরোনো দিল্লির রাস্তার খাবারের গাইড হিসেবে ইয়ামরাজের এই পোস্টটা মহামূল্যবান, আর সবথেকে কাজের হচ্ছে পোস্টের সঙ্গে ফাউ ইয়ামরাজের হাতে আঁকা ম্যাপ। আমাদের অসম্ভব কাজে দিয়েছে। 

ম্যাপ দেখে প্রথমেই যে জিনিসটা পরিষ্কার হল সেটা হচ্ছে ইয়ামরাজের সাজেস্ট করা সব খাবার একবারে খাওয়া যাবে না। একই ট্রিপে কুলচা, কচুরি, কুলপি, রাবড়ি, সোহন হালুয়া খেতে গেলে শিবুর কলকাতা ভ্রমণের পরিণতি হতে পারে। 

আরও বুঝলাম, আমরা খেতে খেতে চাঁদনি চক থেকে চাওরি বাজার মেট্রোর দিকে হাঁটতে পারি, কিংবা চাওরি থেকে চাঁদনির দিকে। আমরা চাট দিয়ে খাওয়া শুরু করব ঠিক করলাম, সেটা করার জন্য চাওরি থেকে হাঁটা শুরু করাই সুবিধেজনক।

চাওরি বাজার মেট্রো স্টেশনের সামনে উবার ভাইসাব নামিয়ে দিলেন, কয়েকপা এগোলেই একটা পাঁচ না ছ’মুখো মোড়, তার এক কর্নারে অশোক চাট কর্নার। একটা চিলতে খুপরি, তার মধ্যে বিভিন্ন পাপড়ি এবং মশলা এবং বরফভাসা দইয়ের ডেকচি। পেটের জায়গা ম্যাক্সিমাইজ করতে আমাদের একটা স্ট্র্যাটেজি ছিল সব এক প্লেট করে খাওয়া। আমরা কলমি বড়া চাট নিলাম, (ইয়ামরাজের দুটো রেকোর মধ্যে একটা), কলমি বড়া, আলুসেদ্ধ, মটরসেদ্ধ, লাল সবুজ চাটনি ইত্যাদি আরও ইউজুয়াল সাসপেক্টস দ্বারা শোভিত হয়ে হাতে চলে এল। কোনওমতে ক্যামেরা ব্যাগে পুরে, আমরা দু’জনে দু’খানা চামচ দিয়ে প্লেটের দু’দিক থেকে চাট তুলে মুখে পুরলাম . . .এবং উল্লাসে ফেটে পড়লাম না।


অশোক চাট কর্নারের চাট ভালো, কিন্তু অভূতপূর্ব কিছু নয়। এরকম চাট আমি আগেও খেয়েছি, পরেও খাব। সত্যি বলতে চাট কত ভালো হওয়াই বা সম্ভব? (উল্টোটাও সত্যি, খুব অখাদ্য চাট আমি আজ পর্যন্ত খাইনি।) আমাদের মনে কেমন একটা আশা তৈরি হয়েছিল যে এই চারপাশের হল্লাহাটি, ওপচানো ভ্যাট, লোম উঠে গিয়ে গোলাপি চামড়া বেরিয়ে যাওয়া খোঁড়া কুকুর, বিকলাঙ্গ ভিখিরি, আর থুতুর টাটকা দলা যা প্রায় ওয়াসিম আক্রমের বলের মতো লাস্ট মিনিটে ঘুরে গিয়ে আমার গায়ের বদলে ফুটপাথে পড়ল, সে সবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খেলে চাটের স্বাদ ম্যাজিকের মতো বেটার হয়ে যাবে।

হল না। 

অভিযানের শুরুতেই কেমন একটা ব্যোমকানো ভাব হল। পরের গন্তব্যের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। সীতারাম বাজারের গলি বেয়ে কয়েক পা গিয়ে ডানদিকে ঢুকে তস্য গলির মধ্যে দিল্লির অন্যতম শ্রেষ্ঠ (কোনও কোনও বিশেষজ্ঞের মতে, অন্যতমটম নয়, স্রেফ শ্রেষ্ঠ) কুলফির দোকান, কুরেমল মোহনলাল কুলফি। চাপা গলির মাথার ওপর ইলেকট্রিকের তারের মাকড়সার জাল, দুপাশে  অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যওয়ালা বাড়ি।

দোকানের সামনে গিয়ে দেখি শাটার বন্ধ।

কার মুখ দেখে উঠেছিলাম বল তো? অর্চিষ্মানকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও করলাম না। 


কুরেমল মোহনলালের উল্টো ফুটে, সামান্য কোণাকুণি,  শ্রী দুলিরাম নরেশ গুপ্তার কুলফির দোকান। 

একটা দোকান কেন বিখ্যাত হয়, আর ঠিক তার দশ হাত দূরের একটা দোকান কেন হয় না? শুধুই কি কুলফির গুণগত তারতম্যের জন্য? নাকি ভাগ্যদেবতার পার্শিয়ালিটিও ম্যাটার করে?

সম্ভবত করে।

আর যদি গুণগত তারতম্য থেকেই থাকে, আমাদের জিভে সে তারতম্য ধরা পড়ার কি কোনও সম্ভাবনা আছে?

বিন্দুমাত্র না।

দুলিরামে ঢুকে পড়লাম। এক প্লেট কেসর পিস্তা কুলফি, চল্লিশ টাকা।


এই মটকা কুলফির বাইরেটা বেশ শক্ত। সাধারণ কাঠের চামচের বদলে তাই বোধহয় শক্ত কাঠের টুকরো দেওয়া হয়, তা দিয়েও ম্যানেজ করা কঠিন। সবথেকে ভালো হচ্ছে হাতে তুলে নিয়ে কামড়ে কামড়ে খাওয়া। ইলেকট্রিক তারের জাল ভেদ করে মিষ্টি রোদ চেয়ারে এসে পড়ছে। আমরা বসে বসে কুলফি খেতে লাগলাম। মোলায়েম, মাপা মিষ্টি। বাদামের সুগন্ধওয়ালা ঘন দুধ প্রাণ জুড়িয়ে দিল। আমাদের নেতানো স্পিরিট চাঙ্গা করে দিল। আছে আছে, আশা আছে! 

মেন গলিতে ফিরে এসে চাঁদনি চক মেট্রোর দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। দু’পাশে সারি সারি দোকান, বেশিরভাগই কাপড়ের। সরু গলির দিয়ে আপ ডাউন দুদিকেই গাড়ি চলার কথা। যদিও এখন একদিকে কেউ চলছে না,  লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন চিৎকার করে খবর নিলেন, ‘আবে, কোই মর গয়া কেয়া?’এমন সময় পেছন থেকে তীরবেগে একটা রিকশা আসতে দেখা গেল। রং সাইডের ফাঁকা অংশটুকু ধরে সাঁ সাঁ এগোচ্ছে। যাত্রী একজন বছর পঁচিশের যুবক, কোলে ল্যাপটপ ব্যাগ, হাত বাড়িয়ে চালককে অভয় দিচ্ছেন, ‘আগে লে লো, আগে লে লো।’ আমরাও পায়ে পায়ে এগোলাম। গলি আরও সরু হয়ে এল, বাজার আরও ঘন হয়ে এল। দোকানের বাইরে চটি আর নাকমুখচোখহীন ম্যানেকুইনের ভিড়, ভেতরে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল টিউব লাইটের নিচে ধপধপে তাকিয়ায় সরু মোটা লম্বা বেঁটে খদ্দের চুমকি জরির পাহাড় ঘিরে বসে আছেন। 

ক্রমে হাঁটা অসম্ভব হয়ে উঠল। পাশাপাশি হাঁটার প্রশ্নই নেই। আমি অর্চিষ্মানের শার্ট ধরে চলতে লাগলাম, এই বাজারে আলাদা হয়ে গেলে আর দেখতে হবে না। এর মধ্যে জ্যামের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি পৌঁছেছি। না, কেউ মরেনি, কোনও এক শাড়ির দোকানে কিছু একটা ফাউ দেওয়া হচ্ছে সম্ভবত। হাজারখানেক লোকের লাইন ফুটপাথ উপচে রাস্তায় এসে পড়েছে। চেনা দুটো মুখ দেখলাম, সেই আগের যুবক যাত্রী এবং রিকশাচালক। এখন তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকা রিকশার লাইন ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করছেন। 


আর এই বর্ণ, শব্দ, গন্ধের বিস্ফোরণের মধ্যে লাইন দিয়ে রিকশায় বসে আছেন সাহেবমেমেরা। কেউ চুপ করে বসে আছেন, কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ রিকশাচালকের হাতে ক্যামেরা তুলে দিয়ে হাসিমুখে পোজ দিচ্ছেন, কেউ ঘাড় তুলে মাথার ওপরের মাকড়সার জালের মতো ইলেকট্রিকের তার দেখছেন, কেউ রিকশার পাশ দিয়ে কনুইয়ে গোঁতা মেরে চলে যাওয়া ষাঁড়ের শিং-এর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। সবারই চোখেমুখে এক অদ্ভুত আলো। রিয়েল ইন্ডিয়া দেখছেন তাঁরা। 

আমরা ডানদিকে বেঁকে গলিতে ঢুকে গেলাম। এই গলির মাপ আগের গলির অর্ধেক, আর দোকান, চটি, মানুষ, খদ্দের, রিকশা, সাহেবমেম আগের গলির চারগুণ। 

এটাই হল পরাঠাওয়ালি গলি। দু’দিকে গরম তেলের কড়াইতে পরোটা ডিপ ফ্রাই হচ্ছে। আমরা পরোটা খাব না, আমরা খাব কচুরি। ইয়ামরাজের ম্যাপ অনুযায়ী আর খানিকটা এগিয়েই জে বি কচুরির দোকান থাকার কথা।

এইসব দোকানগুলোর বেশিরভাগই সম্ভবত একটা বেঞ্চি বা দু’হাত বাই চার হাত খুপরি। চোখ রীতিমতো খোলা না রেখে চললে যে কোনও মুহূর্তে মিস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। দোকানের মাথার বোর্ডে বা দেওয়ালের গায়ে রঙের পোঁচ দিয়ে লেখা নাম পড়তে গিয়ে হাঁটার গতি তিলমাত্র ঢিলে হলে পেছন থেকে হুংকার আসছে, ‘ম্যাডাম, আগে বাঢ়ো!’ অনেকক্ষণ হেঁটে যখন গলি শেষ হওয়ার জোগাড়, আর ধরেই নিয়েছি কচুরির দোকান নির্ঘাত মিস হয়ে গেছে অমনি অর্চিষ্মান চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওই তো!’


দুজনে দুটো হাফ প্লেট কচুরি নিয়ে, কোনওমতে একটা ছবি তুলে, জঞ্জালের নীল ড্রামের গা যথাসম্ভব বাঁচিয়ে, প্রায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে সবজির ঝোলে কচুরি ডুবিয়ে নিয়ে কামড় বসালাম।

এত ভিড়, এত ধমকাধমকি, এত কনুইয়ের গুঁতো সার্থক হল। 

এ ক্লাস খাস্তা কচুরির যা যা শর্ত, ভেতরটা নরম, বাইরেটা মুচমুচে, একটুও তেলতেলে নয়, পর্যাপ্ত এবং সুস্বাদু মশলাদার ডালের পুর, সব শর্তই পূরণ করেছে  জে বি-র কচুরি। কিন্তু এত করেও শেষরক্ষা করতে পারেনি, সঙ্গী আলুর তরকারির সামনে ম্লান হয়ে গেছে। 

এ আলুর তরকারির সে সব কিছুই আছে, যা আমার নেই। ‘ক্যারেকটার’, ঝাঁজ, আলাদা হওয়ার ক্ষমতা এবং সাহস, মেরুদণ্ড। এ তরকারি নিড়বিড়ে নয়। জিভে পড়া মাত্র পঞ্চেন্দ্রিয় কান খাড়া করে চোখ গোল করে টানটান হয়ে বসে। আর প্রথম দু’চামচ মুখে দেওয়ার পর টের পাওয়া যায় ঝালটা। আমার জিভের দু’পাশ আর গলার কাছ গরম হয়ে উঠল, অর্চিষ্মানের দেখি চশমার আড়ালে চোখ ছলছল, নাকের ডগা লাল, কপালে ঘামের বিন্দু, ঠোঁটে হাসি। 

ইমিডিয়েট মিষ্টি কিছু একটা খাওয়া দরকার, আশেপাশে কোটি কোটি রাবড়ির দোকান, কিন্তু আমাদের টু ডু লিস্টে নেক্সট আইটেম জিলিপি। যত দ্রুত সম্ভব হাঁটা লাগালাম। পরাঠাওয়ালি গলি থেকে চাঁদনি চক মেট্রোর দিকে বেরিয়ে ডানদিকে, গুরুদ্বারা পেরিয়ে, (গুরুদ্বারায় আবার কী যেন একটা হচ্ছে, ফুটপাথ উপচে রাস্তার ওপর এসে পড়েছে মোমবাতির স্টল, লাইন দিয়ে সবাই শালপাতায় প্রসাদ নিচ্ছেন) মোড়ের মাথায় ওল্ড ফেমাস জলেবিওয়ালা। আমরা যখন গেছি, জিলিপি ভাজা চলছে। নিজেদের খুবই ভাগ্যবান মনে করেছিলাম তারপর বুঝলাম ব্যাপারটা ভাগ্যটাগ্যর নয়। প্রতি ব্যাচই ভাজার তিন মিনিটের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আগের ব্যাচের ভাঙা গুঁড়ো যা পড়ে থাকে, নেক্সট ব্যাচের ওজন অ্যাডজাস্ট করার কাজে লাগে।


এই হচ্ছে একশো গ্রাম জিলিপি। এর বর্ণনা কী ভাবে দেব আমি জানি না। ফার্স্ট ক্লাস জিলিপি যেমন খেতে হওয়ার কথা, ওল্ড ফেমাস জিলিপিও ঠিক সেইরকমই খেতে।

পেট যা ভরেছিল, মনে হচ্ছিল আর বোধহয় জীবনে কোনওদিন কিছু খেতে পারব না। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল বেদপ্রকাশের বান্টার সাইনবোর্ড। আমি আমার গ্লাসের দিকে ফোন তাক করছি দেখে ভাইসাব বললেন, ‘রুকিয়ে রুকিয়ে’, বলে একজনকে আদেশ দিলেন ‘ঢক্কন’ লাগিয়ে দিতে। ফোটো ভালো আসবে।


এই হচ্ছে ফোটো তোলার জন্য ঢাকনা পরা সাজাগোজা বান্টা। ভাইসাবের এত সহযোগিতা সত্ত্বেও এত খারাপ ছবি তুলেছি, লজ্জার ব্যাপার।


জামা মসজিদে পৌঁছে দেখি, আমাদের সঙ্গে সকালে যারা রোশনারা বাগে ছিলেন, তাঁদের কয়েকজনও মসজিদের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছেন। ওঁরাও নাকি থিয়েটার ওয়াক সেরে, ওল্ড দিল্লির স্ট্রিট ফুড এক্সপ্লোর করে জামা মসজিদ ঘুরতে এসেছেন। ভেবেছিলেন করিমসে খাবেন, কিন্তু পেট ভরে গেছে বলে প্যাক করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া স্থির করেছেন।

আমরা সবাই কী ভীষণ একে অপরের মতো আরও একবার টের পেয়ে আশ্চর্য হলাম।



November 10, 2017

খাতায় কলমে



বয়স হলে কোমর যায়, হাঁটু যায়, চোখ যায়, সবথেকে বেশি যায় মনঃসংযোগ। কতরকম টেকনিক ফলো করলাম, প্রাণায়াম, পোমোদোরো। পঁচিশ মিনিট কাজ, পাঁচ মিনিট ব্রেক। পঁচিশ মিনিট কাজ, পাঁচ মিনিট ব্রেক। প্রথম কয়েকদিন বেশ কাজও দিয়েছিল, তারপর আবার যে কে সেই। 

আফসোস আরও বেশি হয় যখন মনে পড়ে এককালে মনঃসংযোগের ক্ষমতা কত বেশি ছিল। মা বলেন, ঝুঁকে পড়ে গল্পের বই পড়তাম আর কেউ ‘সোনা’ বলে ডাকলে চমকে উঠে হাতপা ছুঁড়ে হার্টফেল হওয়ার জোগাড় হত। ভয়ে লোকে ডাকত না।

আপনারা বলতে পারেন, গল্পের বই মন দিয়ে পড়া দিয়ে মনঃসংযোগের বেশিকম প্রমাণ হয় না। সিঁড়িভাঙা সরল কিংবা ভারতের ম্যাঙ্গানিজ উৎপাদক রাজ্যের লিস্ট মুখস্থ করার সময় মন লাগাতে পার তো বুঝি।

মন তাতেই বসে যা করতে ভালো লাগে। যা ভালো লাগে না, তাতে মন বসে না। অফিসের কাজ, বাড়ি পরিষ্কার। কত রকমের যে ঠ্যাকনা লাগে। কানে হয় গান গোঁজো, নয় সানডে সাসপেন্স। পাঁচশো বার জল খাও। চুল আঁচড়াও। মাকে ফোন কর। অর্চিষ্মানকে পিং। ভাবো দু’ঘণ্টার মধ্যে যদি আবার ফোন করে জিজ্ঞাসা করি, ‘কী চলছে?’ তিন্নি পাগল ভাববে কি না।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে যা করতে আমার ভালো লাগে তাতেও আমার ইদানীং মন বসে না। সাতানব্বই পাতার বই, সাতাশ দিনেও শেষ হয় না। রোজ সকালে মোটে দু’ঘণ্টা নিশ্চিন্তে টাইপ করার সময়, সেই দু’ঘণ্টা আমি কীভাবে নষ্ট করি ভাবলে নিজের গায়েই কাঁটা দেয়। 

সব রহস্য সমাধানের গোড়ার ধাপ হচ্ছে মোটিভ আবিষ্কার। কেন আমার মন বসছে না? 

বা আমার ক্ষেত্রে প্রশ্নটা হবে, কার জন্য মন বসছে না?

আমার জীবনের সব গোলমালের জন্য আমার আলস্য, আমার একাগ্রতার অভাব, আমার ফাঁকি দিয়ে বাজিমাতের চেষ্টা ইত্যাদিকে দায়ী করা যায়, কিংবা অন্য কারও ঘাড়ে দোষ চাপানো যায়। আমি জুৎসই ঘাড় খুঁজতে লাগলাম। সুবিধেজনক ঘাড় বলতে অর্চিষ্মানেরটা আছে, হাতের কাছেও আছে, ল্যাম্পের আলোর বৃত্তের পরিধির বাইরেই আবছা অন্ধকারে ঘুমোচ্ছে, কিন্তু লজ্জা হল। যেটুকু হচ্ছে ও আছে বলেই হচ্ছে। ও না থাকলে এটুকুও হত না।

খোঁজা জারি রাখলাম। টেবিলের ওপর দেওয়ালে যামিনী রায়ের কপিতে শুঁড় তোলা বটল গ্রিন হাতির ঘাড়ে টুকটুকে লাল ঠোঁটের হাসি হাসি বাঘ, বাঘের ঘাড়ে রাণীমা বসে আছেন। ডানদিকে বুককেসের ওপর লকলকিয়ে উঠেছে সানসিভিয়েরা প্ল্যান্ট, ধারালো পাতা দেখে নিন্দুকে যার নাম দিয়েছে ‘শাশুড়ির জিভ’। তার ঘাড়েও দোষ চাপাতে লজ্জা হল, কারণ আমার কোনও ক্ষতি তো সে করেইনি, উল্টে এই বাজারে ঘরের বাতাস পরিশুদ্ধ করছে। দেখেশুনে যখন ভয় লাগতে শুরু করেছে শেষমেশ সব দোষটা নিজের ঘাড়েই নিতে হয় নাকি, তখন আরেকজনের উপস্থিতি টের পেলাম। আমার চোখে নীল চোখ রেখে তাকিয়ে আছে আমার ল্যাপটপ।

ওই ল্যাপটপের ভেতর বাস করে এক ভয়ংকর রাক্ষস। রাক্ষসের নাম ইন্টারনেট। রাক্ষসের খোরাক আমার সময়। চব্বিশ ঘণ্টা, সাত দিন, বারো মাস।

ল্যাপটপ ত্যাগ দিয়ে আপাতত খাতাপেনে ফিরে গেছি। অন্তত সকালের সময়টুকুর জন্য।

এত ড্র্যাস্টিক পদক্ষেপ কেন? ল্যাপটপেই কি মানিয়েগুছিয়ে নেওয়া যেত না? তাছাড়া সমস্যা তো ল্যাপটপ নয়, ইন্টারনেট। কত অ্যাপ আছে, চালু করলেই একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু সে সবে আমার ভরসা নেই। যে সংযোগ এক ক্লিকে বন্ধ করা যায়, সে সংযোগ আরেক ক্লিকে চালু করতে কী? তাছাড়া ইন্টারনেটের হাত থেকে বাঁচতে যদি আমাকে ইন্টারনেটেরই সাহায্য নিতে হয়, তাহলে কেমন কেমন লাগে।  

কিন্তু ব্যাপারটা একটু উলটপুরাণ হল না? সারা বিশ্ব যখন খাতা ছেড়ে যন্ত্রকে আপন করেছে, তখন এই উল্টোদিকে হাঁটার মানে কী? ল্যাপটপে টাইপ করা খাতাপেনে লেখার থেকে বেশি সুবিধেজনক বলেই না সবাই লিখছে?

সে তো বটেই। ল্যাপটপে লেখার অবভিয়াস সুবিধেগুলো সম্পর্কে আমি সচেতন। 

এক, হাতের লেখার স্পিডের থেকে টাইপ করার স্পিড বেশি। দুই, শব্দসংখ্যা মাপার সুবিধে। সব ওয়ার্ড প্রসেসরেই এ সুবিধে থাকে, ‘ স্ক্রিভনার’ বলে যে প্রসেসরটা আমি গত বছরখানেক ধরে ব্যবহার করছি, তাতে আবার ‘টার্গেট বার’ বলে একটা ব্যাপার আছে। ড্রাফট টার্গেট, সেশন টার্গেট ইত্যাদি। টার্গেট বাক্সে আপনি যত শব্দ লিখতে চান, ধরুন তিনশো, বসিয়ে টাইপ করতে শুরু করলাম, এক, দুই, পাঁচ দশ, যত শব্দসংখ্যা বাড়বে, বারের রং টকটকে লাল থেকে ফিকে লাল থেকে কমলা থেকে হলুদ থেকে ক্রমে সবুজ হবে। রোমহর্ষক ব্যাপার। 

দুঃখের বিষয়, এই সব সুবিধেগুলোই হবে যদি আমি অ্যাকচুয়ালি লিখি। এই পোস্টটাই আমি ল্যাপটপে লিখেছি, এবং সেই লেখার মাঝখানে অ্যাকচুয়ালি কী কী করেছি তার ফিরিস্তি নিচে দিলাম। এই পোস্ট লেখা চলছে তিন দিন ধরে, কাজেই নিজের লিস্টের প্রতিটি আইটেম, ইনটু থ্রি করে নেবেন। 

১। গোটা সতেরো বুকটিউব ভিডিও দেখেছি
২। নিরামিষ পোলাও রেসিপি খুঁজেছি
৩। ধনৌল্টিতে জানুয়ারিতে বরফ পড়ে কি না খবর নিয়েছি
৪। ক্যান্ডি ক্রাশ খেলেছি
৫। ফিডলি চেক করেছি, কেউ নতুন পোস্ট লিখল কি না
৬। লংকার আচারের রেসিপিতে লাইক দিয়েছি 
৭। ক্যান্ডি ক্রাশ সোডা সাগা খেলেছি
৮। মাকে বারতিনেক, তিন্নিকে একবার ফোন করেছি। অর্চিষ্মানের সঙ্গে কতবার চ্যাট করেছি গুনিনি। 
৯। সুইডিশ প্রিন্সেস কেক রেসিপি ভিডিওতে লাইক দিয়েছি।

কেন ল্যাপটপ ছাড়ার দরকার হয়েছিল আশা করি বুঝতে পেরেছেন। 

আট বাই তেরো ইঞ্চির, একশো বিরানব্বই পাতার একটা খাতা আগাপাশতলা শেষ করার পর হাতের লেখা বনাম ল্যাপটপে টাইপ করা নিয়ে কয়েকটা পর্যবেক্ষণ আপনাদের বলি। 

এক, ল্যাপটপের তুলনায় আমার খাতায় ফোকাস করতে বেশি সুবিধে হচ্ছে। হাতে পেন ধরে খাতার ওপর লেখার শারীরিক পরিশ্রম, কি বোর্ডের ওপর আঙুল চালানোর থেকে বেশি। পরিশ্রম বেশি বলেই খাতাপেনে লেখা বেশি মনোযোগ দাবি করে। টাইপ করতে করতে অটো-পাইলটে চলে যাওয়া যত সোজা, খাতাপেনে লিখতে লিখতে তত সোজা নয়। মাথাটা অনেক বেশি সজাগ থাকে।

দুই, কোথায় একটা পড়েছিলাম, লেখার মাধ্যমের সঙ্গে ভাষা বদলায়। আমার ল্যাপটপের বাংলার থেকে খাতাপেনের বাংলা আলাদা কি না আমি বলতে পারব না, তবে দুটোর বাংলা বানান যে সম্পূর্ণ আলাদা সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। খাতায় লেখার সময় ক্রমাগত বাড়ির জায়গায় বাড়ী, গাড়ির জায়গায় গাড়ী, ওই-এর জায়গায় ঐ লিখছি। বেসিক্যালি, আমার ছোটবেলার বানান।

খাতাপেনে লিখে আরেকটা সুবিধে হয়েছে, খাতা থেকে ল্যাপটপে টাইপ করার সময় একবারের রিভিশন ফাউ পাওয়া যাচ্ছে। অনেকসময় একই ফাইলে বার বার কারেকশন করতে বোরিং লাগে, এ তাও একটু বৈচিত্র্য হল। 

সবথেকে ভালো ব্যাপার যেটা হয়েছে, হাতের লেখাটাকে আবার নিজের বলে চিনতে পারছি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম ওটা জন্মের মতো গেছে।


November 06, 2017

এ মাসের বই/ অক্টোবর ২০১৭



আমার প্রিয় বুকব্লগাররা সকলেই অক্টোবর মাসজুড়ে হইহই করে হ্যালোউইন উদযাপন করলেন। এত আনন্দ করে সবাইকে ভূতের বই পড়তে দেখে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বহু বছর পর পরপর দুখানা হরর নভেল পড়ে ফেললাম। 


উৎস গুগল ইমেজেস

সেই দু’হাজার পনেরোতে বেরোনোর সময়েই জশ ম্যালেরম্যান-এর বার্ড বক্স-এর নাম শুনেছিলাম, কিন্তু তারপর যা হয়, বোকার মতো রিভিউ পড়তে গেছি। 

রিভিউর ব্যাপারে একটা জিনিস খেয়াল করে দেখেছি, লক্ষ লক্ষ প্রশংসাসূচক রিভিউর মধ্যে যদি একখানা নেগেটিভ রিভিউ থাকে, মন সবসময় সেইটাকেই আঁকড়ে ধরে।  যারা প্রশংসা করছে তাঁরা পা চাটা স্তাবক, ঝাঁকের কই, যে গালি দিয়েছে সে-ই সততার প্রতিমূর্তি।

এই ফাঁদে পড়ে আমার বার্ড বক্স পড়া পিছিয়ে গেল দু’বছর। তারপর মাসের শুরুতে একজন বুকব্লগারের হ্যালোউইন রেকোমেন্ডেশনে বার্ড বক্স-এর নাম শুনে কী মনে হল, কিছু না ভেবে কিনে ফেললাম। তার পরের তিনঘণ্টায় দু’শো চুরানব্বই পাতার বইটা পড়েও ফেললাম। 

বার্ড বক্স-এর গল্প চলে দুটো সুতো ধরে। প্রথম সুতো চার বছর আগের, যখন এক অদ্ভুত ঘটনার কথা প্রথম লোকের কানে আসছে। নিতান্ত স্বাভাবিক অবস্থা থেকে লোকজন মুহূর্তের মধ্যে পাগল হয়ে গিয়ে প্রথমে আশেপাশের লোকজনকে আক্রমণ করছে, খুন করছে এবং ফাইন্যালি নিজেকে মারছে। কেন এ ঘটনা ঘটছে তার কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, শুধু ধরে নেওয়া যায়, এইরকম হিংস্র হয়ে ওঠার আগে তারা কিছু একটা দেখেছিল। কাজেই একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে দেখা আটকানো। অর্থাৎ সবাই যে যার জানালাদরজা বন্ধ করো, স্বেচ্ছায় অন্ধ হও। অ্যামেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে যখন এ ঘটনার আঁচ এসে পৌঁছল, তখন গল্পের প্রধান চরিত্র ম্যালরি সদ্য আবিষ্কার করেছে যে সে গর্ভবতী। 

প্রথমে যখন লোকজন প্যানিক করতে শুরু করল, জানালায় কম্বল ঝোলাল, চোখে ফেট্টি বাঁধল, তখনও ম্যালরি ব্যাপারটাকে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছিল কিন্তু অচিরেই আর ব্যাপারটা হাসির রইল না। তারপর এমন একটা ঘটনা ঘটল যে ম্যালরিকে নিজের বাড়ি ছেড়ে উঠতে হল এক ‘শেল্টার হাউস’এ। যেখানে তারই মতো আরও চারজন পুরুষ আর একজন মহিলা (পরে দু’জন হবে) প্রাণ বাঁচানোর তাগিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। 

গল্পের দ্বিতীয় সুতো বর্তমানে, যখন আমাদের চেনা সভ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বসে গেছে। শেল্টার হাউসে ম্যালরি একা, সঙ্গে দুটি চার বছরের ছেলে মেয়ে। চার বছর ধরে নেওয়া প্রস্তুতির পরীক্ষা সমাগত। ছেলে এবং মেয়েটিকে নিয়ে ম্যালরি, বলা বাহুল্য তিনজনের চোখেই কালো মোটা কাপড়ের ঢাকনা, বেরিয়ে পড়েছে, এই ভয়ানক জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে। 

ভয়ের সিনেমা দেখলে যত ভয় লাগে, দৃশ্য দেখিয়ে বা শব্দ শুনিয়ে ভয় পাওয়ানো যত সহজ, লিখে ঘাড়ের রোম খাড়া করা অত সহজ নয়। অজানা আতংক ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে ম্যালরম্যান অধিকাংশ সময়েই সফল। তাছাড়া শেল্টার হাউসে একসঙ্গে ছ’সাতজন অচেনা লোকের একসঙ্গে থাকার ডায়নামিক্সও বিশ্বাসযোগ্য। একবার পড়তে পড়তে আমি অর্চিষ্মানের টি শার্ট পর্যন্ত খিমচে ধরেছিলাম, আর বাথরুমের ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে আসা আলোর দিকে তাকাতে ভয় লাগছিল।

হরর গল্পের পৃষ্ঠপোষকরা সকলেই বলেছেন, (এমনকি যাঁদের বার্ড বক্স ভালো লাগেনি তাঁরাও) ম্যালরম্যানের প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে মৌলিক। 

*****


উৎস গুগল ইমেজেস

সামাজিক পালার ঝড়ের মুখে ঘরানা যাতে উড়ে না যায় সেটা আমার অন্যতম মাথাব্যথা বটে, কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে ঘরানারও কুলীনঅকুলীন আছে। গোয়েন্দাগল্প নিয়ে লোকে যতই নাক বেঁকাক না কেন, গোয়েন্দাগল্পের বাজার এখনই ওঠার কোনওরকম সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, বরং হাওয়া উল্টো কথাই বলে। সামাজিক পালাকারেরাও অনেকদিন সামাজিক পালা লেখার পর মুখ বদলাতে হলে প্রথমে গোয়েন্দাগল্পের দিকেই হাত বাড়ান। 

এ সৌভাগ্য সব ঘরানার হয় না। আমি খবর রাখি না বলে কি না জানি না, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ভৌতিক বা হরর কাহিনী বাংলায় এখনও লেখা হয় কি? একসময় হত জানি। শরদিন্দুর বরদা, মনোজ বসুর বেশ কয়েকটি গায়ে কাঁটা দেওয়া গল্প বারবার সানডে সাসপেন্সে চালিয়ে শুনি।

তবে এ অবহেলা শুধু বাংলাদেশে ঘটছে তেমন নয়। সাহেবমেমেদের দেশেও নাকি এমনটাই ঘটছে। যে ইংরিজি ভাষার সাহিত্যে এডগার অ্যালান পো জন্মেছিলেন, তার হরর ঘরানার একেবারে দুচ্ছাই অবস্থা। অন্তত এই হ্যালোউইনের বাজারে সে রকমই শুনতে পেলাম। একা কুম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছেন স্টিফেন কিং। তাই তিনি যাঁকে  "the finest writer of paperback originals in America today" খেতাব দিয়েছিলেন, সেই মাইকেল ম্যাকডাওয়েলের লেখা ‘দ্য এলিমেন্টালস’ আর গড়িমসি না করে পড়ে ফেললাম। 

মাইকেল ম্যাকডাওয়েল ইংরিজি সাহিত্যে হার্ভার্ড থেকে বি এ, এম এ করেছেন, ব্র্যান্ডেইস থেকে ইংরিজিতে পি এইচ ডি করেছেন, (ডিসার্টেশনের বিষয় ছিল American Attitudes Toward Death, 1825–1865) বোস্টন আর টাফটস-এ স্ক্রিপ্ট রাইটিং পড়িয়েছেন এবং সারা জীবন নামে-ছদ্মনামে মিস্ট্রি, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, গথিক হরর লিখে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, “I am a commercial writer and I'm proud of that. I am writing things to be put in the bookstore next month. I think it is a mistake to try to write for the ages.”

পঞ্চাশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনের সব সৃষ্টির মধ্যে বিখ্যাততম নিঃসন্দেহে ম্যাকডাওয়েলের সাদার্ন গথিক উপন্যাস ‘দ্য এলিমেন্টালস’। 

এলিমেন্টালস-এর গল্প শুরু হচ্ছে একটি ফিউন্যারেল চলাকালীন। ফিউন্যারেলের দৃশ্য দিয়ে গল্প শুরু করার একটা যুক্তি অ্যান্থনি হরোউইটজ তাঁর ‘ম্যাগপাই মার্ডারস’-এ উল্লেখ করেছেন। একসঙ্গে অনেক চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের আলাপ করিয়ে দেওয়া যায়। এলিমেন্টালসের ফিউনেরাল সিনেও আমরা মোটামুটি সব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হই। অ্যালাবামার দুই বড়োলোক এবং ঐতিহ্যশালী পরিবার, স্যাভেজ আর ম্যাকক্রে। বিবাহসূত্রে এবং প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় আবদ্ধ। এই স্যাভেজ পরিবারের ম্যাট্রিয়ার্কের ফিউনেরালে কিছু অদ্ভুত এবং ভয়ংকর আচারের পরিচয় আমরা পাই, যেটা শতশত বছর ধরে স্যাভেজ পরিবারে চলে আসছে। ফিউনেরালের পর দুই পরিবারের লোক সিদ্ধান্ত নেয়, এই শোক থেকে সেরে উঠতে সবাই মিলে বেলডাম বলে একজায়গায় বেড়াতে যাওয়া হবে। বেলডাম হচ্ছে গালফ কোস্ট-এ বিচ্ছিন্ন একফালি দ্বীপ। সে দ্বীপে তিনটি ভিক্টোরিয়ান প্রাসাদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একটির মালিক স্যাভেজ-রা, একটির ম্যাকক্রে-রা। আর তিননম্বর বাড়ি কারওর নয়। কেউ থাকে না। থাকা সম্ভবও নয়। খোলা জানালাদরজা দিয়ে বালি ঢুকে এসে গ্রাস করছে বেলডাম-এর ‘থার্ড হাউস’কে।

এলিমেন্টালস-এর প্রধান ভালো বিষয়টা হচ্ছে, ঘরানা সাহিত্যে সাধারণত যেটা কমজোরি হয়, বইটার লেখা। অসম্ভব শক্তিশালী। বেলডাম-এর নিঃসঙ্গতা, অ্যালাবামার ছায়াহীন রোদ, তাপ, এ সব শুধু প্রেক্ষাপট নয়, যেন জ্যান্ত চরিত্র। স্যাভেজ এবং ম্যাকক্রে পরিবারের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক, বিনীত ব্যবসায়ী, অবহেলিত অ্যালকোহলিক ম্যাট্রিয়ার্ক, বোহেমিয়ান বাবা এবং কিশোরী মেয়ে এবং এদের পারস্পরিক সম্পর্ককে, একটা ভূতের গল্প বলার সঙ্গে সঙ্গে ছবির মতো ফুটিয়ে তোলা, দু’শো বিরানব্বই পাতার মধ্যে, লিখতে না জানলে সম্ভব নয়।

এলিমেন্টালস-এর বিরুদ্ধে প্রধান যে অভিযোগটা আনা যায় সেটা হচ্ছে মৌলিকতার অভাব, যে মৌলিকতা জশ ম্যালেরম্যান বার্ড বক্স-এ দেখিয়েছেন। সব আঁশ ছাড়িয়ে নিলে দ্য এলিমেন্টালস শেষমেষ ভূতুড়ে বাড়ির গল্প বই আর কিছু নয়। দ্বিতীয় খুঁত, পেসিং। গোড়ায় অসম্ভব এলানো, শেষে অসম্ভব হুড়োহুড়ি। আর তিন নম্বর যে খুঁতটা ধরা যায়, সেটা বললেই অনেকে হাঁউমাউ করে উঠবে, বলবে, “তখন ওইরকমই হত”। সাদা পরিবারের লোকের ভালো কালো চাকর, তাকে ক্রমাগত ‘ব্ল্যাক উওম্যান’ বলে উল্লেখ করা, এবং প্রভুদের জন্য প্রাণ দেওয়ার জন্য সেই চাকর একেবারে বলিপ্রদত্ত। 

***** 


উৎস গুগল ইমেজেস

জেফ্রি ইউজেনাইডিস-এর মিডলসেক্স পড়েছিলাম অনেকদিন আগে, ভালোও লেগেছিল। ভদ্রলোকের বাকি উপন্যাসগুলোও পড়ার ইচ্ছে ছিল, বিশেষ করে তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য ভার্জিন সুইসাইডস, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। এ মাসে হাতে বইটা পেয়ে আবার পুরোনো ইচ্ছেটা চাগাড় দিয়ে উঠল, আর পড়ে ফেললাম। 

ভার্জিন সুইসাইডেস-এর ঘটনা ঘটছে সত্তরের দশকের মিশিগান রাজ্যের এক শহরতলির এক শান্ত পাড়ায়। সে পাড়ায় থাকেন স্থানীয় হাইস্কুলের অংকের মাস্টারমশাই মিঃ রোনাল্ড লিসবন, তাঁর স্ত্রী মিসেস লিসবন, আর তাঁদের পাঁচ মেয়ে, টেরেসে (১৭), মেরি (১৬), বনি (১৫), লাক্স (১৪) এবং সেসিলি (১৩)। একদিন সেসিলি বাথটবে হাতে ব্লেড চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ডাক্তাররা সেসিলিকে বাঁচিয়ে তোলেন। কিছুদিন পর সেসিলি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মারা যায়। ঘটনার ঠিক একবছর পর, টেরেসে, মেরি, বনি এবং লাক্স একসঙ্গে আত্মহত্যার চেষ্টা করে এবং মেরি ছাড়া সকলেই সফল হয়। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার এক মাসের মধ্যে মেরি আত্মহত্যা করে। এর পর মিস্টার এবং মিসেস লিসবন পাড়া ছেড়ে চলে যান।

ভার্জিন সুইসাইডস-এর গল্প বলছে ওই পাড়ার কয়েকজন ছেলে, ঘটনার সময় যারা কিশোর ছিল। গল্প এগোয় স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে। এভিডেন্স নম্বর এক, দুই, তিন, এগারো, সতেরো দিয়ে বক্তারা লিসবন বোনেদের ডায়রি, পাড়ার পুরোনো বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার ইত্যাদি পাঠকের সামনে পেশ করতে থাকে। 

মিডলসেক্স-এও লক্ষ করেছিলাম, ভার্জিন সুইসাইডস-এও আছে ব্যাপারটা। ইউজেনাইডিসের গল্পের মুখ্য চরিত্র আসলে একটা অঞ্চল, এক্ষেত্রে একটা পাড়া, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পাড়ার লোকজন এবং পরিপার্শ্বের বদলে যাওয়া। তাই লিসবন বোনেদের গল্প বলতে বলতে মাঝেমাঝেই অন্য কোনও চরিত্রের পিছু ধাওয়া করেন লেখক এবং তাকে নিয়ে গোটা পনেরো পাতা কাটিয়ে দেন। গল্প বলার গুণে এটা ক্লান্তিকর হয় না, কিন্তু চোখে পড়ে। তাছাড়াও ইউজেনাইডিসের বাক্য দীর্ঘ এবং জটিল, তাই শব্দবাহুল্যের অনুভূতি জাগায়। 

ভার্জিন সুইসাইডস আমার ভালো লেগেছে। একটা সময়কে, একটা অঞ্চলকে লেখক নিখুঁত ধরেছেন। অসহায় বাবার ভূমিকায়, অত্যাচারী মায়ের চরিত্র, এমনকি হরমোনে টইটম্বুর পাড়ার অল্পবয়সী ছেলেদের চরিত্রচিত্রায়ণ নিখুঁত। এবং সেটা নিখুঁত করতে গিয়েই ইউজেনাইডিস কিছু ক্রিটিকের রোষের মুখে পড়েছেন। একদল চোদ্দ, পনেরো বছরের ছেলের চোখ দিয়ে আরেকদল চোদ্দ পনেরো বছরের মেয়েদের (যে সব মেয়েদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য উক্ত ছেলেরা উন্মুখ,) দেখাতে গেলে যা হয় তাই হয়েছে, মেয়েরা একএকটি খোলসে পরিণত হয়েছে। তাদের নাকচোখমুখ, শরীরের বিভঙ্গ এবং যৌনাচার ছাড়া আর কিছু আমরা জানতে পারি না। গল্পে লিসবন বোনেদের পারস্পেক্টিভ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

যা স্বাভাবিক সাহিত্যে তা-ই সর্বদা দেখানো উচিত, না উচিত জিনিসকে স্বাভাবিকের মধ্যে ঢোকানো উচিত, সে বিষয়ে আমি নিজে এখনও ধোঁয়াশায় কাজেই এই বিষয়ে কিছু মত দিচ্ছি না।



November 05, 2017

দুই বোন



আমি এই কালকেই ভাবছিলাম, দিল্লির হিন্দির সঙ্গে আমি কীভাবে সড়গড় হয়ে যাচ্ছি, এমনকি এই ভাষাটা কীভাবে আমার মুখের কথাতেও সময়েঅসময়ে ঢুকে পড়ছে সে নিয়ে একটা পোস্ট লিখব। এই যেমন আজকাল গল্প ‘করা’র জায়গায় মাঝেমাঝে গল্প ‘মারা’ বেরিয়ে যায়। কাল অর্চিষ্মান ফোন করে বলল, ‘শোন, একটা লিংক পাঠিয়েছি, একটু দেখো তো,” আমি বললাম, ‘দাঁড়াও, হাতের কাজটা নিপটে নিয়েই দেখছি।’ 

আবার কিছু কিছু জায়গায় এখনও হোঁচট খাই, যেমন ‘আগে’ শব্দটায়।  ওলা ভাইসাবকে রুকতে বললে তিনি বলেন, ‘পেড় কি আগে?’ আমি বলি, ‘নেহি, পেড় কি বাদ।’ উনি বলেন, ‘ওহি তো বোলা ম্যায়নে, পেড় কি আগে…’ এইরকম খানিকক্ষণ চলার পরে আমার মনে পড়ে যে ভাইসাবের ‘আগে’ যা, আমার ‘বাদ’ ও তাই।


কাল আমার হাতে চা ধরিয়ে দিয়ে ভাইসাব যখন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পেপার দেনে আয়ে হো?’ আমি একমুহূর্তের জন্য কনফিউজড হলাম। সঙ্গে সাইকেল নেই, সাইকেলের হ্যান্ডেলে থলি বোঝাই খবরের কাগজ নেই, থাকলেও আমার টিপ যা খারাপ, সে পেপার পাকিয়ে তিনতলা কেন, তিন হাত দূরের বারান্দায় ফেলতে পারব কি না সন্দেহ। তা সত্ত্বেও আমি ‘পেপার দিতে’ এসেছি, এ রকম মনে হওয়ার কারণ কী?

তারপর মাথা খুলল। কাছাকাছি নাকি কোথায় একটা চাকরির ‘পেপার’ চলছে, ভাইসাবের সন্দেহ হয়েছে আমরা সেই সূত্রে রোশনারা বাগের সামনের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছি কি না।


করছি না। রোশনারা বাগের সামনে আমরা ঘোরাঘুরি করছি রোশনারা বাগে যাব বলেই। রোশনারা বাগ হচ্ছে শাহজাহানের মেয়ে রোশনারার (সম্ভাব্য) সমাধি এবং সমাধিঘেরা বাগান। সি আর পার্ক থেকে বেশ দূর। ওই সকালবেলার খাঁ খাঁ রাস্তাতেও পৌঁছোতে ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল। জায়গাটা দেখে মনে পড়ল, এ পাড়ায় আগেও একবার এসেছিলাম। আধার কার্ড বানাতে।

পরশু কাজ নিপটে অর্চিষ্মানের লিংক খুলে দেখি দিল্লিতে ‘ওয়াক ফেস্টিভ্যাল’ চলছে। ঐতিহাসিক মনুমেন্ট, ফুড ওয়াক ইত্যাদি আরও যা যা চেনা ওয়াক হয় সে সব তো হচ্ছেই, বেশ কয়েকটা ইন্টারেস্টিং ওয়াক-ও আছে দেখলাম। চাঁদনি রাতে জঙ্গলের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে ভূতের গল্প শুনতে শুনতে ওয়াক; কুতুব মিনার, খান মার্কেটে চোখ বেঁধে ওয়াক ইত্যাদি। আমি বললাম, ‘আচ্ছা, চোখ বেঁধে ঘুরতে চাও না বুঝলাম, জঙ্গলে মাঝরাতে ভূতের গল্প শুনি চল,’ অর্চিষ্মান বেঁকে বসল। কাজেই কম্প্রোমাইজ। রোশনারা বাগে থিয়েটার ওয়াক হবে, রোশনারা বাগ আমাদের দেখাও নেই, সেখানেই যাওয়া স্থির হল। 

থিয়েটার ওয়াক হচ্ছে থিয়েট্রিক্যাল পারফরম্যান্স সহযোগে ওয়াক। 'শাহজাহান’স ডটারস’ নামের এই ওয়াকটি পরিচালনা করবেন ‘দরবেশ’ দলের প্রশিক্ষিত অভিনেতারা।

দশটায় ওয়াক শুরু হওয়ার কথা, তখনও মোটে ন’টা কুড়ি। বাগের অনেকগুলো গেট। ফোন করে জানা গেল হাঁটা শুরু হবে তিন নম্বর গেট থেকে। হেঁটে হেঁটে গেলাম তিন নম্বরে। পাখিসব কলরব করছে। একদল মহিলা বসে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে ভগবানের নাম করছেন। কয়েকজনের হাঁটা/ছোটা ততক্ষণে শেষ, তাঁরা বেঞ্চে বসে হাঁপাচ্ছেন আর এখনও যারা হাঁটছে তাদের চেঁচিয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন। বাচ্চারা বাগের মধ্যে বসানো খেলার যন্ত্রপাতিতে চড়ছে। আমরা গেটের কাছে এসে চা খুঁজতে লাগলাম। চা নেই, চারদিকে স্বাস্থ্যকর ফলের জুসের ঠেলাগাড়ি। খানিকটা এগিয়ে চায়ের দোকান মিলল। 


দশটা পাঁচ নাগাদ, সঙ্গের হাঁটিয়েদের সঙ্গে টুকটাক আলাপ আর টিকিট পরীক্ষার পর হাঁটা শুরু হল। এই হচ্ছে রোশনারার অফিশিয়াল সমাধি, যদিও রোশনারা এখানে সমাধিস্থ রয়েছেন না লালকেল্লায় পরিবারের লোকদের সঙ্গে, সেটা নিশ্চিত নয়। এখন হতশ্রী অবস্থা, কিন্তু একসময় এ বাড়ির রূপের বাহার ছিল। ফোয়ারা থেকে বেরোনো সুগন্ধী জল পরিখা ভরে রাখত। ভেতরের দেওয়াল, ছাদ মণিমুক্তো এবং মেঝে কার্পেট দিয়ে সজ্জিত ছিল। রোশনারা বহু যত্নে এই বাগান আর বাগানে এই বাড়িটি বানিয়েছিলেন, তাঁর ইচ্ছে ছিল মৃত্যুর পর তাঁকে এখানে সমাধিস্থ করা হবে। 




শাহজাহান’স ডটারস-এর বিষয় শাহজাহানের পতন এবং ঔরঙ্গজেবের উত্থানের সময়কালের ঘটনাপ্রবাহ। গল্প বলা হবে শাহজাহানের দুই মেয়ে, জাহানারা এবং রোশনারার বয়ানে, পাঁচটি ছোট ছোট দৃশ্যে।

জাহানারা রোশনারাকে সাবধান করছেন, আদর্শবাদী ঔরঙ্গজেব শুধু একটাই আদর্শে বিশ্বাস করেন, 'ঔরঙ্গজেব' আদর্শে

প্রথম দৃশ্য শুরু হচ্ছে যখন, তখন চোদ্দটি সন্তানের জন্ম দিয়ে মুমতাজমহল মারা গেছেন, তাঁর স্মৃতিতে তাজমহল বানানো হয়েছে, শাহজাহানের মন সাম্রাজ্য পরিচালনা থেকে সম্পূর্ণ উঠে গেছে, তিনি সাহিত্যসংস্কৃতিতে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছেন আর ভাবছেন এইবেলা একটা কালো তাজমহল বানালে কেমন হয়। এই সময় শাহজাহানের বয়স চল্লিশ, তাঁর বড়মেয়ে জাহানারার বয়স সাতাশ, দারা শুকো ছাব্বিশ, ঔরঙ্গজেব এবং রোশনারা আরও ছোট। ভাইবোনের মধ্যে, বলা বাহুল্য, সদ্ভাব নেই। মারামারি কাটাকাটির পারিবারিক ঐতিহ্য তো আছেই, তাছাড়া শাহজাহান নিজেও খানিকটা দায়ী। ছেলেমেয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার তারতম্য ছিল। শাহজাহানের ফেভারিট ছিলেন জাহানারা, কারণ তিনি ছিলেন অবিকল মায়ের মতো দেখতে। শাহেনশাহর প্রশ্রয়ে জাহানারার প্রতাপ প্রবল ছিল। তিনি ছিলেন বাদশাহি হারেমের হর্তাকর্তা। রোশনারা বাবার স্নেহের কাঙাল ছিলেন, না পেয়ে চটে গিয়ে দিদি এবং বাবার অ্যান্টি হয়ে গিয়েছিলেন। ওদিকে আবার দারা শুকোর মুখ ছিল শাহজাহানের মুখ কেটে বসানো, শাহজাহানের তাঁর প্রতিও পক্ষপাতিত্ব ছিল। ঔরঙ্গজেব ব্যাপারটা মোটেই ভালো চোখে দেখতেন না। তাছাড়া সাম্রাজ্য পরিচালনা বিষয়ে বাবা এবং দাদার সঙ্গে তাঁর মত ছিল নর্থ পোল সাউথ পোল। ঔরঙ্গজেব বিশ্বাস করতেন শাহজাহান সাম্রাজ্য অলরেডি দুর্বল করে দিয়েছেন, এই সব কবিমার্কা দারা শুকো সিংহাসনে বসলে, যে কি না আবার ফারসি ভাষায় গীতাউপনিষদ অনুবাদ করতে চায়, আর রক্ষা থাকবে না। কাজেই দারা শুকোকে মেরে তাঁর মুণ্ডু শাহজাহানকে ভেট পাঠানো হল।

জাহানারা বিপদ বুঝে আড়ালে চলে গেলেন। রোশনারার এতদিনের প্রতীক্ষার অবসান হল, ঔরঙ্গজেবের প্রতি তাঁর অন্ধ আনুগত্যের ফল ফলল, তিনি প্রবল প্রতাপশালী হয়ে উঠলেন। দাক্ষিণাত্য ঔরঙ্গজেবের অধিকাংশ সময় এবং মনোযোগ অধিকার করে রাখত, দিল্লিতে রোশনারাই ছড়ি ঘোরাতেন। অচিরেই শত্রু বাড়তে আরম্ভ করল। একবার জাহানারার কাপড়ে আগুন লাগল, দুই সহচরী প্রাণ দিয়ে রাজকুমারীর প্রাণ বাঁচালেন। কানাঘুষো হল, রোশনারার চক্রান্ত। দলের লোক না হলেও ঔরঙ্গজেব জাহানারাকে ভালোবাসতেন। দাক্ষিণাত্য থেকে দৌড়ে এলেন দিদির খবর নিতে। এর মধ্যে রোশনারা নাকি এমন কর বাড়িয়েছিলেন, সে আমলের নিরিখে যা বেশি রকমের বেশি। মোদ্দা কথা, রোশনারা ঔরঙ্গজেবের মাথাব্যথার কারণ হলেন। হ্যাঁ, সিংহাসনে চড়ার সময় রোশনারা তাঁর ভয়ানক কাজে লেগেছিলেন, কিন্তু তার প্রতিদান সারাজীবন ধরে দিতে হবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই। বিবেকের শেষ বেড়াটুকু ভাঙার অজুহাতও মিলে গেল চটপট। রোশনারা তো ঠিক অসূর্যম্পশ্যা ছিলেন না, প্রচুর পুরুষপরিবৃত হয়ে তাঁর ছবিটবি আছে। তাঁকে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করা শক্ত ছিল না। পরিষ্কার মনে ঔরঙ্গজেব দুশ্চরিত্র বোনকে বিষ খাওয়ালেন। রোশনারার জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হল। 


জাহানারা বুড়ো হয়ে মরেছিলেন, তাঁর সমাধি নিজামুদ্দিনে আছে। রোশনারার মার্ডার চুপচাপ চেপে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করে এই রোশনারা বাগেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল কি না, নাকি লালকেল্লাতেই তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছিল, সে নিয়ে তাই সংশয় যায়নি।


November 01, 2017

শ্রীমান কানাই






সাকি, যাঁর আসল নাম হেক্টর হিউ মুনরো, তাঁর ছোটবেলাটা অন্য পাঁচটা ছোটবেলার থেকে আলাদা ছিল। ছোটবেলায় মা মারা গিয়েছিলেন। ভাইবোনের সঙ্গে ঠাকুমা এবং মাসিপিসির সংসারে বড় হয়েছিলেন সাকি। তাঁর ছোটবেলা আনন্দের ছিল না। 

সেই জন্যই বোধহয় সাকির গল্পের ছোটরাও আমাদের চেনা আর পাঁচটা ছোটদের মতো নয়। তারা ছোট, কিন্তু সরল নয়। হাসি, কান্না, ক্ষিদে, ব্যথা ইত্যাদি ওপরতলার অনুভূতিগুলোর নিচে মানুষের মনে যে অনুভূতিগুলো চাপা পড়ে থাকে (আমি বড়দের অনুভূতি ইচ্ছে করেই বলছি না, কারণ সব বড়দের ওসব হ্যাপা থাকে না), মেশামেশা, ধোঁয়াধোঁয়া, সেসব সাকির ছোটরা দিব্যি অনুভব করতে পারে। 

Sredni Vashtar সাকির ভীষণ চেনা আর বিখ্যাত গল্পগুলোর মধ্যে একটা। উনিশশো দশ থেকে এগারোর মধ্যে লেখা গল্পটি The Chronicles of Clovis সংকলনের অন্তর্গত। Sredni Vashtar-এর হিরো করনারডিন-এর বয়স দশ, করনারডিন অনাথ এবং মিসেস ডি রুপ বলে একজন আত্মীয়ার ভরণপোষণে বড় হচ্ছে। করনারডিন এবং মিসেস ডি রুপ-এর মধ্যে কোনওরকম ভালোবাসাবাসি নেই। এই সময় জানা গেল করনারডিন এক অজানা অসুখে ভুগছে, যার ফলে আর বছর পাঁচেকের মধ্যে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। 

আমার চেনা পরিবেশে গল্পকে এনে ফেলতে গিয়ে গল্পে কিছু বদল আনতে হয়েছে। পুরোটাই বাধ্যতা নয়, আফটার অল ছায়া অবলম্বনে যখন সাকির মাস্টারপিসের ওপর ভর দিয়ে আরও খানিকটা ডালপালা মেলায় বাধা নেই। খানিকটা ব্যাকস্টোরি, আরও গোটাদুই চরিত্র। খালি করনারডিন-এর বাংলা নামটা ‘ক’ দিয়েই রাখব ঠিক করেছিলাম।

সাকি-র ছোটগল্প Sredni Vashtar-এর ছায়া অবলম্বনে আমার লেখা ‘শ্রীমান কানাই’ পড়তে হলে ক্লিক করুন।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.