August 15, 2017

পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা ১৪২৪/ পর্ব ১



উৎস গুগল ইমেজেস

প্রতিবছর পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা পড়ি, এবং প্রতিবছরই একটা নির্দিষ্ট অর্ডারে পড়ি। ফেলুদার কমিক্স দিয়ে শুরু করে বাকি সব কমিক্স, এবং তারপর যথাক্রমে উপন্যাস, ছোটগল্প এবং ননফিকশন (এ সব বিভাগেরও অভ্যন্তরীণ অর্ডার আছে, সে কথা যথাসময়ে বলছি)। এ বছর সেই অর্ডারে গোলযোগ ঘটল। অর্চিষ্মানের জন্য।

আনন্দমেলা কিনে বাড়িতে ঢুকেছি, চা বানিয়ে আমার চিলতে টেবিলে এসে বসেছি, ডেডলাইন এত সামনে চলে এসেছে তার চোখে চোখ ফেলতেও বুক কাঁপছে, তাই পেপার প্যানিক খেলে সাহস জোগাড় করছি। নিজেকে বোঝাচ্ছি এই আর একটা লেভেল খেলেই কাজ শুরু করব। অর্চিষ্মান ভালো ছেলে, সময়ের কাজ সময়ে করে, কাজেই রবিবার রাতে বুকে বালিশ নিয়ে আনন্দমেলা পড়ছে। 

এমন সময় আর্তনাদ শুরু হল। 

বাবা গো, মা গো, বাঁচাও, তুলে নাও। 

ঘাড় ঘোরাতেই হল।

কী পড়ছ!

রাপ্পা রায়।

অগত্যা ফেলুদা ছেড়ে আমাকে রাপ্পা রায় দিয়েই আনন্দমেলার উদ্বোধন করতে হল। 

বই পড়া, সিনেমা দেখা ইত্যাদি শিল্পকর্মের মূল্যায়ন/প্রতিক্রিয়া নিয়ে আমার একটা ধাঁচ আমি লক্ষ করেছি। গোটাটাই অন্য লোকের মূল্যায়ন ও প্রতিক্রিয়ানির্ভর। কেউ কোনও শিল্পকর্মকে প্রশংসা করে আকাশে তুললে মোটামুটি নিরানব্বই শতাংশ নিশ্চিত থাকা যায় যে সেই শিল্পকর্মটি আমার কাছ থেকে “এ আর এমন কী?” -র বেশি পাবে না। আর রাপ্পা রায় পড়ে অর্চিষ্মান যেরকম কাতরাচ্ছিল, আমি যে পড়ে, “ভ্যাট, অতটাও খারাপ না” বলব তাতেও অবাক হওয়ার কিচ্ছু নেই।

রাপ্পা রায় ও সোনার হরিণ/ কাহিনী সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়/ ছবি সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়, রজত দাস ও পৃথা ঘোষ

বন্ধুর সঙ্গে রাপ্পা বেড়াতে যাচ্ছিল কাজিরাঙা। ওই একই ট্রেনে যাচ্ছিল কুখ্যাত স্মাগলার ‘সোনার হরিণ’। বলা বাহুল্য, রাপ্পা সোনার হরিণ এবং অন্য স্মাগলারদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে। আমার খারাপ লাগেনি রাপ্পা রায়, ছবিগুলো বাকি কার্টুনের ছবির তুলনায় বেটার। তবে গল্পে ঢুকতে সময় লেগেছে অনেক বেশি, এ ব্যাপারে আমি অর্চিষ্মানের সঙ্গে একমত। 

চোরা হাতি শিকারি/কাহিনী সমরেশ বসু/ চিত্রনাট্য ও ছবি সৌরভ মুখোপাধ্যায়

গরমের ছুটিতে শিলিগুড়িতে মামাবাড়ি গেল গোগোল মাবাবার সঙ্গে। সেখানে লিমবু নামে এক ছেলের সঙ্গে আলাপ হল তার। লিমবুর সঙ্গে জঙ্গলে বেড়াতে ঢুকে গোগোলের মোলাকাত হল হাতি আর চোরাশিকারিদের সঙ্গে। সেই সংক্রান্ত অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে কমিক্স চোরা হাতি শিকারি। বেশ ভালোই লাগছিল আমার, শেষটা পড়ে কেমন হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। একসঙ্গে চারপাঁচটা পাতা উল্টে ফেলেছি না কি? বার বার পাতায় আঙুল ঘষে নিশ্চিত হলাম, ফেলিনি। আসল গল্পটাও কি এই রকম ঝপ করে শেষ হয়ে গেছিল? রাপ্পা রায়ের শুরুটা খানিকটা কেটে, গোগোলের শেষটাকে আরেকটু জায়গা দেওয়া যেত।

ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা/ কাহিনী সত্যজিৎ রায়/ ছবি অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়

এ গল্প সবার মুখস্থ, কাজেই গল্প নিয়ে বলার কিছু নেই। ছবি নিয়েও আমার কিছু বলা উচিত না, কারণ আমার ছবি আঁকার দৌড় সূর্য, টবে ফুল, কুটির, কুটিরের সামনে আঁকাবাঁকা নদী, নদীতে নৌকো আর নৌকোর ডিসপ্রোপরশনেটলি লম্বা দাঁড় পর্যন্ত।

তবু আমি বলব। পলাশী, পুলিস, জমিদারবাড়ি, লন্ঠন, আর কারও, কিছুর ছবি নিয়ে বলব না, আমি বলব ফেলুদার ছবি নিয়ে। ফেলুদার বি এম আই বিপজ্জনকরকম বৃদ্ধি পেয়েছে। ওঁর চোয়াল সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়েছে। ফলে ফেলুদার থেকে ফজলি আমের সঙ্গেই ফেস কাটিং মিলেছে বেশি। শ্রদ্ধেয় অভিজিৎ তরফদার চট্টোপাধ্যায়, এই এক বছর ফেলুদাকে কড়া ডায়েটিং-এ রাখুন, পরের বছর অন্তত পনেরো কেজি ঝরিয়ে ফেরৎ আনুন। প্লিজ।  

এবার উপন্যাস। উপন্যাস আগে পড়া পরে পড়া নিয়ে সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আমার নিজের। এতে অর্চিষ্মানের কোনও হাত নেই। কারণ রাপ্পা রায় অর্ধেক পড়া ইস্তক ও আর বইটার দিকে ঘেঁষছে না। চোখ পড়লেই শিউরে শিউরে উঠছে। তাতে একদিক থেকে ভালোই হয়েছে, আমি বিনা বাধায় বইটা শেষ করার সুযোগ পাচ্ছি।

নিঃশব্দ মৃত্যু/সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

মিতিনমাসি নেই, তাই উপন্যাস উদ্বোধনের গুরুদায়িত্ব দীপকাকুর হাতে। কলকাতা শহরে এক অদ্ভুত অপরাধের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, যখন তখন যেখানে সেখানে কেউ কেউ মারাত্মক শ্বাসকষ্টের কবলে পড়ছেন। ভিকটিমদের একটা কমন ব্যাপার হচ্ছে যে এঁরা প্রত্যেকেই ব্ল্যাকমেলের ফোন পাওয়ার কয়েকঘণ্টার মধ্যে দশবিশলাখ টাকা বার করে দেওয়ার মতো বড়লোক। শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ার পর ব্ল্যাকমেলার ফোন করে, বলে টাকা ফেলো, ওষুধ নাও, না হলে মরো। ওষুধ রাখা থাকবে কোনও এক অদ্ভুতুড়ে জায়গায়, নির্দিষ্ট জায়গায় টাকা রেখে আসার পর ওষুধের লোকেশন জানিয়ে ফোন আসবে। যতক্ষণ না টাকা পাওয়া যাবে ওষুধ মিলবে না, আর ওষুধ না মিললে হাঁপানিও সারবে না, সোজা মৃত্যু। 

এইবার আপনি নানারকম টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলতে পারেন, যে এমন কী ওষুধ যে অন্য ডাক্তার দিতে পারবে না, আর যদি অন্য ডাক্তারেও সারাতে পারে তাহলে আর ব্ল্যাকমেলারকে পাত্তা দেওয়ার দরকার কী? কিন্তু আমি সে সব প্রশ্ন তুলতে চাই না। ইন ফ্যাক্ট, এ বছরের শারদীয়া আনন্দমেলা পড়তে বসার আগে আমি এই কথাটা নিজেকে মনে করিয়েছিলাম, যে আমি গোয়েন্দাদের তদন্তের খুঁত ধরব না। কারণ সে খুঁত ধরতে বসলে বাংলা সাহিত্য এবং সিনেমার মহামহিম গোয়েন্দারাও ল্যাজেগোবরের চূড়ান্ত হবেন। তাঁদের রহস্য ছিদ্রে ভরপুর হলেও মাথায় করে নাচব, আর মিতিনমাসি দীপকাকুর তদন্তে ভুল ধরে অস্থির করে দেব, এটা অন্যায়। আমি শুধু গল্পটা পড়তে আমার কেমন লাগছে, সেটার দিকেই নজর দেব বেশি।

গোয়েন্দার সিরিজ পড়ার একটা সুবিধে হচ্ছে, একই চরিত্রের সঙ্গে পাঠক অনেকটা সময় কাটানোর সুযোগ পায়। দীপকাকুর উদাসীনতা, ভিড়ের সঙ্গে বাড়াবাড়ি রকম মিশে থাকা নিয়ে আমার একসময় অস্বস্তি ছিল, এখন সয়ে এসেছে। আমার যেটা অসুবিধে হয়েছে সেটা হচ্ছে গল্পটা বলায়। ভয়ানক জটিল প্লট আরও জটিল করে বলা। কে যে কাকে কখন শ্বাসকষ্ট দিচ্ছে (এই “ শ্বাসকষ্ট দেওয়া” শব্দবন্ধটা আমার কানে লেগেছে, এবং বলাই বাহুল্য, প্লটের প্রয়োজনে শব্দবন্ধটা বহুবার ব্যবহার করতে হয়েছে। আমি ভেবেওছি যে বেটার কী লেখা যেতে পারত, কিছু মাথায় আসেনি। কিন্তু কানে লাগাটাও কমেনি।) কে যে কোথায় ওষুধের পুরিয়া রেখে দিচ্ছে, কোন ভিকটিমের বাড়ির লোকের সঙ্গে  দীপকাকুর কী কথোপকথন হচ্ছে, রহস্য সমাধানে সে সব কথোপকথনের অবদান কী, আমার সব গুলিয়েমুলিয়ে একাকার। ইন ফ্যাক্ট, সব গল্প পড়া হয়ে গেলে এই গল্পটা আরেকবার পড়ার ইচ্ছে আছে। এবার যদি খানিকটা ধোঁয়াশা কাটে।


কঙ্কালতটের ভয়ংকর/রাজেশ বসু

পিসতুতো দাদা কাবুলের সঙ্গে দ্যুতি এসেছে পূর্ব নামিবিয়ার আটলান্টিক সমুদ্রের তটসীমা জুড়ে ছড়ানো নামিব মরুভূমিতে। সেখানে গুপ্তধন নিয়ে গোলযোগ। তার সঙ্গে রয়েছে লোভী মানুষ, হিংস্র সিংহ, কাঁকড়া বিছে, বিশ্বের প্রাচীনতম মরুভূমির অতি  প্রতিকূল জলবায়ু। সকলেই ভয়ংকর। কাজেই উপন্যাসের নামকরণ সার্থক। কিন্তু আমার মতে এদের সবার থেকে বেশি ভয়ংকর কাবুলদা স্বয়ং। আটত্রিশ পাতার (কোটি কোটি ফুল এবং হাফ পাতা বিজ্ঞাপন ধরে) উপন্যাসে কাবুলদা আমাদের যে সব বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছেন তার কয়েকটা নিচে দেওয়া হল। 

১। হরিণের সঙ্গে অ্যান্টিলোপের শিং-এর তফাৎ
২। নামিব মরুভূমিতে কুয়াশা জমার ভৌগোলিক ব্যাখ্যা
৩। নামিবিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস
৪। অ্যালবাট্রস এবং কোলরিজ
৫। গোল্ডেন মোল ছুঁচোর রং কেন গোল্ডেন
৬। অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট অন্তর্ধান রহস্য
৭। ফগ বিটলের জল খাওয়ার অভিনব পদ্ধতি
৮। সিল মাছ আর ব্ল্যাক ব্যাকড জ্যাকেলের মিথোজীবীত্ব
৯। অয়েলিটক্সিয়া গাছের নামকরণের ইতিহাস, সারা পৃথিবীর কোথায় কোথায় জন্মায়, জীবৎকাল
১০। ডুয়ারফ অ্যাডার কিংবা সাইড-ওয়ান্ডার স্নেক-এর নামকরণের ইতিহাস, চেহারা, ছোবলে বিষের পরিমাণ (এই তথ্যগুলো কাবুলদা দিলেন এই বিশেষ সাপটির কামড় খাওয়ার পর, ক্ষতস্থানে রুমাল বাঁধতে বাঁধতে)
১১। কুইভার ট্রি-র নামকরণের ইতিহাস, অ্যালোভেরার সঙ্গে মিল, এ গাছের ছাল আদিবাসীরা কীভাবে ব্যবহার করে
১২। জেব্রার রকমফের 
১৩। মাকালানি পামের শাঁস থেকে ফল তৈরি করার উপায়
১৪। হিম্বা উপজাতির ইতিহাস, জীবিকা, বসতসীমা, বিয়ে করার আগে আর পরে মাথা ঢাকা দেওয়া না দেওয়ার রীতি
১৫। ফেয়ারি সার্কল রহস্য
১৬। হোয়াইট রাইনোর নামকরণের ইতিহাস, প্রকারভেদ

আমার এ রকম একপিস দাদা থাকলে আমাদের যোগাযোগ থাকত না, এ আমি গ্যারান্টি দিতে পারি। 

ব্রতীনআঙ্কলের মৃত্যুরহস্য/জয়দীপ চক্রবর্তী 

পড়ারও আগে, শুধু নাম থেকেই ভাবনার খোরাক খুব কম গল্পই দিতে পারে। তাদের মধ্যে এই উপন্যাসটি পড়বে। নাম পড়ে সাধারণত লোকে গল্পের প্লট ইত্যাদি নিয়ে একটা আভাস পায়, আমি গল্পের চরিত্রদের নিয়েও খানিকটা পেয়েছিলাম। 

আমি ভেবেছিলাম আঙ্কল বলছে যখন চরিত্ররা নির্ঘাত লোরেটো/ অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চ/ প্র্যাট মেমোরিয়াল/ ক্যালকাটা বয়েজ বা গার্লস/ মডার্ন হাই। নিদেনপক্ষে সাউথ পয়েন্ট তো বটেই।

তারপর শুনি জগবন্ধু গার্লস। 

জগবন্ধু গার্লস থেকে পাস করা মেয়েরা আজকাল একে অপরের বাবাকে “আঙ্কল” ডাকছে জেনে ইস্তক আমার আক্কেল গুড়ুম। সেই সঙ্গে হাত পা কাঁপুনি ফাউ যখন জানলাম উক্ত আঙ্কল ছিলেন জগত্তারিণী বয়েজ স্কুলের মাস্টারমশাই। 

যাই হোক, নামকরণ ছেড়ে গল্পে ঢুকি। গল্পটা অ্যাকচুয়ালি ভালোই লেগেছে আমার। ব্রতীন আঙ্কল মারা গেছেন, তাঁর মেয়ে সন্দেহ করছে যে বাবার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। সন্দেহ নিরসনের জন্য মেয়ে নিজের বন্ধু ঝুলনকে, যে ইদানীং রহস্যসমাধানে নাম করেছে, ডাক পাঠায়। ঝুলন ও ঝুলনের সাকরেদ নোটন এসে রহস্য সমাধান করে।  ঝরঝরে ভাষা, তরতরিয়ে পড়া যায়। 

কিন্তু শুরুর হোঁচটটা কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারছি না। আঙ্কল কেন, কাকু কেন নয়? ব্রতীনআঙ্কলের বদলে ব্রতীনকাকুর মৃত্যুরহস্য নাম দিলে কি রোমাঞ্চ কম পড়ত? পাঠক হিসেবে আপনাদের মতামত জানান প্লিজ। 


August 11, 2017

আজকাল আমরা বাইরে কম খাই কেন



ট্যাক্স সিজন যাওয়ার পর আমাদের বাড়িতে এখন সেভিং সিজন চলছে। এমনি টাকা খরচ হলে অত গায়ে লাগে না, যত বুক হু হু ট্যাক্সের বেলায়। ট্যাক্স না দেওয়ার প্রশ্ন কিংবা সাহস কোনওটাই নেই, অগত্যা পড়ে থাকে একটিমাত্র বিকল্প। ট্যাক্স জমা দিয়ে শপথ নেওয়া, এবার থেকে খরচা কমাব। 

প্রতি বছরই শপথ নেওয়া হয়, প্রতি বছরই প্রথম ক’টা দিন খুব তেড়েফুঁড়ে সংযম প্র্যাকটিস হয়, তার পর আবার ঢিলেমো সেট ইন করে। এ বছর সেটা হতে দেওয়া চলবে না। আমরা কষে কোমর বেঁধেছি। মেথডিক্যালি এগোচ্ছি যতখানি সম্ভব। 

খরচ কমানোর প্রথম ধাপটা হচ্ছে খরচ কোথায় কোথায় কমানো সম্ভব তা চিহ্নিত করা। বা ঘুরিয়ে বললে, কোথায় বাজে খরচ হচ্ছে, নির্দয় হয়ে নিজেকে সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো।

বলাই বাহুল্য, বাজে খরচের সংজ্ঞা প্রতিটি মানুষের কাছে আলাদা। জাত, ধর্ম, প্রিয় খাবার, প্রিয় লেখক, কত কিছু দিয়ে মানুষ বিচারের বন্দোবস্ত আছে পৃথিবীতে, আমার মতে এদের সবার থেকে এফেক্টিভ বিচার হচ্ছে খরচের অভ্যেস। কে কোথায় খরচ কমায় বা কিপটেমো করে সেটা একটা ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার স্টাডি হতে পারে। আমি একজনকে চিনি যে প্রচণ্ড গরম কিংবা প্রচণ্ড শীতেও বাস ছেড়ে অটো চড়ে না। কারণ বাসের ভাড়া পাঁচ আর অটোর পঞ্চাশ। আর যদি বিনামূল্যে হেঁটে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকে তাহলে তো অটোও বাদ। অ্যাফর্ড করতে না পারার প্রশ্ন নেই, কারণ তার বাবা উইপ্রো কোম্পানির পাঁচজন বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে একজন। এর খরচের প্রায়োরিটি আলাদা। অটো চড়ে না, কিন্তু অম্লানবদনে হার্ভার্ডের এম পি এ ডিগ্রি নিজেকে গিফট করেছে। 

অফ কোর্স, এই আলোচনায় খরচ কমানোর চয়েসের কথা বলা হচ্ছে, বাধ্যতামূলক খরচের কথা বলা হচ্ছে না। না কমালেও চলে, তবু যেখানে কমানো। মানে আপনি খাওয়ার খরচ না কমালে ওষুধ কেনার টাকা বেরোবে না, কাজেই খাওয়ার খরচ কমাতে হবে, সে রকম খরচ কমানোর কথা হচ্ছে না। কারণ সেটা চয়েস-এর মধ্যে পড়ে না। এবং যদিও একজন আমাকে আশ্বস্ত করেছেন আচ্ছে দিন আসার পর ভারতবর্ষে এই রকমের চয়েস করার মতো গরিব আর কেউ নেই, অন্তত দিল্লি শহরে তিনি চোখে দেখেননি, আমি তাঁর কথা বিশ্বাস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। 
টাকা খরচে সংক্রান্ত আরেকটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, সকলের কাছেই তার তার নিজের টাকা খরচের কারণ ভয়ানক যুক্তিযুক্ত্‌, বাকিদেরটা জাস্ট অপচয়। আমি একজনের মাসে কসমেটিকস কেনার খরচ শুনে হাঁ করে থাকলে, সে-ও আমার বাইরে খাওয়ায় টাকা ওড়ানোর পরিমাণ দেখে চোখ কপালে তুলতে পারে। কিংবা গাছেদের জন্য অনলাইন সারযুক্ত মাটি কেনার সিদ্ধান্তে। আমি একজনকে চিনি, যিনি বেড়াতে গিয়ে টাকা খরচকে ধর্তব্যের মধ্যেই ধরেন না, অথচ বই কেনাকে ভীষণ তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন। বই কিনিয়েরাও জাজমেন্টে কিছু কম যান না, বলাই বাহুল্য। যিনি নন ফিকশন পড়েন তিনি ফিকশন পড়ে (এবং কিনে) কার কী মোক্ষলাভ হবে ভেবেই পান না, সাই ফাই বলেন গোয়েন্দা বই কেনার পুরো পয়সাটাই জলে, গোয়েন্দা বলেন কবিতার বই কিনে পয়সা নষ্ট করার কী দরকার, ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে ফেললেই ফ্রি-তে দেদার পড়া যায়, কবিতাপড়ুয়া (আমি অলমোস্ট শিওর, তিনি নিজে লেখেনও) বলেন, মাগো কফি টেবিল বই কিনে ঘর সাজায় কারা, তারা কি পাঠক না পাষণ্ড? 

এই প্রসঙ্গে বলি, আমাদের অফিসে একজন ছিলেন তিনি গল্পের বই পড়াকেই ভয়ানক জাজ করতেন। আমার ডেস্কে রাখা একটা গোয়েন্দা গল্পের বই দেখে উনি ঈদের চাঁদের মতো বাঁকা হেসে বলেছিলেন, কাম কে বাদ টাইম মিলতা হ্যায়? এই রকম বিপজ্জনক প্রশ্নের উত্তর স্বভাবতই আমি দিতে পারিনি, আমতা আমতা করছিলাম, ততক্ষণে উনি হাসতে হাসতে চলে গেলেন। 

যাই হোক, খরচ কমানো যখন স্থির হল তখন নিজেদের বাজে খরচের জায়গাগুলোও খুঁজে খুঁজে বার করতে হল। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম কঠিন হবে, কারণ সবার মতো আমরাও বিশ্বাস করি যে বাজে খরচ আমরা মোটে করিই না। সত্যিই, জামাকাপড়ের খরচ আমাদের খুবই কম, একজোড়া বাটার জুতো সব জামার সঙ্গে চলে যায়, বেড়াতে যাই, কিন্তু সেটাও যথাসম্ভব কম খরচেই করার চেষ্টা করি, সরকারি হোটেলে থাকি, চান্স পেলেই বাসে এবং ট্রেনে চড়ি। বেড়াতে গিয়ে খুচুরখাচুর এই স্কার্ফ, ওই ধূপদানি কিনি না। এ পাড়ায় যতখানি কম ভাড়ায় সম্ভব ততখানি কম ভাড়াতেই থাকি।

আমাদের সন্তুষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। খুঁজতে শুরু করতে না করতেই দেখলাম চারদিক থেকে অপচয়েরা ড্যাব ড্যাব করে তারা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

এক, খবরের কাগজ। আজকাল খবরের কাগজ পড়া হয় না। আমি ছেড়েছি বহু দিন, সময়ের অভাবে নয়, সুস্থ থাকার তাড়নায়, আর অর্চিষ্মান সারাদিন এত বিবিধ সূত্র থেকে খবর সংগ্রহ করে, এবং রূপে রসে গন্ধে প্রকাশভঙ্গিমায় সে সব সূত্রেরা a এতই বৈচিত্র্যময় যে শুকনো খসখসে খবরের কাগজের পক্ষে তাদের পক্ষে পাল্লা দেওয়া মুশকিল। একটাই রিটার্ন, ছ’মাস বাদে বাদে কাবাড়িভাইসাবের কাছ থেকে গোটা চল্লিশ টাকা আদায়।

দুই, বই কেনায় আমাদের একটা খরচ আছে, কিন্তু সেই খরচটা আমরা জরুরি হিসেবেই ধরি। কিছু কিছু বই ঝোঁকের মাথায় কেনা হয়, কিছু ওভারহাইপড প্রাইজ পাওয়া বই, সোশ্যাল মিডিয়ায় হাততালি পাওয়া বই ইত্যাদি। তবে আমি যেহেতু বিশ্বাস করি নিয়ম করে বাজে বই পড়া উচিত তাই সে খরচগুলোতেও বিশেষ আফসোস হয় না। আফসোস হয় অতৃপ্তি গ্যারান্টিড জেনেও বই কিনলে। যেমন পূজাবার্ষিকী। আগের সপ্তাহেই কিনেছি দু'খানা। ওই খরচগুলো স্রেফ সেন্টিমেন্টাল এবং বাজে। 

তিন, বই কেনার খরচ বাজে না হলেও, আমার খাতা কেনার খরচ সম্পূর্ণ বাজে। কারণ মন খারাপ হলেই (যেটা আমার মারাত্মক রকম ঘন ঘন হয়) আমি গিয়ে একটা ডায়রি বা নোটবুক কিনে আনি। যেন তাতে লিখতে শুরু করলে পুরোনো মনখারাপগুলো চলে যাবে। যায়ও, কিন্তু নতুনও আসে নিয়ম করে, তখন আবার আরেকটা নতুন খাতার খোঁজে বেরোতে হয়। দু’হাজার সতেরোতে আমি আর নতুন নোটখাতা কিনব না।

চার, আমি বেশ কিছু ইনডোর গাছ কিনেছি এবং তাদের কয়েকটাকে মেরেছি। সেটাকে বাজে খরচ বলতে আমার বাধছে, কারণ আমি তাদের বাঁচাতেই চেয়েছিলাম। তাছাড়া এই করতে গিয়ে খানিকটা শেখাও হয়েছে, কোন ইনডোর গাছগুলো সত্যি সত্যি ইনডোর আর কোনগুলো নামেই, আসলে তাদের ছ’ঘণ্টা রোদ লাগাতে হয় ইত্যাদি সম্পর্কে একটা আবছা ধারণা হয়েছে।

পাঁচ, কয়েকটা বাজে খরচ আমি অনেকসময় করে ফেলি উচ্চাশার বশবর্তী হয়ে। যেমন আমাদের মাইক্রোওয়েভ। গ্রিল, কনভেকশন আরও যতরকম হিজিবিজি থাকা সম্ভব সব ওতে আছে। আমার দোষ, আমি কেনার সময় ভেবেছিলাম যে শনিবার শনিবার কেক বানাব, রবিবার রবিবার সন্ধ্যেবেলায় আমাদের মাইক্রোওয়েভে ছাল ছাড়ানো কিউট চিকেন শূলবিদ্ধ হয়ে ঘুরবে বনবন। এখন খালি ঘোরে ডালের বাটি, সয়াবিনের ঝোল। অর্চিষ্মান সাবধান করেছিল, বলেছিল, এটা অবিকল ওই সিনড্রোম, যেটা কেব্‌ল লাইন নেওয়ার আগে হিস্ট্রি আর ডিসকভারি চ্যানেল ছাড়া কিছু না দেখার কনফিডেন্স দেয়, আর মাইক্রোওয়েভ কেনার আগে কেক পেস্ট্রি চিকেনমটনের বন্যা বওয়ার আশ্বাস। অর্চিষ্মান পাঁচশো পার সেন্ট ঠিক প্রমাণ হয়েছে, আমাদের টিভিতে খালি চলে সংগীত বাংলা আর মাইক্রোওয়েভে খালি গরম হয় ভাত ডাল আলুপোস্ত। সস্তা মডেল কিনলেও কিছু ক্ষতি হত না।

একটা সন্দেহ ছিলই, অর্চিষ্মানের ফোনের অ্যাপ সেটা নিশ্চিত করল, এগুলো সব খুচরো পাপ, আমাদের আসল খরচটা হয় বাইরে খাওয়া আর অফিস যাতায়াতে। ওলা উবার এসে অভ্যেস খারাপের চূড়ান্ত করেছে, মেট্রো চড়া মাথায় উঠেছে। অথচ মেট্রোয় খরচ কম, আরাম বেশি। তবু আমরা এখনও এই খরচটা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত রাখছি। অফিস জায়গাটা এত খারাপ লাগে, আসাযাওয়ার পথটা অন্তত একটু আরামের হোক।

অতএব কমানোর জন্য পড়ে আছে কেবল বাইরে খাওয়া। সে খরচে একেবারে কোপ মেরেছি বলব না, কিন্তু সেটা আমাদের স্ট্র্যাটেজিরই অংশ। একেবারে বন্ধ করলে রিবাউন্ডের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই আমরা এখনও ক্বচিৎ কদাচিৎ খাই, আগে থেকে একটা ভেবে রাখা খরচসীমা (আমাদের আগের খরচের, যেটাকে বাজেট বলতে বাধছে, কারণ সে খরচে বাজেটের বিন্দুমাত্র ছাপ ছিল না, অর্ধেক) কোনওমতেই টপকাই না। আর খেতে হলে সস্তা দোকানে খাই। কারণ আমরা ভেবে দেখেছি, আমাদের বাইরে খাওয়া যত না ‘খাওয়া’র প্রতি আসক্তিতে, তার থেকে বেশি বাড়ির বাইরে নিজেদের গল্প করার সুযোগ করে দেওয়ায়। সে গল্প নিভু নিভু মোমবাতিওয়ালা টেবিলের দুদিকে বসে বিরিয়ানি খেতে খেতে করলাম না মা তারায় রুটি তরকারি খেতে খেতে, তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ টেবিলের এপারে আমি সেই আমি, ওপারে অর্চিষ্মানও সেই অর্চিষ্মান, আর সত্যি বলতে কি আমাদের গল্পগুলোও সব চেনা।



August 07, 2017

তিনদিনের ছুটি + মেঘনাদ বধ রহস্য



কেমন আছেন? আমি ভালো আছি। শনিরবিসোম তিনদিন টানা ছুটি ছিল, তাই একটু বেশিই ভালো আছি। আই এস বি টি-তে গিয়ে ঝট করে একটা বাসে উঠে পড়ার জন্য ছুটিটা আদর্শ ছিল। অফিসে সবাই জিজ্ঞাসা করেছিল, উইকএন্ডে কী করবে, কোথায় যাবে। বলেছিলাম, বাড়িতেই থাকব, যাব না কোথাও। তাছাড়া একটা পোস্টও লিখতেই হবে। দ্বিতীয়টা অবশ্য মনে মনে বলেছিলাম, মুখে বলেছিলাম, "কিছুই করব না, জাস্ট চিল করব।"

শনিরবি এমনিতেই একগাদা কাজ থাকে, বাড়ি পরিষ্কার, কাবাড়ি ভাইসাবদের ডাকাডাকি, গাছে জল দেওয়া, ব্যাগের জিপ সারানো, ছেঁড়া চটি সেলাই। আনন্দ করার চান্স পাওয়াই শক্ত। ছোটবেলার শনিরবিবারগুলোয় বরং আনন্দ হত। এখনকার মতো খেতে যাওয়া কিংবা সিনেমা দেখতে যাওয়ার আনন্দ নয়, তখন আনন্দের অপশন বলতে ছিল শুধু আত্মীয়স্বজন। 

প্রায় প্রতি শনিবার যাওয়া হত জেঠুর বাড়ি। তখন জেঠুরা থাকত সোদপুরে। রিষড়া ঘাট থেকে ভটভটি চেপে গঙ্গা পেরিয়ে খড়দা, তারপর বাসটাস কিছু একটা চড়ে সোদপুর। ফোনটোন করে যাওয়ার কোনও ব্যাপারই নেই। যদি ওরা বাড়িতে না থাকে, কিংবা ব্যস্ত থাকে, কিংবা অন্য অতিথি থাকে, এই সব সন্দেহ কখনও হয়নি। তাছাড়া শনিবার জেঠুরাও মাঝেমাঝে গঙ্গা পেরিয়ে আমাদের বাড়ি আসত। খবর না দিয়ে চলেছি, হয়তো মাঝগঙ্গায় দুই ভটভটিতে দেখা হয়ে গেল, আমরাও ওদের বাড়ি যাচ্ছি, ওরাও আমাদের বাড়ি আসছে। এখন হলে ফোন না করে গেলে এইসব গোলযোগের একটা না একটা ঘটতই, কিন্তু তখন কিছুই ঘটেনি। দিব্যি খবরটবর না দিয়ে বিকেলবেলা যেতাম, গিয়ে মনা-টুনার সঙ্গে খেলে, জেঠির হাতের ডবল ডিমের অমলেট খেয়ে সন্ধ্যে পার করে ফিরে আসতাম। ফিরতে ফিরতে আটটা বেজে গেলে সে রাতের মতো আর পড়তে বসতে হত না। 

আরেক জায়গায় শনিরবিবার খুব ঘনঘন যাওয়া হত, সেটা মামাবাড়ি। সোদপুরের বদলে কসবা। যাওয়ার ঝঞ্ঝাট অনেক বেশি, ভটভটিতে হাওয়া খাওয়ার বদলে ট্রেন, মিনিবাসের গুঁতোগুঁতি। হাওড়া ব্রিজ পেরোনোর আড়াই মিনিট শুধু কসবা রথতলা মিনির সিকি জানালার ভেতর দিয়ে খানিকটা হাওয়া। তবু আমরা দেদার যেতাম। কারণ পথের কষ্টের ওপারে, সমস্ত আক্ষরিক এবং অনাক্ষরিক মোহমায়া নিয়ে মামাবাড়ি অপেক্ষা করে থাকত। সুমন-দোলনের সঙ্গে খেলা, ভূতের গল্প, মেজমামি-ছোটমামির হাতে ননস্টপ খাওয়া, ফেরার সময় আবার মিনিবাসের মৃত্যুযন্ত্রণা। হাওড়া ষ্টেশনে নেমে লিমকাটা তখন শখ নয়, প্রয়োজন। সে ট্রেন চলে গেলেও। বাড়ি ফিরতে ডেফিনিটলি দশটা বাজত, পড়তে বসার প্রশ্নই নেই। 

অর্চিষ্মানরাও নাকি খুব যেত মামাবাড়ি। গড়িয়া টু তেঘরিয়া। পঁয়তাল্লিশ নম্বর বাস, চলেছে তো চলেছেই। অনন্তকাল পর জানালা দিয়ে তাকিয়ে সবে শেয়ালদা! শনিবার সকালে মামাবাড়ি যাওয়ার স্ট্রাগলের গল্প করে করে আমাদের বেড়ানো পেয়ে গেল। বেড়ানোর একটা ছুতোও ছিল হাতের কাছেই,  'মেঘনাদ বধ রহস্য' চলছিল পি ভি আর নয়ডায়। গত দু’সপ্তাহ ধরেই চলছে, নয়ডা আর গুরুগ্রামের হলে। আমরা গত দু’সপ্তাহ ধরে ঘাপটি মেরে আছি, কখন এদিকে আসে আসে, কিন্তু দু’সপ্তাহ পরেও এল না দেখে পরিস্থিতি নিজেদের হাতে নিতে হল। এরপর চলে যাবে, আর দেখা হবে না। 

গুরুগ্রাম একটু দূর, কিন্তু নয়ডা অ্যাকচুয়ালি আমাদের বাড়ির কাছেই, মোটে বারো কিলোমিটার। প’নে সাতটায় শো। আমরা হাতে বেশি সময় নিয়ে সোয়া পাঁচটায় বেরোলাম। ভাগ্যিস বেরোলাম। প্রথমে জামিয়া মিলিয়ার সামনে, তারপর যমুনা ব্রিজে ওঠার মুখে, কী জ্যাম কী জ্যাম। আমরা ভেবেছিলাম গিয়ে, মলের ফুড কোর্টের পিটা পিট-এ খেয়ে হলে ঢুকব, মলের সামনে ওলা ব্রেক কষল যখন তখন কাঁটায় কাঁটায় প’নে সাতটা। তিনটে সিকিউরিটি পেরিয়ে, তিনবার পার্স খুলে দেখিয়ে, এসক্যালেটরের তিনটে করে সিঁড়ি লাফিয়ে কোনওমতে হল। তখনও হলের দরজা খোলেনি। পপকর্ন আর পেপসি নিলাম। খেতে খেতে চারদিকের বাঙালি মুখ জরিপ করলাম। আমরা বাকিদের করলাম, বাকিরা আমাদের করল। সবাইকেই চেনা চেনা লাগে, কাউকেই চিনি না। তারপর দরজা খুলে গেল, আমরা ঢুকে পড়লাম। কী দেখলাম, আপনাদের এবার ব্যাখ্যান করে বলব।

উৎস গুগল ইমেজেস

মেঘনাদ বধ রহস্যের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রফেসর অসীমাভ বসু (পি এইচ ডি)। ইংল্যান্ডে থাকেন, সফল প্রফেসর, সফল কল্পবিজ্ঞান লেখক। আর্থার সি ক্লার্ক প্রাইজ পাওয়া। ওঁর ‘বিগ বং থিওরি’ বইয়ের বাংলা অনুবাদের উন্মোচন হচ্ছে পার্ক স্ট্রিটের অক্সফোর্ড বুক শপে। সেখানে অসীমাভ বসু (সব্যসাচী চক্রবর্তী) আছেন, অসীমাভ বসুর বইয়ের তর্জমাকার সাংবাদিক এলিনা (সায়নী ঘোষ) আছেন, মঞ্চে বিশিষ্টদের মধ্যে শিবাজি বন্দ্যোপাধ্যায় একজন বিশিষ্ট ঘোষকের ভূমিকায় আছেন (এঁর চরিত্রের নাম সম্ভবত প্রবুদ্ধ)। দর্শকদের মধ্যে আছেন অসীমাভ বসুর দ্বিতীয় পক্ষের প্রায় কুড়ি বছরের ছোট স্ত্রী, বিখ্যাত নায়িকা রাণী (গার্গী রায়চৌধুরী) আর অংকবিদ এবং অংকনশিল্পী বন্ধুর ভূমিকায় (এঁর চরিত্রের নামও ভুলে গেছি) কল্যাণ রায়। এই সিনেই স্পষ্ট হয়ে যায় আগের পক্ষের ছেলে ঋকের (বিক্রম চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে বাবা অসীমাভ বোসের সম্পর্ক খুব একটা মসৃণ নয়। অসীমাভ বোসের একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানে সে অনুপস্থিত। এবং সেলিব্রিটি সৎ মা সে ব্যাপারটা মোটেই অ্যালাউ করতে রাজি নন। সৎ মায়ের ফোন পেয়ে ঋক অনুষ্ঠানে আসে। এখানে বসুপরিবারের আরেকটি চরিত্রের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়, সে হচ্ছে ধীমান, ডাকনাম সম্ভবত বুলু (অনিন্দ্য ব্যানার্জি)। অসীমাভর লতায়পাতায় ভাগ্নে, আদতে আশ্রিত এবং কলকাতার বাড়ির কেয়ারটেকার। (গোটা সিনেমায় এঁর অভিনয় আমার সবথেকে ভালো লেগেছে। সেই ওয়াই টু কে -তে ফোনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কথোপকথন শুনেই আমি এঁর ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম, এখনও পর্যন্ত ইনি আমাকে হতাশ করেননি।) এ ছাড়াও আরও কয়েকজন চরিত্রকে আমরা বুক লঞ্চে দেখি। রাণীর “উওম্যান ফ্রাইডে” জানকী (আমি এই শিল্পীর নাম জানি না, নেটে খুঁজে পেলাম না), রাণীর এন জি ও-তে গত দেড় বছর ধরে কাজ করছে। বাদল বিশ্বাস (কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়), সাই ফাই লিটল ম্যাগাজিনের জন্য অসীমাভ বসুর লেখা ধার করতে এসেছেন। এর পর আরও চরিত্ররা আসবে, রাণীর আগের পক্ষের মেয়ে গুলি, দুই পুলিস, এক্স পুলিস, এক্স নকশাল ইত্যাদি।

অবশেষে আসবেন, লাস্ট এবং মোটেই লিস্ট নন, রাণীর পুরোনো ছবির পরিচালক এবং বন্ধু কুণাল সেন (আবীর চট্টোপাধ্যায়)। আবীর ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে অর্চিষ্মানের পাশে বসা কিশোরীটি “আবীর! আবীর!” বলে সিটের ওপর যে রকম লাফালাফি শুরু করল, দেখলেও মন ভালো হয়ে যায়।

মেঘনাদ বধ রহস্যের রহস্যটা এক কথায় বলা একটু দুষ্কর, কারণ রহস্য বিবিধ। গোটা ফার্স্ট হাফ লেগেছে সে রহস্য ফাঁদতে। এক নম্বর রহস্য, কে বা কারা অসীমাভকে পোস্টে ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ বইটা পাঠায়। ইংল্যান্ডের ঠিকানায় একবার পাঠিয়েছে। দ্বিতীয়বারে কলকাতায়।

দু'নম্বর, সিনেমার বাকি চরিত্ররাও যথেষ্ট রহস্যময়। কল্যাণ রায় ভারি রহস্যভরে ফোনে কার সঙ্গে কথা বলেন। চাপা গলায় সব বন্দোবস্ত হয়ে গেছে কি না জানতে চান। এলিনা ফোনে অ্যাবিউসিভ বরের সঙ্গে ঝগড়া করে, আবার কার সঙ্গে প্রেমও করে। রকমসকম দেখে রাণী আর কুণাল সেনের সম্পর্কেও সন্দেহ করার মতো মালমশলা ভরপুর পাওয়া যায়। এরই মধ্যে অসীমাভ-র জন্মদিন পালন হয়, জন্মদিনের পরদিন সকালে উঠে দেখা যায় আরেকটা মেঘনাদ বধ কাব্য বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছে, এবার একেবারে পাতায় বুকমার্ক গুঁজে, একটা লাইন হাইলাইট করে। লাইনটা হচ্ছে ‘মারি অরি, পারি যে কৌশলে।’

এরই মধ্যে মধ্যে একটা দ্বিতীয় গল্প চলে, যে গল্পটা লিখছেন অসীমাভ স্বয়ং। গল্পের নাম "স্বীকারোক্তি", স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে একটি বিদ্রোহী ছেলে পুলিসের গুলিতে মারা যায়, আরেকজন জেল থেকে বেরিয়ে বিদেশ যায়। এর মধ্যে একবার শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পথে অসীমাভর গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট হয়, সন্দেহ হয় মার্ডার অ্যাটেম্পট না তো? দ্বিতীয় বার মেঘনাদ বধ কাব্য উপহার পাওয়ার পর অসীমাভর আচারব্যবহারেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। মাঝরাতে চিৎকার করে ঘুম ভেঙে উঠে বসেন, হঠাৎ করে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন ইত্যাদি। নানা ঘটনায় বোঝা যায় ভাগ্নে আর বাড়ির চাকরেরও অসীমাভর ওপর রাগ আছে।

সেকেন্ড হাফ শুরু হওয়ার খানিক পর আরেকটা রহস্যজনক ঘটনা ঘটে, এবং বোঝা যায় এতক্ষণ ফাঁদ পাতা চলছিল, এটাই আসলে কেন্দ্রীয় রহস্য। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রাণী আবিষ্কার করেন যে অসীমাভ বসু নিখোঁজ হয়ে গেছেন। 

তদন্ত শুরু হয় এবং রহস্য সমাধান হয়। 

সমাধান হয় কি না সে নিয়ে অবশ্য মতান্তর আছে, আমার চেনা যারা সিনেমাটা দেখেছে তাদের অর্ধেকের মতে সমাধান হয়নি, অর্ধেকের মতে হয়েছে। আমি নিজে একরকম 'হয়েছে'-র দলেই আছি। সমাধান আরেকটু স্পষ্ট হলেও অসুবিধে ছিল না, কিন্তু যা হয়েছে তাও মেনে নেওয়া যায়, কারণ এই ধোঁয়া ধোঁয়া সমাধানটাই সিনেমাটার সবথেকে বড় সমস্যা নয়, এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ গোলযোগ সিনেমাটায় আছে। 

প্রথমে প্রশংসার জায়গাটা সেরে নিই। বিজ্ঞাপনের লোক বলেই হয়তো, অনীক দত্তর সিনেমা দেখলে একটা ফিল গুড অনুভূতি হয়। পুজোর শালিমারের অ্যাড দেখার মতো। যদিও গল্পের মধ্যে সাবস্ট্যান্স অ্যাবিউজ, দুরারোগ্য ব্যাধি, পুরোনো পাপের কামড় ইত্যাদি প্রচুর ফিল ব্যাড ব্যাপার আছে, কিন্তু সিনেমাটা দেখতে দেখতে আপনাকে সেগুলো বেশি জ্বালাবে না। মানে যখন ইংরেজের পুলিস গুলি করে স্বাধীনতা সংগ্রামীকে মারছে, তখনও করুণ রসের থেকে ব্যাকগ্রাউন্ডের পুরোনো জমিদারবাড়ি ভাঙাচোরা পোড়া থাম আপনার মনে সশ্রদ্ধ বিস্ময় জাগাবে বেশি। পুরোনো পাপে দগ্ধ হওয়া লোকগুলোর জ্বলুনি থেকে পিছলে পিছলে চোখ কেবলই চলে যাবে বাড়ির অপরূপ অন্দরসজ্জায়। দেওয়ালের অরিজিন্যাল পেনটিং আর হলের পিয়ানোয়। অন্তত আমার যাচ্ছিল। তাছাড়া, পার্ক স্ট্রিট, অক্সফোর্ড বুক স্টল, শান্তিনিকেতন, লন্ডনের প্রফেসর, বাড়িতে পিয়ানো ইত্যাদি শহুরে বাঙালিয়ানার ওয়ার্ম ফাজি ফিলিং তো আছেই। তাতেও মুগ্ধতা কম পড়লে বাঁচাতে আসবে আলুপোস্ত আর অথেনটিক আওয়াধি বিরিয়ানির আলু। বিরিয়ানির আলুতেও কোনও বাঙালি বোল্ড আউট না হলে তার বাঙালিত্বের অথেনটিসিটি পরীক্ষা করানোর দরকার।

ভালো লাগানোর জন্য এত কিছু থাকা সত্ত্বেও মেঘনাদ বধ রহস্য আমার ভালো লাগেনি। কেন লাগেনি তার কারণ নিচে বলার চেষ্টা করছি। 

এক, লেখার ক্ষেত্রে একটা জিনিসে নাকি এজেন্টরা খুব দাম দেন, সেটা হচ্ছে ‘ভয়েস’। বাই লাইন না দেখেই যদি কারও লেখা পড়ে চিনতে পারা যায় সেটা সাধারণত একটা গুণ বলেই বিচার্য হয়। মুশকিল হচ্ছে যে উল্টোটাও সময় সময় ঘটতে পারে। যখন একেকজনের মুদ্রাদোষ তাঁদের সৃষ্টিকে চিনিয়ে দিতে শুরু করে। 

অনীক দত্তর মুদ্রাদোষ, শব্দ দেখলে তিনি নিজেকে সামলাতে পারেন না। এলিনা দেখলে সেটাকে এলি না-র সঙ্গে না মিলিয়ে থাকতে পারেন না, জানকী শুনলেই সেটাকে 'জান কি?' ওয়ালা সেন্টেন্সের পাশে বসাতে ইচ্ছে করে, একজিবিশন শুনলেই রিফ্লেক্সে মুখ থেকে 'ইস-কী-ভীষণ' বেরিয়ে আসে। অংক আর অংকনকে পাশাপাশি বসানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ আর যে-ই ছাড়ুন, অনীক দত্ত ছাড়বেন না। মেঘনাদ বধ রহস্যের ছত্রে ছত্রে এই শব্দের বীভৎস খেলা। গুচ্ছ গুচ্ছ পান। এমনকি এমন সন্দেহও আমার হয়েছে যে এই খেলাটা খেলবেন বলে উনি নিজেকে সুযোগ করে দিয়েছেন কি না। ঋকের ব্যান্ডের নাম “মাটি” দেওয়া কি শুধু “মা মাটি মানুষ” সংক্রান্ত পচা রসিকতাটা করবেন বলে?

অসীমাভর সঙ্গে আসিমভ-এর মিল তো ছেড়েই দিলাম, অসীমাভর বাঁহাতি ডানহাতিপনা নিয়ে “সব্যসাচী” রসিকতাও বাদ পড়েনি। আর আছে আলুপোস্তর জন্মরহস্য, কলকাতা বিরিয়ানির আলু। আর কলকাতা বিরিয়ানির কথা উঠেছে এবং ওয়াজেদ আলি শাহ বেচারা বাদ পড়েছেন, এ ঘটনা আমি আমার জন্মে দেখিনি। মেঘনাদ বধ রহস্যও ব্যতিক্রম নয়।

বাঙালির মুগ্ধতায় ইন্ধন জোগানোর আরও একটা শিওর শট উপায় পরিচালক ব্যবহার করতে ভোলেননি, তা হল দলে দলে বুদ্ধিজীবী লেলিয়ে দেওয়া। শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা তো বললামই, বুক রিলিজের দৃশ্যে নাকি মৈত্রীশ ঘটকও ছিলেন। তাছাড়া এক্সিজিবিশনের উদ্বোধনের সময় সব্যসাচী আর কল্যাণ রায়ের মাঝখানে একজন ফাঁদে পড়া পাখির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন, উনি নির্ঘাত নামকরা কোনও শিল্পী, শিল্পীদের সম্পর্কে আমার জ্ঞান ক অক্ষর গোমাংস বলে আমি তাঁকে চিনতে পারিনি। সবাই খুব "গণেশদা" "গণেশদা" করছিলেন। যাঁদের ডেট পাওয়া যায়নি, যেমন অমর্ত্য সেন, তাঁদের স্পিরিট ক্যাপচার করতে পরিচালক ভোলেননি। সব্যসাচীকে দিয়ে আড়াই প্যাঁচ প্যাডল করিয়েছেন স্রেফ শান্তিনিকেতন + অমর্ত্য সেন + সাইকেলের রোম্যানটিকতা বাঙালিকে আরেকবার মনে করিয়ে দেবেন বলে।
  
এত রেফারেন্স আর রসিকতা গোঁজার বিপদ হচ্ছে, কখনওই নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না যে সবাই সব বুঝল কি না। না বুঝলে এত পরিশ্রম মাটি। কাজেই বলে বুঝিয়ে দিতে হয়। এই বলে বোঝানোটা শুধু রসিকতা বা রেফারেন্সেই আটকে থাকেনি, প্লটেও বিস্তৃত হয়েছে। গোটা সিনেমা দেখার পর যদি রামায়ণের মেঘনাদ বধের সঙ্গে বর্তমান রহস্যের মিল কারও চোখে না পড়ে তাহলে তাঁকে “ক্ষুর দু’খানা বাড়ান, স্যার” ছাড়া আর কিছু বলার থাকে না, অথচ শেষের দিকের একটা দৃশ্যে আমরা দেখি দুজন চরিত্র গৌতম হালদারের "মেঘনাদ বধ কাব্য" নাটকটা দেখছেন এবং ঝুঁকে পড়ে কানে কানে সঙ্গীকে বলছেন, “কী রকম মিল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না?”

যাই হোক, এসব পরিচালকের ব্যক্তিগত পছন্দঅপছন্দের ব্যাপার। এগুলো বাদ দিয়ে অন্য অসুবিধেগুলোয় আসা যাক, যেগুলো রহস্য সম্পর্কিত। সিনেমা না হয়ে মেঘনাদ বধ রহস্য যদি একটা উপন্যাস হত, তার জন্যও এই অসুবিধেগুলো খেটে যেত।

অসুবিধে বললাম বটে, কিন্তু শুরু করব একটা সুবিধে দিয়েই। সিনেমার গোড়া থেকে ক্রিস্টি ঘরানা অনুসরণ করে প্রচুর চরিত্র আনা হয়েছে, প্রতিটি চরিত্রকে বেশ যত্ন করে এঁকেছেন পরিচালক, তাতে সবার মোটিভটোটিভগুলো, পারস্পরিক সম্পর্কের চলনগমনগুলো বেশ স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে ফুটে ঊঠেছে। এই পর্বে মূলত দুটো গোলমাল ঘটেছে বলে আমার বিশ্বাস।  

এক, অন্য মোটিভগুলোর তুলনায় একটা মোটিভকে অত্যন্ত বেশি ফুটেজ দেওয়া হয়ে গেছে। ডাকে বই আসা, অসীমাভর নতুন গল্পের প্লটে স্বাধীনতা সংগ্রামে দুই বন্ধুর দুই নিয়তি, ফার্স্ট সিন থেকে অসীমাভর নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে থাকার উল্লেখ এবং নিজের জীবনের সেই দিকটিতে কোনওমতেই আলো ফেলতে না দেওয়ার চেষ্টা, সর্বোপরি বর্তমানে লিখতে থাকা উপন্যাসের নাম "স্বীকারোক্তি" সব মিলিয়ে বাকি সব মোটিভের থেকে এই মোটিভটি যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা ভীষণ রকম স্পষ্ট হয়ে গেছে। এর পর মোটে দুটো জিনিসই ঘটতে পারত। এক, দর্শকের আন্দাজকে সঠিক প্রমাণিত করে বাকি মোটিভদের ভাঁওতা প্রমাণিত করে এটিকেই সেরার মুকুট পরানো যেত, দুই, পেছনের সারির একটা মোটিভকে সামনে তুলে এনে এই মোটিভটাকে ভাঁওতা প্রমাণিত করে দর্শকদের চরম বোকা বানানো যেত। কোনটা হয়েছে আন্দাজ করার জন্য হাততালি নেই।

খেলিয়ে সাসপেক্ট আর মোটিভের মেলা সাজাতে গিয়ে দ্বিতীয় যে অসুবিধেটা হয়েছে সেটা হয়েছে সময় নষ্ট। গোটা প্রথমার্ধ এবং দ্বিতীয়ার্ধেরও সামান্য অংশ তার বাঁধতে খরচ করেছেন পরিচালক। তারপর অসীমাভ উধাও হয়েছেন, পুলিস এসেছে।

পুলিসের আসা নিয়েও আমার বক্তব্য আছে, কিন্তু তার আগে একটা অন্য কথা বলে নিই। আজকাল বাংলা গোয়েন্দা সিনেমায় পুলিসদের একটা ছাঁচ চলছে খুব, যেখানে অধস্তন অনবরত ভুল ইংরিজি বলেন আর ঊর্ধ্বতন অফিসার একেবারে পি কে দে সরকার গুলে খেয়েছেন। মেঘনাদ বধ-এও সেই ব্যাপার। যাই হোক, প্রথমটা আমার তাঁদের দেখে বেশ ভরসা হয়েছিল, দিব্যি মধ্যবিত্ত বাবাকাকাদের মতো চেহারা, করলে এঁরাই করলে কিছু করে উঠতে পারবেন, ওই সব ফ্যান্সি বুদ্ধিজীবী দ্বারা আর যাই হোক রহস্যদ্ধার হবে না, এ আশ্বাস আমার ছিল। 

কিন্তু তাঁরা কিছুই করলেন না। কয়েকটা জেরা করলেন, একটা অ্যালিবাইয়ের গোলমাল বার করলেন, তারপর মিটিং ডেকে তাঁদের "নিষ্কর্মা" গালি দিয়ে হাত থেকে কেস কেড়ে নিয়ে সি বি আই-কে দিয়ে দেওয়া হল। সে মিটিং-এ রিপ্রেজেন্টেশনের খুঁত কেউ ধরতে পারবে না। তিন বিগ বস পুলিসের একজন বাঙালি, একজন পাঞ্জাবী, আরেকজন মেয়ে।

এত কম ফুটেজ দিয়ে পুলিসকে আদৌ আনা হল কেন সেটা একটা রহস্য, আবার রহস্য নয়ও। কারণ পুলিস না আসলে ব্যাপারটা একটুও রিয়্যালিস্টিক হত না। ইদানীং অনেক বিশেষজ্ঞই বলেন, আজকাল রহস্য গল্পে এত যে পুলিস প্রসিডিওর‍্যালের বাজার যে তেজী হয়েছে তার একটা কারণ, সেকেলে গোয়েন্দা গল্পে যে দেখায় প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর সবাইকে জেরা করে বেড়াচ্ছে আর সবাই সুড়সুড় করে সব স্বীকার করে ফেলছে, বাস্তবে সেটা হয় না। আর মেঘনাদ বধে তো প্রাইভেট গোয়েন্দাও নেই, আছে শুধু প্রাইভেট নাগরিক। কাজেই জেরা এবং অ্যালিবাই চেকের জন্য পুলিসকে আসতেই হত।

এতক্ষণ ধরে রহস্য ফাঁদার তিন নম্বর অসুবিধেটা উন্মোচিত হল এই জেরার সময়। বেশিরভাগ গল্পের গোড়াতেই কেন খুনখারাপি ঘটে এবং তার পর বাকিটা সেটার একটা হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম। আগে খুনখারাপি হওয়ার সুবিধে হচ্ছে জেরাটেরার মাধ্যমে মোটিভ অপরচুনিটি প্রকাশ করা যায়। এখানে ঠিক উল্টো হয়েছে। মোটিভ অপরচুনিটি সবই দর্শক জানে, পুলিস জানে না, জেরা করে জানছে। দর্শকও জানছে দ্বিতীয়বার করে এবং বোরের হদ্দ হচ্ছে। ওই জেরায় এমন একটিও তথ্য আবিষ্কার হয়নি, যা আমরা আগের দেড়ঘণ্টা ধরে না দেখেছি।  

আমার মতে মেঘনাদ বধ রহস্যের সবথেকে দুর্বল জায়গা অবশ্য এগুলোর একটাও নয়। সেটা হল ডিটেকটিভ গল্পে ডিটেকশনের অনুপস্থিতি। আমার একজন চেনা, গোয়েন্দাগল্পের সঙ্গে যাঁর দূরদূরান্তের গা ঘেঁষাঘেঁষি নেই, সিনেমাটা দেখে এসে একটা কথা বলেছেন যেটার দেশকালভেদে গোয়েন্দাগল্প রচয়িতাদের টেক্সটবুকে জায়গা পাওয়া দরকার। সেটা হচ্ছে, “ছাড়ানোর যদি দায় না থাকে তাহলে জট পাকাতে আর কষ্ট কী?”

এই সমস্যাটা মেঘনাদ বধ রহস্যের ভীষণ বেশি। প্যাসেঞ্জার লিস্ট দেখে একটা অ্যালিবাই বার করা ছাড়া আর কোনও রহস্যজনক ব্যবহারেরই কোনওরকম যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা কেউ “ডিটেক্ট” করে বার করার চেষ্টা করেনি। (এবং সেই অ্যালিবাই ভাঙার পরেও উক্ত সন্দেহভাজনের সঙ্গে পুলিসের কোনও মোলাকাত হল না।) দুয়েকজন সন্দেহভাজন সেকেন্ড হাফে গড়গড় করে নিজেদের সন্দেহজনক আচরণের কারণ বলে দিল, এক লাইনে, তাও আবার পুলিসের কাছে নয়, নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায়। তাতে ব্যাপারটা যা দাঁড়াল, সেটা হল যে ফার্স্ট হাফে কিছু তথ্য আমরা জানতাম না, সেকেন্ড হাফের শেষদিকে সেই সব তথ্যগুলো জানলাম। মাঝখানে কোনও ক্লু নেই, ক্লু ধরে ধরে সমাধানে পৌঁছনো নেই। এ রকম দুষ্কৃতী ধরে মজা কীসের?

লাস্টে আরেকটা কথা বলব। সব গল্পেই, বিশেষ করে গোয়েন্দাগল্পে ফোরশ্যাডোয়িং বলে একটা মারাত্মক জরুরি ব্যাপার থাকে। এই যে আমি এখন টাইপ করছি, ব্যাকগ্রাউন্ডে 'দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস'-এর বিবিসি অ্যাডাপটেশন চলছে, সেখানে আর্থার হেস্টিংস খুব গলা কাঁপিয়ে বলছেন, “But as the summerstorm drew nearer, I felt a strange premonition of evil. Of some fate that is to break in on us and change Styles Court for ever.

ফোরশ্যাডোয়িং এই সিনেমায় ভরপুর আছে। কিন্তু ফোরশ্যাডোইয়িং-এর একটা আবশ্যিক শর্ত হল ডেলিভারি। আপনি পাঁচবার বাঘ বাঘ বলে চেঁচালে একবার না একবার পালে বাঘ পড়তেই হবে। মেঘনাদ বধ রহস্যে অন্তত তিন থেকে চার বার এই রকম বাঘ বাঘ চেঁচানো হয়েছে। পাতাভর্তি ঘুমের ওষুধের পাতা ধরে লোকজন গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে, হাত থেকে মদের গ্লাস, জলের কাপ পড়ে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, ক্লোজ আপে অবশ হাত, প্রিয়জন ঘরে ঢুকে নাম ধরে ডাকছেন, গলায় আতংক, দর্শকেরা টান টান, এমন সময় হাত নড়ে উঠল, হাতের মালিক চোখ খুলে বললেন, এই একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এটা একদু’বার ভালো লাগে, তিনবারের বার ধুত্তেরি বলে উঠে পড়তে ইচ্ছে হয়। মনে হয়, যা হয় হোক, আমার কিছু যায় আসে না।

আপনারা কেউ মেঘনাদ বধ রহস্য দেখলেন নাকি? কেমন লাগল?


July 29, 2017

মশাদের বুদ্ধি



মানুষের যেরকম ধাপে ধাপে লাফে লাফে অগ্রগতি হচ্ছে, বাকি পশুপাখিদেরও সেরকম হচ্ছে কি না, না হলে কেন হচ্ছে না, এসব নিয়ে কৌতূহল আমার অনেক দিনের। আপাতদৃষ্টিতে দেখে তো মনে হয় ওঁরা যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন। হ্যাঁ, হয়তো সাইজে আরেকটু বড় ছিলেন, কিংবা গায়ে লোম একটু বেশি ছিল, কিন্তু সে সব গৌণ বদল। আমি সে সব বদলের কথা বলছি না। সে রকম বদল তো আমাদেরও হয়েছে, কাঁধ সোজা হয়েছে, চোয়াল ঢুকে গেছে - আমি বলছি বড় বড় পরিবর্তনের কথা। আমাদের ইতিহাস বইতে যেমন আগুন জ্বালাতে শেখা, চাকা আবিষ্কার, কৃষিকর্ম ইত্যাদি চ্যাপ্টার আছে, বাঘসিংহের বইতেও কি আছে সেরকম? মনে তো হয় না। কেন নেই? নিজেদের বুদ্ধিতে না কুলোক, ওঁদের নাকের ডগায় যখন আমরা আগুন জ্বালাতে শিখলাম, তখন আমাদের টুকে ওঁরা শিখলেন না কেন, এইটা আমার আরও অদ্ভুত, আরও অবিশ্বাস্য লাগে। (এত অবিশ্বাস্য যে মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো ওঁরা জানেন সবই, আমরা জানতে পারছি না। এখনও তো সব বন কেটে সাফ করতে পারিনি, হয়তো সেই বনের মধ্যে বাঘেদের অফিস আছে, অফিসে ওয়াইফাই, হয়তো আমাদের থেকে বহুগুণ দ্রুততর, বাফারিং বলে কোনও বস্তু নেই, ডাউনলোড হয় চক্ষের নিমেষে। অবশ্য বাঘেদের অগ্রগতি আমাদের থেকে সম্পূর্ণ অন্যরকম কিছু হয়েছে সেটাও হতে পারে। ফাস্ট ইন্টারনেট কানেকশন যে সভ্যতার একমাত্র শর্ত নয় (অনেকক্ষেত্রে পরিপন্থী) সেটা নিয়ে আমার আবার কোনও সংশয়ই নেই।)

আমরা জামা পরতে শিখলাম, খুলতে শিখলাম, রাঁধতে শিখলাম, রান্না ভুলে হোম ডেলিভারি ধরলাম, ভাষা শিখলাম, এখন ভোলার জন্য প্রাণপাত করছি, অথচ বাঘমামা সেই হরিণ মেরে খাচ্ছিলেন, সেই খেয়েই যাচ্ছেন, ব্যাঙেরা সেই গ্যাঙর গ্যাং ডাকছিল, এখনও ডেকে যাচ্ছে। 

এবং গলা ছেড়ে ডাকছে। প্রতিদিন ফোনে মায়ের গলা ছাপিয়ে তাদের ডাক শুনতে পাই। বর্ষাকালে যেমন বৃষ্টি হওয়া উচিত তেমনই তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি হচ্ছে রিষড়ায়। কুয়োতলা গোড়ালিডোবা পুকুর, বাগানে ফলন্ত কলাগাছ গোড়া নরম হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। আরও আফসোস যে আগের দিনই আরতিমাসি মাকে বলেছিল, “দুটো ডাণ্ডা কাটাকুটি করে এইবেলা ঠ্যাকনা দিন বৌদি”, আর পরদিন মা সকালে উঠে দেখেন কাঁদি কাঁদি কলাশুদ্ধু গাছ শুয়ে রয়েছে। "মানুষের মৃতদেহ দেখার মতোই কষ্ট হয় প্রায় দেখলে, জানিস সোনা।" শোকে মা দু’সেকেন্ডের নীরবতা পালন করছিলেন আর অমনি ফাঁক দিয়ে আগের থেকে দ্বিগুণ জোরে গ্যাঙর গ্যাং শোনা গেল। রীতিমত ভয় লাগে শুনলে। আপসে মুখ থেকে "বাবাগো" বেরিয়ে যায়। 

বিশেষ করে অভ্যেস চলে যাওয়ার পর। বর্ষাকালে যে ব্যাঙ ডাকে ভুলেই গেছিলাম, প্রথমে ভেবেছিলাম মেঘ ডাকছে। দুঃখ দুঃখ গলায় মাকে বলেওছিলাম, "ইস তোমাদের কী মজা, বর্ষাকালে কেমন সুন্দর মেঘ ডাকে।" মা বললেন, ওটা মেঘ না, ব্যাঙ। মেঘও ডাকছে, তবে ঢের আস্তে। ফোনের ভেতর দিয়ে সে আওয়াজ আমার কান পর্যন্ত পৌঁছনোর মতো নয়। 

আমি অভিভূত হয়ে ব্যাঙের ডাক শুনতে লাগলাম আর আবার ওই কৌতূহলটা মাথা তুলল। আমরা এগোলাম, ওরা থেমে রইল কেন। যার গলায় এত জোর, সে গ্যাঙর গ্যাং ছেড়ে এগোতে পারল না?  

বলা বাহুল্য, আমার কৌতূহল নেচার-এ চিঠি লিখে উত্তর খোঁজার বা মিনিমাম গুগল করার মতোও জোরদার নয়। আমার কৌতূহল বাকি সব কৌতূহলের মতোই, অলস টাইমপাসের। তাছাড়া গুগলটুগলের থেকে যার উত্তর আমার পছন্দসই (এবং বিশ্বাসযোগ্যও) হবে অনেক বেশি, আমি তাকেই আমার সংশয়টা খুলে বললাম। 

"মানুষের বুদ্ধি বাড়ল, ব্যাঙেদের বুদ্ধি বাড়ল না কেন গো মা? কিংবা বাঘেদের? বাকিরা মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বুদ্ধিমান হল না কেন?"

আমাকে এবং আমার সব কথাকেই মা মারাত্মক সিরিয়াসলি নেন (অনেকে বলে আরেকটু কম নিলে দুজনের পক্ষেই মঙ্গল হত) এই শখের কৌতূহলকেও দূরছাই করলেন না। “সত্যি তো সোনা, কেন হল না?” মা ভাবতে লাগলেন, আমি এদিক থেকে ব্যাঙেদের ডাক শুনতে লাগলাম। 

হঠাৎ মা বললেন, “উঃ, মাগো।”

আমি আতংকিত হয়ে বললাম, “কী হল কী হল?”  

মা বললেন, “হচ্ছে হচ্ছে সোনা, মশারা বুদ্ধিমান হচ্ছে লাফিয়ে লাফিয়ে।”

পাটুলি আর রিষড়ার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে বন্ধুত্বপূর্ণ তরজা হয়, তাতে রিষড়া সর্বদা হারে। জেতার কোনও চান্সই নেই। পাটুলি আলো করে আছেন আশাপূর্ণা দেবী, আলি আকবর, বুদ্ধদেব বসু আর রিষড়ায় টিমটিম করছেন বিশে ডাকাত, ফেলু ময়রা, আর অন্তর্ধানের আগে নেতাজীর একটি রাত। অনেক হাতড়ে আরেকজন বেরোন, তুরুপের তাসের মতো আমি তাঁকে টেবিলের ওপর ফেলি। শিশির ঘোষ। অমনি পাটুলির ঝুলি থেকে কৃশানু দে বেঁকা হাসি হাসতে হাসতে বেরোন। আমি পুনর্মূষিক অধোবদন। 

কেবল একটা ব্যাপারে আজ পর্যন্ত প্রতি যুদ্ধে পাটুলি হার মেনেছে, সেটা হচ্ছে মশা। প্রতিবার প্রসঙ্গ উঠলেই পাটুলি সসম্মানে পশ্চাদপসরণ করে। "তোমাদের বাড়ির মশা, সিরিয়াসলি..."

মশারা বোকা এ অবশ্য আমার কোনওদিনও মনে হয়নি। অন্তত রিষড়ার মশারা। রিষড়ার মশারা চিরকালই বুদ্ধিমান ছিল, তবে সাইজে বড় হয়েছে, সংখ্যায়ও বেড়েছে অনেক। সেটা আমি এখন গিয়েও টের পাই। পৌরসভা উন্নয়ন খাতে একান্ন কোটি টাকা এসেছিল নাকি, খুব ঢাকঢোল পেটানো হয়েছিল, কাজের ধুম পড়েছিল। রাস্তার দুপাশে ঝটপট মোটা মোটা নর্দমা কাটা হল, তারপর টাকা ফুরিয়ে গেল। ঢাকনা লাগানোর পরিকল্পনা ছিল কি না জানি না, টাকা ফুরিয়ে গেল বলে ঢাকনা লাগানো গেল না, না কি পরিকল্পনাই ছিল না, সে সব জানা যায়নি, শুধু দেখা যাচ্ছে নর্দমাগুলো এখন মশা তৈরির কারখানা। 

আধুনিক মশাদের বুদ্ধিও নাকি বেড়েছে। অন্তত মা সেই রকমই দাবি করলেন। বললেন, তাঁর ছোটবেলায় মশারা যেখানে পেত সেখানেই কামড়াত, এবং চাপড় খেয়ে মরত। এখনকার মশারা অনেক স্ট্র্যাটেজিক। এই যে মোবাইলে আমার সঙ্গে কথা বলছেন, মশাগুলো নাকি কামড়াচ্ছে ঠিক কানের কাছে ফোন ধরে থাকা আঙুলের গাঁটে। আর কোথাও না। ভোরবেলা গ্যাস জ্বালিয়ে চা করার সময়, শাড়ির পাড়ের নিচে যেটুকু পায়ের পাতা বেরিয়ে থাকে, শুধু সেখানে কামড়ায়। গ্যসের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত লেফট-রাইট করে না গেলে রক্ষা নেই। যখন সাঁড়াশি ধরে বাটি থেকে কাপের ওপর রাখা ছাঁকনিতে চা ঢালেন তখন পা ছেড়ে এসে হাত আক্রমণ করে। তবে মশাদের ফেভারিট কামড়ানোর সময় এগুলোর কোনওটাই নয়। মশারা বুঝে ফেলেছে, একজন মানুষের সবথেকে নিরস্ত্র, অসহায় সময় কোনটা। ভুজঙ্গাসনে থাকা অবস্থায় কেউ মশা মারার অ্যাটেম্পট পর্যন্ত করেছে, এ জিনিস শোনা যায়নি। আমার মা ঠেকে শিখেছেন, এখন ব্যায়ামট্যায়াম সব মশারির ভেতরে করেন। ঘুম ভেঙে দাঁত মেজে এসে যখন আবার মশারির ভেতরে ঢোকার উপক্রম করেন, তখন নাকি বাড়ির সব মশা, “মিনিমাম দেড় হাজার”, ম্যাট্রেস আর মশারির সংযোগস্থলে এসে লাইন দিয়ে বিনবিন করতে থাকে। এক ইঞ্চি ওপরে না, নিচে না, ডাইনে না বাঁয়ে না। সে যেন ঠিক পাঁচটা চল্লিশ ঢোকার মুখে হাওড়া স্টেশন আর সে বিনবিনানি নাকি ব্যাঙের ডাক কেন, পনেরোই অগস্টের আকাশে মিলিটারি প্লেনের প্যারেডের গর্জনের থেকে হাজারগুণ ভয়ংকর। 


July 24, 2017

ম্যাগপাই মার্ডারস



উৎস গুগল ইমেজেস

লন্ডনের মাঝারি প্রকাশনা সংস্থা ক্লোভারলিফ পাবলিশিং। সংস্থার কর্ণধার চার্লস ক্লোভার। সুসান রাইল্যান্ড সংস্থার এডিটর এবং চার্লস ক্লোভারের ডানহাত। ক্লোভারলিফ এবং সুসান রাইল্যান্ডের পোর্টফোলিও-র সবথেকে বড় কুমীরছানা, রহস্যলেখক অ্যাল্যান কনওয়ে। কনওয়ে আগাথা ক্রিস্টি, ডরোথি সেয়ার্স ঘরানার চ্যাম্পিয়ন লেখক এবং কনওয়ের গোয়েন্দা অ্যাটিকাস পিউন্ড, পোয়্যারোর সার্থক উত্তরাধিকারী।  

পিউন্ড সিরিজের আটটা উপন্যাস সাফল্যের সব রেকর্ড ভেঙেছে। নবম এবং সিরিজের শেষ উপন্যাস ‘ম্যাগপাই মার্ডারস’-এর পাণ্ডুলিপি এসে পৌঁছেছে ক্লোভারলিফের অফিসে, অফিস থেকে রাইল্যান্ডের হাতে। রাইল্যান্ড পড়তে শুরু করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও। 

উনিশশো পঞ্চান্ন। স্যাক্সবি অন অ্যাভন ছোট্ট ঘুমন্ত গ্রামে পরপর দুটো মৃত্যু ঘটে। প্রথম মারা যান মেরি ব্ল্যাকিস্টন নামের একজন গৃহপরিচারিকা। গ্রামের সবথেকে বড়লোক স্যার ম্যাগনাস পাই-এর অট্টালিকা পাই হল, সেই হলের সিঁড়ির নিচে তাঁর দলামোচড়ানো মৃতদেহ আবিষ্কার হয়। বোঝাই যাচ্ছে কী হয়েছে। সিঁড়ির ওপরে রাখা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের এলোমেলো দড়িতে পা পেঁচিয়ে পতন এবং মৃত্যু। সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। দ্বিতীয় মৃত্যুও ওই সিঁড়ির নিচেই, এবার শুধু চাকরের বদলে মালিক, স্যার মাগনাস স্বয়ং, আর এবারেও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই, রক্তে ভাসাভাসি হলের একদিকে স্যার পাইয়ের দেহ, আর দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মুণ্ডু গড়াগড়ি খাচ্ছে হলের অন্য দিকে। ওয়েপন অফ মার্ডার, ওই হলেরই একপাশে দাঁড় করানো সৌন্দর্যবর্ধক বর্মপরিহিত সেনামূর্তির হাতের তলোয়ার। সেটিও চুপটি করে শুয়ে রয়েছে ওই রক্তের সমুদ্রে। 

অ্যাটিকাস পিউন্ড, তাঁর সহকারী জেমস ফ্রেজারকে নিয়ে এলেন স্যাক্সন বাই অ্যাভন-এ রহস্যের সমাধান করতে। স্যাক্সন বাই অ্যাভন-এর শান্ত, নির্ঝঞ্ঝাট বর্ণনা শুনলে আপনার সেন্ট মেরি মিড-এর কথা মনে পড়বেই, আর মনে পড়বে সেন্ট মেরি মিড-এর সবথেকে বিখ্যাত বাসিন্দা মিস মার্পলের সেই অমোঘ বাণী। অণুবীক্ষণের তলায় এই শান্ত জীবনের একফোঁটা ফেলে দেখুন,  মাথার চুল খাড়া হয়ে যাবে। সাসপেক্টে থিকথিক করছে। মেরি ব্ল্যাকিস্টনের বদরাগী ছেলে রবার্ট আছে, এসট্রেঞ্জড স্বামী আছে, গ্গোলমেলে ভিকার এবং ভিকারের স্ত্রী আছেন, প্রতিশোধস্পৃহায় জরজর স্যার ম্যাগনাসের নিজের বোন আছেন, গ্রামের সবার হাঁড়ির খবর জানা ডাক্তার আছেন, এছাড়াও অশিক্ষিত বড়লোক আছে, লন্ডন থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা সন্দেহজনক ব্যবসায়ী আছে। আর এঁদের প্রত্যেকের কোটি কোটি মোটিভ এবং অপরচুনিটি আছে। বহুদিন আগে ঘটা আরেকটি মৃত্যুও আছে, অ্যাটিকাস পিউন্ড নিশ্চিত, যে মৃত্যুর ছায়া ঝুলে আছে এই গ্রামটির ওপর।

গল্প প্রায় শেষ হয় হয়, ক্লাইম্যাক্স আসন্ন, পিউন্ড তাঁর সহকারী ফ্রেজারকে বলে ফেলেছেন যে তিনি জানেন কে খুন করেছে। এমন সময় কিন্ডলের পাতা উল্টে আপনি হঠাৎ দেখলেন সুসান রাইল্যান্ড আবার ভেসে উঠেছেন কোথা থেকে। বলছেন, “অ্যানয়িং, ইজন’ট ইট?”

ভেরি, ভেরি অ্যানয়িং। সত্যি বলতে কি এতক্ষণে সুসান রাইল্যান্ড, ক্লোভারলিফ পাবলিশিং, আধুনিক লন্ডন এসব হিজিবিজির কথা আপনি ভুলেই গিয়েছিল, হঠাৎ কাঁচা ঘুম ভাঙানোর মতো করে সুসানের এই আবির্ভাবটা আপনি মোটেই ভালো চোখে দেখছেন না।

সুসানের ওপর রাগ করে লাভ নেই, ওঁর হাত পা বাঁধা, কারণ ম্যাগপাই মার্ডারস-এর পরের পাতাগুলো নেই। 

নেই? আপনি হাঁ করে তাকিয়ে থাকবেন। নেই মানেটা কী? আড়াইশো পাতা ধরে একটা গোয়েন্দা গল্প পড়ার পর বলে কি না লাস্ট চ্যাপ্টার নেই?

সত্যি নেই। সুসান চার্লসকে জিজ্ঞাসা করলেন, কনওয়ের ফোল্ডার যে রিসিভ করেছে সেই কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করলেন, সবাই বলল, যা এসেছে তোমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভেতরে কী আছে না আছে আমরা দেখিনি। অগত্যা সুসান গেলেন অ্যাল্যান কনওয়ের বাড়ি। কনওয়েকে সুসান একটুও পছন্দ করতেন না। খিটকেল প্রকৃতির লোক। বিশ্বশুদ্ধু সবাইকে চটিয়ে চলতে পছন্দ করে। প্রকাশক, এডিটর, টিভি প্রযোজক। তবু ম্যাগপাই মার্ডারস-এর শেষটুকু যেহেতু উদ্ধার করতেই হবে, সুসান কনওয়ের বাড়িতে গেলেন এবং দেখলেন কনওয়ে তার সম্প্রতি কেনা প্রাসাদোপম অট্টালিকার ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরে গেছে। 

সুইসাইড নোটটোট পাওয়া গেল। সবাই দুঃখসূচক শব্দ করে মাথা নেড়ে বলল, ইংরিজি সাহিত্যের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। কিন্তু সুসান সারাজীবন ধরে গোয়েন্দাগল্প গুলে খাচ্ছেন, সুসান বুঝে গেলেন আসলে কী হয়েছে। তাছাড়া ম্যাগপাই মার্ডারস-এর শেষ চ্যাপ্টারটাও নেই কোত্থাও, স্রেফ উবে গেছে।

সুসান কাজে নামলেন। কাজটা খুব একটা সহজ হল না, কারণ সুসান অ্যাটিকাস পিউন্ড নন। এখানেসেখানে ঠোক্কর খেতে খেতে সুসানের ম্যাগপাই মার্ডারস-এর শেষ চ্যাপ্টার খোঁজা বা অ্যালান কনওয়ের মৃত্যুরহস্য সমাধান এগোল আর যত এগোল তত হতভম্ব হয়ে গেলেন সুসান। 

আর্ট ইমিটেটস লাইফ না লাইফ ইমিটেটস আর্ট? এ তো হুবহু ম্যাগপাই মার্ডারস-এর গল্প। অ্যাল্যান কনওয়েকে যদি স্যার ম্যাগনাস পাই হিসেবে কল্পনা করে নেওয়া যায়, যেটা একেবারে অযৌক্তিকও নয়, কারণ দুজনেই অভদ্র, নাকউঁচু, বদমেজাজি, লোক চটানোয় পি এইচ ডি, তাহলেই গোটা ঘটনাটা বইয়ের পাতার বাস্তব “ম্যাগপাই মার্ডারস” হয়ে যায়।  মিল শুধু ভিকটিমে নেই, তাঁদের আশেপাশের চরিত্ররাও যেন একে অপরের প্রতিচ্ছায়া, সেই অবহেলিত বোন, সেই অপমানিত স্ত্রী, সেই সিক্রেট পুষে রাখা ভিকার দম্পতি…

*****

গল্প হল, এবার গল্পের সমালোচনা। গল্পের নৈর্ব্যক্তিক সমালোচনা কী ভাবে করা যায় বা আদৌ যায় কি না সেটা তর্কের বিষয়। তবে নৈর্ব্যক্তিক হোক বা না হোক, যে কোনও সমালোচনার মূল তিনটে মাপকাঠি থাকে, তারা হল, এক, প্লট; দুই, চরিত্র; তিন, পারিপার্শ্বিক।

ওপরের গল্প শুনেই বুঝতে পেরেছেন আশা করি, ম্যাগপাই মার্ডারস-এর প্লট যথেষ্ট জটিল, কারণ ম্যাগপাই মার্ডারস হচ্ছে একটি গল্পের মধ্যে আরেকটা গল্প। তবে গল্পগুলো একাএকাও যথেষ্ট জটিল। রেড হেরিং, ক্লু, টুইস্টে ছয়লাপ। যদিও কোনওক্ষেত্রেই সে জটিলতা বুদ্ধির অগম্য হয়নি। সন্দেহভাজন চরিত্র, অগুন্তি। এটা অ্যান্থনি হরোউইটজ-এর থেকে আশা করাই যায়, কারণ এই হরোউইটজ-ই সৃষ্টি করেছিলেন 'মিডসমার মার্ডারস'। অবান্তরে মিডসমার মার্ডারস-এর কথা লিখেছি আগে, এখন সে পোস্টের লিংক খুঁজে বার করতে ইচ্ছে করছে না। আমার অন্যতম প্রিয় গোয়েন্দা টিভি সিরিজ। 'মিডসমার মার্ডারস' এবং 'ম্যাগপাই মার্ডারস', হরোউইটজ-এর দুই সৃষ্টিরই অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাসপেক্টের সংখ্যাধিক্য। গ্রামশুদ্ধু লোকেরই ভিকটিমের প্রতি রাগ, সেই সঙ্গে খুনের অপরচুনিটিও। সাসপেক্ট বেশি হওয়ার পক্ষেবিপক্ষে মত দুইই আছে। আমার নিজের মত অধিকন্তু ন দোষায়ঃ, কারণ তাতে সন্দেহটা অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে। সাসপেক্ট কম হলে খুনীকে ধরে করে ফেলার প্রবাবিলিটি বেড়ে যায়, সাম্প্রতিক কালে পড়া একটা গল্পে যা ঘটেছে। আমি মোটেই সেটা চাই না। খুনী ধরার দৌড়ে আমি লেখকের কাছে হারতেই চাই। 

চরিত্রসংখ্যা বেশি থাকলে মাপকাঠির তৃতীয় বিষয়টাতেও সুবিধে। অর্থাৎ পারিপার্শ্বিক সৃষ্টি বা ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং। বর্ণনা দিয়েও সে উদ্দেশ্য লেখক সাধন করতে পারেন, এই একটা পুকুর, ওই একটা গাছ, এই ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে।কিন্তু তা নিতান্ত বোরিং হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। অনেকটা বেড়াতে গিয়ে খালি পাহাড় নদী ঝরনার ছবি তোলার মতো। পাঁচ বছর বাদে কোথাকার পাহাড়, কোথাকার নদী কিচ্ছু চেনা যাবে না, অথচ সে নদীর পাড়ে কাব্যিক মুখে কিংবা ভি চিহ্ন দেখিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে, সব ছবির মতো মনে থাকবে।

গোয়েন্দাগল্পের গুণ বিচারে এই তিনটে বিষয়ের বাইরে আরও একটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা হল গোয়েন্দা। 'ম্যাগপাই মার্ডারস'-এর একটা চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে এখানে আপনি এক দামে দুই গোয়েন্দা পাচ্ছেন। অ্যাটিকাস পিউন্ড, ম্যানারিজমে ভরপুর, বোকা সহকারী, শেষ সিনে সবাইকে বসিয়ে সব বুঝিয়ে দেন। আমার মতো সেকেলে পাঠকদের জন্য আদর্শ। আবার যারা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চান, তাঁদের জন্য আছেন সুসান রাইল্যান্ড। আধুনিক “গার্ল” ঘরানার রহস্যরোমাঞ্চ গল্পের হিরোদের মতো সুসান গোয়েন্দা নন, গোলেমালে গোয়েন্দার ভূমিকায় নামতে হয়েছে। গল্পের মাঝে মাঝে তার ব্যক্তিগত জীবনের দোলাচল উঁকি দিয়ে যায়। তার ক্যারেকটার আর্ক হবে সাংঘাতিক। গল্পের শুরুতে আর শেষে সে সম্পূর্ণ দুটো আলাদা মানুষ। 

ম্যাগপাই মার্ডারস আমার ভালো লাগার আরও একটা কারণ আছে। এ গল্পের চরিত্ররা কিংস অ্যাবট নামের গ্রামে থাকে, ব্লু বোর ক্যাফেতে চা খায়, চারটে পঞ্চাশের ট্রেনে চাপে। আগাথা ক্রিস্টির ভক্তদের কাছে এ বই একাধারে বই এবং ট্রেজার হান্ট। 

শুধু ভালো বললে রিভিউর মান থাকে না, তাই দুটো খারাপ লাগার কথা বলব। দুটোই অকিঞ্চিৎকর। এক, উপন্যাসের দুটো অর্ধেরই শুরুর দিকে এক্সপোজিশনের আধিক্য আছে, অর্থাৎ আগে কী হয়েছিল তার প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ ধরে ব্যাখ্যা। দুই, কিছু কিছু ক্লু গতে বাঁধা, পড়ামাত্র আপনি সেগুলোকে ক্লু বলে চিনতে পারবেন।

অ্যান্থনি হরোউইটজ সেই গোত্রের মানুষ, যারা অতি অল্প বয়সেই নিজের লক্ষ্য চিনে ফেলেন এবং তার পর একবিন্দু সময় নষ্ট করেন না। ইংরিজি সাহিত্য আর আর্ট হিস্টরি নিয়ে ইউনিভার্সিটি থেকে বেরোনোর পর কপি এডিটরের চাকরি নিয়েছিলেন তিনি এবং “wrote in every spare minute  কুড়ি বছর বয়স থেকে পেশাদার ভাবে লিখে চলেছেন অ্যান্থনি হরোউইটজ, বাষট্টি বছরে এসে এই প্রথম নিজের গল্প, নিজের চরিত্রদের নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গোয়েন্দা উপন্যাস ছাপালেন। মাঝের চল্লিশ বছরে তিনি ছোটদের জন্য স্পাই গোয়েন্দা ঘরানার বিপুল জনপ্রিয় সিরিজ লিখেছেন, টিভির বিখ্যাত গোয়েন্দা সিরিজ বানিয়েছেন। 'মিডসমার মার্ডারস'-এর কথা তো আগেই বলেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের প্রেক্ষাপটে বানানো 'ফয়েল’স ওয়ার'-ও হরোউইটজ-এর সৃষ্টি। ডেভিড সুশের পোয়্যারো সিরিজেরও বহু এপিসোডের অ্যাডাপ্টেশনের দায়িত্ব তাঁর ছিল। শার্লক হোমসের দু’দুখানা অফিশিয়াল প্যাস্টিশ লিখেছেন হরোউইটজ।

ম্যাগপাই মার্ডারস-এ প্রকাশনা জগত একটা বড় জায়গা নিয়ে আছে (এ প্রসঙ্গে রবার্ট গ্যালব্রেথের 'দ্য সিল্কওয়ার্ম'-এর কথা মনে পড়েছে অনেকের) লেখকের ইগো, বিশ্বাসের অভাব, খ্যাতির মোহ এ সবই নিশ্চয় খুব কাছ থেকে দেখেছেন হরোউইটজ নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়, সে সব ফুটে বেরিয়েছে ম্যাগপাই মার্ডারস-এ। আরও একটা বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন হরোউইটজ, সেটা হচ্ছে সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ক। অনেকক্ষেত্রেই একটা সময় কেটে যাওয়ার পর সম্পর্কটা ফ্রাংকেনস্টাইন ও ফ্র্যাংকেনস্টাইনের দৈত্যের মতো হয়ে পড়তেও পারে। তখন কে যে লিখছে আর কে যে বেঁধেমেরে লিখিয়ে নিচ্ছে, তার ফারাক গুলিয়ে যায়। অনেক সময় এও হয়, লেখক যা লিখতে চান তা লিখতে পান না, পেট চালানোর জন্য যা লেখেন তার প্রতি নিজের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা থাকে না। ঘরানা গল্পের লেখকদের মধ্যে এ জিনিস হওয়ার চান্স বেশি। “লিটারেরি” হতে গিয়ে “জনেরিক” হয়ে যাওয়ার উদাহরণ  কম নেই। তখন মরো সারাজীবন দগ্ধে দগ্ধে। 

এই শেষের সমস্যাটা অ্যান্থনি হরোউইটজের নেই। ম্যাগপাই মার্ডারস-এর প্রতিটি শব্দ, বাক্য এবং বাক্যের বিরতিতে তার প্রমাণ আছে। হরোউইটজ গোয়েন্দাগল্পই লিখতে চেয়েছিলেন। এর থেকে মহত্তর কিছু করতে চাননি, বা অন্যভাবে বলা যায় গোয়েন্দাগল্পকে তিনি কিছু কম মহৎ মনে করেন না। হরোউইটজ যতখানি গোয়েন্দাগল্পের লেখক, ততখানিই পাঠকও। তিনি গোয়েন্দাগল্পের পাঠকদের বোঝেন। বোঝেন, যারা গোয়েন্দাগল্প পড়ে, কেন পড়ে। 
You must know that feeling when it's raining outside and the heating's on and you lose yourself, utterly, in a book. You read and you read and you feel the pages slipping through your fingers until suddenly there are fewer in your right hand than there are in your left and you want to slow down but you still hurtle on towards a conclusion you can hardly bear to discover.”

বিশুদ্ধ গোয়েন্দাগল্পের এই রকম হইহই উদযাপন আমি অনেক, অনেকদিন পরে দেখলাম। ম্যাগপাই মার্ডারস আমার হিসেবে পাঁচে পাঁচ। 



July 20, 2017

কী এনেছ?



ইন্টারনেটে ঘুরতে ঘুরতে নানারকম খেলা চোখে পড়ে। চরিত্র বিশ্লেষণ, স্বপ্নবিচার, আপনার পার্টনার আপনাকে ভালোবাসে কি না তার প্রমাণ। বই পড়া সংক্রান্ত খেলাধুলো আমার ফেভারিট। বই পড়া দিয়ে চরিত্র বিচার, চরিত্র দিয়ে বই পড়া বিচার, বইয়ের সঙ্গে লেখক মেলানো, লেখকের সঙ্গে বই ইত্যাদি। 

সেদিন এই আর্টিকলটায় পড়লাম এক ভদ্রলোক একখানা কম্পিউটার প্রোগ্রাম বার করেছেন, যেটাতে কোন লেখক তাঁদের লেখায় কোন শব্দ, শব্দবন্ধ, বাক্য, ক্লিশে সবথেকে বেশি ব্যবহার করেছেন সব বেরিয়ে যাচ্ছে। 

কারও কারও সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দ কার্যকারণরহিত, যেমন

রে ব্র্যাডবেরি = সিনামন
ভ্লাদিমির নাবোকোভ = মভ

আবার কারও কারও একেবারে দুইয়ে দুইয়ে চার। 

ক্রিস্টি = ইনকোয়েস্ট, অ্যালিবাই 
টলকিয়েন = এলভ্‌স, গবলিন, উইজার্ডস 

ক্লিশে ব্যবহারে সাধারণত নাক কোঁচকানো হলেও চেনা লেখকরা অনেকেই ক্লিশে ব্যবহার করতে পছন্দ করেন দেখা গেছে।

জেন অস্টেন = উইথ অল মাই হার্ট
ড্যান ব্রাউন = ফুল সার্কল
রোলিং = ডেড অফ নাইট
সলমান রুশদি = দ্য লাস্ট স্ট্র

বাংলা লেখকদের নিয়ে এরকম একটা কিছু থাকলে মন্দ হত না। কারণ সকলেরই কিছু না কিছু পোষা শব্দ থাকে। লেখায় থাকে, বলায় থাকে। অনেক সময় বহুব্যবহারের চোটে একেকটা লোকের চেহারা, চরিত্রের সঙ্গে একেকটা কথা খুব খাপ খেয়ে যায়, লোকটার কথা মনে পড়লেই ওই শব্দটার কথা মনে পড়ে। 

আমার এক বন্ধু বলেছিল, তাঁর বাবা নাকি কথা প্রায় বলতেনই না, নেহাত বলতেই হলে বলতেন, “দেখছি।” যেমন,

"বাবা, সাইকেল কিনে দাও।
-দেখছি।"

"বাবা, দার্জিলিং চল।
-দেখছি।" 

ইত্যাদি। 

আরেকজনের সঙ্গে  আমার আলাপ ছিল, সে খালি কথায় কথায় বলত, “ পরিস্থিতি” অর্থাৎ চারপাশে যা হচ্ছে সবই পরিস্থিতির চাপে হচ্ছে, তার নিজের কোনও দায় নেই। আমার ছোটবেলার একজন শিক্ষক ঘনঘন বলতেন, “কিস্যু হবে না”। বড়বেলার মাস্টারমশাইদের একজন প্রতিটি বাক্য শুরু করতেন “দেয়ারফোর” দিয়ে, আরেকজনের প্রতিটি বাক্য শেষ হত “সো অন অ্যান্ড সো অন অ্যান্ড সো অন…” দিয়ে। 

আমার মা সারাদিনে কতবার যে “আশ্চর্য!” বলেন গুনলে আশ্চর্য হতে হবে। আমার ঠাকুমা যখন সুস্থ ছিলেন তখন তাঁর কথায় “দ্যাশ/বরিশাল/পটুয়াখালি’ ইত্যাদির বাজার তেজী ছিল। অর্চিষ্মান সারাদিনে সবথেকে বেশিবার হয় “চা” বলে নয় বলে “ওরে বাবা”। “ওরে বাবা কুন্তলা, কেউ বকবে না/ তোমার চাকরি থাকবে/ অবান্তরে কমেন্ট পড়বে, সবে তো ছাপলে।”, “ওরে বাবা কুন্তলা, বাথরুমে টিকটিকি!”

আমি নিজে কী বেশি বলি সেটা ভেবে মনে করতে পারলাম না। “যত্তসব”, "যাচ্ছেতাই" “এরা কারা?” গোছের কিছু হবে। তবে সবথেকে বেশি কী বলতাম যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তবে বিনা প্রতিযোগিতায় জিতবে এই পোস্টের টাইটেল।

"কী এনেছ?"

আমি কথা বলতে শুরু করার পর থেকে মায়ের রিটায়ারমেন্ট পর্যন্ত প্রতি সন্ধ্যেয় (মায়ের ছুটিছাটা আর আমার হোস্টেলে থাকার দিনগুলো বাদ দিয়ে) দরজা খুলে মা’কে এই প্রশ্নটা করেছি। 

'কী এনেছ?" 

মা কখনও নিরাশ করেননি। বেশিরভাগ সন্ধ্যেতেই বাজারের মিষ্টির দোকানের সবথেকে ছোট বাক্সে দু’টাকা পিসের দু’পিস সন্দেশ আসত। কোনও কোনওদিন বাদাম চাক। আর আমার স্কুলের শেষ দিকে হাওড়া স্টেশনে মনজিনিস-এর শাখা খুলেছিল, খুব ঝুলোঝুলি করলে মা সেখান থেকে পিৎজা আনতেন। মাসে একবারের বেশি নয়। কচুরির সাইজের ময়দার তালের ওপর সস্তা চিজ আর টমেটোর লাল সাদা জমাট বেঁধে থাকত এদিকসেদিক। কিন্তু কোনও হ্যান্ডমেড আর্টিসান থিনক্রাস্ট চীজবার্স্ট পিৎজার ঠাকুরদার ক্ষমতা নেই সেই পিৎজাকে হারায়। 

*****

সপ্তাহের শুরুর দিকে সকালবেলা ঘুম ভেঙে চোখ খোলারও আগে টের পেলাম গলায় অসহ্য ব্যথা, ঢোঁক গিলতে প্রাণ বেরোচ্ছে। সোমমঙ্গল কোনওমতে চলল, বুধবার চলল না। ছুটি নিলাম। 

শুধু যে শারীরিক কারণেই নিলাম তা বলব না। ইদানীং কাজ জমে যাচ্ছে খুব। কিছুই সামলে উঠতে পারছি না। হাঁফ ছাড়ার জন্য একদিনের ছুটি দরকার ছিল। ছুটিতে কাজ এগোব ভেবেছিলাম, কিন্তু টাইমিং-এ ভুল করে ফেলে মঙ্গলবার সন্ধ্যেয় কিন্ডলে অ্যান্থনি হরোউইটজ-এর “ম্যাগপাই মার্ডারস” কিনে ফেললাম।

(কেউ যদি বলে ওই বইটা ছিল বলেই সকালে উঠে আমার গলাব্যথা হল, তাহলে আমি বলব, “পাপী মন।”)

বুধবার সকালে অর্চিষ্মান অফিস চলে গেল, আমি ‘ম্যাগপাই মার্ডারস’ শেষ করলাম বসে বসে। দু’দিন আগের পোস্টেই বই পড়ায় ফাঁকিবাজির দোষ বইয়ের ঘাড়ে চাপিয়েছিলাম। ভাব দেখিয়েছিলাম, আমি তো পড়তেই চাই, লেখকরা ভালো বই না লিখতে পারলে আমি কী করব। 

ম্যাগপাই মার্ডারস আমার সে দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। ইংল্যান্ডের গ্রামে ফাঁদা খুনের গল্প, গল্পের মধ্যে আবার গল্প, খুনের পর আবার খুন। ক্রিস্টির ফ্যানবয় হরোউইটজ, ছত্রে ছত্রে রেফারেন্স ছিটিয়ে রেখেছেন। কোনও রকম কায়দাকানুন না করে, গোল্ডেন এজ-এর স্টাইলের বেড়া না ভেঙে কী অপূর্ব গল্প বলা যায়, জানতে হলে পড়তে হবে। দুপুর নাগাদ পড়া শেষ হল, কিন্ডল মুড়ে চুপ করে শুয়ে রইলাম আরও খানিকক্ষণ। জমাটি গোয়েন্দাগল্প পড়ার সুখের সঙ্গে দুনিয়ার আর কোনও সুখের যে তুলনা চলে না সেটা আরও একবার টের পেলাম, আর আমি যে এরকম ভালো গল্প কোনওদিন লিখতে পারব না সেই হতাশাও ছেয়ে এল। সব মিলিয়েমিশিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। 

ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বিকেল। মাথাব্যথা, গলাব্যথা, কাজ না হওয়ার আতংক সব তিনগুণ হয়ে ফিরে এল। বালতির সাইজের একখানা কাপ ভর্তি চা নিয়ে নতুন চেয়ারটেবিলে বসে ঘণ্টাখানেক কাজের ভঙ্গি করেছি, এমন সময় দরজায় বেল। চেয়ার ঠেলে উঠে দরজা খুলে বললাম, "কী এনেছ?" 

বিশ্বাস করুন, গত পনেরো বছর আমি প্রশ্নটা করিনি। করার এক সেকেন্ড আগেও প্রশ্নটা আমার মাথায় ছিল না। অথচ ওই মুহূর্তে দরজা খুলে দাঁড়ানোমাত্র শব্দদুটো আমার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল। 

পরমুহূর্তেই ভয় হল। অর্চিষ্মান তো জানে না কিছু আনতে হবে। রোজ যে আমরা দুজনেই বাড়ি ফিরি, কেউই তো কিছু আনি না, কারণ সন্ধ্যেবেলা কিছুমিছু খাওয়ার অভ্যেসটা আমরা কাটিয়ে ফেলেছি, সোজা রাতের রুটি তরকারিতে ঝাঁপাই।

দুরু দুরু বুকে দাঁড়িয়ে রইলাম। অর্চিষ্মানের দুই কানে ইয়ারফোন, হেড ব্যাংগিং-এর বহর দেখে মনে হচ্ছে রেডিওতে বাদশার র‍্যাপ চলছে। মাথা ঝাঁকানো না থামিয়েই ডানহাতটা তুলে আমার নাকের সামনে ধরল। হাতে প্লাস্টিকের প্যাকেট, প্যাকেটের ভেতর খুশবু।

তারপর আমরা চা আর রোল আর ঝালমুড়ি খেলাম বিছানায় বসে বসে আর লোকজনের নিন্দে করলাম, আর গলাব্যথা, মাথাব্যথা, টেনশন কখন সব হাওয়া হয়ে গেল। 


July 16, 2017

পারকিনসন'স ল



সিরিল নর্থকোট পারকিনসন (১৯০৯-১৯৯৩)
উৎস গুগল ইমেজেস

ছোটবেলায় শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা মহম্মদ আলির জীবনী পড়া ইস্তক 'পারকিনসন'স' বললেই রিফ্লেক্সে ‘ডিজিজ’ শব্দটা মাথায় আসত, গত দুদিন ধরে অন্য একটা শব্দ মাথায় আসছে। 

ল। পারকিনসন’স ল। যদিও যদিও ল’এর অনেক আগে পারকিনসন এসেছেন (ল’ আবিষ্কারের সময়, বা আবিষ্কার জগতের কাছে উন্মোচনের সময় তাঁর বয়স ছিল ছেচল্লিশ) তবু তাঁর থেকে তাঁর ল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ল না থাকলে সিসিল নর্থকোট পারকিনসনের নাম এই এতদিন পরে এত দূরে বসে আমি জানতেই পারতাম না। কাজেই ল-টা আগে বলে নিই। 

Work expands so as to fill the time available for its completion.

যে রকম শুনতে লাগছে, সে রকম গম্ভীর করে কথাটা পারকিনসন বলেননি। সিরিল নর্থকোট পারকিনসন ছিলেন ব্রিটিশ বুরোক্রেসির ভেতরের লোক। সিস্টেমের অপদার্থতা, ক্রমবর্ধমান আয়তন, গুচ্ছের অকাজের লোককে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো, এ সব সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং গাত্রদাহ আর পাঁচটা বাইরের লোকের থেকে বেশিই ছিল। সেই নিয়েই একখানা বিদ্রূপাত্মক, ননসিরিয়াস লেখা, সিরিয়াস পত্রিকা দ্য ইকনমিস্ট-এ লিখেছিলেন পারকিনসন। ছাপা হয়েছিল উনিশশো পঞ্চান্ন সালের নভেম্বর মাসে। বিদ্রূপে ভরপুর সে লেখায় The Law of Multiplication of Subordinates গোছের থিওরি, সাবথিওরি, অ্যাক্সিয়ম, ভয়ালদর্শন ফর্মুলাটরমুলা সহকারে প্রমাণটমান ছিল।

সে সব সময়ের তোড়ে ভেসে গেছে, বেঁচে গেছে শুধু আড়াই হাজার শব্দের লেখার প্রথম লাইনটা। যেটা কোনও রকম আড়ম্বর ছাড়াই পারকিনসন পেশ করেছিলেন, এমনকি কৃতিত্বও নিতে চাননি। 

It is a commonplace observation that work expands so as to fill the time available for its completion. 

কমনপ্লেস তো অনেক কিছুই, কিন্তু সব কমনপ্লেস জিনিসই যে আমদের কমন সেন্সে জায়গা পায় তা তো নয়, তাই পারকিনসন যখন কাজ আর সময়ের মধ্যে সরল সম্পর্কটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, তখন সবাই কমেন্টে এসে বলল, “খাঁটি কথা”। 

পারকিনসন ভালো শিক্ষক ছিলেন, কথা হাওয়ায় ভাসিয়েই হাত ঝাড়েননি, উদাহরণও দিয়েছেন। সময়ের নিয়ম মেনে সে উদাহরণ হয়তো স্বাভাবিকভাবেই সামান্য সমস্যাজনক, তবু ইতিহাসের মুখ চেয়ে সেই উদাহরণটাই এখানে দিলাম।

Thus, an elderly lady of leisure can spend the entire day in writing and despatching a postcard to her niece at Bognor Regis. An hour will be spent in finding the postcard, another in hunting for spectacles, half-an-hour in a search for the address, an hour and a quarter in composition, and twenty minutes in deciding whether or not to take an umbrella when going to the pillar-box in the next street. The total effort which would occupy a busy man for three minutes all told may in this fashion leave another person prostrate after a day of doubt, anxiety and toil.

*****
প্রেজেন্টেশন শেষ হওয়ার পর টেবিলের চারপাশ থেকে সবাই হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে। আমি যে এত মডেলের কথা বললাম, অত ডেটা, তত রিগ্রেশন — কেউ ইমপ্রেসড নয়। ডেটাকে টর্চার করে যে যা খুশি বলানো যেতে পারে, স্ট্যাটিসটিকস অতি ভয়ংকর লায়ার, এই সব প্রাচীন প্রবাদ সবাই মুখস্থ করে রেখেছে, ও দিয়ে চিঁড়ে ভিজবে না। মন্ত্রীমশাই থোড়াই তোমার রিগ্রেশন টেবিল পড়বেন, ওঁর কাছে সিগনিফিকেনস অ্যাট ফাইভ পার্সেন্টও যা ঘোড়াড্ডিমও তাই। তোমার এত ডেটা ধামসানো ফালতু, যদি তার কোনও পলিসি ইমপ্লিকেশন না থাকে। 

অবান্তরের পাঠকদেরও কারও কারও সেরকম মনে হতে পারে। ল পড়ে কী হবে, যদি আমার তাতে কিছু এসে না যায়? 

যাবে যাবে, নিশ্চয় আসবে যাবে। যাঁরাই কাজ করেন, (যেটা আমি ধরে নিচ্ছি, সবাই) তাঁদেরই আসবে যাবে। যাঁরা কাজ সময়ে শেষ করতে পারেন না বা করতে গিয়ে গলদঘর্ম হন (যেটা আমি আশা করছি, অনেকেই) তাঁদেরও। (এমন যদি কেউ থাকেন যে কাজ আসামাত্র লাফিয়ে সারেন, সেরে, হাত ঝেড়ে ডেডলাইন পর্যন্ত বাকি সময়টা পপকর্ন খান আর টিভি দেখেন, ওয়েল, আমি তাঁদের নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।) 

পলিসি ইমপ্লিকেশনে যাওয়ার আগে ল-টা আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। 

Work expands so as to fill the time available for its completion.

টার্মপেপারের কথা মনে করুন। ক্লাসের কেউ লিখেছিল এক রাতে, কেউ এক সপ্তাহে, হাতে গোনা যমের অরুচি কেউ কেউ ছিল যারা সেমেস্টারের ফার্স্ট উইকে নোটিস পাওয়া থেকে কাজ শুরু করে সারা সেমেস্টার খেটে জমা দিয়েছিল।  

তাহলে একটা টার্ম পেপার লিখতে আসলে কত সময় লাগে?

উত্তর সোজা। যে যতখানি সময়ে টার্ম পেপারটা লিখে শেষ করেছে, তার একটা টার্ম পেপার লিখতে ততটাই সময় লাগে।

আপনি কতক্ষণে লিখেছিলেন? ঠিক আছে, বলতে হবে না, আমারটাই শুনুন বরং। আমি জানি আমার টার্ম পেপার লিখতে কত সময় লাগে, কারণ আমি শত শত টার্ম পেপার ওই একই সময়ের মধ্যে লিখেছি এবং জমা দিয়েছি।

এক রাত। 

আরেকটা উদাহরণ দিই। শনিবার সন্ধ্যে সাতটায় এস এম এস এল।

দু’নম্বরে। পাবদা কেনা হয়ে গেছে। দাদুর চপের লাইনে। কুন্তলার বেগুনী নিয়ে নিয়েছি, তুই আলু না পেঁয়াজি শিগগির জানা। পাঁচ মিনিটে দেখা হচ্ছে। 

ল্যাপটপের নিচ থেকে বেরোলাম। চানাচুরের শিশির ঢাকনা বন্ধ করে রান্নাঘরে রাখতে যাচ্ছি, যেতে যেতে ভেতরের ঘরের খাটের ওপর তিনটে জামার দিকে চোখ পড়ল। এমন নয় আগে পড়েনি। গত শনিবার কেচে ইস্তিরি হয়ে আসা থেকে বারবার চোখ পড়ছে, বারবার চোখ সরিয়েও নিচ্ছি। 

সেদিন সরালাম না। চানাচুরের শিশি নামিয়ে রেখে জামাগুলো তুললাম, আলমারির দরজা খুললাম, ভেতরে রেখে দরজা বন্ধ করলাম। ডিসিশন নেওয়া থেকে কাজটা শেষ করা পর্যন্ত আমার সময় লাগল সাত সেকেন্ড।

ওই মুহূর্তে “জামা খাট থেকে আলমারিতে তুলতে কত সময় লাগে?" জিজ্ঞাসা করলে আমার উত্তর হত, “সাত সেকেন্ড”। এস এম এস পাওয়ার আগে ওই একই প্রশ্নের উত্তর সাত দিন, এমন কি ওই মুহূর্তে এস এম এস টা না পেলে চোদ্দ দিন, একুশ দিন, এক মাস, তিন মাস… যা খুশি হতে পারত।

প্রোডাকটিভিটি গুরুরা বলছেন, একটা কাজকে ঠিক ততটাই সময় দিন যতখানি তার প্রাপ্য, এক সেকেন্ডও বেশি নয়। জামাগুলো সাত সেকেন্ডেই তুলুন, কারণ আপনি জানেন, হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছেন, জামাটা তুলতে সত্যিই সাত সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না। সাত সেকেন্ডে জামা তোলার জায়গায় সাত দিন ধরে সেটাকে তুলছি তুলব করে মানবসম্পদের অপচয় করবেন না।

আপনি যেহেতু জানেন টার্ম পেপার এক রাতে লেখা সম্ভব কাজেই সেটা এক রাতেই লিখুন, তার পেছনে আর একবেলাও বেশি খরচ করবেন না।

(ওয়েল, এই পরামর্শের দায় প্রোডাকটিভিটি গুরুরা নিতে চাইবেন কি না আমি নিশ্চিত নই, তবে পারকিনসন ল-কে নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করার মূল এসেন্সটা আপনাদের ধরাতে পেরেছি আশা করি।

হ্যাঁ, এমন অনেক কাজ থাকবে যেগুলো করতে কত সময় লাগবে আপনার জানা থাকবে না। জীবনে একটাও উপন্যাস না লিখে থাকলে আপনার জানা সম্ভব নয় একটা উপন্যাস লিখতে আপনার কত সময় লাগা উচিত। জীবনে একটাও প্রেম না করে থাকলে আপনার জানা অসম্ভব কতক্ষণ আপনি একটা প্রেমের পেছনে পরিশ্রম করবেন আর কখনই বা বুঝে নেবেন যথেষ্ট হয়েছে, এবার বলার সময় এসেছে, নে-এ-এ-ক্সট।

একটু রিসার্চ করুন, তবে সময় বেঁধে। (কারণটা ঠিকই ধরেছেন, রিসার্চ এক্সপ্যান্ডস সো অ্যাজ টু ফিল দ্য টাইম অ্যাভেলেবল ফর ইটস কমপ্লিশন। আরও একটা কথা মনে রাখলে সুবিধে, একটা কাজ করতে যত সময় লাগবে বলে আপনার বিশ্বাস, প্রায় সবক্ষেত্রেই সে কাজটা করতে আসলে লাগে তার থেকে অনেক কম সময়।) অভিজ্ঞ লোকদের পরামর্শ নিন, গুগল করুন, তারপর সময়সীমার যে রেঞ্জটা পাচ্ছেন তার লোয়ার লিমিটে নিজেকে বাঁধুন। কাজটা আপনি ওই সময়ের মধ্যে শেষ করবেন। 

চরমপন্থীরা আরও একধাপ এগোন। তাঁরা বলেন ওই ন্যূনতম সময়েরও অর্ধেক সময় নিজেকে দিন। অর্থাৎ কেউ যদি মোটে তিন ঘণ্টায় একটা কাজ শেষ করে থাকে, তাহলে আপনি ঠিক করে নিন, আপনি দেড়ঘণ্টায় কাজটা শেষ করবেন।

মনে রাখবেন, একটা কাজকে আপনি যত সময় দেবেন, সে ঠিক ততটাই সময় নেবে। 

*****

গোটা আর্গুমেন্টে আমার মতে প্রোডাকটিভিটি গুরুরা একটাই ফাঁক রেখে দিয়েছেন। কাজ সময়ে শেষ করতে একটি তৃতীয় শক্তির অনুপ্রবেশ লাগে। আমার অভিজ্ঞতায় যেটা কাজ এবং সময়, দুইয়ের তুলনাতেই বেশি শক্তিশালী। 

হুমকি। আলটিমেটাম। 

টার্মপেপার আজ না লিখলে, ফেল। 

রিপোর্ট আজ সাবমিট না করলে, বেকার।

অতিথি আসার আগে ঘর না গুছোলে, জাজমেন্ট।

এইটুকু ভুল শোধরানো সোজা। পারকিনসন’স ল-কে নিজের সুবিধার্থে সার্থকভাবে প্রয়োগ করতে গেলে নিজের জন্য উপযুক্ত হুমকির ব্যবস্থা করে নিন। মুখে কালি, বসের বিরাগভাজনতা, যার যা কাজে দেয়। তারপর কাজে নামুন। মনে রাখবেন, আপনি যতখানি অ্যালাউ করবেন, কাজ ঠিক ততখানিই সময় নেবে। 

*****

এই পোস্টটা আমি গত তিনদিন ধরে পাবলিশ করব করব ভাবছি। লিখছি ক’দিন ধরে সে কথা মনে করে আর গ্লানি বাড়াতে চাই না। প্রতিদিনই ঘণ্টাখানেকের কাজ বাকি থেকে যাচ্ছে। আজ সকালে উঠে ঠিক করলাম এক ঘণ্টা নয়, আধঘণ্টায় আমি পোস্টটা শেষ করে ছাপাব। না হলে ব্লগ লেখা ছেড়ে দেব। সারাদিন শুধু অফিসের কাজ করব মন দিয়ে।

পোস্ট শেষ করে ছাপাতে কত সময় লাগল বলুন দেখি? 

কুড়ি মিনিট।

জয় পারকিনসন। জয় পারকিনসনের ল। 


*****

পারকিনসনের মূল লেখাটি যদি কারও পড়ার ইচ্ছে থাকে, এই রইল লিংক।

http://www.economist.com/node/14116121


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.