August 28, 2016

পেঁপে পাতা, প্যারাসিটামল আর সাপ্তাহিকী



এদিকে খুব ইয়ে হচ্ছে, জানিস সোনা। 

ইয়েটা কী সেটা বুঝলাম। এবং শব্দটা মনে থাকা সত্ত্বেও কেন মা এড়িয়ে গেলেন তাও বুঝলাম। বললাম, আমি এখনও ডেঙ্গুই বলছি মা। আর ক’বছর দেখি, তারপর না হয় ডেঙ্গির দলে নাম লেখানো যাবে। 

মা হাঁফ ছেড়ে গল্পটায় ঢুকলেন। 

রিষড়া শ্রীরামপুরে খুব ডেঙ্গু হচ্ছে। ঠাকুমার ফিজিওথেরাপি করান গ, তিনি গত সপ্তাহে ঠাকুমার হাত পা চালনা করে বেরোনোর সময় আমার মাকে ডেকে নাকি বলেছেন, মা দেখো তো গাটা গরম হয়েছে কি না। 

গ আমার মাকে মা বলেন। গ আমার ঠাকুমাকে মা বলেন। সব মহিলাকেই গ মা বলেন। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম গাঁইয়ামো, তারপর খানিকটা বুদ্ধি খরচ করে বুঝলাম কারণটা সম্পূর্ণভাবে পেশাগত। গ-কে পেশার কারণে মহিলাদের শরীর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়। গ শুরুতেই সবার সঙ্গে মা ছেলে পাতিয়ে ফেলেন যাতে মহিলারা আশ্বস্ত হন যে তাঁর কোনও রকম কুমতলব নেই। এবং নিজেকে নিশ্চিন্তে গ-এর হাতে সমর্পণ করতে পারেন। 

মোদ্দা কথা, গ-কে দেখতে স্বাভাবিক মানুষের মতো হলেও গ অস্বাভাবিক রকম বুদ্ধিমান। এতদিন দেখে আমি গ-এর মধ্যে একটিমাত্র মানবিক দুর্বলতা আবিষ্কার করেছি। নিজের সন্তান। দেখা হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে গ মানিব্যাগ থেকে নিজের মেয়ের ছবি বার করে দেখিয়ে দেন এবং তার নানারকম কেরামতির গল্প শুরু করেন। মেয়েকে নাচ গান ক্যারাটে সাঁতার সব শেখাচ্ছেন গ। 

সেই গ গত সপ্তাহের কোনও একদিন মাকে ডেকে বললেন, দেখো তো মা, গাটা গরম হয়েছে কি না। 

আমার মা হয়েই মায়ের শখ মিটে গেছে, অন্য কারও মা হতে তিনি চান না। পাতানো ছেলের কপাল থাবড়ে জ্বর পরীক্ষা করার ইচ্ছে তাঁর একটুও ছিল না। কড়ে আঙুলের ডগা মাইক্রোসেকেন্ডের জন্য কপালে ছুঁইয়ে মা তা-ই বললেন এই প্রশ্নের উত্তরে একমাত্র যা বলা যায়। 

মনে হচ্ছে একটু ছ্যাঁকছ্যাঁক করছে।  

গ গম্ভীর হয়ে গেলেন। মা গম্ভীর হয়ে গেলেন। ঘরের বাকি লোকজন গম্ভীর হয়ে গেল। স্টার্ট নেওয়ার আওয়াজ শুনে মনে হল গ-এর বাইকের ইঞ্জিনটাও অন্যদিনের থেকে গম্ভীর। 

পরদিন কিন্তু সে গাম্ভীর্যের ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না। উচ্চস্বরে মা মা ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকে গ জানালেন যে গতকাল বাড়ি ফেরার সময়, দিনের শেষ ক্লায়েন্টের বাড়ির পেঁপে গাছ থেকে কয়েকটা কচি দেখে পাতা বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। বেটে খেলে ডেঙ্গুর আর সাধ্য নেই তাঁকে ছোঁয় সেটা গ জানতেন, কিন্তু প্রতিষেধক ফুলপ্রুফ করার জন্য পাড়ার দোকান থেকে একখানা প্যারাসিটামলের স্ট্রিপ কিনে এনে তার একটা পেঁপে পাতার সঙ্গে গুঁড়ো করে খেয়ে নিয়েছেন। 

আসার আগেই ব্যাটাকে আটকে দিয়েছি। ঘরশুদ্ধু মায়েদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন গ। আর গ চলে যাওয়ার পর ফোন করে মা বলেছিলেন আমাকে।  

এই গ-এর সঙ্গে আমার একবার পালা পড়েছিল। তখন আমার মায়ের জীবনে একটি কঠিন সময়। তিনি তাঁর মেয়ের জন্য সম্বন্ধ খুঁজছিলেন। বা বলা উচিত খুঁজতে হচ্ছিল। নিজের বিয়ের ব্যবস্থা মা নিজেই করেছিলেন। গোটা একটা প্রজন্ম পার করে যে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের ঘোলাজলে তাঁকে নামতে হবে সে আশংকা মায়ের স্বপ্নেও ছিল না। কিন্তু এ বাবদে আমার উপর্যুপরি ব্যর্থতা মায়ের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিয়েছিল।

এইরকম একটা বিশ্রী সময়ে একবার আমি দুদিনের ছুটিতে বাড়ি যাই এবং গ-এর সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমার অসীম সৌভাগ্য যে গ আমাকে মা বলেননি, দিদিতেই ক্ষান্ত দিয়েছিলেন। কেমন আছ ভালো আছির পালা শেষ হলে গ অসামান্য মসৃণতায় আমার বিয়ের প্রসঙ্গে গেলেন। এবার বিয়েটা করেই ফেল দিদি। আমি এই আক্রমণের জন্য তৈরি ছিলাম না। তৈরি থাকলেও খুব যে অন্যরকম প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারতাম তেমন নয়, সেই হেঁ হেঁ-ই করতে হত, তবে শকটা একটু কম হত এই যা।

গ বলে চললেন। প্রথমে বিয়ের উপযোগিতা নিয়ে মিনিটদুয়েকের লেকচার। তারপরই তাঁর বক্তৃতা সন্দেহজনকরকম ফোকাসড হয়ে উঠল। জানা গেল তাঁর পাড়ায় একটি অতীব সুযোগ্য পাত্র ফাঁকা আছে। তারপর স্বভাবসুলভ বুদ্ধির দীপ্তিতে গ মাত্র দুটি তথ্য আমাকে দিলেন। নাম না, ডিগ্রি না, চেহারা না কমপ্যাটিবিলিটি না - যে সমস্ত আগডুমবাগডুম নিয়ে ভেবে ভেবে মা দিনে এক কেজি করে রোগা হচ্ছিলেন সেই সব কিস্যু না। ছেলের মাসমাইনের অংকটি (যেটা বলার সময় গ-এর ভুরু মাঝকপালে উঠেছিল) আর ছেলের ফ্যামিলির সাইজ (ছোট এবং নির্ঝঞ্ঝাট। গ-এর মুখে বুঝদার হাসি। আমার দ্বারা যে বড় ফ্যামিলি হবে না সেটা বুঝতে বাকি ছিল না গ-এর। আর একে আমি গাঁইয়া ভেবেছিলাম।)

মায়ের মুখ দেখে বুঝলাম এটা তাঁর কাছে সারপ্রাইজ। ঠাকুমার দিকে তাকালাম। ঠাকুমা চোখ সিলিং-এর দিকে ভাসিয়ে চুপ করে শুয়ে ছিলেন। সারামুখে এমন নিখুঁত উদাসীনতা মাখানো যেন নাতনির বিয়ের প্রসঙ্গটা তাঁর কাছে অবান্তর। যেন নিজের হাত পা গ-এর হাতে ছেড়ে দিয়ে তিনি কোনওদিনও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেননি, সবই তো ভালো এবার যদি বিয়াটা হয়ে যায়…

গ চলে গেলেন। মা দৌড়ে রান্নাঘরে কী পুড়ছে দেখতে গেলেন। ঠাকুমা চট করে চোখ বুজে ফেললেন। অর্থাৎ ওই মুহূর্তে আমার সঙ্গে তিনি কোনও কথোপকথনে যেতে রাজি নন। আর আমি বুঝলাম যে বিপদটা কতখানি ঘনিয়েছে। আর গড়িমসি চলবে না। 

তার ক’মাসের মধ্যেই আস্তিন থেকে অর্চিষ্মানের তাসটা আমি বার করি।

*****


এবার এ সপ্তাহের ইন্টারনেট





অদ্ভুত লোকজন


অদ্ভুত হিসেব

জীবনটা উশুল করে নিতে গেলে আত্মীয়বন্ধুর সঙ্গে বেশি সময় কাটানো উচিত কারণ... 

... an increase in the level of social interaction with friends and relatives is estimated to be worth up to an extra £85,000 a year. In terms of statistical significance, this is strikingly large. The estimated figure is even larger than that of getting married (which is worth approximately £50,000). It can compensate for nearly two-third in the loss of the happiness from going through a separation (minus £139,000) or unemployment (minus £143,000). It is also roughly nine times larger than the average real household income per capita in the dataset, which is around £9,800 a year.


টোটকা

বেশি কাজ করারঃ কম কাজ করা

বেশি কাজ করারঃ পরের দিনের জন্য ছ’টা কাজ স্থির করা। এবং সেই কাজগুলো একেক করে (সিংগল টাস্কিং) সম্পন্ন করা। 

ঘুমহীনতা নিরাময়েরঃ ঘুমকে ভালোবাসা, ঘুমের মাসিপিসিকে সম্মান দেওয়া, ঘুমকে নিজের অধিকার মনে করা এবং সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজেকে ঘুমের লোভ দেখানো। 

ছুটিকে টেনে বাড়ানো (অফিসে বেশি ছুটি না নিয়েই): ট্রিপঅ্যাডভাইসরে যথাসম্ভব কম সময় কাটানো। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত কী কী করার, কোথায় কোথায় খাব এসব প্ল্যান না ছকা।

ছবি

এটা দেখে দারুণ মজা পেয়েছি। 

উদ্বাস্তুদের সবথেকে দামি জিনিস।

উদ্বাস্তুদের থেকে কেড়ে নেওয়া জিনিস। 

হোস্টেলের ঘর। আমার নয়। আমার চেনা কারওর নয়। 

ভিডিও



কুইজ/ খেলা

আগের ভিডিওটা দেখতে দেখতে এই লাইনগুলো মনে পড়ছিল। 

ওই  যে জানালা খোলা রয়েছে - সে জানালা দিয়ে আমরা দূরের পাহাড় দেখতে পাচ্ছি, আকাশ দেখতে পাচ্ছি, পাহাড়ের গায়ে গাছপালা বাড়িঘর সব দেখতে পাচ্ছি, আকাশে মেঘ দেখতে পাচ্ছি। এ সব হোল অবান্তর জিনিস - নির্ভেজাল জ্ঞানের পক্ষে এ সব দৃশ্যবস্তু বাধাস্বরূপ। অথচ জানালা যদি বন্ধ করে দিই, তা হোলে কী দেখব? ঘরে যদি আলো না থাকে, তা হোলে বাইরের আলোর পথ বন্ধ করে দিলে কী থাকে? অন্ধকার। জীবন হল আলো, আর জীবন হোল ওই জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্য, যা আমাদের প্রকৃত জ্ঞানের পথ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। আর মৃত্যু হল বন্ধ জানালার ফলে যে অন্ধকার, সেই অন্ধকার। এই অন্ধকারের ফোলে আমাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়। মৃত্যুই হল অন্ধকারের চরম অবস্থা। 
লাইনগুলো কোন বই থেকে নেওয়া?

সবথেকে বিরল জন্মদিন জানাই আছে, ঊনত্রিশে ফেব্রুয়ারি। সবথেকে চালু জন্মদিন ষোলোই সেপ্টেম্বর। আমার জন্মদিনের (চোদ্দোই ডিসেম্বর) জনপ্রিয়তা মোটামুটি মাঝামাঝি, একশো পঁচাশি। আপনার কত?

গান

সামনের সাতদিনের হতাশার কোটা খানিকটা পূর্ণ করতে কাজে দেবে।


August 25, 2016

মালশেজ ঘাট 2/2





অবশেষে একটা করার মতো কাজ বার করা গেছে। এখান থেকে তিরিশ কিলোমিটার দূরে শিবনেরি দুর্গ দেখতে যাওয়া। শিবনেরি দুর্গ হছে শিবাজির জন্মস্থান। এখানকার পাহাড়গুলো এত নিচু যে দশ মিনিট গাড়ি করে গেলেই উপত্যকায় নেমে যাওয়া যায়। সেখানে হাটবাজার, স্কুল, স্কুলে যাওয়া বাচ্চা, ধপধপে সাদা ও গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মিউনিসিপ্যালিটি অফিস দেখে আবার দশ মিনিট গাড়ি চালালেই আরেকটা পাহাড়ের মাথা। এরকম কয়েকটা পাহাড় নেমে উঠে আমরা পৌঁছে গেলাম শিবনেরি দুর্গের গোড়ায়।

আমাদের বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গেছে কারণ সকালে ঘুম থেকে উঠে যা দেখলাম তেমন কুয়াশা আমি জীবনে আর দেখিনি। কুয়াশা বললে কুয়াশা, মেঘ বললে মেঘ। সে কুয়াশার ছোঁয়া সাংঘাতিক, যা ছোঁয়, ভিজিয়ে স্যাঁতসেঁতে করে দেয়। আমাদের বারান্দা ভিজে, করিডোরের চৌকো টাইলের কোণে কোণে জলবিন্দু চকচক করছে, বাথরুমে কাল সন্ধ্যেবেলা গা ধোয়ার তোয়ালে এখনও শুকোয়নি। এই স্যাঁতসেঁতে চরাচরে একমাত্র চনমনে দেখছি বারান্দায় রাখা টবের গাছগুলো। আর আমার মেজাজ। এই দেখতেই তো এসেছি।


গাড়ি যেখানে নামিয়ে দিল সেখান থেকে চারশো সিঁড়ি ভেঙে আর গোটা সাতেক ভাঙাচোরা গেট পেরিয়ে শিবনেরির ধ্বংসাবশেষ। এই দুর্গেই ষোলোশো তিরিশ (কিংবা সাতাশ) সালে জন্মেছিলেন শিবাজি। তাঁর ছোটবেলাও এখানেই কেটেছিল।

দুর্গ বললে যদি আপনার চিতোর কিংবা দৌলতাবাদ মনে আসে তাহলে শিবনেরি হতাশ করবে। পাহাড়ের চুড়োয় আছে দুটো গেট, একটা মন্দির, একটা সাধারণ দোতলা বাড়ি যে বাড়িতে শিবাজি জন্মেছিলেন আর বাদামি তালাও নামের একটা লেক। আর পাহাড়ের আরেকটু ওপরে জঙ্গলের মধ্যে একটা কাঠামো চোখে পড়ল। পরে নেমে এসে ম্যাপ পড়ে মনে হল সেটা একটা মসজিদ হলেও হতে পারে।

   
শিবাই দেবীর মন্দির যার নামে শিবাজির নামকরণ হয়েছিল।

কিন্তু গুরুত্বের মাপ তো সাইজ দিয়ে হয় না। যেটাকে আমার সাধারণ পাকাবাড়ি মনে হচ্ছে সেটা অনেকের কাছে পুণ্যতীর্থ। এলগিন রোডের দোতলা বাড়িটাকেও আমার সাধারণ দোতলা বাড়ি বলেই মনে হয়, কিন্তু ও বাড়ির দুশো মিটারের ভেতরে পা রাখা মাত্র অনেক চেনা লোকের বুকের ছাতি, নাকের পাটা দু’ইঞ্চি ফুলে যেতে দেখেছি। সে সময় মুখ ফসকে নেহরুর নাম বেরিয়ে গেলে আর রক্ষা নেই। এ বাড়ির ক্ষেত্রেও সে রকমই ব্যাপার ঘটে নিশ্চয়। ভেতর থেকে শিবাজি এবং মহারাষ্ট্র সম্পর্কিত জয়ধ্বনি শুনলাম।

শিবনেরি দুর্গের দেখাশোনা করেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এবং বলতেই হবে ভালোই করেন। চড়াই শুরু হওয়ার মুখে রেলিং-এর পাশে সুন্দর সাজানো বাগান। সিঁড়ি পরিষ্কার। যেটা সবথেকে ভালো লাগল সেটা হচ্ছে ওখানে যে সব লোকজন ব্যবসা করেন তাঁদের মধ্যে এই পরিচর্যার ব্যাপারটা গেঁথে গেছে। পাহাড়ে ওঠার পথের বাঁকে বাঁকে শশার ঝুড়ি, কোকম সিরাপের শিশি, ঘোলের কুঁজো, চায়ের সসপ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিক্রেতারা। দোকানের চারপাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। সব বর্জ্য যাচ্ছে পাশের ঝুড়িতে। আমরা নামার সময় চা খেলাম, হাতে হাতে কাগজের কাপ তুলে দিয়ে বিক্রেতা মনে করিয়ে দিলেন সেগুলো যেন আমরা খাওয়া হয়ে গেলে নির্দিষ্ট জায়গাতেই ফেলি।


ফিরতে চারটে বেজে গেল। চিন্তা হচ্ছিল দুপুরের খাবার পাওয়া যাবে কী না, হয়তো সাবপার পকোড়া খেয়ে লাঞ্চ সারতে হবে, দেখলাম যাচ্ছে। অনেক ফ্যামিলিই সারাদিন বেড়িয়ে ফিরেছেন। খাবার জায়গাটা গমগম করছে। কালকের থেকে ভিড় আজ আরও বেশি।

এতক্ষণ এমন কিছু ক্লান্তি টের পাচ্ছিলাম না। খাবার পেটে পরার পর ঘর পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারব কি না সন্দেহ হতে লাগল। মিনিট তিরিশ অজ্ঞান থাকার পর অর্চিষ্মানের ঠেলাঠেলিতে ঘুম ভাঙল।

বাইরের অবস্থা দেখ।

অবস্থা সকালের থেকেও খারাপ। বারান্দার টবগুলোও আর দেখা যাচ্ছে না।

চাদর গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কম্পাউন্ডের বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। খাবার জায়গা পেরিয়ে, বাচ্চাদের পার্ক পেরিয়ে, কটেজগুলো পেরিয়ে ঢালু মাঠ গড়িয়ে গেছে খাদের দিকে। রাস্তা বোঝার উপায় নেই, শুধু আন্দাজে এগিয়ে যাওয়া। এই কুয়াশাতেও পার্ক জমজমাট। সেদিক থেকে ভেসে আসা চিৎকার অনুসরণ করে পার্ক অবধি পৌঁছলাম, তারপর আন্দাজ। দু’হাত দূরের জিনিস দেখা যাচ্ছে না। মাঠের মাঝে মাঝে দুয়েকটা আবছা গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে গাছেদের গায়ে পাতা খুব কম। হাওয়ায় উড়ে যায় বোধহয়। আমাদের গায়ের চাদরেরও পাতার মতোই অবস্থা। হাওয়াটা আসছে খাদের দিক থেকে আর আমরা হাঁটছি খাদের দিকে মুখ করে, চাদর গা থেকে খসে গেছে অনেকক্ষণ। এখন কোনওমতে খামচে রেখেছি যাতে উড়ে না যায়। এটা আবার আমার চাদরও না, মায়ের। একবার পরে দিল্লি এসেছিলেন। আমি বললাম বাঃ, ভালো তো দেখতে। খুলে রেখে চলে গেলেন। বললেন এটা হালকা, নভেম্বর মাসে কাজে লাগব। এভাবে নভেম্বর, ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাসের উপযোগী চাদর মা নিজের গা থেকে খুলে রেখে গেছেন। নিজে এখন কী পরছেন কে জানে।

আরও অনেকে বেরিয়েছে এই কুয়াশায়। সকলেই অন্ধের মতো ঘুরছে, হঠাৎ ধাক্কা খাওয়ার আগের মুহূর্তে কুয়াশার ভেতর থেকে ভুস করে ভেসে উঠছে। একটা বড় গ্রুপ এসেছে, তাদের কলকাকলি শোনা যাচ্ছে। সমুদ্রের মতো খাদেরও পরদ্রব্য না নেওয়ার নীতি আছে বোধহয়। এরা সেটা পরীক্ষা করে দেখছে। সাদা রুমাল মুঠো করে যত জোরে পারা যায় খাদের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। দ্বিগুণ বেগে রুমাল ছিটকে আসছে উল্টোদিকে। অমনি সবাই দৌড়োচ্ছে তার পিছু পিছু। রুমালের কুয়াশায় তাদের উল্লাস ভেসে যাচ্ছে। রেলিং ধরে হাঁটতে লাগলাম। একজায়গায় মাথার ওপর ঝপঝপ করে জল পড়ল। চার পা এগিয়ে যেতেই আবার কিচ্ছু না।

সেদিন রাতে হাওয়ার শব্দ অনেক কম মনে হল। হয়তো কানে সয়ে গেছে। কিংবা হয়তো হাওয়াটার কাছে আমরা সয়ে গেছি, তাই রাগ কমে গেছে।

*****

শেষ দিন সকালে আর কোনও এজেন্ডা ছিল না, ব্রেকফাস্টে মিসাল পাও খাওয়া ছাড়া। মিসাল হচ্ছে চানাচুর ছড়ানো স্প্রাউটের ঝোল। ওঁরা চানাচুরের অংশটায় কার্পণ্য করেননি, তাই জিনিসটাকে চানাচুরের ঝোলও বলা যেতে পারে। অর্চিষ্মান দু’চামচ খেয়ে বলল, ওর নাকি অদ্ভুত লাগছে। বলে চামচ নামিয়ে রেখে শুধু শুধু পাও খেল। আতার আইসক্রিম যার অদ্ভুত লাগে না, চানাচুরের ঝোলের প্রতি তার এই মনোভাব থাকা উচিত নয়। আমারও যে অপূর্ব কিছু লাগছিল তেমন নয়, কিন্তু চানাচুর নষ্ট করা আমার নীতিবিরুদ্ধ কাজেই আমি খেয়ে নিলাম। খেতে খেতেই মনে হল চানাচুরের আইসক্রিম হলে কেমন হবে। আমি টেস্ট করে দেখতে রাজি আছি।

আজ আমরা বম্বে ফিরব, বম্বে থেকে দিল্লি ফেরাও আজকেই। কালকের তুলনায় আজ কুয়াশা অনেক কম, কাজেই তাড়াতাড়ি বেরোতে অসুবিধে হল না। চাবি ফেরত দিয়ে সিকিউরিটি বাবদ জমা রাখা পাঁচশো টাকা ফেরত দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। এম টি ডি সি-র খোলা গেট দিয়ে গাড়ি বেরিয়ে এল।

অভিজ্ঞতা থেকে জানি, আসতে যতটা সময় লেগেছিল ফেরাটা তার থেকে অনেক দ্রুত হবে। যাওয়ার পথে সেই যে একটা গুহার মতো পেরিয়েছিলাম, সেটা চলে গেল। একটা জোরালো ঝর্নার কাছাকাছি এসে ড্রাইভার ভাইসাব কাচ তুলে দিতে বলেছিলেন, সেটাও গেল। গত ক’মাস ধরে প্রত্যেকটা বোরিং, অসহ্য মুহূর্তে যার আশ্বাস মনের মধ্যে টের পেয়েছি সেই মালশেজ ঘাট আর কয়েকমুহূর্তের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে।

নিজের কাছে নিজেই খবর নিলাম।

মন ভরল? হ্যাঁ।

কতখানি? অনেকখানি।

যতখানি ভেবেছিলে ততখানি কি?

মাথা ঝাঁকিয়ে ‘অফ কোর্স’ বললাম বটে, কিন্তু আমিও বুঝলাম, যাকে বললাম সেও বুঝল, ঝাঁকুনিতে সে জোর নেই।

একটি ফোঁটাও বৃষ্টি পড়েনি গত দু’দিনে।

নিজেকে মনে করালাম, বৃষ্টি দেখিনি তো কী হয়েছে, অসামান্য কুয়াশা দেখেছি, হাওয়ার অশরীরী ডাক শুনেছি, প্রিয়জনদের সঙ্গে বসে গরম গরম রুটি আর আমার প্রিয় আলুজিরা খেয়েছি - আর কী চাই।

কিন্তু অতৃপ্তি একবার যখন সেঁধিয়েছে তখন তাকে বার করার অত সোজা নয়। মনের একটা কোণ কামড়ে বসে থাকবে। তারপর কাঁকড়ার মতো গুটি গুটি এগোবে। যতক্ষণ না সমস্ত প্রাপ্তির স্মৃতি নির্মূল করে গোটা মনটা দখলে আসছে, থামবে না। কুয়াশা হাওয়া শিবাজির বাড়ি সব মুছে গিয়ে মালশেজ ঘাট হেডিং-এর তলায় জ্বলজ্বল করবে একটিমাত্র খবর - এত পয়সা খরচ করে বৃষ্টি দেখতে গিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরেছিলাম।

এমন সময় উইন্ডস্ক্রিনে প্রথম ফোঁটাটা চোখে পড়ল। সত্যি বলতে কি আমি ওটাকে দাগ ভেবে ভুল করতাম, যদি না কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গোটা কাচটা দুপাশের জানালায় অগুন্তি দাগে ভরে যেত, যদি না বাঁকানো রুপোলি তীর লাখে লাখে এসে বিঁধে যেত আমাদের গাড়ির সারা গায়ে, চকচকে রাস্তায় আছড়ে পরে ছিটকে উঠত। হাওয়ার ঝাপটে মাঝে মাঝে তাদের সুবিন্যস্ত শৃঙ্খলা এলোমেলো হয়ে গিয়ে ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছিল চারদিক। পথের পাশে গাছের তলায় মোটরবাইক হার মেনে পথের পাশে গাছের তলায় থেমেছিল কিন্তু কচুপাতার ছাতা হেঁটে চলেছিল অকুতোভয়। সিমেন্টের বস্তার লম্বালম্বি একদিকের সেলাই কেটে বানানো বর্ষাতিও বেশ কার্যকরী। কিছু বর্ষাতিওয়ালার সঙ্গে আবার একদল ছাগলছানা। তারা কেউ মনে করে ছাতা নিয়ে বেরোয়নি বাড়ি থেকে কাজেই নিজের বর্ষাতি থাকা সত্ত্বেও ভদ্রলোক ছাগলদের মুখ চেয়ে গাছের তলায় অপেক্ষা করছিলেন।

কিন্তু এসব ছাপিয়ে যা চোখে পড়ল তা হচ্ছে সবুজ। ফিকে, গাঢ়, কচি কলাপাতা, আমার প্রিয় টি শার্টের রঙের, জানালার পাশে রাখা নকল বনসাই বাঁশের পাতার রঙের - আমার দেখা, না-দেখা, বাস্তবের, কল্পনার যত সবুজ সব ঝেঁপে এল আমার চারদিকে। চোখ লেপে দিল, অতৃপ্তিকে ছুঁড়ে বার করে দিয়ে মন ভরে দিল। বৃষ্টি যখন থামল তখন দেখি পাহাড় শেষ, সবুজ শেষ, বেড়ানোও শেষ। আর অবশেষে এয়ারটেলের নেটওয়ার্ক ফিরে এসেছে।
                                           
                                                                                                                               (শেষ)
                                  

August 23, 2016

মালশেজ ঘাট ১/২





শনিবার বিকেলে যখন টি থ্রি-র দিকে যাচ্ছি তখন পঞ্চশীল পার্কের বাড়িগুলোর মাথার ওপর আকাশের ঘন স্লেট রঙে একচুল ফাঁক নেই যেখান দিয়ে নিভে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো একবার দিনের আলো ঢুকে পড়তে পারে। ওয়াইপারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হিপনোটাইজড হওয়ার সম্ভাবনা। ঘাড় ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে দেখলে মনে হচ্ছে গত ক’দিনে জল পেয়ে গাছগুলো যেন আরও ইঞ্চিদুয়েক লম্বা হয়েছে। আরও পুরুষ্টু, আরও সবুজ। দুলছে মাথা নেড়ে নেড়ে। হা হা করে হাসছে আমরা বাক্সপ্যাঁটরা বেঁধে বৃষ্টি দেখতে চলেছি দেখে।

যখন টপ টেন মনসুন ডেস্টিনেশন ইন ইন্ডিয়া দিয়ে সার্চ করেছিলাম তখন দিল্লির এ চেহারা কল্পনাতেও ছিল না। লিস্টের বেশিরভাগ নামই দিল্লি থেকে বহুদূরের। কাছাকাছির মধ্যে বারবার আসছিল খালি উদয়পুরের নাম। লেকের মাঝখানে প্রাসাদের বারান্দায় বসে বৃষ্টি উপভোগ করুন। সে উপভোগের কতখানি বৃষ্টির কেরামতি আর কতখানি লেকের মাঝখানে বিলাসবহুল প্রাসাদের সন্দেহ ছিল বলে এগোইনি।

শেষ পর্যন্ত পশ্চিমঘাট পর্বতমালাই স্থির হল। টপ টেন মনসুন ডেস্টিনেশনস ইন ওয়েস্টার্ন ঘাটস বলে সার্চ দিলাম। লোনাভালা, পঞ্চগনি, খান্ডালা এসবের নাম বেরোলো। সঙ্গে চমৎকার ছবি। অর্চিষ্মান আগে একবার পঞ্চগনি গেছে এবং মুগ্ধও হয়েছে। কিন্তু আমি উৎসাহ পাচ্ছিলাম না। জায়গাগুলোর নাম শুনলেই মনে পড়ে যাচ্ছিল আমির খান রানী মুখার্জিকে বেড়াতে যাওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করছেন, দামি গাড়ি চেপে স্টারদের ছেলেমেয়েরা বোর্ডিং স্কুলে যাচ্ছে।

অবশেষে একটা জায়গার নাম বেরোলো যাতে বলিউডের ছোঁয়া লাগেনি (অন্তত আমি শুনিনি)। মালশেজ ঘাট। ছবি দেখে পছন্দ হল। বর্ণনা পড়েও। শুধু একজন দেখলাম লিখে রেখেছেন, বিওয়্যার অফ ড্রাংকার্ডস। 

মুম্বই থেকে মালশেজ ঘাট একশো তিরিশ-চল্লিশ কিলোমিটার। গাড়ি করে যেতে লাগার কথা আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। রাস্তায় থেমে চা খেলে সেটা সাড়ে তিন হয়ে যাবে। তবে সময়ের হিসেব সবটাই বম্বে থেকে বেরোনোর পর। বম্বের ভেতর কতখানি যেতে কতক্ষণ লাগবে সেটা কপালের ব্যাপার।

নাকবরাবর রাস্তা, থানে হয়ে কল্যাণ হয়ে মালশেজ ঘাট। তক্কে তক্কে ছিলাম, কল্যাণ আসতেই জানালা দিয়ে ঘাড় বার করে যতখানি পারা যায় দেখে নিলাম। দেখার কিছু নেই, ঘিঞ্জি মফস্বল। তবু বহুদিনের একটা গোপন সাধ মিটল। যবে থেকে জেনেছি বাবার নামে একটা জায়গা আছে পৃথিবীতে, এই ভারতেই, তবে থেকে আমার সাধ সে জায়গাটা দেখার। অবশেষে সে সাধ মিটল।

কল্যাণের পর আর জ্যামট্যাম নেই। দুপাশে ফাঁকা মাঠের মধ্য দিয়ে ঝকঝকে এন এইচ একষট্টি। দেড়টা নাগাদ পথের পাশে ধাবায় থামলাম। আমার দোসা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল। জানা গেল একটা বাজতে দোসাওয়ালা তাওয়া গুটিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। তখন নিলাম রুটি আলুজিরা আর স্থানমাহাত্ম্যের স্বার্থে ভেজ কোলাপুরি। কটা চোখওয়ালা শান্ত পরিবেশক জানতে চাইলেন, বংগাল সে? আমরা মাথা নাড়াতে বললেন উনিও ওইদিকেরই, ঝাড়খণ্ড।

যতদূর মনে পড়ছে জানালার বাইরে 'মালশেজ চুয়াল্লিশ’ লেখা হলুদ শিল পেরোনোর পরই তফাৎটা হল। পথের দুপাশ থেকে বড় বড় গাছ উঁচু হয়ে বানিয়ে ফেলল একটা প্রকাণ্ড দুর্ভেদ্য সবুজ পাঁচিল। আকাশ বলতে রইল শুধু উইন্ডস্ক্রিনের সামনের ফালিটুকু। এসি থামিয়ে কাচ নামানো হয়েছিল আগেই। তাপমাত্রা নামল হু হু করে। আচমকা দেখি আমরা গাছেদের ছাড়িয়ে ওপরে উঠে এসেছি, আকাশটা আবার গোটা হয়ে গেছে আর চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাথরের বুড়ো পাহাড়। তাদের গায়ে সারি সারি আঁচড় কাটা। মাঝে মাঝে সরু সাদা ফিতের মতো ঝরনা। ড্রাইভার ভাইসাব আঙুল দিয়ে খাদের ওপারের একটা জায়গার দিকে দেখালেন। সাদা ধোঁয়ার মতো উঠছে। তারপর বুঝলাম ধোঁয়া নয়। ঝরনার জল। হাওয়ার ঝাপটে ওপর দিয়ে উঠে যাচ্ছে।

মালশেজ ঘাট এম টি ডি সি আবাস

ঘরে ঢুকে ব্যাগ নামিয়ে চায়ের অর্ডার দিয়ে প্রথমেই গেলাম বারান্দায়। আমার বাড়ির রান্নাঘর আর বাথরুম মেলালে বারান্দাটার থেকে বেশি বড় হবে না। বারান্দার মাথা পর্যন্ত উঁচু রেলিং-এর ওপাশে খানিকটা সবুজ মাঠ, আর তার পর একটা কোমরছোঁয়া রেলিং। তারপর কী আছে দেখা যাচ্ছে না। কারণ রেলিংএর গা বেয়ে লতার মতো নামতে শুরু করেছে সাদা মেঘ। আমরা দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম।

আট মাস বাদে বেড়াতে যাচ্ছি, হতাশ হওয়া যে চলবে না সে রকম একটা দাবি মনের মধ্যে ছিল। তাই ইন্টারনেটের বাইরে রক্তমাংসের কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছিলাম জায়গাটা নিয়ে। দুয়েকজনকে পাওয়াও গেল যারা মালশেজ ঘাট গেছে। কেউ একদিন গিয়েই চলে এসেছে, কেউ দু’রাত থেকেছে। কিন্তু সকলেই একটা ব্যাপারে একমত।

মালশেজ ঘাটে কিচ্ছু দেখার নেই। কিচ্ছু করার নেই।

আমার মতো কুঁড়ে লোকের পক্ষে মালশেজ ঘাট আদর্শ জায়গা। চাইলেও কেউ কিছু করিয়ে নিতে পারবে না। যে সব জায়গায় অনেক কিছু করার থাকে, দেখার থাকে, সে সব জায়গায় দেখা আর করা শুরুর আগেই আমি হা-ক্লান্ত হয়ে পড়ি। অথচ যেহেতু জানি মালশেজ ঘাটে আমি সেফ, চাইলেও কেউ কিছু করিয়ে নিতে পারবে না, জিপে তুলে নিয়ে ছুটে সাইট সিয়িং-এ বেরিয়ে যেতে পারবে না, এখানে আমার এনার্জি দেখার মতো ছিল। শিগগিরি অন্ধকার নামার প্রতিশ্রুতি ছিল বলেই সাহস করে বললাম ততক্ষণ একটু হেঁটে আসা যাক।

হোটেলের গেটের সামনে একটু দূরে পাথুরে জায়গায় একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস হচ্ছে দেখলাম। এক ভদ্রমহিলা, গোলাপি ঝলমলে ঘাঘরা পরে এবড়োখেবড়ো পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে সলমাচুমকি বসানো বেগুনি ওড়নার দুই কোণা ধরে দুই হাত মাথার ওপর তুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ওড়নাটা পত পত করে উড়ছিল আর চারজন লোক বিভিন্ন অ্যাংগেল থেকে তাঁর ছবি তুলছিলেন। কাজটা ভয়ানক শক্ত। আমরা বাটার ফ্ল্যাট জুতো পরে পাকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাওয়ার ধাক্কায় পড়ো পড়ো হচ্ছিলাম, মহিলার ওইরকম গৌরাঙ্গমূর্তিতে পাথরের ওপর দাঁড়াতে না জানি কত ব্যালেন্স করতে হচ্ছিল।


কুয়াশার সমুদ্রে সূর্য ডুবে গেল।

আর সত্যিই কিছু দেখার নেই। আমরা ঘরে ফিরে এলাম। বিকেলের চা হজম হয়ে গেছে। সাড়ে সাতটা বাজতে না বাজতে দৌড়ে গেলাম খাবার ঘরের দিকে। দোতলার সমান উঁচু সিলিংওয়ালা প্রকাণ্ড হল। আমরা ছাড়াও অনেকেই আছে হোটেলে। ক্রমে হল ভরে উঠল। আমার কী যেন একটা অসুখ হয়েছে, মাছমাংস খাওয়ার কথা মনে হলেই পেট ব্যথা করে। তাছাড়া এরা আলুজিরাটা কেমন বানায় দেখা দরকার। মোটা মোটা নির্ঝাল লংকা কামড়ে রুটি আলুজিরা খেতে খেতে দেখতে পাচ্ছিলাম খোলা দরজা দিয়ে হু হু করে সাদা ধোঁয়া ঢুকে আসছে। গা শিরশির করছিল। সুটকেসের নিচে খুব অশ্রদ্ধা করে যে দুটো চাদর ফেলে রেখেছি, সেগুলো বার করতে হবে মনে হয়। খেয়ে বেরিয়ে এলাম যখন তখন বারান্দা, মেঝে, বাঁধানো ফুটপাথ ভিজে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে ঝাপসা দুয়েকটা হলুদ বাল্ব জ্বলছে এদিকওদিক। খুব মৃদু গলায় পুরোনো হিন্দি গান ভেসে আসছে। কম্পাউন্ডে ছড়ানো বিল্ডিং-এর দেওয়ালে রেডিও গেঁথে রেখেছেন। প্রথমটা খুব বিরক্ত লেগেছিল। পাকাবাড়ি, গিজার, মোবাইলে সিগন্যাল পর্যন্ত ঠিক আছে, এর বাইরে প্রকৃতি আর আমার মধ্যে কোনওরকম সভ্যতার বাধা আমার পছন্দ নয়। কিন্তু ওই মুহূর্তে ঠাণ্ডা ভেজা অন্ধকারের মধ্যে লতার মিহি গলা কম্পাসের কাজ করছিল। 

ঘরে ফিরেই রিমোট হাতে কম্বলের তলায় সেঁধোলাম। একটা চ্যানেলে গুমনাম দিয়েছে। হাম কালে হ্যায় তো কেয়া হুয়া দিলওয়ালে হ্যায় গানটা শুরু হচ্ছিল। দেখলাম। এর পরই খুনটুনগুলো হবে। বাইরে যা ওয়েদার তাতে এই সিনেমাটাই দেখা উচিত কিন্তু এতবার দেখা যে আমরা চ্যানেল পাল্টালাম। ‘তু চিজ বড়ি হ্যায়’-এর তালে তালে আলোছায়ায় ঢেউ তুলছেন অক্ষয়কুমার আর রবিনা ট্যান্ডন। আমার মায়ের আতংক মূর্তিমান হয়ে টিভির পর্দায় নেচে বেড়াচ্ছে। এখন এই গানগুলো শুনলে, নাচগুলো দেখলে ভারি অবাক লাগে। কেন মা ভেবেছিলেন এগুলোর ক্ষমতা আছে মেয়ের ভবিষ্যৎ মাটি করার?

মায়ের ছেলেমানুষির কথা ভাবছি অমনি টিভি নিভে গেল। এখানে খুব কারেন্ট যায়। বাইরে রিসেপশনে সতর্কতাবাণী সাঁটা আছে। জেনারেটরের ব্যাক আপ “পার্শিয়াল”। দেখেশুনে ভয় পেয়েছিলাম। তবে পরে বুঝলাম ওঁরা ঝুঁকি নেবেন না বলে অত ডিসক্লেমার দিয়ে রেখেছেন, পরিস্থিতি আসলে তত খারাপও নয়। কারেন্ট যায় ঠিকই কিন্তু তৎক্ষণাৎ চলে আসে। একটাই ক্যাচ, কারেন্ট আসার পর টিভিটা নিজে থেকে চলে না। মানে রিমোট ব্যবহার করে চালানো যায় না। উঠে গিয়ে গায়ের বোতাম টিপতে হয়।

কারেন্ট এসে গেল। আমরা একে অপরকে উঠে গিয়ে টিভি চালানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ক্ষান্ত দিলাম। অন্ধকার ঘরে টিভির নীল বিন্দুটা জ্বলে জ্বলে আমাদের কুঁড়েমোর প্রতি ধিক্কার জানাতে লাগল।

হাওয়া যে অত শব্দ করতে পারে আমি এর আগে কখনও উপলব্ধি করিনি। গাছের পাতায় ঝড়ের শব্দ শুনেছি, টেবিলে রাখা খোলা পাতায় ফ্যানের শব্দ শুনেছি। কিন্তু খাদের চারধার ঘিরে থাকা পাথরের দেওয়ালের গায়ে ধাক্কা মেরে ঘুরতে থাকা হাওয়ার শব্দ কখনও শুনিনি। শ’খানেক রেসিং কার একসঙ্গে ছুটলে, ব্রেক কষলে, ওভারটেক করলে বোধহয় এ শব্দের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। সবথেকে খারাপ ব্যাপার হচ্ছে আওয়াজটা শুনলে মনে হয় জিনিসটার মধ্যে প্রাণ আছে। পাথরের সঙ্গে হাওয়ার ঘর্ষণের বোরিং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় যেন কিছুতেই একে ধরা যায় না। এ যেন একটা বিটকেল জন্তুর গলা থেকে বেরোনো বীভৎস আর্তনাদ, কোনও জুলজির ক্যাটালগে যার ছবি ছাপা হয়নি কোনওদিন। জন্তুটা আর আমার মধ্যে যে দুটো লোহার রেলিং, একটা শক্তপোক্ত কাঠের দরজা, কংক্রিটের চারটে দেওয়াল আর একখানা ছাদ আছে, ভেবে আমি বারবার নিজের কপালকে কৃতজ্ঞতা জানাতে লাগলাম। খোলা মাঠে এ হাওয়ার খপ্পরে পড়লে না জানি কী হত। প্রাণটা শুষে নিয়ে ছিবড়েটুকু ছুঁড়ে ফেলে দিত ওই জঙ্গুলে খাদে, কে জানে কোন লুপ্ত পাখি ডিম পাড়ছে সে জঙ্গলের ছায়ায়, হতভাগ্য বিজয় বিশ্বাসের মৃতদেহ খুবলে খেয়ে পা টিপে টিপে ঘুরে বেড়াচ্ছে হিংস্র বাঘসিংহের দল, ওপর থেকে আবার কখন কোন শিকার এসে পড়ে তার আশায় ঠোঁট চাটছে।

                                                                          (চলবে)


August 20, 2016

সাতটা জানা আর সাপ্তাহিকী



দিল্লির মেয়ে ফের দিল্লিতে। গত ক’দিন ঘুরতেফিরতে যা যা চোখে পড়ল তার থেকে ঝেড়েবেছে সাতটা পয়েন্ট আপনাদের বলছি। 

১। এদের অনেক শব্দ ‘লা’ দিয়ে শেষ হয়। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কতবার যে থেমে পেছন ফিরেছি, কেউ আমার নাম ধরে ডাকল ভেবে।

২। ভাষায় ড় এবং ণ-এর প্রাধান্য থাকলে, যত মিষ্টি করে যা-ই বলা হোক না কেন, কঠিন শুনতে লাগে।

৩। অথচ এঁরা কেউই কঠিন প্রকৃতির নন। এঁদের থেকে আমি অনেক বেশি কঠিন। দিল্লিতে লোকে খুব স্বাভাবিক কথাও মারমুখো হয়ে বলে। আমিও বলতে শিখে গেছি। সোয়া একঘণ্টা লেটে গাড়ি নিয়ে এসে ভাইসাব এমন মোলায়েম সুরে জ্যামের অভিযোগ (অভিযোগটা খাঁটি) করতে লাগলেন যে কিছুক্ষণ আগে ফোনে আমি কী রকম কড়া গলায় ওঁকে “আপ কাহাঁ হো?” জিজ্ঞাসা করেছিলাম মনে করে নিজেরই লজ্জা করতে লাগল। 

৪। বড় বাড়ি আর ওপচানো ভ্যাট দুটোই দিল্লিতে আছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুটো আলাদা আলাদা জায়গায়। এখানে একেবারে পাশাপাশি। 

৫। এখানে পাড়ায় পাড়ায় ন্যাচারাল আইসক্রিমের দোকান। শুধুমাত্র এই কারণে যে কোনওদিন অর্চিষ্মান বলবে, চল, বম্বে শিফট করি। 

৫। দিল্লির সঙ্গে যদি আমার দৈব জড়িয়ে না থাকত তাহলে আমি সত্যি সত্যি থানেতে শিফট করতাম। ঘরের পর্দা উড়িয়ে নেওয়া ঝোড়ো হাওয়া, পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁচু মলের ছাদ আর হিরা নন্দানি গ্রুপের সিগনেচার টোপর পরা আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাটবাড়ি, তার ওপারে লেক, লেকের গায়ে পাহাড়, জঙ্গল, জঙ্গলে চিতাবাঘ। যা যা একটা মানুষের লাগতে পারে, শহুরে স্বাচ্ছন্দ্য আর প্রকৃতির আরাম, সব আছে থানেতে। 

৬। আইসক্রিম খেতে খেতে লোখণ্ডওয়ালা মার্কেট দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছি, এমন সময় একজনকে আমাদের পাশে পাশে হাঁটতে দেখে ভয়ানক অস্বস্তি হল। কীসের অস্বস্তি প্রথমটা ধরতে পারছিলাম না। তারপর পারলাম। এই ভদ্রলোককে আমি টিভির ভেতরে দেখেছি। অনেকবার। (নাম জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারব না, কোন সিনেমা/সিরিয়ালে দেখেছি তাও মনে নেই, কাজেই গুগল সার্চের রাস্তা বন্ধ) সেই লোকটা টিভি থেকে বেরিয়ে আমার পাশে পাশে হাঁটছে! স্বাভাবিক মানুষের মতো! তারপর থেকে সব স্বাভাবিক লোককে দেখলেই চেনা চেনা ঠেকছে। মনে হচ্ছে সবাইকেই টিভিতে দেখেছি বোধহয়।

৭। মালশেজ ঘাট থেকে ফেরার পথে চা খেতে থেমেছিলাম। কড়াইভর্তি তেলে ডুব দিয়ে পুরুষ্টু বড়ারা উঠছিলেন আর পাওয়ের মধ্যে সেঁধিয়ে প্লেটে চড়ে টেবিলে টেবিলে আসছিলেন। আশপাশে সবাই ওইটাই খাচ্ছিল। আমার লোভ লাগছিল কিন্তু ব্রেকফাস্টের মিসাল পাওয়ে তখনও গলা পর্যন্ত ভর্তি। কাজেই শুধু চা খেয়ে উঠে পড়লাম। দাম দিতে গিয়ে বললাম, তিন চায় কিতনা ভাইসাব? ভাইসাব বললেন, তিন কাটিং? আমি অ্যাঁ বলতে গিয়েও সামলে নিয়ে বললাম, হাঁ হাঁ, তিন কাটিং।  

*****

মালশেজ ঘাটের গল্প আসছে, তার আগে এ সপ্তাহের ইন্টারনেট।





I want to be thoroughly used up when I die, for the harder I work the more I live. I rejoice in life for its own sake. Life is no “brief candle” for me. It is a sort of splendid torch which I have got hold of for the moment, and I want to make it burn as brightly as possible before handing it on to future generations.
                                                                                            ---George Bernard Shaw

অলিম্পিকস

বাকিরা। আর উসেইন বোল্ট। 

“It’s a one-in-a-million type of event, but we’re prepared,” অলিম্পিকের সাঁতারের পুলে লাইফগার্ড রাখার যুক্তি। (নিউ ইয়র্ক টাইমস)



খবরাখবর

জর্জ ডাবলিউ বুশ কম্পিটিশন করে বই পড়তেন, ক্লিন্টনদম্পতি মায়া অ্যাঞ্জেলো-র অনুরাগী ছিলেন, (But, (Bill) Clinton confessed, really he was addicted to mysteries.) আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের, ফ্র্যাংকলি, পড়ার সময় নেই। 


এঁরা বলছেন ওয়ার্কপ্লেসের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে অ্যাপ্রিসিয়েশন। আমি বলি বাড়িরও। গোটা জগৎটারই। মর্ম না বুঝলে (আর সেটা স্বীকার না করলে) সব মাটি। 

আমার মা মনে করেন না খেলে তবু চলে, চান না করলে চলে না। এই লিংকটা মাকে দেখাতে হবে। যদিও তাতে মায়ের মত পাল্টাবে না। 

তিনশো নব্বই বছরের বুড়ো বনসাই। অ্যাটম বোমা হজম করেছেন।  

আমার চেনা একজন এ’রকম মৌন ক্যাম্পে গিয়েছিল। সে ধ্যান করতে বসে ঘুমোত। আমার খুব শখ একবার এ'রকম ক্যাম্পে যাওয়ার। 

ছবি


খেলা

আপনার এনার্জি কোন রঙের? আমার ইন্ডিগো। শেষ পরামর্শটা মনে রাখার চেষ্টা করব। 
You are highly energetically charged and spiritually deep. You radiate a deep and dominant energy that is connected to others. You are highly intuitive and are an extremely good judge of character. You have a powerful energy that allows you to set positive and ambitious goals and achieve them. You have a true gift in that you can see things others may not see. Just be careful not to judge a book by its cover all the time. 



August 13, 2016

সাপ্তাহিকী আর ছুটি







I would maintain that thanks are the highest form of thought, and that gratitude is happiness doubled by wonder.
                                                                                                     —G. K. Chesterton


পড়া হয়ে গেলে ওবামার সঙ্গে দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ইন ফ্যাক্ট আলোচনা সিনেমাটা দেখে নিয়ে করলে আরও জমবে।  

মিউজিয়ামে শব্দছক সাজানো আছে দেখলে সেটা আবার ভর্তি করতে লেগে যাবেন না যেন। 

বইয়ের দোকান আর লাইব্রেরির ঘনত্ব দিয়ে শহরের র‍্যাংকিং। 

তিরিশ বছর বাদে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নাকের ডগায়। 


হস্ত থাকিতে মুখে কেন কথা বল-র এর থেকে ভালো উদাহরণ পাওয়া শক্ত। এঁরা স্টোনহেঞ্জ আরেকবার বানিয়ে দেখছেন স্টোনহেঞ্জ বানানো কত শক্ত ছিল। 


এই হলাম আমি। Moderately sensitive & emotional. Free spirited & independent. Right-brained, creative. Not natural leader. Not kind or nurturing. 

আর যাঁরা গোয়েন্দাগল্প ভালোবাসেন তাঁদের জন্য গোয়েন্দার সঙ্গে লেখক ম্যাচ করার এই খেলাটা রইল। 

*****

আট মাসের দীর্ঘ খরা কাটিয়ে, স্বাধীনতা দিবস আর রাখীর ছুটির বিন্দু জুড়ে, অবশেষে আমরা বেড়াতে চললাম। ফিরব সামনের সপ্তাহের শেষদিকে। ততদিন অবান্তর হাঁফ ছেড়ে বাঁচুক।

টা টা। আবার দেখা হবে। 


August 12, 2016

দ্য কফি শপ, সাকেত


পি ভি আর অনুপম, সাকেত চত্বরের 'দ্য কফি শপ'-এ গিয়েছিলাম আগের সপ্তাহে।


সাধারণত কফির দোকানে গেলে অর্চিষ্মান কফি খায় (ক্যাপুচিনো, প্রত্যেকবার)। আমি চা (ইংলিশ ব্রেকফাস্ট কিংবা দার্জিলিং, ক্বচিৎ কদাচিৎ আসাম)। কিন্তু এঁদের মেনুতে কফির ছবি দেখে আমার লোভ হল। আমি নিলাম হ্যাজেলনাটের গন্ধওয়ালা কফি। অমনি দেখি অর্চিষ্মান মেনু মুড়ে বলছে, আমি বাবা আসাম চা খাব। বুঝলাম পছন্দঅপছন্দটা কথা নয়। চা-কফির ব্যাপারে ও আমার টিমে খেলবে না, সেটাই হচ্ছে কথা।


আমি কফির গুণবিচারী নই। শুধু হৃদয়খানা সুন্দর ফুটেছিল আর গন্ধও বেরিয়েছিল ভারি ভালো।

'দ্য কফি শপ' নামটা মিসলিডিং। ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে স্যালাড, পাস্তা, পিৎজা, ডেজার্ট সবই পাওয়া যায় দোকানে। আমরা অবশ্য এগুলোর একটার জন্যও যাইনি। আমরা গিয়েছিলাম এদের মেনুর ইন্টারনেট-খ্যাত ‘হিমালয়ান ব্রেকফাস্ট’ খেতে। সেটা এক প্লেট অর্ডার করা হল। 


আর পুলড পর্ক স্যান্ডউইচ এক প্লেট। 

পর্ক স্যান্ডউইচ ভালো খেতে কিন্তু আরও ভালো খেতে হচ্ছে হিমালয়ান ব্রেকফাস্ট। এতে থাকে তিব্বতি রুটি, আলুর তরকারি, গোর্খা আচার আর নন ভেজের অংশ হিসেবে মসালা অমলেট আর সসেজ ক্যাপসিকাম ফ্রাই।


আমি যদি আর কখনও 'দ্য কফি শপ'-এ যাই আর হিমালয়ান ব্রেকফাস্ট অর্ডার করি তাহলে নিরামিষ সংস্করণটা করব। কারণ সসেজ ফ্রাই আর অমলেট খেতে চাইলে অর্ডার করেই খাওয়া যায়। ননভেজ বানানোর জন্য হিমালয়ান ব্রেকফাস্টে সসেজ আর অমলেট জোড়ার আইডিয়াটা ছেঁদো।


বেসিক্যালি আমি খাব হাতে গড়া মোটা মোটা, নরম নরম, গরম গরম রুটি আর আলুর তরকারি। আল দেন্তের থেকেও নরম আলুর গায়ে জড়িয়ে থাকবে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া টমেটো, ধনেপাতা আর ফোড়নের সর্ষে। তিন আঙুল দিয়ে রুটি ছিঁড়ে আলুতে পেঁচিয়ে মুখে পুরব। পোরার আগে আচার একবার ছুঁইয়ে নিলেও হয়, নাও হয়। এ জিনিস এমনিই উঠে যায়, মুখশুদ্ধির ঠ্যাকনা ছাড়াই। মুখে পুরে চোখ বুজে চিবোব আর ভাবব রুটি আলুর তরকারির বদলে টিফিনে চাউমিন দেওয়ার জন্য অফিসটাইমে মাকে ঝুলোঝুলির প্রায়শ্চিত্তটা কীভাবে করব কে জানে।  

বেরোনোর আগে আরেক কাপ কফি তো লাগবেই। বিশেষ করে বাইরের চেহারাটা যদি এরকম হয়ে থাকে। 

যাঁরা কাছাকাছি থাকেন তাঁরা যাওয়ার কথা ভেবে দেখতে পারেন। এখান থেকে বিশদে জেনে নিন। 


August 10, 2016

দ্য ব্লাডি লিটল বেলজিয়ান




*স্পয়লার আছে।


উৎস গুগল ইমেজেস



Firstly, I am not a 'bloody little Frog!' I am a bloody little Belgian! 
                           ---হারক্যুল পোয়্যারো, দ্য মিস্ট্রি অফ দ্য স্প্যানিশ চেস্ট 

কারও সম্পর্কে কথা বলতে গেলে, বিশেষ করে সেটাকে যদি বিশ্লেষণের দিকে নিয়ে যাওয়ার উচ্চাশা থাকে তাহলে সে লোকটার প্রতি একটা আবেগহীন উদাসীনতার ভাব থাকলে সুবিধে হয়।  রাগ থাকলে বেরিয়ে পড়ে বিশ্রী ব্যাপার হয়, অন্ধ আনুগত্য থাকলেও আলোচনা ভজন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। 

কিন্তু আমি যে টাইপের লোক, দেখা হওয়ার (অনেক সময় না দেখেই) পাঁচমিনিটের মধ্যে একটা লোকের সম্পর্কে আমার মনে কিছু না কিছু মতামত জন্মে যায়। কারও সঙ্গে তেত্রিশটা উপন্যাস আর চুয়ান্নটা ছোটগল্প কাটানোর পর তো জন্মায়ই। সে সব মতামত নিজের কাছে রাখতে পারলেই সবথেকে ভালো কিন্তু তাহলে ব্লগ চলে না।

একমাত্র রাস্তা হচ্ছে পোস্ট শুরুর আগেই ডিসক্লেমার দিয়ে রাখা। বলে রাখা এর পর যা যা আসছে সে সবই আমার মতামত দ্বারা আকীর্ণ। নিরপেক্ষ আলোচনার দুরাশা থাকলে হতাশা আসতে বাধ্য। 

হারক্যুল পোয়্যারোর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুব একটা মধুর/সরল নয়। দুঃখের বিষয় এর জন্য পোয়্যারো নিজে দায়ী নন। মিস মার্পল নামে অন্য একজন মাঝখানে আছেন। পোয়্যারো পুরুষ, মিস মার্পল মহিলা, হারক্যুল পোয়্যারো নামজাদা, মিস মার্পল ভিড়ে মিশে থাকা; হারক্যুল পোয়্যারো ঘোরেন ইস্তানবুল থেকে প্যারিস থেকে সিরিয়া, মিস মার্পল চার্চে যাওয়ার পথে ভিকারের বাড়ির পেছনের বাগান দিয়ে শর্টকাট নেন; পোয়্যারোর কাছে কেস সমাধানের আর্জি নিয়ে আসেন লর্ড, লেডি এবং হলিউড তারকারা, মিস মার্পলের পরামর্শ চান তাঁর গ্রামের বন্ধুরা (একদম শেষ গল্পে এক মিলিওনেয়ার অবশ্য এসেছিলেন সমস্যা সমাধানের বরাত নিয়ে, যে গল্পে মার্পল জীবনের একটিমাত্র পারিশ্রমিকটি পেয়েছিলেন); হারক্যুল পোয়্যারোর নামে গোলাপের নাম রাখা হয়, মিস মার্পল বেতো হাঁটু নিয়ে নিজের বাগানে গোলাপ ফোটান (প্রতিবেশীদের ওপর নজর রাখতে রাখতে); পোয়্যারো ইজিপ্টের অস্থিরমতি রাজকুমারের হারিয়ে যাওয়া মুক্তো খুঁজে দিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ব্যালেন্স বজায় রাখেন, মিস মার্পল মাথা ঘামান তাঁর গ্রামের এক মহিলা নতুন কেনা দামি জামাটা (না টুপি? দেখেছেন, এতই তুচ্ছ ব্যাপার যে মনে করে রাখার প্রয়োজন বোধ করিনি) একবারের বেশি দু’বার পরলেন না কেন; পোয়্যরোর সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকেন হেস্টিংস যাঁর ক্ষীণবুদ্ধির আয়নায় পোয়্যারোর গ্রে সেলরা ঝকঝক করে, মিস মার্পল চলেন একা। হারক্যুল পোয়্যারো নিজের সম্পর্কে বলেন, "My name is Hercule Poirot, and I am probably the greatest detective in the world." মিস মার্পল নিজের সম্পর্কে কিছু বলেন না। লোকেও তাঁকে নিয়ে খুব যে কিছু বলে তা নয়। বুড়ো পিসিমাদের নিয়ে বলার আছেই বা কী? মার্পলের আত্মপ্রকাশই ঘটে এই ইনভিজিবিলিটির ঘন কুয়াশার মধ্য দিয়ে। 


Let me see, how many are we? One, two, three, four, five. We ought really to be six.'
'You have forgotten me, dear,' said Miss Marple, smiling brightly.
Joyce was slightly taken aback, but she concealed the fact quickly.
'That would be lovely, Miss Marple,' she said. 'I didn't think you would care to play.'
'I think it would be very interesting,' said Miss Marple, 'especially with so many clever gentlemen present. I am afraid I am not clever myself, but living all these years in St. Mary Mead does give one an insight into human nature.' (The Tuesday Night Club)


এবং এতকিছুর পরেও, পোয়্যারো বিক্রি হন মিস মার্পলের থেকে অনেক, অনেক বেশি। আমার হাতে মিস মার্পলের বই ধরা দেখে ক্রাইম উৎসাহী বন্ধু (অবশ্য একে আমি বন্ধু বলে মানি না) বলে, মিস মার্পল জাস্ট পড়া যায় না। নাথিং হ্যাপেনস। পোয়্যারো অনেক বেটার।

যে বলে তার ওপর তো হয়ই, খানিকটা রাগ উপচে পোয়্যারোর ওপরেও পড়ে। মিস মার্পলের যোগ্য সমাদর না হওয়ার পেছনে ওই লোকটার ষড়যন্ত্র আছে সন্দেহ হয়। এখন সে রাগটা অনেক নিভে এসেছে। তবু যদি নিচের পোস্টে কখনও সে রাগের চিহ্ন ফুটে বেরোয়, তাই ডিসক্লেমার দিয়ে রাখলাম। 

******

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ভলান্টারি এইড ডিটাচমেন্ট নার্স হিসেবে আগাথা ক্রিস্টি কাজ করছেন বাড়ির কাছের এক হাসপাতালে। এদিকে বাড়িতে দিদির সঙ্গে একটা ব্যাপারে তর্কাতর্কি চলছে। গোয়েন্দা গল্প লেখা শক্ত না সোজা। দিদি বলছে ভীষণ শক্ত কাজ, ক্রিস্টি ভাবছেন কী আর এমন হাতিঘোড়া হবে। আর সেটা প্রমাণের সবথেকে সোজা উপায় হচ্ছে নিজে একটা গোয়েন্দাগল্প লিখে দেখিয়ে দেওয়া। 

ক্রিস্টির হাসপাতালে বেলজিয়ান উদ্বাস্তুদের যাতায়াত ছিল। তাঁদের দেখে ক্রিস্টির মনে হল, "Why not make my detective a Belgian?" ভাবামাত্র হুড়মুড় করে আইডিয়া আসতে লাগল মাথায়। গল্পের নয়, গোয়েন্দার। স্পষ্ট দেখতে পেলেন, "a tidy little man, always arranging things, liking things in pairs, liking things square instead of round. And he should be brainy - he should have little grey cess of the mind."

সকলে বদনাম করে গোয়েন্দাগল্প নাকি প্লট-ড্রিভেন। কিন্তু ক্যারেকটার ড্রিভেন গোয়েন্দা গল্পের এর থেকে বড় প্রমাণ আর আছে কি? বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত গোয়েন্দা গল্প  ( অ্যাকচুয়ালি, গোয়েন্দাটা উড়িয়ে দিয়ে, সর্বাধিক বিক্রিত ঔপন্যাসিক বললেও হয়) লেখকের সবথেকে জনপ্রিয় গোয়েন্দার গোটা সিরিজটাই আসলে ক্যারেকটার ড্রিভেন।

*****

গল্প শুরু হল। লন্ডনের কাছেই এসেক্স কাউন্টি, সেই কাউন্টির স্টাইলস গ্রামে। স্টাইলস-এর বড়লোক বাসিন্দা মিসেস ইংগলথর্প তখন দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাড়ির খরচা কমাচ্ছেন, ডিনারে যতটুকু না খেলে নয় খাচ্ছেন না, যুদ্ধের ফান্ড তুলতে লর্ড এবং লেডিদের নিয়ে মেলার আয়োজন করছেন, সে মেলায় নিজের লেখা দেশাত্মবোধক কবিতা আবৃত্তি করছেন। বেলজিয়ান শরণার্থীদের গ্রামে আশ্রয় দেওয়ার পেছনেও তাঁরই বদান্যতা।

এঁরই সৎ ছেলের বন্ধু, আর্থার হেস্টিংস, যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে ছুটিতে ইংল্যান্ডে ফিরেছেন তখন। শরীর সারাতে বন্ধুর সঙ্গে ইংগলথর্পদের বাড়ি বেড়াতে গেলেন হেস্টিংস। একদিন গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একদল বেলজিয়ানের মধ্যে হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল বেঁটে, ডিমের মতো মাথাওয়ালা একটা অদ্ভুত লোকের দিকে। লোকটা পায়ে ব্যথা পেয়েছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। হাঁটতে পারছে না ঠিক করে, এদিকে পায়ে পরে আছে চূড়ান্ত আনকরফর্টেবল পেটেন্ট চামড়ার চকচকে পালিশ করা জুতো। জুতোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চমকাচ্ছে লোকটার গোঁফ।

হেস্টিংস চিনে ফেললেন। বেলজিয়ান পুলিশফোর্সের প্রাক্তন “shining light” হারক্যুল পোয়্যারো! ইউরোপে থাকাকালীন এঁর দুয়েকটা রহস্য সমাধানের সাক্ষী থাকার সুযোগ হয়েছিল হেস্টিংস। দুই পরিচিত নতুন করে বন্ধুত্ব পাতালেন যুদ্ধ থেকে দূরে শান্ত স্টাইলস গ্রামের সবুজ ছায়ায়। 
  
আর তার পরপরই মিসেস ইংগলথর্প মাঝরাতে বিষের প্রতিক্রিয়ায় মারা পড়লেন। হেস্টিংসের মনে পড়ল তাঁর বেকায়দাগ্রস্ত বেলজিয়ান বন্ধুর কথা। তিনি দৌড়ে গেলেন গ্রামের ধারের সেই ছোট্ট বাড়িটিতে যেখানে পোয়্যারো তখন থাকছেন।

পোয়্যারোর ভাগ্য বদলে গেল।

হারক্যুল পোয়্যারোর ক্যারেকটার আর্ক অবিশ্বাস্য। ক্যারেকটার আর্ক হচ্ছে গল্পের/ সিরিজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চরিত্রের যাত্রা। যে পোয়্যারো উনিশশো কুড়িতে স্টাইলস গ্রামে শরণার্থী, সেই পোয়্যারোই ছ’বছর বাদে ‘রিটায়ার’ করে বাসা বেঁধেছেন ‘কিংস অ্যাবট’-এ। ডক্টর শেপার্ড আর তাঁর বোন ক্যারোলিনের বাড়ির পাশে একখানা গোটা বাড়ি নিয়ে বাগানে কুমড়ো ফলাচ্ছেন। সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নীল নদে ক্রুজে যাচ্ছেন। মহার্ঘ ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের মহার্ঘতর ক্যালে কোচে চড়ছেন। তাঁর অমিত ক্ষমতাশালী বন্ধুরা বসে আছেন সমাজের মাথায়। টিকিট কাটতে গিয়ে যখন জানা গেল টিকিট সব বুকড, তখন তাঁর বন্ধু মসিওঁর বুক, যিনি কর্তৃপক্ষের মইয়ের টঙে, বললেন নো প্রবলেম। নিজ দায়িত্বে অন্য একজনের বুকিং ক্যান্সেল করে (যদিও বুকিংটা ফেক ছিল, তবু সেটা পয়েন্ট নয়, পয়েন্ট হচ্ছে ক্ষমতাটা) পোয়্যারোকে ট্রেনে চড়িয়ে দিলেন। কন্ডাকটর এসে নিজে হাতে পোয়্যারোর বাক্স বয়ে তাঁকে সিটে পৌঁছে দিয়ে গেল। “A phenomenon I have seldom seen,” সহযাত্রী না বলে পারলেন না, “A Wagon Lit conductor himself puts up the luggage! It is unheard of!”

উদ্বাস্তু থেকে এই জায়গায় পোয়্যারো কী করে পৌঁছলেন সেটা আমরা জানি না। জানি না, কারণ আমার ধারণা ক্রিস্টি নিজেও জানতেন না। ক্রিস্টি যখন দিদির সঙ্গে চ্যালেঞ্জ লড়ে গোয়েন্দা গল্প লিখতে নেমেছিলেন তখন অত আঁটঘাট বেঁধে নামেননি। এই অদ্ভুতুড়ে গোয়েন্দাকে নিয়ে পরে আর একটিও গল্প লিখবেন কি না তিনি জানতেন না। শুধু লিখবেনই না, এ সিরিজ যে তাঁকে অমরত্ব দেবে এ আশংকা ক্রিস্টির মনে উঁকিও মারেনি। 

এই অদূরদর্শিতা পরে ক্রিস্টিকে ভুগিয়েছে। উনিশশো কুড়িতেই ক্রিস্টির কল্পনায় তিনি ছিলেন মাঝবয়সের বেশ খানিকটা ওপারে। সে হিসেবে ষাটের দশকে লেখা গল্পগুলোয় পোয়্যারোর বয়স হওয়া উচিত একশোর বেশি। কিন্তু  গোয়েন্দাগল্পে মরে গিয়ে বেঁচে ওঠার নমুনাও আছে, একশোর্ধ্ব গোয়েন্দা সে তুলনায় জলভাত। ক্রিস্টি বরং অনেক বেশি ফাঁপরে পড়েছিলেন পোয়্যারোর পার্সোন্যালিটি নিয়ে।

"There are moments when I have felt: ‘Why-why-why did I ever invent this detestable, bombastic, tiresome little creature?" Agatha Christie



হারক্যুল পোয়্যারোর বন্ধু, বিখ্যাত রহস্য গল্প লিখিয়ে অ্যারিয়াডনি অলিভারকে আগাথা বানিয়েছিলেন নিজের ছায়ায়। এঁকে দিয়ে নিজের মনের অনেক কথা বলিয়ে নিয়েছেন ক্রিস্টি। মুখের সামনে নিজের প্রশংসা শোনার অস্বস্তি প্রকাশ থেকে নিজের লেখা পুরোনো বইয়ে ভুল তথ্য দেওয়ার সাফাই গাইয়েছেন। কিন্তু যে বিষয়টায় ক্রিস্টি আর অলিভারের সব থেকে বেশি মিল ছিল সেটা ছিল নিজের নিজের গোয়েন্দা নির্বাচনের ভুলে।  

অ্যারিয়াডনি অলিভারের গোয়েন্দা ছিলেন Sven Hjerson। ফিনল্যান্ডের লোক। নিরামিষাশী। 'মিসেস ম্যাকগিন্টি’জ ডেড গল্পে' Hjerson সংক্রান্ত তাঁর ফ্রাস্ট্রেশন ফুটে বেরিয়েছে। এ গল্পে অলিভারের দেখা হচ্ছে এক নাট্যকারের সঙ্গে যে Hjerson কে নাটকের হিরো বানাতে চায়। নাট্যকারের সঙ্গে মিটিং শুরু হতেই অলিভার প্রমাদ গুনলেন। নাট্যকার Hjersonকে রূপসী মেয়েদের হার্টথ্রব করে তুলতে চান, অলিভার আঁতকে ওঠেন। ষাট বছরের বুড়ো, হার্টথ্রব হবে কী? তাহলে তো সবাই বলবে “ডার্টি ওল্ড ম্যান”। নাট্যকার তখন বুদ্ধি দিলেন তাহলে Hjerson-এর বয়স কমিয়ে জোয়ান করে দেওয়া যাক। অলিভার বললেন গত তিরিশ বছর ধরে সবাই Hjersonকে চেনে, এখন সে হঠাৎ চুলে কলপ করলেই লোকে তাকে জোয়ান বলে মানবে? বললেন, Hjerson রোম্যান্সে ইন্টারেস্টেড নন, কোনওদিন ছিলেন না। নাট্যকার যুক্তি দিলেন, আহা বইয়ের চরিত্রের সঙ্গে যে নাটকের চরিত্রের মিল থাকতে হবে এমন তো কোথাও লেখা নেই। বইয়ের Hjerson রসকষহীন হতে চায় হোক, নাটকের Hjerson হিরো হতে দিতে তার আপত্তি থাকা উচিত নয়। 

ক্রিস্টির গোয়েন্দা অবশ্য একেবারে রসকষহীন ছিলেন না। কাউন্টেস রসাকভ নামের একজন উদ্বাস্তু রাশিয়ান নোবেল লেডির প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল। এই কাউন্টেস অতীব গোলমেলে। প্রথমত ইনি কাউন্টেস কিনা সেটা কেউ জানত না। দ্বিতীয়ত ইনি বড় বড় পার্টিতে গিয়ে মণিমুক্তো চুরি করতেন। পোয়্যারো এ সব জানতেন, তবু কখনও রসাকভকে ধাওয়া করেননি। প্রেমের হরমোনের গোলযোগ ছাড়া পোয়্যারোর এ আচরণের আর কোনও ব্যাখ্যা নেই। কারণ পোয়্যারোর মধ্যে অপরাধ এবং অপরাধীদের প্রতি কোনওরকম করুণা ছিল না। এই একটি মাত্র ব্যাপারে মিস মার্পলের সঙ্গে তাঁর মিল। ন্যায় অন্যায়ের মাঝখানের ধোঁয়া ধোঁয়া জায়গাটা দুজনের কাউকেই কোনওদিন ভোগায়নি। দুজনেই বিশ্বাস করতেন অপরাধ ইজ অপরাধ এবং অপরাধের শাস্তি হওয়া দরকার। 

*****

পোয়্যারোর সঙ্গীদের কথায় আসা যাক। আর্থার হেস্টিংস আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ডিটেকটিভ চিফ ইনস্পেক্টর জেমস জ্যাপের কথা পড়লে ডক্টর ওয়াটসন আর ইন্সপেক্টর লেস্ট্রাডের কথা মনে পড়তে বাধ্য। ক্রিস্টির মতো প্রতিভাবান একজন লেখক এই চেনা ছকের ফাঁদে পা দিলেন কেন ভেবে আমার অবাক লাগত একসময়। যেন তিনি মেনস্ট্রিম গোয়েন্দা গল্পের পরীক্ষিত খোপে টিক দিতে দিতে গেছেন। বোকা সহকারী? হেস্টিংস। অপটু পুলিশ অফিসার? ইন্সপেক্টর জ্যাপ। ম্যানারিজম আর বাতিকে ছয়লাপ গোয়েন্দা? হারক্যুল পোয়্যারো। 

তারপরই মনে পড়েছে পোয়্যারো লেখার শুরুর চ্যালেঞ্জের কথা, এবং পোয়্যারো পত্তনকালীন ক্রিস্টির আঁটঘাঁট বাঁধার অভাবের কথা। তখন একটা গোয়েন্দাগল্প লেখার তাগিদই তাঁর প্রধান ছিল। এর থেকে মাত্র বছর সাতেক পরেই মিস মার্পলের মতো ছকভাঙা গোয়েন্দার জন্ম দিয়েছেন তিনি। টমি টাপেন্স-এর মতো প্রৌঢ় স্বামীস্ত্রীর জুড়িকে গোয়েন্দার ভূমিকায় নামিয়েছেন। অথচ পোয়্যারোর শুরুর দিকে ক্রিস্টি আশ্চর্যজনক ভাবে গতে বাঁধা। 

কিন্তু এ বাঁধন ভেঙে বেরোনোর চেষ্টা ক্রিস্টির ছিল। এবং সে চেষ্টা এই পোয়্যারো সিরিজে যত বেশি প্রকাশ পেয়েছে তেমনটি আর কোনও সিরিজে পায়নি, মিস মার্পলেও না। হেস্টিংসকে আর্জেন্টিনা পাঠিয়ে পোয়্যারোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে চেয়েছেন তিনি, সেক্রেটারি মিস লেমন এবং বাটলার জর্জকে গল্পে ঢুকিয়েছেন। স্রেফ পোয়্যারোর কেরামতি পালিশ করার জন্য নয় - যাঁরা গল্পে আছেন নিজের জোরে। পোয়্যারোর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে টক্কর দিতে পারা ব্যক্তিত্বের আমদানি করেছেন। অ্যারিয়াডনি অলিভার, মিস্টার স্যাটার্থওয়েট (যিনি ক্রিস্টির মিস্টিরিয়াস মিঃ কুইন সিরিজের অন্যতম মুখ্য চরিত্র ছিলেন। আমার ভীষণ, ভীষণ প্রিয় চরিত্র।) এছাড়াও নিজ দায়িত্ব নিজে নিতে পারা অল্পবয়সী স্বাধীনচেতা মেয়েরা, যাদের প্রতি ক্রিস্টির পক্ষপাত স্পষ্ট ছিল, তারাও গুটি গুটি পোয়্যারোর গল্পে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। 'মিসেস ম্যাকগিন্টি’জ ডেড' উপন্যাসের মড উইলিয়ামস এরকম একটি চরিত্র। আরও নিশ্চয় আছে, আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।  

*****

সন্তোষ দত্ত ছাড়া আর কোনও অভিনেতা যদি গল্পের বইয়ের কোনও চরিত্রের প্রতি আমার মনোভাব সম্পূর্ণ প্রভাবিত করে থাকেন তবে তিনি ডেভিড সুশে। ডেভিড সুশে একজন ব্রিটিশ অভিনেতা, যিনি অভিনয় জীবন শুরু করেছিলেন থিয়েটার দিয়ে এবং পরে রেডিও, টিভি এবং সিনেমা, তিনটি মাধ্যমেই কাজ করেছেন। 

কিন্তু ডেভিড সুশে নিজেও জানেন, তাঁর ও কাজগুলোর কথা কেউ মনে রাখবে না। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তাঁর অবিচুয়ারির সিংহভাগ জুড়ে থাকবেন, তিনি নন, হারক্যুল পোয়্যারো। উনিশশো ঊননব্বই থেকে দু’হাজার তেরো পর্যন্ত চলা আই টিভির ‘আগাথা ক্রিস্টি’জ পোয়্যারো’ সিরিজে হারক্যুল পোয়্যারোর চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুশে। পঁচিশ বছর, সত্তরটা এপিসোড। সেই উনিশশো আঠাশ থেকে মঞ্চে, টিভিতে, রেডিওতে পোয়্যারোর পারফরম্যান্স চলছে, কাজেই সুশের আগে অনেকেই পোয়্যারো করেছেন। নামকরা দু’জন হলেন অ্যালবার্ট ফিনি, যিনি উনিশশো চুয়াত্তরে মার্ডার ইন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস-এ পোয়্যারোর চরিত্রে অভিনয় করে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন পেয়েছিলেন, জেতেননি। দু’নম্বর বিখ্যাত পোয়্যারো ছিলেন পিটার উস্তিনভ। ইনি ছ’বার পোয়্যারো সেজেছিলেন।

হারক্যুল পোয়্যারো পড়ে আপনি যদি এই দুজনের অভিনয় দেখতে বসেন তাহলে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অনুভূতি হবে। হারক্যুল পোয়্যারোর মধ্যে চকচকে গোঁফ, ভুল ইংরিজি, দম্ভ, বাতিক মিলিয়ে একটা ভাঁড়ামো আছে ঠিকই, কিন্তু একইসঙ্গে সে ভাঁড়ামোর মধ্যে একটা ডিগনিফায়েড ব্যাপারও আছে। এঁরা ওই ভাঁড়ামোর অংশটুকু অবিকল ফুটিয়েছেন, ডিগনিটিটা দর্শকের কল্পনার ওপর ছেড়ে রেখেছেন।

ডেভিড সুশের সঙ্গে বইয়ের হারক্যুল পোয়্যারোর কোনও তফাৎ নেই। থাকলেও আমি তা গ্রাহ্য করি না। পোয়্যারোর গল্প পড়ার সময় আমি সুশের চেহারাটাই দেখি। সিরিজটা নিয়ে আমার অনেক কিছু বলার আছে। কর্তৃপক্ষ আগাথা ক্রিস্টির গল্প থেকে অনেক বিচ্যুত হয়েছেন। কয়েকটা বিচ্যুতি আমার পছন্দ হয়েছে (যেমন যে সব গল্পে হেস্টিংস আর জ্যাপ নেই সে সব গল্পে দুজনকে ঢোকানো, কারণ ডেভিড সুশের মতোই হেস্টিংসের চরিত্রে হিউ ফ্রেজার আর জ্যাপের চরিত্রে ফিলিপ জ্যাকসন অ ন ব দ্য।  বি বি সি-র অনেক শ্রুতিনাটকে ফিলিপ জ্যাকসন অভিনয় করেন। পুরোটা নাটক আমার মাথার‍ মধ্যে চলতে থাকে যে ওই চরিত্রে অভিনয় করছেন ফিলিপ জ্যাকসন নন, ইন্সপেক্টর জ্যাপ।) কয়েকটা হয়নি, যেমন মিস লেমনকে - যাঁকে আগাথা ক্রিস্টি বানিয়েছিলেন “উইথ ফিউ হিউম্যান উইকনেসেস’ চরিত্র হিসেবে, যাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে নিখুঁত ফাইলিং সিস্টেম আবিষ্কার করা - অসম্ভব হাসিখুশি, বর্ণময়, পোয়্যারোর ডায়েট এবং সাজপোশাক নিয়ে তৎপর দেখানোর জন্য। টিভির পোয়্যারো যদি গল্পের পোয়্যারো হন (ডেভিড সুশেকে দেখে তো সেই পোয়্যারোই মনে হচ্ছে) তাহলে এই মিস লেমনের (পোয়্যারোর উচ্চারণে লেমোঁ) চাকরি দু’দিনের বেশি টিকত না। 

*****

"…. But now, I must confess it, Hercule Poirot has won. A reluctant affection has sprung up for him…” Agatha Christie

তাহলে কী দাঁড়াল, হারক্যুল আর কুন্তলার সম্পর্ক? ওঁর ওপর আমার রাগ ঘুচল? নাকি আমার চিরকালের প্রিয় গোয়েন্দাকে নিজের পাঁচফুট পাঁচ (নাকি চার?) ইঞ্চির দীর্ঘ ছায়া দিয়ে আড়াল করে রাখার অন্যায়ের রাগে আমি এখনও ফুঁসছি?

সে কথা বলতে গেলে পোয়্যারোকে নিয়ে পোয়্যারো সিরিজের শেষ উপন্যাস ‘কার্টেন’ এর কথা বলতে হয়। ক্রিস্টি ‘কার্টেন’ লিখেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন। লিখে তালা বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশ পাবে কার্টেন। কিন্তু উনিশশো পঁচাত্তরে ক্রিস্টির শরীর ভেঙে গেল আর উনিশশো বাইশ থেকে শুরু করে চুয়ান্ন বছর পর প্রথমবার এমন উপক্রম হল যে বছর আগাথা ক্রিস্টির অন্তত একটা বই পাবলিশ হচ্ছে না ( ক্রিস্টির অনেক ঘনিষ্ঠ লোকই বলেছেন, মহিলাকে তাঁরা কখনও লিখতে দেখেননি)। তখন তালা খুলে বার করে আনা হল 'কার্টেন'। উনিশশো পঁচাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হল পোয়্যারো সিরিজের শেষ উপন্যাস ‘কার্টেনঃ পোয়্যারো’জ লাস্ট কেস’। চার মাস পর, ছিয়াত্তরের জানুয়ারিতে মারা গেলেন ডেম আগাথা মেরি ক্ল্যারিসা ক্রিস্টি। 

শুরুটা ওরকম দুম করে হয়েছিল বলেই হয়তো শেষটা যথাসম্ভব গুছিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন ক্রিস্টি। সেই উনিশশো সাঁইত্রিশে ‘ডাম্ব উইটনেস’এর পর আবার পোয়্যারো আর হেস্টিংস একসঙ্গে। সেই স্টাইলসে, যেখানে পঞ্চাশ বছর আগে দেশছাড়া, আহত কিন্তু অপরাজিত পোয়্যারোর সঙ্গে আচমকা দেখা হয়েছিল হেস্টিংসের। স্টাইলস কোর্ট ছেড়ে হেস্টিংসের বন্ধু ক্যাভেনডিশরা চলে গেছে অনেকদিন, এখন সে বাড়িতে গেস্ট হাউস চালান কর্নেল আর মিসেস লুটরেল। এই বাড়ির বাগানে আগুপিছু না ভেবে বিয়ের প্রস্তাব করে বসা তিরিশ বছরের আর্থার হেস্টিংসের মেয়ে জুডিথ এখন একুশ বছরের। পোয়্যারো এখন আর্থ্রাইটিসে কাবু। খোঁড়ায়ও না, হুইলচেয়ারে বসে থাকে।  

কার্টেন আগাথা ক্রিস্টির লেখা একমাত্র গোয়েন্দাগল্প যেটা আমি একবারের বেশি পড়িনি। দু’হাজার তেরোর নভেম্বর মাসে কার্টেন এপিসোড সম্প্রচারিত হয়। আমি দেখিনি। কোনওদিন দেখব না। 



*****

ব্যস, পোয়্যারোকে নিয়ে আমার যা বলার ছিল তা বলা হল। সুযোগ পাওয়া গেল না কিংবা আমার মাথাতেই আসেনি বলে যে কথাগুলো বলা হল না, সেগুলো আপনারা বলবেন আশা রাখলাম।  


ঋণস্বীকারঃ 



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.