September 19, 2017

এখন-তখন




যা যা বদলেছে
যা যা একই আছে


আগে মহালয়ায় সবাই যে যার নিজের বাড়িতে রেডিও শুনত এখন মাইক লাগিয়ে পাড়ার সবাইকে শোনায়।

তখনও রেডিওর মহালয়া বেস্ট ছিল, এখনও বেস্ট


আগে এই দিনটা এলে মনে হত, এবার সত্যিই পুজো এসে গেছে এখন সেটা খুঁটিপুজোর দিন মনে হয়


তখনও টিভির মহালয়া বেশি এন্টারটেনিং ছিল, এখনও তাই আছে কারণ, ব্রহ্মার দাড়ি তিরিশ বছর ধরে সমান হাস্যকর


আগে চারপাশে সকলেই মহালয়া খায় না মাথায় দেয় জানত। "আজ তুমলোগ কেয়া করতে হো?” গোছের অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হত না। উত্তরটা সোজা, কিন্তু প্রশ্নকর্তার রিঅ্যাকশন গোলমেলে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


তখনও রেডিও শুনে আর টিভি দেখে মহালয়া উদযাপন করতাম, এখনও করি।


আগে মহালয়া আসতে আসতে জামাজুতো কেনা হয়ে যেত। কারণ তখন বাবামা দায়িত্ব নিতেন। জীবনের ওপর কন্ট্রোল তাঁদের আমাদের থেকে বেশি ছিল।
তখনও মহালয়ার দিন পড়ায় মন বসত না, আজও কাজে মন বসছে না। ফাঁকি দিয়ে বাজে পোস্ট ছাপছি।




September 17, 2017

ঘরের কাজঃ কান্না-পাওয়া থেকে না-করতে-পারলে-মন-খারাপ ক্রমানুসারে



অনেক সময় হয় না, একটা লোককে অনেক দিন চোখের চেনা হওয়ার পর সে লোকটার সঙ্গে পরিচয়, ক্রমে এতখানি ঘনিষ্ঠতাও হয়, যে ওই চোখে চোখে চেনার সময় লোকটা আপনার সম্পর্কে কী ধারণা করেছিল সেটা সে আপনার কাছে স্বীকারও করে? আমার যে ক’জনের সঙ্গে এ রকম হয়েছে, তারা মূলত তিনটে বিষয় আমার কাছে স্বীকার করেছে, যেগুলো তারা আমার সম্পর্কে ভেবেছিল। 

প্রথম দর্শনেই নাকি তারা ধরে ফেলেছিল, আমি বাঙালি। দু’দিন দেখে নিশ্চিত হয়েছিল, আমি বদমেজাজী, রাগী বাঙালি। ধমকাতেও হবে না, ভুরু কুঁচকে তাকালেই গরু দুধের বদলে দই দিতে শুরু করবে। আরও কিছুদিন আমাকে অবজার্ভ করে তাদের মনে হয়েছিল আমার কোনও কাজ নেই। দুশ্চিন্তা নেই, দায়িত্ব নেই, কর্তব্য নেই। জোয়াল ঠেলছি না, যেন আতর মেখে হুঁকো টানতে টানতে চলেছি জীবনের মধ্যে দিয়ে। তারা অবশ্য ওপরের উপমাটা ব্যবহার করেনি, কারণ তারা হুঁকো জানে না, হুকা বার জানে। (একটা জিনিস জেনে আমি চমকে গেছি। হুকা বারের হুঁকোতে নাকি তামাকটামাক থাকে না, স্রেফ গন্ধওয়ালা ধোঁয়া! সেটাই লোকে গুচ্ছ পয়সা খরচ করে গুড়ুক গুড়ুক টানতে থাকে! ) তারা আমার এই ভঙ্গি বর্ণনা করার সময় বলেছিলেন, “মুংফলি খাতে খাতে, গানা গাতে গাতে।”

এই তৃতীয় অবজার্ভেশনটা স্বীকার করার সময় লোকে খুব লজ্জা লজ্জা মুখ করে। আমাকে দেখে যে দামি এবং ভারী মনে হয় না, মনে হয় না আমার ডায়রিতে জায়গা পাওয়ার জন্য মিটিং এবং টেলিকনরা গুঁতোগুঁতি করছে, এটা মনে করিয়ে দিলে পাছে আমি অফেন্স নিই।

আশ্বস্ত করি। অফেন্স মোটেই নিইনি, নিলে ভণ্ডামি হবে। কারণ সত্যিই দায়িত্বকর্তব্য আমার অভিধানের প্রিয়তম শব্দ নয়, আজ কী কী কাজ না করে ফেলে রাখা যেতে পারে, রোজ ভোরে চোখ খোলারও আগে আমার সে চিন্তা শুরু হয়। অফিসের কাজ করি পেটের দায়ে, বাড়ির কাজ করি লোকলজ্জায়।

মুখে বলি বটে, কিন্তু মনে মনে মনখারাপও হয়। কেন ভগবান আমাকে এরকম ফাঁকিবাজ করে বানালেন। এক ঠোঙা মুংফলি কিনে অফিসের দিকে হাঁটতে থাকি, কিন্তু গানা আসে না গলায়। আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকি, সব কাজ একটা লোকের কী করে খারাপ লাগতে পারে, দুয়েকটা নিশ্চয় বেরোবে যেগুলো করতে ভালো লাগে? অন্তত, কম খারাপ? অফিস বরাবরের মতোই হতাশ করে। জল খাওয়া আর আন্টিজির দোকানে যাওয়া ছাড়া আর পাতে দেওয়ার মতো কাজ খুঁজে পাই না। 

বুক বেঁধে বাড়ির দিকে তাকাই। একমনে ভাবতে ভাবতে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখা যায়। আছে আছে, কাজ আছে! যেগুলো করতে আমার কান্না পায় না, এমনকি রীতিমত ভালোও লাগে।

আমার কান্না পাওয়া থেকে ভালো লাগার ক্রম অনুযায়ী কয়েকটা সাংসারিক কাজের একটা লিস্ট এই রইল। আপনাদের সঙ্গে কী মিলল, কী মিলল না জানতে কৌতূহলী রইলাম। 

ইস্তিরি করাঃ অ্যাকচুয়ালি, ইস্তিরি করাকে এই লিস্টে রাখা ইস্তিরি করা-কে অপমান, কারণ লিস্টের বাকি কাজগুলোর প্রতি আমার খারাপ লাগাদের যোগ করে, যোগফলের বর্গফল বার করলেও সে খারাপ লাগা ইস্তিরি করার খারাপ লাগাকে ছুঁতে পারবে না। তাই আমি একে অফিশিয়াল লিস্টের বাইরে রাখলাম।

কেন এত খারাপ লাগে সেটা বুঝিয়ে বলা মুশকিল, একটা হতে পারে, আমি বিষয়টাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করি। পরিষ্কার জামা, ছেঁড়াফাটা নয়, সেটা আবার টানটান হতে হবে কে বলল? তার ওপর যখন রোহিত বাল কলসি থেকে বার করা জামা প্যান্ট পরে রাজদ্বার থেকে ম্যাগাজিন কভার দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন? সে বেলা? 

“ওটা লিনেন।” ইস্তিরি-পুলিস চোখ বন্ধ করে মাথা নেড়ে বলেন। 

সামনের জন্মের আগে আমার গোটা ওয়ার্ডরোব লিনেন-এ বদল করার আগে কোনও সম্ভাবনা দেখছি না, কাজেই এ যমযন্ত্রণা আপাতত চলবে। (কারও কারও আবার শুধু জামা ইস্তিরি করে কুলোয় না, মাথার চুলও রোজ ইস্তিরি না করে তাঁরা প্রকাশ্যে পা রাখেন না। সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ছাড়া তাঁদের আমার আর কিছু বলার নেই।)

৭। ফ্রিজ পরিষ্কারঃ যেদিন যেদিন ঘুম থেকে উঠে মনে হয়, বাঃ, মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে, ডেডলাইন নেই, আফসোস নেই, দিগন্তে অপরাধবোধের ছায়া পর্যন্ত নেই, মোটামুটি নব্বই শতাংশ নিশ্চিত হয়ে বলা যায় সেইদিনই, ঠিক সেইদিনই আমার ফ্রিজ পরিষ্কার করার দিন। 

একটা গোটা দিনকে মাটি করার ক্ষমতা, আমার অফিসের কিছু কিছু লোকের আছে, আর আছে আমার ফ্রিজের। ফ্রিজ না বলে অন্ধকূপ বলাই ভালো। কিংবা ‘হাউস অফ লিভস’ গল্পের সেই ভৌতিক করিডোরের মতো। বহিরঙ্গের সঙ্গে অন্দরের কোনও সম্পর্ক নেই। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, এইটুকু, অবশ্য দু’জনের সংসারে আর কত বড়ই বা লাগে। আমরা তাঁদের আশ্বস্ত করি, যত ছোট দেখতে লাগছে জিনিসটা আসলে তত ছোট নয়। আড়াল আবডাল থেকে কত কিছু যে বেরোয়, কল বেরোনো ছোলা, হারিয়ে যাওয়া টিফিনবাক্সের ভেতর একটুকরো পাতিলেবু। আধবাটি চাউমিন, দু’ চামচ মুগের ডাল। শুধু আয়তনই যে ডিসেপটিভ তা নয়, আমার ধারণা ফ্রিজটার একটা অলৌকিক শক্তি আছে, খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার। 

পরিণাম, ধরে ধরে খাবার ফেলা, এবং নিজের প্রিভিলেজের এই রকম নির্লজ্জ অপব্যবহারে শিউরে শিউরে ওঠা।

৬। ধুলো ঝাড়া/ ঝাঁট দেওয়াঃ ধুলো ঝাড়তে আমার ভালো লাগে না, তারও পেছনে অপরাধবোধ। প্রতিটি জিনিস হাতে তুলে মুছতে গিয়ে মনে পড়ে, কী আবোলতাবোল জঞ্জালে বাড়ি ভর্তি করে রেখেছি। বসের বকুনি খেয়ে অনলাইনে ‘কিপ কাম অ্যান্ড ড্রিংক টি’ কিনেছিলাম। দীপাবলীতে অফিস থেকে কুৎসিত মোমবাতি দিয়েছিল, এখনও জুতোর কেসের ওপর অধিষ্ঠান করছে। ধুলো ঝাড়ার আরেকটা খারাপ ব্যাপার হচ্ছে সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাখব না ফেলব। 

ধুলো ঝাড়ার পরে আসে ঝাঁট দেওয়ার পালা। ধুলো ঝাড়ার থেকে কম বিরক্তিকর, তবে ফ্যান বন্ধ করতে হয়, সেটা আরামদায়ক নয়। আবার কিছু বেয়াদপ ঝুল থাকে, শুয়ে পড়ে খাটের তলা থেকে বার করে আনার পর তারা আবার উড়ে উড়ে খাটের তলায় সেঁধোতে থাকে, আমার নাকের ডগা দিয়ে, সেটাও আত্মবিশ্বাসের পক্ষে ক্ষতিকারক।

৫। কাপড় কাচাঃ কাপড় কাচায় এ ধরণের মানসিক চাপ নেই। পরিশ্রম আছে বিস্তর। কাচার পর তোয়ালে নিংড়ে জল বার করেছেন যাঁরা, জানেন। কাপড় কাচার যে ব্যাপারটা আমাকে ভাবায় সেটা হচ্ছে কাজটার, বা কাজটার নামের অন্তর্লীন অসততা। 

কাপড় কাচা আসলে কাপড় কাচা নয়। কাপড় কাচা হল জামা বাছা, ভেজানো, কাচা, মেলা। মনে করে ক্লিপ লাগানো। না হলে অফিস থেকে এসে দেখা কাল ঝাঁট দেব বলে ফেলে রাখা বারান্দার মেঝেতে তারা গড়াগড়ি খাওয়ারত অবস্থায় আবিষ্কার করা। শুকোলে মনে করে তোলা। না তুললে, বৃষ্টি গ্যারান্টি। এবং আমার একটিমাত্র জিনস ভিজে গোবর। 


৪। বাজার করাঃ কাপড় কাচার মতো এই শেষ হয়েও হইল না শেষ দোষটা বাজার করারও আছে। স্রেফ ওই তোয়ালে চেপা, ক্লিপ দেওয়ার অংশটা নেই বলে কান ঘেঁষে বাজার করা জিতে গেল। বাজার করা কখনওই শেষ হয় না। চাল আনলে আটা ফুরোয়, লাইজল আনলে মনে পড়ে ওডোনিলও আনতে হত। আলু কিনে পোস্ত ভুলে যাই, পোস্ত কিনলে পাঁপড়, পাঁপড় পাঁপড় জপতে জপতে বাজারে গিয়ে যদি বা মনে করে তাকে ব্যাগে পুরি, রবিবার বিকেলে চা বানিয়ে আবিষ্কার হয় পপকর্ন নেই। 

একটা ছিল না?! বাজার যাওয়ার আগে দেখলাম যে! 

মাথায় হাত দিয়ে বসি। এখন কী খাব আমরা? 

শেলফের ওপর থেকে পাঁপড়গুলো চোখ পিটপিট করে।

আমার দুঃখ দ্বিগুণ হয়। পাঁপড়? মাগো, পাঁপড় মানুষে খায়?

তবু বাজার করা আমার লিস্টের এত নিচের দিকে কেন? ধড়াচূড়া পরে বাইরে বেরোতে হওয়া সত্ত্বেও এবং মানুষের সঙ্গে কথোপকথন চালাতে হওয়া সত্ত্বেও? কারণ বাজার করার এতগুলো খারাপ দিক আছে বলেই আমি প্রতিবার বাজার করতে গিয়ে দু’প্লেট করে ফুচকা খাই। 

এবং বাজার করা ভালো লাগা কাজের লিস্টে হইহই করে ওপরে উঠে আসে। 

৩। রান্না করাঃ রান্না করতে আমার খারাপ লাগে না। মাঝে মাঝে সিম করে এসে টিভি দেখা যায়, ভালো হলে ভালো, খারাপ হলেও অসুবিধে নেই, নিজের হাতের রান্না খেতে কারওরই খারাপ লাগে না, আর অর্চিষ্মান ভালোখারাপ যেমনই হোক না কেন, মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করে। খারাপ লাগার বিশেষ কিছুই নেই।

তবু যে এক নম্বরে জায়গা পেল নাতার কারণ হচ্ছে রান্না রোজ করতে হয়, চট করে শেষ হয়ে যায়, তখন আবার রান্না করতে বসতে হয়। বিশেষ করে ভালো খেতে হলে তো অসুবিধেজনক রকম তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। (তখন আমাদের অলৌকিক ফ্রিজ কোনও কম্মে লাগেন না।) 

২। গাছে জল দেওয়াঃ গাছে জল দেওয়া যে আমার লিস্টের এক নম্বর ভালো লাগা কাজ নয় সেটা দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেছি। একটু ভাবতেই অবশ্য কারণটা বেরিয়ে পড়ল। 

ভালো লাগার কারণ তো বুঝিয়ে বলার কিছু নেই। জল দিলে গাছ সাড়া দেয়। ছোট ছোট পাতা বার করে মাথা নাড়ে। পা উঁচু করে জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি মারে। 

ঠিক উল্টো ব্যাপারটা হয় ফেলে রেখে বেড়াতে চলে গেলে। নিজেরা হেসে খেলে বেড়িয়ে ফিরে আসি, দেখি গাছ নেতিয়ে পড়েছে। জল না পেয়ে আধমরা। এবং সবথেকে খারাপ দিকটা হচ্ছে, ওকে না খেতে দিয়ে মেরে ফেলার জন্য গাছের আমার প্রতি কোনও অভিযোগ নেই। চুপ করে মরে যাবে। এবং তাৎক্ষণিক হলেও, ওর মৃত্যুর তুলনায় হাস্যকররকম অকিঞ্চিৎকর হলেও, আমাকেও খানিকটা মেরে যাবে।

অতএব? বাকি কী রইল? আমি মনে মনে জানতাম এর জেতার একটা জোর সম্ভাবনা রয়েছে, সে সম্ভাবনা নিশ্চয়তায় রূপান্তরিত হয়েছে।

১। বাসন মাজাঃ বাসন মাজার কোনও খারাপ দিক, এই মুহূর্তে আমি খুঁজে পাচ্ছি না। একজায়গায় দাঁড়িয়ে করা যায়, কারও সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকট করতে হয় না, লেবুগন্ধের প্রিল দিয়ে কবজি একবার আলতো করে ঘোরাতে না ঘোরাতেই চকচকে। (একমাত্র রাইস কুকারটা মাজতে একটু অসুবিধে হয়, সাইজে বেঢপ বলে বেসিনের সাইডে লেগে ঘটর ঘটর আওয়াজ করে।) 

আর যদি পাজামার পকেট থাকে, আর মোবাইলটা যদি সেই পকেটে ফেলে রাখা যায়, আর কোন চ্যানেলে যদি এই গানটা দেয়, তাহলে বাসন মাজা রীতিমত লোভনীয় টাইমপাস। এমন অনেক সময় হয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যে সাতটায় টেলিকনফারেন্সে, একটাই কথা পাঁচটা লোকের মুখে পাঁচশো রকম ভাবে শোনার পর, আমার রান্নাঘরের বাসন মাজার ছোট্ট কোণটার কথা মনে পড়ে বুক মুচড়ে উঠেছে। 

আরও একটা কারণ আছে বাসন মাজতে ভালো লাগার। অর্চিষ্মান বেসিনের দিকে এগোলেই “না না, এগুলো আমি ম্যানেজ করে নেব, তুমি বরং ইস্তিরির দিকটা দেখো গিয়ে” বলে ঝাঁপিয়ে গিয়ে পড়ার। যে কারণটা আমি আগে কাউকে বলিনি, এই আপনাদের বলছি। আগাথা ক্রিস্টি নামের একজন খুব বুদ্ধিমান আর সফল লেখক বলেছিলেন, তাঁর বেস্ট আইডিয়াগুলো তিনি সব পেয়েছেন বাসন মাজতে মাজতে। 

দুঃখের বিষয়, আমার সঙ্গে সে রকম কিছু ঘটেনি এখনও। তবু আমি হাল ছাড়ছি না। এখনও অনেক বাসন মাজার আছে, আজ না হোক কাল না হোক, একদিন না একদিন আইডিয়াকে এসে ধরা দিতেই হবে। যতদিন না আসছে,ততদিন আমার ভালো লাগা কাজের লিস্টে বাসন মাজার সিংহাসন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।


September 14, 2017

কোথায় বেড়াতে যাওয়া যায় বলুন দেখি?




গত বছর প্রায় ঠিক এই সময়ই মালশেজঘাট যাওয়া হয়েছিল

অফিসের যারা এখন বেলা চারটের সময় সাঁইত্রিশ ডিগ্রিতে ঘামতে ঘামতে পকোড়া খাচ্ছে, ন’মাস আগে এই সময় ডেস্কে বসে বন্ধ এসি-তেও কাঁপতে কাঁপতে ফ্যাট ফ্রি দই খাচ্ছিল, ঝপাঝপ মোটিভেশনাল উদ্ধৃতি ডাউনলোড করতে করতে। তারপর দইয়ের আগুনে দপ করে জ্বলে ওঠা খিদের মুখে ‘মাইন্ড ওভার ম্যাটার’ বিড়বিড় করতে করতে সে সব কোটেশনের প্রিন্ট আউট জোগাড় করতে হাঁটছিল জেরক্স রুমের দিকে। রেনফরেস্টের শ্রাদ্ধ করে টাইমস রোম্যান বোল্ড এবং বত্রিশ ফন্টের প্রিন্ট আউট নিয়ে এনে সাঁটছিল চোখের সামনে।

রেনফরেস্টের প্রতি আমারও যে খুব মায়াদয়া আছে এমন দাবি করতে পারি না। মোটিভেশনাল কোটেও অরুচি নেই, তবে পরিমিতিতে বিশ্বাস আছে। বেশ ক’দিন ধরে একটাই কোটেশন আমার বোর্ডে ঝুলছে, অদূর ভবিষ্যতেও ঝুলবে, কারণ কোটেশনের প্রাসঙ্গিকতা এখনও ফুরোয়নি। 

ডান ইজ বেটার দ্যান পারফেক্ট। 

আমার পারফেকশনিস্ট সহকর্মীরা আতংকিত হন, কিন্তু আমি দমছি না।

যে প্রিন্ট আউটটা দেখে তাঁরা আরও বেশি আতংকিত হবেন, সেটা আমি, তাঁদের মুখ চেয়েই, আরেকটু আড়ালে রেখেছি। ইন ফ্যাক্ট, আমার চেয়ারে না বসলে (অর্থাৎ আমার পারস্পেকটিভ বিনা) সেটা দেখতে পাওয়া অসম্ভব। সেটা হচ্ছে সারা বছরের ছুটির লিস্ট। এ নিরীহ জিনিস এত লুকোনোর কী আছে জানতে চাইছেন? ডেস্কে মার্ডার মিস্ট্রি রাখার যা বিপদ, বোর্ডে ছুটির লিস্ট টাঙিয়ে রাখারও তাই। লোকে ধরে নেয় ফাঁকিবাজ। 

তাতে অবশ্য আমার আপত্তি থাকা উচিত নয়, কারণ আমি সত্যি সত্যিই ফাঁকিবাজ। সে সত্যিটা বারংবার প্রমাণ হওয়ার রিস্ক নিয়েও আমি লিস্টটা ছিঁড়ে ফেলতে পারি না। সারাদিন চোখের সামনে থেকে তারা আমাকে আশ্বাস দেয়, আছে আছে, মুক্তি আছে। 

বছর শেষ হয়ে আসছে বলেই হয়তো ছুটির কথা ইদানিং বেশি বেশি মনে পড়ছে। আগের বছরটা (২০১৬) যেমন খরা ছিল, ছুটির বিচারে এ বছরটা ছিল ততটাই ভরা। বারোটার মধ্যে আটটা ছুটিই ছিল শুক্র কিংবা সোমবারে, বাকি চারটে মঙ্গল বা বৃহস্পতি। এরকম ত্র্যহস্পর্শযোগ আমার জীবৎকালে আর হবে কী না কে জানে।

চিন্তা হচ্ছে, বছরটাকে আর বছরের ছুটিগুলোর যথেষ্ট সদ্ব্যবহার করতে পারলাম কি? বছরের শেষ লম্বা ছুটিটা (শুক্রবার নবমী/দশেরা, সোমবার গান্ধীজয়ন্তী) আসন্ন। যদিও বেড়াতে যাওয়ার পক্ষে ছুটিটা বিশেষ সুবিধের নয়, কারণ সবারই ছুটি, সবাই বেড়াতে যাবে। তবু একেবারে বাড়িতে বসে নষ্ট করতে মন চায় না।

কিন্তু যাব কোথায়? টু ট্র্যাভেল লিস্ট তো উপচে পড়ছে। ভেবে রেখেছিলাম এ বছর ডুয়ার্স যাবই, কেরালা বাকি রয়ে গেল, আন্দামান হল না। মাঝখান থেকে হঠাৎ দুজনের মাথাতেই পুরী ঘাই মারছে ঘুরে ফিরে। পাক্কা আট বছরের ঘেঁষাঘেঁষির পরও যে স্বর্গদ্বারে পাশাপাশি বসে চমচম খাওয়ার সময় হয়নি আমাদের, মনে পড়লে শিউরে উঠছি। বা টাইগার হিলে মাংকি টুপি পরে দাঁড়িয়ে কুয়াশা দেখে তাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা বলে চালিয়ে দেওয়ার, মনে করলে নিজেদের ক্ষমা করতে পারছি না।

তার মধ্যে ক্রমাগত নতুন নতুন জায়গার খবর আসছে। আমার ডেস্ক প্রতিবেশী ‘স’ কেরালার লোক , যদিও নাম শুনে আর চেহারা দেখে আমি হান্ড্রেড পার সেন্ট শিওর ছিলাম বাঙালি। ডেস্কটপে মালয়ালম খবরের কাগজ খোলা দেখেও সন্দেহ হয়নি, উল্টে মারাত্মক ইমপ্রেসড হয়েছিলাম। আরে বাঃ, মালয়ালম পড়তে পারা বাঙালি। (একটু মিথ্যাচার হল, আমি লেখাটা মালয়ালম বলে চিনতে পারিনি, ‘সাউথ ইন্ডিয়ান’ স্ক্রিপ্ট এটুকুই বুঝেছিলাম, এবং ইমপ্রেসডও হয়েছিলাম ‘সাউথ ইন্ডিয়ান’ স্ক্রিপ্ট পড়তে পারা বাঙালি ধরে নিয়েই।) 

আমি কেরালা যেতে চাই শুনে ‘স’ জিজ্ঞাসা করল কেরালার কোথায় যেতে চাই। আমি চেনা নামগুলো বললাম। “শান্তিতে ঘুরতে চাইলে ওসব জায়গায় না গিয়ে এখানে এখানে যাও,” বলে স চারটি অচেনা নাম দিল। ডেস্কে ফিরে এসে সে সব জায়গার ছবি দেখে আমার সত্যি সত্যি মনে হচ্ছিল এক্ষুনি ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়ি, বেরোনোর আগে অর্চিষ্মানকে চ্যাটে জায়গাটার ল্যাটিচ্যুড লংগিচ্যুড জানিয়ে দিয়ে যাই।

আরেক ‘স’, কিছুদিন আগে চলে গেছে অফিস ছেড়ে, যাওয়ার আগে বলে গেল, “আর কোথাও যাও না যাও পণ্ডিচেরিটা ঘুরে এস।” এত আন্তরিক ভাবে বলল, হাতের পেপার ফেলে রেখে ফোন বার করে অপূর্ব সব ছবিও দেখাল যে একরকম মনস্থির করেই ফেললাম। অর্চিষ্মানেরও নাকি অনেকদিনের ইচ্ছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, “বলনি কেন?” পণ্ডিচেরিতে বুঁদ হয়ে আছি, হোটেলমোটেল সব পছন্দ হয়ে গেছে, এমন সময় বাবার ফোন, ছোটদাদু-দিদা দিল্লিতে। গেলাম একদিন দেখা করতে, দাদুরাও এলেন। বেড়ানোর গল্প হল খুব। দিদা বললেন, “আর কোথাও না যাও সোনা, শ্রীখোলা একবার যেও, আর ক্ষীরসু -টাও বাদ দেওয়ার মানে হয় না।”

বাবা বলে রেখেছেন, গোকর্ণ। বিজাপুর। ম্যাঙ্গালোর। 

মা মাঝে মাঝে মনে করান। গরুমারার কটেজের বারান্দায় বসে বৃষ্টি। সূর্য ডোবার ঠিক আগে মূর্তি নদীর তীর।  

এদিকে ক্যালেন্ডারে বছর শেষ, বছরের শেষ ভদ্রস্থ ছুটিটাও ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। অথচ আমাদের এখনও কোথাও যাওয়া ঠিক হয়নি। খুব দূরে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তাই পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছি, টেন/ ফিফটিন/ফিফটি অফ বিট উইকএন্ড/ লং উইকএন্ড ডেস্টিনেশনস অ্যারাউন্ড ডেলহি।

মুশকিল হচ্ছে, পঁচিশটা সাইটে যদি একটাই অফ বিট ডেসটিনেশনের নাম পঁচিশবার লেখা থাকে, তাহলে সেটা যথেষ্ট অফ বিট কি না সে সন্দেহ হয়।

সব মিলিয়ে কেমন একটা হতাশা জাগছে। শেষে না সি আর পার্কের প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে বুড়ির চুল খেয়ে কাটাতে হয়। সেটা যে আমার খারাপ লাগবে তা নয়। তাছাড়া গীতাদি আজ সকালে যাওয়ার সময় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে গেলেন, “মেলা গ্রাউন্ডের ঠাকুরটা এ বছর দারুণ হবে। অলরেডি ছবি টাঙিয়ে দিয়েছে, মনে হচ্ছে মা এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে নামবে।”তবু এখন যখন ভাবছি বছর শেষ, ছুটি শেষ, তখন বেড়াতে না যেতে পারাটাকে চরমতম শাস্তি মনে হচ্ছে। 

তাই আমি আপনাদের শরণাপন্ন হয়েছি। বেড়াতে যদি না-ই যেতে পারি, অন্তত বেড়ানোর গল্পে নিজেকে মুড়ে রাখি। তাছাড়া এই সুযোগে আরও কয়েকটা নাম লিস্টে জোড়া হবে। দুঃখ হলে লিস্ট নেড়েচেড়ে, ইন্টারনেটে সে সব জায়গার ছবি দেখব। 

একবার ভেবেছিলাম, শর্ত দেব। অ্যারাউন্ড ডেলহি, অফ বিট, ওভারনাইট জার্নি হ্যানাত্যানা। কিন্তু দিলাম না। আমার দাবি একটাই, আপনারা আমাকে এমন জায়গার গল্প বলুন যেখানে গিয়ে আপনাদের ভীষণ আনন্দ হয়েছিল, মনে হয়েছিল আবার আসব, না এসে থাকতেই পারব না। সে জায়গা পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে হতে পারে, চাঁদে হলেও আপত্তি নেই। 

এই আমি অপেক্ষায় বসলাম।


September 10, 2017

যকের ধন




উৎস গুগল ইমেজেস


সিনেমার টিকিট কাটার সময় আমাদের সর্বদা প্রায়োরিটি থাকে, সাধ্যে কুলোলে, হলের শেষ সারির টিকিট কেনার।

আপনারা যে কারণে ভাবছেন, সে কারণে নয়। 

সিনেমা হলের সবথেকে পেছনের সারির টিকিট কেনার আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য, আমার সিটের পেছনে ক্রমাগত কেউ যাতে লাথি না মেরে যেতে পারে সেটা সুনিশ্চিত করা। যাতে অবশেষে আমাকে পেছন ফিরে অনুরোধ করতে না হয়,“দাদা/দিদি/ভাই/বোন, এই বেলা একটু ক্ষান্ত দিন।” যাতে তারপর একটা বিশ্রী, আড়ষ্ট অস্বস্তি মনমাথা না ছেয়ে থাকতে পারে।

আপনারা হয়তো মনে করছেন আমি একটি রগচটা সহদর্শক, পায়ের ভাঁজ খুলে এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে যেতে গিয়ে একবার আলতো খোঁচা লাগলেই খাঁড়া নিয়ে লাফিয়ে পড়ি। আফটার অল, সেই প্রবাদটা তো আছেই, সারাদিন যদি আপনার সবাইকে দেখে গা জ্বলে তাহলে দোষটা বাকিদের থেকে আপনার গায়ের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

কাজেই আমাকে যদি সব হলে, সব সিনেমার, সব শোতে কেউ না কেউ লাথি মারে, তাহলেও দোষটা সে লোকটার পায়ের থেকে বেশি আমার পিঠের হওয়ার কথা, কিন্তু আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, ঘটনাটা সেরকম নয়। আমি দাঁতে দাঁত চেপে গোটা সিনেমা জোড়া পায়ের লাথি খেয়ে চুপ করে থাকার চেষ্টা করেছি, অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছি, এমনকি আমার পিঠে লাথির শব্দ এবং কম্পনে চমকে গিয়ে অর্চিষ্মান চমকে ঘাড় ঘুরিয়েছে এমনও হয়েছে। 

এবং মেনে নিয়েছে, বা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে, যে লাথি-মারা লোকদের সঙ্গে আমার সিটের একটা অলৌকিক সমাপতন আছে।

'যকের ধন' দেখব ঠিক করা ছিল, সে নয়ডা গিয়ে হলেও, তারপর কতগুলো ঘটনা এমন ঘটল যে আমরা নিশ্চিত হলাম যে সিনেমার দেবতা আমাদের 'যকের ধন' দেখাতে চান। শুক্রবার খেয়াল করলাম নয়ডার সঙ্গে সঙ্গে সাকেতেও চলছে 'যকের ধন'। তারপর এস এম এসে ওলাঅটোর প্রোমোশন কোড এসে গেল, আর আমরা সত্তর টাকার রাস্তা (মিটারে পঞ্চাশ) চব্বিশ টাকায় পৌঁছে গেলাম।

যতটুকু টাকা বাঁচল তার পাঁচগুণ খরচ করে পপকর্নের গামলা আর কোল্ড ড্রিংকসের বালতি নিয়ে হলে ঢুকে বসলাম। চেয়ারের পিঠ হেলিয়ে দেওয়ালে ঠেকালাম, শান্তিতে মন ছেয়ে গেল। সিনেমা চলাকালীন আড়চোখে দেখলাম, অর্চিষ্মানের ওপাশে বসা ভদ্রলোকটি ক্রমাগত সামনের সিটে লাথি মেরে চলেছেন। আমার আরাম দ্বিগুণ হয়ে গেল। 

সবার রিভিউতে পড়লাম, হেমেন রায়ের মূল গল্প থেকে সিনেমার গল্প বেশ খানিকটা আলাদা। বইয়ের গল্প আমি সম্পূর্ণ ভুলে গেছি, কাজেই কোথায় কোথায় আলাদা বলতে পারব না, সিনেমার গল্পটাই বলি আপনাদের। বিমল প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক,কুমার তার বন্ধু, অ্যাড এজেন্সিতে কাজ করে। (অ্যাড এজেন্সিতে কাজ করানোর একটা সুবিধে হচ্ছে পৃষ্ঠপোষকদের প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট। যেমন ধরা যাক, কুমার যদি চ্যাম্পিয়ন ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপনের প্রোজেক্টে কাজ করে, তাহলে ল্যাপটপ স্ক্রিন থেকে 'চ্যাম্পিয়ন'-এর বিজ্ঞাপন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকায় অস্বাভাবিক কিছুই নেই।)  

যাই হোক, বাড়ির পুরোনো ঘর থেকে কুমারের বড় ঠাকুরদা বীরেন্দ্র রায়ের বাক্স উদ্ধার হয়, ভেতর থেকে বেরোয় একখানা মড়ার মাথার খুলি। খুলির ওপর নানারকম অদ্ভুত সংখ্যাটংখ্যা লেখা। নির্ঘাত গুপ্তধনের সঙ্কেত। এদিকে ভারতীয় জাদুঘরের অ্যাসিস্ট্যান্ট কিউরেটর হিরণ্ময়কে (কৌশিক সেন) তলব করেন করালী (সব্যসাচী চক্রবর্তী)। করালীর কাছেও রয়েছে একখানা উচেন লিপিতে লেখা কাগজ। এইবার ভালো লোক দুষ্টু লোক সবাই মিলে গুপ্তধন ধাওয়া করে। দ্বিতীয়ার্ধ্বে শর্মিষ্ঠা ( প্রিয়াঙ্কা সরকার), শম্ভু গোম্পা (সমিধ মুখার্জি) ইত্যাদি চরিত্ররা আসে। প্রিয়াঙ্কা সরকারের চরিত্রটা একটু জোর করেই ঢোকানো হয়েছে মনে হয়, তবে সেটা ভালোই হয়েছে, একেবারে মেয়েশূন্য গল্প ভালো দেখাত না।

আড়াইঘণ্টার সিনেমার প্রথমার্ধটা আমার খারাপ লাগেনি, যদিও অ্যাডভেঞ্চার মিস করছিলাম। যকের ধন-এর গল্প ভুলে গেছি বটে, কিন্তু তাতে অ্যাডভেঞ্চার যে ভরপুর ছিল, সেটা ভুলিনি। ফার্স্ট হাফে গল্প কলকাতাতেই ঘোরে, যদিও পটপরিবর্তনের জন্য গুচ্ছ পুরোনো বাড়ির ছাদ, ভারতীয় জাদুঘরের রাজকীয় বারান্দা, প্রেসিডেন্সির ঐতিহ্যশালী সিঁড়ির ব্যবহার করেছেন পরিচালক। সেগুলো সব গল্পের প্রয়োজনেই হয়েছে, কাজেই কিছু বলার নেই, কিন্তু মাঝে একবার বিমল আর কুমার গঙ্গাবক্ষে লঞ্চের ওপর আলোচনারত ছিলেন, সেটার কোনও কারণ আমি খুঁজে পাইনি। (যদি না “এক নাগাড়ে স্টুডিওর বদ্ধ পরিবেশে শুটিং চিত্র তারকাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর” এই আপ্তবাক্যটি পরিচালক মাথায় রেখে এ সিদ্ধান্ত নেন। সম্ভাবনাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কেন পরে স্পষ্ট হবে।)

অ্যাডভেঞ্চার ভরপুর আছে সেকেন্ড হাফে। আর সেই সব অ্যাডভেঞ্চার সামলাতে গিয়ে সিনেমাটা একটু নড়বড়ে হয়ে গেছে মনে হয়েছে আমার। ক্লাইম্যাক্সে রাতের বেলা ঘন বনের ভেতর গোলাগুলি চলছে, কাজেই আলোর অনুপস্থিতি প্রত্যাশিত, কিন্তু সেটা একই সঙ্গে কী-থেকে-কী-হয়ে-গেল গোছের একটা ফিলিং জাগায়। 

সিনেমাটায় ভালো জিনিস আছে অনেক, দেখলে উত্তরবঙ্গে বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে। সব্যসাচীকে তো আমি পছন্দই করি, বেশ কিছুদিন ধরে দুষ্টু লোকের ভূমিকায় দেখার পর কৌশিক সেনকে হীরুদার চরিত্রে বেশ পছন্দ হয়েছে আমার। বাংলা সিনেমার হিরো হয়েও যে এত স্পষ্ট উচ্চারণে বাংলা বলেন, সেটার জন্য পরমব্রতর একটা জোর হাততালি প্রাপ্য।  

তাছাড়া বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সুকুমার রায় এবং আবোলতাবোলের অবদান নিয়ে আপনার মনে যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহ থেকে থাকে, তাহলে বিমলকে আড়াইঘণ্টা স্ক্রিনে দেখার পর আর থাকবে না। বাংলা সিনেমায় সত্যজিৎ এবং সোনার কেল্লার অবদানের গুরুত্ব নিয়েও। গড়পারের রায়চৌধুরীদের নিয়ে বিমল অবসেসড। কথায় কথায় আবোলতাবোল আবৃত্তি করে, ফেলুদার ডায়লগ বলে। এতবার বলে যে সন্দেহ হয় অবসেশনটা বিমলের, নাকি পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের, হাতের মুঠোয় একটা চরিত্র পেয়ে তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি? 

লাস্ট সিনে স্পষ্ট হয়ে যায় সিকোয়েল আসছে। বলাই বাহুল্য, দেখব। 


September 09, 2017

কয়েকটা লিংক





ভালো রান্না, খারাপ রান্না দিয়ে ভৌগোলিক লক্ষ্মণরেখা টানা বুঝি, ধর্ম দিয়ে তো বুঝিই, চা আর কফিপ্রীতি দিয়েও কল্পনা করতে পারি, কিন্তু তাই বলে অলস আর খাটিয়ে দিয়ে?  হাঁটতে হাঁটতে খাওয়া আর বসে বসে খাওয়া দিয়ে? এঁরা গোটা ইউরোপ মহাদেশটাকে এইরকম নানা ভাবে ভেঙেছেন। আর সেই খবরটা আমার ইনবক্সে পাঠিয়েছেন সুতীর্থ।

টেরি প্র্যাচেটের মৃত্যুর সময়কার ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস উপন্যাসটিকে রাস্তায় ফেলে তার ওপর দিয়ে স্টিমরোলার চালানো হয়েছে। টেরি প্র্যাচেট তাই চেয়েছিলেন। 


প্রতিবারের লিংকে যে গাছেদের খবর থাকছে, এটা আমার বেশ পছন্দ হচ্ছে। অ্যামেরিকার কয়েকটি সাক্ষী গাছের কথা এই লিংকে রইল, যারা ইতিহাসের বড় বড় ঘটনার, ওয়েল, সাক্ষী রয়েছে।


বাড়ি গিয়ে অনেকদিন পর এই গানটা শুনলাম।


September 08, 2017

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ



আমার পাশে খেতে বসেছিলেন ছোটমা, ছোটমার উল্টোদিকে খোকনকাকিমা (কাকিমার নাম, বলা বাহুল্য, খোকন নয়। একবার ভেবেছিলাম কাকিমাকে ওঁর নিজের নামটা জিজ্ঞাসা করি, সহবতের মুখ চেয়ে করলাম না।) খোকনকাকিমার পাশে নিষ্ঠা। নিষ্ঠা জৈন। দিল্লির মেয়ে, বম্বেতে থাকে, কলকাতায় এসেছে ডকুমেন্টারি বানাতে। ডকুমেন্টারি বিষয় এ পোস্টে অবান্তর, কিন্তু আমি বলবই। বিষয় হচ্ছে রিষড়ার হেস্টিংস জুট মিল, ভারতবর্ষের প্রথম পাটকল। নিষ্ঠা বাংলা জানে না, ছোটমা খোকনকাকিমা হিন্দি ইংরিজি জানেন না, আমারও না জানার মতোই। 

তবু গোটা নেমন্তন্ন বাড়িতে আমাদের টেবিলটাতেই সবথেকে বেশি কথাবার্তা, রসিকতা হয়েছে। কার বাড়ি কোথায়, সে বাড়িতে কে কে থাকে, জৈনদের প্রয়ুশন-এর নিয়মকানুন, বাঙালিদের মুখেভাতের নিয়মকানুন, ক্ষীরের সঙ্গে পায়েসের মিল ও অমিল, নিষ্ঠার পরিচিত সেলিব্রিটিদের হাঁড়ির খবর, ইলিশমাছ খাওয়ার প্রণালী, সঅঅঅব।

কারও কিচ্ছু বুঝতে, কাউকে বুঝতে অসুবিধে হয়নি। কারও মনে হয়নি, “মা গো, এ/এরা ভাষাটা জানে না কেন” কারও মনে জাগেনি, “হে ভগবান, আমি ভাষাটা জানি না কেন, অবিলম্বে আমার দড়িকলসির খোঁজে বেরোনো উচিত।”  সবাই একে অপরকে জানতে জেনুইনলি আগ্রহী ছিল, জেনেওছে। কোনও ভাষা সে জানায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি।

ভাষায় কিছু আটকায় না। আটকায় কুণ্ঠায়। সংকোচে। নিজেকে অপ্রতুল ভাবায়।

*****

তার একটু আগেই বাটি বাটি সুখাদ্য সামনে সাজিয়ে রেখে তর্জনীর ডগায় ওঠা পায়েসের দুধ ইরার জিভে ছোঁয়ানো হয়েছে, তারপর বাকি সবাই কবজি ডুবিয়ে ইলিশ থেকে ধোকা থেকে চমচম কিচ্ছু বাদ দেয়নি। খেয়েদেয়ে উঠে সবে জানালার পাশে আধাশোয়া হয়ে পড়েছি (ইচ্ছে ছিল লম্বা দেওয়ার, কিন্তু সবার মাঝে চিৎপাত হয়ে পড়া যায় না বলে চারপাঁচটা বালিশে পিঠটা কোনওরকমে ঠ্যাকনা দিয়ে থুয়েছিলাম) অমনি হুড়ুমদুড়ুম মেঘ ডেকে বৃষ্টি এসে গেল।

সবাই বলছে, “ওরে বাবা, ওলা ডাক, জিনিস তোল, ইরাকে ভালো করে প্যাঁচা ঠাণ্ডা না লেগে যায়,” আর আমি জানালা দিয়ে দেখছি পাশের বাড়ির শ্যাওলাধরা কলসি রেলিং, রেলিং-এর গায়ে এলিয়ে থাকা গাছের পাতার মহানন্দ স্নান। 

*****

আপনাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আজ সকালে যে কলাটা খেয়ে আপনি অফিসে এলেন সেটা আপনার জীবনের ক’নম্বর কলা, আমি দশ টাকা বাজি ধরতে রাজি আছি, আপনি বলতে পারবেন না। 

এক হাত লম্বা একটা শরীরের মধ্যে নিখুঁত সবকিছুর এঁটে যাওয়া, কনুই এবং হাঁটু এবং আঙুলের নখ; ফুরফুরে চুলে অসম্ভব সুন্দর গন্ধ, পাঞ্জার সঙ্গে আঙুলের জোড়ের জায়গায় টিপ টিপ টিপ টিপ গর্ত চারখানা, ইরার আগাগোড়াই চমকে দেওয়ার মতো। আরও চমকপ্রদ হচ্ছে উদ্দেশ্যসাধনের (কোলে চড়া) জন্য ওইটুকু মাথা খাটিয়ে হাসি এবং কান্নার এমন সুচিন্তিত প্রয়োগ।

কিন্তু এসব ছাপিয়ে যখনই মনে পড়ছে, একটা লোক আমার চোখের সামনে তার জীবনের প্রথম কলাটা খেল এবং পরদিন সকালে জীবনের দ্বিতীয় কলাখানা, আমার বিস্ময় আর বাধা মানছে না। মানুষ এত নতুন হতে পারে?

*****

সেই যে সায়কদের বাড়িতে থাকতে থাকতে হল, তারপর আর বৃষ্টির দেখাসাক্ষাৎ নেই। রসগোল্লার রসে চোবানো একটা পাতলা চাদর যেন গায়ে সর্বক্ষণ জড়িয়ে রেখেছি। এদিকে লক্ষ্মীপুজোর আর মাসখানেক বাকি, আকাশে চাঁদ বিপজ্জনক রকম বড় এবং গোল হয়ে উঠেছে। রাতে খাটে শুলে জানালা দিয়ে চোখে চোখে রেখে প্যাট করে তাকিয়ে থাকে। মা সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আর বলেন, “নিকট শোভা দূর জল/ দূর শোভা নিকট জল”। অর্থাৎ চাঁদের শোভা যখন স্তিমিত এবং ঘোলা, তখন বৃষ্টির সম্ভাবনা অধিক এবং ভাইসি ভার্সা।

নামল তো নামল ঠিক বুধবারের বারবেলায়। বেলা তিনটে পার করে। যেদিন আমাদের ফেরা। তপাকাকু নিতে আসবে সাড়ে পাঁচটায়। এয়ারপোর্টের সামনে জল জমলে কেমন মজা হয় সেটা আসার দিন অর্চিষ্মান টের পেয়েছে, কিন্তু কতক্ষণ আর বৃষ্টি হবে, থেমে যাবে এক্ষুনি ধরে নিয়ে আমরা টেনশন না করার সিদ্ধান্ত নিলাম। দু’রকমের বৃষ্টির কথা জানা ছিল, এক বউ নাচানো, দুই, কেরানি ভেজানো। বুধবারের বৃষ্টির জাত ছাত্র ভেজানো। স্কুল সবে ছুটি হয়েছে। তার মধ্যে সাইকেল করে ফিরছে সব। কুড়ি বছর আগের আমিরা সামনে দিয়ে সাঁ সাঁ করে সাইকেল চালিয়ে যেতে লাগল, মাথার লাল ফিতের ফুল নেতিয়ে শুয়ে পড়েছে, চশমা বেয়ে জলের ধারা, লাল পাড় সাদা শাড়ি গায়ের সঙ্গে সেঁটে পতপত করছে। স্পষ্ট কল্পনা করতে পারলাম, ওই অবস্থায় সাইকেলের প্যাডেল ঠেলা কী যন্ত্রণা। ‘আহা উহু’ করছি, মাবাবা বললেন, “তোর যত কষ্ট হচ্ছে ওদের হচ্ছে না। ওদের ভালোই লাগছে। নিজের কথা মনে করে দেখ।” মনে করে দেখলাম, সত্যিই কষ্ট মনে হয়নি কখনও। বৃষ্টির এদিকে কমার কোনও লক্ষণ নেই, আমাদের বাগান থইথই, রাস্তা দিয়ে জল ছুটেছে নায়াগ্রার গতিতে। বুবুনের বউ গোপা কাকভেজা হয়ে সাইকেল চড়ে ফিরল হাসপাতালের ডিউটি সেরে। 

এসবের মধ্যে মা দেখি উঠে রান্নাঘরের দিকে চলেছেন। মনে পড়ে গেল, আমারই দোষ। আসার আগে বলেছিলাম, উপমা খাব মা। আমাদের বাড়িতে উপমা স্টেপল জলখাবার, অর্চিষ্মান দু’চক্ষে দেখতে পারে না বলে আমার আর একার জন্য বানিয়ে খাওয়া হয় না। আজই বাড়িতে শেষ দিন, আজ সকালে উপমা খাওয়ানোর জন্য মা রেডি ছিলেন, শেষমুহূর্তে আমিই মত বদলে চাউমিনের বায়না ধরেছি। বাপি রোল সেন্টারের কান মুলে দেওয়ার মতো মীরামাসির হাতের গাজর, বিন, ক্যাপসিকাম দেওয়া ঝুরঝুরে চাউমিন সকালবেলা খেয়েছি আরাম করে। কিন্তু উপমা না খাইয়ে মা ছাড়বেন না। বেরোনোর আগে খেতে হবে।

এইবারে একটা দ্বিতীয় সমস্যার উদয় হল। কারি পাতা নেই। মানে আছে প্রচুর, কিন্তু সবই গাছে। আর গাছ বাগানের মধিখানে। পুকুরের মাঝখানে দ্বীপের মতো জেগে আছে। বারান্দা কিংবা ঠাকুমার ঘরের জানালা থেকে লগা দিয়ে টেনে তার ডাল পর্যন্ত পৌঁছনো যায়, কিন্তু টেনে কাছে আনা যায় না। আমি যত বলি, কারিপাতাহীন উপমাই চলবে, আমার পারফেকশনিস্ট মা শুনবেন না। উপমা হবে, এবং কারিপাতা দিয়েই হবে। অবশেষে লগা নিয়ে খানিকক্ষণ ব্যর্থ ধস্তাধস্তির পর, বাবা খপরখপর করে জল ভেঙে গেলেন কারিপাতা ছিঁড়তে।

আমি মনে মনে ভাবলাম, ভাগ্যিস অর্চিষ্মান সাক্ষী নেই, তাহলে এখন কিছু বলত না, সব দেখে রাখত, পরে বলত, “বাঁদর কি সাধে হয়েছ?”’

*****

প্লেন ছাড়ল কুড়ি মিনিট লেটে। জেটে আবার খাবার ফ্রি। বাড়ি থেকে অত সাধনার উপমা খেয়ে বেরিয়েছি, কিন্তু ফ্রি মিল দেবে শুনে পেটে ছুঁচোর দল মার্চপাস্ট লাগিয়েছে। মাইন্ড ওভার ম্যাটার করতে সিটের পকেট থেকে ম্যাগাজিন খুলে পড়তে শুরু করলাম। ট্যারো রিডিং অনুযায়ী রাশিফল দিয়ে রেখেছে। এ মাসেও আমার ফেমাস হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই দেখে বিরক্ত হয়ে অর্চিষ্মানেরটা দেখতে গেছি, অমনি হাত পা পেটের মধ্যে। বলে কি না, পসিবিলিটি অফ নিউ রোম্যান্স! অর্চিষ্মান বলল, “দিল্লি গিয়েই তোমার চশমা বদলাতে হবে দেখছি। পরিষ্কার লিখেছে, সিংগল হলে তবেই নিউ রোম্যান্স।” 

আর ডবল হলে? 

ডবল হলে পার্টনারের সঙ্গে শর্ট অ্যান্ড সুইট রোম্যান্টিক ট্রিপ। 

এদিকে রানওয়েতে জ্যাম, প্লেন আকাশে ঘুরছে তো ঘুরছেই। জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখছি তুঘলকাবাদ ফোর্টের এবড়োখেবড়ো পাঁচিল। অর্থাৎ আরেকটু ওইদিকে সরলেই আমাদের বাড়ি। লাফ দিয়ে নামা যায়, সে জায়গায় কী সময় নষ্ট। 

ব্যাগট্যাগ জোগাড় করে প্রিপেড ধরে বেরোতে বেরোতে সাড়ে এগারোটা বাজল। বাতাসের তাপমাত্রা মোটে ঊনত্রিশ ডিগ্রি। আমরা জানালার কাচ নামিয়ে বসলাম। দেখতে দেখতে উইন্ডস্ক্রিনে ছোট বড় ফোঁটা, ভাইসাবের ফুর্তি আর ধরে না, ট্যাক্সির যত কলকবজা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে তিনি ছুটেছেন। আমরা কোনওমতে সামনের সিটের পেছন আঁকড়ে ধরে বসে রইলাম।

ভেবেছিলাম সাড়ে বারোটা হবে, সোয়া বারোটাতেই পাড়া এসে গেল। ওই সময় সি আর পার্কে পৌঁছনোর একটা মস্ত সমস্যা হল, চতুর্দিকের গেট এবং রাস্তা বন্ধ। ভাইসাব দয়ালু, বার বার বন্ধ রাস্তার সামনে থেকে গাড়ি ব্যাক করিয়ে আমাদের বাড়ির সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, শেষটা আমরাই বললাম, “অনেক হয়েছে, এখানেই নামান।” “ঘরে গিয়ে জামা ছেড়ে নেবেন,” উপদেশ দিয়ে ভাইসাব চলে গেলেন। 

বৃষ্টি আরও জোরে নামল।

সে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হলদে বৃষ্টি তীরের মতো নামছে, পায়ের নিচে সাপের মতো জলের স্রোত, খাঁ খাঁ রাস্তা, আমি আর অর্চিষ্মান সুটকেস টানতে টানতে বাড়ির দিকে চলেছি। বিকেলবেলা ওই রাস্তাটা মোটে দশ পা, এখন মনে হচ্ছে এক মাইল। শুকনো থাকার চেষ্টা ছেলেমানুষি, দেহের প্রতিটি রোমকূপ ভিজে গেছে, ঠাণ্ডায় গা শিরশির করছে। আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, যেমন আজ বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পথে মেয়েগুলোকে দেখে করছিলাম যে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, জুতো ভিজে গোবর, কাল কী করে অফিস যাব, জঘন্য ব্যাপার...

পারলাম না। জনশূন্য চরাচরে বৃষ্টি ভিজতে ভিজতে এই যে আমি আর অর্চিষ্মান চলেছি, সমস্ত নাকানিচোবানি নস্যাৎ করে, এই চলার অভূতপূর্ব রোম্যান্সটাই বারবার মাথা তুলে দাঁড়াল।

এরপরও আপনাদের মধ্যে রাশিফলে অবিশ্বাসী যদি কেউ থেকে যান, তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই। 


September 06, 2017

বাড়ির পথে



দিল্লি থেকে কলকাতা পৌঁছোতে যত সময় লাগে, নাকতলা থেকে দমদম এয়ারপোর্ট পৌঁছোতে লাগে তার থেকে ঠিক কুড়ি মিনিট বেশি।

কথাটা আমিও বিশ্বাস করতাম না, যদি না নিজের চোখে দেখা হত। আমার প্লেন ছাড়ল সন্ধ্যে সাতটা পঁয়ত্রিশে, অর্চিষ্মান বাড়ি থেকে রওনা দিল সাড়ে সাতটায়। ব্যাগট্যাগ নিয়ে আমি থ্রি এ থ্রি বি গেটের সামনে আসতে আসতে দশটা, অর্চিষ্মানের সঙ্গে দেখা হতে হতে আরও ঝাড়া কুড়ি মিনিট। 

দায়ী বৃষ্টি। ফোনে শুনেছি, প্লেনের জানালা থেকেও দেখেছি। এয়ারপোর্টের জমিতে ছোট ছোট জলের ডোবা তিরতির করছে। জানালায় চশমা ঠেকিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলাম ল্যাম্পের আলো, নাকি এখনও বৃষ্টি পড়ছে। 

আলোই। বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ। তাতেই এই, এখনও চললে সেদিন রাতে আর বাড়ি পৌঁছনো হত না। এটাকে কলকাতাবিরোধী মতামত বলে ভাববেন না কেউ, কারণ দিল্লিতে এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি এর থেকে খারাপ হয়। প্রিপেডের লাইনে অন্তত দেড়শো লোক দাঁড়িয়ে ছিল মুখ চুন করে। ওই লাইনে আমারও থাকার কথা ছিল, শেষমুহূর্তে প্ল্যান বদল হওয়ায় বেঁচে গেছি।

অর্চিষ্মানের ফোন পেয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। ভিড়ের মাঝে নিজেকে চেনানো খুব সহজ। সর্বদাই হয় কটকটে লাল নয় কুটকুটে সবুজ জামা পরে থাকি। কাজে দিল যথারীতি। মিনিট দেড়েকের মধ্যে অর্চিষ্মান বার করে ফেলল। 

গাড়ি চলল ফিরতি পথে। উড়ালপুল জুড়ে সারি সারি গাড়ি নিশ্চল। তেঘরিয়া পাস করার সময় জানালা দিয়ে প্রতিবারের মতো ঝুঁকি দিয়ে দেখা হল মাসির ফ্ল্যাটের আলো জ্বলছে কি না। চিন্তা হল বিগ বেন অলরেডি দেহ রাখল নাকি, না হলে সারা গায়ে ভারা বাঁধা কেন? এর পর ডানদিকে ‘বর্তমান’ বিল্ডিং, বাঁ দিকে পরিবেশ ভবন, মাস্টার্সের গরমের ছুটিতে ইন্টার্নশিপে এই বাড়ির লাইব্রেরিতে ঘন ঘন আসতে হত। চতুর্দিকে বড় বড় ব্যানারে সোনার দোকানের বিজ্ঞাপন। আগের বার খুব গুরু গোবিন্দ সিং-এর ব্যানার চোখে পড়ছিল, আমি আর অর্চিষ্মান দুজনেই তাঁকে শিবাজী ভুল করেছিলাম, এখন গোবিন্দ সিং-এর জায়গায় জয়া আহসান মা দুর্গা সেজে দাঁড়িয়ে আছেন দিকে দিকে।

(সি আর পার্কেও প্যান্ডেলের কাজ প্রায় শেষ। আমাকে একজন ওলাভাইসাব গত সপ্তাহেই জিজ্ঞাসা করেছেন, দুর্গাপূজা তো এক মাহিনা দের হ্যায়, অভি সে প্যান্ডেল? আমি হেঁ হেঁ করে এড়ালাম।  বললাম না যে, সারা বছর যে প্যান্ডেল বাঁধা থাকে না সেই নিয়েই তুষ্ট থাকুন। ) 

বাইপাসে জ্যামে দাঁড়ালে অর্চিষ্মান বলে, “এই বাইপাস দিয়ে যখন স্কুলে যেতাম, সাঁ সাঁ করে বাস ছুটত, দুদিকে জলাজমি, জেলেরা মাছ ধরত। আর এখন ছিরি দেখ।”  

এখনটা সত্যি জঘন্য।

এর পর শুরু হয় রাস্তা জুড়ে ‘ব’ এর খেলা। ফোয়ারাপরিবৃত বিশ্ববঙ্গের বল ঘুরছে বনবন। দূর থেকে পাটুলির মোড়ের আলোকসজ্জা চোখ ধাঁধায়। ছোটবেলায় এই লেকে বোটিং করতে আসাটা নাকি একটা মহা উত্তেজনার ব্যাপার ছিল, অর্চিষ্মান আমাকে জানায়। তারপর এগলি ওগলি ঘুরতেই এসে যায় আশাপূর্ণা দেবীর বাড়ি। এমনিতে আমার ভয়ানক ইমপ্রেসড হওয়ার কথা, হইও, কিন্তু চেপে রেখে উদাসীনতার ভান করি। কারণ এই ঘোষণায় “তোমাদের রিষড়ায় খালি মশা আর আমাদের দেখ কেমন আশা” এই দেমাক প্রচ্ছন্ন থাকে। তারপরই ঢ্যাঙা ফ্ল্যাটবাড়ির গুচ্ছ। ওয়েস্ট উইন্ড। প্রথম যখন উঠেছিল, তখন রামগড়ে ‘ওয়েস্ট উইন্ড’ শুনে হাসি পেয়েছিল সবার খুব। আমরা বলাবলি করি, “অ্যাডভার্টাইজমেন্টে নির্ঘাত ‘লাশ গ্রিন সারাউন্ডিংস’ লিখেছিল বড় বড় করে, না গো?” তার থেকে আমার ঢের ভালো লাগে রাস্তার বাঁ পাশের মধ্যবিত্ত হাউসিং, যার কোনও এক ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ক্লাস ফাইভের অর্চিষ্মান গাছের ডালে কাকের বাসা আর বাসায় বাচ্চা কাকের হাঁ করা লাল মুখ দেখত হাঁ করে। 

অবশেষে দূর থেকে বাড়ির গেট। গেটের মাথায় সাঁচি স্টাইলের ধাপ। কাছে গেলে ফলকে পদবী। কুকুরগুলো গাড়ির চারপাশে ভিড় করে আসে, আমাদের চেহারা দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে কিংবা করুণা করে গুটি গুটি ফিরে যায় যে যার ছায়ায়।

বাবা এসে দরজা খুলে দাঁড়ান। সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে মা বলেন, “কুন্তলা, ডাল আছে, আর আছে আলুভাজা, আলুপোস্ত। ক্ষীরকদম্ব আছে আর আছে জ্বাল দিয়ে ঘন করা নোটো ক্ষীর। আমি বলি সবগুলোই খাও, তবে তোমার যা ইচ্ছে যতটুকু ইচ্ছে তাই খেলেও আমি একটুও রাগ করব না।"

*****


যার সৌজন্যে বাড়ি আসা, এই আমাদের সেই ইরা, তিন্নি সায়কের যৌথ উদ্যোগ। ইরা অচেনা লোক দেখলে একটুও কাঁদে না, কোলে চড়তে ভীষণ ভালোবাসে আর ভালো না বাসলেও শান্ত হয়ে কুমড়োসেদ্ধ খায়। খেয়ে ইরার গায়ে ভয়ানক জোর হয়, তখন ইরা ঘনঘন ঊরু চাপড়ে সবাইকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান জানায়। বলা বাহুল্য এখনও পর্যন্ত কারও কলজেয় কুলোয়নি সে চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করে। 


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.