January 16, 2018

পাকা সই



উৎস গুগল ইমেজেস

আমরা মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে রসিকতা করি, লুব্জুগুব্জু হয়ে যখন মরতে বসব তখন যদি সব ভুলে যাই, নিজের নাম, একে অপরের নাম, তখনও কিছু কিছু শব্দ বা বাক্য মনে থাকবে। মৃত্যুর সময় হয়তো বিড়বিড় করে উঠলাম, ‘ড্যাং না ক্যাং না গ্যাং?’ কিংবা ‘আরেকটু তেনজিংগি না করলে চলছে না,’ কিংবা ‘তোমার মতো পাকা লোক কিনা শেষে পাশবালিশ খুন করল ডাক্তার?’

রসিকতাটা নিতান্ত বাড়াবাড়ি নয়, রেডিও মিরচি-র  মীর, দীপ এবং বাকিরা আমাদের বাড়িতে যে প্রতাপে রাজত্ব করেন, তাতে এ ঘটনা সত্যি সত্যি ঘটা কিছুই আশ্চর্য নয়। সানডে সাসপেন্সের সব গল্পই প্রায় শোনা, কিন্তু হাতে গোনা ফেভারিট কয়েকটা আছে। গ্যাংটকে গণ্ডগোল, হত্যাপুরী, হাউন্ড অফ দ্য বাস্কারভিল, সত্যান্বেষী। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সেগুলো না চললে আমাদের ঘুম আসে না। 

আর রাতের পর রাত শুনতে শুনতে এই গল্পগুলো আমাদের কণ্ঠস্থ হয়ে গেছে। একজন যে কোনও জায়গা থেকে কোনও একটা সংলাপ বলে উঠলে অন্যজন ঝটিতি পরের সংলাপটা বলে দিতে পারি। মুখস্থ হয়েছে যখন তখন নতুন গল্প শুনলেই পার বলতে পারে কেউ, আমরা সে চেষ্টা করেওছি, কিন্তু মজা পাইনি। এই বস্তাপচা গল্পগুলোর শোনার মধ্যে একটা কমফর্ট আছে। ডায়লগ, অভিনয়, মিউজিক সব মুখস্থ হয়ে গেছে তাই কান করে শোনার প্রয়োজনও হয় না, ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে আর আমরা ঘুমে তলিয়ে যাই।

তবু মাঝে মাঝে একেকটা লাইন কানে এসে ধাক্কা মারে। যেমন সেদিন। ফেলুদাকণ্ঠী সব্যসাচী খোঁজ নিচ্ছেন, যমন্তকের মূর্তিটা শেলভাংকার ক্যাশে কিনেছিলেন না চেকে আর তার উত্তরে নিশিকান্ত সরকারকণ্ঠী জগন্নাথ বসু বলছেন, ‘আরে না, ক্যাশ দিলে তো সুবিধেই হত আমার, কিন্তু ক্যাশ তো ছিল না ওঁর কাছে, চেক দিয়েছিলেন।’ এই বলে প্যান্টের পকেট থেকে চেকটা বার করে ফেলুদাকে দেখাচ্ছেন আর তোপসে অমনি পাশ থেকে উঁকি মেরে দেখছে, ‘ন্যাশনাল অ্যান্ড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের চেক, চেকের তলায় দারুণ পাকা সই, শিবকুমার শেলভাংকার।’

রোজই শুনি, কিন্তু সেই রাতে ওই দারুণ পাকা সইয়ের ব্যাপারটা বুকে বাজল। 

*****

মানুষ হওয়া বলতে কে কী বোঝে সেটা একটা রহস্য। কেউ দয়ালু হওয়াকে, কেউ সৎ হওয়াকে, কেউ দুনিয়াদার হওয়াকে, আবার কেউ ফ্লুয়েন্ট ইংরিজি বলতে পারাকেই মানুষ হওয়ার আলটিমেট লক্ষণ ধরে নেয়। সেই অনুযায়ী যে যার নাগালের ছোটদের বড় করার চেষ্টা করে। আমাদের স্কুলের সব দিদিভাই-ই মানুষ হওয়াকে গুরুত্ব দিতেন এবং যে যার নিজের সংজ্ঞায় আমাদের মানুষ করার চেষ্টা করতেন। কেউ বলতেন কক্ষনও মিথ্যে কথা বলবে না, কেউ বলতেন সবসময় সবার কথা মেনে চলবে, কেউ নিজের টিফিন অন্যের সঙ্গে ভাগ করে খেতে উৎসাহ দিতেন, কাউকে কাউকে ইস্তিরি করা জামা পরা এবং প্রতি সপ্তাহে নখ কাটার ওপরেও মারাত্মক জোর দিতে দেখেছি। 

মেজদিদিভাই কোন গুণটাকে মানুষ হওয়ার জন্য দরকারি মনে করতেন সেটা আমরা আবিষ্কার করেছিলাম আমাদের ক্লাস থ্রি-র শেষ দিনে। শেষ দিন মানে একেবারেই শেষ দিন। রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে, নতুন ক্লাসের বইখাতা জোগাড় হয়ে গেছে, আমরা এসে পুরোনো ক্লাসরুমেই বসেছি। এমনি দিনে ব্যাগ থেকে বই বার করে ডেস্কের নিচের খোপে রেখে ব্যাগ গুছিয়ে রেখে আসার কথা ক্লাসের কোণে, কিন্তু সেদিন সবাই ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে বসে আছি, ক্লাস ফোরের ক্লাসটিচার এসে সংকেত দিলেই তাঁর পিছু পিছু লাইন দিয়ে নতুন ক্লাসরুমে গিয়ে বসব, কিন্তু তাঁর আগে বিদায়ী ক্লাসটিচারের সঙ্গে শেষবারের মতো দিনের শুরুতে দেখা হবে। তিনি আমাদের ভালো হয়ে থাকতে বলবেন, যতই চেঁচামেচি করি বকবেন না, এমনকি তাঁর এবং আমাদের কারও কারও চোখে জলও আসবে। 

মেজদিভাই ছিলেন আমাদের বিদায়ী ক্লাসটিচার। তিনি ক্লাসে ঢুকলেন। সেদিন নাম ডাকার পর্ব নেই, আমরা রেডি হয়ে আছি এই বুঝি দিদিভাই আদর করে কথা বলতে শুরু করলেন, এমন সময় তিনি বললেন, যে যার নোটখাতা বার কর। 

আমাদের নোটখাতা ছিল একটা খেরোর খাতা, সেখানে ছুটি থেকে মাইনের তারিখ সবের নোটিস লেখা হত, প্রতি পিরিয়ডের শেষে ‘আজ এই পিরিয়ডে আমরা এই এই করেছি’ এই সব লিখে ক্লাসের ভারপ্রাপ্ত দিদিভাইকে দেখাতে হত, তিনি ‘রাইট’ দিতেন, তারপর সেই নোটখাতা গার্জেনকে দিয়ে সই করিয়ে আনতে হত। রোজ। এক কথায় নোটখাতা ছিল শিক্ষক, ছাত্র এবং অভিভাবক, এই তিনপক্ষকে তিনপক্ষের চোখে চোখে রাখার একটি অভিনব এবং কার্যকরী পন্থা। কোনও দিন নোটখাতা আনতে ভুলে গেলে দিদিভাইয়ের সে দিনের মেজাজ বুঝে দাঁড়ানো বা কান ধরে দাঁড়ানো বা দুয়েক-ঘা পড়াও আশ্চর্য ছিল না। 

আমরা যে যার নোটখাতা বার করলাম। মেজদিভাই ক্লাসের একধার থেকে ধরে ধরে প্রত্যেকের নোটখাতার খুলে একেবারে শেষ মলাটের গায়ে লাগানো পাতায় গিয়ে পৌঁছলেন। রোজ প্রতি পিরিয়ডে ব্যবহার হত বলে নোটখাতা সবসময়েই অন্য খাতার থেকে স্বাস্থ্যকর হত, এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পেছনের বেশ কয়েকটা পাতা বছরের শেষেও বাকি রয়ে যেত। 

মেজদিভাই সবার নোটখাতার লাস্ট পাতা পরীক্ষা করতে লাগলেন এবং ক্রমে তাঁর মেঘের মতো মুখে ঝড়ের আভাস ফুটে উঠতে লাগল। ক্লাস থ্রি-তে প্রথম পেনসিল ছেড়ে কালি পেনে লেখা শুরু হয়েছিল, এবং পেন আটকে গেলে নোটখাতার পেছনের পাতা বার করে ঘষা হত, কিংবা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কালি বার করা হত, সেই সব হিজিবিজি আর ছোটবড় নীল ফোঁটা বেরোলো, কাটাকুটি খেলার ঘর, ডেঁপো কিছু মেয়ের খাতার পেছনে অমুকদি + তমুকদা ইত্যাদি সমীকরণ পর্যন্ত বেরোলো। 

আর তখনই আমরা বুঝলাম গেল যে নোটখাতার পেছনের পাতা পরিষ্কার রাখাই মেজদিদিভাইয়ের মতে ভালো এবং পরবর্তী কালে মানুষ হওয়ার প্রধান লক্ষণ। মত একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। যে মেয়ে কক্ষনও খাতার পেছনের পাতায় হিজিবিজি কাটে না, কাটাকুটি খেলে না, দাদাদিদির নাম ঘিরে হার্ট সাইন আঁকে না, সে কী পরিমাণ মনোযোগসহকারে জীবনের মধ্যে দিয়ে চলে এবং ভবিষ্যতেও চলবে ভাবতে পারছেন? 

যাই হোক, ক্রমে আমার খাতা এল। মেজদিদিভাই পাতা উল্টে দেখলেন, তারপর থমথমে মুখে বললেন, 

তোমার থেকে আমি এটা আশা করিনি কুন্তলা।

আমার বুকের মধ্যে কী রকম বাজ পড়েছিল এখনও মনে করতে পারি। কী ছিল আমার নোটখাতার শেষ পাতায়? কাটাকুটি? কালির ফোঁটা? নারীপুরুষের নামের মাঝে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ হার্ট সাইন?

কিচ্ছু না। আমার খাতার পেছনের পাতা ভর্তি করে ছিল আমার সই। শত সহস্র সই।

*****

আমার কেন যেন বিশ্বাস হয়েছিল যে বড় হয়ে আমাকে অনেক অটোগ্রাফ দিতে হলেও হতে পারে। সেই জন্য আমি নিজের জন্য একটি মোক্ষম সইয়ের সন্ধানে ছিলাম। সার্থক সইয়ের মোটামুটি তিনটে ক্রাইটেরিয়া পূর্ণ করা ছিল আমার উদ্দেশ্যঃ

এক, সই ছোট হতে হবে। ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। হাজার হাজার অনুরাগী যখন ঘিরে ধরে আমার অটোগ্রাফ চাইবে তখন তাদের প্রত্যেকের খাতায় কে ইউ এন টি এ এল এ বি এ এন ডি ওয়াই ও পি এ ডি এইচ ওয়াই এ ওয়াই কিংবা ক-এ হ্রস্ব উ ন-এ ত-য় ল-এ আ-কার ব ন-য় দ-য় য-ফলা ও-কার……… লিখতে হলেই হয়েছে।

দুই, সই পাকা অর্থাৎ স্টাইলিশ হতে হবে। কোনটা স্টাইলিশ কোনটা স্টাইলিশ নয় সেটা আপেক্ষিক, কিন্তু আমার মতে স্টাইলিশ সইয়ের একটা প্রধান লক্ষণ হচ্ছে সই করার সময় পেন কাগজ থেকে উঠবে না। খালি লাস্টে পেন ঝাঁকিয়ে একটা ফুটকি দেওয়া যেতে পারে। জটায়ু যেমন দিতেন। দুঃখের বিষয় আমার গোটা নামে কোথাও ফুটকি নেই। (বাংলা নামের একেবারে শেষে একটা আছে, কিন্তু যেহেতু পুরো সই করা যাবে না কাজেই সেই ফুটকি ইউজলেস।

তিন নম্বর শর্তটা আমার নিজের মাথা থেকে বেরোয়নি, আনন্দমেলা ভাবিয়েছিল। সই নিয়ে আমার ভাবনাচিন্তা যখন তুঙ্গে তখন আনন্দমেলায় একটা আর্টিকল বেরিয়েছিল সই দিয়ে স্বভাব বিচার সংক্রান্ত। স্বাক্ষরের স্যাম্পলের একদিকে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজী, নেতাজী, চে গুয়েভারা, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ার অন্যদিকে হিটলার, মুসোলিনি, পল পট। তার পর দুই স্যাম্পলের সইয়ের বৈশিষ্ট্য খুঁটে খুঁটে প্রমাণ করা হয়েছিল যে কোনও সন্দেহই নেই, সই দেখেই বোঝা যাওয়া উচিত ছিল ভবিষ্যতে কার গলায় নোবেল আর কে বাংকারে নিজের মাথায় নিজে গুলি। আমার সইয়ের সঙ্গে এই দ্বিতীয় স্যাম্পলের সইয়ের যাতে কোনও মিল না থাকে সে সম্পর্কে আমি বিশেষ যত্নবান হয়েছিলাম। এতগুলো ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে গিয়ে বলা বাহুল্য প্র্যাকটিসের দরকার হয়েছিল প্রচুর, কাজেই নোটখাতার পেছনের দুই পাতাই ভরে গিয়েছিল এবং ফলস্বরূপ মেজদিভাই আশাহত হয়েছিলেন।

ওয়েল, নিজের সম্পর্কে বেশিরভাগ এসটিমেটের মতো অটোগ্রাফ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার এস্টিমেটও ভুল হয়েছিল। এমনকি আমার বাবামায়ের সইয়ের যা দাম ছিল আমার সইয়ের দাম তার কাছাকাছিও পৌঁছোতে পারেনি। দুজনে মিলে সই করে সারাজীবনে কম করে কোটিখানেক ফাইল পাস করিয়েছেন, আমার সই কাজে লাগছে কেবল আমার নিজের। আমার ব্যাংক, আমার পাসপোর্ট, আমার ট্যাক্স ডিক্লারেশন।

আর কাজে লাগার সই করতে হয় বলেই কায়দার সই করতে সাহস হয় না, পাছে প্রত্যেকবার একরকম দেখতে না হয়, তাই বেসিক্যালি এসব জায়গায় আমি সইয়ের বদলে নিজের গোটা নামটা লিখি। আমার অত প্র্যাকটিসের সই করার সুযোগ আসে শুধুমাত্র অ্যামাজন/ফ্লিপকার্টের ডেলিভারি নেওয়ার সময়। ভাইসাবের বাড়িয়ে ধরা ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সবুজ পর্দায় আঙুল বুলিয়ে সই দেওয়ার পর সেটা যে রকম দেখতে হয়, তাতে আমার মাঝে মাঝে সেদিনের মেজদিভাইয়ের থেকেও নিজের প্রতি বেশি হতাশ লাগে।



January 13, 2018

আর যাই করুন, মিক্স করবেন না



মান্ডি হাউসের কাছে একটা উঁচু অফিসে সেদিন যেতে হয়েছিল মিটিং-এর জন্য। যে কোনও গোত্রের মিটিংই আমার জঘন্য লাগে, তার মধ্যে সেদিনের মিটিং ছিল জঘন্যতম গোত্রের। ইটিংহীন মিটিং। প্রেমহীন বিয়ের মতোই প্যাথেটিক। 

মিটিং শেষ হল সাড়ে বারোটায়। রাস্তার উল্টোদিকে ত্রিবেণী টেরাস ক্যাফে আর রাস্তার শেষে বেংগলি মার্কেট। মার্কেটে গিয়ে চাট খেলে কেমন হয় আলোচনা চলছিল, রবিভাইসাব বললেন, বেংগলি মার্কেটের চাট ভালো কিন্তু আরও ভালো চাট হল প্রভুজির। 

প্রভুজির চাটের নাম আমি শুনেছি। দিল্লির সব চাট-উৎসাহীরাই শুনেছে। ইউ পি এস সি-র বাজখাঁই অফিসের পাশের গলিতে আরও ছোটখাটো চাটওয়ালা আছেন, কিন্তু প্রভুজির দোকানের সামনের ভিড়ই বলে দেয় ওই বনে রাজা কে। চাটু ভর্তি ঢেউ তোলা তেলের চারপাশে আধভাজা আলু আর টিক্কির ঢিপি। একদিকে গোলগাপ্পার আয়োজন, অন্যদিকে দই আর লাল সবুজ চাটনির ডেকচি। দেওয়ালে গণেশ আর শেরাওয়ালির পাশে একজন নশ্বর মানুষের ছবিতেও মালা পরানো, যাঁর মুখের সঙ্গে অনতিদূরে টোকেন নিয়ে বসে থাকা ভদ্রলোকের মুখের মিল আছে। 

একটা টিনের বোর্ডে রং দিয়ে মেনু লেখা। সবই খেতে ইচ্ছে করে কিন্তু সব তো খাওয়া যায় না, তাই অনেক ভেবে একপ্লেট আলুটিক্কি, একপ্লেট আলুফ্রাই আর একপ্লেট গোলগাপ্পার টোকেন নেওয়া হল। গোলগাপ্পা/পানিপুরি এখনও আমি কেন খাই সেটার একটা ব্যাখ্যা আমি অনেক ভেবে খুঁজে বার করেছি। বাঙালি হিসেবে গর্ব করার বিষয় এত কমে গেছে বলে। রসগোল্লার যুদ্ধে কোনওমতে হেঁচড়েমেচড়ে জেতা গেছে কিন্তু অত খাটনির জয়ে আমার রুচি নেই। আমার চাই অনায়াস, অবিসংবাদিত জয়। প্রতিবার গোলগাপ্পা/পানিপুরি খেয়ে আমি সেই জয়ের স্বাদ অনুভব করি। 

এবারেও করলাম। বাঙালি হিসেবে জন্মানোর অন্তত একটা সুবিধে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে পরের আইটেমগুলোর দিকে এগোলাম। টোকেন হস্তান্তর হওয়ার পর চাটুর ধারে অপেক্ষারত আধভাজা টিক্কিরা হাতার ঠেলা খেয়ে ফুটন্ত তেলে পড়ে দেখতে দেখতে গনগনে বাদামি হয়ে উঠল। তারপর ওই হাতা দিয়েই টিক্কিতে চারটে খোঁচা মেরে পেট ফাঁসিয়ে তার ওপর দই, লাল এবং সবুজ চাটনি, পেঁয়াজ এবং মুলোর সরু সরু করে কাটা আচার সাজিয়ে দু’খানা কাঠের চামচ সহযোগে ভাইসাব আমাদের হাতে প্লেট তুলে দিলেন। এত খারাপ জিনিস একসঙ্গে হলে খাবার ভালো খেতে হবেই, হলও। তবে একজনের হাত টেবিল করে দুজনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চামচ দিয়ে টিক্কি কেটে খাওয়াটা গোলযোগের। আরও বিপদ, ততক্ষণে আমাদের অন্য আলু ফ্রাইয়ের প্লেটও এসে হাজির হয়েছে। 

ছোট ছোট টুকরো করা আলুভাজা গরম তেলে চাঙ্গা হয়ে ওপরে সবুজ চাটনি এবং বাড়াবাড়ি রকম মশলাপরিবৃত হয়ে আমাদের কাছে এলেন। মশলা দেওয়ার আগে ভাইসাব জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কিতনা?’ আমরা যথারীতি ‘জ্যায়াদা’ বলেছি। ঝালমুড়িতে লংকা? আলু ফ্রাইয়ে মসালা? ফুচকায় ঝাল? সব বেশি। বেশি বেশি। বেশি ঝাল দিয়ে কোনও ফুচকা মাটি হয়েছে বলে অভিজ্ঞতা নেই আমার। আর পৃথিবীতে অভিজ্ঞতা যদি আমার কোনও ব্যাপারে থেকে, এ ব্যাপারে আছে। 

ফ্রাই খাওয়ার মজা টিক্কি খাওয়ার দ্বিগুণ, যে যার টুথপিকে গেঁথে মুখে পোরো, আঙুলে দই মশলা চিটচিটে চাটনি লেগে যাওয়ার ভয় নেই। আর ওই চিটচিটে চাটনি একবার আঙুলে লাগলে আর রক্ষা নেই। হাতে হাতে ঘুরে চ্যাটচেটে হয়ে যাওয়া টোকেন একটা বড় বালতিতে সাবানজলে ঘষে ঘষে ধোওয়া হচ্ছে দেখলাম।

আলু ফ্রাই খাওয়া হল। রবিভাইসাবকে এমন সুন্দর লাঞ্চের জায়গা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে আমরা অফিসে ফিরে এসে বাকি দিনের কাজ সেরে বাড়ি ফিরলাম। তখনও জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ চলছিল, তাই বাড়ি ফিরে ঘর গোছালাম, ল্যাপটপ বার করে কুড়ি মিনিট টাইপ করলাম আর চল্লিশ মিনিট ল্যাব্রাডর পাপিদের প্রথম সুইমিং পুলে নামার ভিডিও দেখলাম। মেসেজ ফোল্ডারে জমে থাকা বার্গার কিং, ডাংকিন ডোনাটস, কলকাতা বিরিয়ানি হাউসের পায়ে ধরে সাধাসাধি উপেক্ষা করে ফ্রিজের খাবার গরম করে খেলাম। মায়ের কথা মনে করে একগ্লাস গরম দুধও খাওয়া হল। অর্চিষ্মান ভালোবেসে সে দুধে দু’চামচ হার্শি’জ কোকো পাউডার গুলে দিল।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমে ভেবেছিলাম সানডে সাসপেন্সে হাউন্ড অফ দ্য বাস্কারভিলের হাউন্ডের রক্ত জমানো চিৎকারে, কিন্তু তা নয়। ওই শীতেও গলগল করে ঘামছি, মাথা ঘুরছে, গলার কাছে যেন তিনটে বিয়েবাড়ির খাওয়া এসে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

******


মিক্স না করা সংক্রান্ত প্রথম সাবধানবাণী শুনি জে এন ইউ যাওয়ার পর। সেই সকল রাতগুলোতে, যখন কাবেরী হোস্টেলের ছাদে বসে প্রাণপণ কুল হওয়ার চেষ্টা করছিলাম আর আমার সি জি পি এ হুড়হুড় করে নামছিল, তখন। যত খাবি খা, মিক্স করিস না। রামের সঙ্গে ভদকা না, ভদকার সঙ্গে হুইস্কি, হুইস্কির সঙ্গে বাংলা না। 

আমার মেজমামাও বলেন, মিক্স না করার কথা। মেজমামা গোল্ড মেডেল পাওয়া ছাত্র ছিলেন, যদিও তাতে কিছু প্রমাণ হয় না। পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার বুদ্ধি আর মানুষের সমাজে চলার বুদ্ধি দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার, এবং কোনও একটা দিয়ে অন্যটার উপস্থিতি প্রমাণ হয় না। কিন্তু আমার মেজমামার, ভাগ্নি বলে বলছি না, দুটোই পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। মেজমামা মানা করেন বসা আর চষা মিক্স করতে। যেখানে বসবে সেখানে চষবে না, যেখানে চষবে সেখানে বসবে না। 

বসা-চষা মিক্স না করার এই নীতি বাড়িতেও পরে অনেককে মেনে চলতে দেখেছি। যেমন নাকতলার বাবা। বাবার অফিসের বন্ধু আর নাটক দেখার বন্ধু তো আলাদাই, এবং সে সব বন্ধুর সঙ্গে বাবা বাড়ির লোক মিক্স করেননি কখনও। মা করেছেন, মায়ের ছাত্রছাত্রীরা বাড়িতে আসছে, সহশিক্ষিকারা আসছেন, মা তাঁদের বাড়ি যাচ্ছেন, পিকনিকে যাচ্ছেন। এদিকে বাবার অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুদের সঙ্গে তিন্নিঅর্চিষ্মানের প্রথম দেখা হচ্ছে তিন্নির বিয়েতে। ‘ভাবতে পারিস?’ বলেছিল তিন্নি। সত্যি বলতে কি আমি ভাবতে পারি, কারণ অর্চিষ্মানও ওই নীতিতেই বিশ্বাস করে। আমিও করি। আমার যদি অফিসের বন্ধু থাকত তবে আমিও তাদের বাড়ির সঙ্গে মিক্স করতাম না। 

আমার বাবাও মিক্স করেন না। তাঁর নাটকের বন্ধু আলাদা ছিল, তাস খেলার বন্ধু আলাদা ছিল, এখন দীঘা আর পুরী যাওয়ার বন্ধুও আলাদা আলাদা। 

বাবার ক্ষেত্রে অবশ্য এই মিক্স না করার ব্যাপারটা বন্ধু ছাড়া অন্য দিকেও প্রসারিত হয়েছে। নেমন্তন্নবাড়িতে আজকাল বাবা মেনু দু’ভাগে ভাগ করেন। প্রথম ভাগ লেবু থেকে মাংস পর্যন্ত, দ্বিতীয় ভাগ চাটনি থেকে পান/মশলা। বাবা দু’ভাগ মিক্স করেন না। কোনও নেমন্তন্ন বাড়িতে গিয়ে যদি ঠিক করেন প্রথম ভাগ খাবেন তবে মাংস পর্যন্ত খেয়ে থেমে যান, চাটনি থেকে বাকিটুকু টেবিলের বাকিদের সঙ্গে গল্পতামাশা করে টাইমপাস করেন। আর যে বাড়িতে দ্বিতীয় ভাগ খাবেন ঠিক করেন, তখন মাংস পর্যন্ত হাত গুটিয়ে বসে থেকে তারপর চাটনি থেকে আস্তিন গুটিয়ে আসরে নামেন। বাবাকে যারা প্রথম দেখছে তারা অবাক হয়, কিন্তু বাবা যেহেতু পুরোনো হয়েছেন, বাবাকে যারা দেখছে তারা অনেকদিন ধরেই দেখছে, কাজেই অবাক হওয়াটা সইয়ে নিয়েছে।

*****

আর সেই বাবার মেয়ে হয়ে আমি প্রভুজির চাটের সঙ্গে গরম দুধ মিক্স করে ফেললাম। সেদিন রাতে যা হল, এবং যার রেশ এখনও চলছে, আমি নিশ্চিত সেটা এই মিক্স না করার গোল্ডেন রুল ভাঙার জন্যই হল। যদি শুধু চাট খেতাম কিংবা গরম দুধ তা হলে এই যন্ত্রণা এড়ানো যেত। তাই আপনাদেরও বলছি, আর যাই করুন মিক্স করবেন না।


January 08, 2018

এ মাসের বই/ডিসেম্বর ২০১৭। ২০১৭য় পড়া আমার সেরা বই।



When Breath Becomes Air/ Paul Kalanithi




 ‘Intelligence (is) not enough, moral clarity is needed.’

দু’হাজার পনেরোয় প্রকাশিত হওয়ার সময়েই পল কলানিথির মেমোয়ার ‘হোয়েন ব্রেথ বিকামস এয়ার’ সাড়া ফেলেছিল। অন্যান্য মেমোয়ারের সঙ্গে এই বইয়ের একটা তফাৎ হল, বইটি লেখার সময় ছত্রিশ বছর বয়সী পল কলানিথি জেনে গেছেন তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে স্টেজ ফোর লাং ক্যান্সার।

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মেমোয়ার লেখার সাহস খুব কম লোকেই দেখাতে পারে, পল কলানিথি পেরেছেন। পল কলানিথি আরও অনেক কিছু পেরেছেন, ইন ফ্যাক্ট, ক্যানসার ধরা পড়ার আগে পর্যন্ত পল কলানিথির জীবন একের পর এক ‘পারা’র মিছিল। প্রথম প্রজন্ম অভিবাসী ভারতীয় বাবামায়ের সন্তান পল সব সাবজেক্টে হায়েস্ট পাওয়া ছাত্র ছিলেন, সাহিত্য এবং সায়েন্স দুদিকেই সমান উৎসাহ এবং দখল ছিল, অবশেষে সায়েন্স বেছে স্ট্যানফোর্ডে নিউরোসার্জেন হয়ে ওঠার দশ বছরের অমানুষিক ট্রেনিং প্রায় শেষ করে ফেলেছিলেন, এমন সময় ফিনিশিং লাইন সামনে এসে দাঁড়াল। 

সবারই মনে হয়, পলেরও হয়েছিল। হোয়াই মি? 

সবাই পারে না, পল পেরেছেন। সে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উল্টে নিজেকে প্রশ্ন করতে। হোয়াই নট ইউ?

‘হোয়েন ব্রেথ বিকামস এয়ার’ একজন মেধাবী, সংবেদনশীল, শিক্ষিত, শাণিত, উদ্দীপ্ত মানুষের মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লেখা জীবনচরিত। 

পল কলানিথির পেশা তাঁকে জীবনমৃত্যু সম্পর্কে সাধারণের থেকে বেশি সচেতন করেছিল। প্রতিদিন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হলে সম্ভবত আরেকরকমের জীবনচেতনা তৈরি না হয়ে পারে না।

Being with patients in these moments certainly had its emotional cost, but it also had its rewards. I don’t think I ever spent a minute of any day wondering why I did this work, or whether it was worth it. The call to protect life—and not merely life but another’s identity; it is perhaps not too much to say another’s soul—was obvious in its sacredness.

Before operating on a patient’s brain, I realized, I must first understand his mind: his identity, his values, what makes his life worth living, and what devastation makes it reasonable to let that life end. The cost of my dedication to succeed was high, and the ineluctable failures brought me nearly unbearable guilt. Those burdens are what make medicine holy and wholly impossible: in taking up another’s cross, one must sometimes get crushed by the weight.

অবশ্য পড়তে পড়তে আমার বার বার সন্দেহ হয়েছে, এই চেতনা পলের পক্ষে আশীর্বাদ না অভিশাপ ? কোনটা ভালো, শরীরের গতিক সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন বা আধাচেতন থেকে মির‍্যাকলের অপেক্ষায় শেষের দিনক’টা কাটানো, নাকি নিজের ভবিতব্য বাকি সবার থেকে বেশি স্পষ্ট নিজেই দেখতে পাওয়া?

At moments, the weight of it all became palpable. It was in the air, the stress and misery. Normally, you breathed it in, without noticing it. But some days, like a humid muggy day, it had a suffocating weight of its own. Some days, this is how it felt when I was in the hospital: trapped in an endless jungle summer, wet with sweat, the rain of tears of the families of the dying pouring down.

সবথেকে বেশি যে জিনিসটা আমাকে আপ্লুত করেছে, আশ্চর্য করেছে সেটা হচ্ছে মৃত্যুর গ্রাসে দাঁড়িয়ে লেখা এই বইয়ের দু’মলাটের ভেতরের প্রাণশক্তি। পল কলানিথির ‘হোয়েন ব্রেথ বিকামস এয়ার’ আমার দু’হাজার সতেরোর পড়া অন্যতম, অন্যতম ছুঁয়ে যাওয়া বই। আমি বলি আপনারাও বইটা পড়ুন এবং পড়ান।

***** 

The Music Room/ Namita Devidayal



রাগ’ন জোশের পর সুতীর্থর রেকমেন্ড করা ভারতীয় মার্গসংগীত সংক্রান্ত দ্বিতীয় মেমোয়ার পড়লাম, নমিতা দেবীদয়ালের দ্য মিউজিক রুম। পাঁচটি পার্ট, একটি প্রোলোগ এবং একটি এপিলোগ সংবলিত তিনশো দশ পাতার বই। আগের বইটির মতো এই স্মৃতিকথাটিও আর পাঁচটি স্মৃতিকথার থেকে আলাদা, এই কথার প্রধান সুতো লেখক নিজে নন, বরং তাঁর গুরু ধোন্ডুতাই কুলকার্নি। একেবারে পারম্পর্য না মেনে হলেও জয়পুর-আতরৌলি ঘরানার এই বিখ্যাত শিল্পীর গান শেখা শুরু করা থেকে নাত্থান খান, ভুরজি খান হয়ে কেসরবাই কেরকরের শিষ্যত্ব গ্রহণ পর্যন্ত সব ধাপই আছে। সংগীতজীবনের সঙ্গে সঙ্গে দেবীদয়াল তাঁর গুরুর ব্যক্তিগত জীবনেরও কথা লিখেছেন। কোলাপুর থেকে মুম্বই শহরে আসা, থাকা, দৈনন্দিন সংগ্রাম সবই। এর ফাঁকে ফাঁকে দেবীদয়ালের নিজের বেড়ে ওঠার কথা আছে, ঘরানা কাকে বলে, কোন ঘরানার কী বৈশিষ্ট্য, হিন্দুস্থানি মার্গসংগীতের ইতিহাসে হিন্দুমুসলিম অধিকারের লড়াই আছে আর আছে তৎকালীন সময়সমাজের প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলী সংক্রান্ত আলোচনাও (বাবরি মসজিদ ভাঙা ইত্যাদি)। 

এতকিছু থাকা সত্ত্বেও আমার বইটা ভালো লাগেনি। একটা কারণ হতে পারে এর কয়েকদিন আগে পড়া শীলা ধারের রাগন জোশ-এর মতো জোরদার মিউজিক্যাল মেমোয়ার পড়ার পর সে ঘরানার অন্য যা-ই পড়ি না কেন, জোলো লাগতে বাধ্য, কিন্তু পুরো কারণটা সেটা নয়।

প্রথম কারণ, দ্য মিউজিক রুম-এর লেখনশৈলীর মধ্যে একটা দোলাচল আছে। এটা অনেক নতুন লেখকের লেখায় লক্ষ করা যায়। ব্যাপারটা মেমোয়ার না নভেল সেটা লেখক স্থির করতে পারেননি, এবং দুই রকমই লিখতে লিখতে গেছেন। এটা অবশ্য লেখকের দোষ যতখানি, এডিটরের দোষ আরও বেশি। ছোটবেলা, গান শেখার শুরু, শহরের বর্ণনা, মানুষের বর্ণনা, সবই আমরা দেখছি শুনছি দেবীদয়ালের দৃষ্টি থেকে, কিন্তু মাঝপথে হঠাৎ হঠাৎ থার্ড পার্সন আনলিমিটেড সর্বজ্ঞ দৃষ্টি দিয়ে কয়েকটি দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বইয়ের শুরুতে ধোন্ডুতাই কুলকার্নির জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, একান্ত সংগোপন ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে শুরু করা হয়েছে। তাইয়ের নিজের বয়ানে নয়, এমনকি তাঁর মুখে শোনা দেবীদয়ালের বয়ানেও নয়, পরিষ্কার থার্ড পার্সনে। 

এ উদাহরণ আছে ভূরি ভূরি। আল্লাদিয়া খানের নাতি ‘বাবা’র সঙ্গে ধোন্ডুতাইয়ের সখ্য ছিল। তাঁরা দুজন দীর্ঘসময় একসঙ্গে গানবাজনা করতেন। লেখক লিখছেন, 

'The camaraderie between Baba and Dhondutai went well beyond the fact that they were man and woman. There was love, yes. But it was a love triangle, really, between man, woman and music. Sometimes, when Baba’s wife stood behind the door, watching the lesson, keeping her two young sons from running into the room, she felt a wincing pain within her which she could’t place. It was the knowledge that she would never be able to share with her husband the closeness that Dhondutai had, because she couldn’t speak their language.'  

‘বাবা’র যে স্ত্রীকে লেখক জীবনে কোনওদিন দেখেননি, এবং এই সব ঘটনার সময় যিনি ধারেকাছেও ছিলেন না, সেই স্ত্রী দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে কী ফিল করছেন সেটা সন্দেহ করা একরকম, আর কনফিডেন্টলি লিখে দেওয়া আরেকরকম। ওই মুহূর্তে 'বাবা'র স্ত্রী রক্তমাংসের মানুষ নয়, উপন্যাসের চরিত্র।  

এ রকম উদাহরণ আরও আছে। 

'A few nights later, Gopaldas was over at Kesarbai’s house. They lay in bet together and discussed this great new development in her life. It was quiet, except for the distant sound of the sea lapping gently against the city. The bed cracked as Gopaldas turned on his side to face his lover, resting his head on his elbow.
‘Kesar,’ he said, gently.
‘Yes, Seth?’ She looked at her benefactor and smiled. 
‘You know what the Khansahib has said, don’t you?’
‘Yes, that I must not have any more children if I wish to learn under him.’
‘That means we must not meet like this any more,’ he whispered to her. ‘We will continue to be good friends and you will always be my confidante.’
‘Yes, Seth.’'

রিভিউ লেখার প্রধান শর্ত হচ্ছে শিল্পকর্মের রিভিউ করা, শিল্পীর নয়। কিন্তু আমি সেই শর্ত ভাঙতে চলেছি। 'দ্য মিউজিক রুম' আমার খারাপ লাগার দ্বিতীয় এবং প্রধান কারণ হচ্ছে লেখক নমিতা দেবীদয়ালকে আমার ভালো লাগেনি।

আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা অপচেষ্টা করা যাক। সাধারণত ওয়ার্ক অফ ফিকশনে লেখককে অনেকাংশে অগ্রাহ্য করে থাকা যায় (যদিও আমার বিশ্বাস ড্রাগন আর ইউনিকর্নের প্রেমের গল্প লিখলেও সে লেখা থেকে লেখক নিজেকে বাদ দিতে পারেন না) কিন্তু যিনি নিজের জীবনের কথা লিখছেন, যে রচনার মুখ্য চরিত্র লেখক নিজেই, সেখানে লেখককে পছন্দ করা না করা প্রায় গল্পের প্রোটাগনিস্টকে পছন্দ করা না-করার মতোই স্বাভাবিক হয়ে পড়ে।

আর সেখানেই মিউজিক রুম আমার কাছে মাটি হয়েছে। ফার্স্ট পারসন থার্ড পারসন গোলমাল নয়, স্মৃতিকথা এবং জীবনীর কনফিউশন নয়, আমার কাছে দ্য মিউজিক রুম মাটি করেছেন লেখক নমিতা দেবীদয়াল স্বয়ং। 

এইখানে একবার শীলা ধারের প্রসঙ্গ তুলতে হচ্ছে। শীলা ধার প্রিভিলেজড পরিবারে জন্মেছিলেন এবং সে প্রিভিলেজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন, কিন্তু তিনি ভারতবর্ষের প্রায় গোটা পপুলেশনের থেকে তিনি কোথায় কোথায় আলাদা সেটা আন্ডারলাইন করতে করতে জীবনের মধ্যে দিয়ে হাঁটেননি, অন্তত রাগ’ন জোশে তেমন কোনও প্রমাণ আমি পাইনি। নমিতা দেবীদয়াল সেটাই করেছেন। মুম্বাইয়ের তাঁর পশ পাড়া থেকে গুরুর নিম্নমধ্যবিত্ত পাড়ায় গান শিখতে যাওয়ার বর্ণনা প্রায় নন্দাদেবী বেসক্যাম্পে ট্রেক করতে যাওয়ার বর্ণনা। মুম্বইয়ের ট্রেনের সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টে চড়ার অভিজ্ঞতার বর্ণনাও অনুরূপ। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, নিজেকে এই আলাদা করার প্রক্রিয়াটা লেখকের দুদিকেই সমান সক্রিয়। তাঁর ইংরিজি মিডিয়াম স্কুলের ট্যাঁশ বন্ধুদের তাঁর মার্গসংগীতের ব্যুৎপত্তির মর্ম বুঝতে অক্ষমতা এবং তানপুরাকে ফ্যালিক সিম্বল ভেবে অ্যামেরিকান সহপাঠীদের ঠাট্টা ইত্যাদিও লেখকের সমান খেদের জন্ম দিয়েছে। 

আরও চমকপ্রদ হচ্ছে দেবীদয়ালের কস্তূরী মৃগ সিনড্রোম। স্কুলের গানের কম্পিটিশনে তিনি নাম দিলেন এবং ‘naturally I won.” গোটা বইতে মিনিমাম পাঁচবার  লেখক আমাদের মনে করিয়েছেন যে ধোন্ডুতাই তাঁকে ‘কেসরবাই কেরকর’-এর সঙ্গে তুলনা করতেন। একবার ‘বাবা’কে লেখকের গান শোনানোর সুযোগ হয়েছিল। 

'I sang Raga Bhoop for Baba, and happily noticed that he responded to my full-throated rendering with great enthusiasm.'

নিজের চোখে না পড়লে আমিও বিশ্বাস করতাম না।

কবে কোথায় কোন খবরের কাগজে চার লাইন তাঁর গান এবং কেসরবাইচিত কণ্ঠের প্রশংসা বেরিয়েছিল সেটা উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতরে লাইন বাই লাইন তুলে দেওয়া থেকেও নিজেকে সামলাতে পারেননি লেখক।

বলাই বাহুল্য, যাঁরা নিজেকে বেশি নম্বর দেন, আশেপাশের সবাইকে তাঁদের ক্রমাগত কম নম্বর দিয়ে যেতেই হয়।  রীতিমত ছোট বয়স থেকেই আশেপাশের সমবয়সী ছেলেমেয়ের সাংগীতিক বোধের অভাব লেখকের নজর এড়ায়নি। কবে কোন সতীর্থর গান শুনে 'এ মেয়ের গান হবে না' বলে গুরু মাথা নেড়েছিলেন, সে সবও সাড়ম্বরে মিউজিক রুমে জায়গা পেয়েছে।

সত্যি বলছি, একটা সময়ের পর আমি গোটা ব্যাপারটার প্রতি এত বিরূপ হয়ে পড়েছিলাম যে বইটাতে মারাত্মক দামি কিছু লেখা থাকলেও সেটা আমার চোখ এড়িয়ে গেছে।

*****

My Name is Lucy Barton/ Elizabeth Strout



এলিজাবেথ স্ট্রাউটের ‘মাই নেম ইজ লুসি বার্টন’ একশো তিরানব্বই পাতার ছোট্ট উপন্যাস। লুসি বার্টন নিউ ইয়র্ক সিটির একটি হাসপাতালে ভর্তি। লুসির মা, ইলিনয় রাজ্যের একটি ছোট গ্রাম অ্যামগ্যাশ থেকে লুসিকে দেখতে এসেছেন। হাসপাতালের ঘরের ভেতর মা মেয়ের কথোপকথন ‘মাই নেম ইজ লুসি বার্টন’ উপন্যাসের উপজীব্য। এই কথোপকথন থেকে আমরা জানতে পারি যে লুসির সঙ্গে লুসির পরিবারের বহুদিন কোনও যোগাযোগ নেই। আমরা জানতে পারি অ্যামগ্যাশে অকথ্য দারিদ্র্য এবং প্রায় একঘরে হয়ে বড় হয়ে ওঠা লুসির ছোটবেলার কথা, নিজের চেষ্টায় সেই দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে নিজের জীবন গড়ে তোলার কথা। এই সব পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রেই যা হয়, যে পালালো আর যারা পড়ে রইল তাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়। লুসি এবং লুসির পরিবারের মধ্যে এই দূরত্ব অনতিক্রম্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুসির চেষ্টার অভাবে নয়। লুসি নিয়মিত ফোন করে, নিজের সন্তানদের জন্মের খবর দিয়ে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছে, উল্টোদিক থেকে কোনও রকম চেষ্টা তো হয়ইনি বরং লুসিকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে যোগাযোগ রাখতে তাঁরা উৎসাহী নন। এই পরিস্থিতিতে লুসির অসুস্থতার সময় লুসির স্বামী শেষ চেষ্টা হিসেবে লুসির মাকে মেয়েকে দেখতে আসার অনুরোধ করেন, এবং মা রাজি হন।

লুসির মা স্বাভাবিক নন।  স্নেহশীল মা বলতে যে ছবিটা আমাদের মনে ভেসে ওঠে সেটার সঙ্গে লুসির মায়ের কোনও মিল নেই। তিনি নিষ্ঠুর এবং জাজমেন্টাল। গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে লুসির ছোটবেলায় আরও অনেক ট্রমা বেরিয়ে পড়ে, লুসির বাবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বয়ে আনা মানসিক ক্ষত, বাড়ির লোকজনের সঙ্গে আচরণে তার প্রভাব, লুসির দাদার হোমোসেক্সুয়ালিটি ইত্যাদি। এ ছাড়াও আবছা যৌননিগ্রহের আঁচও আছে। 

এলিজাবেথ স্ট্রাউটের লেখা এটা আমার পড়া দ্বিতীয় উপন্যাস। প্রথম পড়া অলিভ কিটরিজ-এর মতোই, মাই নেম ইজ লুসি বার্টন - ও প্রধান চরিত্রদের পাশাপাশি একটা গোটা অঞ্চলের গল্প। অ্যামগ্যাশের বিবিধ চরিত্র এবং তাদের জীবনের ঘটনা এমন সুন্দর করে, অল্প কথায়, এমন সহমর্মিতার সঙ্গে লেখক বলেছেন যে অতি অল্প কথায় শেষ হলেও সে চরিত্রগুলো পাঠকের মনে থেকে যায়। 

*****

দু’হাজার সতেরোর আমার প্রিয় বই


দু’হাজার ষোলোয় যেমন একাধিক বই প্রিয় হয়ে ওঠার লাইনে লাফ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, এ বছর তেমন ঘটেনি। বেশ কিছু বই ছুঁয়ে গেছে। হানা কেন্টের ‘বেরিয়াল রাইটস’, ইয়া গিয়াসির ‘হোমকামিং’ চমৎকার লেগেছে, পল কলানিথির ‘হোয়েন ব্রেথ বিকামস এয়ার’ জীবনের অনিত্যতা আবার মনে করিয়ে দিয়েছে, ডন ডে লিলো-র হোয়াইট নয়েজ কিচ্ছু বুঝতে পারিনি, সোফি হানার ‘মোনোগ্রাম মার্ডারস’, ‘ ক্লোজড কাসকেট’ বাকিদের যত খারাপ লেগেছে আমার তত লাগেনি, আবার এমিলি সেন্ট জন ম্যান্ডেল-এর ‘ষ্টেশন ইলেভেন’ আর চিম্মামান্ডা এনগোজি আদিচিয়ে-র ‘অ্যামেরিকানা’-কে মনে হয়েছে ওভারহাইপড। কিন্তু এদের কোনওটা পড়েই সেই ফিলিংটা হয়নি, যেটা স্টোনার পড়ে হয়েছিল,  আ গার্ল ইজ আ হাফ ফর্মড থিং’ কিংবা ‘ক্যাজুয়াল ভেকেন্সি’ পড়ে।

আর কে কীভাবে বইয়ের বিচার করে জানি না, আমি সর্বদা আমার ‘ফিলিং’ দিয়ে করি। বইটা পড়ার মুহূর্তটায় আমার কী ফিলিং হচ্ছিল। আমার সব প্রিয় বই পড়ার মুহূর্ত আমার মনে আছে। মায়ের সঙ্গে বসে সুকুমার সমগ্র পড়ছি, বইয়ের দোকানের সোফায় বসে হ্যারি পটার, হোস্টেলের একটিমাত্র জানালার পাশে চেয়ার টেনে বসে মিস মার্পলের পড়া গল্পগুলো আবার পড়ছি। ওই সময়টার বাকি সব ভুলে গেছি, খালি ওই মুহূর্তগুলো ভুলিনি, ভুলতে চাইও না। 

সেই ‘ফিলিং’ দিয়ে বিচার করলে গত বছরের মোটে একটি দিনের কথা আমার মনে আছে। শরীর খারাপ ছিল, একমাত্র পথ্য ছিল চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা। আমি চাদরের ভেতর শুয়ে শুয়ে একটা মোটা বইয়ের পাতা ফসফস করে উল্টোচ্ছিলাম আর অর্চিষ্মান ফোন করলে, 'না না একটুও কষ্ট হচ্ছে না, এখন রাখি, হ্যাঁ?' বলে কট করে ফোন কেটে দিচ্ছিলাম। বই যখন শেষ হল, মনে পড়ল গত পাঁচঘণ্টায় গলাব্যথা টের পাইনি, মাথাব্যথাও না। পাঁচঘণ্টায় পড়া সেই বইটাই আমার এ বছরের পড়া সেরা বই। ম্যাগপাই মার্ডারস। 



January 03, 2018

দলাদলি




পৃথিবীতে দু’দলের লোক আছে। 

যারা জানুয়ারির প্রথম ক’টা দিনের ম্যাজিকে বিশ্বাস করে। আর যারা করে না। 

যারা করে, এই ক’দিন তাদের অফিস যাওয়ার পথটাও বেড়াতে যাওয়ার মতো হয়ে যায়। 

তারা এই ক’দিন সকালে লাফ দিয়ে বিছানা ছাড়ে, লেবু-চেপা গরম জল খেয়েই যোগা ম্যাট পেতে ডাউনওয়ার্ড ডগ হয়।

(আর তাদের বাড়িতে যদি অবিশ্বাসী দলের লোক কেউ থেকে থাকে যে মনে করে যে এই ক’দিনের সঙ্গে সামনের বাকি তিনশো ষাট দিনের কোনও পার্থক্য নেই আর সেই লোকটা যদি লেপের ভেতর থেকে খিকখিক করে হাসে,  সে হাসি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়।)

এই ক’দিন হাত নেড়ে চেনা আধচেনা হ্যাপি নিউ ইয়ার বলতে, বা অন্য কারওর হাত নেড়ে হ্যাপি নিউ ইয়ার-এর উত্তর দেওয়ার সময় প্রত্যেকবার তাদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের বান ডাকে।

তারা এই ক’দিন বস হাঁ করার আগে অফিসের কাজ শেষ করে জমা দেয়। 

তারা এই ক’দিন টিফিনের পর ডেস্কে বসে মন দিয়ে কমলালেবু খায়, কারণ ভিটামিন সি। আর সিজন্যাল ইটিং।

তারা এ ক’দিন নতুন ডায়রি খুলে নতুন পাতায় লেখে। টু ডু লিস্ট বানায়। রাতে সে লিস্টের প্রতিটি আইটেম কেটে শান্তিতে লেপের তলায় হাসি হাসি মুখে সেঁধোয়।

তারা বিশ্বাস করে এই ক’টা দিন তাদের নতুন জীবনের শুরু। যে জীবনটায় পুরোনো জীবনের একটাও ভুল রিপিট হবে না।

আমি তাদের দলে পড়ি। আপনি কাদের দলে পড়েন?


January 02, 2018

রত্নাকর পত্রনবীশের একটি দিন





ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ড (১৮৮৮-১৯২৩) নিউজিল্যান্ডে জন্মেছিলেন, যদিও তাঁর লেখকজীবনের অধিকাংশটাই কেটেছিল ইংল্যান্ডে। ১৯২০- তে প্রকাশিত ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ডের ছোটগল্প 'মিস্টার রেজিন্যাল্ড পিকক’স ডে'-র ছায়া অবলম্বনে এবার ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর গল্পের কামরায় আমার গল্প বেরিয়েছে, ‘রত্নাকর পত্রনবীশের একটি দিন’

মিস্টার রেজিন্যাল্ড পিকক’স ডে-তে ঘটনা যে খুব একটা ঘটে তা নয়, গল্পের নামের সঙ্গে সংগতি রেখে এটি মূলত একটি ‘স্লাইস অফ লাইফ’ রচনা। এই একটি দিনের ঘটনাবলী থেকে পাঠক গল্পের মুখ্যচরিত্র মিস্টার পিকক-এর চরিত্র সম্পর্কে অবগত হবেন।

মিস্টার পিকক-এর পদবীর মাধ্যমে তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যটি বেশ প্রকাশ পায়। তিনি নিজেকে নিয়ে আত্মহারা। একশো বছর আগে মিস্টার পিককের মতো লোক হয়তো খুব বেশি ছিল না, না হলে ম্যান্সফিল্ড আর তাঁকে হিরো করে গল্প ফাঁদবেন কেন। কিন্তু এখন আমাদের চারপাশে ‘পিকক’ খুব কমও নেই। বা হতে পারে, সোশ্যাল মিডিয়া এসে সবার প্রচ্ছন্ন পিকক-পনাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

আমার গল্পের হিরো রত্নাকর পত্রনবীশ। মিস্টার পিককের সঙ্গে শ্রী পত্রনবীশের মূল পার্থক্য হচ্ছে মিস্টার পিকক গান শিখিয়ে জীবিকানির্বাহ করেন, আর শ্রী পত্রনবীশ ব্যাংকের কেরানি, সাইডে কবিতা লেখেন। সোশ্যাল মিডিয়ায়। ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ড ভালো চেলো-বাজিয়ে ছিলেন, তাই হয়তো গায়ক নায়কের একটি দিন নিয়ে লিখতে তাঁর অসুবিধে হয়নি, আমি যদিও কবিতা এবং সোশ্যাল মিডিয়া দুই থেকেই শতহস্ত দূরে থাকি তবু সাহস করে রত্নাকরের একটি সম্ভাব্য দিনের গল্প লিখেছি।


December 31, 2017

ছবিতে ২০১৭



জানুয়ারি

বছরের এর থেকে ভালো শুরু আর হতেই পারত না। গোয়ার সেই দুপুরের আরামটা এখনও মনে করতে পারি। এই গোয়াতেই হানি লেমন জিঞ্জার ‘টি’-এর মাহাত্ম্য প্রথম অনুধাবন করি। এখন এই পোস্ট লেখার সময়েও এক গ্লাস লেমন জিঞ্জার ‘টি’ পাশে রাখা রয়েছে। 


ফেব্রুয়ারি

খিড়কি গাঁওয়ের রুস্তম’স ক্যাফে অ্যান্ড বেকারি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ওই দোকানটার শান্তি, জাফরি দিয়ে এসে পড়া রোদ আর পোহা, মনে আছে এখনও।



মার্চ 


এপ্রিল মাসে প্রায় কিছুই ঘটেনি। 

মে

ল্যান্ডোর। , ,


জুন




জুলাই

ম্যাগপাই মার্ডারস। আমার এবছরের পড়া সেরা বই।

আগস্ট


সেপ্টেম্বর



অক্টোবর আবার অকিঞ্চিৎকর।





ডিসেম্বর

একটা জিনিস শেখালো। আমার স্মরণযোগ্য অতীতে অবান্তরের কোনও পোস্টে এত ভিউজ হয়নি যা ডিসেম্বরের এই পোস্টে হয়েছে। এ মাসের বই, অনুবাদ গল্প তো ছেড়েই দিলাম, নস্ট্যালজিয়ার পোস্টেও না। দৃশ্যমানতা বাড়াতে গেলে লোককে মত প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হয়। বিশেষ করে বিপক্ষ মত প্রকাশের। শেখা হল, কাজে লাগাতে পারব কি না সেটা সময় বলবে।

*****

অবান্তরের সব পাঠককে আমার তরফ থেকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালাম। আপনাদের দু'হাজার আঠেরো ভালো কাটুক। 



December 26, 2017

একটি ভালো সিনেমা




কোনও সিনেমার প্রথম দৃশ্যে যদি তাঁতের শাড়ি, সুতির পাঞ্জাবী, মার্বেলের মেঝে আর সে মেঝের ওপর বাবু হয়ে বসা গান গাওয়া বালক থাকে, তাও আবার যে সে গান না, একেবারে ‘সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা’, তাহলে আপনার কী মনে হয় আমি জানি না, আমার আর কোনও সন্দেহই থাকে না সিনেমাটা ভালো।  

আর এই ভালো সিনেমাটাই কি না রিলিজ করার সাত মাস পরেও আমার না-দেখা পড়ে ছিল। আরও কত মাস পড়ে থাকত কে জানে যদি না অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে (ব্যোমকেশের ভূমিকায়) দেখার জন্য ফোনে হইচই অ্যাপ ডাউনলোড  করতাম। সে অ্যাপের কল্যাণে অনির্বাণ ভট্টাচার্য ছাড়াও আরও অনেককিছু দেখা হল। 'বৌদি ডিটেকটিভ’ মার্কা হইচই অরিজিন্যাল ওয়েবসিরিজ দেখা হল, পুরোনো সিনেমার মধ্যে সাড়ে চুয়াত্তর, চিড়িয়াখানা, নতুনের মধ্যে খোঁজ, ক্ষত, খাদ ইত্যাদিও বাদ গেল না।

কিন্তু বছরের শেষে হইচই অ্যাপের কাছে যে কারণে সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ বোধ করছি তা এই ভালো সিনেমাটার জন্য। যার ভালো তার সবই ভালো, এমনকি নামটাও। আমার ফেভারিট তরকারি আর এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র বাচ্চা ছেলেটির নাম একই, পোস্ত। (বাই দ্য ওয়ে, বিপাশা বসুর কুকুরের নামও পোস্ত, জানতেন?) আজকাল পশ্চিমবঙ্গে বাংলা বাচ্চাদের অ্যাংলো ডাকনাম রাখার চল হয়েছে, আমার রিষড়ার এঁদো পাড়া অ্যানি, সানি-তে ছেয়ে গেছে, কিন্তু এ বাচ্চার অভিভাবকরা সে রাস্তায় হাঁটেননি, বাঙালিয়ানার হদ্দমুদ্দ করে নাম রেখেছেন পোস্ত। (আমার মন বলছে, পোস্তর বোন থাকলে তার নাম রাখা হত প্রজাপতি বিস্কুট।) পোস্ত শান্তিনিকেতনে থাকে আর কাচা পাজামাপাঞ্জাবী পরে গুরুদেবের গান গায়। পোস্তর বাড়িতে থাকেন তাঁর ঠাকুরদাঠাকুমা আর বঙ্গজীবনের অঙ্গ নিবেদিতপ্রাণ ঝি, যিনি পোস্তর সব অসভ্যতা সয়ে হাসিহাসি মুখে পোস্তর পেছনপেছন সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়ান। ঠাকুমা পোস্তর টিফিন গুছোন, পড়াশোনা দেখেন, ঠাকুরদা পোস্তকে স্কুলে দিয়ে আসেন নিয়ে আসেন আর গুরুদেবের গান শেখান। আরও কিছু ছেলেমেয়ে ঠাকুরদার কাছে গান শেখে এবং ঠাকুরদাকে ‘গুরুজী’ বলে ডাকে। দেখাদেখি পুঁচকে পোস্তও ঠাকুরদাকে ‘গুরুজী’ বলে ডাকতে শিখেছে। এটাকে জাস্ট কিউট ডাকাডাকি বলে উড়িয়ে দিলে ভুল করবনে, পোস্তর ঠাকুরদা আক্ষরিক অর্থেই পোস্তর গুরু। জীবনের যা কিছু সত্য, সুন্দর এবং শিব, সেই শিক্ষা তিনিই পোস্তকে শেখান এবং শেখাবেন। এবং তাঁর এই শিক্ষাদানের প্ল্যানে কেউ বাগড়া দিতে এলে তাঁদের তিনি ছাড়বেন না।

এমন ভালো প্ল্যানে কে-ই বা বাগড়া দিতে আসবে? প্রশ্ন করবেন দর্শক। আর জানতে পারবেন, পোস্তর এই আগাপাশতলা রাবীন্দ্রিক যাপনে একটা, থুড়ি, দুটো কাঁটা আছে। পোস্তর বাবা এবং মা। দুজনে কলকাতায় থেকে চাকরি করেন। থুড়ি, পোস্তর বাবা চাকরি করতেন, আদর্শে না পোষানোয় চাকরির মুখে লাথি মেরে আপাতত বেকার। এরকম নাকি উনি প্রায়ই করে থাকেন। গুরুজীর ছেলের কাছ থেকে আর কীই বা আশা করা যায়? পোস্তর মা চাকরি করেন। মারাত্মক লম্বা অফিস আওয়ারস, সারাদিনের শেষে বাড়ি ফিরে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া তো দূর অস্ত, শোনার পর্যন্ত সময় থাকে না। তাছাড়া চাকরিটাও খুব একটা ভদ্রমহিলাসুলভ নয়। লোকজনকে ফোন করে করে লোন-শোধের আলটিমেটাম দিতে হয়। এঁদের কলকাতা শহরে সাজানোগোছানো খেলানো বাড়ি/ফ্ল্যাট, উইকএন্ডে শান্তিনিকেতনে পোস্তকে দেখতে যান আর বাবামায়ের কাছে ‘পোস্তকে আমাদের কলকাতায় নিয়ে যেতে দিন,’ বলে পায়ে ধরাধরি করেন।

‘বাচ্চাটা ঠাকুমাদাদুর খপ্পরে পড়ল কী করে?’

ভালো সিনেমা পজ করতে হল। 

‘মানে?’

‘বলছি, বাচ্চাটা ঠাকুমাদাদুর খপ্পরে পড়ল কী করে?’ 

অর্চিষ্মানের প্রশ্নে আমি খানিকক্ষণ হাঁ করে রইলাম, তারপর অপরিশীলিত ভাষা প্রয়োগের জন্য মৃদু তিরস্কার করলাম। কিন্তু সত্যি বলতে প্রশ্নটা আমার মনেও এসেছিল। বিশেষ করে মিমি ‘আমার পোস্তর সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করে, মা’ করে যে রেটে কান্নাকাটি করছিলেন তাতে মনে না এলেই অদ্ভুত। 

সিনেমা এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে ক্রমে রহস্য ফাঁস হল।

প্রথমত, পোস্তর বাবামা, যিশুমিমি দুজনেই চাকরি করেন (সরি, করতেন। এখন মোটে একজন করেন।) দ্বিতীয়ত,  সে সময় যিশুমিমির রোজগার এখনকার থেকে কম ছিল। আর তিন নম্বরে কিস্তিমাত, পোস্ত হওয়ার সময় যিশুমিমির ফ্ল্যাট ছিল মোটে এক কামরার। 

‘তুমি দাবি কর যে কলকাতা শহরে এককামরার ফ্ল্যাটে একটা বাচ্চা বড় হবে? কোপাইয়ের ধারে বিঘে বিঘে খাঁ খাঁ লালমাটির মাঠ পড়ে থাকতে?’ আমি অর্চিষ্মানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলাম।

অর্চিষ্মান, প্রত্যাশামতোই, বাক্যহারা।

একমাত্র মিমি দেখলাম গুরুজীর যুক্তির উত্তরে কিছু কুযুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করলেন। বললেন, ‘দাদুদিদার লাক্সারি তো সবার থাকে না, তা বলে সে সব বাচ্চা কি মানুষ হয় না? তাছাড়া আমি তো মা, আমার ছেলে কোথায় থাকবে সে বিষয়ে আমার কি কিছু বলার থাকতে পারে না? ’ হ্যানাত্যানা। বলা বাহুল্য গুরুজী কিংবা পরিচালকদ্বয়, কেউই মিমির প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। 

এই দার্ঢ্যের পরিচয় দেওয়া ছাড়াও সিনেমার পরিচালকদের আরও একটা ব্যাপারে সাধুবাদ জানাতেই হয়, একটা অসম্ভব শক্ত কাজ তাঁর করতে পেরেছেন, কোনও চরিত্রকেই একমাত্রিক করে ফেলেননি। কেউই পুরোটা খারাপ নয়, যেমন মিমি। রবীন্দ্রসংগীতের ধার ধারেন না, ছেলেকে পিৎজা কিনে দেন, ফোন করে লোন আদায়ের মতো পুরুষালি চাকরি করেন, আবার এই মিমিই বাচ্চা মেয়ের মাথায় নরম হাত চালিয়ে চুল এলোমেলো করে দেন। গুরুজী যে গুরুজী যিনি সাধারণ কথোপকথনের মধ্যে যখনতখন রবিঠাকুরের পদ্য মুখস্থ বলে উঠতে পারেন তিনিও নিষ্কলঙ্ক নন, তাঁরও ব্যাকস্টোরিতে সন্তানপালনসংক্রান্ত নানারকম গোলযোগ দেখানো হয়েছে।

একমাত্র একটি চরিত্রের ক্ষেত্রে তাঁরা হার মেনেছেন। তাঁর অনেক গুণ। তিনি আদর্শের জন্য চাকরি ছাড়েন, ধপধপে সাদা পাজামাপাঞ্জাবী পরে ছেলেকে সাইকেলে চড়িয়ে চাঁদনিরাতে বনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে গান গান। ছেলেকে মারতে গিয়েও মুঠো করে হাত নামিয়ে নেন, কেঁদে মেঝেতে লুটিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেন। কিন্তু এত গুণ সব বিফলে যায়। পরিচালকদের শত চেষ্টাতেও যে সত্যিটা কোনওভাবেই ঢাকাঢুকি দিয়ে ওঠা যায় না, সেটা হচ্ছে…

পোস্তর বাবা মদ খান। 

*****

মা চাকরি করে। বাবা মদ খায়। এবং তার পরেও ছেলেকে নিজেদের কাছে রেখে মানুষ করার আস্পর্ধা দেখায়। 

গুরুজীর কাছে আর কীই বা রাস্তা খোলা ছিল, নাতির কাস্টডির জন্য ছেলের বিরুদ্ধে মামলা ঠোকা ছাড়া?

এর মধ্যে যিশুর কেরিয়ারের বদলে কেরিয়ারসংক্রান্ত সাবপ্লট খানিকটা এগিয়েছে। শান্তিনিকেতনে এসে যিশু এক পুরোনো চেনার সঙ্গে বন্ধুত্ব ঝালিয়েছেন, সে বন্ধুর নামটাম সিনেমায় বলা হয়েছিল কি না ভুলে গেছি, কিন্তু মদ খায় সেটা দেখানো হয়েছিল শিওর। বন্ধু যিশুকে একটা চূড়ান্ত লোভনীয় প্রস্তাব দেন। তিনি লন্ডনে গিয়ে রেস্টোর‍্যান্ট খোলার প্ল্যান করছেন, যিশুকে তিনি সে রেস্টোর‍্যান্টে চাকরি দিতে চান। 

যিশু রেস্টোর‍্যান্ট-ব্যবসার র জানেন কি না জানি না, (ধরে নেওয়া যায় জানেন না, জানা থাকলে পরিচালকেরা দর্শকদের জানাতেন নিশ্চয়) যিশুর বন্ধু জানেন কি না আমার মনে পড়ছে না। ইন ফ্যাক্ট, যিশুর বন্ধু মদ খান এ ছাড়া আর কোনও তথ্য সিনেমায় দেওয়া হয়েছিল কি না সেটাই আমার মনে পড়ছে না।

বলা বাহুল্য, যিশু লাফিয়ে পড়েন। যেন এর থেকে নিশ্ছিদ্র লাইফপ্ল্যান জগতে আর কেউ কোনওদিন কাউকে অফার করেনি। স্থির করেন মিমি এবং পোস্তকে নিয়ে লন্ডনে গিয়ে সেটল করবেন। 

মিমি যিশুর থেকেও সরেস, লন্ডনে যাওয়ার আনন্দে তিনি নিজের চাকরিটি ছেড়ে বসে থাকেন এবং শ্বশুরশাশুড়িকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করেন এই বলে যে, ‘আমি আপনাদের ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য চাকরি পর্যন্ত ছেড়ে দিতে পারলাম আর আপনারা নাতিকে ছাড়তে পারছেন না?’

আমার নাতি থাকলে আমিও এদের হাতে তাকে ছাড়তাম না, স্বীকার করছি। 

তবে আদালতে এই চাকরিবাকরির গোলমালটা নিয়ে কোনও কথাই ওঠে না। ওখানে যিশুমিমিকে কাৎ করতে মায়ের চাকরি আর বাবার মদই যথেষ্ট। 

আরও একটা জিনিস, বা একজন বলা উচিত, যিশুমিমিকে একা হাতে হারানোর পক্ষে যথেষ্ট ছিলেন, তিনি হচ্ছেন বিবাদীপক্ষের উকিল, সোহিনী সেনগুপ্ত।

আমি একশো দশ শতাংশ নিশ্চিত গুরুজী সোহিনীকে পয়সা খাইয়েছিলেন। না হলে নিজের গোলে ওই রেটে কেউ গোল দেয় না। পোস্তকে বাড়ি, পোস্তর বাবামাকে বাড়িওয়ালা এবং ঠাকুমাদাদুকে কেয়ারটেকার এই রকম মারাত্মক মেটাফরসহযোগে সোহিনী তাঁর সওয়াল শুরু করেন। বলেন, 'বাড়ি ঝেড়েমুছে, যত্ন করে রাখা যাদের কাজ, তারা বাড়িকে নিজেদের বলে ক্লেম করার সাহস করে কী করে?'  

আমি চমৎকৃত যে জাজ তক্ষুনি কেয়ারটেকারের নামে গোটা বাড়ি লিখে দেননি। 

যাই হোক, মামলা চলতে থাকে।  বাবাছেলের টানাপোড়েন, গুরুজী আর গুরুজীর বউয়ের টানাপোড়েন, গুরুজীর আড্ডার বুড়োদের টানাপোড়েন, যিশুমিমির টানাপোড়েন, পোস্ত আর কাজের মাসির আক্ষরিক টানাপোড়েন।

তারপর গোলেমালে পোস্তর বাবামা পোস্তকে সঙ্গে নিয়ে লন্ডন রওনা দেন। সব ভালো সিনেমার মতোই ক্লাইম্যাক্স ঘটে এয়ারপোর্টে। পোস্তর বাবামা পোস্তকে চুপ করে দাঁড়াতে বলে কী একটা কাজ করছেন, ফিরে দেখেন ছেলে হাওয়া। 

এখানে পরিচালকরা একটু কাঁচা কাজ করে ফেলেছেন বলে আমার বিশ্বাস। শিষ্যকে এত ভালোভালো জিনিস শিখিয়ে এদিকে বাবামা একজায়গায় দু’মিনিট চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে বললে যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সেটা গুরুজী শিখিয়ে উঠতে পারেননি, এটা ফাঁস করে দেওয়াটা ঠিক হয়নি।

অবশ্য মদ খাওয়া বাবা আর চাকরি করা মায়ের কথা না শোনাই ভালো। গুরুজী ঠিকই করেছেন। গুরুজী ভুল করতেই পারেন না।

তারপর মধুরেণ সমাপয়েৎ। ল্যাজ গুটিয়ে বাবামা পোস্তকে ঠাকুমাদাদূর কাছে ফেরৎ দিয়ে যান। পেটের ভেতর থেকে ভসভসিয়ে ওঠা অট্টহাস্য চেপে গুরুজী কথা দেন যে পোস্তকে সময় হলে নিজের হাতে তিনি বাবামায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসবেন। 

*****

সিনেমাটা দেখে আমি মুগ্ধ। অর্চিষ্মান মুগ্ধ। আপনারাও যাঁরা দেখেছেন মুগ্ধ হয়েছেন নিশ্চয়? যাঁরা দেখেননি তাঁরাও এই মচৎকার ভালো সিনেমাটা দেখুন আর গলা ফাটিয়ে জানতে চান, কে বলে টালিগঞ্জে সুস্থ রুচির সিনেমা বানানো হয় না?



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.