September 20, 2016

মরশুমি ভালো-খারাপ




১। আমাদের বাড়িওয়ালার গাছে শিউলিফুল এসেছে। ভোরবেলা, এমনকি অফিস বেরোনোর সময়েও দরজার আশেপাশের চার পা সুবাসিত হয়ে থাকে। ভালোবাসি। 

২। ফুলগুলো আর ক’দিন বাদে গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়বে এবং লোকজন নির্বিচারে সেগুলো পদদলিত করে যাতায়াত করবে। ভালোবাসি না। লোকজনের দোষ নেই। এড়ানো শক্ত। কিন্তু কেউ এড়ানোর চেষ্টাও করে না সেটাও ঠিক।

৩। মেলাগ্রাউন্ড জুড়ে প্যান্ডেল। মাঠ ছিঁড়েখুঁড়ে বাঁশ, ত্রিপল, রঙিন কাপড়, লোহার কাঠামো। একটুও ভালোবাসি না। ভোরবেলা ফাঁকা মাঠে কুকুরগুলো ছোটাছুটি করে খেলত। একটা সাদা, একটা কালো, একটা সাদাকালো। এখন ছোটার জায়গা নেই, তাছাড়া কর্মযজ্ঞ দেখে বেচারারা ঘাবড়েও গেছে। চুপচাপ বসে থাকে ছড়িয়েছিটিয়ে। 

৪।  ওই একই কারণে আমার শরীরচর্চা রুটিনে (রেডিওতে বিজ্ঞাপন সহ সাত থেকে দশটা গানের (এনার্জি আর ঘড়ি বুঝে) সমান হাঁটা, তারপর দুটো গানের সমান দোলনা চড়া) রীতিমত বিঘ্ন ঘটেছে। দোলনা ঘিরে প্যান্ডেলশিল্পীদের অস্থায়ী কুটির বানানো হয়েছে। এখন দোলনায় আমার বদলে তাঁদের গামছা দোলে। ভালো তো লাগেই না, রীতিমত দুঃখ হয়। 

৫। কেনাকাটি। ভালোবাসি না। দেওয়াদেওয়ি। একটুও ভালোবাসি না। ছোটবেলায় নতুন জামা পেতে ভালো লাগত। কিন্তু ছোটবেলায় তো খালি পুজোতেই জামা হত। বড়জোর পয়লা বৈশাখে একপিস সুতির হাতকাটা ফ্রক। এখন যখন ইচ্ছেমতো, যখনতখন জামা কিনে আনছি তখন পুজোর জামার মহিমা কিছু বাকি নেই। এখন শুধু অভ্যেস। আর ভদ্রতা। আর অপচয়। শুধু টাকার নয়। কোনও পক্ষের আলমারিতেই তো আর জায়গা নেই। 

৬। শালিমারের বিজ্ঞাপন। যেটায় চন্দ্রিল আছেন। কমলা রঙের পাঞ্জাবি পরে দু’হাত অঞ্জলির ভঙ্গিতে তুলে ধরছেন, রূপমের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন। কাশফুল আর ঢাকের থেকে ওই বিজ্ঞাপনটা আমার কাছে অনেক বেশি পুজোর বার্তাবাহী। খুবই ভালোবাসি। 

৭।  পুরী থেকে বাবার এনে দেওয়া কটকিটা অবশেষে যে পরার সুযোগ আসতে চলেছে এইটা ভালোবাসি।

৮। কিন্তু তার আগে যে ব্লাউজ বানাতে ছুটতে হবে (যদি অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে না দিয়ে থাকে) সেটা একটুও ভালোবাসি না। 

৯। অর্চিষ্মানের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোব, আইসক্রিম আর কালা খাট্টা চুসকি খাব ভাবতেই ভালো লাগে। 

১০। আমাদের সঙ্গে আরও এক কোটি লোক ঠাকুর দেখতে বেরোবে আর আইসক্রিম কালা খাট্টা চুসকি খাবে আর তাদের আঙুল, কনুই, চিবুক গড়িয়ে গাঢ় বেগুনি তরল মাটিতে পড়বে, কিংবা এক হাতে আইসক্রিম সামলে অন্য হাতে ফোন তাক করে সেলফি তুলতে গিয়ে এ হাত কাত হয়ে আইসক্রিম খসে মাটিতে পড়বে, তার ওপর এক কোটি জোড়া জুতোর ধুলো, ভাবতেই কান্না পায়।

১১। স্মল টকের অসম্ভব সহজ হয়ে যাওয়াটা ভালোবাসি। লিফটে, রেস্টরুমে, ক্যান্টিনে চেনা আধচেনা লোকের সঙ্গে অস্বস্তিকর নীরবতা হাওয়া। দেখা হলেই হিন্দি ইংরিজি বাংলায়, “ঘর নেহি যাওগে?” ট্যাক্সিতে উঠে ডেসটিনেশন সি আর পার্ক দেওয়া মাত্র, “রাস্তা কব সে বন্ধ হো রহা হ্যায়, ম্যাডাম?” 

১২।  কিন্তু এই মরশুমের যে জিনিসটা সবথেকে, সবথেকে ভালোবাসছি সেটা হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতিতে আসা জোয়ার। টিভি দেখাটা মারাত্মক ইন্টারেস্টিং হয়ে গেছে। বিনোদনের মুখ চেয়ে কলকাতা সি আই ডি-র পাঁচবার দেখা এপিসোডগুলো ছ’বার করে দেখার যন্ত্রণা নেই। কাল পাওলি দামের সাতদিনের লুক দেখলাম। নতুন নতুন সিনেমার ট্রেলার। কলার তোলা ট্রেঞ্চ কোট থেকে সিক্সপ্যাক-এদিকে-গালফোলা হিরোর বুকখোলা রোম্যান্স থেকে শহরের তলার শহরের গুন্দাগর্দি। ইন্ডাস্ট্রির সেরা অভিনেতাদের জীবনের সেরা অভিনয়। দেখলে পিলে চমকে যায়। গায়ে কাঁটা দেয় গানের কথা। ভেঙেচুরে গেছে ঘরবাড়ি/চাপা দিয়ে চলে গেছে লরি/ উচ্ছে করলা গাড়িগাড়ি/ আমি রেঁধে খাব তরকারি। তারকাদের ইন্টারভিউ। এত বিখ্যাত অথচ আমার আপনার মতোই। রেগুলার গাই। অবসর টাইমে ডগদের নিয়ে ওয়াকে যান। সিঙ্গাপুরে শুটিং-এ গিয়ে ফান হ্যাভ করেন। ইয়াহ্‌। লাইক ক্রেজি। শুনতে শুনতে নস্ট্যালজিয়ার ঢেউ মগজে আছাড় খায়। মাবাবার ঘাড়ে চেপে দায়দায়িত্বহীন জীবনযাপনের সোনালি দিনগুলো , শ দিয়ে শকুন কাঁদে গরুর শোকে আর ভি ফর ভালচার যখন একইসঙ্গে চলছিল। তখন মুহূর্তের ব্রেনওয়েভে ভাষার ব্যারিকেড ভেঙেচুরে ‘ভালচার কাঁদে কাউ-র শোকে’। এ বাংলাভাষায় আমার কপিরাইট থাকবে না? 



September 17, 2016

সাপ্তাহিকী




খবরাখবর


আত্মবিশ্বাসের খারাপ ব্যাপার হচ্ছে জিনিসটা কখনওই মাপমতো থাকে না। কম হলে তবু একরকম। বেশি হলে ভয়াবহ। এবং হাস্যকর।

কে বলতে পারে এখন শরীরচর্চা ইন্ডাস্ট্রি টাকা খাওয়াচ্ছে না? কিংবা অরগ্যানিক ইন্ডাস্ট্রি?

শরীরচর্চার কথা বলতে মনে পড়ল। অক্ষয়কুমার ঊনপঞ্চাশ হলেন। যিনি না থাকলে আমার মতে হিন্দি সিনেমায় সুপুরুষ নায়কের কোটাটা খালি পড়ে থাকত। তাঁর স্বাস্থ্যের রহস্য আর্লি টু বেড আর্লি টু রাইজ। এবং জিমে না যাওয়া।

সঞ্চয়প্রতিভা নয়, ঔদার্যও নয়, গোটা গল্পটার সবথেকে অবিশ্বাস্য ব্যাপার আমার মতে এত টাকা জমিয়েও লোকটা টাকার গরম লুকিয়ে রাখল কী করে সেটা।


ভিডিও

ধ্যানের বৈজ্ঞানিক উপকারিতা প্রমাণ হলে অনেকেই ব্যাপারটা চেখে দেখতে চাইবে।

লিস্ট

অ্যাংজাইটি বলতে আমি যা বুঝি তার মধ্যে এগুলোর অনেকগুলোই পড়ে না। তবু চোখ বোলাতে মন্দ কী।

ট্রেনলাইনে যারা বড় হয়েছে তাদের সবার হয়েছেই হয়েছে L’appel du vide বাংলাদেশের প্রতি আমার কোনও Kaukokaipuu নেই। আমি মারাত্মক মাত্রার Malu-তে ভুগি। ইদানীং সর্বক্ষণ Torschlusspanik হচ্ছে।

কুইজ/খেলা

আমি পূর্ণচ্ছেদে বিশ্বাসী। সম্পর্কের, কথোপকথনের, সমস্যার। দেখে ভালো লাগল যে এরা আমার চরিত্রকে দাঁড়ির সঙ্গেই তুলনা করেছে।

মিস মার্পল তাঁর কেরিয়ারে ক’কাপ চা খেয়েছিলেন সেটা বলতে না পারলেও ক’টা খুন সমাধান করেছিলেন সেটা পারা উচিত ছিল। নিজেকে নিয়ে চূড়ান্ত হতাশ।


September 15, 2016

বিহার নিবাস, দ্য পটবেলি





লালু ভালো নীতিশ খারাপ। মৈথিলী ভাষায় অইখন মানে এখানে তইখন মানে সেখানে। ভোজপুরী ফিল্মি গানের ভাষা এমন যে ফ্যামিলিকা সাথ বইঠকে শোনা যায় না। অথচ সেই গান শুনে শুনে মৈথিলী যুবসম্প্রদায় গোল্লায় যাচ্ছে। এ সব খবর আমরা পেলাম ঈদের দুপুরে বাড়ি থেকে বিহার নিবাস যেতে যেতে। 

ট্যাক্সিতে উঠেই যেই না বললাম বিহার নিবাস যানা হ্যায়, ভদ্রলোক এক গাল হেসে জি পি এস বন্ধ করে দিলেন। ট্যাক্সিচালকরা দু’প্রকার। একদল জি পি এস-এর দেখানো রাস্তার এক ইঞ্চি এদিকওদিক দিয়ে যেতে রাজি হন না। আর একদল জি পি এস-এর সাহায্য নেওয়াকে কাপুরুষতা মনে করেন। প্রথমে ভেবেছিলাম এই ভদ্রলোক দ্বিতীয় দলের। তারপর অন্য কারণটা বেরোলো। নার্ভাস হয়ে আমরা কিন্তু রাস্তা চিনি না বলাতে আশ্বাসের হাত তুলে বললেন, আপনা হি স্টেট হ্যায়, ভবন তো পাতা হি হোনা চাহিয়ে।

কৌটিল্য মার্গের বিহার ভবন ওঁর পাতা ছিল ঠিকই কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ক্যান্টিনটা তেনজিং নোরগে মার্গের বিহার নিবাসে। দুটোর মধ্যে দূরত্ব মোটে পাঁচ মিনিট।

বিহার নিবাসের ক্যান্টিনকে অবশ্য ক্যান্টিন বলা উচিত নয়। কারণ সেটা একটা বাহারি দোকান। শাহপুর জাট ভিলেজে পটবেলি রুফটপ ক্যাফের ধুন্ধুমার ব্যবসা দেখে বিহার ভবন/নিবাসের কর্তারাই পটবেলি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন বিহার নিবাসে তাঁদের দোকান খুলতে। সিদ্ধান্ত যে ভুল হয়নি তা মঙ্গলবারের (অবশ্য ছুটির মঙ্গলবার) দুপুরের হাউসফুল দিয়েই পরিষ্কার। 

শাহপুর জাটের চারতলা বাইতে যাঁদের হাঁটু কাঁপে, কিংবা হিপস্টারদের যাঁরা ভয় পান তাঁদের পক্ষে বিহার নিবাসের পটবেলি আদর্শ। ঝলমলে, অতিথিবৎসল আবহাওয়া। কাউন্টারে যিনি বসেছিলেন আর যিনি ঘুরে ঘুরে তদারকি করছিলেন, দু’জনকেই শাহপুর জাটের ক্যাফেতে দেখেছি।

পটবেলির মেনুতে স্টার্টারের নামগুলো পড়লেই অর্ডার করতে ইচ্ছে করে। আলু লালু চপ, কিমা গোলি, পোঠিয়া মছলি ফ্রাই। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ওগুলো খেলে আর কিছু খাওয়া যায় না। তাই সোজা মেন কোর্স। আমার জন্য চিকেন তিখা ইস্টু, অর্চিষ্মানের জন্য খড়া মসালা মাটন। প্রথমটা ভাত আর দ্বিতীয়টা পরোটার সঙ্গে আসে। আর গলা ভেজানোর জন্য নেওয়া হল সল্টি অ্যান্ড স্পাইসি লস্যি। 


খড়া মসালা মানে গোটা মশলা। এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি, জিরে, ধনে, গোলমরিচ, জয়িত্রী, জায়ফল - কেউ কেউ গন্ধের জন্য মৌরিও দেন - তেলে ফোড়ন (গোটা কিংবা মোটা করে গুঁড়িয়ে) দিয়ে মাংস রান্না করাই হচ্ছে খড়া মসালা মাটনের মোদ্দা রেসিপি। এত তরিবত করে রাঁধলে তো রান্না খারাপ হওয়ার কোনও কারণ নেই, খড়া মসালা মাটন প্রত্যাশিতভাবেই ভালো। কিন্তু আমাকে রুদ্ধবাক করল চিকেন তিখা স্টু। গাজর আর আলুর টুকরো দিয়ে রান্না ঝাল ঝাল, টক টক মুরগির পাতলা ঝোল। জিভে ছোঁয়ানোমাত্র মাথা থেকে পা পর্যন্ত যত ঘুমন্ত কোষ, ঝিমন্ত রন্ধ্র ঝাঁকুনি খেয়ে বাপ বাপ বলে উঠে দাঁড়ায়, দু’হাত তুলে গলা খুলে “জিয়া হো বিহার কে লালা” রাঁধুনিবন্দন শুরু করে। 


বাইরে ছাতার তলায় লিট্টি উৎপাদনশালা। খোলা আগুনের ওপর লোহার জালির ওপর বড় সাইজের সবেদার মতো সারি সারি লিট্টি। হাতের তেলো দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চারপাশ সমান করে সেঁকা চলছে। 

কাচের দেওয়াল ভেদ করে এমন মিষ্টি আলো আসছিল যে আমরা ভাবলাম আরেকটু বসা যাক। সঙ্গ দিতে এল পাইনঅ্যাপেল আপসাইড ডাউন কেক উইথ আইসক্রিম। অথেনটিক না হতে পারে, চমৎকার। আনারসের চোখওয়ালা টুকরো ঢাকা নরম মসৃণ স্পঞ্জকেক। পাইনঅ্যাপেলের উপস্থিতি প্রমাণের তাগিদে কোনও রকম সেন্টের ব্যবহার করা হয়নি। আমার মতো গন্ধবিচারীদের পক্ষে রক্ষে। 


শেষে ভালো খাওয়া উদযাপন করতে এক কেটলি চা। আদালবঙ্গএলাচ দিয়ে বেশ করে ফোটানো।

দিল্লিবাসী হলে আর স্টেট ক্যান্টিনে খাওয়ার আগ্রহ থাকলে বিহার নিবাসের দ্য পটবেলি-কে লিস্টের ওপরদিকে রাখুন। আর যাঁরা দিল্লিতে কিংবা বিহারে থাকেন না তাঁরা শিগগিরি বাড়ির কাছে বিহারী দোকান খুঁজে খেতে যান।




September 13, 2016

আমার জীবনের কুড়িটি জ্বলন্ত সমস্যা



১। তেষ্টা মেটার আগেই চা ফুরিয়ে যাওয়া। প্রত্যেকবার।

২। চায়ের দুধ, চিনি, নুন, বয়ামে কখনওই প্যাকেটের পুরোটার জায়গা না হওয়া। বাকিটুকু গার্ডার পেঁচিয়ে রাখতে বাধ্য হওয়া। চোখের সামনে রাখলে দৃশ্যদূষণ, আড়ালে রাখলে বিস্মৃতি। 

৩। ওষুধ ফুরোনোর আগেই অসুখ সেরে যাওয়া। তারপর সারাবাড়ি ওষুধের গোরস্থান।

৪। বাড়িতে প্লাগ পয়েন্টের থেকে গ্যাজেট বেশি থাকা।

৫। অর্চিষ্মান আর আমার ফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদির চার্জ সর্বদা, সর্বদা, একসঙ্গে ফুরোনো। এবং তখন ওপরের সমস্যাটা প্রকটতর হয়ে ওঠা।

৬। আশু দরকারি কাজটা ছাড়া পৃথিবীর সব কাজ করতে ইচ্ছে করা। 

৭।  পড়তে শুরু করা বইটা ছাড়া পৃথিবীর অন্য সব বই পড়তে ইচ্ছে করা। 

৮। সব খাবার গরম হয়ে যাওয়ার পর সিনেমা বেছে বাফারিং-এ দেওয়ার কথা মনে পড়া। তখন হয় সিনেমা বাছতে গিয়ে খাবার ঠাণ্ডা কর, নয় সিনেমা চালাতে চালাতে খাওয়া শেষ।

৯। বাঁধানো ছবির তুলনায় দেওয়ালে পেরেক কম পড়া। নিজেরা মারার এলেম নেই। আর পেরেক মারার জন্য এখনও লোক ভাড়া পাওয়া যায় না। হাঁ করে বসে থাকা কখন বড় কিছু খারাপ হবে - কলিং বেল, গিজার - তখন ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে পেরেক পুঁতিয়ে নেওয়ার জন্য। 

১০। ইলেকট্রিশিয়ান আসা থেকে চলে যাওয়া পর্যন্ত দুজনের মাথা থেকে পেরেকের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বেরিয়ে যাওয়া।   

১১। মুদির দোকানে হোম ডেলিভারির অর্ডার দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ চেয়ে থাকা। 

১২। অর্ডার দেওয়ার পাঁচ মিনিট পর ফোন করে একটা ভুলে যাওয়া আইটেম জুড়ে দেওয়ার কথা বললে শোনা, “দিদি, এক্ষুনি আপনার মালটা বেরিয়ে গেল।” 

১৩। ঠিক সে সব ক্ষেত্রেই নুন দিয়েছি কি না ভুলে যাওয়া, যে সব ক্ষেত্রে চেখে দেখা সম্ভব নয়। মাংস ম্যারিনেট করতে দিয়ে, ডিম ফেটানোর পর।

১৪। রিল্যাক্সেশন পুরো হওয়ার আগেই ভিডিও গেমের লাইফ ফুরিয়ে যাওয়া।

১৫। দিন ফুরিয়ে গেলেও ইউটিউবে দেখার মতো ভিডিও না ফুরোনো। 

১৬। সুবিধেজনক দিকে পড়ার সমান সুযোগ থাকলেও জিনিসপত্রের সর্বদা খাটের সেদিকে পড়া যেদিকে হাত ঢোকানোর জায়গা নেই। 

১৭। একটা হারানোর পর অনেক খুঁজে না পেয়ে শেষমেশ অন্যটা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার চব্বিশঘণ্টার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া দুলটা বেরিয়ে পড়া। 

১৮। ইন্টারনেটে যাদের দেখলে ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যায়, তাদের খবরই সবথেকে বেশি নিতে ইচ্ছে করা।

১৯। উল্টোদিক থেকে চেনা লোক আসতে দেখলে তার উপস্থিতি অ্যাকনলেজ করা মোক্ষম মুহূর্তটা চিহ্নিত করতে না পারা। সবসময়েই টু আর্লি, নয়তো টু লেট।

২০। অনেক ভেবেও কুড়ি নম্বর অসুবিধেটা মনে করতে না পারা। এবং এটা জানা যে পাবলিশ করার কুড়ি সেকেন্ডের মধ্যে আমার জীবনের জ্বলন্ততম সমস্যাটা মনে পড়বে যেটা এই লিস্টে অনুপস্থিত।  



September 10, 2016

সাপ্তাহিকী



Intelligence is really a kind of taste: taste in ideas. 
                                                                                             ---Susan Sontag


Mother's genes go directly to the cerebral cortex, those of the father to the limbic system. 

পৃথিবীর প্রথম চুটকি হল খ্রিস্টপূর্ব উনিশশো শতকের একটি সুমেরিয়ান প্রবাদ। 

জাপানে বোমাপতনের পরে ভিয়েতনামের যুদ্ধে রাস্তায় ছুটতে থাকা ছোট মেয়েটির ছবি ফেসবুকের সংজ্ঞায় ফুল ফ্রন্টাল নুডিটি-র উদাহরণ। কাজেই বাতিল।
  
চারচারটে জন্তুকে আমরা জিরাফ নামের ছাতার তলায় গুঁজে রেখেছি। (নিউ ইয়র্ক টাইমস)

উনিশশো চুয়াত্তর সালে টুইন টাওয়ার তৈরি হওয়ার খবরটা দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারে বসে পেয়েছিলেন ইনি। তখনই ঠিক করেন এক টাওয়ারের ছাদ থেকে অন্য টাওয়ারের ছাদ পর্যন্ত হাঁটবেন। প্রস্তুতির আট মাসে দড়িতে হাঁটা মোটে একবার প্র্যাকটিস করেছিলেন তিনি। তাঁর মূল মাথাব্যথা ছিল হাঁটার পার্টটা নয়, গার্ডের চোখ এড়িয়ে ছাদ টু ছাদ তার লাগানোর পার্টটা। কারণ ঘটনাটা ঘটানোর জন্য তাঁর অনুমতি ছিল না। কাজেই নিচে সেফটি নেটও ছিল না। 
“On the last step, as I gave myself up to the police, it started to rain. They were very angry. It took them an entire afternoon to process and get rid of me. They were rough, but some asked for my autograph."

জেতার টোটকা? উঁহু, এক্সেলেন্স নয়। ইকুয়ালিটি। 

 ছবির পেছনে জল ছিটকানোর ব্যাকগ্রাউন্ড বানাতে চাইলে। 




আমার বাবামার জন্মবছরের বেস্টসেলার বই দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই, আমার জন্মবছরের বেস্টসেলার দ্য বোর্ন আইডেন্টিটি, অর্চিষ্মানের জন্মবছরের বেস্টসেলার সিক্রেটস। আপনার?



September 08, 2016

সাত



গোড়ায় অসুখবিসুখের প্রসঙ্গে সাত বছর সময়টা জরুরি ছিল। বলা হত এ পৃথিবীতে এমন কিছু রোগ আছে, শরীরের এবং মনের, যা সারতে লাগে সাত বছর। তারপর বিশেষজ্ঞরা বার করলেন মানুষের সম্পর্কেও সাত বছর সময়টা জরুরি। সম্পর্ক মানে মূলত রোম্যান্টিক সম্পর্ক, জোগাড় করা থেকে টিকিয়ে রাখা, সবকিছুতেই যাদের পেছনে কাঠখড় পোড়াতে হয়। জন্মলগ্নে মুফতে পাওয়া সম্পর্ক, বিজয়ায় একটা ফোন করলেই পরের বছরের জন্য যাদের থাকা নিশ্চিত, তারা নয়। বিশেষজ্ঞরা বললেন এই সব কঠিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাত বছর সময়টা ক্রুশিয়াল। শুরুতে হালকা ইরিটেশন, লাল হওয়া, ফুসকুড়ি। পত্রপাঠ ব্যবস্থা না নিলে একেবারে বিচ্ছেদে গড়ানো অসম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা কিছু বললে অবশ্য একটা সান্ত্বনা থাকে। যে আরেকদল বিশেষজ্ঞ ঠিক উল্টো কথাটা প্রমাণ করে দেবেন। এ ব্যাপারেও তাই হল। অন্যরা বললেন যে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা তো নেই, বরং সাত বছর যদি কোনও সম্পর্ক টিকে যায় তাহলে বরং নিশ্চিত হওয়া যায় বাকি জীবনটাও সেটা টিকবে। সাত বছর একসঙ্গে থাকা মানে পালানোর রাস্তা সব একে একে বন্ধ হয়েছে, একে অপরকে হাড়েমজ্জায় অভ্যেস হয়ে গেছে, বাকিটুকু জাস্ট নিয়ম করে টেনে দিলেই হল। 

কোন তত্ত্বটা যে ঠিক সেটা তো জানিই না, কোনটা যে বেশি ভয়ের সেটাও নিশ্চিত নই। 

যেমন আজ রাত পোহালে আমার অবান্তর লিখে চলার সাত বছর পূর্ণ হবে, এ খবরটা উদযাপনের না বুক চাপড়ানির, সেটা আমার গুলিয়ে যাচ্ছে। 

জন্মের বাইরে পাওয়া আমার কোনও সম্পর্ক, রোম্যান্টিক বা ননরোম্যান্টিক, সাত বছর টেকেনি। (এখন যে রোম্যান্টিক সম্পর্কটায় আছি সেটা অ্যাকচুয়ালি সাত ছুঁতে চলেছে, মাগো...) কেউ আমাকে তাড়িয়েছে, কাউকে আমি কাটিয়েছি। কোনওটা সম্পর্কের পেডেস্ট্যাল থেকে হড়কাতে হড়কাতে এখন পরিচয়ের ক্ষীণ সুতোয় ঝুলছে। আর কোনওটার দিকে আঙুল তুলে যারা বলছে, কই এইগুলো তো বেশ জং ধরা মনে হচ্ছে, তাদের আমি রহস্য করে উত্তর দিচ্ছি, তবেই বুঝুন। 

অবান্তরের সঙ্গে সম্পর্কটা সাত বছর কী করে টিকল সেটা একটা রহস্য। সে রহস্যের চাবি আমি নই। হতেই পারি না। তাহলে আমার অন্যান্য সম্পর্কেও এর ছাপ পড়ত। 

দায়ী নির্ঘাত অন্য পক্ষ। অর্থাৎ, অবান্তর।

কিন্তু অবান্তর কি সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে পারে? শেষপর্যন্ত তো সে স্ল্যাশ, কোলন, হাইফেন আর ডট দিয়ে লেখা একটা নাম। থাকে ল্যাপটপে, খায় ইন্টারনেট। সে সাত বছর ধরে এইরকম একটা মিনিংফুল রিলেশনশিপ পুষছে এটা আমি অনেক চেষ্টা করেও মেনে নিতে পারলাম না।

তখন আমার নজর পড়ল অবান্তরের ওপারের ছায়াটার দিকে। আপনার ছায়া। আপনাদের ছায়া। যার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ আলাপ নেই, অথচ সারাদিনের সমস্ত সশরীরী কথোপকথন, দেওয়ানেওয়াকে ম্লান করে যে ছায়া আমাকে ঘিরে থাকে, যে ছায়া রসিক ও সংবেদনশীল, বুদ্ধিমান ও বিনীত, আত্মবিশ্বাসী ও শিখতে রাজি, বলার থেকে শুনতে খুশি, যে ছায়ার মেজাজ নরম, শিরদাঁড়া শক্ত, চোখ চকচকে, হাসি পরিষ্কার, আর যে ছায়া ভেতর থেকে ভালো।

আমার ঠিক যেমনটি পছন্দ, আপনারা ঠিক তেমনই। আপনাদের জন্যই সাত বছর ধরে অবান্তরে ফিরে ফিরে আসছি, আপনারা আমাকে না ছাড়লে আরও অন্তত সাত বছর আসব। আমার জীবনের অন্যতম পারফেক্ট সম্পর্কে সাত বছর ধরে আমাকে থাকতে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনেক ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা রইল। এই সাড়ে চারশো শব্দের মধ্য দিয়ে যতটুকু প্রকাশ করতে পারলাম তার থেকে অন্তত সাড়ে চারশো কোটি গুণ। 



September 06, 2016

ধর্মের বিষ আর কুমারীর বাস/ অগস্ট (২০১৬) মাসের বই



The Poisonwood Bible/ Barbara Kingsolver




উৎসঃ গুগল ইমেজেস

উনিশশো ঊনষাট সালে চার মেয়ে র‍্যাচেল, লিয়া, আডা, রুথ মে এবং এক বউ অরলিয়ানাকে সঙ্গে করে এভ্যানজেলিক্যাল ব্যাপ্টিস্ট নাথান প্রাইস কঙ্গো পৌঁছন মিশনারি দায়িত্ব সারতে। গন্তব্য কিলাংগা নামের একটি ছোট গ্রাম। প্রাইস পরিবারের সংক্ষিপ্ত কিলাংগাবাসের অভিজ্ঞতা এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবনে অভিজ্ঞতার দীর্ঘ, অতি দীর্ঘ ছায়াপাত নিয়ে বারবারা কিংসলভারের লেখা পয়জনউড বাইবেল, প্রায় সাড়ে পাঁচশো পাতার বই, হার্পার প্রকাশনী থেকে ছাপা হয়েছিল উনিশশো আটানব্বই সালে। উনিশশো নিরানব্বই সালের ফিকশন বিভাগে পয়জনউড ফাইন্যালিস্ট ছিল। ( জিতেছিল মাইকেল ক্যানিংহ্যামের দ্য আওয়ারস।)

গল্পটা আমাদের বলে অরলিয়ানা এবং তার চার মেয়ে। নাথানের কোনও বক্তব্য আমরা শুনতে পাই না। তার কারণ আডার মন্তব্যে স্পষ্ট। “Our father speaks for all of us”।  মা আর চার মেয়ে পাঁচরকম ভাবে আমাদের কিলাংগা, কিলাংগার মানুষ, মাঠ, নদী, নদীর কুমীর, খরা, বন্যা, শিকার, পুরুষতন্ত্র, ওঝাতন্ত্র, খুনি পিঁপড়ে, আপাতভাবে কিলাংগার নাগালের বাইরে কিন্তু কিলাংগাকে নিরন্তর ছুঁয়ে যাওয়া কঙ্গো এবং বিশ্ব রাজনীতির* গল্প বলে। আর সে গল্পের মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে কী ভাবে পালটে যাচ্ছে এই পাঁচটি মানুষের দর্শন, পারস্পরিক সম্পর্ক। কারও চোখ ফোটে, কেউ অন্ধ হয়ে যায়। কঙ্গো, কিলাংগা, আফ্রিকা কীভাবে প্রাইস পরিবারকে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ে তারই গল্প হচ্ছে পয়জনউড বাইবেল। 

* প্রাইসরা পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই কঙ্গোর রাজনীতিতে পালাবদল শুরু হয়। বেলজিয়াম শাসন শেষ হয়ে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিক লুমুম্বা। তারপর অ্যামেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বেলজিয়াম, ইউ এন এবং কঙ্গোর ক্ষমতালোভী লোকজন মিলে এক অভূতপূর্ব গোলযোগের সৃষ্টি করে। উনিশশো একষট্টি সালে প্যাট্রিক লুমুম্বা অকথ্য অত্যাচার সয়ে খুন হন এবং জোসেফ মোবুটু নামের এক বাঁধিয়ে রাখার মতো মানুষের হাতে পড়ে (এবং সাদা বড়লোক দেশদের সম্পূর্ণ সহযোগিতায়) পরবর্তী তিরিশ বছর ধরে কঙ্গো লুণ্ঠিত হতে থাকে। এসবই বারবারা কিংসলভার ছুঁয়ে গেছেন তাঁর বইয়ে।

পয়জনউড বাইবেলের সবথেকে ভালো জিনিস হচ্ছে কিলাংগা। আর তারপরই কিংসলভারের ভাষা। পাঁচ বয়সের পাঁচ মহিলার ভাষা একেবারে পাঁচরকম। খানিকটা পড়ার পর আপনি নিজে থেকেই বুঝতে পারবেন কোন গলাটা কার। আর কিংসলভারের রসবোধ। ওই গোলমালের মধ্যেও মাঝে মাঝে সশব্দ হাসি বেরিয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে পয়জনউড বাইবেল জমজমাট, একবার শুরু করলে থামতে না পারা বই। 

তবু কেন আমি পয়জনউডকে পাঁচে তিন দিলাম সে কথায় আসি। পয়জনউড বাইবেলের প্রধান অসুবিধে আমার মতে ভালোখারাপের ভাগাভাগি। নাথান প্রাইস একটি ধর্মান্ধ, অত্যাচারী, নারীবিদ্বেষী অমানুষ। কাজেই তার নিন্দে করার জন্য খুব বেশি মগজ খরচ না করলেও চলে। আর লোকটা এই রকম বলেই তার বক্তব্যটা সম্পূর্ণ নীরব করে দিয়ে কিংসলভার পাঠকের কাজটা অত্যন্ত বেশি সোজা করে দিয়েছেন। পাঁচ ভিকটিমের মধ্যেও কিংসলভারের পক্ষপাতিত্ব প্রকট। বোনেদের মধ্যে একজন আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছে, একজন বিদ্যাবুদ্ধির জন্য, আরেকজন বিষয়সুখের জন্য। এই বিষয়সুখলোভী বোনটিকেও প্রায় ক্যারিকেচারের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন লেখক। এবং শুধু তাতেই ক্ষান্ত দেননি, সকলের মধ্যে সে বেচারাকেই অসুখী করে রেখেছেন। কোনও কোনও সন্ধ্যেবেলা দামি ওয়াইন নিয়ে প্রাসাদের বারান্দায় বসে একা তারই মনে হয় সব থেকেও কী যেন নেই। যারা আদর্শবাদী কিংবা বুদ্ধিজীবী, তাদের মনে কখনও এরকম কিছু আক্ষেপ জাগে না। বড়লোক বোনের প্রাচুর্যের দিকে তাকিয়ে কখনও তাদের ঈর্ষা হয় না। কখনও, কোনও দুর্বল মুহূর্তেই আদর্শ/+ ডিগ্রির মুখে লাথি মেরে স্রোতে ভেসে যাওয়ার ইচ্ছে তাদের বুকে কখনও মাথা তোলে না। 

*****

Parfume: The Story of a Murderar/Patrick Süskind
অনুবাদকঃ John E. Woods

উৎসঃ গুগল ইমেজেস

পারফিউমঃ দ্য স্টোরি অফ আ মার্ডারার-এর আসল নাম Das Parfum। জার্মান ভাষায় বইটা লিখেছিলেন Patrick Süskind। উনিশশো পঁচাশি সালে বইটি ছাপা হওয়ার পর এ যাবৎ আটচল্লিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বিক্রি হয়েছে কুড়ি মিলিয়ন কপির বেশি। 

গল্পের মার্ডারার হচ্ছেন সতেরোশো আটত্রিশ সালে প্যারিসের জন্মানো Jean-Baptiste Grenouille। ফরাসিতে Grenouille শব্দের মানে ব্যাং, কাজেই Jean-Baptiste-এর চেহারা সম্পর্কে একটা ধারণা সেখান থেকে করে নেওয়া যায়। Jean-Baptiste-এর মা ছিলেন এক মাছব্যবসায়ী। Jean-Baptiste-এর আগেও তাঁর বেশ ক’টি সন্তান হয়েছিল। তিনি প্রতিটি সন্তান প্রসব করেছিলেন ওই মাছের বাজারে কাজ করতে করতে। এবং প্রসবান্তে তাদের ওই বাজারেরই নোংরা গাদায় ফেলে রেখেছিলেন যাতে তারা পত্রপাঠ মারা যায়। মায়ের কপাল খারাপই বলতে হবে, তাঁর গর্ভে Jean-Baptiste জন্মালো। মা জন্ম দিলেন এবং অভ্যেসমতো নোংরা গাদায় ফেলে দিলেন। 
একটু বাদে সেই নোংরা গাদা থেকে উঠে এল এক গগনবিদারী আর্তনাদ। বাজারশুদ্ধু লোক ছুটে এল। আস্তাকুঁড় থেকে বেরোলো নবজাতক। মায়ের অপরাধও বেরোলো। জানা গেল এ-ই প্রথম নয়, এর আগেও  সে এই কাণ্ড করেছে। নিজের সন্তানদের খুনের অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড হল। Jean-Baptiste বেঁচে রইল। বেঁচে রইল কেবল Jean-Baptiste বলেই। অন্য কেউ হলে বাঁচত না। কেউ Jean-Baptiste কে ভালোবাসত না। সকলেই তাকে ভয় পেত। কেউ কেউ মুখে বলতও, Jean-Baptiste মানুষ নয়। সাক্ষাৎ শয়তান।

Whoever has survived his own birth in a garbage can is not so easily shoved back out of this world again. He could eat water soup for days on end, he managed on the thinnest milk, digested the rottenest vegetables and spoiled meat. In the course of his childhood he survived the measles, dysentery, chicken pox, cholera, a twenty foot fall into a well, and a scalding with boiling water poured over his chest. এর পর ট্যানারিতে কাজ করতে করতে Jean-Baptiste-এর অ্যানথ্রক্স হয় এবং সে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকেও Jean-Baptiste বেঁচে ফেরে। 

ধ্বংসের অতীত হওয়াই অবশ্য Jean-Baptiste-এর একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়। Jean-Baptiste-এর সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার ঘ্রাণশক্তি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘ্রাণশক্তির সদ্ব্যবহার করে Jean-Baptiste একজন পারফিউমার হয়ে ওঠে। গন্ধ তার কাছে শুধু পেশা ছিল না, ছিল অস্তিত্বের মূল কথা। 

কিন্তু মার্ডার কোথায়? সেটা আমারও প্রশ্ন। নিজের গন্ধের নেশা চরিতার্থ করতে Jean-Baptiste একাধিক খুন করে ঠিকই, কিন্তু গল্পটা পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন সে সব খুন গল্পের অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর জায়গা দখল করে আছে। যারা খুন হয়েছে তাদের নামধাম কিছুই আমরা জানতে পারি না। তারা গল্পে ছিল Jean-Baptiste নামের একটি অতি অদ্ভুত মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে। 

Patrick Süskind-এর ভাষা খুবই শক্তিশালী। বর্ণনামূলক লেখা আমার মতে এমনিই শক্ত, আর এ বর্ণনার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে ঘ্রাণশক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান। পাতার পর পাতা জুড়ে গন্ধের বর্ণনা দিয়ে গেছেন লেখক অথচ তা কখনও একঘেয়ে হয়ে ওঠেনি। 

পারফিউম-এর প্রতি আমার একটিই নালিশ। কিন্তু যত সময় যাচ্ছে পারফিউম-এর সব বড় গুণ ছাপিয়ে সেই নালিশটাই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে। যখনই মনে পড়ছে পৃথিবীর সেরা গন্ধের উৎস হিসেবে লেখক সুন্দরী সদ্যযৌবনোদ্গমা কুমারী (কুমারীর অংশটা জরুরি। চুলের রং একটু ফ্যাকাশে, নাকচোখমুখ একটু কম কাটাকাটা হলেও চলবে, কিন্তু অনাঘ্রাতা না হলে চলবে না) ছাড়া আর কিছু পেলেন না, তখনই নাকখানা কুঁচকে যাচ্ছে। ওই খবরটা যেন এককুচি মরা ইঁদুরছানা, গোটা দুশো তেষট্টি পাতার প্রস্ফুটিত মুঘল গার্ডেনকে মাটি করার জন্য একাই একশো। 


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.