ভাল থাকার উপায়


এক মাস পুরনো হয়ে গেলে কি হবে, নতুন বছরে ঝাঁ চকচকে জীবন শুরু করার মরীচিকা আমাকে এখনও পিছু ছাড়েনি। আমি এখনও ভাল ছাত্রী হতে চাই, এখনও পাঁচ কেজি ওজন কমাতে চাই, এখনও প্রতি মাসে অ্যাকাউন্টে আরেকটু বেশি করে টাকা জমাতে চাই।

এখনও আমার ইউটিউবের হাত থেকে মুক্তির স্বপ্নে জং ধরেনি।

কী কী করলে আমার সব স্বপ্ন বাস্তব হবে জানতে চাওয়ায় এক হিতৈষী বললেন, “প্রাণায়াম কর।”

“ওহ, এই ব্যাপার” বলে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই, হিতৈষী বলে উঠলেন, “এই ব্যাপার কী বলছ মেয়ে, ব্যাপার সোজা মোটেই না”।

জানা গেল, প্রাণায়াম নিয়মমত করতে পারলে আপনার অনন্ত যৌবন গ্যারান্টি, কিন্তু ভুলভাল জায়গায় ভুলভাল নিঃশ্বাস ফেলেছেন কি আর রক্ষা নেই। অগত্যা মনোযোগ দিতে হল। খাতা পেন বার করে টুকে নিলাম, ভস্ত্রিকা পাঁচ মিনিট, কপালভাতি পনেরো মিনিট, অনুলোম বিলোম দশ মিনিট, চার নম্বর প্রাণায়াম অর্থাৎ কিনা......এই পর্যন্ত শুনেই আমি চেঁচিয়ে বললাম, “দাঁড়ান দাঁড়ান, আমার সকাল তো মোটে তিরিশ মিনিটের, এত সব করব যদি, তো মর্নিং ওয়াক-এই বা যাব কখন, মুখে পেঁপের রসই বা মাখব কখন, আর একফাঁকে টুক করে বারোখানা ই মেল অ্যাকাউন্টই বা চেক করব কখন!”

হিতৈষী বললেন, “কেন ওই যে বললাম, প্রাণায়াম?”

ওজন কমাবে প্রাণায়াম? আলবাত। গ্লোয়িং স্কিন? কেন অনুলোম বিলোম করলে যে? সমতল ভুঁড়ি? আরে কপালভাতি আছে কী করতে?

মন ভার, অখিদে, হুট বলতে মাথাগরম? প্রাণায়াম প্রাণায়াম প্রাণায়াম।

অবিশ্বাসী মুখ গোঁজ করে বসে থাকি আমি। হঠাৎ খেয়াল হতে ভয়ানক খুশি হয়ে প্রায় চেচিঁয়ে উঠি, “আমার যে মাঝে মাঝেই ঠাণ্ডায় গলা বন্ধ হয়ে যায়, সেটার কী হবে? আর আজকাল যে একটার বেশি দুটো বিস্কুট খেলে বুক জ্বালা করে আর সিঁথি ভুল হলে মাথার এধারে ওধারে ইতিউতি সাদা দেখা যায় সেগুলোরই বা কী?”

হিতৈষী প্রবল অনুকম্পার দৃষ্টি হানেন আমার দিকে। বলেন, “হুম, গলার জন্য সকালে উঠে এক কাপ গরম জলে মধু আর লেবু চেষ্টা করে দেখতে পার। চুল পাকার জন্য অব্যর্থ শীর্ষাসন, নয়ত প্রত্যহ সকালে একটি করে আমলকি।”

শেষ দুটোর কোনটাই সম্ভব না শুনে মুষড়ে পড়েন তিনি। অবশ্য তাঁর থেকেও বেশি মুহ্যমান হয়ে বসে থাকি আমি। একা প্রাণায়ামে রক্ষে নেই তায় লেবু গরম জল দোসর। আমার এমন সুন্দর ইউটিউব মণ্ডিত সকালগুলোর এমন অপচয় দেখে।

অন্যমনস্ক হয়ে হিতৈষী বলতে থাকেন, “অম্বলের কথা কী যেন বলছিলে?” আমি রেগে গিয়ে বলি, “হোক গে অম্বল। আর কিছু করতে পারব না আমি ঘুমচোখে।” কান না দিয়ে তিনি বলতে থাকেন, “সকালে উঠেই যদি বড় বড় দু'গ্লাস জল ঢকঢক করে খেতে পার...”, এই পর্যন্ত শুনে আমি কান খাড়া করি, এইটা শুনতে মন্দ লাগছে না, “...তারপর মুখ চেপে ধরে নাক আর কান দিয়ে সেই জল...”

আমি দুহাতে কান চেপে ছিটকে উঠে পড়ি।

চকচকে ত্বক আর কুচকুচে চুল আর অম্বলবিহীন বেঁচে থাকতে হলে আমার এখন ভস্ত্রিকা প্র্যাকটিস করা উচিত ছিল। কিংবা এক ইন্দ্রিয় দিয়ে জল টেনে আরেক ইন্দ্রিয় দিয়ে ছাড়া। বুঝতেই পারছেন, ভাল কথা কানে ঢোকে না আমার। বদলে আমি এই ফাজিল পোস্ট লিখতে বসেছি। তবে আজ এই পর্যন্তই, কারণ বেরনোর আগে রিয়্যাল হাউসওয়াইভস-এর শেষটুকু দেখে যাব ঠিক করেছি।

এই দিয়ে যতটুকু ভাল থাকা যায়, ততটুকুতেই চলবে আমার। অন্তত এ বছরে।


Comments

  1. ভাল থাকা তো ভেতরের জিনিস, কপালভাতি করে ভালো থাকবি কিভাবে? আর ভস্ত্রা জানি, ভস্ত্রিকা আবার কি?

    ReplyDelete
    Replies
    1. দাদা এটা ভস্ত্রিকা

      Delete
  2. এ বছর কি বলছেন মশাই, আমার তো এ জীবনে মুখ দিয়ে জল খেয়ে কান দিয়ে বার করবার প্রয়োজন হবে বলে মনে হয়না| তাতে যেটুকু ভালো থাকা যায় সেটুকুই তো যথেষ্ট হওয়া উচিত| তাছাড়া আমি বিষম খেয়ে নাক দিয়ে জল বার করে দেখেছি, যে অনুভূতি টা হয়, সেটা কে আর যাই বলুন, "ভালো থাকা" বলা চলেনা|

    ReplyDelete
  3. ei konkone thandaye ami sob rokomer shwash felte raji achi, kintu ghumer ghore. jotokhon bolo, ami furfur kore naak deke, mane oi ar ki, chaliye jabo. but saat sokale uthe pranayam, jommeo na. aar amar mathar eto chul i peke gyache, je puro baganer amloki kheleo tate kichu asbe jabe na.

    ReplyDelete

Post a Comment