October 28, 2015

হাঁটা মানে বাঁচা






Walking is man's best medicine. -Hippocrates

Meandering leads to perfection. -Lao Tzu

All truly great thoughts are conceived while walking. - Friedrich Nietzsche

 If I could not walk far and fast, I think I should just explode and perish. - Charles Dickens

Every walk is a sort of crusade. -Henry David Thoreau

My father considered a walk among the mountains as the equivalent of churchgoing. - Aldous Huxley

I understood at a very early age that in nature, I felt everything I should feel in church but never did. Walking in the woods, I felt in touch with the universe and with the spirit of the universe. -Alice Walker

When you have worn out your shoes, the strength of the shoe leather has passed into the fiber of your body. I measure your health by the number of shoes and hats and clothes you have worn out. -Ralph Waldo Emerson

The best remedy for a short temper is a long walk. -Jacqueline Schiff

Above all, do not lose your desire to walk. Every day I walk myself into a state of well-being and walk away from every illness. I have walked myself into my best thoughts, and I know of no thought so burdensome that one cannot walk away from it. -Søren Kierkegaard


October 23, 2015

পুজো ২০১৫



জে ব্লকের ঠাকুর

এক নম্বর থেকে দুনম্বর মার্কেটের দিকে আসা রাস্তাটা ধরে হেঁটে হেঁটে আসছি পঞ্চমীর সকালে, দেখি উল্টোদিক থেকে লরি চেপে দুর্গাঠাকুর আসছেন।  প্রথম লরিটায় দশ হাত বিছিয়ে মা, পরের লরিটায় গাদাগাদি করে ছেলেমেয়েরা। বছরের প্রথম ঠাকুরটা দেখা হয়ে গেল।

অর্চিষ্মান বলল, দেখা হল কোথায়, মুখে আনন্দবাজার চাপা দিয়ে রেখেছিল তো?

তাতে কী? মুখ ঢাকা ছিল কিন্তু দশ হাত, জরি বসানো লালরঙের শাড়ি, মুকুট, মুকুটের পেছনে পরচুলার আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়া মাটির পুতুলের মাথা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল তো। ছোটবেলায় এর থেকে ঢের কম জিনিস দেখে, যেমন প্যান্ডেলের চুড়ো কিংবা টিউবলাইট, আমরাদেখাঠাকুরের গুনতি বাড়িয়ে নিতাম, তার সঙ্গে তুলনা করলে এ ঠাকুর শুধু দেখেছি নয়, এর সঙ্গে রীতিমত হ্যান্ডশেক করেছি বলা যেতে পারে।

পঞ্চমীতে বেরোনোর ইচ্ছে ছিল না, আফটার অল পুজো শুরু ষষ্ঠী থেকে, কিন্তু সারাদিন ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে সন্ধ্যে নাগাদ দুজনেরই মাথা ঘুরে উঠল। বললাম, চল একটু হেঁটে আসা যাক। ঝটপট জিনস জামা গলিয়ে যেই না বাড়ির পেছনের অন্ধকার গলিটুকু পেরিয়েছি, চিত্ত চমৎকার। পুজো শুধু শুরু হয়ে যায়নি, মনে হচ্ছে অষ্টমীর সন্ধ্যে। আমাদের রিষড়ার পাড়ার পুজো প্যান্ডেলে অষ্টমীর রাতেও এত ভিড় হয় না, যদি না প্রদীপ জ্বালানো প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

ভিড়ের মজাটা হচ্ছে, দেখলেই সামিল হতে ইচ্ছে করে। তাই ভয়ানক আন্ডারড্রেসড হওয়া সত্ত্বেও আমরা ভাবলাম প্যান্ডেলগুলো ঘুরে দেখা যাক। যারা সেজেছে তারা সব নিজেদের দেখতেই ব্যস্ত, আমাদের দেখবে না। এই বলে পাড়ার ঠাকুর দিয়ে শুরু করে আমরা গেলাম মেলা গ্রাউন্ড, কালীবাড়ি, জে-ব্লক, নবপল্লী।

বলার মতো বিশেষ কিছু ঘটেনি সেদিন, বেশিরভাগ প্যান্ডেলেই ঠাকুরের মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। কালীবাড়িতে পৌঁছে দেখি খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে কালীঠাকুরের সন্ধ্যারতি চলছে। জুতো খুলে মন্দিরে উঠে একটা ফাঁকা বেঞ্চি দেখে বসলাম। লোক হয়েছে বিস্তর। তার মধ্যে গুটিকয়েক বিদেশী মহিলাপুরুষও রয়েছেন। কেউ কেউ ভয়ানক ভক্তিভরে বার বার হাত জোড় করে মাথায় ঠেকাচ্ছেন, পঞ্চপ্রদীপের আগুনের শিখার আঁচ নিয়ে চুলে মাখাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ রুমাল দিয়ে মুখ মোছার ভঙ্গি করে হাই লুকোচ্ছেন, ভাবছেন এই হল্লাগোল্লা থামলে বাঁচি।

বাড়ি এসে মাকে ফোন করে এসবের বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়ার পর মা জিজ্ঞাসা করলেন, এবার আসল কথাটা বল দেখি? কী অখাদ্যকুখাদ্য খেলি? নির্ঘাত ওই নোংরা জল আর না-ধোয়া হাত দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধওয়ালা ফুচকা সাঁটিয়েছিস? পাশে খোলা নর্দমা ছিল?  

উঁহু, আরও খারাপ জিনিস।

কাটা তেলে ভাজা আর কুমড়োর সস দেওয়া এগরোল?  

আরও খারাপ।

অ্যাঁ! ওই যে কবেকার ছোলাসেদ্ধ আর ন্যাতানো বাতাসা দিয়ে চাট বানায় তাই? ছ্যা ছ্যা।

আরও খারাপ।

মা আতংকিত হয়ে আন্দাজের খেলা থামালেন।  

কী?

ওই যে হাত দিয়ে বরফ চেপে চেপে একটা কাঠির চারদিকে বরফগুঁড়ো চেপে চেপে একটা কুলফির মতো দেখতে জিনিস বানায়, তারপর একটা প্লাস্টিকের গ্লাসে খানিকটা সিরাপ ঢেলে সেটার ভেতর জিনিসটাকে চুবিয়ে হাতে দিয়ে বলে, থাট্টি রুপিস প্লিস, যেটাকে কেউ বলে চুসকি, কেউ বলে গোলা, সেটা খেলাম।

রামো রামো।

আমরা কালা খাট্টা ফ্লেভারের সিরাপ নিয়েছিলাম তো, আমাদের দুজনের দাঁত আর ঠোঁটই এখন ঘোর বেগুনিবর্ণ ধারণ করেছে। মচৎকার দেখাচ্ছে।

মা বললেন, আমি আর শুনতে চাই না, এক্ষুনি দুজনে দুই দুই চারচামচ কারমোজাইম খেয়ে শুয়ে পড়। আর ভগবানকে ডাকো যেন শরীর খারাপ না করে।

আমি বললাম, যা ভালো খেতে না মা, নেক্সট বার তুমি যখন আসবে তোমাকেও খাওয়াব।

ষষ্ঠী

বাড়ি - অফিস - বাড়ি। একবার লাঞ্চে বেরিয়ে ফ্যাব ইন্ডিয়ার দোকানে গিয়ে লাস্ট মোমেন্টের পুজোর বাজার। ব্যস। ষষ্ঠী ফুরিয়ে গেল।

মেলা গ্রাউন্ড

সপ্তমী

অফিসে আজ এথনিক ড্রেস ডে। শাড়িটাড়ি পরে গিয়ে, ছবিটবি তুলে, খানিকটা কাজের ভঙ্গি করে দুপুরবেলা সবাই মিলে খেতে যাওয়া হল। ফ্রায়েড রাইস, নুডলস, চিকেন, ল্যাম্ব, পর্ক ইত্যাদি গাদাগুচ্ছের জিনিস খাওয়া হল। তবে সবথেকে মনে ধরল ওয়াসাবি প্রন। ওয়াসাবি ব্যাপারটা আমার খুব পছন্দের। মুখে দিয়ে প্রথমে, “এঃ, এ আবার এমন কী ঝাল, এর থেকে আমাদের ধানি লংকা . . .” বলতে না বলতেই যে একখানা ঝাঁঝ গলা বেয়ে মাথার পেছনদিকে গেরিলা অ্যাটাক করে, এই ব্যাপারটা আমার দারুণ লাগে।

সন্ধ্যেবেলা বেরোনো হল। স, , , আমি আর অর্চিষ্মান। ভিড় তখন জমে উঠেছে। শুনেছিলাম বি ব্লকের ঠাকুর নাকি দারুণ হয়েছে। ওদিকেই যাওয়া হল। যাওয়ার পথে দুদুখানা বাড়ির ঠাকুরও দেখলাম। ঘুরতে ঘুরতে যেটা পরিষ্কার হয়ে গেল, সি আর পার্কের ব্লকবাস্টার ঠাকুরগুলো, বিশেষ করে যারা অ্যাওয়ার্ড উইনিং হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট ক্লিনিক-এর মতো রাঘববোয়াল স্পনসর জবাই করেছে, সেগুলোতে ঢুকতে গেলে লাইনে দাঁড়াতে হবে।  কালীবাড়ি আর মেলা গ্রাউন্ডের ক্ষেত্রে দাঁড়ানোটা আধঘণ্টারও হতে পারে। গণভোট নেওয়া হল। লাইনে দাঁড়িয়ে ঠাকুর দেখতে চাও নাকি এয়ারকন্ডিশনড রেস্টোর‍্যান্টে বসে ডিনার খেতে খেতে গল্প করতে চাও? পাঁচ শূন্য ভোটে দ্বিতীয় প্রস্তাব পাশ হয়ে গেল। ঠাকুর দেখার জন্যই ওই লাইন, বাঙালি খাবার দোকানগুলোর সামনে কী ঘটছে সেটা আমাদের সবারই আন্দাজ ছিল। কাজেই আবার চাইনিজ।

দোকানে বসে ইম্পেরিয়াল ফ্রায়েড রাইস, সেজুয়ান চিলি গারলিক নুডলস, পর্ক উইথ মাশরুম, চিলি ফিশ, চিলি পেপার চিকেন, ল্যাম্ব ইন অয়েস্টার সস দিয়ে খেতে খেতে গল্প হল। অফিসের ছুটির হিসেবের গল্প, পুরোনো বন্ধুদের গল্প, পুরোনো শত্রুদের গল্প।  

গল্প সেরে বেরিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে শ বলল, ছোটবেলায় পুজো দেখে বাড়ি ফেরার সময় কেমন লাগত মনে আছে?  ক্লান্তি, উত্তেজনা মিলিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হত? ক্লান্তির অনুভূতিটা এখনও হয়, তবে উত্তেজনাটা কমে গেছে অনেক। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি গলি এসে গেল, টা টা বলে ঢুকে পড়লাম।

পুজোর বেস্ট দিনটা ফুরিয়ে গেল।

কালীবাড়ি

অষ্টমী

ছুটি নেব নেব ভাবতে ভাবতে আর নেওয়া হল না। সন্ধ্যেবেলা গাজিয়াবাদ থেকে শ এল। গল্প হল বেশ খানিকক্ষণ। যাদের সঙ্গে বেশিরভাগ মতই মেলে, তাদের সঙ্গে গল্প করে সুখ আছে। গল্পটল্প করে খাবারের সন্ধানে বেরোলাম।  হঠাৎ অ্যাডভেঞ্চারাস হতে ইচ্ছে করল খুব, চলে গেলাম অলকনন্দার সিটি অফ জয়-এ। মাদুর্গা সহায় ছিলেন, যাওয়া মাত্র জায়গা পেয়ে গেলাম। আমদের থেকে দশ মিনিট দেরিতে যারা পৌছেছিলেন তাদের সব আধঘণ্টা করে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। পোস্ত নারকেলের বড়া, সোনা মুগ ডাল, ঝুরি আলু ভাজা আর কষা মাংস দিয়ে ভাত খেতে খেতেই পেট ভরে গেল, মিষ্টি দইয়ের আর জায়গা রইল না। ফেরার পথে দেখলাম সি আর পার্কের রাস্তার পিচ দেখা যাচ্ছে না, যেদিকে তাকাও শুধু মাথা, আর ভেঁপুর চিৎকার আর ধাক্কাধাক্কি। সে এক ভয়ানক কাণ্ড। কোনওমতে দৌড়ে বাড়ি এসে বাঁচলাম।

বি ব্লক

নবমীদশমী

দশেরার ছুটি, তাই ছুটির দিনের মতো করেই কাটালাম সকালটা। কাপ তিনেক চা, বাকিটা সময় বিছানায় গড়াতে গড়াতে টিভি দেখা। এগারোটা নাগাদ উঠে স্নান করে বেরিয়ে পড়লাম। আমরা যাব কাশ্মীরী গেট। উনিশশো দশ সালে শুরু হওয়া দিল্লির সবথেকে পুরোনো দুর্গাপুজো হয় ওখানে।
আমাদের দুজনেরই খুব ভালো লাগল কাশ্মীরী গেটের পুজো। সি আর পার্কের পুজোর হাঁসফাঁসানি এক্কেবারে নেই। সে জায়গায় প্যান্ডেল জুড়ে একটা শান্ত, প্রসন্ন, পাড়া পাড়া ভাব। ইচ্ছে করে চেয়ার টেনে খানিকক্ষণ বসি। আমরা অবশ্য বসিনি, দাঁড়িয়েই ছিলাম। মঞ্চে শাঁখ বাজানো প্রতিযোগিতা হচ্ছিল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। আমরা থাকতে থাকতেই আঠাশ সেকেন্ড টানা শাঁখ বাজিয়ে ফার্স্ট হলেন একজন।

কাশ্মীরী গেট

খিদে পেয়েছিল খুব। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম আনন্দলোকে গার্গী কলেজের উল্টোদিকে ইটালিয়ান খেতে যাব, কিন্তু তারপর মনে পড়ল এটা দিল্লি ইউনিভার্সিটির পাড়া। এখানে খাবার দোকানের অভাব হবে না। জোম্যাটো খুলতেই সন্দেহ সত্যি প্রমাণিত হল। জি টি বি নগরে লাইন দিয়ে নানারকম ক্যাফে, রেস্টোর‍্যান্ট। আমাদের পছন্দ হল বিগ ইয়েলো ডোর। আমরা যখন গেলাম তখন বসার জায়গা ছিল না। আমরা দোকানের বাইরের রংচঙে বেঞ্চিতে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। খানিকক্ষণ পর ডাক পড়ল। আমরা খেলাম গ্রিক চিকেন স্যালাড, বোলোনিজ পাস্তা। বেরিয়ে জি টি বি নগর মেট্রোর দিকে হাঁটতে হাঁটতে বাঁদিকে চোখে পড়ল থাংকো ন্যাচারাল আইসক্রিমের দোকান। সেখান থেকে এক স্কুপ টেন্ডার কোকোনাট (অর্চিষ্মানের জন্য) আর এক স্কুপ কেসর পিস্তা (আমার জন্য) কিনে নেওয়া হল।


বাড়ি যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের শরীরে আর একবিন্দু শক্তি অবশিষ্ট নেই। শুধু সেদিন নয়, এবারের পুজোয় যতবার বেরিয়েছি, ততবারই বাড়ি ফিরে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অনুভূতিটা হয়েছে। আর মনে পড়েছে এই আমিই একদিন কলেজ স্ট্রিট থেকে শুরু করে কুমারটুলি পর্যন্ত দুপুররোদে হেঁটে হেঁটে ঠাকুর দেখেছি। হয় তখন আমি পাগল ছিলাম, নয় এখন আমি বুড়ো হয়েছি।

ধড়াচুড়ো ছেড়ে বিছানায় গা ঢালা মাত্র ঘুম। ঘণ্টাদেড়েক পর চোখ খুলে মনে হল কপালের দুপাশটা সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে কেউ। চা বানিয়ে নিয়ে এসে বসলাম। বাইরে অন্ধকার আর ছাতিমের গন্ধ ঘন হয়ে এসেছিল। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিতে থাকলাম।  

অর্চিষ্মান বলল, তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে যথেষ্ট মজা হল না, তার আগেই সব ফুরিয়ে গেল।

আমি বললাম, কই না, হল তো। কত ঘুরলাম, কত খেলাম, কত মজা করলাম।

কিন্তু অর্চিষ্মান কি না আমার সোলমেট, মুখের কথা আর মনের কথার তফাৎ ধরতে পারে। বলল, উহু তা তো মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে কিছু একটা বাকি রয়ে গেছে।

আমি বললাম, কালীবাড়ির প্যান্ডেলে নাগরদোলা এসেছিল দেখেছিলাম, সেটা চড়া হল না।

অর্চিষ্মান সান্ত্বনা দিয়ে বলল, চিন্তা কোর না, সামনের বছর আবার আসবে, তখন চোড়ো। আমি মনে করিয়ে দেবখন।

তা বটে। আফসোসের কিছু নেই, সামনের বছর এ সবই আবার হবে। যা হল না, যা হল, সব। সি আর পার্কের রাস্তায় আরও বেশি ভিড় হবে, নবপল্লীর মাঠে একজন বাঙালি একজন বাঙালিকে আরেকজন বাঙালির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলবেন, “ইনি হলেন মিসেস বিসওয়াস”, হাতে বুড়ির চুল চোখে সানগ্লাস মুখে ভেঁপু নিয়ে বেছে বেছে ফুটপাথে লাল ইঁটে পা ফেলে ফেলে হাঁটবে অন্যমনস্ক ছেলে, ছেলের পেছনে ফুটপাথে জ্যাম ক্রমশ বাড়বে, সে জ্যাম ঠেলে ঠাকুর দেখার ধৈর্য আমার থাকবে কি না কে জানে, নাগরদোলা তো দূরের কথা।  

আপনাদের সবাইকে আমার অনেক প্রীতি, অনেক শুভেচ্ছা, অনেক ভালোলাগা, অনেক ভালোবাসা, অনেক কোলাকুলি জানালাম। শুভ বিজয়া।


মেলা গ্রাউন্ড


October 17, 2015

সাপ্তাহিকী



এ রকম আরও 'বিগার পিকচার' দেখতে হলে ক্লিক করুন।

I think I can sum up my religious feelings in a couple of paragraphs. First: I believe in you and me. I'm like Albert Schweitzer and Bertrand Russell and Albert Einstein in that I have a respect for life -- in any form. I believe in nature, in the birds, the sea, the sky, in everything I can see or that there is real evidence for. If these things are what you mean by God, then I believe in God. But I don't believe in a personal God to whom I look for comfort or for a natural on the next roll of the dice. I'm not unmindful of man's seeming need for faith; I'm for anything that gets you through the night, be it prayer, tranquilizers or a bottle of Jack Daniel's. But to me religion is a deeply personal thing in which man and God go it alone together, without the witch doctor in the middle. The witch doctor tries to convince us that we have to ask God for help, to spell out to him what we need, even to bribe him with prayer or cash on the line. Well, I believe that God knows what each of us wants and needs. It's not necessary for us to make it to church on Sunday to reach Him. You can find Him anyplace.
             --- উনিশশো তেষট্টিতে প্লেবয়-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফ্রাংক সিনাত্রা


শিশুর ব্রেনের সাইজের পেছনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর কী বলুন তো? পুষ্টি, পরিবেশ এ সব জানা ব্যাপার তো বটেই। কিন্তু একটা অজানা ফ্যাক্টরও আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। মায়ের ভালোবাসা। আপনি কত বুদ্ধিমান হবেন তা নির্ভর করে আপনার মা আপনাকে কত ভালোবসেন তার ওপর। বিশ্বাস না হলে পড়ে নিন।

অমরনাথ ঘুরে আসুন, সিডনির অপেরা হাউসে অপেরা শুনে আসুন, কিলিমাঞ্জারোর চাঁদের পাহাড়ের মথায় জোৎস্নাধোয়া বরফের টুপি দেখে আসুন আর পারলে এইবেলা একটু ভালো জাতের কোকেনও চেখে আসুন, কারণ এ সব জিনিস আর বেশিদিন থাকবে না।

অ্যাকটিভ ভালো, প্যাসিভ মন্দ না, ডেঞ্জারাস হচ্ছে প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভ।







চাতকের কাছে বৃষ্টি যেমন, অম্বলে ভোগা রোগীর কাছে জেলুসিল যেমন, আমার কাছে এই খবরটাও তেমনি।

এই ভালো খবরটা উদযাপন করতে একটা আনন্দের গান শোনা যাক এ সপ্তাহে।


October 15, 2015

Calvinism






People always make the mistake of thinking art is created for them. But really, art is a private language for sophisticates to congratulate themselves on their superiority to the rest of the world.

I wondered, is it better to do the right thing and fail...or is it better to do the wrong thing and succeed? On the one hand, undeserved success gives no satisfaction...but on the other hand, well-deserved failure gives no satisfaction either.

Sometimes I think the surest sign that intelligent life exists elsewhere in the universe is that none of it has tried to contact us.

We should take pride in our mediocrity.

I find my life is a lot easier the lower I keep my expectations.

That's one of the remarkable things about life. It's never so bad that it can't get worse.

There's no problem so awful, that you can't add some guilt to it and make it even worse.

Hobbes: Do you think there's a God?
Calvin: Well, somebody's out to get me!

Did you ever wonder if the person in the puddle is real, and you're just a reflection of him?

They say the secret of success is being at the right place at the right time, but since you never know when the right time is going to be, I figure the trick is to find the right place and just hang around.

The problem about the future is that it keeps turning into the present.

All this modern technology just makes people try to do everything at once.

People who get nostalgic about childhood were obviously never children.

The more you know, the harder it is to take decisive action. Once you are informed, you start seeing complexities and shades of gray. You realize nothing is as clear as it first appears. Ultimately, knowledge is paralyzing. 

Know what's weird? Day by day, nothing seems to change. But pretty soon, everything's different.

Life is like topography, Hobbes. There are summits of happiness and success, flat stretches of boring routine, and valleys of frustration and failure.



October 13, 2015

ক্যাফে লোটা



দিল্লির মতো জায়গায় যদি কোনও খাবার দোকানে একবার নয়, দুবার নয়, তিনতিনবার যাওয়া হয়, তাহলে বুঝতে হবে সে দোকানের মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। ব্যাপারওয়ালা দোকান, ব্যাপারওয়ালা মানুষের মতোই বিরল। এতদিনে এত রেস্টোর‍্যান্ট চাখার পর সে রকম গোটা পাঁচেকের সন্ধান পেয়েছি আমরা। তার মধ্যে প্রথমেই থাকবে জনপথের সারাভানা ভবন। সারাভানা ভবনের মেদু বড়া আর ফিল্টার কফি আমার পছন্দের আর অর্চিষ্মানের পছন্দের হল দোকানটারযখনই-যাও-তখনই-গমগম-করার চরিত্রটা। সারাভানা ভবনে আমরা শখানেক বার গেছি, আরও হাজার বার যাব। আরও যে ঘন ঘন যাওয়া হয় না তার কারণ আমাদের বাড়ি থেকে দোকানটার দূরত্ব। একশো টাকা অটো ভাড়া দিয়ে সত্তর টাকার ফিল্টার কফি যেতে গা করকর করে। আমাদের বাড়ির পাশে গ্রেটার কৈলাস মেট্রো স্টেশনের কাজ হইহই করে চলছে, হয়ে গেলেই আমরা আরও ঘনঘন সারাভানা ভবন যাব। যতদিন তা না হচ্ছে ততদিন আমাদের পাশের পাড়ারনৈবেদ্যম’-এ কাজ চালিয়ে নিতে হবে। নৈবেদ্যম-এর বাটারমিল্কের জবাব নেই। তাছাড়া আমি যে ছমাস অর্চিষ্মানকে রেখে ভাগলবা হয়েছিলাম তখন ও শনিরবিবার সকালবেলানৈবেদ্যম’-এ গিয়ে উত্থাপাম আর কফি খেতে খেতে গল্পের বই পড়ত। সে কথা শোনার পর থেকেনৈবেদ্যম’-এর প্রতি আমি সদয়।

আমাদের রিপিট করা দোকানের তিন নম্বরটা হচ্ছেস্বাগতস্বাগত’-এ উত্তরী, দক্ষিণী, চাইনিজ নানারকম খাবার পাওয়া যায়, তবে আমরা যাই দক্ষিণী খাবার খেতে। এ ছাড়া আর যে দুটো দোকানে আমরা একাধিকবার গেছি তার একটা হচ্ছে খান মার্কেটেরসোডাবটলওপেনারওয়ালাআর অন্যটা গ্রেটার কৈলাসে টু-এর এম ব্লক মার্কেটেরইয়েতিপ্রথমটা পার্সি (কেউ কেউ বলে ওটা যত না পার্সি তার থেকে বেশি ইরানি) খাবারের দোকান, দ্বিতীয়টা হিমালয়ান কুইজিনের। নেপাল, তিব্বত, ভুটান অর্থাৎ ইত্যাদি নানা হিমালয়ান অঞ্চলের খাবার পাওয়া যায়ইয়েতিতে। একবার খেলে সারাজীবন মনে রাখার মতো খাবার। পরে একদিন অবান্তরে সে দোকানের গল্প লিখব।

আর যে দোকানটায় আমরা আগেও গেছি, পরেও যাব, সে দোকানটার নামক্যাফে লোটাআমি অনেকদিন ভাবতাম এ লোটা কোন লোটা, তারপর দোকানে ঢোকার মুখের আল্পনা দেখে বুঝলাম এ লোটা লোটাকম্বলের লোটাই বটে।


দোকানের নামও অন্যরকম, খাবারও অন্যরকম, অবস্থানও অন্যরকম। ভৈঁরো মার্গে ন্যাশনাল ক্রাফটস মিউজিয়াম, সে মিউজিয়ামের বারান্দায় এই ক্যাফে লোটা। আপনি যদি একঢিলে দুই পাখি মারতে চান তবে মিউজিয়াম ঘুরে ক্যাফে লোটায় খেয়ে ফিরতে পারেন। ইন ফ্যাক্ট, এক ঢিলে তিন পাখি মারাও সম্ভব। কারণ রাস্তার ওপারেই শেরশাহের তৈরি পুরানি কেল্লা। মহাকাব্যের ইন্দ্রপ্রস্থ। পুরানি কেল্লার পাশেই দিল্লির চিড়িয়াখানা, চিড়িয়াখানার পাশেই সুন্দরনগর, সেই সুন্দরনগরেই কপিলদেবের বাড়ি, যে বাড়িতে করণ থাপার সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। কাজেই বুঝতে পারছেন শুধু খেতে অতদূর ঠেঙিয়ে যেতে যদি কারও আপত্তি থাকে তাহলে তার ওপাড়ায় যাওয়ার অজুহাতের অভাব নেই। আমরা অবশ্য যতবার গেছি শুধু খেতেই গেছি। একবার শুধু বসার জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না বলে দোকানের লাগোয়া মিউজিয়াম শপে ঢুকেছিলাম। ঢুকে মনে হল যা দেখছি সব কিনে ফেলি। মধ্যপ্রদেশের পাথরের কুঁদে বানানো নিখুঁত নটরাজ, কাশ্মীরের কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরি রঙিন পুতুল, ওডিশার তালপাতার ক্যালেন্ডার, পশ্চিমবঙ্গের পটচিত্র। তাছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের তৈরি চামড়ার ছোট ছোট হাতি, গণ্ডার, শুয়োরছানাও ছিল, তাদের উল্টো করে ধরলেই দেখা যাবে চারটের মধ্যে যে কোনও একটা পায়ের পাতায় টিপ বোতাম লাগানো, সে বোতাম খুলে আপনি তাদের পেটের মধ্যে খুচরো পয়সা জমাতে পারেন।

কিনব বলে একরকম মন ঠিক করেই ফেলেছিলাম, তারপর শুভবুদ্ধির উদয় হল। মনে পড়ল শুধু কিনলেই হবে না, ঘর সাজালেই হবে না, সে সজ্জাদ্রব্যের ধুলোও ঝাড়তে হবে। এই রঙিন হাতি যা এখন নিরীহ মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কালে কালে তার ধবল দাঁত মলিন হবে। তারপর আমাকে ঝাড়ন হাতে তাদের পেছনে লেগে থাকতে হবে। ভাবতেই গায়ে কম্প দিয়ে জ্বর এল। আমি তাড়াতাড়ি হাতিকে যথাস্থানে নামিয়ে রেখে সরে এলাম। এসে দেখি অর্চিষ্মান একটা শেলফের পাশে দাঁড়িয়ে খুব মন দিয়ে কী সব দেখছে। দেখি সেখানে সব কাঠের জিনিসপত্র। বাহারি বাক্স, হাতাখুন্তি, পেনদানি। আমাদের দুজনেরই একটা সাবানদানি দারুণ পছন্দ হল। কাজের জিনিস। তাছাড়া কেরালা থেকে তিলক মামা আর সুমিতা মামি ঝিনুকের মতো বাক্সে পোরা সাবান এনে দিয়েছে, তার চন্দনের গন্ধে মন ভালো হয়ে যায়। প্লাস্টিকের সাবানখোপে তাকে রাখা মানে ঘোর অপমান করা। কিনে নিলাম। খাওয়া সেরে অটো চেপে ফিরতে ফিরতে আরেকবার সাবানদানিটা বার করে দেখতে গিয়ে দেখি পেছনদিকে একটা ছোট্ট কুচি স্টিকারে লেখা আছেমেড ইন ক্যালকাটা

যাই হোক, মিউজিয়াম শপের কথা ছেড়ে এবার ক্যাফে লোটার কথায় আসি। ক্যাফে লোটা একটি ফিউশন রেস্টোর‍্যান্ট। প্রথম যখন ক্যাফে লোটার প্রশংসা শুনি তখন সঙ্গে সঙ্গে এই শব্দটিও কানে আসে এবং সত্যি কথা বলতে কি আমি একটু নিরুৎসাহই হয়ে পড়ি। বক কিংবা কচ্ছপ, বকচ্ছপের থেকে দুটোই আমি বেশি পছন্দ করি। শুনতে হলে আমি হয় ক্ল্যাসিকাল শুনি, নয় ফোক, নয় রক, কোক স্টুডিও শুনি না। অর্চিষ্মান অবশ্য আমার মতো খুঁতখুঁতে আর খিটখিটে নয়, অনেক বেশি উদার আর মনখোলা।আহা, ট্রাই করে দেখাই যাক নাএই হচ্ছে ওর জীবনের মোটো। একরকম ওর তাড়াতেই অতিষ্ঠ হয়ে আমি ক্যাফে লোটায় প্রথমবার যেতে নিমরাজি হই এবং গিয়েই পত্রপাঠ প্রেমে পড়ে যাই।

গুজরাটের ধোকলা, পণ্ডিচেরির মাছের ঝোল, আসামের কালো চিকেন, কুমায়ুনের রায়তা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের খাবারদাবার জড়ো করে গড়ে উঠেছে ক্যাফে লোটার মেনু। রকমারি উপকরণ আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি জিভে চট করে যাদের স্বাদ মেলে না সে সব ভরপুর রয়েছে মেনুতে। রাগির রুটি, পদ্মডাঁটার রায়তা, কাঁঠালের বিরিয়ানি, খেজুরের পুর ভরা মিষ্টি সামোসা। কখনও কখনও পদের থেকে প্রাধান্য পেয়েছে কোনও একটি স্পেশাল উপকরণ বা মশলা। পাঁচফোড়ন দেওয়া খিচুড়ি, কাঁচা আম দেওয়া চিংড়ি মাছ। তাছাড়া সর্বভারতীয় নস্ট্যালজিয়া যা নির্দিষ্ট কোনও প্রদেশের সম্পত্তি নয়, সে সবও রয়েছে। ডাকবাংলো মাটন, রেলওয়ে চিকেন। সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে প্রতিটি রান্নাই (গত তিনবারে আমরা দুজনে মিলে যা যা খেয়েছি) রাঁধা হয়েছে একই রকমের সাবলীলতায়।

প্রথমবার যখন গিয়েছিলাম তখন ক্যামেরা সঙ্গে ছিল না। দ্বিতীয় আর তৃতীয়বার ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলাম, তার ছবিসহ প্রমাণ রইল এই আপনাদের জন্য।

ক্যাফে লোটা, ব্রেকফাস্ট, জুলাই ২০১৫


ক্যাফে লোটার ব্রেকফাস্ট মেনু অভিনব। বিলিতি ধাঁচের দই মুয়েসলি, মাখনটোস্ট যেমন আছে, তেমনি আছে রাগি প্যানকেক, লংকার চাটনির সঙ্গে সাবুদানার বড়া, বম্বে স্টাইল এগ ভুরজি, রেলওয়ে স্টাইল মসালা এগ পাও। শেষের পদটার ওপর খানিকক্ষণ তর্জনী বুলিয়ে আমি শেষমেশ কান্দা বাটাটা পোহা-য় গিয়ে থামলাম। চিঁড়ের পোলাওয়ের প্রতি আমার দুর্বলতা চিরদিনের। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে খাবারটা কমই হত। অন্তত কখনও মনে পড়ে না খেয়েছি বলে। তারপর একদিন পিসির সঙ্গে সেবক সংঘের মাঠে বিকেলে বেড়াতে গিয়ে পিসির এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মাঠের ধারেই তাঁর বাড়ি। তিনি আমাদের জোর করে বাড়িতে ধরে নিয়ে গিয়ে আদর করে চিঁড়ের পোলাও খেতে দিলেন। চিঁড়ে ব্যাপারটার সঙ্গে আমার তার আগে কেবল দুধের বাটিতেই মোলাকাত হয়েছে, সে চিঁড়েকে আলু আর বাদামভাজা দিয়ে যে এমন স্বর্গীয় রূপান্তর সম্ভব, আমার মগজে সে কথা অবিশ্বাস্য ঠেকেছিল। রান্নাটার নামটাও কী সুন্দর, পোলাও। হলুদের মধ্যে আবার চকচকে মুক্তোর মতো বাদামভাজারা জেগে রয়েছে। তারপর শত শত অখাদ্য চিঁড়ের পোলাওয়ের শিকার হওয়া সত্ত্বেও (তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটা আমার নিজের হাতেই বানানো) চিঁড়ের পোলাওয়ের প্রতি সেই যে আমি অনুগত হয়ে পড়লাম আজও তা থেকে বেরোতে পারিনি।। খটখটে শুকনো গলায় আটকে যাওয়া চিঁড়ের পোলাও, ডেলা পাকানো কাদাকাদা চিঁড়ের পোলাও, বাদাম ছাড়া (বা-দা-ম-ছা-ড়া!) চিঁড়ের পোলাও। তবু এখনও চিঁড়ের পোলাও বলতেই আমার মনে পড়ে একটা বিরাট সবুজ মাঠের পারে লালসাদা ইঁটের ডিজাইন করা দোতলা বাড়ির ডাইনিং রুমের টেবিল। ফ্রয়েড যে বলে গেছেন একজন মানুষের পছন্দঅপছন্দ, বিদ্রোহ আনুগত্য, সবের বীজ রয়েছে তার শৈশবে আর স্বপ্নে, মিধ্যে নয়।

আমি কান্দা বাটাটা পোহা অর্ডার করলাম, অর্চিষ্মান কিমা পরাঠা অর্ডার করে আমার দিকেকেমন দিলামভাব করে তাকাতে লাগল।


এ চিঁড়ের পোলাও শুকনো নয়, ভেজাও নয়, বাদামও এতে আছে বিস্তর।


কিমার পুর ভরা পরোটা তো ভালো ছিলই, তার সঙ্গে সমান ভালো ছিল ঠাণ্ডা রায়তা। আর রায়তার বাটির পাশে সারা গায়ে দানা দানা নুন মাখানো ওই যে কাঁচা লংকাটি উঁকি মারছে, আমার মতে সবথেকে ভালো ছিল ওইটি।

জুলাই মাসের গরমে অটো চেপে চিত্তরঞ্জন পার্ক থেকে দশ কিলোমিটারেরও বেশি রাস্তা যেতে গিয়ে আমাদের দুজনেরই প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল। তাই আমরা খাওয়া শুরু করেছিলাম পুদিনাপাতা দিয়ে সাজানো, জিরেগুঁড়োর সুবাস ছড়ানো ছাস (আমি) আর টকমিষ্টি আম পান্না (অর্চিষ্মান)। খাওয়া শেষ হয়েছিল কাটিং গ্লাসে মসালা চা (আমি) আর ফিল্টার কফি (অর্চিষ্মান) দিয়ে। কিন্তু সে সবের ছবি নেই।

ক্যাফে লোটা, নৈশভোজ, অক্টোবর ২০১৫

আমাদের তিন নম্বর ক্যাফে লোটা অভিযান ঘটল এই শনিবার। একটা সুপ্ত ইচ্ছে ছিল যে এবার সন্ধ্যে নামার একটু আগে গিয়ে শেরশাহের বানানো পুরানি কেল্লাটা একটু ঘুরে দেখব, দেখব ইন্দ্রপ্রস্থ শহরের কোনও চিহ্ন এখনও বাকি আছে কি না, কিন্তু সৎ কাজে শত বাধা। সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতে অটো ভাইসাব আমাদের নিয়ে মথুরা রোডে পড়লেন। আর মথুরা রোডের প্রায় পুরোটা জুড়ে রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে মেরামতির জন্য। সে জ্যামে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম সূর্য আকাশ বেয়ে নামছে। কেল্লা খোলা থাকবে সুরজ ডুবনা তক। তারপর নিজেদেরই বোকামিতে আমরা পুরানি কেল্লার দরজায় না নেমে ভৈঁরো মন্দিরের দরজায় গিয়ে নামলাম, সেখানে বসে থাকা দারওয়ান ভাইসাবরা আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন কোই বাত নেহি, এই রেড লাইট থেকে বাঁ দিক নিয়ে পরের রেড লাইটে গেলেই পুরানি কেল্লার দরজা পেয়ে যাবে। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। প্রথম রেড লাইটে পৌঁছতে পৌঁছতেই দেখলাম রাস্তার ওপারে গাছেদের মাথার ওপর সূর্য লুকিয়ে পড়ল। অগত্যা পুরানি কেল্লাদর্শনের সদিচ্ছায় জল ঢেলে আমরা ক্যাফে লোটায় ঢুকে পড়লাম।

মিউজিয়ামে ঢোকার ঢাকা করিডরের গায়ে শিল্পকর্ম চলছিল। যাঁর পিঠ দেখা যাচ্ছে ছবিতে তিনিই ছবির শিল্পী, ওডিশার অক্ষয়।


বিকেলের চা মিস হয়ে গেছে, কাজেই আমরা ডিনার শুরু করলাম কফি দিয়ে। ক্যাফে লোটা-র মেনুর চা কফির দিকটা কালটিভেট করার মতো। ক্যাপুচিনো, ফ্রাপে, লাটের দৌরাত্মের বদলে ক্যাফে লোটায় রয়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের প্লান্টেশন থেকে বাছাই করে আনা চা কফির সম্ভার। কুর্গ, চিকমাগালুরের প্ল্যান্টেশনের সিংগল এস্টেট কফি, ডিব্রুগড়ের ম্যানকোটা টি এস্টেটের চা। পাছে এক্সপেরিমেন্ট বুমেরাং হয়ে যায় সেই ভয়ে আমি নিলাম গতে বাঁধা সাউথ ইন্ডিয়ান ফিল্টার কফি, সাহসী অর্চিষ্মান নিল কুর্গের বিবি প্লান্টেশনের কফি। আমার ফিল্টার কফিও ভালো ছিল, কিন্তু টেবিলের উল্টোদিকে রাখা অর্চিষ্মানের কফির কাপ থেকে যা সুগন্ধ আসছিল, ঠিক করেছি পরের বার আমিও ওই কফিটাই অর্ডার করব।

ক্যাফে লোটার খাবারের মেনু বেশ অভিনব। অন্যান্য দোকানে যেমন স্টার্টার বা অ্যাপেটাইজার আর মেন ডিশের ভাগাভাগি থাকে, সে জায়গায় ক্যাফে লোটার ভাগাভাগিটা হচ্ছে স্মলার প্লেটস আর লার্জার প্লেটস। নাম আলাদা হলেও কাজ একই, স্মলার প্লেটস খেয়ে আপনি খিদে চাগাবেন আর মেটাবেন লার্জার প্লেটস খেয়ে।


স্মলার প্লেটসে থেকে আমরা বাছলাম পালক পাত্তা চাট। পালং শাকের পাতা বেসন বা ওই জাতীয় কিছুর মিশ্রণে ডুবিয়ে মুচমুচে করে ভাজা আর সঙ্গে দইয়ের চাট। সে চাটের অংশটা বাজারের আর পাঁচটা চাটের মতোই, তফাৎ এই যে সে সব চাটের থেকে সেটা অনেক বেশি ভালো খেতে। মিষ্টি, ঘন ভাজামশলার সুবাসওয়ালা দইয়ের লেপের তলায় সেদ্দ আলু আর কাবুলি চানা, আর প্রায় প্রতি চামচে মুখে পড়া পাকা ডালিমের দানা। আর সেউভাজাতেও যে ওঁরা কোনও কার্পণ্য করেননি সেটা তো দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

আমরা মাস্টারশেফ দেখে একটা জিনিস বুঝেছি যে বিচারকরা সবসময় টেক্সচারের ওপর জোর দেন। মানে একই রান্নায় যদি একাধারে মিহি, কুড়মুড়ে, দানাদানা ইত্যাদি নানারকম ব্যাপারের আমদানি করা যায় তা হলে সে রান্নার রাঁধুনির পরের এপিসোডে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। টেক্সচারের সমাহার দিয়ে বিচার করলে ক্যাফে লোটার পালক পাতার চাট প্রতিযোগিতায় নিশ্চিত ফাইন্যালিস্ট। মুচমুচে পালংপাতার বড়া, মসৃণ দই, নরম চানা আর আলুসেদ্ধ, আর মাঝে মাঝে মুখের মধ্যে ডালিমদানার মিষ্টি রসের বিস্ফোরণ, সব মিলিয়ে পালংপাতার চাট একখানা চ্যাম্পিয়ন ডিশ।



ক্যাফে লোটার লার্জার প্লেটস অর্থাৎ প্রধান পদগুলোর বেশিরভাগই আসে রুটি বা ভাত আর একটা ছোট সাইড ডিশের সঙ্গে। আমাদের পছন্দ হল ইমলি ফিশ। তেলাপিয়া মাছ ভেজে তার ওপর কারিপাতা আর নারকেলেরক্রাম্বলছড়িয়ে নিয়ে এলেন পরিবেশক। সঙ্গে এল ট্যামারিন্ড রাইস আর ছোলা নারকেলের তরকারি। প্রতিটি পদেরই স্বাদ চমৎকার।


শেষপাতে আমরা নিলাম আপেল দারচিনির জিলিপি আর নারকেলের রাবড়ি। এ জিলিপি আমাদের চেনা জিলিপি নয়, জিলিপির থেকে ডোনাটের সঙ্গেই তার সাদৃশ্য বেশি। কিন্তু স্বভাব আমাদের জিলিপির মতোই। চকচকে, কুড়মুড়ে বহিরাবরণ দাঁত দিয়ে চূর্ণ করলেই ভেতরে হাল্কা দারচিনির গন্ধওয়ালা রসালো আপেলের পুর। পাছে শুধু জিলিপিতে কারও ক্যালরি কম পড়ে তাই সতর্কতা হিসেবে পাশে বাটিতে করে ঘন নারকেলের দুধের রাবড়ি দেওয়া হয়েছে।

সাধারণত রাতের খাওয়ার পর চা খাওয়াটাই আমাদের নিয়ম, বাইরে গেলেও আমরা এ নিয়মের ব্যত্যয় করি না, কিন্তু কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি আসে যে চা, এমনকি চা খাবারও পেটে জায়গা থাকে না। ক্যাফে লোটায় গেলে সেরকমটা হয়। আমরা বিল আনতে বলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পেট চেপে ধরে হাঁ করে দম নিতে লাগলাম। ওখান থেকে প্রগতি ময়দান মেট্রো হেঁটে লাগে মোটে দশ মিনিট। হাঁটাই উচিত ছিল আমাদের, পয়সাও বাঁচত, খাবারগুলোও হজম হত। কিন্তু তখন দুপা চালনা করার থেকে একটা আঙুল চালিয়ে ওলাক্যাবস অ্যাপ থেকে অটো ডাকা একশো কোটি গুণ সোজা মনে হচ্ছিল। ভাইসাব ফোন করে জানালেন যে তিনি মথুরা রোডের জ্যামে আটকে আছেন, মিনিট সাতেক লাগবে পৌঁছতে। ওই সাতমিনিটে আমরা খানিকটা ধাতস্থ হলাম, ম্যাপে যখন দেখাল যে অটো মিউজিয়ামের প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে, লোটাকম্বল গুটিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল।

*****

Cafe Lota
National Crafts Museum, Bhairon Marg, Pragati Maidan, New Delhi
+91 7838960787



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.