December 10, 2017

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস




অর্চিষ্মান একবার বলার চেষ্টা করেছিল, রিভিউ ভালো নয় কিন্তু। কিন্তু ও-ও জানত, 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' সিনেমা হয়ে বেরিয়েছে যখন আমি দেখব। ক্রিটিকে, দর্শকে কী বলল তোয়াক্কা না করেই। শনিবার সাড়ে বারোটার শোয়ের টিকিটের দাম মোটামুটি ভদ্রলোকের মতো দেখে আমরা রওনা দিলাম। টিকিট অনলাইন কাটা যেত, কিন্তু সে ক্ষেত্রে ‘কনভেনিয়েন্স ফি’ বলে একটা জিনিস হয়, সেটা আমার চরম অসুবিধেজনক লাগে। তাছাড়া আমার ভরসা ছিল, ফুকরে রিটার্নস রিলিজ করেছে, থরঃ রাগনারোক চলছে, এই বাজারে বেশি লোক পোয়্যারো নিয়ে উৎসাহী হবে না। ভরসা বিফলে যায়নি,হলে গিয়ে টিকিট পেতে কোনও অসুবিধেই হয়নি। 

প্রায় আধঘণ্টা ধরে ট্রেলার আর অ্যাড চলার পর মার্গসংগীতের ছোঁয়া লাগানো জনগণমন বাজিয়ে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি করে সিনেমা শুরু হল। পবিত্র শহর জেরুজালেমে একটি রহস্যের সাফল্যের সঙ্গে সমাধা করে (বইয়ের সমস্যাটির সঙ্গে সিনেমার সমস্যাটির মিল নেই) পোয়্যারো লন্ডনে ফিরছেন, ইচ্ছে ফেরার আগে ইস্তানবুলে ক’টা দিন বিশ্রাম নিয়ে যান। কিন্তু খবর আসে, আরেকটি রহস্য সমাধানের জন্য পোয়্যারোকে অবিলম্বে লন্ডনে ফিরতে হবে। ট্রেন কোম্পানির কর্তা মঁসিয়র বুকের ভাইপোর (ইনিও মঁসিওর বুক, যদিও বইয়ে এই ভূমিকায় সিনিয়র মঁসিয়র বুকই ছিলেন) সহৃদয়তায় টইটম্বুর ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের ক্যালে কোচে পোয়্যারোর একটি সিটের বন্দোবস্ত হয়। যাত্রার শুরুতেই স্যামুয়েল র‍্যাচেট নামের একজন অ্যামেরিকান বড়লোক পোয়্যারোকে নিজের ‘বডিগার্ড’ হিসেবে নিযুক্ত করতে চান, বলেন কেউ বা কারা তাকে হুমকি চিঠি পাঠিয়ে খুন করতে চাইছে। পোয়্যারো ‘না’ করে দেন। সেই রাতেই র‍্যাচেট নৃশংসভাবে খুন হন, আর তুষারঝড়ে ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস আটকা পড়ে যায়। মঁসিওর বুকের ভাইপো পোয়্যারোর হাতে পায়ে পড়ে খুনিকে ধরে দেওয়ার অনুরোধ করেন, না হলে কোম্পানির বড়বাবু হিসেবে তাঁর একেবারে নাককাটা যাবে।

'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' আগাথা ক্রিস্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখা, প্লটের অভিনবত্বের জন্য তো বটেই, কিন্তু সে অভিনবত্ব তো ক্রিস্টির সব বইতেই কমন। মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' স্পেশাল এই জন্য যে এই বইতেই ঠিক আর ভুল, ন্যায় এবং অন্যায়, শাস্তি এবং ক্ষমার মাঝামাঝির ধোঁয়াটে জায়গাটা হারক্যুল পোয়্যারোর কাছে প্রথম প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়। টিভি সিনেমার পরিচালক প্রযোজকদের কাছে এই গল্প তাই চিরকালই লোভনীয়। সিনেমার পর্দায় উনিশশো চুয়াত্তরে সিডনি লুমের পরিচালনায় 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এ পোয়্যারোর ভূমিকায় ছিলেন অ্যালবার্ট ফিনি। এই ছবিতেই একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান সেরা সহঅভিনেত্রীর অস্কার জিতেছিলেন। টিভির পর্দায় দুহাজার দশ সালে ডেভিড সুশে ছাড়াও 'মার্ডার ইন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এ পোয়্যারোর ভূমিকায় নেমেছিলেন আলফ্রেড মলিনা, দুহাজার এক সালে।

দু'হাজার সতেরোর 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' পরিচালনা করেছেন কেনেথ ব্রানা, পোয়্যারোর ভূমিকাতেও তিনিই অভিনয়ও করেছেন। র‍্যাচেটের ভূমিকায় জনি ডেপ, গ্রেটা অলসন (যে ভূমিকায় অভিনয় করে ইংগমার বার্গম্যান অস্কার পেয়েছিলেন) চরিত্রের নাম বদলে হয়ে গেছে পিলার এস্ত্রাভাদোস (এই চরিত্রের নাম নেওয়া হয়েছে 'হারক্যুল পোয়্যারো’স ক্রিসমাস' বই থেকে), অভিনয় করেছেন পেনেলোপি ক্রুজ, প্রিন্সেস দ্রাগোমিরফের ভূমিকায় আছেন ডেম জুডি ডেঞ্চ। দু’চারটে চরিত্র এবং তাদের ভূমিকা অদলবদল করা হয়েছে। কর্নেল আরবাথনট আর ডাক্তার মিলিয়ে তৈরি হয়েছেন ডাক্তার আরবাথনট, গল্পে ডাক্তারের ভূমিকাও বদলেছে। এ ছাড়া গল্পের কাঠামো তেমন কিছু বদলায়নি।

বদলেছে গল্পের ফোকাস। 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এ থিম (ন্যায়অন্যায় ঠিকবেঠিকের সংজ্ঞায়ন) জরুরি, কিন্তু ক্রিস্টির বাকি সব গল্পের মতোই প্লট আরও জরুরি। ব্রানার 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' প্লট প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মেনেছে, বইয়ের প্রতিটি ক্লু, রেড হেরিং আছে সিনেমাতেও, কিন্তু সেগুলোকে যথেষ্ট খেলিয়ে ব্যবহার করা হয়নি, তাদের পেছনে যথেষ্ট সময় খরচ করা হয়নি। সম্ভবত এই ভেবে যে এত চেনা গল্পে কী হবে, কেন হবে, কী করে হবে এসব সবাই জানে, কাজেই সে সবের গভীরে না গেলেও চলবে। তার থেকে বরং পোয়্যারোর দোলাচল, অন্যান্য চরিত্রদের অন্তর্লীন টানাপোড়েনে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। কথাটা সত্যি, কিন্তু আরও সত্যি কথাটা হচ্ছে, ওই ক্লুয়ের লেজ ধরে ধরে, রেড হেরিংয়ের পিছু নিয়ে পথ ভুল করে আবার ঠিক পথে ফিরে আসার খেলাটা বাদ দিলে গোয়েন্দাগল্পের পনেরো আনা মজা মাটি।

সামান্য বদল এসেছে পোয়্যারোর চরিত্রেও। আগাথা ক্রিস্টির পোয়্যারো দৌড়োদৌড়ি তো দূরে থাক, জুতোর পালিশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বাড়ি থেকে বেরোন না, গুলিগোলা মারাত্মক অপছন্দ করেন। সেই পোয়্যারো বিপজ্জনক ব্রিজ বেয়ে অপরাধীকে ধাওয়া করছেন, হাতে গুলি খেয়ে টসকাচ্ছেন না। বিশ্বাস করা শক্ত। তবে এসব বদলে আমার আপত্তি নেই। এর থেকে ঢের আপত্তিজনক ব্যাখ্যা এর আগে হয়েছে (পিটার উস্তিনভ, অ্যালবার্ট ফিনি, আলফ্রেড মলিনা) যেখানে পোয়্যারো রীতিমত ভাঁড়ে রূপান্তরিত হয়েছেন। সে সব দেখে রাগ হয়েছিল খুব, কিন্তু ক্রমে বুঝেছি এইরকম আইকনিক চরিত্রের বিভিন্ন ব্যাখ্যা হবেই। না হলেই অদ্ভুত হত। 

আমার 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' ভালো লেগেছে । বরফঢাকা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ট্রেন যাওয়ার দৃশ্য ভালো লেগেছে, অভিনয় ভালো লেগেছে, মূল গল্পের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকার সিদ্ধান্ত ভালো লেগেছে। তবে ভালো যে লাগবে জানাই ছিল।


December 09, 2017

কয়েকটা লিংক ও চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের হুইলার্স স্টল






The best things in life happen to you when you’re alone. 
                                                                         —Agnes Martin


দ্য অরিজিন্যাল গন গার্ল। 

গত বছরে শেখা ৫২টি তথ্যের এই তালিকাটি ইন্টারেস্টিং। ভারতসংক্রান্ত যে তথ্যটি লেখক জেনেছেন সেটা হল,
  1. Unscrupulous mobile phone recharging stations in Uttar Pradesh, India, are selling the phone numbers of female customers to male customers, who use them to harass the women. Numbers cost from Rs 50 (60p) to Rs 500 (£6) depending on how attractive the victim is. [Snigdha Poonam]

এই সোজা কথাটা মনে রাখা শক্ত। দ্য আদার সাইড ইজ নট ডাম্ব।


গাছ পোঁতা হয়েছে, একশো বছর পরে তাদের কেটে কাগজ হবে, সেই দিয়ে বই হবে। হতে পারে অভিনব ব্যাপার, তবে আমার খবরটা শুনে মনখারাপ হল, এ যেন বলির আগে পাঁঠাকে কাঁঠালপাতা খাওয়ানো। 

ডাইনোসরের প্রতি আমার ভালোবাসা আছে (মুখোমুখি আমি পড়তে চাই না যদিও,) তাই যখন জানলাম এমন উড়ুক্কু প্রাণীর খোঁজ পাওয়া গেছে যাদের খাদ্য ছিল শিশু ডাইনোসর, আমার মোটেই ভালো লাগল না।

এই লিংকটা খুললে আপনারাও ডাইনোসরকে ভালো না বেসে পারবেন না।


এই পাঠপ্রতিক্রিয়াগুলো আগেও পড়েছেন অবান্তরে, কিন্তু আমার এবছরের প্রিয় তিনটি বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া বেরিয়েছে এ মাসের চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের হুইলার্স স্টলে। 

December 07, 2017

গত সপ্তাহে



আমি তৈরি হয়েই গিয়েছিলাম। গেট খুলতে খুলতে বারান্দাটা দেখব, যে বারান্দায় বসে বসে ঠাকুমা মশা মারতেন, দু’পাশের বাগান দেখব, ঠাকুমার লাগানো, যত্ন করা গাছে ভরা বারান্দা পেরিয়ে সদর ঘর দেখব, ঘরের তক্তপোশে আমি আর ঠাকুমা শুয়ে থাকতাম পাশপাশি, বাঁয়ে বেঁকে অযৌক্তিক বারান্দাটা পেরিয়ে আলনা দেখব আর আলনার পাশে পর্দা সরিয়ে ঠাকুমার ঘর দেখব। এ ঘরের বিছানায় গত পাঁচ বছর ধরে ঠাকুমা শুয়ে ছিলেন। শুয়ে শুয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও অনেকক্ষণ তাঁর কাছে না গেলে আমাকে ‘সোনা সোনা’ বলে ডেকেছেন। ওই ঘরের জানালার শিকের মধ্য দিয়ে বিশ্বের খবর নিয়েছেন এবং দিয়েছেন। 

আমি তৈরি ছিলাম এসব দেখলেই আমার চোখে জল আসবে।

যেটার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না (যদিও থাকা উচিত ছিল) সেটা হচ্ছে ওই বাড়িতে এখন অন্তত দশজন লোক বাড়তি থাকবেন। আরও জনা দশেক রোজ আসাযাওয়া করবেন। ঠাকুমার খাট দেওয়ালের দিকে ঠেলে দিয়ে মেঝেতে ঢালাও বিছানা পাতা হবে। তেরোদিনের জন্য যাঁদের খাটে শোওয়া বারণ হয়ে গেছে তাঁরা তো মাটিতে শোবেনই, যাদের বারণ নয় তারাও কমরেডারি দেখিয়ে বেতো হাঁটু নিয়ে এই ডিসেম্বরের শীতে মেঝেতে শয্যা পাতবেন। আতপচালের ফেনাভাত আর সাবুমাখার মহোৎসব চলবে। (শেষদিন সেজকাকু বলেছেন, ‘এই শেষ, আর লাইফে সাবু মুখে তুলব না, বাপ রে বাপ রে বাপ।’ )

যেটার জন্য আমার তৈরি থাকা উচিত ছিল সেটা হচ্ছে বাড়ি গেলে শোক করার মতো ফুরসৎই থাকবে না আমার।

ভালোই হয়েছে না থেকে। আমার তো শখের শোক, আমার বাবামার না হলে বড্ড কষ্ট হত।

*****

আমার শোকের অনুপস্থিতির জন্য দায়ী আরও একটা ফ্যাক্টরের কথা আমি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম, সেটা হচ্ছে দুজন মানুষের উপস্থিতি। তাদের ছবি আগের পোস্টেও দেখিয়েছি আপনাদের, আবার দেখাচ্ছি। 


মাঝের জন্য হচ্ছেন মনা। আর ডানের জন্য টুনা। এ দুজন যথাক্রমে আমার জেঠতুতো দিদি এবং বোন। তিনে মিলে আমরা মনাসোনাটুনা। মনাদিদি ভীষণ ভালো গল্প করতে পারে, তেতোচচ্চড়ি খাইয়ে মাংস ভুলিয়ে দিতে পারে, একবার চোখ বড় করে তাকিয়ে অতি বাঁদর বাচ্চাকে শান্ত করতে পারে, কিন্তু আস্তে হাসতে পারে না। 

টুনার জীবনের সবথেকে বড় আফসোস, ওর আশেপাশে সবার চশমা আছে, খালি টুনার নেই। ছোটবেলায় বাবামায়ের সঙ্গে দুয়েকবার ডাক্তারখানায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, বড় বয়সে টুনা মরিয়া হয়ে নিজেই ডাক্তারখানায় গেছে এবং চোখে আবছা দেখার কাল্পনিক কমপ্লেন করেছে। বলেছে, ‘ভালো করে দেখুন না ডাক্তারবাবু, যদি খুঁজেটুজে একটুখানি পাওয়ার পাওয়া যায়।’ ডাক্তার বলেছেন, ‘অসম্ভব। এত স্বাস্থ্যবান চোখ আমি লাইফে কমই দেখেছি।’ এখন টুনার একমাত্র আশা বুড়ো হওয়া। তবে যদি চশমা পাওয়া যায়।

মনাটুনা এসে পড়ার পর আমার শোকের যেটুকু সম্ভাবনা ছিল তাও আর রইল না। নেমন্তন্ন বাড়িতে গল্প করার মতো জিনিসের অভাব থাকে না। ব্যান্ডের গান থেকে শুরু করে ফিল্মের হিরোহিরোইন পর্যন্ত আমাদের পছন্দঅপছন্দ মোটামুটি একইরকম, আত্মীয়স্বজনের ক্ষেত্রেও বিশেষ অমিল নেই। অর্থাৎ যাকে পছন্দ তাকে তিনজনেরই পছন্দ, যাকে দেখলে গা জ্বলে তাকে দেখলে তিনজনেরই গা জ্বলে। গায়ের দোষ নেই, কিছু কিছু লোকের স্বভাবই ওই রকম। কাকে কী জিজ্ঞাসা করলে বিব্রত হতে পারে বুঝে নিয়ে তাকে ঠিক সেই প্রশ্নটা করে। আমাদের তিনজনকেই সেরকম প্রশ্ন করার পর আমরা প্রতিশোধ নেওয়া ঠিক করলাম। গাজ্বলার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যাকে দেখলে গা জ্বলে, তার সবকিছু দেখলেই গা জ্বলে, এমনকি বেগুনভাজা খাওয়ার রকম দেখলেও। 

প্রথমে যখন হাসির হররা ওঠে সবাই আঁতকে ওঠে। শ্রাদ্ধবাড়িতে এত জোরে হাসতে নেই, নিমন্ত্রিতরা কী বলবে? আর মনাদিদির হাসি তো তিনটে বাড়ির পরের লোকেরাও শুনতে পাচ্ছে। মাজেঠি রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে মুখ চেপে ধরার চেষ্টা করেন। তারপর আশেপাশের ঘরে যারা ভয়ানক গম্ভীর মুখ করে বসে ছিল তারা গুটি গুটি আমাদের ঘরে এসে ভিড় জমায়। গোল বড় হয়, খাটে তিলধারণের জায়গা থাকে না, সবাই ঝুলি ঝেড়ে মজার গল্প বার করে। সবাই জোরে জোরে হাসে।

সন্ধ্যেবেলা বাইরের লোকেরা চলে গেলে, ঠাকুমার ঘরে বড়দের আড্ডা বসে। আমরা এ ঘর থেকে শুনতে পাই মা বহুদিন বাদে গান গাইছেন। পিসিরা গলা মিলিয়েছে।

*****

অনুষ্ঠানবাড়ির অন্যতম কঠিন ব্যাপার হচ্ছে লোক চেনা। একতুতো, দুইতুতো, তিনতুতো কাকা জেঠু, পিসে, কারও কারও মুখ মনে আছে, কাউকে কোনওদিন দেখেছি কি না সন্দেহ। আমার তিনতুতো ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে জীবনে দু’বার, নাম ভুলে গেছি। কান খাড়া করে ঘুরছি, যদি কেউ নাম ধরে ডাকে, শুনে নেব। কেউ ডাকল না, তখন দায়িত্বজ্ঞানহীন ননদের মতো স্বীকার করতেই হল, ‘তোমার নামটা বল না, ভুলে গেছি।’

পাড়ার লোকদের আমি একসময় সবাইকে চিনতাম, এখন সেখানেও হয়েছে মুশকিল, বুড়োদের চিনতে পারছি, জোয়ানদের পারছি না। পারব কী করে? এদের আমি দেখেছি কাউকে হামা দিতে, কাউকে হাতে হাওয়াই চটি পরে দৌড়তে। তারা এখন সব বরবউ সহযোগে উপস্থিত হয়েছে। আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে, ‘চিনতে পারছ? বল তো আমি কে?’ 

অত ভিড়ের বাড়িতে অবশ্য সবাইকে না চিনলেও পার পেয়ে যাওয়া যায়। ‘ভালো করে খাবেন, লজ্জা করবেন না, যা লাগে চেয়ে নেবেন’ বলতে গেলে নামধাম না জানলেও চলে। বা সদ্য কেউ বাড়িতে ঢুকলে, ‘আসতে বেশি কষ্ট হয়নি তো’ ইত্যাদি বলতেও ট্যাক্স লাগে না। কিন্তু মা এই করতে গিয়েই বিপদে পড়েছেন, একটা ফর্সা গম্ভীর মতো ছেলেকে যেই না জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘আপনাদের আসতে কতক্ষণ লাগল?’ সে ছেলে একগাল হেসে বলেছে, ‘দেড় মিনিট, জেঠিমা।’ তারপর বেরোলো সে বুম্বা, আমাদের তিনটে বাড়ি পরের বণিকদের বাড়ির ছেলে।

তবে লোক চেনার থেকেও শক্ত কাজ হচ্ছে চা করা। আমার মতে অনুষ্ঠানবাড়ির সবথেকে শক্ত কাজ। আজকাল আবার সবার প্যাকনা, কেউ দুধ দিয়ে খায়, কেউ না দিয়ে, কেউ আধকাপ খাবে, কেউ দুই-তৃতীয়াংশের একচুমুক বেশি খেলেই পেট ফেটে মরে যাবে। আর ওয়ার্স্ট যারা তারা জিজ্ঞাসা করতে বলবে, ‘আমার কোনও ঝামেলা নাই, যা দিবা দাও।’ তারপর লিকার চা দেখে বলবেন, ‘ইস, কালাকালা চা খাই না।’ দুধ দেওয়া চা নিয়ে এলে চুমুক দিয়ে মুখব্যাদান করে বলবে, ‘চিনি ছাড়া কর নাই? না করলে অসুবিধা নাই। এই দিয়া কাম চালায়া নিমু।’ 

‘তাই নিন বরং,’ বলার মতো স্মার্ট আমার মা বা জেঠি কেউই নন, কাজেই তৃতীয়বার চা আসে।

এর ওপর যদি চায়ের কাপ ধুতে হয় তাহলেই হয়েছে। মৎস্যমুখী/নিয়মভঙ্গের দিন সকালে আবিষ্কার করা হল কাগজের কাপ শেষ, একজনকে দিয়ে আনানো হয়েছিল, সে ভয়ানক ছোট কাপ নিয়ে এসেছে, তাতে লোককে চা দিলে একেবারে নাককাটা। মা আমাকে একপাশে ডেকে চুপি চুপি বললেন, ‘বাজারে গিয়ে কাপ এনে দে সোনা।’ আমি বললাম, ‘অফ কোর্স।’ তারপর কুটকুটে সবুজ রঙের বমকাই পরে সকাল সাড়ে ন’টার সময় টোটো চেপে গেলাম কাপ কিনতে। 

ভাগ্যিস গেলাম। ওই সময়ের রিষড়া স্টেশন দেখিনি আমি বহু বহু বছর। একই রকম গোলমেলে, তবে লোক আরও বেশি। দোকানের মাথার বোর্ড আরও চকচকে। অনেক চেনা দোকান নেই। কোনওটা ভেঙে তিনখানা দোকান হয়েছে। যে দোকানগুলোকে আমার ছোটবেলায় প্রকাণ্ড মনে হত, যত দিন যাচ্ছে তত তারা চিলতে থেকে চিলতেতর প্রতিভাত হচ্ছে। দোকানের ভেতরের শিশিবয়ামের ওপাশে বসে থাকা মুখ বেশিরভাগই বদলে গেছে, তবে কাউকে কাউকে এখনও চেনা যায়। 

আমার বন্ধুর বাবার দশকর্মা ভাণ্ডার থেকে কাপ কিনলাম। কাকু চিনতে পেরেছেন আমাকে। 

*****

দুঃখ হল বাড়িটা যখন ফাঁকা হয়ে গেল। সবাই চলে গেলে, একজনের না থাকা প্রকট হয়ে ওঠে। মাবাবা প্ল্যান করেন, ‘তুমি সামনের দিকে শোবে, আমি পেছন দিকে শোব, তাহলে বাড়ির দুদিকেই নজর রাখা যাবে।’ আমার খাটের সঙ্গে মিশে যাওয়া ঠাকুমা যে বাড়ি পাহারা দেওয়ার কাজে লাগছিলেন এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে? চলে যাওয়ার আগে গৌরীপিসি খেতে বসে গ্রাস তুলতে পারে না। মামি মরে গেলে কি মামাবাড়ি ফুরিয়ে যায়? তপাকাকুর গাড়িতে উঠে পড়ে মনে হয়, এইবার সত্যি সত্যি সব ফুরোলো। ঠাকুমার ঘরের জানালাটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলি, ‘চললাম, ঠাকুমা। টা টা।’ 

*****

জি টি রোডে অবরোধ হয়েছিল। ভেতর দিয়ে অনেক ঘুরে আসতে হল। ভেতরের গলি এমনিতেই সরু, তার মধ্যে দুদিকে সবজি, ফলের ঠেলাগাড়ি, দোকানের সামনে হেলান দেওয়া বাইক, দুদিক থেকে আসা এস ইউ ভি। এইসব সময় বোঝা যায়, মফস্বলের অধিকাংশ লোকই স্বভাবগত ভাবে ট্রাফিক পুলিস। বাড়ির ছাদ থেকে, বারান্দা থেকে কত যে ডাইনে কাটাও, বাঁয়ে কাটাও,’ শোনা গেল। এমনকি রাস্তার পাশের দশফুট বাই দশফুট খুপরির সামনে হামা দেওয়া খোকাখুকু পর্যন্ত কাজলটানা চোখ পাকিয়ে ‘কাতাও কাতাও’ করছে। কপাল ভালো জ্যাম ছাড়ল আর আমরা অবরোধের লোকেশন পার করে জি টি রোডে এসে পড়লাম। তখনই দেখলাম মেরুনসবুজ আর লালহলুদ পতাকায় মোড়া টেম্পো আর প্রাইভেট গাড়িগুলোকে। ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের ম্যাচ আছে যুবভারতীতে। নিজের নিজের দলকে সমর্থন করার জন্য গাড়ি ভাড়া করে, ঠাসাঠাসি হয়ে চলেছে দুই দলের সমর্থকেরা। মাইকে চিৎকার করতে করতে, স্লোগান দিতে দিতে,  মুখে এবং হস্তমুদ্রায় যৌন নিগ্রহের আস্ফালন করতে করতে বাংলার যুবসমাজ মহান ঐতিহ্যরক্ষায় চলেছে।

*****

প্লেনে আমার পাশে যে বসেছিল সে আকারে মানুষের বাচ্চার মতোই, প্রকারে ল্যাজকাটা বাঁদর। দুরন্ত বাচ্চাদের আমি ভয় পাই এবং পারতপক্ষে ঘাঁটাই না। মুখ গম্ভীর করে প্রাণপণে ভগবানকে ডাকি যেন তারাও আমাকে না ঘাঁটায়। এর সঙ্গেও সারা রাস্তা আমি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারের কোনও চেষ্টা করিনি। নিজের কাজ করেছি, সামনের সপ্তাহের টু ডু লিস্ট বানিয়েছি, গো এয়ারের মেনু মুখস্থ করেছি, আর ফ্লাইট ম্যাগাজিন দেখে পরের বেড়াতে যাওয়ার আইডিয়া সংগ্রহ করেছি। 

শেষটা যখন ল্যান্ডিং হচ্ছে তখন শুরু হল চিৎকার। ‘মাম্মি মেরে কান মে দর্দ হো রহা হ্যায়! পাপা মেরে কান মে দর্দ হো রহা হ্যায়!’ মাম্মি পাপা যথাসম্ভব চেষ্টা করলেন তার কানের দর্দ থামাতে, একখানা কোক কেনা হয়েছিল কিছুক্ষণ আগে সেই খেতে দিলেন, নাকমুখ বন্ধ করে বসতে বললেন, কর্তৃপক্ষকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন লজেন্সটফি কিছু পাওয়া যাবে কি না, তাতে সে কানের ব্যথা ভুলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ম্যাংগো বাইট!’ ম্যাংগো বাইট পাওয়া গেল না।

তখন সে হাল ছেড়ে চুপ করল। মিনিটখানেক পর কোমরের কাছে একটা খোঁচা খেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি জন্য ছোট একখানা মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

‘আপকে কান মে ভি দর্দ হো রহা হ্যায়, আন্টি?’

আমি মাথা নেড়ে বললাম, না।

সে মায়ের দিকে ফিরে করুণ গলায় বলল, ‘কিসিকে কান মে দর্দ নহি হো রহা হ্যায়, সির্ফ মেরে কান মে কিঁউ হো রহা হ্যায়?’

আর আমি মাটিতে মিশে গেলাম। ছি ছি ছি। কী ক্ষতি হত আমার যদি বলতাম, আমি কানের ব্যাথায় মরে যাচ্ছি? সত্যভাষণের রোগ কি অবশেষে আমাকে ধরে ফেলল? এইসব ভেবে ভেবে মরমে মরছি, এমন সময় প্লেন ল্যান্ড করল। কানের ব্যথাও কমল সম্ভবত কারণ সে আমাকে দ্বিতীয় প্রশ্নটা করল। 

‘আপ দিল্লি মে রহতে হো?’

আমার উত্তর শুনে চোখ কপালে তুলে বলল, ‘ম্যায় ভি দিল্লি মে রহতা হুঁ।’ যেন এরকম আশ্চর্য সমাপতন ওর বছরপাঁচেকের জীবনে আগে ঘটেনি।

আমি প্রায়শ্চিত্তের জন্য মুখিয়ে ছিলাম, হাত তুলে বললাম, ‘ফির হো যায়ে এক হাই ফাইভ?’ 

চটাস করে হাই ফাইভ এসে পড়ল আমার হাতে।


December 03, 2017

এখনতখন



ঘণ্টাখানেক হল ঘরে ঢুকেছি। সবাইকে ফোন করে নিশ্চিন্ত করে, হাতপা ধুয়ে, জামা ছেড়ে, টিভি চালিয়ে, কেটলিতে জল বসানো হয়ে গেছে। অবান্তরে চারখানা পোস্ট লেখার মতো কথা জমেছে গত চারদিনে। সে সব কথা, মনে হওয়া, মনে পড়া, মাথার ভেতর জট পাকিয়ে, বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে রয়েছে এখন। তাদের ঝেড়েবেছে বাক্যে প্যারাগ্রাফে সাজাতে সময় লাগবে, হয়তো সাজানো হবেও না। তাই আপাতত চট করে এই কয়েকটা ছবি দেখিয়ে নিই আপনাদের। আপনারা সবাই ভালো আছেন আশা করি। শিগগিরই আগের ছন্দে দেখা হচ্ছে।











November 26, 2017

দ্য অয়েন্টমেন্ট



২০শে নভেম্বর, ২০১৭ র সকাল সাতটা তিন মিনিটে ঠাকুমা মারা গেলেন। আমি ঠাকুমার কাছে ছিলাম না। এমন দূরত্বেও ছিলাম না যে চট করে চলে আসতে পারি। কাজেই আমাকে বাবামা খবরটা তৎক্ষণাৎ জানাননি। পাছে আমার বিপদ হয়। পাছে আমি অতদূরে একলা ভেঙে পড়ি। আমি খবর পেয়েছি বাড়ি ঢুকে, অর্চিষ্মানের মুখে, সব চুকেবুকে যাওয়ার পর। 

মৃত্যুর সময় ঠাকুমার কাছে আমার বাবা ছিলেন, মা ছিলেন, আর বিজলিদি ছিল। গত কয়েকবছরে আমার ঠাকুমার সবথেকে কাছের তিনজন মানুষ। ঠাকুমা বিছানাবন্দী ছিলেন অনেক বছর। শেষদিকে সাড়া কমে এসেছিল, ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, ‘মাল্টিঅর্গ্যান ফেলিওর’ শুরু হয়েছে। অতিকষ্টে দুয়েকটা কথা বলতেন, কিন্তু চেতনা টনটনে ছিল, যেটুকু বলতেন নিখুঁত বলতেন। ছোটদাদু দিদা দেখতে এসেছিলেন, প্রথমটা চিনতে পারেননি। দৃষ্টিশক্তি ধীর হয়ে এসেছিল। ঠাকুমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়াতে পেরেছিলেন। স্মৃতি অদ্ভুতভাবে কাজ করে। জ্যান্ত লোককে চিনতে পারছেন না, অথচ কবে মরে যাওয়া তাঁর ছোটমাসির নাম জিজ্ঞাসা করাতে মুহূর্তের মধ্যে বলে উঠেছিলেন, ‘কুট্টিমাসি’। ছোটদাদু কম মৃত্যু দেখেননি তাঁর জীবনে। বলে গিয়েছিলেন বাবাকে, এখন আর বেড়াতে যেয়ো না কোথাও। 

সপ্তাহখানেক ধরে ঠাকুমার খারাপ শরীর আরও খারাপ হয়েছিল। কী একটা ইনফেকশন হয়েছিল, গালের কাছটা ফুলে গিয়ে ধুম জ্বর এসেছিল। ডাক্তারবাবু বদলে বদলে ওষুধ দিচ্ছিলেন, তাতে কাজও দিচ্ছিল। গালের ফোলাটা কমল, জ্বর নামল। সবাই ভাবল আবার সামলে নিলেন ঠাকুমা। গত প্রায় দশ বছর ধরে এই রকম সব ঝড় সামলে নিচ্ছেন ঠাকুমা। স্ট্রোক, মাথার অপারেশন, হ্যানাত্যানা। উনিশ তারিখেও একটা নতুন ওষুধ লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু, সন্ধ্যেবেলায় হাঁটতে বেরিয়ে ওষুধটা কিনে এনেছিলেন বাবামা, খাওয়ানোও হয়েছিল।

কুড়ি তারিখ সকালে মা এসে ঠাকুমার লেপ সরিয়ে শীতের জামা পরাতে গিয়ে দেখেছিলেন, কী রোগা হয়ে গেছেন ঠাকুমা। শরীরটা শুধু একটা খাঁচা। রোজই দেখছেন, কিন্তু সেদিন মায়ের নতুন করে দুঃখ হয়েছিল। মনে হয়েছিল, ঠাকুমার কত কষ্ট হচ্ছে। বিজলিদি ঠাকুমাকে দাঁত মাজিয়ে, চুল আঁচড়িয়ে দেওয়ার পর চা খেতে বসা হত সবাই মিলে। এই পর্যন্ত অন্যদিনের মতোই চলছিল, বিজলিদি ঠাকুমার দেখভাল করছিল, মা রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় ব্যতিক্রম ঘটল। বিজলিদি ডাকল, ‘বৌদি, শিগগিরি আসুন।’ মা ছাঁকনি ফেলে ঠাকুমার ঘরের পর্দা তুলে একঝলক দেখে বাবাকে দৌড়ে গিয়ে বললেন, ‘শিগগির এসো।’ বাবা এসে বসলেন ঠাকুমার পাশে। ঠাকুমার শ্বাস তখন গভীর এবং ধীর। বিজলিদির মাথা বরফের মতো ঠাণ্ডা, ঠাকুমার খাটের পাশের টেবিলে রাখা জলের ঘটি এনে দিল বাবার হাতে। বাবা এক চামচ জল দিলেন ঠাকুমার মুখে। জল ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল। মা ঠাকুমার মাথা তুলে ধরলেন, কিন্তু ততক্ষণে আরেকটা কথা মায়ের মনে পড়ে গেছে। ঠাকুরের আসনে দু’টো গঙ্গাজলের দুটো পাত্র রাখা আছে আমাদের। একটায় রিষড়ার গঙ্গার জল, অন্যটায় হরিদ্বারের। হরিদ্বারের গঙ্গার জল আনার পর সেই দিয়েই খুব পুজোটুজো হচ্ছিল, যতদিন না ঠাকুমা বললেন, রিষড়ার গঙ্গার জলেই ঠাকুর তুষ্ট হবেন এখন, হরিদ্বারের গঙ্গার জল বরং বাঁচিয়ে রাখ আমার জন্য। তখন ঠাট্টা বলেই ধরেছিল সবাই, কিন্তু ওই মুহূর্তে সবই ভয়ানক সিরিয়াস। ঠাকুমার মাথার নিচে শাল গুঁজে দিয়ে মা দৌড়লেন ঠাকুরের আসন থেকে ঠাকুরকে বঞ্চিত করে ঠাকুমার জন্য তুলে রাখা সেই জল আনতে। একেক চামচ সেই জল বাবা, মা, বিজলিদির হাত থেকে বিনা প্রতিবাদে ঢকঢক করে গিলে নিলেন ঠাকুমা, আর তাঁর চোখের পাতা দুটো স্লো মোশনে বুজে এল। যেন ভীষণ ঘুম পেয়েছে।

ডাক্তারবাবু এলেন। তেত্রিশ বছর আগে আমার ঠাকুরদা মারা যাওয়ার  সময় এই ডাক্তারবাবু সবে পাশ করে পাড়ায় চেম্বার খুলে বসেছিলেন, ঠাকুরদা বন্ধুবান্ধবের কাছে সুখ্যাতি শুনেছিলেন, খুব শখ ছিল তরুণ ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে তবে মরবেন। ঠাকুরদার সাধ মিটেছিল। সেই আমাদের বাড়িতে ডাক্তারবাবুর যাতায়াত শুরু। তেত্রিশ বছর পর, সেই ডাক্তারবাবু, এখন যাঁর চুলে পাক, চোখে চশমা, আমার ঠাকুমার ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিলেন। 

আত্মীয়স্বজন এল, তারও আগে এল পাড়ার লোক। ঠাকুমা যাঁদের সঙ্গে বসে বারান্দায় গল্পের আসর বসিয়েছেন, রাত তিনটে থেকে জেগে থেকে নিজের বাড়ির সঙ্গে যেচে যাঁদের বাড়ির ফুলগাছ পাহারা দিয়েছেন, সবাই। জেঠু, জেঠি, রত্মাকাকিমা, অমিতকাকু, শ্যামলকাকু, রাজুদা, টুকাইদা, বুচিদিদি, বুবুন। হরিবোল বলে ঠাকুমার খাট গাড়িতে তুলে দিল সবাই। আমার বাবাকাকাজেঠু তো গেলেনই, পাড়ার সবাই যারা একে অপরের বাড়ির শ্মশানবন্ধু হয়ে এসেছে বছরের পর বছর, তারাও সঙ্গে গেল। 

*****

শোক সর্বদাই স্বার্থপর। ঠাকুমার জন্য আমার যত না শোক, ঠাকুমা চলে যাওয়ার পরের আমার জন্য আমার শোক তার থেকে অনেক বেশি। মোটে একটাই জীবন বাঁচছি, কাজেই বেঁচে থাকায় আমি এক্সপার্ট নই। বেঁচে থাকতে গেলে কী কী লাগে আমি জানি না। টাকা লাগে, জামাকাপড় লাগে, প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি, এবং প্রশংসা লাগে। কার কতটা করে লাগবে তারও তারতম্য আছে, কোনও বাঁধাধরা নিয়ম নেই।

তবে যা বুঝেছি, বাঁচতে গেলে ভালোবাসার লোক লাগেই। এমন লোক যারা আমাকে ভালোবাসবে। কোনও প্রশ্ন না করে ভালোবাসবে। আমি যেমন ঠিক তেমন করে আমাকে ভালোবাসবে। আর সে রকম ভালোবাসা কেমন হয়, কাকে বলে তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন আমার ঠাকুমা। 

জীবন থেকে হঠাৎ অতখানি ভালোবাসা উধাও হওয়ার ক্ষতি হিসেব করছি আমি এখন বসে বসে। শেষবার গিয়ে ঠাকুমার গালে গাল, ঠাকুমার আঙুলে আঙুল জড়ানোর ছোঁয়াটা মনে করার চেষ্টা করছি। অপেক্ষা করছি, কখন সময় এই ক্ষতি পূরণ না করলেও, অন্তত ভুলিয়ে দেবে।

ডেথ ইজ নট দ্য ফ্লাই ইন দ্য অয়েন্টমেন্ট। ইট ইজ দ্য অয়েন্টমেন্ট। পড়লাম ক’দিন আগেই। ক’দিনের জীবন কাটিয়ে আমার ঠাকুমা সেই মৃত্যুময় জগতে ফিরে গেছেন। আমিও যাব একদিন। যদিও আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ঠাকুমা ততদিন বসে থাকবেন, তা ধরে নেওয়ার মতো নিষ্পাপ বিশ্বাস আমার আর নেই। শুধু গত সাঁইত্রিশ বছরের ঠাকুমাকে কাছে পাওয়াটুকু রইল। থাকবেও।


November 21, 2017

পথে



ইস্তানবুল থেকে বোর্ডিং প্রায় শেষ, সবাই বসে পড়েছে, ওভারহেড বিনগুলো ধপাধপ বন্ধ হওয়ার আওয়াজ কমে এসেছে, আমি একবার মিডিয়া লাইব্রেরি পরীক্ষা করে নিয়েছি, দিল্লি থেকে ইস্তানবুল আসার পথে বার্ডম্যান আর হিডেন ফিগারস দেখা হয়ে গেছে, আমি ভাবছি এবার ‘মার্ডার, শি বেকড’ দেখব না ‘লেগো ব্যাটম্যান’, ভেবে ভেবে লেগো ব্যাটম্যানের দিকেই যখন মন ঝুঁকেছে এমন সময় একটা অস্বস্তি হল।

শারীরিক অস্বস্তি নয়, গরম বা ঠাণ্ডা লাগছে না। মানসিকও যে নয় বোঝাই যাচ্ছে, লেগো ব্যাটম্যান দেখার জন্য তৈরি হচ্ছি যখন। একবার দ্রুত চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলাম। না, কেউ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে নেই, যে যার নিজের সামনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে।

অস্বস্তিটা গেল না। উল্টে একটু একটু তাকে চিনতে পারলাম। একটা কিছু যা আমার সঙ্গে থাকার কথা, কিন্তু না থাকার অস্বস্তি।

ছাতা আনিনি (যদিও বনে বৃষ্টি হবে লিখেছে), রুমাল ব্যাগের ভেতর, টিফিনবাক্সে লুচিআলুভাজা পুরে প্লেনে ওঠার জমানা গেছে, আই কার্ডও ব্যাগ থেকে বার করার প্রয়োজন হয়নি। এসব ছাড়া আর যে জিনিসটা আমার কাছে থাকার কথা, ছিলও এই কিছুক্ষণ আগে, আমার পাঁচ আঙুলে তার ছোঁয়া আমি তখনও স্পষ্ট কল্পনা করতে পারছি, আমার মেরুন কামিজের কোলে শুয়ে থাকা তার অবয়ব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ঘন নীল, চৌকো, ওপরে সোনালি কালিতে কয়েকটা শব্দ লেখা।

ঘরে আগুন লাগলে কী নিয়ে ছুটে বেরোবো এ প্রশ্ন যখনই উঠেছে, বিনা দ্বিধায় আমি বলেছি, পাসপোর্ট। ভোটার কার্ড না, আধার না, আমার অফিসের আই কার্ড না, এমনকি অর্চিষ্মানও না, পাসপোর্ট। (যদিও লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে এবার থেকে অর্চিষ্মানকে নিয়ে বেরোনোটা পাসপোর্ট নিয়ে বেরোনোর থেকে বুদ্ধিমানের হবে। পাসপোর্ট নিয়ে অর্চিষ্মানকে খুঁজতে বেরোনো অসম্ভব, কিন্তু নতুন পাসপোর্টের জন্য দৌড়োদৌড়ি করার সময় অর্চিষ্মান সঙ্গে থাকলে সুবিধে।)

সেই পাসপোর্ট আমার কাছে নেই। কোথাও আগুন লাগেনি কোথাও, কোনও বিপর্যয় ঘটেনি, আমি জাস্ট বসে বসে, একটুও কাঠখড় না পুড়িয়ে, নিজ দায়িত্বে আমার পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেছি। যেমন করে সবাই ছাতা কিংবা রুমাল কিংবা টিফিন বাক্স হারায়।

ব্যাগে দেখলাম, নেই। সামনের খোপে দেখলাম, নেই। উঠে জামা, চাদর ঝাড়লাম, পাসপোর্ট ঝরে পড়ল না। দু’পাশের সহযাত্রীদের তুলে তাঁদের সিট, সিটের মাঝের ফাঁক চেক করলাম, নেই। আইলে বেরিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ে যতদূর চোখ যায় প্লেনের মেঝে পরীক্ষা করলাম। নেই। আমার পাসপোর্ট কোথাও নেই। জাস্ট উবে গেছে। 

টেক অফের তিন মিনিট আগে যতখানি সাড়া ফেলা যায় (আমার পক্ষে) ফেললাম। প্লেনের সহকারীদের তখন তুঙ্গ ব্যস্ততা। তাঁরা জানালেন এই মুহূর্তে তাঁদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়, যা হওয়ার ল্যান্ডিং-এর পরেই হবে। যদি আমার মনে হয় পাসপোর্ট এয়ারপোর্টে ফেলে এসেছি তাহলে আমি প্লেন থেকে নেমে যেতে পারি। 

আমি নামলাম না। কারণ আমি নিরানব্বই শতাংশ নিশ্চিত ছিলাম আমি পাসপোর্ট নিয়ে প্লেনে উঠেছি। আমাকে আরও সাহস দিলেন আমার ডানদিকে বসে থাকা সহযাত্রী। বললেন, ‘আই স ইট ইন ইয়োর হ্যান্ড!’

কিছু কিছু মানুষ থাকেন যারা যে কোনও পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে ক্রাইসিসের মুহূর্তেও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারেন। আমার এই সহযাত্রী সেই গোত্রের। প্রথমেই তিনি আমাকে স্লো ব্রিদিং-এর পরামর্শ দিলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, আমি তোমার জিনিসপত্র চেক করতে পারি? মে বি আ সেকেন্ড পেয়ার অফ আইজ…আমি আমার ব্যাগ ওঁর হাতে গুঁজে দিলাম। বাঁচান আমাকে। তারপর দেখলাম সিস্টেমেটিক খোঁজা কাকে বলে। ভদ্রমহিলা আমার শালটা নিয়ে নিজের কোলে পাতলেন, তারপর ব্যাগ থেকে প্রতিটি জিনিস বার করে শালের ওপর ঝেড়ে ঝেড়ে দেখলেন। 

পাসপোর্ট বেরোলো না। 

‘বাট আই স ইট ইন ইয়োর হ্যান্ড! ইট মাস্ট বি ইনসাইড দ্য প্লেন!’

ততক্ষণে প্লেন মেঘটেঘের দুলুনি পেরিয়ে শান্ত আকাশে ভেসে চলেছে। আমার মাথার ভেতরের পরিস্থিতির সঙ্গে তার চালের কোনও মিল নেই। সিটবেল্ট বাঁধার সাইন অফ করে দেওয়া হয়েছে। আমি উঠে আবার চারদিক খুঁজে দেখলাম। সহযাত্রীরা কেউ সাহায্য করলেন, কেউ সোজা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পাসপোর্ট নেই।

আমি ফেরত গিয়ে মাথা সিটে হেলিয়ে চোখ বুজলাম। একটু আগের কনভিকশনটা, যে পাসপোর্ট কোথাও যেতেই পারে না, ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল। হয়তো আমি পাসপোর্টটা নিয়ে প্লেনে উঠিনি। বোর্ডিং-এর আগের মুহূর্তে বোর্ডিং পাসের সঙ্গে আমার পাসপোর্টটাও চেক করেছিল। তারপর আমি ভেস্টিবিউল দিয়ে দেড়শো পা হেঁটে প্লেনে উঠেছি। হয়তো সেখানে আমার হাত থেকে পাসপোর্ট পড়ে গেছে।

খাবার এল। প্লেনের খাবার সবাই দূরছাই করে, আমার দিব্যি লাগে। বাড়িতে কেমন বোরিং থালাবাটি, এখানে কেমন প্লাস্টিকের বাক্স থেকে প্লাস্টিকের কাঁটা বিঁধিয়ে খাওয়া। কোনওমতে ফয়েল তুলে কাঁটার ডগায় একখানা পাস্তা গেঁথে মুখে পুরলাম। অসম্ভব। আমার সারা শরীর টেনশনে দরজা বন্ধ করে খিল তুলে দিয়েছে, একবাটি তো দূরঅস্ত, একটা পাস্তারও জায়গা নেই।

ফ্রাংকফুর্ট এসে গেল। ওড়ার আগে পাইলট বলেছিলেন মোটে ঘণ্টা আড়াইয়ের মামলা, যদিও আমার মনে হল পাঁচঘণ্টার এক সেকেন্ড কম নয়। সবাই নেমে গেল। ডানপাশের ভদ্রমহিলা আমার হাত চেপে ধরে আমার চোখে চোখ ফেলে বলে গেলেন, ‘ইট ইজ নট লস্ট। নাথিং ইজ এভার লস্ট। রিমেমবার দ্যাট।’ আমার বাঁদিকের মেয়েটি, ওঠার পর থেকে যে জানালার দিকে তাকিয়ে মুখে রুমাল চেপে ক্রমাগত নিঃশব্দে কেঁদেছে, কান্না থামিয়ে আমার পাসপোর্ট খুঁজেছে, খোঁজা শেষ করে আবার মুখ ফিরিয়ে কেঁদেছে, বলে গেল, ‘গুড লাক’।

প্লেন খালি হয়ে গেল। আমি আবার আমার ব্যাগ, সামনের খোপ পরীক্ষা করলাম। সাষ্টাঙ্গ শুয়ে পড়ে প্লেনের মেঝে পরীক্ষা করলাম। যতদূর চোখ যায় কেবল ব্যবহৃত টিসু, বালিশের ছেঁড়া প্লাস্টিক, হেডফোন। আমার পাসপোর্ট নেই।

প্লেনের বাইরে ‘পোলিৎজাই’ লেখা বর্মের মতো কালো জ্যাকেট পরা তিনজন দাঁড়িয়ে ছিলেন, আমাকে বললেন, ‘সো, ম্যাম, ইউ ডু নট হ্যাভ ইয়োর পাসপোর্ট উইথ ইউ?’

‘নো।’ বললাম আমি।

আর বলামাত্র গোটা ঘটনাটা এই এতক্ষণ পর স্বমূর্তিতে প্রতিভাত হল। এতক্ষণ এত খোঁজাখুঁজি যেন একটা ট্রেজার হান্ট, পাসপোর্টটা কোনও খাঁজ থেকে বেরিয়ে এসে পিঠে ধাপ্পা দিলেই খেলা শেষ। কিন্তু শেষ হয়নি। খেলা সবে শুরু হয়েছে। আমি একটা অন্য দেশে এসে নেমেছি, পাসপোর্ট ছাড়া। এখন তিনজন পুলিশ আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।

যতক্ষণ আশা থাকে, ততক্ষণই ছটফটানিও থাকে। ওয়ার্স্ট যা হওয়ার হয়ে গেছে, এবার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কেউ আমাকে আর বাঁচাতে পারবে না। ঘটনাটার হাস্যকরতা, যদি কিছু থেকে থাকে, সেটার ওপর ফোকাস করলাম। পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলাম, এর পর কী কী হবে আমার। প্লেনেও এই প্রশ্নটা করেছি, সহযাত্রী এবং প্লেন কর্তৃপক্ষ কেউই সদুত্তর দিতে পারেননি। নিজেরা তো নয়ই, তাঁরা এর আগে কাউকে দেখেনওনি বা কারও কথা শোনেননি যে পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেছে। কাজেই আমার কপালে কী নাচছে সে সম্পর্কে কেউ আমাকে সাবধান করতে পারেননি। একজন বলেছিলেন, সম্ভবত তোমাকে ফিরতি প্লেনে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে, বাট আই ডোন্ট নো।

পুলিশরাও পারলেন না। বলা বাহুল্য, আমার কেস হ্যান্ডল করার জন্য সিনিয়ার অফিশিয়ালদের পাঠানো হয়নি, যারা এসেছে তারা সবাই অল্পবয়সী, নভিস পুলিশ। তাঁরা বললেন, আমরা দেখিনি, কিন্তু হতেই পারে না তোমার আগে আর কেউ কখনও পাসপোর্ট হারায়নি। ইউ আর নট দ্য ফার্স্ট (ইডিয়ট) অ্যান্ড ইউ সার্টেনলি ওন্ট বি দ্য লাস্ট।

এইটুকু সান্ত্বনাই তখন আমার কাছে যথেষ্ট।

বনে আমার পৌঁছনো দরকার সন্ধ্যে ছ’টার আগে। সেই অনুযায়ী টিকিট কাটা হয়েছে, যাতে ফ্রাংকফুর্টে দুপুরবেলা নেমে ট্রেনে চেপে বিকেলের মধ্যে বনে পৌঁছোতে অসুবিধে না হয়। এখন আর সে চান্স নেই। কিন্তু দেরি নিয়ে আমি ভাবছিলাম না। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। মনে পড়ছিল, রওনা দেওয়ার আগের সন্ধ্যেবেলায় অর্চিষ্মানের সঙ্গে দু’নম্বর মার্কেটে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে হঠাৎ কেমন মনখারাপ হয়েছিল। হলই বা সাত দিন, যে গতিতে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছি তাতে এক্সট্রা সাত দিনের অর্চিষ্মানের সঙ্গের মূল্য না বোঝার মতো বোকা আমি নই। সাত দিন একসঙ্গে থাকা যেত, মিনিমাম চোদ্দ বার একসঙ্গে চা খাওয়া যেত। জেনারেলি এ রকম বোকা বোকা মনখারাপ আমার হয় না, হয়েছিল যখন তখন কি সাবধান হওয়া উচিত ছিল যে সামনে একটা বিপদ আসতে চলেছে? মনে পড়ল ইস্তানবুল এয়ারপোর্ট দিয়ে হাঁটার সময় উল্টোদিক থেকে আসা একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে হাতে ধরা পাসপোর্ট, পাসপোর্টের ভেতরের বোর্ডিং পাস সব ছত্রাকার হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছিল, যিনি ধাক্কা দিলেন তিনি পরিণতির দিকে দৃকপাত না করে চলে গেলেন, আর আমি সব কুড়িয়ে কুড়িয়ে তুললাম, তখন লোকের অভদ্রতায় নতুন করে চমৎকৃত হওয়ার থেকে কি অশুভ ইঙ্গিতটা খেয়াল করা উচিত ছিল? যে আমার পাসপোর্ট অচিরেই আমার হাতছাড়া হতে চলেছে?

প্রথমে আমাকে এয়ারপোর্টের ওই তলারই ফেডেরাল পুলিশের শাখা অফিসে নিয়ে যাওয়া হল। ততক্ষণে আমার অন্যান্য পরিচয়পত্র (ভোটার, প্যান কার্ড) তাঁরা হস্তগত করেছেন। সেখানে আমার সমস্যা নিয়ে গুরুতর আলোচনা চলল, বলা বাহুল্য তার একটি বর্ণও আমার বোধগম্য হল না। একে তাকে ফোন করা হল, তারপর আমাকে জানানো হল যে আমাকে এয়ারপোর্টের পুলিশের হেড অফিসে যেতে হবে, সেখানে স্থির হবে আমার কী হিল্লে করা হবে।

রওনা দিলাম। এয়ারপোর্টের মধ্যে দিয়েই রাস্তা, কিন্তু আমার চেনা রাস্তা নয়। যে সব দরজায় লাল রং দিয়ে ‘ডু নট এন্টার’ লেখা থাকে দেখেছি এতদিন, সে সব দরজা পুলিশরা নিজেদের কার্ড দিয়ে খুলে ফেললেন। খাঁ খাঁ করিডর, এদিকের দরজা যতক্ষণ না বন্ধ হয় ওদিকের দরজা খোলে না, এইসব গুরুতর সিকিউরিটি পেরিয়ে পুলিশপরিবৃত হয়ে আমি চললাম। সিঁড়ি চড়লাম, নামলাম, ডায়ে বেঁকলাম, বাঁয়ে বেঁকলাম, আবার সিঁড়ি চড়লাম, আবার নামছি, এমন সময় চোখ গেল সামনে নিচের দিকে একটা ঘরের দিকে। কাচের দরজার ভেতর কোটি কোটি ইউনিফর্ম পরা পুলিশ কিলবিল করছে। নির্দেশ পাওয়া মাত্র হই হই করে ক্রিমিন্যাল নিধনে বেরিয়ে পড়বে। ওর মধ্যে আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গতি আপসে খানিকটা শ্লথ হয়ে এল। আমার সামনের পুলিশ কী হল দেখতে ঘাড় পেছনে ঘোরালেন তাই মিস করে গেলেন, কিন্তু আমি দেখতে পেলাম সামনের ঘরের ভেতর থেকে দরজা ঠেলে একজন নীল জ্যাকেট বেরিয়ে এসেছেন, হাত উঁচু করে ধরা, সে হাতে ছোট নীল রঙের একটা বই, গায়ে সোনালি রঙের ছিটে। 

আমি জানি ওগুলো কী। ওগুলো হচ্ছে কয়েকটা শব্দ। রিপাবলিক অফ ইন্ডিয়া। 

আমার পাসপোর্ট সবার হাতে হাতে ঘুরল। সবাই পাতা উল্টে উল্টে দেখল যে ওটা আমারই পাসপোর্ট কি না, ছবি তুলে ধরে ভুরু কুঁচকে আমার মুখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল, তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে পাসপোর্টটা আমার বাড়ানো হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘ইউ আর ভেরি লাকি।’

‘আই নো।’ ছাড়া আর কিছু বলার ছিল না আমার। একবার জিজ্ঞাসা করলাম, কোথা থেকে পেলে? তাতে ‘ইট ওয়াজ ইনসাইড দ্য প্লেন’ ছাড়া আর কিছু জবাব পেলাম না। মারাত্মক কৌতূহল হচ্ছিল প্লেনের এক্স্যাক্টলি কোথায় ছিল পাসপোর্টটা। যে সব জায়গায় আমি পাঁচশোবার করে খুঁজেছিলাম সেখানে? আমার সিটের নিচে? আমার সামনের খোপে? সিটের খাঁজে? সামনের রোয়ের যে লোকটা অত হল্লার মধ্যেও নির্বিকার মুখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল তার পকেটে? কিন্তু সে সবের উত্তর দেওয়ার সময় কারও ছিল না। 

পাসপোর্টটার গায়ে একবার হাত বুলিয়ে ব্যাগে পুরে নিলাম। এখন যে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, সেমিনার শুনতে শুনতে, ডিনার খেতে খেতে দশ মিনিট অন্তর অন্তর ব্যাগ খুলে পরীক্ষা করে নিচ্ছি সব ঠিকঠাক আছে কি না, তা দেখে নিশ্চয় সবাই আমাকে পাগল ভাবছে। কিন্তু আপনারা নিশ্চয় ভাববেন না।



November 18, 2017

কয়েকটা লিংক





“For me there are only two kinds of women: goddesses and doormats.”
                                                                         —Pablo Picasso  (উৎস)
    

আজকের জেওপার্ডি কুইজঃ জর্জ অরওয়েলের মতে হোয়াট ইজ the lunatic modern habit of identifying oneself with large power units and seeing everything in terms of competitive prestige.” ?

"It introduces Miss Marple who I love much more than the irritating Poirot because her reasoning is always rooted in human nature." এতে কাজ দিত, কিন্তু আরও আছে। "Christie doesn’t often get credit for the sly humour that runs through much of her work," আমি ভ্যাল ম্যাকডারমিডের কোনও বই পড়িনি, এবার পড়ে দেখতে হবে।

আমার ফেভারিট প্ল্যান? প্ল্যান ক্যানসেল করা। 




পি এইচ ডি করে কী হবে যদি কেউ বলে তাদের জবাব দেওয়া যেতে পারে, একশো বছর আগের কোনও খুনের কিনারা তো হতেই পারে।

আমি এদের বলা কোনও রকম রিডার টাইপেই পড়ি না। আপনি পড়েন কিনা দেখুন তো।


November 13, 2017

হ্যাপি বার্থডে, রোহিত!




রোহিতের বয়স পাঁচ হল। রোহিত আন্টিজির নাতি। জন্মদিনে রোহিত নতুন জামা পরে চকোলেটের প্যাকেট নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল। রোহিতের সব বন্ধুরা চকোলেট পেয়েছে। আমিও বাদ পড়িনি।

November 12, 2017

কচুরি জিলিপি কুলফি চাট বান্টা



রোশনারা বাগ থেকে উবারে আধঘণ্টা মতো গেলেই এদিকে চাওরি বাজার আর ওদিকে চাঁদনি চক মেট্রো ষ্টেশন। এই দুই মেট্রো স্টেশনের আশেপাশের চত্বরটাই হচ্ছে, বড়লোক দেশের টুরিস্টদের মতে ‘রিয়েল’ দিল্লি বা ‘রিয়েল’ ইন্ডিয়া।

এই জায়গাটা ‘রিয়েল’ ফুডিদের মক্কাও বটে। ইতিহাসচর্চা শেষ হতে হতে আমাদের ক্ষিদে পেয়ে যাবে জানতাম। ঠিক করেই রেখেছিলাম সে ক্ষিদে এখানে গিয়ে মেটাব। কচুরি, জিলিপি, পরোটা, রাবড়ি যা প্রাণে চায় খাব। 

ব্যাপারটা শুনতে যতটা সোজা মনে হচ্ছে, আসলে অতটা সোজা নয়। সোজা হতে পারত, যদি না কোটি কোটি রিয়েল ফুডি এই চত্বরে গিয়ে নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার করতেন এবং কোটি কোটি টুইট, ফেসবুক স্টেটাস, ব্লগপোস্ট, ইউ টিউব ভিডিও এমনকি বই পর্যন্ত লিখে সে সব আবিষ্কারের কথা চারদিকে ফলাও করতেন।

কারও আবিষ্কারের সঙ্গে কারও আবিষ্কারের মিল নেই। কেউ বলে রামের কুলফি অথেনটিক, কেউ বলে শ্যামের, কেউ বলে যদুরটা না খেলে জীবনের সব কুলফি খাওয়া বৃথা। রিসার্চ করতে করতে মাথা ভোঁ ভোঁ, চোখে সর্ষে ফুল। ক্ষান্ত দিলাম। ঠিক করলাম, যে কোনও একজন এক্সপার্টের কথা মেনে চলব। তিনি ঠিক হোন, ভুল হোন, আমরা বিচার করব না, তাঁর পছন্দই আমাদের পছন্দ, তাঁর রেকোমেন্ডেশনই আমাদের গীতা বাইবেল কোরান।

সে এক্সপার্ট হলেন ইয়ামরাজ। পুরোনো দিল্লির রাস্তার খাবারের গাইড হিসেবে ইয়ামরাজের এই পোস্টটা মহামূল্যবান, আর সবথেকে কাজের হচ্ছে পোস্টের সঙ্গে ফাউ ইয়ামরাজের হাতে আঁকা ম্যাপ। আমাদের অসম্ভব কাজে দিয়েছে। 

ম্যাপ দেখে প্রথমেই যে জিনিসটা পরিষ্কার হল সেটা হচ্ছে ইয়ামরাজের সাজেস্ট করা সব খাবার একবারে খাওয়া যাবে না। একই ট্রিপে কুলচা, কচুরি, কুলপি, রাবড়ি, সোহন হালুয়া খেতে গেলে শিবুর কলকাতা ভ্রমণের পরিণতি হতে পারে। 

আরও বুঝলাম, আমরা খেতে খেতে চাঁদনি চক থেকে চাওরি বাজার মেট্রোর দিকে হাঁটতে পারি, কিংবা চাওরি থেকে চাঁদনির দিকে। আমরা চাট দিয়ে খাওয়া শুরু করব ঠিক করলাম, সেটা করার জন্য চাওরি থেকে হাঁটা শুরু করাই সুবিধেজনক।

চাওরি বাজার মেট্রো স্টেশনের সামনে উবার ভাইসাব নামিয়ে দিলেন, কয়েকপা এগোলেই একটা পাঁচ না ছ’মুখো মোড়, তার এক কর্নারে অশোক চাট কর্নার। একটা চিলতে খুপরি, তার মধ্যে বিভিন্ন পাপড়ি এবং মশলা এবং বরফভাসা দইয়ের ডেকচি। পেটের জায়গা ম্যাক্সিমাইজ করতে আমাদের একটা স্ট্র্যাটেজি ছিল সব এক প্লেট করে খাওয়া। আমরা কলমি বড়া চাট নিলাম, (ইয়ামরাজের দুটো রেকোর মধ্যে একটা), কলমি বড়া, আলুসেদ্ধ, মটরসেদ্ধ, লাল সবুজ চাটনি ইত্যাদি আরও ইউজুয়াল সাসপেক্টস দ্বারা শোভিত হয়ে হাতে চলে এল। কোনওমতে ক্যামেরা ব্যাগে পুরে, আমরা দু’জনে দু’খানা চামচ দিয়ে প্লেটের দু’দিক থেকে চাট তুলে মুখে পুরলাম . . .এবং উল্লাসে ফেটে পড়লাম না।


অশোক চাট কর্নারের চাট ভালো, কিন্তু অভূতপূর্ব কিছু নয়। এরকম চাট আমি আগেও খেয়েছি, পরেও খাব। সত্যি বলতে চাট কত ভালো হওয়াই বা সম্ভব? (উল্টোটাও সত্যি, খুব অখাদ্য চাট আমি আজ পর্যন্ত খাইনি।) আমাদের মনে কেমন একটা আশা তৈরি হয়েছিল যে এই চারপাশের হল্লাহাটি, ওপচানো ভ্যাট, লোম উঠে গিয়ে গোলাপি চামড়া বেরিয়ে যাওয়া খোঁড়া কুকুর, বিকলাঙ্গ ভিখিরি, আর থুতুর টাটকা দলা যা প্রায় ওয়াসিম আক্রমের বলের মতো লাস্ট মিনিটে ঘুরে গিয়ে আমার গায়ের বদলে ফুটপাথে পড়ল, সে সবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খেলে চাটের স্বাদ ম্যাজিকের মতো বেটার হয়ে যাবে।

হল না। 

অভিযানের শুরুতেই কেমন একটা ব্যোমকানো ভাব হল। পরের গন্তব্যের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। সীতারাম বাজারের গলি বেয়ে কয়েক পা গিয়ে ডানদিকে ঢুকে তস্য গলির মধ্যে দিল্লির অন্যতম শ্রেষ্ঠ (কোনও কোনও বিশেষজ্ঞের মতে, অন্যতমটম নয়, স্রেফ শ্রেষ্ঠ) কুলফির দোকান, কুরেমল মোহনলাল কুলফি। চাপা গলির মাথার ওপর ইলেকট্রিকের তারের মাকড়সার জাল, দুপাশে  অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যওয়ালা বাড়ি।

দোকানের সামনে গিয়ে দেখি শাটার বন্ধ।

কার মুখ দেখে উঠেছিলাম বল তো? অর্চিষ্মানকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও করলাম না। 


কুরেমল মোহনলালের উল্টো ফুটে, সামান্য কোণাকুণি,  শ্রী দুলিরাম নরেশ গুপ্তার কুলফির দোকান। 

একটা দোকান কেন বিখ্যাত হয়, আর ঠিক তার দশ হাত দূরের একটা দোকান কেন হয় না? শুধুই কি কুলফির গুণগত তারতম্যের জন্য? নাকি ভাগ্যদেবতার পার্শিয়ালিটিও ম্যাটার করে?

সম্ভবত করে।

আর যদি গুণগত তারতম্য থেকেই থাকে, আমাদের জিভে সে তারতম্য ধরা পড়ার কি কোনও সম্ভাবনা আছে?

বিন্দুমাত্র না।

দুলিরামে ঢুকে পড়লাম। এক প্লেট কেসর পিস্তা কুলফি, চল্লিশ টাকা।


এই মটকা কুলফির বাইরেটা বেশ শক্ত। সাধারণ কাঠের চামচের বদলে তাই বোধহয় শক্ত কাঠের টুকরো দেওয়া হয়, তা দিয়েও ম্যানেজ করা কঠিন। সবথেকে ভালো হচ্ছে হাতে তুলে নিয়ে কামড়ে কামড়ে খাওয়া। ইলেকট্রিক তারের জাল ভেদ করে মিষ্টি রোদ চেয়ারে এসে পড়ছে। আমরা বসে বসে কুলফি খেতে লাগলাম। মোলায়েম, মাপা মিষ্টি। বাদামের সুগন্ধওয়ালা ঘন দুধ প্রাণ জুড়িয়ে দিল। আমাদের নেতানো স্পিরিট চাঙ্গা করে দিল। আছে আছে, আশা আছে! 

মেন গলিতে ফিরে এসে চাঁদনি চক মেট্রোর দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। দু’পাশে সারি সারি দোকান, বেশিরভাগই কাপড়ের। সরু গলির দিয়ে আপ ডাউন দুদিকেই গাড়ি চলার কথা। যদিও এখন একদিকে কেউ চলছে না,  লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন চিৎকার করে খবর নিলেন, ‘আবে, কোই মর গয়া কেয়া?’এমন সময় পেছন থেকে তীরবেগে একটা রিকশা আসতে দেখা গেল। রং সাইডের ফাঁকা অংশটুকু ধরে সাঁ সাঁ এগোচ্ছে। যাত্রী একজন বছর পঁচিশের যুবক, কোলে ল্যাপটপ ব্যাগ, হাত বাড়িয়ে চালককে অভয় দিচ্ছেন, ‘আগে লে লো, আগে লে লো।’ আমরাও পায়ে পায়ে এগোলাম। গলি আরও সরু হয়ে এল, বাজার আরও ঘন হয়ে এল। দোকানের বাইরে চটি আর নাকমুখচোখহীন ম্যানেকুইনের ভিড়, ভেতরে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল টিউব লাইটের নিচে ধপধপে তাকিয়ায় সরু মোটা লম্বা বেঁটে খদ্দের চুমকি জরির পাহাড় ঘিরে বসে আছেন। 

ক্রমে হাঁটা অসম্ভব হয়ে উঠল। পাশাপাশি হাঁটার প্রশ্নই নেই। আমি অর্চিষ্মানের শার্ট ধরে চলতে লাগলাম, এই বাজারে আলাদা হয়ে গেলে আর দেখতে হবে না। এর মধ্যে জ্যামের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি পৌঁছেছি। না, কেউ মরেনি, কোনও এক শাড়ির দোকানে কিছু একটা ফাউ দেওয়া হচ্ছে সম্ভবত। হাজারখানেক লোকের লাইন ফুটপাথ উপচে রাস্তায় এসে পড়েছে। চেনা দুটো মুখ দেখলাম, সেই আগের যুবক যাত্রী এবং রিকশাচালক। এখন তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকা রিকশার লাইন ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করছেন। 


আর এই বর্ণ, শব্দ, গন্ধের বিস্ফোরণের মধ্যে লাইন দিয়ে রিকশায় বসে আছেন সাহেবমেমেরা। কেউ চুপ করে বসে আছেন, কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ রিকশাচালকের হাতে ক্যামেরা তুলে দিয়ে হাসিমুখে পোজ দিচ্ছেন, কেউ ঘাড় তুলে মাথার ওপরের মাকড়সার জালের মতো ইলেকট্রিকের তার দেখছেন, কেউ রিকশার পাশ দিয়ে কনুইয়ে গোঁতা মেরে চলে যাওয়া ষাঁড়ের শিং-এর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। সবারই চোখেমুখে এক অদ্ভুত আলো। রিয়েল ইন্ডিয়া দেখছেন তাঁরা। 

আমরা ডানদিকে বেঁকে গলিতে ঢুকে গেলাম। এই গলির মাপ আগের গলির অর্ধেক, আর দোকান, চটি, মানুষ, খদ্দের, রিকশা, সাহেবমেম আগের গলির চারগুণ। 

এটাই হল পরাঠাওয়ালি গলি। দু’দিকে গরম তেলের কড়াইতে পরোটা ডিপ ফ্রাই হচ্ছে। আমরা পরোটা খাব না, আমরা খাব কচুরি। ইয়ামরাজের ম্যাপ অনুযায়ী আর খানিকটা এগিয়েই জে বি কচুরির দোকান থাকার কথা।

এইসব দোকানগুলোর বেশিরভাগই সম্ভবত একটা বেঞ্চি বা দু’হাত বাই চার হাত খুপরি। চোখ রীতিমতো খোলা না রেখে চললে যে কোনও মুহূর্তে মিস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। দোকানের মাথার বোর্ডে বা দেওয়ালের গায়ে রঙের পোঁচ দিয়ে লেখা নাম পড়তে গিয়ে হাঁটার গতি তিলমাত্র ঢিলে হলে পেছন থেকে হুংকার আসছে, ‘ম্যাডাম, আগে বাঢ়ো!’ অনেকক্ষণ হেঁটে যখন গলি শেষ হওয়ার জোগাড়, আর ধরেই নিয়েছি কচুরির দোকান নির্ঘাত মিস হয়ে গেছে অমনি অর্চিষ্মান চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওই তো!’


দুজনে দুটো হাফ প্লেট কচুরি নিয়ে, কোনওমতে একটা ছবি তুলে, জঞ্জালের নীল ড্রামের গা যথাসম্ভব বাঁচিয়ে, প্রায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে সবজির ঝোলে কচুরি ডুবিয়ে নিয়ে কামড় বসালাম।

এত ভিড়, এত ধমকাধমকি, এত কনুইয়ের গুঁতো সার্থক হল। 

এ ক্লাস খাস্তা কচুরির যা যা শর্ত, ভেতরটা নরম, বাইরেটা মুচমুচে, একটুও তেলতেলে নয়, পর্যাপ্ত এবং সুস্বাদু মশলাদার ডালের পুর, সব শর্তই পূরণ করেছে  জে বি-র কচুরি। কিন্তু এত করেও শেষরক্ষা করতে পারেনি, সঙ্গী আলুর তরকারির সামনে ম্লান হয়ে গেছে। 

এ আলুর তরকারির সে সব কিছুই আছে, যা আমার নেই। ‘ক্যারেকটার’, ঝাঁজ, আলাদা হওয়ার ক্ষমতা এবং সাহস, মেরুদণ্ড। এ তরকারি নিড়বিড়ে নয়। জিভে পড়া মাত্র পঞ্চেন্দ্রিয় কান খাড়া করে চোখ গোল করে টানটান হয়ে বসে। আর প্রথম দু’চামচ মুখে দেওয়ার পর টের পাওয়া যায় ঝালটা। আমার জিভের দু’পাশ আর গলার কাছ গরম হয়ে উঠল, অর্চিষ্মানের দেখি চশমার আড়ালে চোখ ছলছল, নাকের ডগা লাল, কপালে ঘামের বিন্দু, ঠোঁটে হাসি। 

ইমিডিয়েট মিষ্টি কিছু একটা খাওয়া দরকার, আশেপাশে কোটি কোটি রাবড়ির দোকান, কিন্তু আমাদের টু ডু লিস্টে নেক্সট আইটেম জিলিপি। যত দ্রুত সম্ভব হাঁটা লাগালাম। পরাঠাওয়ালি গলি থেকে চাঁদনি চক মেট্রোর দিকে বেরিয়ে ডানদিকে, গুরুদ্বারা পেরিয়ে, (গুরুদ্বারায় আবার কী যেন একটা হচ্ছে, ফুটপাথ উপচে রাস্তার ওপর এসে পড়েছে মোমবাতির স্টল, লাইন দিয়ে সবাই শালপাতায় প্রসাদ নিচ্ছেন) মোড়ের মাথায় ওল্ড ফেমাস জলেবিওয়ালা। আমরা যখন গেছি, জিলিপি ভাজা চলছে। নিজেদের খুবই ভাগ্যবান মনে করেছিলাম তারপর বুঝলাম ব্যাপারটা ভাগ্যটাগ্যর নয়। প্রতি ব্যাচই ভাজার তিন মিনিটের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আগের ব্যাচের ভাঙা গুঁড়ো যা পড়ে থাকে, নেক্সট ব্যাচের ওজন অ্যাডজাস্ট করার কাজে লাগে।


এই হচ্ছে একশো গ্রাম জিলিপি। এর বর্ণনা কী ভাবে দেব আমি জানি না। ফার্স্ট ক্লাস জিলিপি যেমন খেতে হওয়ার কথা, ওল্ড ফেমাস জিলিপিও ঠিক সেইরকমই খেতে।

পেট যা ভরেছিল, মনে হচ্ছিল আর বোধহয় জীবনে কোনওদিন কিছু খেতে পারব না। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল বেদপ্রকাশের বান্টার সাইনবোর্ড। আমি আমার গ্লাসের দিকে ফোন তাক করছি দেখে ভাইসাব বললেন, ‘রুকিয়ে রুকিয়ে’, বলে একজনকে আদেশ দিলেন ‘ঢক্কন’ লাগিয়ে দিতে। ফোটো ভালো আসবে।


এই হচ্ছে ফোটো তোলার জন্য ঢাকনা পরা সাজাগোজা বান্টা। ভাইসাবের এত সহযোগিতা সত্ত্বেও এত খারাপ ছবি তুলেছি, লজ্জার ব্যাপার।


জামা মসজিদে পৌঁছে দেখি, আমাদের সঙ্গে সকালে যারা রোশনারা বাগে ছিলেন, তাঁদের কয়েকজনও মসজিদের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছেন। ওঁরাও নাকি থিয়েটার ওয়াক সেরে, ওল্ড দিল্লির স্ট্রিট ফুড এক্সপ্লোর করে জামা মসজিদ ঘুরতে এসেছেন। ভেবেছিলেন করিমসে খাবেন, কিন্তু পেট ভরে গেছে বলে প্যাক করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া স্থির করেছেন।

আমরা সবাই কী ভীষণ একে অপরের মতো আরও একবার টের পেয়ে আশ্চর্য হলাম।



November 10, 2017

খাতায় কলমে



বয়স হলে কোমর যায়, হাঁটু যায়, চোখ যায়, সবথেকে বেশি যায় মনঃসংযোগ। কতরকম টেকনিক ফলো করলাম, প্রাণায়াম, পোমোদোরো। পঁচিশ মিনিট কাজ, পাঁচ মিনিট ব্রেক। পঁচিশ মিনিট কাজ, পাঁচ মিনিট ব্রেক। প্রথম কয়েকদিন বেশ কাজও দিয়েছিল, তারপর আবার যে কে সেই। 

আফসোস আরও বেশি হয় যখন মনে পড়ে এককালে মনঃসংযোগের ক্ষমতা কত বেশি ছিল। মা বলেন, ঝুঁকে পড়ে গল্পের বই পড়তাম আর কেউ ‘সোনা’ বলে ডাকলে চমকে উঠে হাতপা ছুঁড়ে হার্টফেল হওয়ার জোগাড় হত। ভয়ে লোকে ডাকত না।

আপনারা বলতে পারেন, গল্পের বই মন দিয়ে পড়া দিয়ে মনঃসংযোগের বেশিকম প্রমাণ হয় না। সিঁড়িভাঙা সরল কিংবা ভারতের ম্যাঙ্গানিজ উৎপাদক রাজ্যের লিস্ট মুখস্থ করার সময় মন লাগাতে পার তো বুঝি।

মন তাতেই বসে যা করতে ভালো লাগে। যা ভালো লাগে না, তাতে মন বসে না। অফিসের কাজ, বাড়ি পরিষ্কার। কত রকমের যে ঠ্যাকনা লাগে। কানে হয় গান গোঁজো, নয় সানডে সাসপেন্স। পাঁচশো বার জল খাও। চুল আঁচড়াও। মাকে ফোন কর। অর্চিষ্মানকে পিং। ভাবো দু’ঘণ্টার মধ্যে যদি আবার ফোন করে জিজ্ঞাসা করি, ‘কী চলছে?’ তিন্নি পাগল ভাববে কি না।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে যা করতে আমার ভালো লাগে তাতেও আমার ইদানীং মন বসে না। সাতানব্বই পাতার বই, সাতাশ দিনেও শেষ হয় না। রোজ সকালে মোটে দু’ঘণ্টা নিশ্চিন্তে টাইপ করার সময়, সেই দু’ঘণ্টা আমি কীভাবে নষ্ট করি ভাবলে নিজের গায়েই কাঁটা দেয়। 

সব রহস্য সমাধানের গোড়ার ধাপ হচ্ছে মোটিভ আবিষ্কার। কেন আমার মন বসছে না? 

বা আমার ক্ষেত্রে প্রশ্নটা হবে, কার জন্য মন বসছে না?

আমার জীবনের সব গোলমালের জন্য আমার আলস্য, আমার একাগ্রতার অভাব, আমার ফাঁকি দিয়ে বাজিমাতের চেষ্টা ইত্যাদিকে দায়ী করা যায়, কিংবা অন্য কারও ঘাড়ে দোষ চাপানো যায়। আমি জুৎসই ঘাড় খুঁজতে লাগলাম। সুবিধেজনক ঘাড় বলতে অর্চিষ্মানেরটা আছে, হাতের কাছেও আছে, ল্যাম্পের আলোর বৃত্তের পরিধির বাইরেই আবছা অন্ধকারে ঘুমোচ্ছে, কিন্তু লজ্জা হল। যেটুকু হচ্ছে ও আছে বলেই হচ্ছে। ও না থাকলে এটুকুও হত না।

খোঁজা জারি রাখলাম। টেবিলের ওপর দেওয়ালে যামিনী রায়ের কপিতে শুঁড় তোলা বটল গ্রিন হাতির ঘাড়ে টুকটুকে লাল ঠোঁটের হাসি হাসি বাঘ, বাঘের ঘাড়ে রাণীমা বসে আছেন। ডানদিকে বুককেসের ওপর লকলকিয়ে উঠেছে সানসিভিয়েরা প্ল্যান্ট, ধারালো পাতা দেখে নিন্দুকে যার নাম দিয়েছে ‘শাশুড়ির জিভ’। তার ঘাড়েও দোষ চাপাতে লজ্জা হল, কারণ আমার কোনও ক্ষতি তো সে করেইনি, উল্টে এই বাজারে ঘরের বাতাস পরিশুদ্ধ করছে। দেখেশুনে যখন ভয় লাগতে শুরু করেছে শেষমেশ সব দোষটা নিজের ঘাড়েই নিতে হয় নাকি, তখন আরেকজনের উপস্থিতি টের পেলাম। আমার চোখে নীল চোখ রেখে তাকিয়ে আছে আমার ল্যাপটপ।

ওই ল্যাপটপের ভেতর বাস করে এক ভয়ংকর রাক্ষস। রাক্ষসের নাম ইন্টারনেট। রাক্ষসের খোরাক আমার সময়। চব্বিশ ঘণ্টা, সাত দিন, বারো মাস।

ল্যাপটপ ত্যাগ দিয়ে আপাতত খাতাপেনে ফিরে গেছি। অন্তত সকালের সময়টুকুর জন্য।

এত ড্র্যাস্টিক পদক্ষেপ কেন? ল্যাপটপেই কি মানিয়েগুছিয়ে নেওয়া যেত না? তাছাড়া সমস্যা তো ল্যাপটপ নয়, ইন্টারনেট। কত অ্যাপ আছে, চালু করলেই একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু সে সবে আমার ভরসা নেই। যে সংযোগ এক ক্লিকে বন্ধ করা যায়, সে সংযোগ আরেক ক্লিকে চালু করতে কী? তাছাড়া ইন্টারনেটের হাত থেকে বাঁচতে যদি আমাকে ইন্টারনেটেরই সাহায্য নিতে হয়, তাহলে কেমন কেমন লাগে।  

কিন্তু ব্যাপারটা একটু উলটপুরাণ হল না? সারা বিশ্ব যখন খাতা ছেড়ে যন্ত্রকে আপন করেছে, তখন এই উল্টোদিকে হাঁটার মানে কী? ল্যাপটপে টাইপ করা খাতাপেনে লেখার থেকে বেশি সুবিধেজনক বলেই না সবাই লিখছে?

সে তো বটেই। ল্যাপটপে লেখার অবভিয়াস সুবিধেগুলো সম্পর্কে আমি সচেতন। 

এক, হাতের লেখার স্পিডের থেকে টাইপ করার স্পিড বেশি। দুই, শব্দসংখ্যা মাপার সুবিধে। সব ওয়ার্ড প্রসেসরেই এ সুবিধে থাকে, ‘ স্ক্রিভনার’ বলে যে প্রসেসরটা আমি গত বছরখানেক ধরে ব্যবহার করছি, তাতে আবার ‘টার্গেট বার’ বলে একটা ব্যাপার আছে। ড্রাফট টার্গেট, সেশন টার্গেট ইত্যাদি। টার্গেট বাক্সে আপনি যত শব্দ লিখতে চান, ধরুন তিনশো, বসিয়ে টাইপ করতে শুরু করলাম, এক, দুই, পাঁচ দশ, যত শব্দসংখ্যা বাড়বে, বারের রং টকটকে লাল থেকে ফিকে লাল থেকে কমলা থেকে হলুদ থেকে ক্রমে সবুজ হবে। রোমহর্ষক ব্যাপার। 

দুঃখের বিষয়, এই সব সুবিধেগুলোই হবে যদি আমি অ্যাকচুয়ালি লিখি। এই পোস্টটাই আমি ল্যাপটপে লিখেছি, এবং সেই লেখার মাঝখানে অ্যাকচুয়ালি কী কী করেছি তার ফিরিস্তি নিচে দিলাম। এই পোস্ট লেখা চলছে তিন দিন ধরে, কাজেই নিজের লিস্টের প্রতিটি আইটেম, ইনটু থ্রি করে নেবেন। 

১। গোটা সতেরো বুকটিউব ভিডিও দেখেছি
২। নিরামিষ পোলাও রেসিপি খুঁজেছি
৩। ধনৌল্টিতে জানুয়ারিতে বরফ পড়ে কি না খবর নিয়েছি
৪। ক্যান্ডি ক্রাশ খেলেছি
৫। ফিডলি চেক করেছি, কেউ নতুন পোস্ট লিখল কি না
৬। লংকার আচারের রেসিপিতে লাইক দিয়েছি 
৭। ক্যান্ডি ক্রাশ সোডা সাগা খেলেছি
৮। মাকে বারতিনেক, তিন্নিকে একবার ফোন করেছি। অর্চিষ্মানের সঙ্গে কতবার চ্যাট করেছি গুনিনি। 
৯। সুইডিশ প্রিন্সেস কেক রেসিপি ভিডিওতে লাইক দিয়েছি।

কেন ল্যাপটপ ছাড়ার দরকার হয়েছিল আশা করি বুঝতে পেরেছেন। 

আট বাই তেরো ইঞ্চির, একশো বিরানব্বই পাতার একটা খাতা আগাপাশতলা শেষ করার পর হাতের লেখা বনাম ল্যাপটপে টাইপ করা নিয়ে কয়েকটা পর্যবেক্ষণ আপনাদের বলি। 

এক, ল্যাপটপের তুলনায় আমার খাতায় ফোকাস করতে বেশি সুবিধে হচ্ছে। হাতে পেন ধরে খাতার ওপর লেখার শারীরিক পরিশ্রম, কি বোর্ডের ওপর আঙুল চালানোর থেকে বেশি। পরিশ্রম বেশি বলেই খাতাপেনে লেখা বেশি মনোযোগ দাবি করে। টাইপ করতে করতে অটো-পাইলটে চলে যাওয়া যত সোজা, খাতাপেনে লিখতে লিখতে তত সোজা নয়। মাথাটা অনেক বেশি সজাগ থাকে।

দুই, কোথায় একটা পড়েছিলাম, লেখার মাধ্যমের সঙ্গে ভাষা বদলায়। আমার ল্যাপটপের বাংলার থেকে খাতাপেনের বাংলা আলাদা কি না আমি বলতে পারব না, তবে দুটোর বাংলা বানান যে সম্পূর্ণ আলাদা সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। খাতায় লেখার সময় ক্রমাগত বাড়ির জায়গায় বাড়ী, গাড়ির জায়গায় গাড়ী, ওই-এর জায়গায় ঐ লিখছি। বেসিক্যালি, আমার ছোটবেলার বানান।

খাতাপেনে লিখে আরেকটা সুবিধে হয়েছে, খাতা থেকে ল্যাপটপে টাইপ করার সময় একবারের রিভিশন ফাউ পাওয়া যাচ্ছে। অনেকসময় একই ফাইলে বার বার কারেকশন করতে বোরিং লাগে, এ তাও একটু বৈচিত্র্য হল। 

সবথেকে ভালো ব্যাপার যেটা হয়েছে, হাতের লেখাটাকে আবার নিজের বলে চিনতে পারছি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম ওটা জন্মের মতো গেছে।


November 06, 2017

এ মাসের বই/ অক্টোবর ২০১৭



আমার প্রিয় বুকব্লগাররা সকলেই অক্টোবর মাসজুড়ে হইহই করে হ্যালোউইন উদযাপন করলেন। এত আনন্দ করে সবাইকে ভূতের বই পড়তে দেখে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বহু বছর পর পরপর দুখানা হরর নভেল পড়ে ফেললাম। 


উৎস গুগল ইমেজেস

সেই দু’হাজার পনেরোতে বেরোনোর সময়েই জশ ম্যালেরম্যান-এর বার্ড বক্স-এর নাম শুনেছিলাম, কিন্তু তারপর যা হয়, বোকার মতো রিভিউ পড়তে গেছি। 

রিভিউর ব্যাপারে একটা জিনিস খেয়াল করে দেখেছি, লক্ষ লক্ষ প্রশংসাসূচক রিভিউর মধ্যে যদি একখানা নেগেটিভ রিভিউ থাকে, মন সবসময় সেইটাকেই আঁকড়ে ধরে।  যারা প্রশংসা করছে তাঁরা পা চাটা স্তাবক, ঝাঁকের কই, যে গালি দিয়েছে সে-ই সততার প্রতিমূর্তি।

এই ফাঁদে পড়ে আমার বার্ড বক্স পড়া পিছিয়ে গেল দু’বছর। তারপর মাসের শুরুতে একজন বুকব্লগারের হ্যালোউইন রেকোমেন্ডেশনে বার্ড বক্স-এর নাম শুনে কী মনে হল, কিছু না ভেবে কিনে ফেললাম। তার পরের তিনঘণ্টায় দু’শো চুরানব্বই পাতার বইটা পড়েও ফেললাম। 

বার্ড বক্স-এর গল্প চলে দুটো সুতো ধরে। প্রথম সুতো চার বছর আগের, যখন এক অদ্ভুত ঘটনার কথা প্রথম লোকের কানে আসছে। নিতান্ত স্বাভাবিক অবস্থা থেকে লোকজন মুহূর্তের মধ্যে পাগল হয়ে গিয়ে প্রথমে আশেপাশের লোকজনকে আক্রমণ করছে, খুন করছে এবং ফাইন্যালি নিজেকে মারছে। কেন এ ঘটনা ঘটছে তার কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, শুধু ধরে নেওয়া যায়, এইরকম হিংস্র হয়ে ওঠার আগে তারা কিছু একটা দেখেছিল। কাজেই একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে দেখা আটকানো। অর্থাৎ সবাই যে যার জানালাদরজা বন্ধ করো, স্বেচ্ছায় অন্ধ হও। অ্যামেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে যখন এ ঘটনার আঁচ এসে পৌঁছল, তখন গল্পের প্রধান চরিত্র ম্যালরি সদ্য আবিষ্কার করেছে যে সে গর্ভবতী। 

প্রথমে যখন লোকজন প্যানিক করতে শুরু করল, জানালায় কম্বল ঝোলাল, চোখে ফেট্টি বাঁধল, তখনও ম্যালরি ব্যাপারটাকে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছিল কিন্তু অচিরেই আর ব্যাপারটা হাসির রইল না। তারপর এমন একটা ঘটনা ঘটল যে ম্যালরিকে নিজের বাড়ি ছেড়ে উঠতে হল এক ‘শেল্টার হাউস’এ। যেখানে তারই মতো আরও চারজন পুরুষ আর একজন মহিলা (পরে দু’জন হবে) প্রাণ বাঁচানোর তাগিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। 

গল্পের দ্বিতীয় সুতো বর্তমানে, যখন আমাদের চেনা সভ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বসে গেছে। শেল্টার হাউসে ম্যালরি একা, সঙ্গে দুটি চার বছরের ছেলে মেয়ে। চার বছর ধরে নেওয়া প্রস্তুতির পরীক্ষা সমাগত। ছেলে এবং মেয়েটিকে নিয়ে ম্যালরি, বলা বাহুল্য তিনজনের চোখেই কালো মোটা কাপড়ের ঢাকনা, বেরিয়ে পড়েছে, এই ভয়ানক জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে। 

ভয়ের সিনেমা দেখলে যত ভয় লাগে, দৃশ্য দেখিয়ে বা শব্দ শুনিয়ে ভয় পাওয়ানো যত সহজ, লিখে ঘাড়ের রোম খাড়া করা অত সহজ নয়। অজানা আতংক ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে ম্যালরম্যান অধিকাংশ সময়েই সফল। তাছাড়া শেল্টার হাউসে একসঙ্গে ছ’সাতজন অচেনা লোকের একসঙ্গে থাকার ডায়নামিক্সও বিশ্বাসযোগ্য। একবার পড়তে পড়তে আমি অর্চিষ্মানের টি শার্ট পর্যন্ত খিমচে ধরেছিলাম, আর বাথরুমের ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে আসা আলোর দিকে তাকাতে ভয় লাগছিল।

হরর গল্পের পৃষ্ঠপোষকরা সকলেই বলেছেন, (এমনকি যাঁদের বার্ড বক্স ভালো লাগেনি তাঁরাও) ম্যালরম্যানের প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে মৌলিক। 

*****


উৎস গুগল ইমেজেস

সামাজিক পালার ঝড়ের মুখে ঘরানা যাতে উড়ে না যায় সেটা আমার অন্যতম মাথাব্যথা বটে, কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে ঘরানারও কুলীনঅকুলীন আছে। গোয়েন্দাগল্প নিয়ে লোকে যতই নাক বেঁকাক না কেন, গোয়েন্দাগল্পের বাজার এখনই ওঠার কোনওরকম সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, বরং হাওয়া উল্টো কথাই বলে। সামাজিক পালাকারেরাও অনেকদিন সামাজিক পালা লেখার পর মুখ বদলাতে হলে প্রথমে গোয়েন্দাগল্পের দিকেই হাত বাড়ান। 

এ সৌভাগ্য সব ঘরানার হয় না। আমি খবর রাখি না বলে কি না জানি না, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ভৌতিক বা হরর কাহিনী বাংলায় এখনও লেখা হয় কি? একসময় হত জানি। শরদিন্দুর বরদা, মনোজ বসুর বেশ কয়েকটি গায়ে কাঁটা দেওয়া গল্প বারবার সানডে সাসপেন্সে চালিয়ে শুনি।

তবে এ অবহেলা শুধু বাংলাদেশে ঘটছে তেমন নয়। সাহেবমেমেদের দেশেও নাকি এমনটাই ঘটছে। যে ইংরিজি ভাষার সাহিত্যে এডগার অ্যালান পো জন্মেছিলেন, তার হরর ঘরানার একেবারে দুচ্ছাই অবস্থা। অন্তত এই হ্যালোউইনের বাজারে সে রকমই শুনতে পেলাম। একা কুম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছেন স্টিফেন কিং। তাই তিনি যাঁকে  "the finest writer of paperback originals in America today" খেতাব দিয়েছিলেন, সেই মাইকেল ম্যাকডাওয়েলের লেখা ‘দ্য এলিমেন্টালস’ আর গড়িমসি না করে পড়ে ফেললাম। 

মাইকেল ম্যাকডাওয়েল ইংরিজি সাহিত্যে হার্ভার্ড থেকে বি এ, এম এ করেছেন, ব্র্যান্ডেইস থেকে ইংরিজিতে পি এইচ ডি করেছেন, (ডিসার্টেশনের বিষয় ছিল American Attitudes Toward Death, 1825–1865) বোস্টন আর টাফটস-এ স্ক্রিপ্ট রাইটিং পড়িয়েছেন এবং সারা জীবন নামে-ছদ্মনামে মিস্ট্রি, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, গথিক হরর লিখে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, “I am a commercial writer and I'm proud of that. I am writing things to be put in the bookstore next month. I think it is a mistake to try to write for the ages.”

পঞ্চাশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনের সব সৃষ্টির মধ্যে বিখ্যাততম নিঃসন্দেহে ম্যাকডাওয়েলের সাদার্ন গথিক উপন্যাস ‘দ্য এলিমেন্টালস’। 

এলিমেন্টালস-এর গল্প শুরু হচ্ছে একটি ফিউন্যারেল চলাকালীন। ফিউন্যারেলের দৃশ্য দিয়ে গল্প শুরু করার একটা যুক্তি অ্যান্থনি হরোউইটজ তাঁর ‘ম্যাগপাই মার্ডারস’-এ উল্লেখ করেছেন। একসঙ্গে অনেক চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের আলাপ করিয়ে দেওয়া যায়। এলিমেন্টালসের ফিউনেরাল সিনেও আমরা মোটামুটি সব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হই। অ্যালাবামার দুই বড়োলোক এবং ঐতিহ্যশালী পরিবার, স্যাভেজ আর ম্যাকক্রে। বিবাহসূত্রে এবং প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় আবদ্ধ। এই স্যাভেজ পরিবারের ম্যাট্রিয়ার্কের ফিউনেরালে কিছু অদ্ভুত এবং ভয়ংকর আচারের পরিচয় আমরা পাই, যেটা শতশত বছর ধরে স্যাভেজ পরিবারে চলে আসছে। ফিউনেরালের পর দুই পরিবারের লোক সিদ্ধান্ত নেয়, এই শোক থেকে সেরে উঠতে সবাই মিলে বেলডাম বলে একজায়গায় বেড়াতে যাওয়া হবে। বেলডাম হচ্ছে গালফ কোস্ট-এ বিচ্ছিন্ন একফালি দ্বীপ। সে দ্বীপে তিনটি ভিক্টোরিয়ান প্রাসাদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একটির মালিক স্যাভেজ-রা, একটির ম্যাকক্রে-রা। আর তিননম্বর বাড়ি কারওর নয়। কেউ থাকে না। থাকা সম্ভবও নয়। খোলা জানালাদরজা দিয়ে বালি ঢুকে এসে গ্রাস করছে বেলডাম-এর ‘থার্ড হাউস’কে।

এলিমেন্টালস-এর প্রধান ভালো বিষয়টা হচ্ছে, ঘরানা সাহিত্যে সাধারণত যেটা কমজোরি হয়, বইটার লেখা। অসম্ভব শক্তিশালী। বেলডাম-এর নিঃসঙ্গতা, অ্যালাবামার ছায়াহীন রোদ, তাপ, এ সব শুধু প্রেক্ষাপট নয়, যেন জ্যান্ত চরিত্র। স্যাভেজ এবং ম্যাকক্রে পরিবারের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক, বিনীত ব্যবসায়ী, অবহেলিত অ্যালকোহলিক ম্যাট্রিয়ার্ক, বোহেমিয়ান বাবা এবং কিশোরী মেয়ে এবং এদের পারস্পরিক সম্পর্ককে, একটা ভূতের গল্প বলার সঙ্গে সঙ্গে ছবির মতো ফুটিয়ে তোলা, দু’শো বিরানব্বই পাতার মধ্যে, লিখতে না জানলে সম্ভব নয়।

এলিমেন্টালস-এর বিরুদ্ধে প্রধান যে অভিযোগটা আনা যায় সেটা হচ্ছে মৌলিকতার অভাব, যে মৌলিকতা জশ ম্যালেরম্যান বার্ড বক্স-এ দেখিয়েছেন। সব আঁশ ছাড়িয়ে নিলে দ্য এলিমেন্টালস শেষমেষ ভূতুড়ে বাড়ির গল্প বই আর কিছু নয়। দ্বিতীয় খুঁত, পেসিং। গোড়ায় অসম্ভব এলানো, শেষে অসম্ভব হুড়োহুড়ি। আর তিন নম্বর যে খুঁতটা ধরা যায়, সেটা বললেই অনেকে হাঁউমাউ করে উঠবে, বলবে, “তখন ওইরকমই হত”। সাদা পরিবারের লোকের ভালো কালো চাকর, তাকে ক্রমাগত ‘ব্ল্যাক উওম্যান’ বলে উল্লেখ করা, এবং প্রভুদের জন্য প্রাণ দেওয়ার জন্য সেই চাকর একেবারে বলিপ্রদত্ত। 

***** 


উৎস গুগল ইমেজেস

জেফ্রি ইউজেনাইডিস-এর মিডলসেক্স পড়েছিলাম অনেকদিন আগে, ভালোও লেগেছিল। ভদ্রলোকের বাকি উপন্যাসগুলোও পড়ার ইচ্ছে ছিল, বিশেষ করে তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য ভার্জিন সুইসাইডস, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। এ মাসে হাতে বইটা পেয়ে আবার পুরোনো ইচ্ছেটা চাগাড় দিয়ে উঠল, আর পড়ে ফেললাম। 

ভার্জিন সুইসাইডেস-এর ঘটনা ঘটছে সত্তরের দশকের মিশিগান রাজ্যের এক শহরতলির এক শান্ত পাড়ায়। সে পাড়ায় থাকেন স্থানীয় হাইস্কুলের অংকের মাস্টারমশাই মিঃ রোনাল্ড লিসবন, তাঁর স্ত্রী মিসেস লিসবন, আর তাঁদের পাঁচ মেয়ে, টেরেসে (১৭), মেরি (১৬), বনি (১৫), লাক্স (১৪) এবং সেসিলি (১৩)। একদিন সেসিলি বাথটবে হাতে ব্লেড চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ডাক্তাররা সেসিলিকে বাঁচিয়ে তোলেন। কিছুদিন পর সেসিলি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মারা যায়। ঘটনার ঠিক একবছর পর, টেরেসে, মেরি, বনি এবং লাক্স একসঙ্গে আত্মহত্যার চেষ্টা করে এবং মেরি ছাড়া সকলেই সফল হয়। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার এক মাসের মধ্যে মেরি আত্মহত্যা করে। এর পর মিস্টার এবং মিসেস লিসবন পাড়া ছেড়ে চলে যান।

ভার্জিন সুইসাইডস-এর গল্প বলছে ওই পাড়ার কয়েকজন ছেলে, ঘটনার সময় যারা কিশোর ছিল। গল্প এগোয় স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে। এভিডেন্স নম্বর এক, দুই, তিন, এগারো, সতেরো দিয়ে বক্তারা লিসবন বোনেদের ডায়রি, পাড়ার পুরোনো বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার ইত্যাদি পাঠকের সামনে পেশ করতে থাকে। 

মিডলসেক্স-এও লক্ষ করেছিলাম, ভার্জিন সুইসাইডস-এও আছে ব্যাপারটা। ইউজেনাইডিসের গল্পের মুখ্য চরিত্র আসলে একটা অঞ্চল, এক্ষেত্রে একটা পাড়া, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পাড়ার লোকজন এবং পরিপার্শ্বের বদলে যাওয়া। তাই লিসবন বোনেদের গল্প বলতে বলতে মাঝেমাঝেই অন্য কোনও চরিত্রের পিছু ধাওয়া করেন লেখক এবং তাকে নিয়ে গোটা পনেরো পাতা কাটিয়ে দেন। গল্প বলার গুণে এটা ক্লান্তিকর হয় না, কিন্তু চোখে পড়ে। তাছাড়াও ইউজেনাইডিসের বাক্য দীর্ঘ এবং জটিল, তাই শব্দবাহুল্যের অনুভূতি জাগায়। 

ভার্জিন সুইসাইডস আমার ভালো লেগেছে। একটা সময়কে, একটা অঞ্চলকে লেখক নিখুঁত ধরেছেন। অসহায় বাবার ভূমিকায়, অত্যাচারী মায়ের চরিত্র, এমনকি হরমোনে টইটম্বুর পাড়ার অল্পবয়সী ছেলেদের চরিত্রচিত্রায়ণ নিখুঁত। এবং সেটা নিখুঁত করতে গিয়েই ইউজেনাইডিস কিছু ক্রিটিকের রোষের মুখে পড়েছেন। একদল চোদ্দ, পনেরো বছরের ছেলের চোখ দিয়ে আরেকদল চোদ্দ পনেরো বছরের মেয়েদের (যে সব মেয়েদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য উক্ত ছেলেরা উন্মুখ,) দেখাতে গেলে যা হয় তাই হয়েছে, মেয়েরা একএকটি খোলসে পরিণত হয়েছে। তাদের নাকচোখমুখ, শরীরের বিভঙ্গ এবং যৌনাচার ছাড়া আর কিছু আমরা জানতে পারি না। গল্পে লিসবন বোনেদের পারস্পেক্টিভ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

যা স্বাভাবিক সাহিত্যে তা-ই সর্বদা দেখানো উচিত, না উচিত জিনিসকে স্বাভাবিকের মধ্যে ঢোকানো উচিত, সে বিষয়ে আমি নিজে এখনও ধোঁয়াশায় কাজেই এই বিষয়ে কিছু মত দিচ্ছি না।



November 05, 2017

দুই বোন



আমি এই কালকেই ভাবছিলাম, দিল্লির হিন্দির সঙ্গে আমি কীভাবে সড়গড় হয়ে যাচ্ছি, এমনকি এই ভাষাটা কীভাবে আমার মুখের কথাতেও সময়েঅসময়ে ঢুকে পড়ছে সে নিয়ে একটা পোস্ট লিখব। এই যেমন আজকাল গল্প ‘করা’র জায়গায় মাঝেমাঝে গল্প ‘মারা’ বেরিয়ে যায়। কাল অর্চিষ্মান ফোন করে বলল, ‘শোন, একটা লিংক পাঠিয়েছি, একটু দেখো তো,” আমি বললাম, ‘দাঁড়াও, হাতের কাজটা নিপটে নিয়েই দেখছি।’ 

আবার কিছু কিছু জায়গায় এখনও হোঁচট খাই, যেমন ‘আগে’ শব্দটায়।  ওলা ভাইসাবকে রুকতে বললে তিনি বলেন, ‘পেড় কি আগে?’ আমি বলি, ‘নেহি, পেড় কি বাদ।’ উনি বলেন, ‘ওহি তো বোলা ম্যায়নে, পেড় কি আগে…’ এইরকম খানিকক্ষণ চলার পরে আমার মনে পড়ে যে ভাইসাবের ‘আগে’ যা, আমার ‘বাদ’ ও তাই।


কাল আমার হাতে চা ধরিয়ে দিয়ে ভাইসাব যখন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পেপার দেনে আয়ে হো?’ আমি একমুহূর্তের জন্য কনফিউজড হলাম। সঙ্গে সাইকেল নেই, সাইকেলের হ্যান্ডেলে থলি বোঝাই খবরের কাগজ নেই, থাকলেও আমার টিপ যা খারাপ, সে পেপার পাকিয়ে তিনতলা কেন, তিন হাত দূরের বারান্দায় ফেলতে পারব কি না সন্দেহ। তা সত্ত্বেও আমি ‘পেপার দিতে’ এসেছি, এ রকম মনে হওয়ার কারণ কী?

তারপর মাথা খুলল। কাছাকাছি নাকি কোথায় একটা চাকরির ‘পেপার’ চলছে, ভাইসাবের সন্দেহ হয়েছে আমরা সেই সূত্রে রোশনারা বাগের সামনের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছি কি না।


করছি না। রোশনারা বাগের সামনে আমরা ঘোরাঘুরি করছি রোশনারা বাগে যাব বলেই। রোশনারা বাগ হচ্ছে শাহজাহানের মেয়ে রোশনারার (সম্ভাব্য) সমাধি এবং সমাধিঘেরা বাগান। সি আর পার্ক থেকে বেশ দূর। ওই সকালবেলার খাঁ খাঁ রাস্তাতেও পৌঁছোতে ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল। জায়গাটা দেখে মনে পড়ল, এ পাড়ায় আগেও একবার এসেছিলাম। আধার কার্ড বানাতে।

পরশু কাজ নিপটে অর্চিষ্মানের লিংক খুলে দেখি দিল্লিতে ‘ওয়াক ফেস্টিভ্যাল’ চলছে। ঐতিহাসিক মনুমেন্ট, ফুড ওয়াক ইত্যাদি আরও যা যা চেনা ওয়াক হয় সে সব তো হচ্ছেই, বেশ কয়েকটা ইন্টারেস্টিং ওয়াক-ও আছে দেখলাম। চাঁদনি রাতে জঙ্গলের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে ভূতের গল্প শুনতে শুনতে ওয়াক; কুতুব মিনার, খান মার্কেটে চোখ বেঁধে ওয়াক ইত্যাদি। আমি বললাম, ‘আচ্ছা, চোখ বেঁধে ঘুরতে চাও না বুঝলাম, জঙ্গলে মাঝরাতে ভূতের গল্প শুনি চল,’ অর্চিষ্মান বেঁকে বসল। কাজেই কম্প্রোমাইজ। রোশনারা বাগে থিয়েটার ওয়াক হবে, রোশনারা বাগ আমাদের দেখাও নেই, সেখানেই যাওয়া স্থির হল। 

থিয়েটার ওয়াক হচ্ছে থিয়েট্রিক্যাল পারফরম্যান্স সহযোগে ওয়াক। 'শাহজাহান’স ডটারস’ নামের এই ওয়াকটি পরিচালনা করবেন ‘দরবেশ’ দলের প্রশিক্ষিত অভিনেতারা।

দশটায় ওয়াক শুরু হওয়ার কথা, তখনও মোটে ন’টা কুড়ি। বাগের অনেকগুলো গেট। ফোন করে জানা গেল হাঁটা শুরু হবে তিন নম্বর গেট থেকে। হেঁটে হেঁটে গেলাম তিন নম্বরে। পাখিসব কলরব করছে। একদল মহিলা বসে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে ভগবানের নাম করছেন। কয়েকজনের হাঁটা/ছোটা ততক্ষণে শেষ, তাঁরা বেঞ্চে বসে হাঁপাচ্ছেন আর এখনও যারা হাঁটছে তাদের চেঁচিয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন। বাচ্চারা বাগের মধ্যে বসানো খেলার যন্ত্রপাতিতে চড়ছে। আমরা গেটের কাছে এসে চা খুঁজতে লাগলাম। চা নেই, চারদিকে স্বাস্থ্যকর ফলের জুসের ঠেলাগাড়ি। খানিকটা এগিয়ে চায়ের দোকান মিলল। 


দশটা পাঁচ নাগাদ, সঙ্গের হাঁটিয়েদের সঙ্গে টুকটাক আলাপ আর টিকিট পরীক্ষার পর হাঁটা শুরু হল। এই হচ্ছে রোশনারার অফিশিয়াল সমাধি, যদিও রোশনারা এখানে সমাধিস্থ রয়েছেন না লালকেল্লায় পরিবারের লোকদের সঙ্গে, সেটা নিশ্চিত নয়। এখন হতশ্রী অবস্থা, কিন্তু একসময় এ বাড়ির রূপের বাহার ছিল। ফোয়ারা থেকে বেরোনো সুগন্ধী জল পরিখা ভরে রাখত। ভেতরের দেওয়াল, ছাদ মণিমুক্তো এবং মেঝে কার্পেট দিয়ে সজ্জিত ছিল। রোশনারা বহু যত্নে এই বাগান আর বাগানে এই বাড়িটি বানিয়েছিলেন, তাঁর ইচ্ছে ছিল মৃত্যুর পর তাঁকে এখানে সমাধিস্থ করা হবে। 




শাহজাহান’স ডটারস-এর বিষয় শাহজাহানের পতন এবং ঔরঙ্গজেবের উত্থানের সময়কালের ঘটনাপ্রবাহ। গল্প বলা হবে শাহজাহানের দুই মেয়ে, জাহানারা এবং রোশনারার বয়ানে, পাঁচটি ছোট ছোট দৃশ্যে।

জাহানারা রোশনারাকে সাবধান করছেন, আদর্শবাদী ঔরঙ্গজেব শুধু একটাই আদর্শে বিশ্বাস করেন, 'ঔরঙ্গজেব' আদর্শে

প্রথম দৃশ্য শুরু হচ্ছে যখন, তখন চোদ্দটি সন্তানের জন্ম দিয়ে মুমতাজমহল মারা গেছেন, তাঁর স্মৃতিতে তাজমহল বানানো হয়েছে, শাহজাহানের মন সাম্রাজ্য পরিচালনা থেকে সম্পূর্ণ উঠে গেছে, তিনি সাহিত্যসংস্কৃতিতে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছেন আর ভাবছেন এইবেলা একটা কালো তাজমহল বানালে কেমন হয়। এই সময় শাহজাহানের বয়স চল্লিশ, তাঁর বড়মেয়ে জাহানারার বয়স সাতাশ, দারা শুকো ছাব্বিশ, ঔরঙ্গজেব এবং রোশনারা আরও ছোট। ভাইবোনের মধ্যে, বলা বাহুল্য, সদ্ভাব নেই। মারামারি কাটাকাটির পারিবারিক ঐতিহ্য তো আছেই, তাছাড়া শাহজাহান নিজেও খানিকটা দায়ী। ছেলেমেয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার তারতম্য ছিল। শাহজাহানের ফেভারিট ছিলেন জাহানারা, কারণ তিনি ছিলেন অবিকল মায়ের মতো দেখতে। শাহেনশাহর প্রশ্রয়ে জাহানারার প্রতাপ প্রবল ছিল। তিনি ছিলেন বাদশাহি হারেমের হর্তাকর্তা। রোশনারা বাবার স্নেহের কাঙাল ছিলেন, না পেয়ে চটে গিয়ে দিদি এবং বাবার অ্যান্টি হয়ে গিয়েছিলেন। ওদিকে আবার দারা শুকোর মুখ ছিল শাহজাহানের মুখ কেটে বসানো, শাহজাহানের তাঁর প্রতিও পক্ষপাতিত্ব ছিল। ঔরঙ্গজেব ব্যাপারটা মোটেই ভালো চোখে দেখতেন না। তাছাড়া সাম্রাজ্য পরিচালনা বিষয়ে বাবা এবং দাদার সঙ্গে তাঁর মত ছিল নর্থ পোল সাউথ পোল। ঔরঙ্গজেব বিশ্বাস করতেন শাহজাহান সাম্রাজ্য অলরেডি দুর্বল করে দিয়েছেন, এই সব কবিমার্কা দারা শুকো সিংহাসনে বসলে, যে কি না আবার ফারসি ভাষায় গীতাউপনিষদ অনুবাদ করতে চায়, আর রক্ষা থাকবে না। কাজেই দারা শুকোকে মেরে তাঁর মুণ্ডু শাহজাহানকে ভেট পাঠানো হল।

জাহানারা বিপদ বুঝে আড়ালে চলে গেলেন। রোশনারার এতদিনের প্রতীক্ষার অবসান হল, ঔরঙ্গজেবের প্রতি তাঁর অন্ধ আনুগত্যের ফল ফলল, তিনি প্রবল প্রতাপশালী হয়ে উঠলেন। দাক্ষিণাত্য ঔরঙ্গজেবের অধিকাংশ সময় এবং মনোযোগ অধিকার করে রাখত, দিল্লিতে রোশনারাই ছড়ি ঘোরাতেন। অচিরেই শত্রু বাড়তে আরম্ভ করল। একবার জাহানারার কাপড়ে আগুন লাগল, দুই সহচরী প্রাণ দিয়ে রাজকুমারীর প্রাণ বাঁচালেন। কানাঘুষো হল, রোশনারার চক্রান্ত। দলের লোক না হলেও ঔরঙ্গজেব জাহানারাকে ভালোবাসতেন। দাক্ষিণাত্য থেকে দৌড়ে এলেন দিদির খবর নিতে। এর মধ্যে রোশনারা নাকি এমন কর বাড়িয়েছিলেন, সে আমলের নিরিখে যা বেশি রকমের বেশি। মোদ্দা কথা, রোশনারা ঔরঙ্গজেবের মাথাব্যথার কারণ হলেন। হ্যাঁ, সিংহাসনে চড়ার সময় রোশনারা তাঁর ভয়ানক কাজে লেগেছিলেন, কিন্তু তার প্রতিদান সারাজীবন ধরে দিতে হবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই। বিবেকের শেষ বেড়াটুকু ভাঙার অজুহাতও মিলে গেল চটপট। রোশনারা তো ঠিক অসূর্যম্পশ্যা ছিলেন না, প্রচুর পুরুষপরিবৃত হয়ে তাঁর ছবিটবি আছে। তাঁকে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করা শক্ত ছিল না। পরিষ্কার মনে ঔরঙ্গজেব দুশ্চরিত্র বোনকে বিষ খাওয়ালেন। রোশনারার জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হল। 


জাহানারা বুড়ো হয়ে মরেছিলেন, তাঁর সমাধি নিজামুদ্দিনে আছে। রোশনারার মার্ডার চুপচাপ চেপে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করে এই রোশনারা বাগেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল কি না, নাকি লালকেল্লাতেই তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছিল, সে নিয়ে তাই সংশয় যায়নি।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.