October 23, 2017

কমপ্যারিজন ইজ দ্য থিফ অফ জয়



গত সপ্তাহে বিছানায় শুয়ে যখন ক্রমাগত কাশছিলাম আর হাঁচছিলাম, মায়ের কথা মনে পড়ছিল। মা কোথায়, মা থাকলে এখন মাথায় হাত বুলিয়ে দিত এই সব নয়, মনে পড়ছিল যে আমার মাকে আমি জীবনে শুয়ে থাকতে দেখিনি। মাঝেমাঝে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখেছি মা পাশে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন, কিন্তু ওইটুকুই। আমি বা বাড়ির অন্যরা বসে বা দাঁড়িয়ে আছি এবং মা শুয়ে আছেন, এরকম কোনও স্মৃতি আমার নেই।

আমার মা বাড়ির সবার পরে ঘুমোতে যান এবং সবার আগে ওঠেন, কাজেই সেটা মাকে শুয়ে থাকতে না দেখার একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু ঘুমোনো ছাড়াও তো লোকে শুয়ে থাকে। শুতে বাধ্য হয়, যখন শরীর খারাপ করে। 

তার মানে কি আমার মায়ের শরীর খারাপ হয়নি? আমার মা নিতান্ত ছোটখাট চেহারার, সকালে চ্যবনপ্রাশ বিকেলে মুক্তবায়ু সেবন ইত্যাদিও করতে দেখিনি কখনও যে স্বাস্থ্যবান বলে চালিয়ে দেব। তবু মাকে শুয়ে থাকতে দেখিনি কখনও। কাজেই ধরে নেওয়া যায় মায়ের শরীর খারাপ হয়নি কখনও। আমার মতো তিন মাস বাদে বাদে নিয়ম করে তো হয়ইনি।

কখনও দেখিনি বলব না। একবার মাকে শুয়ে থাকতে দেখেছিলাম। ওই একবার দেখেছিলাম বলেই বাকি যে কখনও দেখিনি সেটা বেশি করে স্পষ্ট হয়ে আছে। মা শুয়ে ছিলেন, বাকিরা সবাই ন যযৌ ন তস্থৌ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, কারণ এ রকম একটা অদ্ভুত ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সে সম্পর্কে কেউই নিশ্চিত ছিল না। মা নিজেও ছিলেন না। বার বার বলছিলেন, ‘এই একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে মনে হয়, তোমরা চিন্তা কোরো না।” আর কিছুক্ষণ এ রকম চললে মা ঠিক হয়েও যেতেন আমি নিশ্চিত, বাদ সাধলেন সেজকাকু। ‘কই দেখি কী হয়েছে’ বলে দুমদাম করে ঘরে ঢুকলেন, মাকে এবং বাড়ির সবাইকে একবার দেখলেন, তারপর গাড়ি ডেকে সোজা মাকে নিয়ে চলে গেলেন সেবাসদন। কারও সঙ্গে আধবারও পরামর্শ করলেন না, কেউ সেজকাকুকে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টাও করল না কারণ করে লাভ ছিল না। সবাই জানত সেজকাকু মাথাগরম, গোঁয়ার, যা মনে হয়েছে সেটা না করে ছাড়বেন না। ঘটনাটা ঘটেছিল ভোরের দিকে। একটু বেলা হতে আমি আমার লাল রঙের হিরো সাইকেল চালিয়ে সেবাসদনে গিয়েছিলাম। মা হাতে স্যালাইন গুঁজে শুয়ে ছিলেন। খাটের পাশে বসে আমি হাউমাউ করে কাঁদছি আর আমার মা সূচ বেঁধানো হাত তুলে আমার গায়ে বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, মনে আছে। 

অসুখের সময় শুধু না, সুখের সময়ও মায়ের কথা মনে পড়ে। আরও বেশি করে মনে পড়ে। অফিস থেকে ফিরে শরীরের প্রতিটি গ্রন্থি শিথিল করে যখন ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকি, আমার সঙ্গে আমার ফ্রিজের চালকুমড়োটার যখন বিন্দুমাত্র তফাৎ থাকে না, তখন হঠাৎ মা এসে উপস্থিত হন। আমার আরাম মাটি করতে। ল্যাপটপের স্ক্রিনের ডানদিকের মাথার সময় জানায় আমার মা এখন বাড়ি ফিরছেন। কোথায় ওলা, কোথায় উবার। মা ঘামতে ঘামতে হাঁটছেন বিবাদী বাগ থেকে ফেয়ারলি প্লেস, মা ছুটছেন লঞ্চের ভোঁ শুনে, মা দৌড়চ্ছেন ঘেমো ভিড়ের মধ্য দিয়ে, পাখির চোখ তারকেশ্বর লোকালের লেডিস কামরা। দুই হাতে বাজারের থলি নিয়ে বাড়ি ঢুকছেন। বাজার গুছোবেন, রান্না করবেন, কাল মান্থলি টেস্ট। মায়ের না।

আমার এখন একটাই কাজ। ব্লগ লেখা। না লিখলেও কিছু এসে যায় না। 

*****

অন্যদিন সকালে চা খাওয়ার জন্য দশ মিনিট, শনিরবি সকালে গড়াতে গড়াতে পঁচিশ মিনিট, এক ঘণ্টা, দু’ঘণ্টাতেও ঠেকেছে কখনও কখনও। খবরের কাগজের কোনও একটা হেডলাইন, বা সোশ্যাল মিডিয়ার সাম্প্রতিকতম তর্ক, সদ্য পড়া কোনও একটা বই, রিসেন্টলি দেখা সিনেমা…বিষয় যা খুশি হতে পারে। বেশিরভাগ সময়েই দু’জনে সম্পূর্ণ একমত হই, কখনও কখনও মতান্তর ঘটে। ক্রমাগত যুক্তির জাল বেছাতে বেছাতে, গেরো পাকাতে পাকাতে এবং ছাড়াতে ছাড়াতে আবিষ্কার করি, ছোটখাটো খুঁটিনাটিতে অমিল থাকলেও, মোটের ওপর বিগ পিকচারটা আমাদের দুজনের কাছেই এক। আশ্বস্ত হই। প্রতিটি শনিরবির চায়ের আড্ডা আমাদের সম্পর্কের গোড়ায় নতুন করে জল ঢালে, আগাছা নিড়োয়, কোথাও অগোচরে কোনও কাদা জমলে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়। 

আর অন্য দুজনের শনিরবির সকালের কথা মনে পড়ে যায়। বাকি পাঁচদিনের সকালের থেকে আরও বেশি ব্যস্ততা। অন্যদিন কলকাতা ক-তে সাড়ে ন’টার খবর শুরু হওয়া মাত্র বাকি পাঁচদিনের সকাল শেষ, শনিরবির সকাল অনন্ত। রান্না চলছে, বাজারে যাওয়া হচ্ছে, গ্যাসের দোকান, রেশন দোকান। ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা কলের মিস্তিরি কিংবা বাগান পরিষ্কারের গোপালকাকু। কখন সকাল যায়, কখন দুপুর আসে, বিকেল পড়তে না পড়তে আবার লৌকিকতার পালা।

ওইরকম শনিরবির মধ্যে দিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যেতে হলে কেমন হত আমাদের সম্পর্ক? কেমন হত, যদি এই নিভৃত দু’কামরার বদলে একটা হট্টমেলার মধ্যে ফেলে দেওয়া হত আমাদের দু’জনকে? কেমন হত যদি আমাদের কথোপকথনে রাজনীতি, সমাজনীতি আর বড় বড় আইডিয়ার জায়গায়, খালি অন্য লোক, অন্য লোকের সমস্যা, নালিশ, কলের মিস্তিরি, চালের দাম, ওষুধের বিল রাজত্ব করত? যদি দু’জনের গলায় হালের মতো বসে থাকত একটা আস্ত সংসার? যদি সারাদিনে কেন সারা সপ্তাহেও দশ মিনিট সময় নিজেদের জন্য আলাদা না করে পাওয়া যেত?

*****

মাসচারেক আগে ক্যাফে লোটায় খেতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ক্রাফটস-এ হস্তশিল্প মেলা চলছে। যা দেখি সবই কিনতে ইচ্ছে করে, তারপর সংযম প্র্যাকটিস করে কাগজের মণ্ড দিয়ে বানানো একখানা ল্যাম্প কিনলাম। লাল, সবুজ, হলদে, নীল দিয়ে লতাপাতা ফুল মৌমাছি আঁকা। শেডের দুটো অপশন ছিল। একটা উজ্জ্বল হলুদ, একটা ঘন সবুজ। আমাদের সবুজটা পছন্দ হল। আমার ছোট টেবিলে সে ল্যাম্প এখন শোভা পাচ্ছে। ভোরবেলা যখন টেবিলে বসি, ল্যাম্পের আলোয় রংচঙে আলপনা ঝলমল করে। টাইপ করতে করতে চোখ বার বার সেদিকে যায়। আর ভাবি বাড়ি সাজানোর জন্য আর কী কী কেনা যায়, এই ল্যাম্পের সঙ্গত হিসেবে দেওয়ালে আর কী কী শোভাবর্ধক জিনিস ঝোলানো যায়। অবশেষে যুদ্ধে ইতি দিয়ে সুইটকাউচ ডট কম-এ ঘুরতে থাকি। দেওয়ালে একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট প্রিন্ট ঝোলালে কেমন হয়? ফ্রেমের এ কোণ থেকে ও কোণ পর্যন্ত লাল রঙের পোঁচ? আমার ভাড়াবাড়ির দেওয়াল আর খালি নেই, মনে মনে রিষড়ার বাড়ির দেওয়াল ধার নিই। আফটার অল, আমার আসল বাড়ি তো ওটাই, আমার পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস। ছবি হাতে নিয়ে মনে মনে ঘুরি ঘর থেকে ঘর, দেওয়াল থেকে দেওয়াল। সামনের ঘরের দেওয়ালে নীলবর্ণা মা কালী মাথায় জবাফুল গুঁজে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর জিভের লালের কাছে আমার অ্যাবস্ট্রাক্ট লাল লজ্জা পায়। অন্য দেওয়ালে বিবেকানন্দ, হাতে হাত পেঁচিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে। অ্যাবস্ট্রাক্ট পেন্টিং সম্পর্কে তাঁর মতামত বুঝতে বেশি কল্পনাশক্তির দরকার নেই। একের পর এক দেওয়াল থেকে মধুসূদন, (কবি এবং ঠাকুর দুজনেই,) বিদ্যাসাগর এবং আমার ঠাকুরদা, আমার অ্যাবস্ট্রাক্ট পেন্টিংকে শেম করেন। 

অনেক ভেবে আমি সিদ্ধান্তে এসেছি, যে সব জিনিস আমার এই ভাড়াবাড়িতে বা মিথ্যে বাড়িতে মানায়, সেটা রিষড়ার বাড়িতে মানায় না। রিষড়ার বাড়ির দেওয়ালে অ্যাবস্ট্রাক্ট পেন্টিং মানায় না। রিষড়ার বাড়ির ঘরে নিভু নিভু হলদে আলো মানায় না। রিষড়ার বাড়ির জন্য চাই ফ্যাটফেটে সাদা টিউবলাইটের আলো।

দিল্লিতে প্রথমবার বাড়িভাড়া নেওয়ার সময় মা এসে রান্নাঘর গুছিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, মুদির দোকান থেকে আট টাকা দিয়ে লজেন্সের খালি প্লাস্টিকের বয়াম কেনা হয়েছিল, আমাদের চাল ডাল চিঁড়ে মুড়ি এখনও তাতেই রাখা চলছে। ভোরবেলা বসে কাজে ফাঁকি দিয়ে যখন সাইটে সাইটে ঘুরি, ভাবি ওই আট টাকার প্লাস্টিকের বয়াম বদলে ফ্যান্সি কনটেনার কিনলে কেমন হয়? কতরকমের যে কনটেনার পাওয়া যায় অনলাইন। সাদা সেরামিকের গলায় হলদে পোঁচ ট্র্যাডিশনাল, স্টিলের ইউটিলিটারিয়ান, টেরাকোটার গায়ে কবিতা লেখা আর্টিস্টিক। 

বাড়ির জন্য কনটেনার কেনার কথা মনে হয়নি কখনও। মানেই হয় না। দু’দিনে ভেঙেচুরে ছত্রাকার হয়ে যাবে। তাছাড়া আমার এক কেজি চাল ওই সব ফ্যান্সি কনটেনারে এঁটে যেতে পারে, বাড়ির চালডাল আঁটবে না। আমাদের বাড়িতে চাল রাখা হত ড্রামে। দু’ফুট উচ্চতার, দেড়ফুট ব্যাসের লোহার ড্রাম। কীসের ড্রাম আমি জানি না, ব্যবহারে ব্যবহারে তার বাইরের লেখা চটে গেছে। ড্রামের ভেতর একটা খালি জর্দার কৌটো থাকত, তাই দিয়ে লোক বুঝে তিন বা চার বা পাঁচ কৌটো চাল নেওয়া হত। আমিও নিয়েছি। যে সব কাজগুলো আমাকে করতে দিলে মায়ের কাজ বাড়বে না, সেটার মধ্যে চালের ড্রাম থেকে চাল আনাটা পড়ত। কাজেই আমি অনেকবার ওই ড্রাম থেকে চাল এনেছি। দরকার মতো নিয়ে ছোট ছোট তিন চিমটি চাল ড্রামে আবার ফেরত দেওয়ার নিয়ম ছিল। কারণ শুধু নিচ্ছি, ফেরত দিচ্ছি না, এরকম করলে চালের ড্রামের মা লক্ষ্মী রেগে যাবেন। (চালের ড্রামে লক্ষ্মীঠাকুর থাকেন সেটা জানা ছিল, কারণ লক্ষ্মীপুজোয় সারাবাড়ির সঙ্গে চালের ড্রামের সামনেও লক্ষ্মীর পা আঁকা হত।) 

এবার বাড়ি গিয়ে দেখি চালের ড্রামের ঢাকনার ওপর গুচ্ছের জিনিসপত্র রাখা। খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, ইস্তিরি। বললাম, ‘এ সব রোজ নামাতে ওঠাতে অসুবিধে হয় না?’ মা বললেন, ‘ওহ, ওই ড্রাম আর ব্যবহার হয় না তো।’

আমি তাকালাম মায়ের দিকে। ‘চাল কোথায় রাখো তবে?’

‘একটা মুড়ির কৌটো খালি করে নিয়েছি। প্লাস্টিকের থলিতে দু’কেজি করে চাল আসে। আমি আর তোর বাবা তো একলা এখন।’


October 15, 2017

এ মাসের বই/সেপ্টেম্বর ২০১৭/২ঃ মিস্ট্রি ও মহাকাব্য



A Rising Man/ Abir Mukherjee


উৎস গুগল ইমেজেস

এ বছরের শুরুতে আমার বই পড়া সংক্রান্ত একটা রেজলিউশন ছিল, ননককেশিয়ান গোয়েন্দার স্টক বাড়ানো। বই পড়া সংক্রান্ত বাকি সব রেজলিউশনের মতো, এটা রক্ষাতেও আমি ডাহা ফেল করতে চলেছি। তবে হারা জেতায় লাজ নেই, যত লাজ নিশ্চেষ্ট হয়ে অদৃষ্টের হাতে সব ছেড়ে বসে থাকায়। সে জন্য হাফ বছর পেরিয়ে যেতে আমি নড়েচড়ে বসলাম। আর অমনি গার্ডিয়ান পত্রিকায় একখানা গোয়েন্দা উপন্যাসের গ্লোয়িং রিভিউ চোখে পড়ল। উপন্যাসটার কথা অনেকদিন ধরেই এদিকওদিক থেকে কানে আসছিল। গার্ডিয়ানের রিভিউ মনে জোর দিল, কিন্ডলে কিনে ফেললাম আবীর মুখার্জির আত্মপ্রকাশকারী উপন্যাস ‘আ রাইজিং ম্যান’। স্যাম উইন্ডহ্যাম সিরিজের প্রথম বই।

এই শেষের তথ্যটা আমি জানতাম না। আমি শুধু জানতাম মুখার্জির উপন্যাসের ঘটনা ঘটছে স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষের কলকাতা শহরে। সেখানে একজন বাঙালি পুলিসের সাহসিকতার কথাও পড়েছিলাম, পড়ে ধরেই নিয়েছিলাম যে এ গল্পের গোয়েন্দাও কালা আদমি। 

বই কেনার পর দেখি গোয়েন্দা আপাদমস্তক সাহেব, ক্যাপ্টেন স্যাম উইন্ডহ্যাম। গল্পের কালা আদমি সার্জেন্ট ‘সারেন্ডার-নট’ ব্যানার্জি, ক্যাপ্টেন উইন্ডহ্যামের তোপসের ভূমিকায়। 

যাকগে, একটা রেজলিউশন (ননককেশিয়ান গোয়েন্দার বই পড়ার) রাখা হল না, আরেকটা (বই পড়ার) রাখা হল। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রের আতংক স্বচক্ষে দেখে, স্ত্রীবিয়োগের যন্ত্রণা পেয়ে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা ক্যাপ্টেন উইন্ডহ্যাম এসেছেন কলকাতায় ইম্পিরিয়াল পুলিশবিভাগের গোয়েন্দা হিসেবে যোগ দিতে। নতুন শহরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই একটি ঘনঘোর রহস্যে উইন্ডহ্যামের দায়িত্বে এসে পড়ে। একজন উচ্চপদস্থ ’সাহিব’, নেটিভ আদমিদের পাড়ার গলির নালার মধ্যে খুন হয়ে পড়ে আছেন, মৃতদেহের মুখে কাগজ পোরা, তাতে বাংলায় ভারত ছাড়ার হুমকি লেখা।  

তদন্ত শুরু হল। যা যা গোলমাল বাধার সবই বাধল। উইন্ডহ্যামের সহকারী ডিগবি, ঘোর রেসিস্ট, ঘোর ভারতবিদ্বেষী। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির ঘুণধরা ব্রিটিশ রাজ। সরকারি আনুকূল্যপ্রাপ্ত দুর্নীতিগ্রস্ত পাটকলের ফিরিঙ্গি মালিক। বেইমান ভারতীয় খোচর। ‘টেররিস্ট’ স্বাধীনতাসংগ্রামী। কোঠাবাড়ির আবেদনময়ী মালকিন। রহস্যময়ী অ্যাংলোমেম টাইপিস্ট। এই পরিস্থিতিতে স্যাম উইন্ডহ্যামের একমাত্র সঙ্গী অধস্তন পুলিস সার্জেন্ট ব্যানার্জি। যার খটমট নাম জিভে কায়দা করতে না পেরে সাহেবরা ‘সারেন্ডার-নট’ করে নিয়েছে।

আ রাইজিং ম্যান-এর ফরে অনেক কিছুই, চরম ইন্টারেস্টিং প্রেক্ষাপট, সেই প্রেক্ষাপটের সদ্ব্যবহারও করতে ছাড়েননি/ভোলেননি শ্রী মুখার্জি। সে সময়ের কলকাতার বর্ণনা, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, টেরিটিবাজারে চিনা আফিমের আড্ডা, একই শহরে নেটিভ এবং সাহেবদের পাশাপাশি কিন্তু যোজনদূরত্ব অবস্থান, এ সব কিছুই ছুঁয়ে গিয়েছেন তাঁর গল্পে।

আর সেটা করতে গিয়েই গল্পটার দিকে নজর দেননি। বা আরেকটু ক্রিটিক্যাল হয়ে বলা যায়, উল্টোভাবে বলা যায়, সেটা করেছেন বলেই গল্পের দিকে নজর না দিয়েও পার পেয়ে গেছেন।

রাইজিং ম্যান-এর ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং যতটা টানটান, রহস্য সমাধানের প্রক্রিয়া ততটাই ফুটোফাটা। বা বলা উচিত ফুটোগুলো চাপা দিতে অক্ষম লেখক। গোয়েন্দাগল্প পড়েটড়ে আমার যা মনে হয়েছে, ভুল ধরতে চাইলে সব তদন্তেরই ভুল ধরা যায়। যাকে জেরা করলে সেকেন্ড সিনে খুনি বেরিয়ে যাবে তার জেরা টাঙিয়ে রাখা হয়ে লাস্টের আগের সিন পর্যন্ত। করিৎকর্মা লেখক এইসব ধাপ্পাবাজি সাফল্যের সঙ্গে চাপাচুপি দিয়ে রাখতে পারেন। মাঝখানে রেড হেরিং, ফলস ক্লু দিয়ে পাঠককে এমন গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখেন যে সে অন্য কথা ভাবার সময় পর্যন্ত পায় না। আবীর মুখার্জি সেটা পারেননি। উইন্ডহ্যাম পাগলের মতো দৌড়চ্ছেন এদিকসেদিক, আর আমি ভেবে চলেছি ওই ব্যাপারটার কী হল, ওই লাইন অফ ইনভেস্টিগেশনটা পারসু করল না তো। (মনে রাখতে হবে, আমি কিন্তু অত্যন্ত বিশ্বাসী পাঠক, আমি ভুল পথে ভেসে যেতেই চাই, সেই আমারই যখন এতসব প্রশ্ন মনে জাগছে, সেয়ানা পাঠকদের জাগতে বাধ্য।)

তবে লেখকের এটা প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস, কাজেই গ্রেস দিতে চাইলে দেওয়া যায়। যে বিষয়টায় আমি গ্রেস দিতে পারছি না (নাকি চাইছি না?) সেটার কথা বলে শেষ করি। স্যাম উইন্ডহ্যাম সবে একবেলা হল কলকাতায় এসে নেমেছেন, এর আগে তিনি আধখানা বাঙালিও চোখে দেখেননি, অথচ বাঙালি এবং কলকাতা নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস দেখার মতো। ভারতবর্ষের বাকি প্রদেশের ওপর ব্রিটিশসাম্রাজ্য আরামসে আধিপত্য চালাচ্ছে, কেবল এই বাগ্মী, তেজস্বী এবং মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি, বুদ্ধিমান বাঙালির দল তাঁকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। আর কলকাতা, আহা। এরকম বর্ণময়, ইউনিক শহর পৃথিবীতে আর দুটি আছে কি না সন্দেহ। এ কি সদ্য প্রিয়বিরহে শোকার্ত, দেশ ছেড়ে আসা সাহেবের জবানবন্দী, নাকি প্রবাসী কলকাতাবাসীর ফেসবুক পোষ্ট, মাঝে মাঝে আমার সত্যি গুলিয়ে যাচ্ছিল। 

*****

Vyasa: The Beginning/ Sibaji Bandyopadhyay and Sankha Banerjee


উৎস গুগল ইমেজেস

২০১৭র সেপ্টেম্বরে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার ঘটল, আমি আমার জীবনের প্রথম গ্রাফিক নভেলটা পড়লাম। তাও আবার যে সে নভেল না, একেবারে মহাভারত। শিবাজি বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আর শঙ্খ ব্যানার্জির ছবিতে মহাভারতের শুরুর দিকের অংশ নিয়ে গ্রাফিক নভেল বার করেছে পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউস, নাম দিয়েছে ব্যাসঃ দ্য বিগিনিং, দাম করেছে চারশো টাকা। দামটা আমার মতে খুবই ন্যায্য, কারণ মোটা বই, মোটা পাতা, ঝকঝকে বাঁধাই।

ব্যাস দি বিগিনিং-এর বেশিরভাগ গল্প -  সত্যবতী পরাশর, সত্যবতী শান্তনু, ভীষ্মের শপথগ্রহণ, অম্বা অম্বিকা অম্বালিকা বৃত্তান্ত, দ্রোণ বনাম দ্রুপদ, শর্মিষ্ঠা বনাম দেবযানী, যযাতির যৌবনযাতনা ইত্যাদি আমার জানা ছিল, আবার জন্মেজয়ের যজ্ঞে মহাভারতের কথা শুনে এসে নৈমিষারণ্যে বসে সেই গল্প যে শোনাচ্ছিলেন যে উগ্রশ্রবা সৌতি, তাঁর বাবাও যে চমৎকার গল্প বলিয়ে ছিলেন আর বাবার নাম যে ছিল লোমহর্ষণ, এটা জানা ছিল না।

ব্যাস-এর ভাষা আমার চেনা লোকদের কারও কারও অপছন্দ হয়েছে, কিন্তু আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। সাধারণত মহাকাব্য আমরা যে রকম শ্রদ্ধাপূর্ণ, নতমস্তক ভাষায় পড়তে অভ্যস্ত শিবাজি সেটা সম্পূর্ণ পরিহার করেছেন। যেমন শর্মিষ্ঠা দেবযানী ঝামেলায় চরিত্ররা একে অপরকে অবলীলায় ‘দ্যাট বিচ!’ বলে তিরস্কার করছে, উগ্রশ্রবার শ্রোতারা তো ভয়ানক রসিক। 

লেখার থেকেও নজর কেড়েছে আমার ব্যাস-এর ছবি। মহাভারতের (বা যে কোনও মহাকাব্যেরই) যা মূল সুর, হিংস্রতা, সেটা ব্যাস দ্য বিগিনিং-এর প্যানেলে প্যানেলে পরিস্ফুট। জন্মেজয়ের যজ্ঞে সাপদের ধরে ধরে আগুনে ফেলার সময় সাপদের চোখেমুখে যে মৃত্যুআতংক, আমি দ্বিতীয়বার তাকাতে পারিনি। উগ্রশ্রবা এ গল্পে দাড়িওয়ালা বোরিং সাধু নন, তিনি রীতিমতো গল্পের মুড বুঝে মেকআপ পাল্টান, চোখ নাক মুখ আঁকেন, প্রপ্স বদলান। 

বইটি একটি সিরিজের অংশ। ব্যাসঃ দ্য বিগিনিং শেষ হয়েছে দ্রৌপদী এন্ট্রি নেওয়ার ঠিক আগে। পরের বইগুলো অতি অবশ্যই পড়ব, ঠিক করে রেখেছি।


October 13, 2017

Serious vs. Severe



SERIOUS procrastinator
























SEVERE Procrastinator



কৃতজ্ঞতাঃ www.raptitude.com


October 12, 2017

অন আ ডে লাইক দিস



একজন সাহেব, যিনি আমার সঙ্গে পদবীর দৈর্ঘ্যতুতো বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলেন, সেমিনারের শেষ বেলায় আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সেমিনারের পরে আমার প্ল্যান কী। আমি বলেছিলাম, কী আর, ঘরে বসে রিপোর্ট শেষ করা। 

তাতে তিনি ভুরু আকাশে তুলে বলেছিলেন, 'অন আ ডে লাইক দিস?' জানালার বাইরে তাকিয়ে চোখ ঝলসে গিয়েছিল। আকাশে মেঘের লেশমাত্র নেই, কংক্রিটের রাস্তায় পড়ে ঝাঁ ঝাঁ রোদ ঠিকরোচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস চেপে সাহেবকে বলেছিলাম, ‘ইউ আর রাইট। চুলোয় যায় রিপোর্ট। বাড়ি ফিরে সারা গায়ে এস পি এফ পঁচাত্তর জবজবে করে মেখে হাফপ্যান্ট পরে দৌড়তে বেরোনোই আমার প্ল্যান।’ 

সাহেব হাঁফ ছেড়ে বলেছিলেন, 'গুড আইডিয়া।' 

সাহেবকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সাহেব সামার নিয়ে লাফান, আমি উইন্টার নিয়ে। দিল্লিতে কে জানে কত বছর থাকার পর মনসুন নিয়েও।

ক’দিন ধরে শীতের প্রতীক্ষাটা চরমে উঠেছে। সার্চ করে করে এমন অবস্থা, ব্রাউজারে ডি টাইপ করলে ডেলহি টেম্পারেচার চলে আসছে, জানুয়ারি পর্যন্ত ম্যাক্সিমাম মিনিমাম টেম্পারেচার, আর্দ্রতা, বাতাসের দিক এবং গতি মুখস্থ হয়ে গেছে, তবু প্রতিদিন আবার করে দেখছি। দেখছি আর মনখারাপে ভুগছি। প্রতি সপ্তাহে একটা দুটো করে ছত্রিশ ডিগ্রি গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। কবে যে শীত আসবে, আদৌ আসবে কি না সেই নিয়েই সন্দেহ হচ্ছে এখন। 

সেদিন কথা হচ্ছিল ওলাতে যেতে যেতে। ঠিক কোন মুহূর্তে নিশ্চিত হওয়া যায় একটা ঋতুর আসা বা যাওয়া? প্রথম যেদিন বাজারে ল্যাংড়া উঠল সেদিন প্রথম গরম পড়ল না প্রথম যেদিন এসি চালাতে হল সেদিন? জামাইষষ্ঠীর পর প্রথম যেদিন বৃষ্টি নামবে সেদিনই কি ধরে নেব বর্ষা এসেছে, নাকি আষাঢ় মাসের এক তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? যতদিন না হাঃ করলে মুখ থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে ততদিন শীত এসেছে দাবি করা চলবে না নাকি বালতির জল গায়ে পড়লে ‘মাগো’ বেরোলেই যথেষ্ট?

মাঝে মাঝে ভ্রম হয়, শীত এসে গেছে বুঝি। ভোর হচ্ছে দেরিতে, সন্ধ্যে নামছে দ্রুত। ঘন ঘন ঠোঁট শুকোচ্ছে। এই সেদিন একটা ছোট বোরোলিন কিনে ব্যাগে রাখতে শুরু করেছি। কিন্তু দুপুরবেলা চা খেতে বেরোলেই সব আশা বিচূর্ণ। কী রোদ, কী তার তেজ, বাপ রে বাপ। 

এ বছর আর শীত আসবে না ধরেই নিয়েছি। নিয়ে এমন মেজাজ গরম হয়েছে যে সোমবার বাড়ি ফেরার পথে একজন ওলাভাইসাবকে ওয়ান স্টার দিলাম, সি আই ডি কলকাতার একটা পুরোনো এপিসোড চালিয়ে দশ মিনিটের বেশি দেখতে পারলাম না, আমার ফেভারিট রুটি আলুপোস্ত পর্যন্ত বিশ্রী তিতকুটে লাগল খেতে। 'ধুত্তেরি' বলে ঘুমোতে গেলাম। 

পরদিন চোখ খোলারও আগে টের পেলাম ব্যথাটা। একদল যন্ত্রী যেন সার দিয়ে বসেছে গলার ভেতর, তাদের খাঁজকাটা খাঁজকাটা বেহালার ছড়ে টেনে টেনে আমার ভোকালকর্ডে বিঠোভেনের নবম সিম্ফনি বাজাচ্ছে। হাঁ করলাম, আওয়াজের বদলে শুকনো ঘংঘঙে কাশি, বুকটা যেন দশখানা হয়ে ছিটকে পড়ল এদিকসেদিক। 

আমি কোনওমতে আঙুলের খোঁচা দিয়ে অর্চিষ্মানকে জাগালাম। পাঁচবার ঘুমচোখে 'কী? কী?' করার পর অবশেষে বালিশের পাশ হাতড়ে চশমা পরে অর্চিষ্মান তাকাল যখন, আমি আরেকবার হাসিমুখে ঠোঁট নেড়ে বললাম, ‘শীত এসে গেছে।’

*****

ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার ব্লাড প্রেশার নর্ম্যালি কমের দিকেই থাকে না?’ বললাম, ‘নব্বই ষাট। শুক্রবার রাতে মাপলে পঁচাশি পঞ্চান্নও বেরোতে পারে।’

ডাক্তারবাবু ভুরু কোঁচকালেন। একবার ভাবলাম বলব কি না যে এটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। প্রেশার কীসে বাড়ল আমি জানি। কখন বাড়ল তাও জানি। চেম্বারে ঢোকার আগের আধঘণ্টায়।

এটা অবশ্য ডাক্তারবাবুর প্রাইভেট চেম্বার নয়, এটা হচ্ছে সমিতির চেম্বার। পুরোনো দূরদর্শী লোকেরা সমিতি খুলে গিয়েছিলেন, যেখানে সস্তায় নানারকম ডাক্তার দেখানো যায়, দাঁত থেকে শুরু করে কান থেকে শুরু করে শরীরের যে কোনও অংশে যে কোনও রকম যাতনা হলেই আমি আর অর্চিষ্মান ওখানে গিয়ে একখানা কুপন কেটে হত্যে দিয়ে পড়ি। সমিতিতে এয়ারকন্ডিশনিং নেই, ইউনিফরম নেই, অর্থাৎ সে সবের দাম আমাদের পকেট থেকে কাটে না। একখানা ধুদ্ধুড়ে ডেস্কটপের সামনে দুজন বসে থাকেন, ‘স্যার স্যার ম্যাম ম্যাম’ করেন না, খুচরো না দিতে পারলে রীতিমত ধমকান। কাচের গায়ে গোল ফোকর দিয়ে নিজের নাম, কাকে দেখাতে চাই সে ডাক্তারের নাম বললে খটাখট টাইপ করে, একখানা স্কেল ধরে প্রিন্ট আউটের নিচের অংশটুকু কেটে আমাদের হাতে দেন। ওটা আমাদের রিসিট, যেখানে লেখা আছে রেজিস্ট্রেশন + ডাক্তারের ফি বাবদ আমি কত টাকা দিয়েছি (যৎসামান্য)। ওপরের অংশটুকু চলে যায় ডাক্তারের ঘরে। ওটা আমাদের প্রেসক্রিপশন। ওখানেও আমার নামধাম বয়স ইত্যাদি ছাপা আছে। 

কিন্তু সবথেকে জরুরি জিনিসটা দুটোর একটাতেও ছাপা নেই। ওটা লেখা হবে হাতে। প্রেসক্রিপশন আর আমার রিসিট, দুটোরই  ডানদিকে মাথার ওপর অবহেলে একটা নম্বর লিখে গোল পাকিয়ে দেবেন কর্তৃপক্ষ।

ওটা আমার নম্বর। 

ডাক্তারবাবুর ঘরের সামনে যে জটলাটা জমেছে, তাদের মধ্যে আমি কার কার আগে আর কে কে আমার পরে, সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি নির্ধারণ করবে এই সংখ্যাটি।

একটা বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বড় হয়েছি বলে বোধহয়, নম্বর আমাকে নার্ভাস করে দেয়। ধরা যাক আমার নম্বর ছয়। অর্থাৎ যারা জটলা করেছেন তাঁদের মধ্যে আমি ছ’নম্বরে যাব। কিন্তু এই তথ্যটা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ অর্থহীন, যতক্ষণ না আমি জানছি পাঁচ নম্বর কোন জন। আমার পাশে এক মহিলা বসে আছেন, মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভয়ানক পেট ব্যথা, তাঁকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করি, 'আপনি কি পাঁচ, দিদি? আপনি কি পাঁচ?'

দিদি মুখব্যাদান করেন, ব্যথাটা নিশ্চয় মারাত্মক। কাঁপা কাঁপা হাত তুলে চারটে আঙুল দেখান। থ্যাংক ইউ। আমি ঘাড় অন্যদিকে ঘোরাই। সামনে কচি বাচ্চা নিয়ে এক মা বসে আছেন। বাচ্চাটা ভুরু কুঁচকে মোবাইলে প্যাঁ পোঁ শব্দ করে গেম খেলছে। মা একবার মোবাইল ফেরত চাইতে গেছিলেন, বাচ্চা এমন ঘ্যাঁক করে উঠেছে যে মা ছিটকে সরে এসেছেন। খেলো বাবা, যত প্রাণে চায় খেলো। আমি মাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনারা কত নম্বর?’ 

পাঁচ। যাক। অল্প পরিশ্রমে বেরিয়েছে। মা হলে কী হবে, বয়সে নির্ঘাত আমার থেকে দশ বছরের ছোট, ভারি নিরীহ মুখ মেয়েটির। নেক্সট জরুরি প্রশ্নটার জন্য আমি ওকেই পাকড়াও করি। ‘কত নম্বর গেছে ভেতরে?’ মেয়েটির মুখ করুণ হয়। ‘এই তো সবে প্রথম জন। এত লেট করে এলেন…’

তা ঠিক। আমাদের ডাক্তারবাবু একটু লেটলতিফ।

এইবার আমার শান্ত হয়ে যাওয়ার কথা। জরুরি তথ্য সব জানা হয়ে গেছে। বাকি যে যখন খুশি যাক, পেটব্যথা মহিলার পর মা আর বাচ্চা যাবে, মা আর বাচ্চার পর আমি যাব, ব্যস।  

কিন্তু আমি শান্ত হই না। কারণ আমার পাশে মহিলা ততক্ষণে ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন। উনি কার পরে যাবেন সেটা খেয়াল রাখার অবস্থায় উনি আর নেই মনে হচ্ছে, কাজেই আমাকেই কাজে নামতে হয়।

আমি চোখ সরু করে বাকিদের মাপি। ভিডিও গেম খেলা বাচ্চার পাশে একটা রোগা মতো ছেলে বসে আছে, হাতে বিরাট এক্স রে-র ঠোঙা। বসে হাঁ করে তাকিয়ে আছে এদিকের দেওয়ালে লাগানো টিভির দিকে। এদিকের চেয়ারের সারিতে অর্চিষ্মানের ওপাশে আরেকজন বসে আছেন, চাপা জিনস, নাগরা কাটিং বুটজুতো, কবজি থেকে রুপোলি তাবিজ আর নীল রঙের হেলমেট ঝুলছে। 

এদের দুজনের মধ্যে একজন দুই, অন্যজন তিন। কোনজন কে, সেটা আমাকে বার করতে হবে। 

সোজা জিজ্ঞাসা করলেই হয়। কিন্তু পাছে আমাকে কেউ ম্যানিয়াক ভাবে, রিস্ক নিই না। অর্চিষ্মানকে বলি, 'জিজ্ঞাসা কর না, উনি কত নম্বর।' অর্চিষ্মান পয়েন্ট ব্ল্যাংক রিফিউজ করে। 

'আমাদের ছ’নম্বর। আর আমাদের পরে কেউ আসেনি, কাজেই আমরা সবার লাস্টে যাব। তাই তো?'

আমি নিমরাজি ঘাড় নাড়ি। 

'তাহলে আর জিজ্ঞাসা করে লাভ কী, অপেক্ষা কর।'

অকাট্য যুক্তি।

আমি বলি, ‘আচ্ছা জিজ্ঞাসা করতে হবে না, তুমি আড়চোখে একটু খেয়াল রাখো, হেলমেটওয়ালা ওই যে সাদা কাগজটা হাতে নিয়ে পাকাচ্ছে, একবার খুলছে, আবার ভাঁজ করছে, ওটার ডানদিকে মাথার ওপর নজর রাখ।’

অর্চিষ্মানের মুখ দেখে আমার সন্দেহ হয়, ব্যাপারটাকে ও যথেষ্ট সিরিয়াসলি নিচ্ছে না। অগত্যা আমিই উঁকিঝুঁকি মারতে থাকি। একবার কাগজ প্রায় খোলোখোলো হয়েও খোলে না, আরেকবার জাস্ট একবার নীল রঙের একটা আবছা আভাস চোখে পড়ে মিলিয়ে যায়। সাসপেন্স সহ্যাতীত। এদিকে ডাক্তারবাবুর ঘরের ভেতর খকখক কাশির শব্দ জোর হয়ে উঠছে। দরজা খুলে যায়। কাশতে কাশতে প্রায় হুমড়ি খেয়ে এক নম্বর বেরিয়ে আসেন।

হেলমেট উঠে দাঁড়িয়েছে। দৃপ্ত ভঙ্গিতে নাগরাই বুট এগিয়ে যাচ্ছে ডাক্তারবাবুর ঘরের দিকে। 

আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াই। বাঁ হাত তুলে হেলমেটের রাস্তা আটকাই। জাস্ট একটা গাট ফিলিং।

উল্টোদিকের এক্সরে-কে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার নম্বর কত?’

“হাঁজি?”

“বলছি আপকা নম্বর কিতনা হ্যায়?”

ভদ্রলোক ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকেন। আমি ইশারায় হাতের চিরকুটটা দেখাই। ভদ্রলোক খোলেন। যা ভেবেছি তাই। জ্বলজ্বল করছে ‘দুই’।

বিজয়গর্বে অর্চিষ্মানের দিকে তাকাই। ধীরে, অতি ধীরে অর্চিষ্মানের মাথা দু’দিকে নড়ে। 
   
*****

ডাক্তারবাবুকে বললাম, “চিন্তা করবেন না, প্রেশার নেমে যাবে। টেম্পোরারি মনে হয়।”

ডাক্তারবাবু আশ্বস্ত হয়ে অন্যদিকে মন দিলেন। একটা পাতলা কঞ্চি জিভের ওপর চেপে ধরলেন, বললেন, ‘আআআ করুন।’ করলাম, ঠিক যেন ফাঁদে পড়া ভেড়া। ডাক্তারবাবু বলেন, “বাঃ বাঃ, বেশ টমেটোর মতো লাল করেছেন দেখছি।” বলে গড়গড় করে খানদশেক উপসর্গ বলে গেলেন, কিছু মিলল, কিছু মিলল না। কাল থেকে সবক’টা শুরু হবে, আশ্বাস দিলেন। ‘গার্গল করবেন, সিরাপ খাবেন দিনে তিনবার, অ্যান্টিবায়োটিক দিলাম না, পাঁচ দিনে না সারলে দেখা যাবে। এখন খালি বেশি করে জল খাবেন আর শুয়ে থাকবেন। অসুবিধে হলে ফোন করবেন, বুঝেছেন?’

ঘাড় নেড়ে থ্যাংক ইউ বলে ওষুধ কিনে বাড়ি চলে এলাম। টেবিলের ল্যাপটপ আর কোটি কোটি ডেটা কেবল সরিয়ে ফেলে এখন সে সব ওষুধের সবুজ শিশি আর রাংতা ফয়েল আর এনার্জি পাউডার রাখা হয়েছে। আমি টেবিলের পাশে খাটে বালিশ পিঠে গুঁজে বসেছি, ক্লান্ত লাগলেই সড়াৎ করে নেমে টুকটাক ন্যাপ নিচ্ছি, অর্চিষ্মান ঘন ঘন ফোন করে খবর নিচ্ছে। ঠিক করে খাচ্ছি কি না, বেশি ক্লান্ত লাগছে কি না। আমি বলছি, না না চিন্তা করার কোনও কারণই নেই। পরশুর থেকে কাল অনেক বেটার ছিলাম, কালকের থেকে আজ আরও ভালো।

ওষুধ তো কাজে দিচ্ছে নিশ্চয়, কিন্তু আমার ধারণা ওষুধের থেকেও বেশি কাজে দিচ্ছে ডাক্তারবাবুর অন্য পথ্যটা। গোটা সপ্তাহ যাওয়া তো দূরঅস্ত, অফিসের কথা ভাবা পর্যন্ত বারণ করে দিয়েছেন।



October 08, 2017

এ মাসের বই/ সেপ্টেম্বর ২০১৭/১/ রাগ'ন জোশ



উৎস গুগল ইমেজেস


‘ধর’ শুনে প্রথমে খুব লাফিয়েছিলাম, কিন্তু শীলা আসলে বিবাহসূত্রে কাশ্মীরী পণ্ডিত ‘ধার’, বাঙালি ‘ধর’ নন। শীলার কোনওকালেই বাঙালিদের সঙ্গে কোনও সংস্রব ছিল না, কারণ ধার হওয়ার আগে তিনি ছিলেন মাথুর কায়স্থ। 

শীলা ধারের লেখা রাগ’ন জোশ বইটি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। হোম (তখনও তিনি ধার হননি, মাথুর কায়স্থ জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বড় হচ্ছেন), মিউজিশিয়ানস (বিভিন্ন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও শিল্পীর সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত আলাপ পরিচয়ের গল্প), আদার পিপল ( এখানে মূলত স্বামী পি কে ধারের ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার সময় সেখানকার ঠাটবাট চলনবলন, এবং ভারত সরকারের পাবলিকেশন ডিভিশন লেখকের চাকরির সময়কার মানুষজন, অভিজ্ঞতার  কথা জায়গা পেয়েছে) দ্য কুকিং অফ মিউজিক অ্যান্ড আদার এসেজ (এই চ্যাপ্টারে রয়েছে রাগ রাগিণী সম্পর্কিত টেকনিক্যাল প্রবন্ধ), এবং পরিশিষ্টে শীলা ধারের দুখানি অবিচুয়ারি। 

আমার মতে বইটির সবথেকে চমকপ্রদ এবং উপভোগ্য অংশ হচ্ছে প্রথম এবং দ্বিতীয় অংশদুটি। শীলা ধার অত্যন্ত প্রিভিলেজড বাড়িতে জন্মেছিলেন। তাঁর ঠাকুরদা ব্যারিস্টার অ্যাট ল ছিলেন, এবং সিভিল লাইনস-এ প্রাসাদোপম অট্টালিকা বানিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিপত্তি এমনই ছিল যে ‘সাত নম্বর’ কানে শুনতে ভালো লাগে বলে বাড়ির নম্বর সাত রাখা হয়েছিল, আগেপিছে ছয় কিংবা আটের চিহ্নমাত্র না থাকা সত্ত্বেও। শুধু সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও মাথুররা ‘কালচার্ড’ও ছিলেন বলাই বাহুল্য। তাঁদের বাড়িতে সঙ্গীতের মহামহোপাধ্যায়দের মিছিল লেগেই থাকত, বইতে সে সব তথ্য ছড়িয়ে আছে।

এই রকম বাড়িতে জন্মালে দৃষ্টি নষ্ট হওয়ার একটা বিপদ সবসময় থেকে যায়। আমি বড় বাড়িতে জন্মানো সেলেব্রিটিদের আত্মজীবনী পড়ে দেখেছি, তাঁদের সবসময়েই চেষ্টা থাকে এই প্রিভিলেজ, এই এলিটিজমকে ছদ্ম তাচ্ছিল্যের চোখে দেখার, কারণ আফটার অল যারা বইটা কিনবে তারা সবাই ছাপোষা মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ, তাদের চোখে নিজেকে ‘রিলেটেবল’ প্রতিপন্ন না করতে পারলে বই বিক্রি হবে না। কাজেই তাঁরা যথেষ্ট পরিমাণে নিজেদের ব্যাকগ্রাউন্ডের নিন্দেমন্দ করলেও সে নিন্দের মধ্যে একটা প্রশ্রয়ের ভাব প্রকট থাকে। 

শীলা ধারের লেখায় সেটা এক্কেবারে অনুপস্থিত। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে নিজের মায়ের সঙ্গে শীলার গভীর সংযোগের সম্পর্ক, এবং সেই মায়ের প্রতি ওই বড় বাড়ির লোকজনদের ভয়াবহ আচরণ। 

শুধু বাড়ির ক্ষেত্রে নয়, পরবর্তীকালে গানের দুনিয়া নিয়ে লেখার সময়েও শীলা সমান স্পষ্টবাদী। শিল্পীরা বেশিরভাগ সময়েই খুব সুবিধের লোক হন না, তাঁদের হিংসেহিংসি, দলাদলি, একে অপরকে ক্রমাগত তাচ্ছিল্য করার চেষ্টা, সবই শীলা লিখেছেন। হিন্দুস্থানি বনাম কর্ণাটকীর যুদ্ধ, ঘরানা বনাম ঘরানার লড়াই, এই হাস্যকর কিন্তু সত্যি ব্যাপারগুলো ধামাচাপা দেননি। 

আর সবই লিখেছেন গভীর কৌতুকের দৃষ্টিতে। রাগ’ন জোশ-এর আরও একটা রিফ্রেশিং ব্যাপার হচ্ছে বইখানার অশ্রদ্ধামূলক ভঙ্গি। ক্লাসিক্যাল জগতের ওই নাম বলার আগে কান ধরে জিভ কাটার অসহ্য তৈলাক্ত বিনয় নেই শীলার। তিনি বেগম আখতারের ‘ভিকটিম সিনড্রোম’এর কথা অনায়াসে লিখেছেন, নিজের গুরু প্রাণনাথের স্বার্থপরতার কথাও বাদ দেননি। এবং এগুলো লেখার সময় কখনও আমার মনে হয়নি যে তিনি এঁদের কাউকে মন থেকে অপছন্দ করেন। একেবারেই না। শীলা নিজেই লিখেছেন,

“I love and admire the artistes that figure in this book. The eccentricities and frailties I have described do not diminish them in any way. On the contrary, they are intended to enhance the charm of their rich personalities.

অফ কোর্স, রাগ’ন জোশ-এর মূল জোর হচ্ছে গল্প। গল্পের পর গল্প। সে এমন গল্প, সবাইকে ধরে ধরে শোনাতে ইচ্ছে করে। “এই জায়গাটা শোনো” বলে কতবার যে অর্চিষ্মানের কান থেকে হেডফোন খুলিয়েছি আমি।

আপনাদেরও শোনাব ভেবেছিলাম। একটার পর একটা গল্প পড়ছি আর ভাবছি, রিভিউ লেখার সময় এই গল্পটা দেব। কিন্তু কোনটা দেব? সিদ্ধেশ্বরী দেবী প্রথমবার বিলেত যাওয়ার সময় তাঁর এক গুণমুগ্ধ যে ‘দ্য গ্রেট লেডি গোয়িং টু লন্ডন’ এই একটাই লাইন ক্রমাগত পুরিয়ায় গাইতে গাইতে সঙ্গে চলেছিলেন সেইটা? নাকি ফৈয়াজ খানের দর্শনার্থীদের অসীম ধৈর্যের গল্পটা? নাকি প্রথমবার লেখকর রেডিও রেকর্ডিং-এর গল্পখানা, যেটা পড়তে পড়তে হাসির চোটে আমি কি-বোর্ডের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিলাম আর অবান্তরের সেভ না করা অর্ধেক পোস্ট ডিলিট হয়ে গিয়েছিল?

বলার মতো অসংখ্য গল্পের মধ্যে থেকে আমি শেষমেশ সারেঙ্গী ওস্তাদ বুন্দু খানের গল্পটা বেছে নিলাম। 

“..his visits to us must have been a relief from the noisy and congested environment of his  own large joint family establishment in Suiwalan in the Old City. He was not really concerned about the poor living conditions. What bothered him was having to deal with the world outside music. He once told us that when he was young, he was expected to do errands in the vegetable market for his mother and aunts. ’It seemed to take forever’, he said with a tortured expression. We quite understood that the real hardship for him must have been the time he was forced to be away from music. To get over the problem, he designed a small bamboo sarangi which he could sling over his shoulder unobtrusively and use for practice with the finger of his left hand without making any sound while he went about his extra-musical chores. He added that he would drape a light shawl over the left shoulder to hide the sarangi so that he didn’t have to listen to casual comments from passing busybodies."

“One Sunday morning Bundu Khan got lost in our house. Dependable old Masoom Ali, my grandfather’s chauffeur, had driven the family dodge to Suiwalan and brought the maestro back in accordance with my father’s standing instructions and deposited him on the veranda. After a few moments my father hurried out of his dressing room to greet him but he was nowhere to be seen. Not in the lavatory, not still in the car, not on the terrace, nowhere. My father’s faithful valet, the smirking Jai Singh whom we all hated, was sent hunting everywhere without result. Half an hour after the panic set in we heard the faint, scratchy sounds of a sarangi. They seemed to be coming from the garden but we could not see anyone there. We followed my father in the direction of the sound and tracked it down to a tall, thick hedge of sweetpeas that divided the huge garden in front of our house into two sections. Ustad Bundu khan was lying in the flower bed on the farther side, his instrument balanced on his chest and shoulder, his eyes closed, completely engrossed in the music he was playing. Even my father who prided himself on courtly manners did not know how to awaken such a great musician from his reverie, or how to call such a revered name aloud. Anyhow, with much fake coughing and embarrassed clearing of the throat, my father managed to catch his attention. Ustad Bundu khan opened his eyes, just a slit, and scrambled on his feet when he saw the concern on the faces of the small assemblage. 

‘It is spring time, and I was playing for the flowers’, he said in complete explanation.

শীলা ধারের রাগ’ন জোশ আমার এ বছরের পড়া অন্যতম সেরা বইয়ের মধ্যে থাকবে।


October 07, 2017

কয়েকটা লিংক






গান্ধী সম্পর্কে অরওয়েল।

মঙ্গলে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে।


স্পিনস্টার কথাটা যে আর চলে না সেটা জানতাম, দু’হাজার পাঁচ থেকে ব্যাচেলরও নাকি ব্যাকডেটেড। 

যে কুমীরের ডায়েট ডাইনোসর, তার সাইজ যে পিলে চমকানো হবে তাতে আর আশ্চর্য কী।

রিসার্চের নামে অ্যাডভাইসরের জলটল বয়ে দিতে শুনেছি, কিন্তু মার্ডার মিস্ট্রি লেখার রিসার্চের নামে সত্যি সত্যি মার্ডারটা একটু বাড়াবাড়ি। 

পৃথিবীতে সব রঙের নাম দেওয়ার মতো ভাষা নেই আমাদের।

সবাই এই লিস্ট মেনে চললে আমার হলে গিয়ে সিনেমা দেখার ইচ্ছে আবার ফিরে আসবে, আমি নিশ্চিত। 

রোজ সকালে উঠে দশবার বলব আমি, আপনারাও বলা অভ্যেস করুন। এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার। এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার। 

ভাগ্যিস গুগল মনে করাল, না হলে তো জানতেই পারতাম না আজ এঁর জন্মদিন।


October 06, 2017

ঝালমুড়ি আর চাঁদ



ঝালমুড়ি খাওয়া আর এমন কী শক্ত ব্যাপার, বলবেন আপনারা। যাও, অর্ডার দাও। দাম জিজ্ঞাসা করতেও পার, আবার দাম নিয়ে মাথা একেবারে না-ই ঘামাতে পার কারণ প্রোহিবিটিভ দাম হওয়ার জন্য ঝালমুড়ি না খেতে পেয়ে ফিরে আসতে হবে, সে রকম হওয়ার সম্ভাবনা কম। 

প্রোহিবিটিভ দাম হলেও যে সব ক্ষেত্রে ফিরে আসা যায় এমন নয়।  সি আর পার্কের মোটামুটি সব তরিতরকারিওয়ালাই ডাকাত, কিন্তু একজন আছেন ডাকাতদলের সর্দার। তাঁর দাম শুনে কেউ অবাক হলে তিনি আরও অবাক হয়ে বলেন, “এ কি দিল্লির পচা মাল পাইসেন নাকি? আমার কাছে যা দ্যাখতাসেন সব কলকাতার।” এই সর্দারের কাছ থেকে আমি পঁচাত্তর টাকা দিয়ে একবার একখানা ফুলকপি কিনেছিলাম। আমারই দোষ হয়েছে, দাম জিজ্ঞাসা না করে ফুলকপি দিতে বলেছি। আরও কী সব নিয়েছিলাম সঙ্গে, আলু পটল লালশাক। টোটাল শুনে চোখ কপালে তোলাতে ডাকাতসর্দার হেসে হেসে বললেন, “কপিটাই তো পঁচাত্তর।” আমি মুখ বুজে ফুলকপি নিয়ে বাড়ি চলে এলাম, আর পরদিন আলু দিয়ে তরকারি রাঁধার সময় ভাবতে লাগলাম, কপিটা দেখতে কিন্তু ভালো, ফটফটে ফর্সা, ঠিক বিগ বাজারের অ্যাডের মতো। সস্তা কপি হলে হয়তো দাগটাগ থাকত। খেতে বসে ক্রমাগত বলে চললাম, “কপিটার টেস্ট কিন্তু ভালো, বল? ধাপার মাঠের রিয়েল ফুলকপির মতো খেতে। তাই না? তাই না?” বলতে বলতে প্রায় যখন গলা বুজে এসেছে, চোখে জল আসে আসে, অর্চিষ্মান বলল, “ওরে বাবা কুন্তলা, কিছু ক্ষতি হয়নি পঁচাত্তর টাকার ফুলকপি কিনে। এখন শান্তিতে খাও তো।” 

(“শান্তিতে খেতে দাও তো” বলেনি কিন্তু, ও রকম করে কখনও বলে না অর্চিষ্মান, ভীষণ ভদ্র ছেলে।)

অত গায়ে লাগলে ব্যাগ থেকে কপি বার করে বাড়ি চলে আসাই উচিত ছিল, সাধ্যে না কুলোলে বা অযৌক্তিক খরচ মনে হলে হাত তুলে চলে আসাই আমার নীতি, কিন্তু আমি ডাকাতসর্দারের ক্ষেত্রে সেই নীতি কখনও প্রয়োগ করে উঠতে পারিনি। এঁর পার্সোন্যালিটিই আলাদা। আরেকদিন টোটাল দাম শুনে ঢোঁক গিলে জিজ্ঞাসা করেছি, “এই যে করলা, থুড়ি, কলকাতার করলাগুলো নিলাম, দাম কত?” সর্দার টং থেকে ভুরু কুঁচকে গর্জন করলেন, “এহন জিগায়া কী হবে? দিয়া দিসি তো।” আমি নার্ভাস হয়ে গিয়ে বললাম, “না না, এমনিই জিগাচ্ছি আরকি।”

প্রোহিবিটিভ দামের জন্য একেবারেই যে কিছু ব্যাগ থেকে বার করাইনি তা নয়। ওই সর্দারের দোকানেই করেছি। সর্দার ছিলেন না, তাঁর চ্যালা ছিল। আমিও নরম মাটি পেয়ে আঁচড়ালাম। কাঁচা আমের সিজন ছিল। বেশ কিছুদিন ধরে অর্চিষ্মানের কাঁচা আমের চাটনির কথা মনে পড়ছিল। সর্দারের দোকানের ঝুড়িতে ঢিবি করে কাঁচা আম রাখা ছিল। তাদের সবুজ রঙে সর্দারের দোকানের টিউবলাইটের আলো পিছলে যাচ্ছিল। টাকা দিয়ে চলে আসার আগে কী মনে হল, আম দু’খানার দাম জিজ্ঞাসা করলাম। একশো তিরিশ বা তার কাছাকাছি কিছু একটা। আমি চ্যালাকে দিয়ে ওই জোড়া কাঁচা আম ব্যাগ থেকে বার করিয়ে টাকা ফেরত নিয়েছিলাম। তারপর সফল-এ এসে একজোড়া আম কিনেছিলাম আঠেরো টাকায়। একশো আঠেরো নয়, জাস্ট আঠেরো। হ্যাঁ, সবুজ অত সতেজ ছিল না, চামড়া কুঁচকেও গিয়েছিল জায়গায় জায়গায়। কিন্তু চাটনি বানানোর পর কিচ্ছু টের পাইনি। 

ঝালমুড়ির ক্ষেত্রে এমন হওয়াটা একটু শক্ত। কত আর বেশি দাম হবে। দশের জায়গায় পনেরো। শুনে হয় আপনি চুপ করে থাকবেন বা তেমন স্মার্ট হলে সঙ্গীকে বা সঙ্গীর অভাবে দোকানদারকেই বলবেন, “আমাদের ছোটবেলায় এসব দু’টাকায় খেয়েছি। ঠোঙার সাইজও ছিল ডবল।” আর কেউ কেউ থাকবেন বলবেন, “এগুলো আর বাড়িতে বানাতে কী, মুড়ি নাও, সর্ষের তেল নাও, চাট মশলা, ভাজা মশলা, একটু সেদ্ধ ছোলা আর কাবলি, সেদ্ধ আলু, ব্যস হয়ে গেল, ঝালমুড়ি। হ্যাঁ, কাঁচালংকাগুলো একটু মিহি করে কুচোতে হবে। ব্যস। বাঙালি ডি আই ওয়াই করবে না, খালি দাম দাম বলে চেঁচালে হবে?”

আমি অলমোস্ট গ্যারান্টি দিতে পারি এই শেষ দলের লোকেরা জীবনে দু’বারের বেশি রান্নাঘরে ঢোকেননি। চোখে দেখে কাবলি ছোলা আর অড়হর ডালের তফাৎ বলতে পারবেন না। 

চেনা ঝালমুড়িওয়ালা হলে তো আরওই মজা। দাঁড়িয়ে অর্ডার দেওয়ারও দরকার নেই, যেতে যেতে বলে যাও, “দুটো প্যাক করে রাখুন দাদা প্লিজ, আমি ফুলকপি কিনে আসছি।”  দুটো মুড়ির একটায় যে ঝালনুন নর্ম্যাল, আরেকটায় যে দুটোই অ্যাবনর্ম্যালি বেশি আর নারকেল বাদ, এসব ওঁদের মুখস্থ হয়ে গেছে। 

তাই যখন দেখলাম দাদা নারকেল ফালি তুলেছেন হাতে, অবাক হলাম। দাদার মুখটা যেন কেমন উদাস উদাস। সারাদিন অন্যত্র যে কাজে যান দাদা, হয়তো সেখানে কোনও মনোমালিন্য হয়েছে। হয়তো কেউ কড়া গলায় কথা বলেছে। হয়তো ছেলেমেয়ের রেজাল্ট ভালো হয়নি। হয়তো পুজোয় কিনে দেওয়া নতুন জুতো অলরেডি ছিঁড়ে ফেলেছে। হয়তো স্ত্রীর কাশিটা যাচ্ছে না। হয়তো দেনা জমে গেছে অনেক, খাতক তাগাদা দিচ্ছে। হয়তো মায়ের ক্যান… 

স্টপ। জাস্ট স্টপ। নিজের কল্পনাকে জোর ধমক দিলাম। তারপর আস্তে করে বললাম, “নারকেল লাগবে না দাদা।” 

দাদা আমার মুখের দিকে তাকালেন। গোঁফের ফাঁকে হাসি ফুটল। “ওহ। লবণ একটু বেশি যাবে তো?” 

দাদা কবজি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুড়ি মাখতে লাগলেন। চারপাশে অন্যান্য দিনের থেকে বেশি ভিড়। তবে কালকের থেকে কম। নাড়ু, ফুলের মালা, মঠ, কদমা, নারকেলের আজ ভাঙা হাট। আজ কিনছে যারা অগোছালো, কোনও কিছুই সময়ে করে উঠতে পারে না, কিংবা ভাঙা হাটে কম দামে জিনিস পেলে যাদের সুবিধে হয়। অনেক বাড়িতে হয়তো পুজো হয়েও গেছে। রিষড়াতেই টুকাইদা পুজোতে বসে গেছে খবর পেয়েছি। একটু বাদে ঘণ্টা নেড়ে উঠে পড়লেই নাড়ু, নিমকি, মঠ, কদমা, চালমাখা, ডালমাখা, সন্দেশ নিয়ে আপ্যায়নে নামবেন মা আর বিজলিদি। আর আমি তখন নাপতোল চালিয়ে ঝালমুড়ি চিবোব। 

আমার মুখটাও দাদার মতো উদাস হয়ে গেল। দাদা মুড়ি মাখতে মাখতে মাঝে মাঝে মুখ তুলে সামনের আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন। অন্যদিন যেমন সম্পূর্ণ মনোযোগ স্টিলের ক্যানের স্থাপিত করে স্টিলের হাতা ঘুরিয়ে মুড়িতে ঝড় তোলেন, আজ দাদার তেমন মনোযোগ নেই।

একজন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ছ’ফুট লম্বা, দেড়ফুট চওড়া। এঁকে আমি চিনি, মানে দেখেছি। রোগা হওয়ার চেষ্টা করছেন বোধহয়। দাদার কাছ থেকে স্প্রাউট চাট নিয়ে এগরোলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে করুণ মুখে খান। দাদার মুড়ি বানানো শেষ। ঠোঙাদুটোর মুখ যত্ন করে মুড়ে ঘুগনির ডেকচির ঢাকনার ওপর রেখে স্প্রাউটের বাটির গামছাঢাকা সরিয়ে অঙ্কুরিত ছোলা তুলবেন বলে দাদা হাত মুঠো করলেন, আমি ঠোঙাদুটো ব্যাগে পুরে পেছন ফিরে ব্যাগের চেন টানতে টানতে মুখ তুললাম, বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। 

ওটা কী? কৃষ্ণা এস্টেটের ব্যানারের ওপারের ঝাঁকড়া গাছটার মাথার মারাত্মক কাছে, আকাশের গায়ে ওটা কী? আমাদের চেনা চাঁদ? এত গোল? এত বড়? এত জ্যান্ত যেন অল্প অল্প দুলছে?

চাঁদটা দেখতে দেখতে হাঁটব বলে বাঁদিকের শর্ট রাস্তায় না গিয়ে সোজা রাস্তা ধরলাম। চাঁদও তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আর আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দাদার দিকেও। চাঁদের চোখে চোখ রেখে হাঁটতে হাঁটতে আমি মনে মনে প্রার্থনা করলাম, রোগ নয়, শোক নয়, দুঃখ নয়, কষ্ট নয়, দাদার অমনোযোগের জন্য একমাত্র দায়ী যেন হয় কোজাগরীর চাঁদ। 


October 04, 2017

(অবহেলিত?) আট



ক’দিন আগেও যেমন সাড়ে পাঁচটাতেই চারদিকে হা হা আলো, এখন ছ’টা সতেরোতেও জানালার বাইরে কারি গাছের অবয়ব অস্পষ্ট। তিন্নির দেওয়া কাগজের ল্যাম্পের হলুদ আলোর আবেশ এখনও মায়াবী। হাতের তেলোয় দ্বিতীয় কাপ চায়ের আরাম, কানে অঞ্জন, চোখের সামনে অবান্তর। মুহূর্তটার পারফেকশন আমাকে দুর্বল করে দেয়। আহা, অবান্তর। সেই কবে থেকে…

একটা আতংক মাথার মধ্যে ব্রেক ক্যাঁ——চ করে ব্রেক কষে। গত মাসে অবান্তর আট পেরিয়ে নয়ে পা দিয়েছে।এবং আমি সেটা সম্পূর্ণ ভুলে গেছি।

খসখসিয়ে লাল ডায়রির পাতা উল্টোই। এই তো, টেনথ সেপ্টেম্বর। কী রাজকার্য করছিলাম আমি? পেপার লিখছিলাম? মাস্টারপিস উপন্যাসের ছক কষছিলাম? ছোটগল্প ভাঁজছিলাম? নাকি ইদানীং যা নিয়ে জীবনে হুলাবিলার অন্ত নেই সেই অনুবাদে আবিষ্ট ছিলাম? কিচ্ছু না। ইন ফ্যাক্ট, অবান্তরের আট পেরিয়ে নয়ে পা রাখার দিনটাতে আমি অবান্তরেই যকের ধন-এর রিভিউ পোস্ট করছিলাম। 

আমি জানি না এর প্রায়শ্চিত্ত হয় কি না, বা হলেও অবান্তর সেটা অ্যাকসেপ্ট করবে কি না। অবান্তরকে দেখতে নিরীহ ভালোমানুষ হলে কী হবে, দরকার বুঝে ঘরের কোণে মুখ নিচু করে বসে নখ খুঁটতে খুঁটতে “আমাকে তো কেউ ভালোবাসে না, আমার জন্মদিন তো সবাই ভুলে যায়” বলে গিল্টে ভাজাভাজা করতে জানে।

তবু চেষ্টা তো করতেই হবে। তাই জন্মদিন পেরিয়ে যাওয়ার চব্বিশ দিন পর আমি অবান্তরের আট বছর উদযাপন করছি। এবং ন্যূনতম যে আট রকম ভাবে (ভাবলে আশি রকম বেরোবে) অবান্তর আমার জীবন বদলে দিয়েছে,  তা সবার সামনে স্বীকার করছি।

১। অবান্তর আমাকে আমার সারাদিনের একমাত্র ভালোলাগা কাজটার সন্ধান দিয়েছে।
২। অবান্তর আমাকে সেই ভালোলাগা কাজটা ক্রমাগত প্র্যাকটিসের সুযোগ দিয়েছে।
৩। অবান্তর আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে কোনও কিছুতে “লেগে থাকার” উপকারিতা (এবং তৃপ্তি) বুঝিয়ে দিয়েছে। 
৪। গত আট বছরের আর্কাইভ চোখের সামনে মেলে ধরে অবান্তর আমাকে ক্রমাগত সর্বক্ষণ মনে করাচ্ছে, কী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কী পরিমাণ হাসির পাত্র আমি বানিয়েছি নিজেকে।
৫। এবং সেই একই যুক্তিতে, এখন যা হচ্ছে, সেটাও হাস্যকর ছাড়া আর কিছু হচ্ছে না। 
৬। অবান্তর কক্ষনও নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমার চরিত্রের বাইরে গিয়ে নেটওয়ার্কিং-এ বাধ্য করেনি।
৭। অবান্তর আমাকে আমার বুদবুদের বাইরে পা না রেখে ইন্টারেস্টিং মানুষের সঙ্গ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। 
৮। মুখে যা-ই বলুক না কেন, অবান্তর আমাকে ভালোবেসেছে। সত্যি সত্যি ভালোবেসেছে। না হলে কেউ আট বছর (অ্যান্ড কাউন্টিং) আমার মতো বোরিং লোকের সঙ্গে থেকে যায় না।

বিলম্বিত কিন্তু একটুও অবহেলিত নয়, জন্মদিনের অনেক অনেক অনেক শুভেচ্ছা ভালোবাসা, অবান্তর। তুমি না থাকলে আমিও নেই।

পুনশ্চঃ বিলম্বিত জন্মদিনে অবান্তর আপনাদের একটা গান শোনাতে চায়। আমি বলেছিলাম, এটা একটু বেশি নাটকীয় হয়ে যেতে পারে, তাতে অবান্তর “চব্বিশ দিন” বলে মুখ কাঁদো কাঁদো করল এবং আমার রাজি না হয়ে উপায় থাকল না। গানটার কথায় ‘এন্ড’, ‘ফাইন্যাল কার্টেন’ ইত্যাদিগুলো শব্দগুলো অগ্রাহ্য করবেন, ওগুলো আজকের অনুষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য নয়। প্রযোজ্য হচ্ছে গানটার সার বক্তব্যখানা। আর হ্যাঁ, লাস্ট লাইনটা গাওয়ার সময় ‘দ্য কিং’ যখন হাঁটু বেঁকিয়ে হাত ছড়িয়ে মঞ্চের ওপর স্থির হচ্ছেন, অবান্তর আপনাদের জানিয়ে দিতে বলেছে, ওই ভঙ্গিটাই অবান্তরের আসল স্পিরিট। 






October 02, 2017

সপ্তমীতে অঞ্জন



গত কয়েকদিন ধরে ওলাশেয়ার উবারপুলে যা অপদস্থ হতে হল। সি আর পার্ক যাব শুনলেই সহযাত্রীরা রাখঢাক না রেখে মাথা নাড়ছেন, ছিকছিক শব্দ করছেন, ফোন তুলে ওপারের বাস্তব কিংবা কাল্পনিক বন্ধুকে বলছেন, কাহাঁ ফঁস গয়ে ইয়ার। তাঁদেরও দোষ দেওয়া যায় না, গোটা রাস্তা পক্ষীরাজের গতিতে ছুটে এসে সি আর পার্কের মুখে আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হলে এদিকে পুজোয় নতুন জামা না হলে রাগ হওয়ারই কথা। 

আমার নতুন জামা এমনকি নতুন জুতো পর্যন্ত হয়েছে, তবু আমারই মাথা ধরে যাচ্ছিল। সপ্তমীর দিন অফিস থেকে ফেরার পথে সব রাস্তা বন্ধ, রাস্তা জুড়ে পুলিশ, পাঁপড়, বিরিয়ানি এবং বাঁশ।  

বাড়ি এসে জামাকাপড় ছেড়ে শয্যা নিলাম। বেল বাজল। যত না ক্লান্তি, মুখচোখের ভাব তার থেকে দ্বিগুণ করে গেলাম দরজা খুলতে। অত ভালো অভিনয় কাজে দিল না যদিও। প্রতিবাদের সুযোগই পেলাম না, আধঘণ্টা বাদে আবিষ্কার করলাম, ফ্যাব ইন্ডিয়া থেকে কেনা সবুজ সিল্কের জামা পরে রসরাজ-এ দাঁড়িয়ে আছি। 

অর্চিষ্মান দাবি করেছে, ক্ষীরের সিঙাড়া আর বেকড রসগোল্লা খেয়ে নিলেই সব ক্লান্তি হাওয়া হয়ে যাবে। তখন আর হেঁটে হেঁটে ঠাকুর দেখতে কোনও কষ্টই হবে না। 

খেয়েদেয়ে ডি ব্লক আর মেলা গ্রাউন্ডের ঠাকুর দেখে আমরা হাঁটা দিলাম নবপল্লীর মাঠের দিকে। ওখানে আজ অঞ্জন দত্ত অ্যান্ড নীল দত্ত গাইতে আসবেন। পোস্টার দেখা ইস্তক অর্চিষ্মান বলে রেখেছে, ঝড় হোক, ঝঞ্ঝা হোক, এইটা মিস করা চলবে না। কোটি কোটি বাচ্চা, মাথায় কোটি কোটি হেয়ারব্যান্ড, চোখে সানগ্লাস, হাতে বুড়ির চুল এবং হাওয়াকল নিয়ে রাস্তা জ্যাম করে রেখেছে, সে সব পেরিয়ে আমরা নবপল্লীর মাঠে গিয়ে পৌঁছলাম। 

বলা বাহুল্য, সিট নেই। মাঝে মাঝে দু’চারটে খালি চেয়ার দেখে উত্তেজিত হচ্ছি, কাছে গেলেই বেরোচ্ছে রুমাল পাতা। ধুত্তেরি বলে একেবারে সামনে চলে গেলাম। লাল কার্পেট পাতা, নতুন জুতো খুলে বসে পড়লাম বাবু হয়ে। তখনও নবপল্লীর স্থানীয় ট্যালেন্টদের প্রোগ্রাম চলছিল। নতুন লোকগীতি, পুরোনো লোকগীতি, বেশিরভাগই দুর্গাপুজো সংক্রান্ত। শিল্পীরা দারুণ আনন্দ করে গাইছিলেন, বাজাচ্ছিলেন। দিব্যি লাগছিল। নিচ থেকে কর্মকর্তারা “আরও একটা আরও একটা” ইশারা করছিলেন। আমি আর অর্চিষ্মান বলাবলি করছিলাম, অঞ্জন দত্তর পাউডার মাখা শেষ হয়নি নির্ঘাত।
  
অবশেষে লোকগীতির অনুষ্ঠান শেষ হল। ঘোষক ভারি রহস্য করে হাসি হাসি গলায় জানালেন, অবশেষে মহালগ্ন সমাগত। এতক্ষণ কার্পেট ফাঁকা ফাঁকা ছিল, নিমেষে গিজগিজ হয়ে গেল। ছোট ছোট লাইট জ্বলানেভা জুতোরা আমার সিল্কের জামা পাড়িয়ে দৌড়ে চলে গেল। বিশাল লটবহর নিয়ে ছায়া ছায়া কয়েকজন মানুষ মঞ্চে উঠে এলেন।  

নীল দত্তকে চিনতে পারলাম, ড্রামারের পদবী পরে জানলাম বক্সী, বেস গিটারে প্রশান্ত। মঞ্চের ডানদিকে সামনে আরেকজন দাঁড়িয়ে গিটার টিউন করছিলেন, আমি সিরিয়াসলি ভেবেছি অঞ্জন দত্তর কোটি কোটি সাহেব বন্ধুর মধ্যে কেউ একজন হবেন। তারপর শুনলাম উনি বিখ্যাত গিটারিস্ট অমিত দত্ত। সত্যি বলছি, আমি ওঁর নাম জানতাম না, স্রেফ চেহারা দেখেই ফ্ল্যাট। তারপর বাড়ি এসে গুগল করে বেরোলো অমিত দত্ত নাকি রায়চাঁদ বড়ালের নাতি! 

সকলেই উঠে যে যার যন্ত্রের কান মুলছেন, উইংসের দিকে তাকিয়ে এইসব আঙুল তুলে এক নম্বরটা বাড়াও, দুই নম্বরটা কমাও এইসব নির্দেশ দিচ্ছেন, অঞ্জন দত্তর দেখা নেই। মঞ্চের মাঝখানে মাঝের মাইকটা একজন টেস্ট করছিলেন। খানিকক্ষণ বাদে আমাদের সন্দেহ হল ইনিই অঞ্জন দত্ত নয়তো? হয়তো মোটা হয়ে গেছেন, চুল বড় রেখে ঝুঁটি বেঁধেছেন। টিভিতে লোকের আসল চেহারা বোঝা যায় কি না কে জানে। আমরা ভদ্রলোককে কেটে ছেঁটে অঞ্জন দত্তর চেনা চেহারায় ফিট করানোর চেষ্টা চালাচ্ছি, এমন সময় আলোটালো সব ডিম হয়ে গেল, স্টেজের পেছন থেকে ভসভসিয়ে সাদা ধোঁয়া বেরিয়ে এল, এই ভদ্রলোক ও পাশের উইং দিয়ে ভেতরে চলে গেলেন, আর এ পাশের উইং থেকে কানফাটানো হাততালি আর হুপহাপ চিৎকারের মধ্যে নীল জিনসে কালো টি শার্ট গুঁজে গটগটিয়ে বেরিয়ে এলেন অঞ্জন দত্ত। এসেই কথাটথা না বলে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে ধরলেন, “সেই বুড়ো পুরোনো গিটার”।

তারপর 'শুনতে কি চাও তুমি' থেকে 'মেরি অ্যান' থেকে 'রঞ্জনা' হয়ে 'বেলা বোসে' আসতে আসতে নবপল্লীর প্যান্ডেলে বিস্ফোরণ ঘটল। 

অবান্তরের অ্যাবাউট মি- পেজে খারাপ লাগা জিনিসের মধ্যে অঞ্জন দত্ত-র গান লিখে রেখেছি বটে, কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, খারাপ লাগুক আর জঘন্যই লাগুক, অঞ্জন দত্তর প্রতিটি গান আমার কণ্ঠস্থ। পুরোনো গিটার, শুনতে কি চাও, মেরি অ্যান, বেলা বোস, রঞ্জনা, খাদের ধারের রেলিংটা, তুমি না থাকলে, কত কী করার ছিলো যে… কোনওটা বাদ নেই। অঞ্জন দত্ত একেকটা গান ধরছেন, আর আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি, এইটার নিশ্চয় সুর মনে নেই, এইটার নির্ঘাত কথা ভুলে গেছি।

প্রত্যেকটি গানের প্রত্যেকটি লাইনের প্রত্যেকটি শব্দ মনে আছে। এমন নয় যে গানগুলো আমি নিত্যি দু’বেলা শুনছি, কারণ আমি তো অঞ্জন দত্তর গান ভালোবাসি না, তবু মনে রয়ে গেল কী করে সেটা একটা রহস্য। সেই কবে চোদ্দ পনেরো ষোলোতে শোনা গানগুলো এই সাঁইত্রিশে মনে রয়ে গেছে কী করে? 

হয়তো চোদ্দ পনেরো ষোলো বলেই গেছে। 

হাততালি দিতে দিতে হাত লাল হয়ে গেল, চেঁচিয়ে গাইতে গাইতে গলা খুলে গেল। এগারোটা নাগাদ অর্চিষ্মান একবার কানে কানে বলার চেষ্টা করল, “বাড়ি যাবে নাকি, কাল আবার অফি…” আমি বললাম, “ক্ষেপেছ, অফিস তো থাকবে, অঞ্জন দত্ত তো থাকবে না।” 

পনে বারোটার প্যান্ডেলশুদ্ধু লোকের কোরাসে ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ দিয়ে ফাংশান সাঙ্গ হল। পকেট ফর্টির গলিতে বেরিয়েই দেখি একটা টিংটিঙে লোক, ছাগলদাড়ি নেড়ে নেড়ে ফোনে কাকে বলছে, “বেসিক্যালি, গানবাজনাটা ছাড়া আর সবই হচ্ছে বাঙালির।” মনে মনে “আঁতেল কোথাকার” গালি দিয়ে অর্চিষ্মানকে বললাম, “তুমি না থাকলে সকালটা ইত্যাদি ইত্যাদি সে সব তো জানাই ছিল, কিন্তু তুমি না থাকলে আজকের সন্ধ্যেটাও যে এত ভালো কাটত না, এইটা আরও সাংঘাতিক।” 

সেই থেকে মেরি অ্যান আর হরিপদ লুপে শুনে যাচ্ছি।



September 30, 2017

যতই অকওয়ার্ড হোক



একসময় বিজয়া এলে আতংক হত। দশমীর সকাল থেকে মাবাবা মনে করাতেন, কাকে কাকে ফোন করতে হবে। করতেই হবে। আমি যত বলি, এতদিন কথা নেই, দেখা নেই, হঠাৎ ফোন করে বিজয়ার প্রণাম করতে যাওয়াটা মহা অকওয়ার্ড হবে, কিছুতেই শুনবেন না। হোক অকওয়ার্ড। তবু করবে। ওঁরা খুশি হবেন। তাছাড়া খুশিঅখুশির ব্যাপারই না এটা। কর্তব্য পালনের মতো করে করবে। 

গত বছরদুয়েক থেকে নিজেই করি। অস্বীকার করব না, ফোনের রিং হওয়ার সময় একবার মাথায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে, কী বলব? তারপর ওপারের হ্যালো-র উত্তরে নিজের পরিচয় দেওয়ামাত্র সব অকওয়ার্ডনেস হাওয়া হয়ে যায়। সাজিয়েগুছিয়ে, ভেবেচিন্তে, আগুপিছু বেছে যে কথা বলতে হবে, একটা শব্দ এদিকওদিক হয়ে গেলে চাকরি জুটবে না, কিংবা ফ্রাইডে নাইটের আড্ডায় ইমেজ চুরমার, তেমন তো নয়, এ সব কথার নদী বইছে আমার জন্মের, কোনও কোনও ক্ষেত্রে আমার বাবামায়ের জন্মেরও আগে থেকে। আমার হাঁ করার শুধু অপেক্ষা। অমনি উল্টোদিক থেকে কথার তোড়। কোথায় আছিস, কেমন আছিস, কত মাইনে পাস। এ বছর কোনও প্রশ্নের ঘুঁষিতে কাৎ হলে কুছ পরোয়া নেই, আসছে বছর আবার হবে। কখনও ন্যায্য নালিশ। তোরা তো আর আসবি না, বলে কী হবে। তখন সত্যি লজ্জা পাওয়া। সত্যি চাই গো যেতে, কিন্তু সময় নেই। যতদিন নেই, ততদিন এই বিজয়ার ফোন আছে। খুব খুব বিরল কেসে, এতই বিরল যে সে কথা তোলাও ভুল তবু সত্যের খাতিরে লিখছি, মনে হয়েছে, হয়তো ওপ্রান্তের সুর সামান্য কাটা। মনে হয়েছে, হয়তো সুতো ধরে রাখার চেষ্টা বৃথা। সত্যি তো, আমার কী দায়? তখন নিজেকে মনে করানো, প্রশ্নটা দায়অদায়ের নয়, প্রশ্নটা কর্তব্যের। বছরে তো মোটে একটা দিন। 

আজ রাতে, কাল সকালে সবার নম্বর খুঁজে খুঁজে বার করে ফোন করব। কাউকে বাদ দেব না। 

আপনাদের তো দেবই না। আপনাদের সবার জন্য রইল আমার অনেক ভালোবাসা, নমস্কার, কোলাকুলি। সবাই ভীষণ আনন্দে থাকুন, যা চান তাই পান। শুভ বিজয়া। 


September 29, 2017

ঠাকুমার পুজো



এককালে আমরা অষ্টমীর রাতে ঠাকুর দেখতে বেরোতাম, একডালিয়া আর কলেজ স্কোয়্যার আর মহম্মদ আলি পার্কের মণ্ডপে ঢুকে ঠাকুর দেখে আসতাম, আর ক’বছর পরে এই সব গল্প লোকের কাছে করলে লোকে বলবে, দেখেছ, চিরকেলে বাঙাল, জমিদারি ফলাচ্ছে।

আমি জীবনে চল্লিশ মিনিটের বেশি কোনও প্যান্ডেলে লাইন দিইনি। রিষড়ার শুনশান প্যান্ডেলে তো না-ই, কলেজ স্কোয়্যার, কুমোরটুলি, বাগবাজার ইত্যাদি হেভিওয়েট পুজোতেও দিইনি। দিইনি আমি বিরাট বিপ্লবী বলে কিংবা এই সব পুঁজিবাদী আস্তিক বাগাড়ম্বরে আমার অরুচি আছে বলে নয়, দিইনি দিতে হয়নি বলেই। গেছি, প্যান্ডেলে ঢুকেছি, নমো করে বেরিয়ে এসেছি। একবার কলেজ স্কোয়্যারের পুকুরপাড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হয়েছিল মনে আছে, তাও চল্লিশ মিনিটের বেশি কিছুতেই হবে না।  

এইবার লোকে আমার এজ শেমিং করবে, পরশু অঞ্জন দত্তকে যেমন করলেন একজন। “আপনি যখন রঞ্জনা লিখেছিলেন স্যার, আমরা ইশকুলে পড়তাম, উঃ, জাস্ট ভাবা যায় না।”  বলবে, সে তো তোমাকে এককালে সোমবার সোমবার মানডে টেস্টও দিতে হয়নি, ইনস্ট্যাগ্রামে অ্যাকাউন্টও খুলতে হয়নি, হাসি বোঝাতে অল ক্যাপস-এ লোল-ও টাইপ করতে হয়নি। তুমি লোলচর্ম হয়েছে বলে তো পৃথিবী থেমে থাকবে না। মান্ধাতার, থুড়ি, তোমার আমলে লাইন ছিল না বলেই এ আমলেও প্যান্ডেলের সামনে লাইন পড়বে না এটা কেমন যুক্তি?

আমি না হয় মান্ধাতা, অর্চিষ্মানকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি হায়েস্ট কতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েছ?” অর্চিষ্মান ভেবেটেবে বলল, “পঁয়তাল্লিশ মিনিট।” 

বছরদুয়েক আগে টিভিতে দেখলাম শ্রীভূমি না কোন একটা পুজোর লাইনে একজন হাসি হাসি মুখে বলছেন, “এই তো সবে সাড়ে তিন ঘণ্টা হল।” আগের বছর নাকতলার বাবামা চতুর্থীর সন্ধ্যেবেলা বেরিয়ে জ্যামে তিনঘণ্টা দাঁড়িয়ে আধখানা ঠাকুরও না দেখে বাড়ি ফিরে এবার বুদ্ধি খাটিয়ে তৃতীয়ার দুপুরবেলা বেরিয়ে কয়েকখানা পুজোতে টিক মেরে এসেছেন।

হঠাৎ হল কী?  কলকাতার জনসংখ্যা কি চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে গেল গত ক’বছরে? 

একজন বললেন, “কলকাতার কেন হতে যাবে রামোঃ, মফস্বল থেকে পালে পালে পাবলিক আসে আজকাল শহরের ঠাকুর দেখতে, এ হচ্ছে তাদের ভিড়।”

অস্বস্তিকর নীরবতা কাটাতে একজন প্রস্তাব দিল চুসকি খেয়ে আসার। 

অনেক বেরসিক আছেন, লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখাকে ভয়ানক বেঁকা চোখে দেখেন। “কারা এরা? কী দেখে?”

আপনি যদি আশা করেন লোকে প্যান্ডেলে যায় দশ হাত, টানা চোখ, শুঁড়, কেশর, বীণা কিংবা বাবরি দেখতে, তাহলে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি আপনাকে, ও সব কেউ দেখে না। এমনকি সবাই এক জিনিসও দেখে না। বিভিন্ন লোক বিভিন্ন জিনিস দেখে। বেশির ভাগ বড়রা অন্য বড়দের দেখে। প্যান্ডেলের গায়ে কাচের কাজ থাকলে চট করে নিজেকে দেখে নেয়। বেশিরভাগ ছোটরাই আই লেভেলে ইঁদুর, হাঁস, পেঁচা, সিংহ দেখে। অবশ্য ঢাক না বাজলে তবেই।

বাগপাড়ার পুজোয় একবার সরস্বতীকে মাখন জিনসের প্যান্ট পরানো হয়েছিল, শেয়ালদা স্টেশনের ভিড় হয়েছিল সেই প্যান্ট দেখতে। বাবামায়ের সঙ্গে বাঁশবেড়িয়ার তাঁদের এক সহকর্মীর বাড়িতে গিয়েছিলাম একবার, তাঁদের বাড়ির পুজো দেখতে। আর কে কী দেখছিল জানি না, আমি দেখছিলাম কড়িকাঠের নিচে টানা বারান্দার ওপর ইজিচেয়ারখানা। বাঁশের ঘন কাটাকুটি পিঠ আর বসার জায়গা, চকচকে কালো কাঠের গোলাপফুল খোদাই বর্ডার, হাতলটা কবজির কাছে রীতিমত চওড়া, চায়ের কাপ তো বটেই, মাস মার্কেট পেপারব্যাকও দিব্যি রাখা যাবে। আমাদের বাড়ির ফোল্ডিং কাঠামোর গায়ে ডুরিকাটা শতরঞ্চি পরানো ইজিচেয়ারের তুলনায় সে ইজিচেয়ার যেন রিকশাস্ট্যান্ডের শনিমন্দিরের তুলনায় তাজমহল। 

বম্বেতে লোকে ঠাকুর দেখতে যায়, সে মুখে যাই বলুক না কেন, ফাঁকতালে রাণী মুখার্জিকে দেখতে। অনেকে অভিজিৎ ভট্টাচার্যের পুজোও দেখতে যান, কী দেখতে আমি শিওর নই। আমি এ বছর বম্বেতে ঠাকুর দেখতে গেলে অবশ্য ইরা ছাড়া কাউকে দেখতাম না। এ বছর ইরাও দেখছে পুজো। স্যাডলি, ভুলেও যাচ্ছে। না হলে জিজ্ঞাসা করা যেত, কী দেখল ও জীবনের প্রথম পুজোতে।

অগ্রদূত স্পোর্টিং-এ দুর্গার মুখ এবছর নাকি অবিকল শ্রীদেবী কাটিং বানিয়েছে, বাবামা সপ্তমীতে গিয়েছিলেন নিজের চোখে দেখতে। "সত্যি শ্রীদেবীরে সোনা", উত্তেজিত হয়ে বললেন দুজনেই।  ছবিও তুলেছেন নাকি। পাঠাননি এখনও, না হলে আপনাদের দেখাতাম।

আমরাও বেরিয়েছিলাম সপ্তমীতে, নবপল্লীর প্যান্ডেলে অঞ্জন দত্ত, তস্য সুপুত্র নীল দত্তকে দেখতে। সে অভিজ্ঞতা অবান্তরে আসছে শিগগিরই। এই নবপল্লীতেই আমি ক্যাকটাসকে দেখেছিলাম, জুন মালিয়াকে দেখেছিলাম, সম্ভবত ভূমিকেও। 

আশেপাশে সেলিব্রিটি না থাকলে আমি প্রধানত ঝাড়লণ্ঠন দেখি। আর দেখি পেডেস্ট্যাল ফ্যানটা কোনদিকে। 

আমার ঠাকুমা গত বেশ কিছু বছর ধরে সিলিং ফ্যান ছাড়া আর কিছুই দেখেন না। আমার যে তেজস্বিনী ঠাকুমার গল্প আপনাদের শুনিয়েছি, যিনি ডাকাতদের ভয় পাওয়াতে ফাঁকা ঘরে গামবুট পরে হাঁটতে হাঁটতে জোরে জোরে বলতেন, “হ্যাঁরে তপন, বন্দুকটা হাতের কাছে নামিয়ে রেখেছিস তো?” তিনি আর সেই ঠাকুমা নেই। বা বলা উচিত ঠাকুমার নশ্বর শরীরখানা আমার সত্যিকারের ঠাকুমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। “যথেষ্ট হল, এবার ছাড়ান দাও ভাই” বলে শয্যা নিয়েছে। হাঁটাচলা তো অনেকদিনই চুকেছে, এবার গিয়ে দেখলাম কথাও প্রায় বন্ধ। ঘাড় নেড়ে সারেন। আমরা কিছুক্ষণ ঠাকুমাকে ঘিরে বসে আসর জমালাম, তারপর বাকি সবাই উঠে চলে গেল যে যার কাজে। কাঁহাতক আর মুখ বুজে বসে থাকা যায়, তাই আমি ঠাকুমার বালিশটা একটুখানি টেনে নিয়ে ঠাকুমার পাশে বডি ফেলে দিলাম। শুয়ে শুয়ে মোবাইলে ইন্টারনেট সার্ফ করতে লাগলাম, অবান্তরে পাহারা চালু রাখলাম। ঠাকুমা তাঁর রোগা হাতখানা দিয়ে আমাকে ছুঁয়ে রইলেন। 

আমাদের দুজনের দুজনকে যা বলার বলা হয়ে গেল, যা বোঝার বোঝা হয়ে গেল। 

নরম দেখে, ছাপা পাড়ের একটা নীল পাড় সাদা শাড়ি আমাদের নাম করে কিনে রেখেছিলেন মা, ষষ্ঠীর দিন সকালে ব্যায়াম,  স্নান হয়ে যাওয়ার পর সেটা জড়িয়ে ঠাকুমাকে বসিয়ে দেওয়া হল। ঠাকুমা এমনি বসতে চান না মোটে আজকাল, সেদিন বসে রইলেন। চা বিস্কুট খেলেন। খানিকক্ষণ পর গরম লাগছে কি না, শাড়ি বদলে দেওয়া হবে কি না জিজ্ঞাসা করতে ঘাড় নেড়ে জানালেন, না। একটু পরে বাবা পাশে এসে বসে জিজ্ঞাসা করলেন, "নতুন শাড়ি?" ঠাকুমার ঘাড় ওপর নিচে নড়ল। 

“কে দিয়েছে?” 

উত্তর নেই। বাবা আশাও করেননি। এ সব প্রশ্ন স্রেফ করার জন্য করা। স্বাভাবিক কথোপকথনের ভঙ্গি করার জন্য। ঠাকুমাকে বুঝিয়ে দেওয়া যে তাঁর উত্তর ফুরোলেও, আমাদের অনেক প্রশ্ন বাকি রয়ে গেছে এখনও। 

একটু বাদে ঠাকুমার গলা দিয়ে একটা ঘরঘর শব্দ বেরোলো। বাবা ঠাকুমার দিকে তাকালেন, আর বাবার চোখে চোখ রেখে ঠাকুমা স্পষ্ট গলায় বলে উঠলেন, “সোনা দিসে।”

শুনে থেকে সব ফেলে ঠাকুমাকে দেখতে চলে যেতে ইচ্ছে করছে। 


September 27, 2017

বড়ে গোলাম



     "The old fashioned cook, dressed in a clean white dhoti, brought us four gleaming silver thalis one by one.  Each had seven small silver bowls containing an assortment of dishes, all swimming in thin sauces of different hues - yoghurt white, spinach green, lentil yellow, potato brown, squash beige, beetroot red, and so on. The maestro scowled at the unfamiliar food and lowered the large and rather shapeless thumb of his right hand into each bowl in turn, hoping against hope that it would encounter a piece of meat on a bone. When the thumb met no resistance and sank clean to the bottom of each bowl, right through the thin gravies, the horrible truth dawned on him. He was trapped in a puritanical vegetarian household and there were no prospects of getting meat. That he was an honoured guest here was no consolation. 

     When the cook came in with freshly fried porous, Bade Ghulam Ali Khan could not help saying witheringly in his native Punjabi, ‘So you decided to cook every tree and every bush you could lay your hands on!’ Fortunately, the poor man could not understand a word that was being said to him. I got the general drift and was appalled at the terrible blunder that had resulted in such a glaring mismatch between guest and host. 

     I was the person in charge, so the maestro turned to me, pushing the thali roughly away. ’Such music as mine, and this food?’ he thundered in a shocked tone. ‘The truth is I can’t manage with this at all. I’m going to cook my own dinner. I’ll make a list of what I need. It’s impossible for me to sing without proper nourishment. Even when we sit down to practise at home, a big pot of good food is always at hand, and we dig into it regularly to keep up our strength. Somebody told me that every note I sing has the aroma of kababs. Do you think I can sing the way I do if I have to feed on grasses swimming in fluids of various kinds?’ 

     I was sure my father would think I had made some horrible mistake when we did not arrive even six hours after we were expected. The disciples had set off with a long shopping list that featured six broiler chickens, a kilo of khoya of solidified whole milk, a kilo of almonds, a tin of clarified butter, fifteen different spices, and a stack of tandoori rotis. A charcoal fire was lit and a portable stove set up in the open courtyard because no meat of any kind was allowed in the family kitchen. Full-scale cooking operations started at around nine with great enthusiasm and expertise and a delicious, one-dish meal was triumphantly produced within two hours. The maestro heaped vast quantities on to a china plate since the metal thalis were not available for this kind of depraved eating. Nor was any space inside the house, so the dinner took place outdoors and was all the more enjoyable for that. Three or four hearty belches announced the end of this phase of the proceedings and we finally set off for the site of the concerts." 

                                                                          ---Sheila Dhar, Raga’n Josh


September 25, 2017

জাহানারা রোশেনারা



মহাদ্বিতীয়ার দুপুর থেকে বৃষ্টি নামল। সে রকম বৃষ্টি চট করে দিল্লিতে দেখা যায় না। ঝমঝম দেখা যায়, ঝিরিঝিরি দেখা যায়, কিন্তু ঠায়লয়ে সারাদুপুর, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এইটা বিরল। তাপমাত্রা নামল তিরিশের নিচে, ডেফ কল থেকে মূলচন্দের রাস্তায় হাঁটুজল জমল, বাড়ি ফেরার রাস্তা তিরিশ মিনিট থেকে তিয়াত্তর মিনিট হয়ে গেল। বাড়ির সামনে উবার থেকে নেমেছি, বলা বাহুল্য, তক্ষুনি বৃষ্টিটা জোর হতে হবে, আমি লটবহর সামলে, বাটার জুতো প্যাচপেচিয়ে রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির গেটের দিকে হাঁটছি, ভাবছি অর্চিষ্মানের নিশ্চয় আসতে ন’টা বাজবে, ভেবে ভেবে দুঃখী মুখ তুলেছি, অমনি চশমার কাচ বেয়ে ভরা বাদরের ধারার ফাঁক দিয়ে চেনা মুখ, চেনা গোঁফ। দরজার সামনে অর্চিষ্মান দাঁড়িয়ে হাসছে। 

শুক্রবারের রাতে বাড়িতে ঢুকে দরজার ছিটকিনি তোলা, জামাকাপড় ছাড়া, চা বসানো, এক বগলে বালিশ অন্য বগলে ল্যাপটপ নিয়ে খাটের দিকে হাঁটা, এমনকি আমাদের রোজকার জরাজীর্ণ রসিকতাগুলোর মধ্যেও যে একটা নতুন পালিশ পড়ে, সেটাকে অনেকসময় ভাষায় রূপান্তরিত করার কথা ভেবেছি আমি, এবং হাল ছেড়েছি। সে ক্ষমতা আমার জানা নেই। বা ভাষাই অক্ষম, তাও হতে পারে। আফটার অল, গোলাপের ফুটে থাকাকে শুধু গোলাপের ফুটে থাকার সঙ্গেই তুলনা করা যায়, বুঝেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

জানালা দিয়ে আসা ঊনত্রিশ ডিগ্রির ভেজা হাওয়া আর কংক্রিটের ওপর টুপটাপ জলের আওয়াজ সেই অলরেডি অনির্বচনীয় শুক্রবারের সন্ধ্যেকে অন্য মাত্রা দিল।

*****

শনিবারের সকাল, স্বাভাবিকভাবেই হল দেরিতে। কিন্তু খুব যে দেরি করব তার উপায় নেই। ঘরের জমানো কাজ শেষ করে, খেয়েদেয়ে সোয়া দু’টোর মধ্যে বেরোতে হবে, তিনটে পাঁচে শো ‘ব্যোমকেশ ও অগ্নিবাণ’-এর টিকিট কাটা আছে। পালে পালে বাংলা সিনেমা রিলিজ করেছে দিল্লিতে। ব্যোমকেশ, কাকাবাবু, প্রজাপতি বিস্কুট, ককপিট। বুকমাইশো আমার দুর্বল জায়গা ধরে ফেলেছে, ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা চললেও ক্রমাগত ‘মাছের ঝোল’-এর প্রোমো কোড পাঠাতে থাকে।

দেখতে পারলে আমরা চারটে সিনেমাই দেখতাম, কিন্তু সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অগত্যা র‍্যাংকিং করতে হল। দুজনের র‍্যাংকিং-এরই লাস্টে ছিল ককপিট, ফার্স্টে ব্যোমকেশ।

অগ্নিবাণ এবং উপসংহার, এই দুটো গল্প মিশিয়ে তৈরি হয়েছে 'ব্যোমকেশ ও অগ্নিবাণ'। অগ্নিবাণের গল্প ওই দেশলাইয়ের গল্পটা, আর উপসংহারের গল্প হচ্ছে কোকনদ গুপ্তকে নিয়ে। গল্প নিয়ে বলার কিছু নেই, সিনেমা নিয়েও আমার বলার কিছু থাকা উচিত না। শাশ্বতকে তো ভালোই লাগে, যিশু অভ্যেস হয়ে গেছেন, ঊষসীর উপস্থিতি খুবই কম, তাতে একটা জিনিস ভালো হয়েছে, হিংস্র দাম্পত্য কলহ মাত্রা ছাড়ায়নি। ওপরচালাকিবর্জিত সংলাপ দিয়ে সিনেমা চালানোর সাহস দেখানোর জন্য অঞ্জন দত্তকে আমার বিনম্র ধন্যবাদ। 

তাছাড়া আরও একটা শক্ত কাজ তাঁকে করতে হয়েছে, গল্পের স্ত্রীচরিত্রদের পাল্টানো। ঝগড়ুটে, স্নেহহীন, শুচিবায়ুগ্রস্ত। পরম স্নেহময় স্বামীর স্নেহ যিনি স্রেফ স্বভাবদোষে পেলেন না উল্টে বিষবৎ ঘৃণা জুটল, অফ কোর্স, নিজের স্বভাবদোষেই। “অন্যান্য নারীসুলভ সদগুণের মধ্যে বাচালতাও” যার চরিত্রে ভরপুর। বইয়ের পাতায় এ সব পড়লে যে রকম ওয়ার্ম কোজি ফিলিং হয়, চোখে দেখলে হয়তো নাও হতে পারে। তাই সে সব চরিত্রে নতুন মোচড় আনতে হয়। নতুন মনস্তাত্ত্বিক ঠ্যাকনা। দুঃখের বিষয়, সে সব ঠ্যাকনাই শেষপর্যন্ত 'স্বামী সময় দেন না, তাই স্ত্রী যত গোলমাল বাধান'-তে গিয়ে ঠেকে। এর থেকে প্লেন ঝগড়ুটে নারীসুলভ নারী দেখালেও খুব বেশি অসুবিধে হত বলে মনে হয় না। শরদিন্দুর দূরদৃষ্টির প্রশংসা করতে হয়।

*****

ভাড়াবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘাড় বাড়ালে যে পুজোর প্যান্ডেল দেখা যায়, আমার মা পনেরোশো কিলোমিটার দূর থেকে ফোন করে খবর দিলেন, তারা নাকি নবমী নিশিতে মহানট অসীমকুমারের নির্দেশনায় চাণক্য পালার আয়োজন করেছে। যাত্রা আমি খুব ছোটবেলায় দেখেছি, তখনও রিষড়ার সব কারখানাগুলো ঝপাঝপ বন্ধ হয়ে যায়নি, ধুঁকছিল। আর সে সব কারখানার মাঠে মাঝেমাঝেই যাত্রাপালার আয়োজন হত। আমার বাবা প্রতিটি যাত্রা দেখতে যেতেন। সাইকেলের রডে সাঁটা ছোট্ট সিটে বসে সন্ধ্যের পালাগুলোতে আমিও গেছি মাঝে মাঝে, বাবা আর ঠাকুরদার বাঁকানো হ্যান্ডেল ছাতার সঙ্গে। সে ছাতার হাইট তখন আমার থেকে বেশি। রাত দশটা নাগাদ ঘুমন্ত আমিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বাবা আর দাদুর ছাতা আবার মাঠে ফিরে যেতেন, পালা শেষ করে বাড়ি ফিরতে কখনও মাঝরাত, কখনও শেষরাত।

ওই সময়টা এইসব যাত্রামাত্রা মা কত সুনজরে দেখতেন আমার সন্দেহ আছে, কিন্তু সময় মানুষকে বদলে দেয়, যাত্রাকে বদলে দেয়, যাত্রার প্রতি মানুষের মনকেও। এখন যাত্রা শব্দটা শুনলেই মায়ের মনে পড়ে তাঁর নিজের শৈশবের ঔরংজেব, বাবু হয়ে বসা বয়কাট ছাঁট মা ঊর্ধ্বপানে মঞ্চের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন, ঔরংজেবের অট্টহাস্যে মায়ের ছোট্ট শিরদাঁড়ায় বিদ্যুৎ খেলছে, আর একটা পুরোনো দুঃখ মাথাচাড়া দিচ্ছে আবার। জাহানারা রোশেনারার মতো এমন নাম থাকতে তাঁর কপালে কিনা অর্চনা?


September 23, 2017

কয়েকটা লিংক




শিল্পীঃ নিয়াজউদ্দিন



ধরা যাক মাটি খুঁড়ে একটা কবর বেরোলো। কবরের মধ্যে একটা কঙ্কাল। সঙ্গে তরবারি, কুঠার, বর্শা, বর্মভেদকারী ধারালো তীর, ছুরি ও ঢাল। আবার দু’খানি অশ্ব। হোমরাচোমরা কোনও সমরাধিপতির কঙ্কাল হবে। আরও বেরোলো কঙ্কালের কোলের ওপর রাখা একরকমের দান দেওয়া খেলার বোর্ড, যা দেখে ধরে নেওয়া যায় (এবং হলও) এই বীর যোদ্ধা যুদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতেন। সুইডেনের এমন একটা অংশে কবরটা বেরোলো যেখানে ভাইকিংদের বাড়বাড়ন্ত ছিল, কাজেই ইনি যে ভাইকিং যোদ্ধা ছিলেন সেটা ধরে নিতেও কোনও বাধা নেই। এই শক্তিধর, সম্মাননীয়, উচ্চপদস্থ বীর ভাইকিং যোদ্ধা পুরুষ না নারী? আঠেরোশো আশির দশকের শেষ দিকে আবিষ্কার হওয়ার পর এই প্রশ্নটা ওঠেনি কারণ উত্তরটা সবাই ধরেই নিয়েছিল। দেড়শো বছর পর সেই ধরে নেওয়াটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। 

বাজি থেকে বই। যদিও আর্টিকলটার তথ্যনিষ্ঠতা নিয়ে আমার সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। হেমিংওয়ের বিখ্যাত ‘বেবি শু’ সংক্রান্ত বিখ্যাত পরমাণু-গল্পটি হেমিংওয়ের লেখা কি না সে নিয়ে দ্বন্দ্ব যায়নি।






September 21, 2017

আমি দোষ স্বীকার করছি, ধর্মাবতার



ইউটিউবের অরিজিন্যাল ট্যাগের সঙ্গে আরও কয়েকটা দোষত্রুটি জুড়ে এই রইল আমার বই এবং বইপড়া সংক্রান্ত অপরাধের  ফিরিস্তি। 

যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিব না। 

১। উপহার পাওয়া বই কখনও অন্যকে উপহার দিয়েছেন?
না। যদিও প্রথম প্রশ্নেই কেমন হাই গ্রাউন্ড নেওয়া গেল, তবু এও স্বীকার করে রাখি, আমার কাছে যদি শীর্ষেন্দুর দশটা উপন্যাস দু’কপি উপহার থাকে, তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় একখানা কাউকে উপহার হিসেবে গছাতে পারি। শীর্ষেন্দুর জায়গায় কামু, কাফকা, রোম্যা রোল্যাঁ হলেও পারি। না পারার কোনও কারণই খুঁজে পাচ্ছি না। 

২। কোনও বই না পড়েই পড়েছি বলেছেন?
এইটা এক কথায় বলতে যাওয়া মুশকিল। আমার বিশ্বাস প্রশ্নকর্তা আসলে জানতে চেয়েছেন স্রেফ জাতে ওঠার জন্য, “হ্যাঁ হ্যাঁ আমার তো দস্তয়েভস্কি মুখস্থ” বলেছি কি না। যতদূর মনে পড়ছে, বলিনি। তবে অনেক সময় এমন হয়েছে ধরুন কেউ, গজেন্দ্রকুমার মিত্র-র ওই গল্পটা পড়েছিস? বলে একটা গল্পের নাম বলল। নামটা আমি চিনতে পারলাম না। কিন্তু গজেন্দ্রকুমার মিত্র-র ছাপা হওয়া সব গল্পই যেহেতু আমি পড়েছি, তাই আমি সাদা মনে ঘাড় নেড়ে বলে দিলাম, “হ্যাঁ, পড়েছি।” আরও একটা বেটার রেসপন্স হতে পারত, “কোন গল্পটা বল তো?… ও আচ্ছা, আচ্ছা, হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, পড়েছি…” বলা, কিন্তু ঠিক সময়ে ঠিক প্রতিক্রিয়া মনে পড়লে আজ আমি যেখানে আছি সেখানে থাকতাম না, যা করছি তা করে দিনগত পাপক্ষয় করতাম না। 

৩। চ্যাপ্টার বাদ দিয়ে দিয়ে পড়েই পড়েছি বলেছেন? 
চ্যাপ্টার হয়তো নয়, তবে প্যারাগ্রাফ তো নিশ্চয় বাদ দিয়েছি, হরদম দিই। এবং তাতে মোটেই লজ্জা পাই না। শক্ত বইয়ের প্যারা বাদ দেওয়ার কথা বলছি না, শক্ত বই পড়ার বয়স আমার চলে গেছে। এখন যা সহজে মাথায় ঢোকে শুধু তাই পড়ি। সে সব সহজ বইয়ের অংশও হরদম বাদ দিই। এবং মনে করি, ওই অংশগুলো লেখকের, বা লেখক না হলেও এডিটরের আগেই বাদ দেওয়া উচিত ছিল।

My most important piece of advice to all you would-be writers: When you write, try to leave out all the parts readers skip. 
                                                                                                         - Elmore Leonard

এই রকম প্যারা লাফিয়ে, পাতা ঝাঁপিয়ে বইকে ‘পড়া বই’এর মধ্যে গুনি কি না? কী সাংঘাতিক, গুনব না কেন? তা হলে তো 'লর্ড অফ দ্য রিংস'-কেও না পড়া বইয়ের মধ্যে গুনতে হয়। কিংবা The Truth About the Harry Quebert Affair'- কেও। আমি এগুলোকে ‘পড়া’ বইয়ের মধ্যেই গুনি, এবং ‘পয়সা দিলেও আরেকবার পড়ব না’র মধ্যেও। 

৩। ধার নিয়ে কোনও বই ফেরত না দিয়েছেন?
না। অন প্রিন্সিপল, বই ধার নিই না। 

৪। কাউকে বই ধার দিতে অস্বীকার করেছেন? মুখের ওপর? আপনি কি মানুষ না পাষণ্ড? পারলেন কী করে?
প্রথমে মুখে বলতে চাইনি, হিন্ট দিয়েছি। কিন্তু একটা জিনিস আমি এই সাঁইত্রিশ বছরে বুঝেছি, লোকে কোয়ান্টাম মেকানিকস বুঝে ফেলে, হিন্ট বোঝে না। কাজেই বলতে হয়েছে। কারণ বই ধার দিয়ে ফেরত না পেলে তাকে মুখে বলে, ফোন করে, ইমেল করে, হোয়াটসঅ্যাপ ডাউনলোড করে দিবারাত্র পিং করে, তার বাড়িতে গিয়ে তার বুককেস হাঁটকে বই উদ্ধার করে নিয়ে আসতে হত, তারপর সম্পর্ক ছেদ করতে হত। সেটা আরও বেশি অভদ্রতা হত না?

৫। সিরিজ এলোমেলো করে পড়েছেন?
আমি যে রকম সিরিজ বেশি পড়েছি, ফেলুদা, ব্যোমকেশ, মিস মার্পল, পোয়্যারো, সেগুলো এলোমেলো করে পড়লে কিছু যায় আসে না। যেসব সিরিজে পারম্পর্য ম্যাটার করে, যেমন হ্যারি পটার, সেগুলো সিরিজ ধরেই পড়েছি। 

৬। কাউকে কোনও বইয়ের স্পয়লার দিয়ে দিয়েছেন?
মনে তো পড়ছে না, তবে একেবারে যে দিইনি, এ কথা তামাতুলসী ছুঁয়ে বলতে পারব না। কারণ আমি স্পয়লারের মর্ম বুঝি না। একটা এক লাইনের/ এক পাতা/দশ পাতার তথ্য বলে দেওয়ার জন্য বাকি গোটা পাঁচশো পাতার বই পড়া যে কারও মাটি হবে এটা বিশ্বাস করতে আমার অসুবিধে হয়। তবে আপনার যদি স্পয়লারে আপত্তি থাকে তাহলে ইচ্ছে করে সেটা মাটি করব না, নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি খারাপ, অতটাও খারাপ নই। 

৭। বইয়ের পাতা মুড়েছেন?
এরা আমাকে কী মনে করেছে, কালাপাহাড়?

৮। কোনও বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বীকার করতে অস্বীকার করেছেন? ইমেজ রক্ষার্থে?
এটা ডেফিনিটলি করিনি। এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারলাম, কারণ আমি বাজে বই পড়তে দারুণ ভালোবাসি। মনে করি সবার নিয়ম করে তিনটে ভালো বই পড়ার পর একটা করে বাজে বই পড়া দরকার।

১০। লেখক দিয়ে বইয়ের বিচার করেছেন?
এই রে, এইবার এরা আমার দুর্বল জায়গায় টর্চ ফেলেছে। আমি সত্যি সত্যিই লেখক দিয়ে বইয়ের বিচার করতে চাই না, শিল্প আর শিল্পী যে আলাদা এইসব তত্ত্ব আমি জানি এবং মনেপ্রাণে মানিও, কিন্তু মানা আর হাতে কলমে প্র্যাকটিস করার মধ্যে যে সাঁকো, সেটা এখনও পেরোতে পারিনি। ধরুন একজন লেখকের একটা উপন্যাস পড়ে দারুণ লাগল, সবাইকে বললাম পড়ুন পড়ুন/ পড়/ পড়িস। তারপর একজায়গায় সেই লেখক মহাশয়ের প্রায় দু’হাজার শব্দের আর একটা লেখা পড়লাম, প্রথম লেখাটা নিয়ে। দ্বিতীয় লেখাটার প্রথমার্ধে উক্ত লেখাটি কী ভাবে লেখক হিসেবে তাঁকে অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছে তাঁর বিবরণ, দ্বিতীয়ার্ধ রণহুংকার। উপন্যাসটি লিখে কেমন তিনি তাঁর শত্রুদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন, যে সব শালার তাঁর খ্যাতি দেখে চোখ টাটাচ্ছিল, তাঁর লেখা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যাঁরা চাদর মুড়ি দিয়ে এসে ইলেকট্রিকের লাইন কেটে দিয়ে যাচ্ছিল, তাঁদের থোঁতা মুখ কেমন ভোঁতা করে দিয়েছেন তার আখ্যান।

এই দ্বিতীয় লেখাটা পড়ার পর থেকে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, লেখকের প্রথম লেখাটা আমি আর কাউকে রেকমেন্ড করতে পারছি না। করতে গেলেই অদৃশ্য দুটো হাত গলা টিপে ধরছে, জিভ অসাড়, স্মৃতি ঝাপসা। 

এর সমাধান একটাই, লেখকের ব্যক্তিগত জীবন বা মতামত থেকে শতহস্ত দূরে থাকা। এই হাটে হাঁড়ি মিডিয়ার জগতে যা ভয়ানক শক্ত। চোখ বন্ধ করে থাকতে চাইলেও উপায় নেই। এই কালকেই রোয়াল্ড ডাল সম্পর্কে কী সব জেনে ফেললাম। তবু চোখ বন্ধ করে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। 

১১।  বই দিয়ে পাঠক বিচার করেছেন? 

এই বিচারটা ওপরেরটা থেকেও বেশি অন্যায়, এবং সত্যি সত্যি দুঃখ এবং লজ্জার সঙ্গে স্বীকার করছি, এটাও আমি করি। আত্মপক্ষ সমর্থনে একটাই কথা বলতে পারি এইসব ছুঁৎমার্গ আচারবিচার নিজের মনেই (আর অর্চিষ্মানের কানে) রাখি, ফ্রিডম অফ স্পিচ ফলিয়ে, “এরা কারা, বস?” চেঁচিয়ে আত্মগর্ব অনুভব করি না। কারণ আমি জানি এটা অন্যায় আর এইসব বিচারে আমিও কোথাও দাঁড়াব না, ফুৎকারে উড়ে যাব। কাজেই এই অন্যায়টা আমি অজ্ঞাতে নয়, জ্ঞাতসারেই করি, এবং সর্বদা চেষ্টায় থাকি না করার।

এতে কি দোষ খানিকটা স্খালন হয়, নাকি আমি সত্যি সত্যিই কালাপাহাড়?

September 20, 2017

নিল গেমন'স ফার্স্ট ল + টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২৪




“Picking up your first copy of a book you wrote, if there’s one typo, it will be on the page that your new book falls open to the first time you pick it up.” 
                                                                                   – Neil Gaiman’s First Law


আমার মতে বড় কথা টাইপোর চোখে পড়া নয়। টাইপোর থেকে যাওয়াটা। শুধু টাইপো হলে তবু একরকম। আরও কত কিছু যে থেকে যায়, চোখে পড়ে। কত ত্রুটি, কত গোঁজামিল। অনেককে বলতে শুনেছি নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখা নাকি নিজের সন্তানকে প্রথমবার দেখার মতো। সন্তানকে দেখে যদি কারও প্রথমেই, ‘ইস নাকটা কী বোঁচা’, ‘মাগো মাথায় কেন টাক’ ইত্যাদি মনে না হয় তাহলে তাঁর সঙ্গে আমার বিশেষ মিল নেই। 

আমাদের বঙ্কিমও বলেছিলেন, তিন মাস পরে নিজের লেখা পড়লে নাকি তাঁর ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। ধরে নিচ্ছি, সে যুগেও টেবিল ছেড়ে প্রকাশকের টেবিল ঘুরে বই হয়ে আসতে একটা লেখার তিন মাস বা তার বেশিই লেগে যেত, কাজেই বঙ্কিমের উক্তিটাকে নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখার প্রতিক্রিয়া হিসেবেও ধরে নেওয়া যেতে পারে।

বঙ্কিম, গেমন-এরই এই, তাহলে তিনমাস পর আমার লেখার অবস্থা কী হয় ভাবুন।

নড়বড়ে গাঁথুনি, নিড়বিড়ে ভাষা, পর পর দুটো সেন্টেন্সে একই শব্দ ব্যবহার, সব বইয়ের পাতা থেকে গুলতির মতো ছিটকে ছিটকে চোখে বেঁধে। অথচ গল্পটা পাঠানোর আগে দুশোতমবার যখন চোখ বোলাচ্ছিলাম (আর একটিবারও বোলালে বমি করে ফেলতাম নিশ্চিত), এগুলো চোখে পড়েনি।

নিল গেমন আরও একটা কথা বলেছিলেন, দশ মিনিট গুগল সার্চ করে পেলাম না, প্যারাফ্রেজ করে বলছি। বলেছিলেন, তাঁর লেখক জীবনের সারাৎসার হচ্ছে  - লেখা, ছাপতে দেওয়া, ছাপা হওয়ার পর পড়ে শিউরে ওঠা এবং পত্রপাঠ পরের লেখাটা লিখতে বসা। আবার ছাপা, আবার শিহরণ, আবার লেখা, আবার ছাপা, আবার শিহরণ…

কিশোর সাহিত্য পত্রিকা টগবগ-এর উৎসব সংখ্যা ১৪২৪-এর একটা ভালো উদ্যোগ ছিল, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের গল্পের অনুবাদ প্রকাশ। আমার দায়িত্ব ছিল কাশ্মীরী গল্প অনুবাদ করার। গল্পের লেখক এম কে রায়না ভারি ভদ্রলোক, ওঁর একটা গল্প ইংরিজি করাই ছিল, নিজেই করে রেখেছিলেন, আমি সেটা ইংরিজি থেকে বাংলা করলাম। বলাই বাহুল্য, নিজের সামান্য ফোড়ন দিতেও ছাড়লাম না। সেই গল্পটার খানিকটা তুলে দিয়েছে দেখলাম রোহণ বিজ্ঞাপন হিসেবে। পড়ে আমার শিহরণ হল। তা সত্ত্বেও, সেটাই নিচে দিচ্ছি।

টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২৪ কাগজের কিনতে হলে চলে যান এইখানে

ই-বুক কিনতে হলে এইখানে 

কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চাখতে হলে, এইখানে


*****

এম কে রায়না-র ‘দ্য লাস্ট গেম’ ছোট গল্প অবলম্বনে আমার অনুবাদ ‘শেষ খেলা’র উদ্ধৃতাংশ


আবার কাজে নামল লালজী। মায়ের চোখ বাঁচিয়ে রান্নাঘরের জ্বালানি কাঠকুটো হাঁটকে একটা বেশ চওড়া চ্যালা কাঠের তক্তা জোগাড় করে নিয়ে গেল রাজুভাইয়ার কাছে। নিজের গুমটির ভেতর, কানে পেনসিল গুঁজে তখন রাজুভাইয়া খুব মন দিয়ে শিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষে ঘষে একটা কাঠের লম্বা পাটাতনকে মসৃণ করছিল। হাতের কাঠটা দিয়ে লালজী সব বুঝিয়ে দিল রাজুভাইয়াকে। পরদিন স্কুলের পরে সবাই মিলে গিয়ে দেখল রাজুভাইয়া সেই চ্যালাকাঠটাকে কেটে ছেঁটে, হাতলটাতল বসিয়ে, পালিশ-টালিশ করে দিব্যি একটা ব্যাট বানিয়ে রেখেছে। সবাই খুব খুশি হল ব্যাট দেখে, কিন্তু আসল ভয়ের কাজটাই এখনও বাকি। খুচরো পয়সাগুলো হাতে মুঠো করে লালজী জিজ্ঞাসা করল, “কত দাম ব্যাটের?” রাজুভাইয়া একবার ওদের মুখের দিকে, একবার লালজীর মুঠোর দিকে তাকাল।

“কত এনেছ?”

“চার টাকা।” মুঠো খুলে খুচরোগুলো দেখাল লালজী। রাজুভাইয়া আশ্চর্য হয়ে গেল। ব্যাটের মজুরিও তো চার টাকাই! ভীষণ খুশি হয়ে ব্যাট নিয়ে ফিরতে যাবে এমন সময় পিছু ডাকলেন রাজুভাইয়া। “ব্যাট লাগবে, বল লাগবে না?” নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করল ওরা। কাগজ গোল্লা পাকিয়ে গার্ডার পেঁচিয়ে রেডি করা আছে। রাজুভাইয়া উঠে গিয়ে দোকানের ভেতর থেকে একটা কাঠের বল বার করে দিল ওদের হাতে। বলল, “নতুন পলিসি চালু হয়েছে দোকানে, ব্যাট কিনলে বল ফ্রি।”

বসন্ত ততদিনে পুরোদস্তুর জেঁকে বসেছে মনিয়ারে। তুঁতগাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে মুকুলের আভাস। হাওয়ায় কামড় উধাও। সবাই বলল, “শুভকাজে আর দেরি কেন, ম্যাচের দিন স্থির করে শত্রুপক্ষকে নেমন্তন্ন করা হোক, পিচের ধুলোয় ব্যাটাদের নাকগুলো ঘষে দেওয়া যাক।” এই ব্যবস্থায় সবথেকে বেশি যার উৎসাহ থাকবে ভেবেছিল সবাই, সেই লালজীই তেমন গা করল না। বলল, “ম্যাচ পরে হবে, তার আগে আমাদের খানিকটা প্র্যাকটিস করা দরকার।”

পরের রবিবার ভালো করে জলখাবার খেয়ে লালজী, রফিক, কুন্দন, রঘু, কবীর আর রামজী ব্যাট, বল আর তুঁতগাছের চারটে ডাল নিয়ে চলল পাড়ার বাইরের সেই কাঁটাতার ঘেরা মাঠের দিকে। ওদের সুপার সিক্স টিমের খবর এর মধ্যে চাউর হয়েছে, ওদের স্কুলেরই ছোট ক্লাসে পড়া ডজনখানেক উৎসাহী দর্শকও জুটল। মাঠের ধারে লাইন দিয়ে বসল তারা। ব্যাটিং অর্ডার স্থির করার রাস্তা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। চিরকুটে এক, দুই নম্বর লিখে ভাঁজ করে দুই হাতের আঁজলায় নিয়ে দাঁড়াল রামজী। চিরকুট তুলে নিল বাকি পাঁচজন। দেখা গেল লালজীর চিরকুটে বড় বড় করে লেখা আছে ‘এক’।

প্রথম বল করবে কুন্দন। নতুন বল নিয়ে কুন্দন হেঁটে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল উলটোদিকে। নতুন ব্যাট নিয়ে লালজী গিয়ে দাঁড়াল তিনটে তুঁতডালের সামনে। শেষবারের মতো ব্যাট ঠুকে পিচের গতিপ্রকৃতি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল লালজী। চোখ চালিয়ে দেখে নিল বিরোধীপক্ষের ফিল্ডারদের অবস্থান। দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে অল্প ঝুঁকে খুনে দৃষ্টি নিয়ে লালজীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে রঘু, রফিক, কবীর, রামজী। কে বলবে এতদিনের বন্ধু? চোখে খুনে দৃষ্টি, এক চুল ভুল করলে ‘আউট’ বলে চেঁচিয়ে উঠবে সবাই।

বুকের মধ্যে অল্প একটু কাঁপন ধরল কি লালজীর? কুন্দনকে চেঁচিয়ে বলল ও, প্রথম বলটা নেট প্র্যাকটিসের জন্য, ফলাফল যাই হোক না কেন হিসেবে ধরা হবে না। ক্যাপ্টেনের কথা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কারোর নেই। কুন্দন মনে মনে সবুজ খাতার পড়া ঝালিয়ে নিল। স্পিন না পেস না গুগলি? অনেক ভেবে-টেবে অল্প ছুটে এসে একটা স্পিন বল দিল কুন্দন। লালজী ডিফেন্সের ভঙ্গিতে ব্যাট তুলল, চ্যালাকাঠের ব্যাটে ঠকাস করে ঠোকা খেয়ে বল চলে গেল কুন্দনের দিকে। চটাপট হাততালি দিয়ে উঠল মাঠের চারপাশের দর্শকরা। রান হল না কোনও।

দ্বিতীয় বল। কুন্দন এবার দৌড় শুরু করেছে খানিকটা দূর থেকে। প্র্যাকটিস বল সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে ব্যাটসম্যানের আত্মবিশ্বাসও তুঙ্গে, বল কাছে আসার তর সইল না, এগিয়ে গিয়ে ব্যাট চালাল লালজী।

আবার ‘ঠকাস’ করে শব্দ। কিন্তু ব্যাটে তো বল লাগেনি! অথচ একটা চিৎকার উঠেছে চারদিকে, কান ফাটানো হাততালি, নিজের নিজের জায়গা ছেড়ে ফিল্ডাররা ছুটেছে কুন্দনের দিকে, সবাই মিলে জড়াজড়ি করে এখন একটাই পিণ্ড হয়ে গেছে। সবাই একদিকে, লালজী একদিকে। পেছনে ফিরে তাকাল লালজী। যা দেখল বিশ্বাস হল না তার। তিনটে ডালের মাঝেরটা মাটি থেকে উপড়ে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে, তখনও অল্প অল্প গড়াচ্ছে বিশ্বাসঘাতক বলখানা।



*****

গল্পের সঙ্গতে চমৎকার ছবিটি এঁকেছেন অরিজিৎ ঘোষ। 



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.