June 20, 2017

মঙ্গলবার পর্যন্ত



উৎস গুগল ইমেজেস

কখনও কখনও পরিস্থিতি এমন হয় যে সব কিছুর মধ্যেও সময় বার করে নেওয়ার আশা থাকে। আজ হল না, কাল হবে, কাল না হলে পরশু তো হবেই। আবার কখনও কখনও অতি বড় চাষার পক্ষেও আশাবাদী হওয়া পোষায় না।  যেমন এখন। চারদিকে যা চলছে, যা চলবে আগামী সাত দিন, (লিখতে গিয়ে হাত কাঁপল, কারণ সত্যিটা হচ্ছে গোটা বছরটাই) তার মধ্যে যদি নিজের সঙ্গে আর কাউকে বলি দেওয়া যায়, সে অবান্তর।

বলি দেওয়াটা কখনও কখনও জিইয়ে রাখার থেকে কম বেদনার। আজও হল না, কালও হল না-র মধ্যে একটা অসহায়তা থাকে। সারাদিনের একমাত্র ভালোলাগার কাজ না করতে পারার কষ্ট থাকে। আর আমার মতো জন্মহিংসুটেদের ক্ষেত্রে, কই-আর-সবাই-তো-সবকিছু-পেরে-যাচ্ছে-তুড়ি-বাজিয়ে-আমি-একটা-ব্লগ-পর্যন্ত-চালাতে-পারছি-না জ্বলুনি ফাউ।

তখন 'পারলাম না'-র গ্লানিটাকে 'পারতাম কিন্তু করলাম না'-র নির্মোহ উচ্চারণে পরিণত করা ছাড়া গতি থাকে না। 'প্রাইজ কেন পেলাম না'-র কাঁদুনির থেকে যেমন 'লাথি মারি তোর প্রাইজে' বলাটা বুদ্ধিমানের। 'সামনের সাত দিন আমি লিখতে চেয়েও পারব না'-র থেকে 'আগামী সাতদিন আমার ছুটি কাজেই পায়ে ধরে সাধলেও লিখব না', ভেবে নেওয়া সোজা।

আমিও তাই ভেবে নিচ্ছি।

সামনের মঙ্গলবার পর্যন্ত অবান্তরের ছুটি। আমারও ছুটি। (শুধু অবান্তরের কাছ থেকেই, বাকি ঘানি যেমন পেষার পিষবে।) তবে পুরোটাই কালো নয়, একটা ভালোও আছে। তার প্রস্তুতির জন্যও খানিকটা সময় দরকার। ব্যাগট্যাগ গোছাতে হবে, টিকিটমিকিটের প্রিন্ট আউট নিতে হবে, ড্রাইভারজিকে ফোন করে মনে করাতে হবে, "সিমলায় আমাদের পিক আপ করতে আসবেন কিন্তু সময়মতো, ডোবাবেন না দয়া করে।"

সোজাসাপটা ছুটি নেওয়ার সিদ্ধান্তটা যে ভালো হয়েছে অলরেডি টের পাচ্ছি। অলরেডি মগজ লাফাচ্ছে ছুটির পর ফিরে আপনাদের গল্প শোনানোর আশায়। আপনারা সবাই খুব ভালো থাকবেন, যাঁদের যাঁদের জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে বৃষ্টি দেখবেন, বাকিরা তাঁদের বৃষ্টিতে লোভ দেবেন। যাঁরা যাঁরা আম খেতে পাচ্ছেন আম খাবেন, যাঁদের আম খেলেই ফোঁড়া বেরোয় তারা রিস্ক না নিয়ে লিচু খাবেন। মোট কথা, ফুর্তিতে থাকবেন, এই আমার আন্তরিক কামনা। 

আর সে ফুর্তির মাঝে কখনওসখনও যদি অবান্তরের কথা মনে পড়ে, তবে দু-ফোঁটা চোখের জলের দরকার নেই, মুহূর্তের জন্য আনমনা হলেই আমার জন্ম সার্থক।

টা টা বাই বাই, আবার যেন দেখা পাই।


June 18, 2017

22 Never Asked Questions




কাল রাত বারোটার সময় কী করছিলেন? ঘুমোচ্ছিলাম

আপনি যদি অন্য কেউ হতেন, এখন আপনি যিনি, তাঁর বন্ধু হতেন? পাগল?

বক্রোক্তি ব্যবহার করেন? মনে মনে সর্বক্ষণ, মুখে যথাসম্ভব কম।

কত বছর বয়সে সাইকেল চালাতে শিখেছিলেন? চার কিংবা পাঁচ। 

ক্যারাটে জানেন? না। 

শিস দিতে পারেন? না। তবে ক্যারাটে যেমন শিখতে চাই না, শিস দেওয়াটা শিখতে চাই। 

নিজের ভাষা ছাড়া আর কোন ভাষায় অনর্গল হতে চান? বাঙাল ভাষায়

কখনও ইন্ডিয়ান ফুড চেখে দেখেছেন? ইন্টারনেট থেকে প্রশ্ন টুকলে কী পরিণতি হয় সেটা দেখানোর জন্য এই প্রশ্নটা রাখলাম।

একদিনের জন্য সবার সময় থেমে গেল, খালি আপনার ছাড়া। কী করবেন? ঘুমোব।

আপনার জীবনের একটাই দিন বার বার পুনরাবৃত্তি হতে লাগল। কোন দিনটা হলে ভালো হয়? আজকের দিনটা। কারণ আজ রোববার। বৃষ্টি হওয়ার পর টেম্পারেচারও কম।

আপনার ব্যক্তিগত নরক? যেখানে আমি একলা। 

ব্যক্তিগত স্বর্গ? যেখানে আমি একলা। 

আপনার সামনে এক নতুন জগতের প্রবেশপথ খুলে গেল। সে জগৎ সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন না, গেলে ফিরতে পারবেন কি না জানেন না, দরজা কতক্ষণ খোলা থাকবে জানেন না। কী করবেন? যেখানে আছি সেখানে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকব। 

আপনার জীবনের সেরা আবিষ্কার? (ইংরিজিতে লিখেছিল ‘বেস্ট ফাইন্ড’) অর্চিষ্মান

মুদির দোকানে গেলে সর্বদা কী কেনেন? রোজ কিনি না, তবে সবথেকে ঘন ঘন কিনি ম্যাগি আর মাইক্রোওয়েভ পপকর্ন। 

কোনও কাজের মোটিভেশন বজায় রাখতে গেলে কী করা উচিত বলে মনে করেন? সে কাজটা রোজ করা। 

কোন খেলা দেখতে পছন্দ করেন? কোনও খেলাই না। যেগুলো পছন্দ করি না সেগুলো তো হয়েই গেল, যেগুলো করি সেগুলো দেখতে বসলে হারজিত নিয়ে এমন বুক ধড়ফড়ানি হয় যে তার থেকে না দেখা ভালো। 

বাড়িতে ফোন ফেলে রেখে বেরিয়ে গেলে কী ফিলিং হয়? প্রথমে প্যানিক, তারপর শান্তি। 

সবথেকে রিল্যাক্সিং কোথায় বেড়াতে গেছেন? ল্যান্ডোরের স্মৃতি টাটকা, রিল্যাক্সেশনও চরম হয়েছিল, তাই ল্যান্ডোর। 

আপনার ফোনের সবথেকে উপযোগী তিনটি অ্যাপ? ওলা, উবার, জোম্যাটো। 

লোকে সাধারণত আপনার থেকে কী সাহায্য চাইতে আসে? পথনির্দেশ।

টিভিতে কোন ধরণের অনুষ্ঠান দেখা পরিহার করেন? রিয়ালিটি শো আর সিরিয়াল। কারণ একবার দেখতে শুরু করলে আর থামতে পারব না। 


June 16, 2017

Whether a little less might not have been better



কালকের পোস্টে প্রতিভাট্রতিভা নিয়ে আলোচনা করার পর আজই ব্রেইন পিকিংস -এ এই পোস্টটা পড়লাম। ওঁদের সাইট থেকে, আর ইন্টারনেটের খাঁজখোঁজ থেকে কুড়োনোবাড়ানো ট্যালেন্ট বনাম জিনিয়াস সংক্রান্ত কয়েকটা কোটেশন এই রইল।

Talent is insignificant. I know a lot of talented ruins. Beyond talent lie all the usual words: discipline, love, luck, but most of all, endurance. —James Baldwin

Genius gives birth, talent delivers. —Jack Kerouac

The Man of Genius may at the same time be, indeed is commonly, an Artist, but the two are not to be confounded. The Man of Genius, referred to mankind, is an originator, an inspired or demonic man, who produces a perfect work in obedience to laws yet unexplored. The Artist is he who detects and applies the law from observation of the works of Genius, whether of man or nature. The Artisan is he who merely applies the rules which others have detected. There has been no man of pure Genius; as there has been none wholly destitute of Genius. —Henry David Thoreau

Talent is like the marksman who hits a target which others cannot reach; genius is like the marksman who hits a target … which others cannot even see. —Arthur Schopenhauer

The difference between talent and genius is in the direction of the current: in genius, it is from within outward; in talent from without inward. —Ralph Waldo Emerson

Genius is seldom recognized for what it is: a great capacity for hard work. --Henry Ford

(নিচের উদ্ধৃতিদুটো যদিও ট্যালেন্ট বনাম জিনিয়াস সংক্রান্ত নয়, তবু এখানে জুড়ে দিলাম। প্রথমটা, গোয়েন্দাগল্প লেখকরা যে কত বুদ্ধিমান হন তার প্রমাণ হিসেবে। দ্বিতীয়টা, মনের কথা হিসেবে।)

Mediocrity knows nothing higher than itself, but talent instantly recognizes genius.’ —Arthur Conan Doyle

Sometimes, indeed, there is such a discrepancy between the genius and his human qualities that one has to ask oneself whether a little less talent might not have been better.’ —Carl Gustav Jung


June 15, 2017

উপস্থিত



গত ক’দিনে আমার গুগল সার্চ হিস্ট্রির কয়েকটা নমুনা হল এই

Bailey’s 2017
Delhi temperature
Utpalendu Satarupa
Ministry of Petroleum and Natural Gas
Shakira bellydancing
Bijoli grill bangabhaban
Ready to use plant soil buy online india
How to find the energy to write after a work day

কেউ বলেছেন চট করে ন্যাপ নিয়ে উঠে লিখুন, কেউ বলেছেন বাড়ি ফিরে জুতো খুলতে পারেন, মোজা খুলবেন না। মোজাতেই সব মোটিভেশন। কেউ বলেছেন বাড়ি যাওয়ার পথে মাঝপথে কফি শপে থেমে লিখুন। কিন্তু লিখুন, দোহাই আপনার। আমি সেই সব পড়েটড়ে লিখতে বসেছি। জানি না, কতখানি হবে, কারণ চোখ টানছে, খাট ডাকছে, আঙুল মাঝে মাঝেই উঠে নতুন ট্যাব খুলে সার্চ করছে। হাউ টু রাইট আফটার অ্যান এইট আওয়ার ওয়ার্ক ডে? হাউ মেনি ওয়ার্ডস টু রাইট?

লোকে বলে লেখা যত ইন্টারেস্টিং, লেখার কথা তত ইন্টারেস্টিং নয়। আমি নিজে লেখার কথা পড়তে ভীষণ ভালোবাসি, কে কতক্ষণ লেখে, কখন লেখে, ঘণ্টা মেপে লেখে না শব্দ মেপে, নাকি মাপামাপি চুলোয় দিয়ে, এ সব জানতে আমার দারুণ কৌতূহল। মাইকেল ক্রিকটন নাকি সারাদিনে দশ হাজার শব্দ লিখতেন, স্টিফেন কিং দু’হাজার, আর্থার কোনান ডয়েল তিন হাজার, হেমিংওয়ে মোটে পাঁচশো শব্দ লিখতেন আর অস্কার ওয়াইল্ড নাকি সকালবেলা একটিমাত্র নিখুঁত শব্দ লিখে বিকেলবেলা সেটি কেটে দিতেন। 

বিখ্যাত লেখকদের লেখার রুটিন পড়লে একই সঙ্গে উদ্দীপনা, বিস্ময়, নিজের প্রতি ধিক্কার, এই সব নানারকম অনুভূতি হয়। গুস্তাভ ফ্লোবে-র লেখার, বা সারাদিনের, রুটিন পড়ে যেমন হিংসে হল। সকাল দশটার সময় ঘুম থেকে উঠতেন গুস্তাভ। উঠেই একটা ঘণ্টা বাজাতেন। সেই ঘণ্টা বাজলে তবে সারা বাড়ির লোক স্বাভাবিক গলায় কথা বলার সাহস পেত, তার আগে শুধু ফিসফিস। ঘণ্টা শুনে ব্যক্তিগত ভৃত্য জল নিয়ে আসত, পাইপে তামাক গুঁজে দিত, ফসফস করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গুস্তাভ খবরের কাগজ পড়তেন, চিঠির উত্তর দিতেন, মায়ের সঙ্গে গল্প করতেন। তারপর স্নান সেরে, মাথায় যত্ন করে চুল পড়া কমানোর ওষুধ লাগিয়ে ডাইনিং রুম। সেখানে খেতে খেতে আর গল্প, খাওয়া শেষে বাড়ির বাগানে, নদীর ধারে দল বেঁধে ঘোরাঘুরি। তারপর দুটো নাগাদ ফিরে এসে লিখতে বসা। এই যে সারাটা দিন নিজের হাতে, আমি আমার সময়মতো লেখার টাইম বার করে নেব, এইটা একটা মারাত্মক বিলাসিতা।

সবার অবশ্য এই বিলাসিতা লাগে না। অ্যান্থনি ট্রলপের যেমন লাগেনি। ডাকবিভাগে ডাকসাইটে চাকরি করতেন ভদ্রলোক, আর সাতষট্টি বছর বয়সে মরে যাওয়ার আগে সাতচল্লিশটা উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, চিঠিচাপাটি, সবাই যা যা লেখে, সে সবও লিখেছিলেন। অ্যান্থনি ট্রলপ অনুপ্রেরণাট্রেরণায় বিশ্বাস করতেন না। উনি বিশ্বাস করতেন লিখতে বসলে লেখা আসবে। ঠিক করে নিতেন আগামী এত দিনে আমি এতটা লিখব, তারপর সেই টার্গেটকে মাস, সপ্তাহ, দিনে ভাঙা হত। লেখার পাশাপাশি একটা ডায়রিও চলত, সেখানে টার্গেট আর ডেডলাইন দাগানো থাকত। লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না ফাঁকি পড়ছে সে সব চোখের সামনে জ্বলজ্বল করত। দিনে তিনহাজার শব্দ লিখতেন ট্রলপ। চাকরিতেও মগ্নপ্রাণ ছিলেন কাজেই অফিসে বসে চুরিচামারি করে লেখার জন্য ছোঁকছোঁক করতেন না। তিন হাজারের গোটাটাই লেখা হত অফিস যাওয়ার আগে, ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে। অর্থাৎ ঘণ্টাপ্রতি হাজার শব্দ। কিন্তু এখানে থেমে গেলে আর পাঁচজনের সঙ্গে ট্রলপের তফাৎ থাকে না। ঘড়ি সামনে রেখে পনেরো মিনিটে আড়াইশো শব্দ লিখতেন ট্রলপ। তিন ঘণ্টায় তিন হাজার শব্দ নেমে যেত, ট্রলপ উঠে পড়ে অফিস চলে যেতেন। সারাদিন চুটিয়ে কাজ করে সন্ধ্যেবেলা চুটিয়ে আড্ডা দিতেন, আর সপ্তাহে অন্তত দু’বার বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে শেয়াল শিকারে বেরোতেন। 

আমি চেষ্টা করেছিলাম, এই গত পরশুই, সময় মেপে শব্দ লেখার। ট্রলপের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার আমার সাহস হয়নি, আমি ভেবেছিলাম আমার পক্ষে আধঘণ্টায় আড়াইশোই যথেষ্ট হবে। ওই আধঘণ্টাতেই এফ এম এ এমন ভালো ভালো গান বাজালো যে আমাকে টাইপ করা থামিয়ে সে গান শুনতে হল। আড়াইশো শব্দ যখন শেষ করলাম তখন ঘড়ি এক ঘণ্টা দশ মিনিট পার করে ফেলেছে। 

অবশ্য সবাই ট্রলপের মেথডে বিশ্বাস করেন না। ট্রলপের বহুপ্রসবের অভ্যেসকে অনেক ক্রিটিকই সন্দেহের চোখে দেখতেন (যেমন আমরা বছর বছর শারদীয়ার লেখকদের করি), মৃত্যুর পর ট্রলপের আত্মজীবনী ছাপা হল। তখন এই পনেরো মিনিটে আড়াইশো শব্দটব্দের ব্যাপার সবার গোচরে এল। অবশেষে সন্দেহের নিরসন। এতদিনে স্পষ্ট হল লোকটা এত খারাপ লিখত কী করে। এ কি লেখক না মেশিন?

তবে এই ক্রিটিকরা সংখ্যায় কম। শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিশ্রম করার ক্ষমতা এসবকে লোকে অনায়াস দক্ষতা/ স্বতঃস্ফূর্ততার থেকে মূল্য দেয় বেশি। আমিও এই দলেই পড়ি। এই সব লেখালিখির রুটিন, শব্দসংখ্যা পড়তে পড়তে সেটাই লক্ষ করছিলাম। মাইকেল ক্রিকটনের থেকে হেমিংওয়ের লেখা আমি পছন্দ করি বেশি, কিন্তু হেমিংওয়ে যে দিনে মোটে পাঁচশো শব্দ লিখতেন দিনে আর ক্রিকটন যে দশ হাজার এইটা আমাকে থমকে দিল। জন্মগত প্রতিভায় লোকে অত ইম্প্রেসড হয় না, গাঁতিয়ে খেটে প্রতিভার খামতিকে অতিক্রম করাতে যত হয়। আর প্রতিভা যদি কেউ অপচয় করে, তাহলে তো রক্ষা নেই। প্রতিভাবানদের, বিশেষ করে সে যদি নিজের ভাষার, নিজের ধর্মের, নিজের মামারবাড়ির পাড়ার (যে যেটাকে বেশি গুরুত্ব দেয়) প্রতিভার প্রতি মানুষের একটা স্বাভাবিক অধিকারবোধ থাকে। কীভাবে খরচ করলে সে প্রতিভার সদ্ব্যবহার হবে, সে সম্পর্কেও একটা নির্দিষ্ট মতামত থাকে। প্রতিভাবানের প্রতিভা খরচ করার ধরণ যদি সে মতের সঙ্গে না মেলে তাহলেই জাজমেন্টের বন্যা। ঋত্বিক ঘটক কেন মদ খেলেন, পিকাসো কেন নারীসঙ্গ করলেন, অরুন্ধতী রায় কেন রাজনীতি করতে গিয়ে কুড়ি বছরে মোটে দু’খানা উপন্যাস নামালেন, সমরেশ বসু কেন দু’খানা সংসার করলেন, সবাই কেন রবীন্দ্রনাথের (বায়োপিক দেখে আসার পর শচিন তেন্ডুলকরের নামও জোড়া হচ্ছে) মতো ঠুলিবাঁধা ঘোড়া হলেন না, এই নিয়ে গাধাদের চিন্তার শেষ নেই। আমারও না। আজ সকালেই ভাবছিলাম, হেমিংওয়ে যদি অত মাছ না ধরে আর দৈনিক আরও পাঁচশো শব্দ বেশি লিখতেন, কত ভালোই না হত।

আমার মতো যারা অফিসে ফাঁকি মারে, বাড়িতে ফাঁকি মারে, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে ফাঁকি মারতে মারতে এসেছে, তারা পরিশ্রম আর নিষ্ঠার নামে এত উদ্বাহু কেন, এটা আমার কাছে একটা রহস্য। পরিশ্রমের বিকল্প নেই, এ কথা সবার জীবনের/শিল্পের ব্রত নাও হতে পারে, এটা মেনে নিতে এত কষ্ট কীসের? কোথা থেকে আমাদের এই দৃঢ় প্রত্যয় যে প্রতিভা না থাকাটা দৈবের হাতে, কিন্তু পরিশ্রম না করাটা সম্পূর্ণ নিজদায়িত্ব? তাহলে নিজেরা করলাম না কেন? অস্কার ওয়াইল্ডের মতো ‘পারফেক্ট ওয়ার্ড’ লেখার ক্ষমতা আমার নেই এটা মেনে নিতে আমার কোনও অসুবিধেই হয়নি, কিন্তু ট্রলপের মতো পনেরো মিনিটে আড়াইশো শব্দ লেখারও যে নেই, এটা হাতে কলমে পরীক্ষা করে না দেখলে অবিশ্বাস যাচ্ছিল না। রেজাল্ট দেখেও শান্তি নেই। মনে মনে ভাবছি আজ পারিনি, কাল পারব নিশ্চয়। পরিশ্রমও যে চাইলেই করা যায় না, সেটার প্রতিভাও যে নিয়ে জন্মাতে হয় এটা আমার এখনও মাথায় ঢোকেনি। আর কবে ঢুকবে জানি না।


June 08, 2017

সাতচল্লিশ



শাটার সিনেমাটা দেখেছেন? অরিজিন্যাল থাই কিংবা অ্যামেরিক্যান রিমেক? যারা দেখেননি এবং দেখতে চান এবং স্পয়লারে আপত্তি আছে, তাঁরা এইবেলা চোখ বন্ধ করুন। নেক্সট অনুচ্ছেদ থেকে পড়তে চাইলে পড়তে পারেন। যারা এখনও চোখ খুলে আছেন, তাঁদের জন্য আরেকবার গল্পটা বলি বা মনে করিয়ে দিই। একটি ফোটোগ্রাফার ছেলের জীবনে নানারকম গোলযোগ ঘটতে শুরু করে। তার তোলা ছবিতে নানারকম ভূতুড়ে আলো দেখতে পাওয়া যায়, অন্ধকার রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় সামনে রাস্তায় রহস্যময় নারী লিফট চায়। এ সবই হরেদরে হরর ছবিতে থাকে, এ নিয়ে উত্তেজনার কিছু নেই। ইন্টারেস্টিং হচ্ছে অন্যান্য ভৌতিক উপসর্গগুলো। ছেলেটির কাঁধে ক্রমাগত ব্যথা হয়, ছেলেটির কাঁধ ক্রমশ ঝুঁকে যায়। ওজন মেশিনে উঠলে যা নম্বর দেখায় ওইরকম রোগাপ্যাংলা ছেলের অত ওজন হতেই পারে না। ছবির শেষে জানা যায় অতীতে ছেলেটি একটি পাপকাজ করেছিল, সে পাপের ভূত আক্ষরিক অর্থেই ছেলেটির কাঁধে চেপে বসে আছে, আর সেই ভারে ছেলেটি ক্রমশ বেঁকে যাচ্ছে। 

গত ক’দিন আমার অবস্থাটা হয়েছে অনেকটা সেইরকম। আমার বয়স বাড়ছে সেকেন্ড মিনিট ঘণ্টা মেপে যেমন বাড়ে, কিন্তু আমার কাঁধের বয়স যেন বাড়ছে একেক লাফে দশ বছর। অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু আমি টের পাচ্ছি কাঁধদুটো ধনুকের মতো বেঁকে গেছে, মাঝে মাঝে যখন সোজা করছি, টনটনিয়ে উঠছে। সবসময় মাথা ভার, মুখ হাঁড়ি। চেনা লোক দেখলে বুক ধড়ফড়, এই বুঝি কথা বলতে হয়। 

তিনটে কারণে এটা  হতে পারে।

এক, পুরোনো আর রোজ রোজ নতুন নতুন জমা পাপের ভার
দুই, বাইরের গরম আর ভেতরের এসির দ্রুত পট পরিবর্তন। 
তিন, গোটাটাই মানসিক।

আমার নিজের ধারণা তিনটে কারণের মিশ্রণে গোলমালটা ঘটেছে। মিশ্রণের অনুপাতটা তেত্রিশ, তেত্রিশ, তেত্রিশ নাকি চল্লিশ চল্লিশ কুড়ি নাকি নব্বই পাঁচ পাঁচ, সেটা আমি জানি না। 

রবিবারে আমাদের তাপমাত্রা ছিল সাতচল্লিশ। সোমবার ছেচল্লিশ। এমনিতে তো গতকাল, আজ, আগামীকালের সমস্ত ফারাক ইস্তিরি হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তার মধ্যে এটা একটা খবর।  খবরটা দিতে মাকে ফোন করলাম। শুরুতে যেমন করতে হয়, কী করছ, কেমন আছ ইত্যাদি, সেসব ভদ্রতা করছি, মা বললেন, “কেমন আর থাকতে পারে মানুষ, সাঁইতিরিশে?” আমি সাতচল্লিশের বাণ মারলে মায়ের সাইতিরিশ অক্কা পেত, কিন্তু আমি চুপ করে রইলাম। একে তো গরম নিয়ে গর্ব করা বংশপরিচয় নিয়ে গর্ব করার থেকেও হাস্যকর। দুই, আমার সাতচল্লিশের কষ্ট মায়ের সাঁইত্রিশের কষ্টের থেকে বেশি এবং মহান এটা নির্ধারণ করার কোনও উপায় আমার কাছে নেই। তিন, নিজেকে মনে করালাম, আমি ঘামছি না, মা ঘামছেন। 

গরমে গোটা শনিরবি বাড়িতে বসে থাকতে হল। বসে বসে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাস মুখস্থ করে ফেললাম।  মোটামুটি যা বুঝলাম সাতচল্লিশের দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই, আর সামনের সপ্তাহে, চোদ্দই জুন নাগাদ ধুঁয়াধার বর্ষণের সম্ভাবনা। আরও একটা কাজ হল, এ বছরের নন-ককেশিয়ান গোয়েন্দা জোগাড়ের সিলেবাসের একটা ধাপ পেরোনো গেল। জাপানি লেখক Keigo Higashino-র ইন্সপেক্টর কাগা। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত এ মাসের বইতে বলব। 

আর যে কাজটা হয়েই থাকে, টিভি দেখা, সেটাও হল দেদার। তবে এই শনিরবি টিভি দেখার পাশাপাশি টিভি দেখাসংক্রান্ত একটা সত্য উদ্ঘাটন করলাম, যেটা হচ্ছে, আমরা টিভিতে অনুষ্ঠান দেখার বদলে চ্যানেল দেখি। এর কারণ আমাদের রিমোট, বা রিমোটের অনুপস্থিতি। বেশিরভাগ সময় আমাদের রিমোট খুঁজে পাওয়া যায় না। যদি বা পাওয়া যায়, সেটা সর্বদা আমাদের থেকে হাত দশেক দূরে অবস্থান করে। এই হাতে করে খাটে নিয়ে এসে বসলাম, এই দেখি ঘরের ও প্রান্তে বুককেসের ওপরে তিনি অবস্থান করছেন। এটা কী করে হয় আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না। রীতিমত ভৌতিক। রিষড়ার বাড়িতে এ ধরণের ঘটনা খুব ঘটত। ফাঁকা ঘরে ফ্যান ঘুরছে, কেউ দেখছে না টিভি চলছে, জানালা এঁটে বন্ধ করা হয়নি, ছাদের কাপড় তুলে এনে দরজা দেওয়া হয়নি। কে করেছে? “আমি না”, “আমিও না”, “আমি তো না-ই”।  তখন ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই যে বাড়িতে আমরা ছাড়াও অন্য কেউ আছেন নির্ঘাত, তিনিই দোষী। অচেনা অশরীরীর কথা ভাবলে ভয় লাগে, তাই আমরা ধরে নিতাম,  ঠাকুরদা করেছেন। কাঁহাতক আর সামনের ঘরের দেওয়ালের ফোটোর ভেতর হাসি হাসি মুখে বসে থাকা যায়, তাই দাদু নেমে এসে এসব নষ্টামো করে বেড়াচ্ছেন।

দিল্লির ভাড়াবাড়িতেও এরকম কেউ আছেন নিশ্চয়। আমরা আসার পর, বাড়িওয়ালা এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই পর পর সজ্ঞানে স্বর্গলাভ করেছেন। তাঁরা হতে পারেন, বা আমরা আসার আগে এই ঘরে কেউ স্বর্গলাভ করেছিলেন, তাও হতে পারে। যিনিই থাকুন না কেন, তাঁর যত রসিকতা রিমোটখানাকে নিয়ে। আমাদের তাতে আপত্তি নেই। রসিকতা যদি রিমোটের বদলে গ্যাসের নব বা জলের কল নিয়ে হত, তাহলে কেলেংকারি। তার থেকে রিমোট ভালো। 

রিমোট খুঁজে না পাওয়া গেলে তো হয়েই গেল, নাগালের বাইরে থাকলেও একই ব্যাপার। ধরুন আপনি সব কাজ সেরে, গ্যাস, কল পরীক্ষা করে, গাছে জল দিয়ে, বাসন মেজে, ও ঘরের লাইট ফ্যান নিভিয়ে, জলের বোতলে জল ভরে এসে খাটে উঠে আবিষ্কার করলেন রিমোট আনা হয়নি। তখন কি আবার নেমে রিমোট আনতে যাবেন? গেলে আমার সঙ্গে আপনার মিল নেই। অর্চিষ্মানের সঙ্গেও নেই। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার আর অর্চিষ্মানের ভয়ানক মিল। আমরা তখন টিভিতে যে চ্যানেল খোলা আছে সেটাই দেখতে থাকি। যা-ই দেখানো হচ্ছে তাতেই আমাদের দিব্যি চলে যায়। এই করে করে একসময় আমাদের কেবলই ফক্স লাইফ দেখা হত, সকালে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া, দুপুরে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া, রাতে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া।  এই করে করে নাপতোল দেখেছি। (দেখে দেখে এমন নেশা হয়েছে এখন মাঝে মাঝে খাট থেকে উঠে রিমোট খুঁজে এনে চ্যানেল বদলে নাপতোল দেখি। কিন্তু সে এখনকার কথা, শুরুটা হয়েছিল রিমোট হারানো দিয়েই।) এ সপ্তাহের চ্যানেল ছিল জি সিনেমা বাংলা। টানা দু’দিন জি সিনেমা বাংলা দেখে চ্যানেল দেখে আমি যে সিদ্ধান্তে এসেছি, সেগুলো নিম্নলিখিতঃ

১। বাংলা সিনেমার নামে সবথেকে বেশি ব্যবহৃত শব্দ ‘অত্যাচার’। অন্যায় অত্যাচার। বিধাতার অত্যাচার। শাশুড়ির অত্যাচার। দ্বিতীয় ব্যবহৃত শব্দ ‘প্রতিবাদ’। শুধু ‘প্রতিবাদ’। অন্যায়ের প্রতিবাদ। বৌমার প্রতিবাদ।

২। দেভকে গালি দিয়ে লাভ নেই, বাংলা সিনেমার অভিনেতাদের বেশিরভাগই স্পষ্ট উচ্চারণে বাংলা বলতে পারেন না, কোনওদিনই পারতেন না। রঞ্জিত মল্লিক, শতাব্দী রায় এঁদের মধ্যে কয়েকজন। ইন ফ্যাক্ট, দেখেশুনে আমার ধারণা জন্মেছে, বাংলা সিনেমায় সফল হওয়ার অন্যতম শর্ত বাজে উচ্চারণ। 

৩। উত্তমপন্থীরা যা-ই বলুন না কেন, যত চোখে ঠুলি পরে থাকতে চান না কেন, সোজা কথাটা হচ্ছে, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির জন্য প্রসেনজিৎ যা করেছেন, করে চলেছেন এবং করবেনও, সেরকম আর কেউ করেননি। হ্যাঁ, মিথে পরিণত তিনি নাও হতে পারেন (অবশ্য মৃত্যুর পর কী হবে না হবে বলা যায় না। যদিও আমি চাই প্রসেনজিৎ অমর হোন এবং বাংলা সিনেমার রাজার মুকুট পরে সিংহাসনে চড়ে থাকুন) কিন্তু ফ্যাক্ট ইজ ফ্যাক্ট। ব্যাগি জামা থেকে চুলের ছাঁট থেকে শুরু করে আমি, আমার, আমাকে জাতীয় সমস্ত শব্দকে ‘আ-আ-মি”, “আ-আ-মার”, “আ-আ-মাকে” উচ্চারণ পর্যন্ত, বাংলা সিনেমার প্রত্যেকটি ট্রেন্ডের পথিকৃৎ আমাদের প্রসেনজিৎ। জি বাংলা সিনেমা সে কথা জানে এবং সারা দিনে অন্তত তিনটে করে তাঁর ছবি দেখায়। কানাঘুষো শুনি, কারা নাকি প্রসেনজিৎকে ইন্ডাস্ট্রিতে নবজীবন দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে। যাঁরা এ গুজব ছড়ান তাঁদের আমি সবিনয়ে বলতে চাই, জি বাংলা সিনেমা দেখুন, প্রসেনজিৎকে ফিরিয়ে আনার দরকার ছিল না, কারণ তিনি যাননি কোথাও, এখানেই ছিলেন। 

৪। কোনও ছেলের কোনও মেয়ের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার উপায়ঃ মেয়েটিকে ধর্ষণ করা
কোনও মেয়ের কোনও ছেলের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার উপায়ঃ ছেলেটির নামে ধর্ষণের মিথ্যে অভিযোগ আনা
কোনও মেয়ের কোনও ছেলেকে ইমপ্রেস করার উপায়ঃ ছেলেটি তাকে ধর্ষণ করা সত্ত্বেও, “আমি তোমাকে ভালোবাসি কাজেই পুলিসে দিচ্ছি না” বলে গলায় আঁচল দিয়ে ছেলেটিকে প্রণাম করে কাঁদতে কাঁদতে দড়ি কিনতে বাজারে যাওয়া।
কোনও ছেলের কোনও মেয়েকে ইমপ্রেস করার উপায়ঃ মেয়েটিকে অন্য ছেলেদের হাত থেকে ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচানো। 

আমরা খাটের ওপর এবং রিমোট টিভির কাছে থাকার জন্য শনিরবি তিন তিন করে ছ’খানা বাংলা সিনেমা দেখা হল, তার মধ্যে ‘চৌধুরী পরিবার’ দু’বার। অসামান্য ছবি। আপনারা দেখার চান্স পেলে ছাড়বেন না। যেমন বিনোদনধর্মী, তেমন শিক্ষামূলক। স্বামীকে দিয়ে স্ত্রীকে শিক্ষা দেওয়া, চরিত্রবান ভাইকে দিয়ে মাতাল দাদাকে শিক্ষা দেওয়া, প্রেমিক দিয়ে বেচাল প্রেমিককে শিক্ষা দেওয়া, জামাইকে দিয়ে শাশুড়িকে শিক্ষা দেওয়া, স্কুলকলেজের চালকলাবাঁধা সিলেবাসের ফাঁক দিয়ে যতরকম শিক্ষা আমাদের হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে, অথচ এখন জীবনে চলার পথে প্রতিপদে সে সব শিক্ষার অভাব অনুভব করছি, সে সব আছে চৌধুরী পরিবার-এ। 

আপনার যদি এ সব শিক্ষায় রুচি না থাকে, আপনি যদি গতে বাঁধা, পুঁথিপড়া শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার জন্যও চৌধুরী পরিবার দেখা আবশ্যক। বা জি সিনেমা বাংলা-র অন্য সিনেমা। মাধ্যমিকে বাংলার নম্বর নিয়ে আমার গর্বের শেষ ছিল না, এদিকে হঠাৎ বড়লোক হওয়া বোঝাতে এতদিন সেই “আঙুল ফুলে কলাগাছ”/ “ধরাকে সরা”/ “সাপের পাঁচ পা” “দুইদিনের যুগী…” ইত্যাদি জরাজীর্ণ প্রবাদের চর্বিতচর্বণ চালাতাম। চৌধুরী পরিবার-এ জীবনে প্রথমবার শুনলাম এক চরিত্র আরেক চরিত্রকে তিরস্কার করছেন, “লম্বা লম্বা সিগারেট খেয়ে তুমি আজকাল বিড়ির স্বাদ ভুলে গেছ।”

এর থেকে উদ্ভাবনী এবং যথাযথ উক্তি আপনি অদূর, সুদূর, কোনও অতীতেই আর শুনেছেন কি? ভবিষ্যতেও শুনবেন না। গ্যারান্টি। শেখার পর থেকে গত তিনদিনে আমি ডায়লগটা অর্চিষ্মানের ওপর বারসাতেক প্রয়োগ করেছি, প্রত্যেকবারই অর্চিষ্মান দাবি করেছে যে নিশানা কানঘেঁষে গেছে। কিন্তু আমি তাতে দমছি না। 


June 04, 2017

পাঁচিল



মূল গল্পঃ The Railings
লেখকঃ Ronald Frame

*****

ছেলেটার ঘরের জানালা দিয়ে পাঁচিলটা দেখা যেত। প্রায় দু’মানুষ উঁচু, তার ওপর একহাত লম্বা কাঁটাতারের বেড়া। ঐকিক নিয়মের অংক কষতে কষতে, ইতিহাসের সনতারিখ মুখস্থ করতে করতে, কম্পাসের কাঁটা পাতার মাঝখানে বিঁধিয়ে বৃত্ত আঁকতে আঁকতে মনঃসংযোগ হারিয়ে মুখ তুলে তাকালেই ছেলেটা পাঁচিলটা দেখতে পেত। রান্নাঘরের জানালা, চিলেকোঠার জাফরি,  ঠাকুরঘরের ঘুলঘুলি থেকেও দেখা যেত পাঁচিলটা। অটল প্রহরীর মতো বাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। রক্ষা করছে। 

রক্ষা করার মতো কিছু নাকি ছিল একসময়। কোথায় ছিল সে নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলে তিনতলার বড়ঘরের সিন্দুকটায়, এখন যার দরজা খুললেই ন্যাপথলিনের দমবন্ধ গন্ধের ঝাপট, আর যার গায়ে সাঁটা আয়নাটার সামনে হিসেব করে দাঁড়াতে পারলে কপালের ঠিক মাঝখানটায় তৃতীয়নয়নের মতো কমলা রঙের ছোপ, তার ভেতর নাকি ছিল সাত রাজার হিংসে করার মতো ষড়ৈশ্বর্য। কেউ বলে, ছিল চিলেকোঠায়, যার প্রতিটি ঘুলঘুলিতে এখন পায়রার বাসা, বুকবুক আওয়াজে কান পাতা যায় না। আবার কেউ বলে এসবের কোথাও না, ছিল আসলে পাঁচিলের ধারের ওই মরা জামরুল গাছের গোড়ায়। কালিচোষা তুলোট কাগজে সংকেত লেখা ছিল, কারা যেন খুঁজে পেয়ে খুঁড়ে নিয়ে চলে গেছে। 

মোট কথা, এখন আর পাহারা দেওয়ার মতো কিছু নেই। তবু পাঁচিল আছে, তারকাঁটাসহ। কী পাহারা দিচ্ছে কে জানে। সম্ভবত আব্রু। ষড়ৈশ্বর্য গেছে, রেখে গেছে আব্রু। আব্রু সবার থাকে না। যাদের থাকে তাদের তা যত্নে রক্ষা করতে হয়। পাঁচিলের বাইরে মাঝে মাঝে বেরোতেই হয়, না বেরোলে চলে না, তখন দেখেছে ছেলেটা, সত্যি, সবার বাড়িতে পাঁচিল নেই। বেশিরভাগেরই  রাস্তার সঙ্গে ঘর মিশে গেছে, কোনও পাঁচিল নেই, কাঁটাতারও না। থাকার দরকারও নেই। ওদের কোনওদিন ষড়ৈশ্বর্য ছিল না, আব্রুও না।

এই বেআব্রু লোকগুলোকে পাঁচিলের ভেতরের লোকজন পছন্দ করত না। ছেলেটা জন্মে থেকে দেখছে এই বেআব্রু লোকগুলো। জামরুল গাছের নিচে পোঁতা সোনার মোহরের মতো সে স্বর্গেরও শুধু  গল্পই শুনেছে ছেলেটা, যখন এরা ছিল না। পদে পদে আব্রু খোয়াবার ভয়ও ছিল না। তারপর একদিন রেলস্টেশন আর স্টিমারঘাট আর তারকাঁটাহীন মাঠঘাট পেরিয়ে পিলপিল করে এসে ঢুকল এরা, যেখানে পারল খুঁটি পুঁতে বসে পড়ল। এ বাড়ির আব্রুও যেত, যদি না পাঁচিলটা থাকত।

পাঁচিলটা কিন্তু রইল না আর বেশিদিন। সরলের সিঁড়ি ভেঙে ততদিনে ত্রিকোণমিতিতে কিশোর, খবর এল, পাকা রাস্তা যাবে। ওই বেআবরু বাড়িগুলোর বারান্দার ওপর দিয়ে, আর এই পাঁচিলের ওপর দিয়েও। ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে সবাইকে। পাঁচিলের এপারের লোকগুলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সরকারি আদেশ বুঝিয়ে কাগজের তাড়া গুছিয়ে উঠে পড়ার আগে সে দৃষ্টির অর্থ উদ্ধার করতে না পেরে ঘেমো শার্ট, কেঠো চোয়াল জিজ্ঞাসা করল, “কিছু বলবেন?”

কী বলবে? বললেই বা কী বুঝবে এসব লোকেরা, আব্রু যাদের ছিলই না কোনওদিন? ক্ষতিপূরণ তো জমির, পাঁচিল গেলে আব্রু যে চিরকালের মতো উদোম হয়ে যাবে, সে ক্ষতি পূরণ করবে কে? কী দিয়ে?

কিশোর দাঁড়িয়ে ছিল পড়ার ঘরের জানালায় যখন গাঁইতি, হাতুড়ি নিয়ে ওরা এল। পাঁচিলের গোড়ায় বাড়ি পড়ল, ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই। পাঁচিল প্রথমে অটল রইল। মনে হতে লাগল, লড়াই নিতান্ত একপেশে। ওদের লোহার হাতুড়ি শাবল যেন শোলার খেলনা। তারপর ক্রমে পাঁচিল টলতে শুরু করল, প্রতিটি আঘাত যেন একেকটা আর্তনাদ, বাড়ি কেঁপে কেঁপে উঠল, সারাবেলার যুদ্ধের পর শেষ আব্রুটুকু উজাড় করে দিয়ে পাঁচিল ঝুরঝুর করে ধসে গেল।

পাঁচিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ছেলেটা। কিশোরেরই বয়সী কিন্তু ওর থেকে অনেক বেশি সুঠাম আর শক্তিশালী। হাতের গাঁইতিটা নিশ্চয় ভীষণ ভারি, অথচ ছেলেটার হাতে ঘাসের মতো পোষ মানা। ছেলেটার ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনও আবরণ নেই। কালো চামড়ার নিচে পেশির ঢেউ। গাঁইতি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দু’হাত কোমরের দু’পাশে রেখে সম্রাটের মতো দাঁড়াল ছেলেটা। সারা গা চকচক করছিল ঘামে, কপালের ওপর পড়া চুল ধুলোয় ধূসর। পাঁচিলের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে ছেলেটা হাসছিল। ধপধপে দাঁত। ঝকঝকে হাসি। 

জানালার পাশে সেদিন থেকে ঘনঘন এসে দাঁড়াত কিশোর। ছেলেটা কোদাল দিয়ে ভাঙা ইটের টুকরোগুলো তুলত ঝুড়িতে, মাথায় চাপিয়ে ফেলে দিয়ে আসত অদূরে দাঁড়ানো টেম্পোয়। মাথা ঝাঁকিয়ে, সারা শরীর কাঁপিয়ে হাহা করে হাসত ছেলেটা, বাগান পেরিয়ে, পাইপ বেয়ে, কার্নিশে পা রেখে সে দুরন্ত হাসি জানালা টপকে ঢুকে যেত কিশোরের কানে। শেষ ঝুড়ি পাঁচিলের ইট যেদিন উঠে গেল টেম্পোয়, সেদিন কিশোর সারাদিন দাঁড়িয়ে রইল জানালার দিকে, বার বার গুঁড়ো গুঁড়ো কী সব ঢুকে যাচ্ছিল ওর চোখে, চোখ জ্বালা করছিল। ছেলেটা পাঁচিলের শেষ টুকু ঝুড়িতে নিয়ে টেম্পোতে তুলে দিয়ে এল। চেঁচিয়ে বলল, “আসছি।” তারপর রাস্তা তৈরি করার জন্য এনে রাখা নতুন ইটের পাঁজার ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে শার্ট নিয়ে পরতে পরতে, এই প্রথমবার, পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল জানালার দিকে। কিশোরের ইচ্ছে হল দৌড়ে পালায়, কিন্তু ছেলেটার বড় বড় চোখদুটো যেন বঁড়শি, বিঁধে গেছে ওর বুকের ভেতর। টেম্পো স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে ওদিকে, দৌড়ে চলে যেতে যেতে আরেকবার পেছন ফিরে তাকাল ছেলেটা। 

***** 

বাড়ির লোক ছবি এনে দিলেন। ভাবলেশহীন চোখ বোলাল যুবক। ছবি থেকে একটি মেয়ে, সমান ভাবলেশহীন চোখে ওর চোখে চোখ ফেলে রইল। চোখ দেখে যুবকের সন্দেহ হয়েছিল, অন্যেরা সে সন্দেহ নিরসন করল। মেয়েটাও একটা উঁচু পাঁচিলের ওপারে বড় হয়েছে। রাজযোটক, বলল সবাই।

ছবির মিছিল চলছিল বছরকয়েক ধরেই, যুবক এড়িয়ে যাচ্ছিল। প্রথম প্রথম এই এড়িয়ে যাওয়াটাকে প্রশংসার চোখে দেখত সবাই। বলত, জানা ছিল আগেই, ও অন্যদের থেকে আলাদা। কিন্তু বারবার এড়াতে এড়াতে কারও কারও মনে প্রশংসার ভেতর একটা সন্দেহ কাঁটার মতো জেগে উঠছে, টের পাচ্ছিল যুবক। তবে কি যেটা আড়ালেআবডালে সন্দেহ করা হয়েছে তা-ই? ও কি সত্যি আলাদা অন্যদের থেকে? ওর তাকানো, ওর দাঁতে নখ কাটার অভ্যেস, ‘স’ উচ্চারণ করার সময় ওর ঠোঁটের একটা বিশেষ ভঙ্গিতে বেঁকে যাওয়া, অবিকল ওর পিসতুতো বোনের মতো, যার সঙ্গে ছোটবেলায় পুতুল খেলে ওর বেশিরভাগ সময় কেটেছে?  যুবক সতর্ক হল। আর দেরি করা উচিত হবে না।

সেন্টের গন্ধ আর চেলির খসখস আর ডেকোরেটরের ফ্যানের ঝড়ের মতো গরম হাওয়ার ঘূর্ণির মধ্যে বসিয়ে এক বৈশাখের গোধূলিতে যুবকের হাতের ওপর সেই ভাবলেশহীন মেয়েটির হাত, যার নাম, যুবক জেনেছে, জবা, স্থাপন করে দেওয়া হল। জবার আংটির কানা বিঁধছিল যুবকটির হাতে। গরমে, ভয়ে, ঘেমে যাচ্ছিল যুবকের হাতের তালু, ইচ্ছে করছিল এক্ষুনি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে এই সব দড়িদড়া খুলে দৌড়তে, কিন্তু বাস্তবে যুবক কাঠের মতো বসে রইল কল্কা আঁকা পিঁড়িতে, আর পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দুজনের দুটি হাত, বেশ করে বেঁধে দিলেন। 

পরদিন সকালে, কিংবা সন্ধ্যেয়, যুবকটি ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল ততক্ষণে, একদল শ্যালিকা হাসিতে গড়িয়ে পড়তে পড়তে, বয়স্কা আত্মীয়াদের ঠোঁটচাপা চোখটেপা প্রশ্রয়ে এগিয়ে এসে যুবকটির হাতে গুঁজে দিল পাঁচটি ফলের বীজ। বলল, এই নাও, ভালো করে বুনে দিও জমিতে। আবার হাসি। যুবকের গরম হয়ে যাওয়া কানের পর্দায় খনখন করে সে হাসি বাজল। 

যথাসময়ে বীজ থেকে ফল হল। এ বাজারে কেউ পাঁচটা ফল আশা করে না, একটির পরই সবাই শান্ত হল। তাছাড়া ভাগ্যদেবী মুখ তুলে চাইলেন, প্রথম দানেই ছেলে উঠল, দ্বিতীয় সন্তানের প্রত্যাশা বা জোরাজুরি কেউ করল না। দায়িত্ব সেরে, সকলের চোখের আড়ালে দাম্পত্যবিছানা থেকে নিজের বালিশখানা নিয়ে সরে পড়ল লোকটা। 

*****

উড়ো ফোনের খবরে, শহরের এক ঘিঞ্জি গলির এক ঝুরঝুরে বাড়ির সারি সারি ঘরের একটার দরজা লাথি মেরে ভেঙে বুড়োটার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলল পুলিস। বুড়োটার নিচে চাপা পড়ে ছিল একটা অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক। যে অফিসার রেডের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, ঠিক ওই বয়সী তাঁর একটা ছেলে আছে বাড়িতে। ছেলের সামনে উচ্চারণ করার কথা কল্পনাও করতে পারেন না, এরকম একটা অশ্রাব্য গালি দিয়ে অফিসার তাঁর পালিশ করা বুট বিঁধিয়ে দিলেন বুড়োটার পাঁজরে। তাঁর লোকেরা কাতরাতে থাকা বুড়োটাকে কলার ধরে টানতে টানতে নিয়ে জালঘেরা ভ্যানে তুলে দিল।

সবাই অবশ্য এই অফিসারের মতো হয় না, কারও কারও মনে দয়ামায়া থাকে। যেমন বিচারের পর বুড়ো যে জেলে এল সেখানকার ভারপ্রাপ্ত অফিসার। কলেজে তাঁর পাসে সাইকোলজি ছিল। শান্ত, নিরীহ, ভীতু বুড়োটাকে দেখে তাঁর দয়া হল। ক্রিমিন্যাল টাইপ নয়। বুড়োটা যখন বাগানে কাজ করত, তখন তিনি মাঝে মাঝে বুড়োটার কাছে যেতেন। বুড়োটা ভয় পেয়ে দ্বিগুণ জোরে মাটি কোপাতে লাগত, তিনি অভয় দিতেন। বুড়োটার সঙ্গে গল্প করতেন। বলতেন, এই যে এইসব অপরাধ, যে অপরাধে বুড়োটা ধরা পড়েছে, সেগুলোর দায় আসলে দোষীদের নয়। এর বীজ পোঁতা হয় অনেক শুরুতে, অনেক গভীরে। বুকের মধ্যে রুদ্ধ কামনার ফেনা জমতে জমতে একদিন ফেটে বেরোয়। আমাদের দেশে তো সচেতনতা নেই, বলতে বলতে তাঁর মুখে আফসোসের ছায়া ঘনাত, না হলে কাউনসেলিং-এ সব সারে। বুড়োটাকে উৎসাহ দিতেন অফিসার। বলতেন, এখনও সময় আছে, শুধু মন খুলে দিতে হবে। চেতন অবচেতনের মাঝের পাঁচিল ভেঙে দিতে হবে।

মনস্তত্ত্বের ক্লাস শেষ করে অফিসার ফিরে গেলে বুড়োটা হাতের খুরপি রেখে জিরোত। জেলের বাগানের কোণে একটা জামরুল গাছ, তার ছায়ায় বসে গামছা নেড়ে ঘাম শুকোত। চোখ লেগে আসত কখনও কখনও। আধোঘুমে বুড়োটা স্বপ্ন দেখত কাঁটাতারের বেড়াওয়ালা একটা উঁচু পাঁচিলের। জীবন্ত। স্বপ্নে পাঁচিলটা ক্রমশ উঁচু হতে থাকত, উঁচু আরও উঁচু, আরও উঁচু। ঘাড় ব্যথা হয়ে যেত বুড়োর, তবু মাথা দেখতে পেত না। পাঁচিলের ওধারে একটা ঘামচপচপে কালো ছেলে, একলা একটা শাবল নিয়ে পাঁচিলটার গায়ে শুধু অক্লান্ত বাড়ি মেরে চলত, ঠাঁই, ঠাঁই, ঠাঁই… 



June 02, 2017

গত সাত বছরে



কাল চিরাগ দিল্লির সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আমি সেই কাজটা করলাম, যেটা দু’হাজার নয়ের সেপ্টেম্বর মাস থেকে এই দুহাজার ষোলোর মে মাস পর্যন্ত, গত সাত বছরে কখনও করিনি। 

বললাম, “একটা পোস্টের আইডিয়া দাও না গো।”

ও-কারের শেষটুকু ঠোঁট ছাড়ার আগেই সম্বিত ফিরল। এটা আমি কী করলাম! অবান্তরের সবথেকে অপরিহার্য নিয়মটাই ভেঙে ফেললাম? গত সাত বছরের শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্ত পেরোতে পেরোতে একটিই সত্যকে আমি ধ্রুব রাখতে চেয়েছি। অবান্তরকে ‘টিমওয়ার্ক ফ্রি’ জোন রাখতে চেয়েছি। অফিসে, সংসারে, উবারপুলে, টিমওয়ার্ক যত বুকের ওপর চড়ে গলা টিপে ধরেছে তত আমি প্রাণ পণ করেছি অবান্তরকে রাহুমুক্ত রাখার। অবান্তর আমার ছাগল, তাকে আড়ে কাটব না বহরে কাটব শুধু আমার এক্তিয়ার। আমার একার ক্ষমতায় যতটুকু কুলোবে, যেমন কুলোবে, অবান্তর ততটুকুই, তেমনই চলবে। 

কিন্তু সত্যি সত্যি কি টিমওয়ার্ক ছাড়া কিছু দাঁড়ায়? পোস্ট আর কমেন্টের যুগলবন্দী ছাড়া ব্লগ কী? তাহলে আর ইন্টারনেটে কেন, ডায়রি কিনে মনের কথা লিখলেও হয়। অ্যাকচুয়ালি তাও হয় না, আমার কোটি কোটি ডায়রির সবগুলোই কোনও না কোনও সময় কারও না কারও হাতে পড়েছে। বেস্ট হয় মনের কথা মনেই রেখে দিতে পারলে। 

অবান্তরের পাঠকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমি অনেককে জানি যারা আমার পোস্ট না পড়ে বা পড়ার পরে দ্বিগুণ উৎসাহে কমেন্ট পড়েন। কিন্তু কমেন্ট আর পোস্টের মাঝখানে ‘পাবলিশ’ নামের একটি নিশ্ছিদ্র দেওয়াল থাকে, তার ওপারে পাঠক আমার গুণগান করুন, গালি দিন, সাপের বদলে ব্যাঙ বেরোতে দেখে হতাশ হন, সে তাঁদের অভিরুচি, অধিকার। তার ওপর আমার হাত নেই। ঠিক যেমন কারও হাত নেই পাবলিশ হওয়ার আগে অবান্তরে কী ঘটছে তার ওপর।

পাঠকের না, অর্চিষ্মানের না, মায়েরও না।

আর সেই আমি কি না আইডিয়া ধার চাইছি?

অনেক খুঁজে একটাই সান্ত্বনা বেরোলো, যে ধারটা অন্তত অর্চিষ্মানের কাছে চেয়েছি। আমি নিজেকে বুঝিয়ে রেখেছি, অর্চিষ্মানের সঙ্গে করা গসিপগুলো গসিপ নয়। আপাদমস্তক ইনকারেক্ট ভাবনা, যেগুলো নিজের মায়ের কাছে বলার সাহস আমার হবে না এবং আমার মা আমাকে বললেও আমি তাঁকে ঘোরতর জাজ করব, সেগুলো অর্চিষ্মানের কাছে উন্মুক্ত করা, সামহাউ, ক্ষমাযোগ্য। অর্চিষ্মানের উদ্দেশ্যে বলা কথা আসলে আমার মনে মনে ভাবারই সামান্য এক্সটেনশন। 

কিন্তু এসব সান্ত্বনা, সান্ত্বনাই। সত্যিটা হল, আমি আমার সাতবছর আগলানো দুর্গের মুখ খুলে দিয়েছি, এবার তেড়ে বন্যার জল ঢুকলে আমি ছাড়া দোষারোপ করার কেউ নেই।

দ্রুত ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামতে হল। আর এতে সাহায্য করল আমার আর অর্চিষ্মানের দুজনেরই চরিত্র, যা সম্পূর্ণ বিপরীত কিন্তু এই সব মুহূর্তে পারফেক্ট পরিপূরক। 

অর্চিষ্মানের যে ব্যাপারটা সাহায্য করল, সেটা হল ওর উত্তর দেওয়ার আগে ভাবার স্বভাব। আমি যেমন প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই “ওহ, এটা তো আমি জানি” বলে লাফিয়ে উত্তর দিতে শুরু করি, ও ঠিক তার উল্টো। প্রশ্নটা শোনে, ভাবে, তারপর উত্তর দেয়। এতে উত্তরের কোয়ালিটি তো ভালো হয়ই, তাছাড়া আমার মতো প্রশ্নকর্তার পক্ষেও, যিনি সাতপাঁচ না ভেবে প্রশ্ন করেছেন, ভালো হয়, কারণ তিনি কথা ঘোরানোর সুযোগ পান। 

আর আমার না ভেবে কথা বলার ক্ষমতাটাও কাজে লেগে গেল। সিগন্যাল যতক্ষণে সবুজ হল ততক্ষণে আমি অবান্তর থেকে ওয়েদার হয়ে শনিরবি কী কী ‘ফান থিংস’ করা যেতে পারে, কথোপকথন সেখানে নিয়ে গেছি। দুজনে মোবাইল খুলে ‘ডেলহিইভেন্টস ডট কম’ পরীক্ষা করছি, আমার মাথার মধ্যে একটা গলা বলে চলেছে, "মাগো, কী বাঁচাই না বাঁচলাম।" 

*****

বলা বাহুল্য, অর্চিষ্মানের সাজেস্ট করা বিষয় নিয়ে অবান্তর লিখলে কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হত না। কথাটা সেটা নয়। কথাটা হচ্ছে, সাত বছর ব্লগ লেখার পরও এমন মুহূর্ত আসে, যে পরের পোস্ট কী নিয়ে লিখব সেটা ভেবে পাওয়া যায় না। এমন নয় যে মুহূর্তগুলো ক্বচিৎকদাচিৎ আসে। ঘনঘন আসে। সপ্তাহের শুরুতে, মাঝে, শেষে আসে। প্রতিটি পোস্ট ছাপা হওয়ার পরেই আসে। 

এসে দু’হাত বুকের সামনে আড়াআড়ি ভাঁজ করে, ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকায়। বলে, "এটা তো নেমে গেল, এরপর? আর ভাণ্ডারে কিছু আছে? নাকি দোকান বন্ধ করার সময় এসে গেছে?"

কখনও সামান্য চিন্তা হয়। সত্যি, কী নিয়ে লিখব? এই যে বুদ্ধিমান পায়রাটা আমার নাকের সামনে দিয়ে উড়ে চলে গেল, নিজের জীবন সহজসরল রেখেছে, ব্লগ খুলে ঝঞ্ঝাট বাড়ায়নি, একে নিয়ে লিখব? এই যে লিফট-এ চেপে উঠছি, লিফট নিয়ে লিখব? কখনও পুরোদস্তুর প্যানিক সেট ইন করে। পাগলের মতো স্মৃতি হাতড়াই, লিফটে বলার মতো কিছু ঘটেছিল কি? কখনও কি কোনও টল ডার্ক হ্যান্ডসামের সঙ্গে বন্দী হয়ে পড়েছিলাম, বা লিফটে চড়ে জীবনের কোনও সারসত্য উপলব্ধি হয়েছিল? নাথিং। লিফটে বলার মতো একটাই ঘটনা ঘটে আমার সকালবিকেল, সেটা হচ্ছে দূর থেকে অফিসের চেনা লোক লিফটে উঠছে দেখলে হয় স্পিড কমাতে হয়, নয় গতিপথ বদলাতে। আর সে সব কিছুই করার সুযোগ না থাকলে দাঁত বার করে বলতে হয়, ডাক্তারের আদেশ। তারপর লিফটের বদলে ভাঙো পাঁচতলা সিঁড়ি। 

বোরিং লোকের ব্লগ লেখার এটাই সমস্যা। নিজেকে রসদ করে ব্লগ চালাতে গেলে আমি আজ সকালে ঘুম থেকে উঠলাম, খেলাম, অফিসে এলাম, এসে বসের ধাতানি খেয়ে মুখ হাঁড়ি করলাম, দিনের পর দিন এই চর্বিতচর্বণ করে যেতে হয়। তাতে অসুবিধে কিছু নেই, এরকম ব্লগ অনেকেই লেখেন এবং আমার পড়তেও দিব্যি লাগে। তবে আমার ধারণা ক্রমাগত এসব লিখতে লিখতে আমি নিজেই বোর হয়ে যাব। বেশিদিন এইসব লেখা যায় না, ঠিক যে কারণে বেশিদিন ডায়রি লেখা যায় না। 

তখন হয় আইডিয়ার অপেক্ষা করতে হয়, নয় ইমপ্রোভাইজ করতে হয়। কুইজ, কোটেশন, সাপ্তাহিকী হ্যানাত্যানা। এসব হাজার শব্দের ট্র্যাডিশনাল পোস্টের বিকল্প নয়, পাঠককে এসব দিয়ে বোকা বানানো যায় না। তবু মনে হয় ফাঁকা জায়গা তো খানিকটা ভরল। এই ভরাতে ভরাতেই হয়তো পরের আইডিয়াটা মাথায় আসবে।

আসেও। গত সাত বছরে কখনও হতাশ করেনি। সেগুলো আইডিয়া হিসেবে কেমন তার বিচার আমি করছি না, আমার পক্ষে করা সম্ভবও নয়। হাজার শব্দ লিখে যাওয়ার মতো কিছু একটা হলেই আমার মতে যথেষ্ট। তবু গোটা মন মানে না। লেখার সময় অর্ধেক মন ছি ছি করে, বোরের হদ্দ হয়, হাই তোলে। বলে "তুলে নাও মা, এ যমযন্ত্রণা জন্মের মতো ঘোচাও।" অন্য অর্ধেক বলে "ঘাবড়াও মৎ, লিখতে থাকো।" আমি সদাসর্বদা এই দ্বিতীয় মনটার কথা শুনি। যেমন আজ শুনলাম।


May 31, 2017

গত সাড়ে তিন মাসে



কিছু পছন্দের লিংক জমেছিল, এই রইল। 




বন্ধুত্ব। আমার মতে পৃথিবীর সবথেকে ওভারহাইপড সম্পর্ক। 

আইফেল টাওয়ার এরই মধ্যে বারদুয়েক বিক্রি হয়েছে জানতেন? যিনি বিক্রি করেছেন তাঁর সম্পর্কে জানতে হলে ক্লিক করুন।

এরকম একটা সমীক্ষা বাংলায়ও করা যেতে পারে। যে বইগুলো সকলেই পড়েছে দাবি করেছে, কিন্তু আসলে পড়েনি।

ক্রাইম রাইটারস’ অ্যাসোসিয়েশন-এর ছশো লেখকের মতে 'বেস্ট ক্রাইম নভেল এভার'? লিংকে ক্লিক করার আগে সমাধান করার চেষ্টা করুন দেখি? ক্লু হচ্ছে, ভেজিটেবল ম্যারো, চার্লস কেন্ট, ডিকটাফোন।


পড়ুয়ারা ভালো হিংসুটেও হয়। লাইব্রেরি নিয়ে কত লড়াই হয়েছে ইতিহাসে, পড়ে আমার চোখ কপালে। একে অপরের বই লেখা ডকে তোলার জন্য কাগজের সাপ্লাই বন্ধ করা পর্যন্ত।

মেল হ্যারাসিং অ্যাভয়েড করার একটা স্ট্র্যাটেজি।

ভ্যাজাইনা আর ভালভার পার্থক্য জানেন? না জানলে জেনে নিন।

এই সেদিন বাড়ি পরিষ্কার নিয়ে অত কথা লিখলাম, তাই কিনব না। কারণ ফাইন্যালি এগুলো জঞ্জাল ছাড়া কিছু না। তা যদি না হত, তাহলে আমি মুখ মোছার জন্য এই রুমালটা কিনতাম।

আর পেন রাখার জন্য এই পেনদানিটা। 

শনিরবিগুলো পলক ফেলতে না ফেলতে পালায়, যতই কাজকর্ম ফেলে আরাম করি না কেন, কম পড়ে। এঁরা বলছেন, আমার স্ট্র্যাটেজিটা ভুল। আসলে যত বেশি কাজ করব, সময় তত লম্বা হবে।

“I may not agree with you, but I will defend to the death your right to make an ass of yourself.” অস্কার ওয়াইল্ডের অনেক পছন্দসই কথার মধ্যে এটা আমার একটু বেশিই পছন্দ।


May 30, 2017

এ মাসের বই/ মে ২০১৭



Into the Water/Paula Hawkins



বই ছাপা হয়ে বেরোলো আর আমি লাফিয়ে পড়ে সে বই কিনে পড়ে ফেললাম, এ প্রায় ঘটেই না। পলা হকিন্সের ‘ইনটু দ্য ওয়াটার’-এর ক্ষেত্রে সেটাই ঘটল। পলা হকিন্স হচ্ছেন ‘দ্য গার্ল ইন দ্য ট্রেন’-এর বিখ্যাত লেখক। আমার ‘দ্য গার্ল ইন দ্য ট্রেন’ রীতিমত ভালো লেগেছিল, তাই ইনটু দ্য ওয়াটার পড়ব ঠিকই করে রেখেছিলাম। সিদ্ধান্ত নিতে বেগ পেতে হয়নি।

ইংল্যান্ডের উত্তরে বেকফোর্ড নামের এক ছোট্ট গ্রাম। সেই গ্রামে থাকত জুলস এবং নেল নামের দুই বোন, তাদের বাবামায়ের সঙ্গে। সদ্ভাব কখনওই ছিল না, বড় হওয়ার পর দুই বোনের সম্পর্কছেদ হয়। মূলত, ছোটবোন জুলসেরই উদ্যোগে। নেল কেরিয়ারে নাম করে, বেকফোর্ড ছেড়ে বেরিয়ে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ায়, এবং কিছুদিন পর নিজের মেয়েকে নিয়ে বেকফোর্ডে ফিরে এসে, পুরোনো বাড়িতে থাকতে শুরু করে।

বেকফোর্ডে ফিরে আসার একটা বিশেষ কারণ নেলের ছিল। বেকফোর্ড-এর একটা কুখ্যাতি ছিল জনমানসে। গ্রামের পাশ দিয়ে বইত এক নদী। একটি বিশেষ বাঁকে, নদী প্রায় সবদিক থেকে অবরুদ্ধ ছিল আর একদিক থেকে উঠে গিয়েছিল খাড়া পাথরের দেওয়াল। সেই নদীর বদ্ধ অংশটুকুকে সবাই জানত ‘ড্রাউনিং পুল” নামে। দেওয়ালের ওপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার আদর্শ সুযোগ। সে সুযোগের সদ্ব্যবহারও হত প্রায়ই। তাছাড়া শত শত বছর আগে, যখন ও তল্লাটে ডাইনিশিকারের ধুম ছিল, তখন কিছু ডাইনিকে এই পুলে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল বলেও বইতে লেখা আছে। 

নেল বেকফোর্ডে ফিরে এসেছিল এই ড্রাউনিং পুল-এর লিজেন্ড নিয়ে কাজ করবে বলে।একদিন সকালে উঠে সবাই দেখল, পুলের জলে নেল-এর নিথর দেহ ভাসছে, কোথাও কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই। যদিও ‘এসট্রেঞ্জড’ তবু আর কোনও প্রাপ্তবয়স্ক আত্মীয়ের অভাবে পুলিস জুলস-কে খবর দিল নেলের আত্মহত্যার। জুলস এল। নেলের জন্য নয়। নেলের টিনএজার মেয়ে, লেনা-র, প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে, তাছাড়াও নিজের একটা ধন্দও পরিষ্কার করার ছিল । নেলকে জুলস যতটুকু চেনে, তাতে নেলের পক্ষে আত্মহত্যা করা অসম্ভব।

নেলের কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে, বেকফোর্ডের ড্রাউনিং পুল নিয়ে নেলের তৈরি করা অসমাপ্ত প্রতিবেদনের পাণ্ডুলিপির ভেতর দেখল জুলস, নেল লিখে গেছে, ওটা ড্রাউনিং পুলটুল কিছু না, ওটা হচ্ছে “a place to get rid of troublesome women,”

পলা হকিন্স-এর এই ব্যাপারটা আমার পছন্দ। ওঁর দুটো বইয়েরই মুল চরিত্র মেয়েরা শুধু নয়, ‘আনলাইকেবল’ মেয়েরা। মোদোমাতাল, যে কাজটা করতে বারণ করা হচ্ছে (নিজের ভালোর জন্যই) সেই কাজটাই ক্রমাগত করে চলা, জেনেবুঝে কুড়ুলে গিয়ে পা দেওয়া, যৌনতাকে নীতিবোধের সিংহাসনে চড়িয়ে ধূপধুনো না দেখানো মেয়েরা। বেসিক্যালি, ছেলে হলে যে চরিত্রগুলোকে আমি বাঁধনছাড়া, বোহেমিয়ান এবং ব্রেভ বলতাম, সেই রকম মেয়েরা।

‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’-এ তিন মহিলার কণ্ঠস্বরে আমরা গোটা গল্পটা শুনেছিলাম। ইনটু দ্য ওয়াটার লেখা হয়েছে নারী পুরুষ মিলিয়ে এগারো জনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুনলাম। অনেকেই বলেছেন এগারোটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। পলা হকিন্স নিজে বলেছেন, ইনটু দ্য ওয়াটার-এর সব চরিত্রই গল্পে কোনও না কোনও ভাবে ক্রুশিয়াল, এবং সকলেই ঝুড়ি ঝুড়ি সিক্রেট গালে পুরে বসে আছে। তাদের সেই সব সিক্রেট বার করার জন্য তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়া দরকার ছিল। ফার্স্ট পার্সনের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণ পরিসরে, এমনকি থার্ড পার্সন সর্বজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েও সে সিক্রেট ইন্টারেস্টিং করে আলোয় আনা যেত না। 

এই যুক্তিটা আমার একটু অদ্ভুত লেগেছে। সব গল্পেরই, বিশেষ করে রহস্যরোমাঞ্চ গল্পে একাধিক চরিত্রের একাধিক সিক্রেট থাকে। কিন্তু তা বলে সবাইকে নিজের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গল্পটা বলতে দেওয়া হয় না। পয়েন্ট অফ ভিউ বারবার বদলালে গল্পের স্রোতে বাধা পড়ে বলেই আমার বিশ্বাস, তাছাড়া প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ ফুটিয়ে তোলা সহজ নয়। 

ইনটু দ্য ওয়াটার আমার ভালো লেগেছে। দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন-এর সঙ্গে তুলনা অবশ্যম্ভাবী, পলা হকিন্স নিজেও সেটা জানতেন, তাই সে খাঁচা থেকে বেরোনোর চেষ্টা তাঁর ছিল। দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন অনেক বেশি সাসপেন্সমূলক, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের সঙ্গে তার মিল অনেক বেশি। ইনটু দ্য ওয়াটার-এ রহস্যের পাশাপাশি আরও কয়েকটা বাড়তি স্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন পলা। বেকফোর্ডের প্রেক্ষাপটে উইচক্রাফট ইত্যাদির আভাস বুনে একটা গথিক অনুভূতি আনার চেষ্টা করেছেন, এবং পেরেওছেন। সেটা করতে গিয়ে মিস্ট্রির অংশটা একটু ঢিলে হয়ে গেছে। প্রায় মাঝখান থেকেই বোঝা যাচ্ছিল গোলমালটা কোনখানে। তাতেও অসুবিধে হয়নি আমার বিশেষ। আমার যেটা মনে হয়েছে, ইতিহাস এবং বর্তমানের মিশেলটা আরও জম্পেশ হতে পারত। চোদ্দ বছরের লিবি সিটন, ষোলোশো ঊনসত্তর সালে, ডাকিনীবিদ্যা চর্চার অভিযোগে, এবং বত্রিশ বছরের এক পুরুষকে ‘ভুলিয়ে’ তার স্ত্রী ও নবজাতকওয়ালা সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য লিবির হাত পা বেঁধে ড্রাউনিং পুল-এ ডুবিয়ে মারা হয়। দেওয়া হয়। নেল আর জুলস আর লেনা আর কেটির গল্প পড়তে পড়তে আমার কেবলই লিবি সিটনের কথা মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, এই গল্পটার থেকে ওই গল্পটা হয়তো আরও ভালো হত।


The Landour Cookbook: Over hundred Years of Hillside Cooking/Edited and Introduced by Raskin Bond & Ganesh Saili




উনিশশো কুড়ির দশকে ল্যান্ডোরের কেলগ চার্চের পাদ্রির স্ত্রী মিসেস লুকাস আর উডস্টক স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের স্ত্রী মিসেস পার্কারের সঙ্গে মিলে একটি রিডিং ক্লাব খোলেন। উনিশো আঠাশ সালে তৈরি হওয়া ল্যান্ডোরের ঝকঝকে নতুন কমিউনিটি সেন্টারে ক্লাবের সাপ্তাহিক মিটিং বসত। ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য ছিল বই পড়া, আফটার অল, রিডিং ক্লাব যখন। বই পড়ার পাশাপাশি সদস্যরা নিজেদের মধ্যে রেসিপি চালাচালি করতেন। এই সব রেসিপি জমা করে উনিশশো তিরিশ সালে প্রথম ছাপা হয় ল্যান্ডোর কুকবুক। রেসিপির সঙ্গে সঙ্গে ঘরকন্নার আরও দরকারি খুঁটিনাটি টিপস ও টোটকাও ছিল। বই বিক্রি থেকে যে টাকা উঠল, তা রিডিং ক্লাবের উন্নতিকল্পে খরচ হল।

প্রায় সত্তর বছর পর সেই বইয়ের রেসিপি সাজিয়েগুছিয়ে আবার নতুন করে বই বাঁধিয়ে বার করেছেন রোলি বুকস, সম্পাদনার দায়িত্ব পেয়েছেন ল্যান্ডোরের মুখপাত্র রাস্কিন বন্ড এবং গণেশ সাইলি।

এমাসের দুটো বইয়ের মধ্যেই একটা মিল আছে, সেটা হচ্ছে দুটো বইই আমি লাফিয়ে কিনেছি। প্রথমটা কিনেছি নিজে, আর দ্বিতীয়টা, ল্যান্ডোর কুকবুকঃ ওভার হান্ড্রেড ইয়ারস অফ হিলসাইড কুকিং কিনেছি এই অবান্তরের কমেন্ট বিভাগে সাজেশন পেয়ে। আমি আমাজন প্রাইমের তিরিশদিনের ফ্রি ট্রায়ালের তিরিশ দিন এখনও পেরোয়নি, তারই সুবাদে অর্ডার দেওয়ার পরদিনই বই এসে গেল। ঠিক আমার হাতের পাঞ্জার সমান লম্বা আর আটআঙুল পাশাপাশি জড়ো করা আটআঙুল প্রমাণ চওড়া, অতি সুন্দর, হালকা নীল, ঘিয়ে, গোলাপি, বেগুনি ইত্যাদি রঙের মৃদু আঁচে রাঙানো একটি মারাত্মক কিউট বই।

বইয়ের বাইরেটা দেখে মন যত খুশি হল, পাতা উল্টে ঠিক ততটাই দমে গেল। যদিও দমার কোনও কারণ নেই।  বইটি এক্স্যাক্টলি তাই, যা টিনে লেখা আছে। ল্যান্ডোর কুকবুক। অর্থে রেসিপিবুক। গত একশো বছর ধরে ল্যান্ডোর, মুসৌরিসংলগ্ন পাহাড়ের ঘরেঘরে রান্নাহওয়া রেসিপির বই, দ্য ল্যান্ডোর কুকবুক। দুশো ছাপ্পান্ন পাতার দুশো ছত্রিশ পাতা ধরে রেসিপি। বেভারেজ, সুপ, অন্ত্রে ও টিফিন, মিট ফাউল অ্যান্ড ফিশ, ভেজিটেবলস, স্যালাড অ্যান্ড স্যালাড ড্রেসিং থাকলেও সিংহভাগ জুড়ে আছে পুডিংস অ্যান্ড ডেজার্টস, কনফেকশনারি (যার মধ্যে পড়ছে কেকস, আইসিংস, কুকিস, ডোনাটস, পেস্ট্রিস অ্যান্ড পাইস, ক্যান্ডি), ব্রেডস অ্যান্ড রোলস, জ্যামস অ্যান্ড জেলিস, পিকলস অ্যান্ড রেলিশেস। উপসংহারে ঘরোয়া টোটকা (নমুনাঃ টু কিল দ্য মাটন টেস্ট ইন মাটন, অ্যাড টু পীলড অ্যাপলস।) এবং ভিটামিন তালিকা ও তাদের গুণাগুণ তালিকা। 

বাকি কুড়ি পাতার ছ’পাতা প্রকাশকের নামধামবংশপরিচয় ইত্যাদি, এবং চোদ্দ পাতা জুড়ে বইয়ের উপক্রমণিকা। কে লিখেছেন লেখা নেই, তবে ভুল প্রমাণিত হওয়ার খুব একটা ঝুঁকি না নিয়েই আন্দাজ করা যায়। অসামান্য সরস ভাষায় আঞ্চলিক গল্প, ল্যান্ডোর পত্তনের ইতিহাস, রাসকিন বন্ডের ঠাকুমার খাদ্যাখাদ্যসংক্রান্ত প্রবাদপ্রবচনখচিত উপক্রমণিকা। সেখানে স্থানীয় গোয়ালাদের কথা আছে, ল্যান্ডোর পত্তনের ইতিহাস আছে। একটা গল্প বিশেষ করে পছন্দ হয়েছে আমার, সেটা আপনাদের শোনাচ্ছি। 

“Among the many local cooks who worked for the missionaries was Ranjit, an eccentric character who spoke his mind on everything under the sun. At one time he worked for a Bishop of the Hindustani Church, who was given to criticising his guests behind their backs. When the Bishop threw a big dinner party in Landour, Ranjit had made up his mind to quit his job. As the entourage entered the dining room, they found Ranjit comfortably ensconced at the head of the table. 

‘Out! Out!’ yelled the Bishop, pointing to the door. 

‘You out! Out yourself!’ replied Ranjit calm, and proceeded to tell the guests what their genial host actually thought of them!’

গোটা বইটা এরকম গল্প নিয়ে হলেই ভালো হত না? কিন্তু দোষ আমারই, বইয়ের বর্ণনায় কোথাও লেখা ছিল না দ্য ল্যান্ডোর স্টোরিবুকঃ ওভার হান্ড্রেড ইয়ারস অফ হিলসাইড স্টোরিস। অগত্যা আমি রেসিপি পড়তে শুরু করলাম।

রেসিপির বই যে গল্পের মতো পড়া যায় না তা নয়। লীলা মজুমদারের লেখা রান্নার বই আমি শুরু থেকে শেষ, শেষ থেকে শুরু বার পঞ্চাশেক পড়েছি। কিন্তু সে প্রথমত, লীলা মজুমদারের লেখা, দ্বিতীয়ত, বাংলা রেসিপির বই। ‘ডাল ফেলা’ আমি কোনওদিন রাঁধি না রাঁধি, ব্যাপারটা সম্পর্কে আমার তবু একটা কৌতূহল আছে। মার্শমেলো পুডিং আ লা স্ট্যানলি-র মার্শমেলো এবং স্ট্যানলি, দুজনের প্রতিই আমি সমান নির্বিকার। এ বইয়ের রেসিপিগুলো একেবারেই রেসিপির ঢঙে লেখা। (সেকেলে ঢঙে। উপকরণ এবং প্রণালী। গ্যাস হাই-তে রাখতে হবে না সিমে, আভেন প্রিহিট করতে হবে না উলের কাঁটা ফুটিয়ে দেখতে হবে, এসব লেখা নেই। এসব রাঁধুনির কমন সেন্সের ওপর ছেড়ে রাখা হয়েছে।) রেসিপির সঙ্গে কোনও গল্প জুড়ে নেই। 

একেবারেই কি নেই? রেসিপির ডানদিকের মাথায় ছোট ছোট অক্ষরে রেসিপির উৎসের নাম লেখা আছে। মিস ড্রামন্ড, ই এল মুডি, এলমা হিল। মিস বার্জেস পাঠিয়েছেন ‘গুড প্লেন কেক’। নাম শুনেই ভরসা হয়। মিস বার্জেসের কেক এবং মিস বার্জেসের প্রতিও। কেন যেন মনে হয় কেকের নামের সঙ্গে মিস বার্জেসের স্বভাবেরও মিল থাকবে। থাকতেই হবে। এলমা হিল, কল্পনায় দেখি, ছিপছিপে চটপটে একজন মানুষ, রেসিপি দিয়েছেন কুইক কেকের। উপকরণের নিচে লেখা, মিক্স অল দ্য ইনগ্রেডিয়েন্টস ইন আ বোল অ্যান্ড বিট ফর থ্রি মিনিটস। বেক ফর থার্টি ফাইভ টু ফর্টি মিনিটস। ব্যস? ব্যস। এলমা হিল কাঁধ ঝাঁকাচ্ছেন। আবার কী? অতৃপ্ত পাঠকরা, ফুড ব্লগ পড়ে পড়ে/দেখে দেখে যাদের অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে তারা বলছে, “আর কিছু টিপস দিন মিস হিল। কেকটা কীভাবে সাজাতে হবে? জানালার কোন ধারে রেখে ছবি তুললে বেটার আসবে? যারা ডায়েটিং করছে অথচ নোলা কমাতে পারছে না, তাদের জন্য এনি সাবস্টিটিউটস? আচ্ছা আপনি যে লিখেছেন বিট ফর থ্রি মিনিটস, এই বিটিং কি ধীরে ধীরে না জোরে জোরে? বিটিং-এর গতির ওপর কি সময়সীমা বাড়বে কমবে? আচ্ছা, ড্রাই ইনগ্রেডিয়েন্টস আর ওয়েট ইনগ্রেডিয়েন্টস আলাদা আলাদা, খেপে খেপে মেশালে কি কেক আরও ভালো হবে? আরও ফ্লাফি? আরও সফট?”

এমিলি হিল মাথা ঝাঁকাচ্ছেন। ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।  অবশেষে তিনি জুড়ে দিচ্ছেন নোটঃ ইফ দ্য ইনগ্রেডিয়েন্টস আর অ্যাডেড সেপারেটলি, দিস কেক উইল ফেল।

এই সব গল্প কল্পনা করে নিলে ল্যান্ডোর কুকবুকের শুরুর চোদ্দ পাতার মতো বাকি দুশো ছত্রিশ পাতাও পড়তে সমান ভালো লাগতে পারে।


May 27, 2017

কেটলি ও কপোলকল্পনা



এখনও সবকিছু শান্ত, ফ্যানের ঘরঘর আর বাড়িওয়ালার পাম্পের আওয়াজ (আর আমার টাইপিং-এর খটাখট) ছাড়া চারদিক শব্দহীন। অর্চিষ্মান ঘুমোচ্ছে। আমার ভোরের কোটা দু’কাপ চা হয়ে গেছে, ও উঠলে ওর সঙ্গে আরেক কাপ খাব। মিনিটকুড়ি আবোলতাবোল আড্ডা দেব, ব্যস। তারপর একটা দক্ষযজ্ঞ বেধে যাবে।  

আজ আমাদের বাড়ি গোছানোর দিন। অনেকদিন আগেই এই দিনটা আসা উচিত ছিল। করছি করব বলে ঠেলে রেখেছি। আর ঠেলব না। সারা সপ্তাহ ধরে নিজেদের প্রস্তুত করেছি। চ্যাটবাক্সে গানের লিংক চালাচালি করার আগেপিছে মনে করিয়েছি, "মনে আছে তো? এই উইকএন্ডেই কিন্তু… "

প্রথমে হাত দেব ওয়ার্ডরোবে। টান মেরে জামাকাপড়গুলো ফেলব। অফিসে যাওয়ার দুটো জামা থাকবে, বাড়িতে পরার দুটো। বালিশ, গদি সরিয়ে খাটের গহ্বরের হাঁ খুলব। তিনটে সুটকেস, পাঁচটা লেপ, সাতটা বালিশ, সতেরোটা বিছানার চাদর। হ্যাঁচকাটানে ড্রয়ার খুলব একে একে। কান ধরে ধরে সামনে আনব ঘাপটি মেরে থাকা যত বিল, রসিদ, পুরোনো ডায়রি। দুমদুম পা ফেলে যাব রান্নাঘরে। সংসারে দুটো লোক। তাদের ছ’টা থালা, তেরোটা বাটি, পনেরোটা চায়ের কাপ। আজকের পর আর থাকবে না। নেক্সট, ফ্রিজ। ফ্রিজের দরজায় যে সব সরুমোটা সাদাকালো শিশিবোতলেরা এক্সপায়ারি ডেটের অপেক্ষায়, কিংবা ডেট পার করে হাসিহাসি মুখে বসে আছেন, তাঁদের ফেলব। ঝাঁট দেওয়ার নামে গায়ে জ্বর, অথচ বারান্দার কোণে পাঁচ রকমের ঝাঁটা জমেছে। একটা লম্বা, একটা বেঁটে, একটার মাথায় মোরগের মতো ঝুঁটি, একটার গায়ে মেঘের মতো তুলো। সব ঝেঁটিয়ে বিদেয় করব। বার সাবান শেষ কবে মেখেছি মনে নেই, এদিকে বাথরুমের আয়নাবাক্সে একটা সবুজ, একটা গোলাপি, একটা নীল সাবানকেস। সব যাবে আজ প্লাস্টিকবন্ধ হয়ে কুড়ার ভাণ্ডে।

কিংবা যাবে না। মন চাইবে। মাথা বলবে ফেলে দাও, গত চার বছর যে শাড়িটা পরোনি, সেটা নেক্সট চল্লিশেও পরবে না। গত চার বছর যে হার লকারে রয়ে গেছে, সেটা নেক্সট চল্লিশও লকারে থাকবে। মাঝখান থেকে গচ্চা যাবে কিছু লকারের ভাড়া। আর সে হার বানাতে যা গেছে তা তো গেছেই। সে দুঃখের কথা আর না মনে করাই ভালো। মাথাকে চুপ করিয়ে শাড়ি আবার ধীরে ধীরে বাক্সে নামিয়ে রাখব। হয়তো এ বাক্সের বদলে অন্য বাক্সে। তাও একটু ফাঁকা লাগছে, না গো? নিজের মনকে চোখ ঠারাতে না পেরে একে অপরের চোখ ধার নেব। আবার রসিদগুলো ভাঁজ করে রাখব গুছিয়ে ড্রয়ারে। যদি লাগে। 

আর তারপর দু’কাপ চা নিয়ে বসব দুজনে যে যার ল্যাপটপ কোলে নিয়ে। অর্চিষ্মান কী ভাববে বা আদৌ কিছু ভাববে কি না জানি না, আমার ভাবনা স্ক্রিন থেক উঠে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াবে। আলমারির পাল্লা খুলে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। বন্ধ ড্রয়ারের হাতলে হাত বোলাবে। ভাববে, যদি পারতাম। সব টান মেরে ফেলে দিতে। 

কেমন হত? ওয়ার্ডরোব খাঁ খাঁ, ড্রয়ার ঢুঁ ঢুঁ, খাট নেই, গাদাগুচ্ছের চেয়ার নেই, চোদ্দ বাই বারো ফুট ঘরে আছে শুধু কটা বুককেস, কয়েকটা বই, কয়েকটা ছবি, আর কয়েকটা গাছ। হালকা হালকা, কী হালকা। গোটা বাড়িটা যেন ভাসছে হাওয়ায়, পর্দাগুলো দুলছে। মাঝে মাঝে মেলা গ্রাউন্ডের দিক থেকে হাওয়ার একেকটা ঝাপটা আসছে, বুককেসের হালকা বইগুলো খসে পড়ছে টুপটাপ, দেওয়ালে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসা আমরা দুজন হেলে যাচ্ছি, বাঁদিকে কিংবা ডানদিকে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছি। ভয় লাগছে না একটুও, যেন খুব শান্ত ভদ্র একটা নাগরদোলায় চেপেছি। চারদিক নিঝুম, খালি রান্নাঘরে চায়ের কেটলির জল ফুটছে গব গব করে।

*****

বাই দ্য ওয়ে, আমাদের বর্তমান ইলেকট্রিক কেটলি অবশেষে দেহ রেখেছে। বা রাখব রাখব করছে।  দু’হাজার বারোতে যখন এ বাড়িতে নতুন এসেছিলাম, বা অর্চিষ্মান এসেছিল বলা উচিত, যখন বাড়িটা আমার স্বপ্নের মতো হালকা ছিল, এমনকি স্বপ্নের থেকেও বেশি, কারণ বই, গাছ, ছবিও ছিল না - তখন এই কেটলিটা ছিল। বছরদেড়েক পর যখন আই ব্লক থেকে আরেক দফা খাট বুককেস, টিভি নিয়ে আমি এলাম আর তারও একমাস পর কলকাতা থেকে সুটকেসভর্তি শাড়ি, শার্টপ্যান্টের পিস বেডকভার, বই, চায়ের সেট আর অস্বচ্ছ প্লাস্টিকের বাক্সভর্তি গাদা গাদা মুখে মাখার ক্রিম, পাউডার, পারফিউম নিয়ে আমরা দুজনে এলাম, তখনও ছিল। ওই যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে বসে আমরা এই কেটলি থেকেই জল ঢেলে দু’কাপ চা খেয়েছিলাম। আর সাহস পেয়েছিলাম, বন্ধ সুটকেস ডিঙিয়ে দরজায় তালা মেরে সিনেমাহলে চলে যাওয়ার। এই কেটলির ঢাকনিতে একটা চিড় আছে, আমার সিপ্রালেক্সবিহীন কোনও মুহূর্তের অবদান। ওই একই মুহূর্তে ঢাকনাটা বাকি শরীর থেকে খুলে এসেছিল। এখন কাত করে জল ঢালতে গেলে মাঝে মাঝে ঢাকনাটা খুলে কাপের ওপর পড়ে। আর লিটারখানেক ফুটন্ত জল হাতের ওপর। সাবধানে চলা যায়, চলছিও প্রায় বছরখানেক ধরে। কিন্তু অফিসে যাওয়ার আগের মুহূর্তে কিংবা ফেরার পরমুহূর্তে সাবধানতার ওপর ভরসা করা যায় না, তখন একটা কেলেংকারি ঘটতে পারে, ঘটবেই যে কোনও দিন।

এই সব ভেবেটেবে আমরা নতুন কেটলি কিনেই আনলাম। কতরকমের কেটলি পাওয়া যায় আজকাল বাজারে, লাল নীল হলুদ, কতরকমের এক্সট্রা ফিচার। কোনও রকম পরীক্ষানিরীক্ষায় যাইনি আমরা, কারণ কেটলি আমাদের কাছে ফ্যান্সি গ্যাজেট নয়, বাঁচামরা। আমরা সেই ট্রায়েড অ্যান্ড টেস্টেড ব্র্যান্ডের, কালো প্লাস্টিক আর স্টিল মেশানো বডি, খাটো তারওয়ালা, এক লিটারের মডেল কিনেছি। প্রথম যখন কাঁচি দিয়ে পিচবোর্ডের বাক্স কেটে, সেলোটেপ আর বাবলর‍্যাপ খুলে কেটলিটা বার করলাম, বুক ধড়াস করে উঠল, এতটুকু! আগেরটা কি তবে দেড় বা দু’লিটারের ছিল? নির্ঘাত। মনটা দমে গিয়েছিল নিমেষে। কেটলি হাতে  রান্নাঘরের দিকে হাঁটার পনেরো পায়ে কতকিছু মনে এল। ফেরৎ দেব? ফেরৎ দিতে গেলে কত ঝামেলা করতে হবে? নাকি যা পেয়েছি তাতেই কাজ চালিয়ে যাব? জলের সংকুলান হলে, বার বার উঠে কেটলিতে জল ভরতে হলে চা খাওয়ার ঘটা কিছু কমতে পারে, হয়তো। 

রান্নাঘরে পৌঁছে পুরোনো কেটলিটার গায়ে নতুন কেটলি লাগিয়ে দেখলাম, অবিকল এক। মাথার ওপর বসিয়ে দেখলাম, বেড় এক্স্যাক্টলি সমান। পাশাপাশি রেখে হাঁটুতে ভর দিয়ে চোখ খুব সামনে নিয়ে গিয়ে মাপলাম, জল ঢালার জন্য ঠোঁটের মতো অংশটা এক, এমনকি ঠোঁটের নিচে যে ফুটো ফুটো মতো করা আছে, সম্ভবত বাষ্প বেরোনোর জন্য, তার সংখ্যাও কাঁটায় কাঁটায় সমান সমান। 

অথচ পুরোনো কেটলিটার পাশে নতুনটাকে কী খেলনাসুলভ দেখাচ্ছে। যেন চাসুড়ের রান্নাঘরে নয়, কোনও শখের চাপ্রেমীর ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখার জন্য বানানো। অথচ এত মাপামাপির পর সন্দেহের কোনও জায়গাই নেই যে দুজনে আসলে এক ও অবিকল। তবে? খানিকক্ষণ ভেবে অবশেষে এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে আসলে ব্যবহার এবং উপযোগিতা, জিনিসকে (মানুষকেও হয়তো) একটা আলাদা মহত্ব দেয়। এই কেটলিতেও যখন জল ভরব, সুইচ অন করব, রক্তচক্ষু জ্বেলে কেটলি গরম হতে শুরু করবে, শোঁ শোঁ শব্দ ক্রমে টগবগটগবগ, একদল বন্য ঘোড়া যেন কেটলি ফাটিয়ে বেরোনোর উপক্রম করবে, তাদের ক্ষুরের ধুলো আর নিঃশ্বাসের আগুনের আঁচ বেরোবে কেটলির গা দিয়ে, থরথর করে কাঁপবে কেটলি, আর তারপর তা থেকে আমরা যে যার কাপে ঢেলে নেব সঞ্জীবনীসুধা, তখন এই চকচকে খেলনাসুলভ কেটলিকেও ততখানিই প্রকাণ্ড আর মহান আর সর্বশক্তিমান দেখাবে, যেমন আমাদের সংসারের প্রথম কেটলিকে দেখাত এতদিন। 


May 23, 2017

টাফিদের আড্ডায়



সে মেধা নেই, সে নোবেল নেই, সে সি পি এম নেই, এমনকি সে আড্ডাও নেই। নেই নেই আর্তনাদ ছাড়া আর কিছু নেই বাঙালির। আড্ডার না থাকাটা সবথেকে বড় আফসোস। নোবেল, জ্ঞানপীঠ, ম্যাগসেসে, পলিটব্যুরোর সদস্যপদ, বসের পিঠচাপড়ানি, ফর্সা + রবীন্দ্রসংগীত জানা বউ, অ্যামেরিকার স্কলারশিপ, বাঙালি যতটুকু যা পেয়েছে, সব নাকি আড্ডা মেরেই পেয়েছে। অমর্ত্য সেন শান্তিনিকেতনের মাঠে আড্ডা দিতেন, তবে না অক্সফোর্ড কেম্ব্রিজ হার্ভার্ড, শান্তিদেব ঘোষ আর সুচিত্রা মিত্র কালোদার দোকানে বসে আড্ডা দিতেন, তবে না গলায় অমন দাপট। ছ’নম্বর প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটের আড্ডার দৌলতেই না যত আনন্দ, রবীন্দ্র, সাহিত্য অ্যাকাডেমি, জ্ঞানপীঠ। 

তবে একেবারে কি নেই? আছে এদিকসেদিক ঘাপটি মেরে। আমাদের বাড়ির সামনেই একটা আছে। বিশুদ্ধ বাঙালি আড্ডা। ওই যে মোড়ের মাথায় বাড়ির (যার নেমপ্লেটে সারিসারি নাম আর প্রতিটি নামের পাশে নামের থেকেও বেশি জায়গা জুড়ে ‘আই আই টি’ লেখা), তার সামনের কংক্রিটের ঢালু হওয়া অংশটুকুতে আর রাস্তার ওপারে জমে ওঠা বালির পাহাড়ে ভাগ ভাগ হয়ে আড্ডা বসে। কখনও কখনও আড্ডা তর্কের আকার নেয়, তার চিৎকার পাঁচশো মিটার দূরের আমার এই ভাড়াবাড়ির দোতলাতেও পৌঁছোয়। মাঝে মাঝে খুব কৌতূহল হয় গিয়ে দেখি। কিন্তু সে আড্ডায় আমার প্রবেশাধিকার নেই।

টাফির আছে। টাফি আমাকে মোটামুটি নেকনজরে দেখে, ওর থেকে মাঝে মাঝে আড্ডার খবরাখবর পাই। রাজনীতির খবর বেশি দেয়টেয় না, বলে, “তুমি ওসব বুঝবে না।” সামাজিক ইস্যু হলে মুড ভালো থাকলে, গরম কম থাকলে, মাঝেসাঝে বলে। 

গত সপ্তাহে দুদিন হঠাৎ মেঘলা হল (এ সপ্তাহে ছেচল্লিশ ছোঁবে, তারই আগাম সান্ত্বনা সম্ভবত), বৃষ্টির ছাঁট পাওয়ার আশায় জানালা খুলে রেখেছিলাম, চেঁচামেচি শুনতে পেলাম স্পষ্ট। খানিকক্ষণ পর জানালা দিয়ে লাফ মেরে ঢুকে, খাটে উঠে, সারা গা ভালো করে ঝাঁকিয়ে আমার বেডকভার ভিজিয়ে, আমার চায়ের কাপ থেকে চুকচুক করে খানিকটা চা খেয়ে মুখব্যাদান করে (ভদ্রলোকের মতো দুধচিনি দেওয়া চা খাও না কেন বল দেখি?) আরাম করে বসে টাফি বলল, “আড্ডা খুব জমেছিল আজ।” আমি বললাম, “শুনে তো তাই মনে হল। কী নিয়ে লেগেছিল?”

টাফি ততক্ষণে পকেট থেকে ফোন বার করেছে। দু’চারবার ওপরনিচে স্ক্রোল করে, দুচারজনের পোস্টে লাইক আর লাভসাইন মেরে, মুচকি হাসতে হাসতে নিজের স্টেটাস আপডেট দিল। যদিও ভদ্রতাবিরোধী, তবু উঁকি মেরে দেখলাম টাফি লিখেছে, #চিলিংউইডচা। টাফির প্রোফাইল পিকচারটা আমারই তোলা। আমারই বারান্দায়, আমারই কারিগাছের টবে হেলান দিয়ে, কালো সানগ্লাস পরে, জিভ বার করে, থাবা উঁচিয়ে রক সাইন দেখিয়ে টাফি দাঁড়িয়ে আছে। 

অবশেষে ফোন নামিয়ে রেখে টাফি বলল, “হ্যাঁ, কী বলছিলে?”

“তর্কটা কী নিয়ে লেগেছিল?”

“বাংলা।”

আমি ভুরু কোঁচকালাম। নিজের ফোন তুলে একবার ক্যালেন্ডার চেক করতে যাচ্ছি, টাফি হাই তুলে বলল, “না না, এটা ফেব্রুয়ারি মাসও নয়, আজ একুশ তারিখও নয়।” বলে চিত হয়ে চার পা আকাশে তুলে শুলো।  

আমি ইশারা বুঝে ওর নরম সাদা পেটটা চুলকোতে লাগলাম। টাফি লাল জিভটা অল্প বার করে, চোখ বুজল।

আমি বললাম, “তবে?”

টাফি বলল, “গ্লোবাল ওয়ার্মিং চলছে জান না? সিজন ব্যাপারটাই উঠে গেছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি হচ্ছে না, ডিসেম্বরে শীত পড়ছে না, বাংলা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে ফেব্রুয়ারির কী দরকার।”

তা বটে। 

আমার মুখ দেখে টাফির দয়া হল বোধহয়। দু’কথায় আমাকে ধরতাই দিয়ে দিল। এবার থেকে রাজ্যের সব স্কুলে বাংলা পড়া আবশ্যিক। 

নাঃ, তর্ক লাগার মতোই বিষয় বটে। আমি বললাম, “শুনি শুনি, কারা সমর্থন করল, আর কারা বলল চলবে না?”

টাফি থাবা দিয়ে পেটের একটা অংশ নির্দেশ করে বলল, “এ কি তোমাদের শহরতলি ইশকুলের বিতর্কসভা পেয়েছ, যে দিদিমণি বলে দিলেন সভার মত হল এই, বাংলা বাধ্যতামূলক, এবার একদল তেলচিটে বিনুনি বাঁধা মেয়ে কোমরে আঁচল কষে সভার পক্ষে বলবে, আরেকদল তেলচিটে বিনুনি বাঁধা মেয়ে বিপক্ষে? এখন ওসব পক্ষে বিপক্ষে হয় না। এখন মতামতের স্পেকট্রাম। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে থেকে শুরু করে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তার মাঝে কত অ্যাংগেলে ঘোরে, কত স্পিড, ঘোরা ভালো না খারাপ, ডানদিকে ঘোরে না বাঁদিকে, ক্লকওয়াইজ ঘোরে না অ্যান্টিক্লকওয়াইজ ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ে বিবিধ লোকে মত প্রকাশ করে।” 

তেলচিটে বিনুনির খোঁচাটা আমার ভালো লাগল না। আমি হাত সরিয়ে নিয়ে বললাম, “ওহ, তা তোমার শহুরে পরিশীলিত বন্ধুরা কে কী বলল শুনি?”

টাফিও বুঝেছিল, খোঁচাটা একটু বেশি ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। গা ঘেঁষে, আমার গালটা একবার চেটে দিয়ে গল্প শুরু করল। 

“শুরুতে যে চিৎকারটা শুনেছ সেটা মোস্ট প্রব্যাবলি লাল্টুবিল্টুর দলের। তখনও বেশি লোক জমেনি। ওরাই লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে শার্ট উড়িয়ে উল্লাস করছিল। না না, বাংলার জন্য নয়। বাঙালির জন্যও নয়। রাজ্যে, মেনলি কলকাতায় থাকা মেড়ো আর খোট্টাগুলো যে কেস খাবে, এইটাই এই দলের উল্লাসের মূল কারণ।"

"তারপর গুটিগুটি আরও অনেকে এসে জড়ো হল। এরা লাল্টুবিল্টুর থেকে আরেকটু বুঝদার।” 

আমি বললাম, “কী রকম?”

“এরা প্রমাণ ছাড়া তর্ক করে না। মুশকিল হল, বেশিরভাগেরই প্রমাণ স্বয়ং নিজে। নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতা দিয়ে জগতের উচিতঅনুচিত ভালোমন্দ প্রমাণ হবে। যেমন ধরো ওই মোড়ের বাড়ির কালোটা।”

আমি বললাম, “কালো কোথায়, কানের কাছে একটু সাদা ছোপ আছে তো।”

টাফি নাক দিয়ে ভুক করে একটা শব্দ করল (অনেকটা আমাদের ধুস-এর মতো শুনতে), “আমার মতো সর্বাঙ্গ ধপধপে সাদা তো নয়, ওদের আমি কালোই বলি।”

টাফির বর্ণবিদ্বেষ আমার পছন্দ নয়, কিন্তু এখন ওসব পয়েন্ট আউট করতে গেলে গল্প মাটি হয়, কাজেই কিছু বললাম না। 

বললাম, “কী বলল, কালোটা?”

“খুব চোখটোখ ঘুরিয়ে বলল, ‘কই আমি তো আজীবন ইংরিজি মিডিয়ামের ডাস্টবিনের আশেপাশে ঘুরেছি, আমার চোদ্দ পুরুষের কেউ কখনও বাংলা মিডিয়ামের দারোয়ানের লাঠির বাড়ি খাওয়া তো দুরে থাক, ছায়া পর্যন্ত পাড়ায়নি। তা বলে কি আমরা বাংলা বলতে শিখিনি?’ এই বলে বালির পাহাড়ে উঠে বুক চিতিয়ে ‘এসেছে শরৎ হিমের পরশ’ গোটাটা আবৃত্তি করে শুনিয়ে দিল।

“এই ভর জ্যৈষ্ঠ মাসে?”

“বিউটিপার্লারের দোতলার টমিটাপেন্সও কালোটাকে সাপোর্ট করল।” 

আমি বললাম, “এরা আবার কারা?” 

টাফি বলল, “কেন তুমি যখন অফিসে যাও পাশাপাশি গলায় বকলস বেঁধে দুজন বেরোয় দেখোনি? সোনালি ঝুপো ঝুপো লোম…”

“ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝেছি। তা এঁরা কি গোয়েন্দাটোয়েন্দা নাকি?”

টাফি তেরিয়া হয়ে বলল, “তোমাকেও তাই বলেছে বুঝি? !@#৳ মিথ্যেবাদী কোথাকার!”

আমি কানে আঙুল দিয়ে বললাম, “না না, ওঁরা কিছু বলেননি, আমি এমনিই আন্দাজ করলাম।”

টাফি বলল, “আরে ওরা সবাইকে বলে বেড়ায় ওরা নাকি সিক্রেট সার্ভিসে ছিল, আপাতত রিটায়ার্ড। যত সব গুলতাপ্পি। জন্মে থেকে দেখছি সকালবিকেল একনম্বর পর্যন্ত জিভ বার করে হাঁপাতে হাঁপাতে যায়, আর হাঁপাতে হাঁপাতে ফেরে। বাকি সময় বারান্দায় বসে ঝিমোয়। সিক্রেট সার্ভিস না হাতি।”

আমি বললাম, “ওদের গোটা তিনেক ছানা আছে না? গলায় ওয়াটার বটল ঝুলিয়ে বাড়ির সামনে স্কুলবাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে? ভীষণ মজার।” 

“মজার?” টাফি চোখ কপালে তুলল। “একেকটা একেক পিস। দু’নম্বরের শনিমন্দিরের মেঝেতে পুঁতলে একনম্বরের কালীমন্দিরের মেঝে ফুঁড়ে বেরোবে। আমাকে দেখলেই ‘টাফি, তোর গোদা পায়ে লাথি’ ছড়া কাটে আর মুখ ভেংচায়।”

আমি হাসি চেপে বললাম, “কী বলল টমিটাপেন্স?”

“টমি বলল, ‘আমরাও তো ছেলেপুলেকে ইংরিজি ইশকুলে দিয়েছি, না হয় এখন রাইমস ছাড়া আর কিছু দাঁতে কাটছে না, তা বলে কি আমার ছেলেমেয়ে বাংলা শিখবে না? এই যে আমি প্রতিবছর বইমেলা গিয়ে চুন চুন কে বাংলা সাহিত্যের মণিমুক্তো কুড়িয়ে আনছি, যত্ন করে জমাচ্ছি বুকশেলফে, সুকুমার রায় টু সতীনাথ ভাদুড়ী, রাইমসের চাপ একটু কমলে কি বাচ্চারা সেগুলো পড়বে না?’

টাপেন্স বলল, ‘আর তাছাড়া নাচের ইশকুলে তো এই বছরেও ঋতুরঙ্গ করেছে আর ড্রামা স্কুলে অবাক জলপান। আবার কত চাই? যত্ত সব।’”

আমি বললাম, “তা বটে।” 

টাফির গল্পের মুড এসে গিয়েছিল। “এই সব হতে হতে মাছের বাজারের দিক থেকে বাদামি দুটো নেড়ি এসে হাজির। একটা বেশ নাদুসনুদুস, অন্যটার অর্ধেক লোম উঠে গেছে। ওটা বেশি কথা বলে না, চুপচাপ থাকে। নাদুসনুদুসটাকে দেখেছ বোধহয়, পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ, পনেরোই আগস্টে প্রভাতফেরি লিড করে। গলায় সুর নেই বিশেষ, দরদ দিয়ে মেকআপ দেয়।”

মাথা নাড়লাম। দেখেছি। বা শুনেছি বলা ভালো। 

“নাদুসনুদুস খুব দৌড়ে এসে, জিভ বার করে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘বন্ধুগণ ব্রেকিং নিউজ, এখন থেকে বাংলা বাধ্যতামূলক।’

শুনে সবাই হাই তুলে, তুড়ি বাজিয়ে, পাশ ফিরে শুল। নাদুসনুদুস বলল, ‘ওহ, সেই নিয়েই কথা হচ্ছে বুঝি? দারুণ হয়েছে, এতদিনে একটা কাজের মতো কাজ হয়েছে, জয়ব্বাংলা।’ 

টাপেন্স মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘আমাদের ছেলেপুলেরা তো আর মাছের বাজারে চুরি করে লাইফ কাটাবে না। আমাদের ছেলেপুলে রেসপেক্টেবল অফিসে রেসপেক্টেবল চাকরি করবে। তাদের ইংরিজি শেখা মাস্ট।’

টাপেন্স যদিও কথাটা আকাশের দিকে নাক তুলে বলেছিল, সকলেই বুঝেছে কাকে উদ্দেশ্য করে বলা। নাদুসনুদুস তেরিয়া হয়ে বলল, ‘বাংলা পড়লে ইংরিজি শেখা যায় না কে বলল? আমার ঠাকুরদা বাংলা পড়ে রায়চৌধুরী খেতাব পেয়েছিলেন, আমার মাসতুতো দাদার পিসতুতো বোন বাংলা ইশকুলে পড়ে বিলেতে পি এইচ ডি করছে, আমিও তো ইতিহাস ভূগোল অংক ইংরিজি সব বাংলাতেই পড়েছি, তা বলে কি ইংরিজি বলতে পারি না? এ বি সি ডি ই এফ জি এইচ, ক্যাট ব্যাট ম্যাট ফাক শিট। কে বলে বাংলা পড়লে ইংরিজি শেখা যায় না?’

“স্যার জেমস এর মধ্যে কখন সফল-এর সামনে থেকে গুটি গুটি এসে আড্ডায় যোগ দিয়েছে কেউ খেয়ালই করেনি। স্যার জেমসকে চেনো তো?” 

চিনি। সারাজীবন বিলেতে কাটিয়ে এ পাড়ায় নতুন এসেছেন। সাহেবি চেহারা, সাহেবি হাবভাব। সুট প্যান্ট বোলার হ্যাট পরে ঘোরেন। ইংরিজি ছাড়া কথা বলেন না, 'সিট'-এর বদলে ‘বোসো’ বললে দাঁড়িয়ে থাকেন। 

“ঠিক ধরেছ। ওটাই। স্যার জেমস থাবা মুখের কাছে এনে গলা খাঁকারি দিল। টমিটাপেন্স উঠে দাঁড়িয়ে বাও করল, নাদুসনুদুস মুখ বেঁকিয়ে ঘাড়টা অন্যদিকে ঘোরালো, কিন্তু কানদুটো খাড়া করে রইল। 

সব উশখুশ থামলে গলা খাঁকারি দিয়ে হ্যাটপরা মাথাটা যথাসম্ভব উঁচু করে উদাত্ত কণ্ঠে স্যার জেমস বলল, “ফ্রেন্ডস, রোমানস, কান্ট্রিমেন। আমি বয়সে বুড়ো কিন্তু হাবেভাবে নবীন। আমার সমসাময়িকরা যখন ধর্মগ্রন্থ বগলে বাণপ্রস্থে গেছে তখন আমি বালখিল্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্মার্টফোনে টাইপ করা শিখেছি। আমার এ বিষয়ে কিছু বলার আছে।’

“আমি অমনি কচুগাছের আড়াল থেকে বলেছি, ‘সে আপনার কোন বিষয়ে কিছু না বলার থাকে দাদু?’” টাফি ফ্যাচফ্যাচ করে হাসছে।

আমি বললাম, “তুমি কোনদিন মারধোর খাবে। স্যার জেমস রাগলেন না?”

টাফি বলল, “রাগবে না আবার। রেগেকেঁপে একশা। একেবারে ছাদের সমান লাফ দিয়ে উঠে বলছে, ‘কে কে কে? কে বলল এসব, সবক’টাকে কান ধরে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বার করে দেব।’”

“তারপর?”

“তারপর আবার কী। সবাই হাতেপায়ে ধরে ঠাণ্ডা করল। ছেড়ে দিন দাদা, ইগনোর করুন, হেটারদের পাত্তা দেবেন না, আমাদের কথা ভেবে বক্তৃতা চালিয়ে যান। দুয়েকজন বলল, ‘ফেক প্রোফাইল, রিপোর্ট করে এলুম।’ অমনি একযোগে রোল উঠল, ‘রিপোর্টেড, রিপোর্টেড।’” 

“আবার গলা খাঁকরানি, আবার ফ্রেন্ডস অ্যান্ড রোমানস আর হ্যানাত্যানা শেষ করে স্যার জেমস আসল কথায় এল। এই কথাগুলোও নতুন কিছু নয়, সকলেই শুনেছে আগে। 'আপনারা সকলেই জানেন, যাঁরা জানেন না তাঁদের অবগতির জন্য জানাই, আমি আজীবন বিলেতে কাটিয়েছি। এখন এই আই আই টি মোড়ে আপনাদের নেতৃত্ব দিচ্ছি বলে ভাববেন না আমি আপনাদের লোক। আমি মনেপ্রাণে বিলিতি। এখনও আমার ফ্যামিলি বিলেতে থাকে, আমার নাতিরা তো ওখানেই জন্মেছে। ভাবুন একবার। বিলিতি নাতি। কই তারা তো বাংলা পড়ছে না। তা বলে কি তারা বছর বছর পুজো ফাংশানে “যদি কুমড়োপটাশ নাচে” আবৃত্তি করছে না? এনকোর পাচ্ছে না? তবে আমার নাতিরা, বিলেতে জন্মেছে বলেই বোধহয়, দারুণ শার্প। আপনাদের নাতি হলে কে জানে কী করত। ইন ফ্যাক্ট, তাদের এই পারফরম্যান্সের ভিডিও আমার বাড়িতে তুলে রাখা আছে, আমি প্রস্তাব করছি,’ নাদুসনুদুসের দিকে তাকিয়ে স্যার জেমস বলল, ‘সমিতির আগামী মিটিং-এ সেটা দেখানোর ব্যবস্থা হোক। বাংলা না পড়লে বাংলা সাহিত্যে দিকপাল হওয়া যায় না, এ সর্বৈব অপপ্রচার। আমার বিলিতি নাতিরা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।’

টমিটাপেন্সের বিচ্ছুগুলো ইশকুল থেকে ফিরে বাড়ি না গিয়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল, তাদের একটার গলা থেকে ওয়াটার বটল খুলে নিয়ে চুমুক দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিল স্যার জেমস।

‘আমি যেটা বলতে চাই, আপনাদের কারও ছেলেমেয়ে নাতিপুতি যখন আমার নাতিদের সমকক্ষ হতে পারবে না, কী পড়ানো হবে না হবে, বাংলা না ইংরিজি না হিব্রু, সেটা, পার্ডন মাই অনেস্টি,’ থাবা তুলে আবার গলা খাঁকরালো স্যার জেমস, ‘ইমমেটেরিয়াল, ইররেলেভ্যান্ট। ইশকুলে না পাঠালেও কিছু আসবে যাবে না। আর যদি পাঠাতেই হয়, তাহলে আমার মতে, আমার বিলিতি নাতিদের বিলিতি স্কুলের মহান ঐতিহ্য অনুসরণ করে বাংলা বাধ্যতামূলক করার বদলে, বাংলা ব্যান করা সরকারের পবিত্র কর্তব্য। আমি এসব বিবেচনা করে বাংলা ব্যান করার পিটিশন লিখেই এনেছি, আপনারা যদি ঝামেলা না করে পিটিশনে থাবাছাপ দিয়ে দেন, তাহলেই ল্যাঠা চুকে যায়।’ এই না বলে স্যার জেমস পকেট থেকে একটা পাকানো কাগজ বার করে গলা খাঁকারি দিয়ে পড়তে শুরু করল।

‘হার ম্যাজেস্টি দ্য কুইন…’

এমন সময় সবার চোখ ঘুরে গেল। নাদুসনুদুসের চ্যালা, মার্কেটের লোম ওঠা ঘেয়ো কাঁপতে কাঁপতে স্যার জেমস-এর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক থাবা তুলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে, ‘কোথায় ছাপ দিতে হবে স্যার? আমার মধ্যে পোটেনশিয়াল ছিল, বিশ্বাস করুন স্যার, কেরানি বাবামা কিপটেমো করে বাংলা স্কুলে পাঠিয়েছিল বলে আজ এই দশা।’ ঘেয়োকে দেখে স্যার জেমস রিফ্লেক্সে নাক চাপা দিয়েছিল, এখন আহ্লাদিত হয়ে ‘এখানে এখানে’ বলে পিটিশন নিয়ে এগিয়ে গেল।

সবাই কেমন থতমত খেয়ে গিয়েছিল, প্রথম সম্বিত ফিরল নাদুসনুদুসের। ‘আরে আরে কর কী কর কী’ বলে সে দৌড়ে এল, একটা গোলমাল বাধে দেখে খুশি হয়ে লাল্টুবিল্টুর দল হইহই করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওদিক থেকে টমিটাপেন্স, টমিটাপেন্সের খোকাখুকুর নাচের ক্লাসের, আবৃত্তি ক্লাসের টিচাররা, তাইকোন্ডু ক্লাসের টিচাররা ধেয়ে এল।

“কারা কোন দলের হয়ে লড়ছিল?” আমার কৌতূহল তুঙ্গে।

“কে জানে।” টাফি মুখ ছেতরালো। “অত হট্টগোলে বোঝা যায় নাকি। যদ্দূর মনে পড়ছে নাচগানআবৃত্তির টিচাররা বাংলার ফরে লড়ছিল, আর তাইকোন্ডুর টিচাররা সেভাবে কারও পক্ষ নিচ্ছিল না, যারাই মার খাচ্ছিল, তাদের হয়ে লড়ছিল। ঘেয়োর হয়ে দু’তিনজন খুব ঘুঁষি চালাচ্ছিল দেখলাম।”

শুনে আমার কীরকম রক্ত গরম হয়ে উঠল। বললাম, “তুমি কোথায় ছিলে?”

“আমি আবার কোথায় থাকব, আমি কচুঝোপে বসে চেঁচালাম খানিকক্ষণ, তারপর ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলাম, হেবি মশা। মারামারি তখন তুঙ্গে, চারদিক থেকে ‘ইংরিজি গোল্লায় যাক, বাংলা গোল্লায় যাক, মেড়ো গোল্লায় যাক, খোট্টা গোল্লায় যাক, বাঙালি গোল্লায় যাক’ স্লোগান উঠেছে, আমার কথা কারও মনেই নেই। আমি হাতপা চালালাম এদিকওদিক। যাকে সামনে পেলাম চড়চাপাটি দিলাম, কানটান মুললাম। ঝগড়ার ঝোঁক একটু কমে আসছে দেখলেই, একেকবার একেকজনের কানের কাছে গিয়ে বলছিলাম, ‘ধোর মশাই, আপনি কিসু zানেন না।’ তাতে কাজ দিচ্ছিল খুব।” 

টাফি হাসির চোটে দুবার গড়াগড়ি খেল খাটের ওপর। 

“তারপর সব মহা বোরিং লাগতে লাগল, বৃষ্টিও নেমে গেল, আমি ভাবলাম যাই, তোমার খবর নিয়ে আসি।” 

বৃষ্টি থেমে গিয়ে একটা অসামান্য হলুদ আলো ফুটেছে জানালার বাইরে, সেদিকে তাকিয়ে দুজনে বসে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর একটা প্রশ্ন মনে এল। “এ ব্যাপারে তোমার কী মত?”

টাফির ভুরু কোঁচকাল, “কোন ব্যাপারে?”

“বাংলা বাধ্যতামূলক করা উচিত নাকি উচিত না?”

অনেক পেট চুলকোনোর পর, কানে হাত বোলানোর পর, রাতে কলকাতা বিরিয়ানি হাউসের মাংসের টুকরো খাওয়াব কথা দেওয়ার পর, টাফি অবশেষে নিজের মতটা বলতে রাজি হল। কিন্তু একটা শর্তে। 

"কী?"

"তোমার ওই ব্লগে লিখবে না, খবরদার।"

লিখব না। কথা দিলাম। টাফি সবে আমার কানে ফিসফিস করে নিজের মতটা বলেছে, অমনি মোড়ের মাথা থেকে আবার চিৎকার শুরু হল। 

টাফির কান অমনি খাড়া। “ওই ওই, আরেকটা ডিসকোর্স শুরু হয়েছে।”  

আমি বললাম, “কী নিয়ে?” টাফি বলল, “সে ঘটনাস্থলে না গিয়ে কী করে বুঝব। আমিষ-নিরামিষ হতে পারে, বাংলা-হিন্দি হতে পারে, আস্তিক-নাস্তিক হতে পারে, সাদাপোস্ত-হলুদপোস্ত হতে পারে, সিরাজ-আরসালান হতে পারে। যাই হোক না কেন, আমি ছাড়া জমবে না। তেমন কিছু হলে খবর দেব, বারান্দার দরজাটা খুলে রেখো।”

এক লাফে বারান্দা পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল টাফি। 



May 19, 2017

ল্যান্ডোর ৩/৩




পাহাড়ে গেলে প্রশ্নটা অবধারিত ওঠে। এখানে থেকে যেতে পারবে? এই গুটিকয়েক মানুষ আর অনেক গাছের মধ্যে? ঝিঁঝিঁর ডাক আর প্রজাপতির মধ্যে? আপনি যদি বলেন, থাকা না থাকার ডিসিশন তো ওভাবে নেওয়া যায় না, চাকরি পেতে হবে, তাছাড়া বাড়ির লোক কে কোথায় থাকবে, তারা সঙ্গে থাকতে চাইবে কি না, ছেলেমেয়েদের স্কুল কী হবে, বাবামা কী বলবেন, পাড়াপড়শি কী বলবে, তাহলে উত্তরটা বাস্তবধর্মী এবং বোরিং হবে।

বেড়াতে গিয়ে বোরিং উত্তরের কোনও জায়গা নেই। উত্তর দিতে হবে স্পষ্ট হ্যাঁ কিংবা না-তে। 

আমি সবসময় বলি, পারব। চারদিকে ঝিঁঝিঁ ডাকবে, ঝুপঝুপ বৃষ্টি পড়বে যখনতখন, আমি বারান্দায় বসে চা খাব, বরফি দৌড়ে দৌড়ে প্রজাপতি তাড়াবে, না পারার কী আছে? অর্চিষ্মান সবসময় বলে, না বাবা, আমি পারব না। একদিন ভালো লাগবে, দু’দিন ভালো লাগবে, তিনদিনের দিন ঠিক দু’নম্বর মার্কেটের এগরোলের জন্য মন হু হু করবে। 

আপনি পারবেন, নিরিবিলি পাহাড়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে?

ল্যান্ডোরের লোকেরা শহরের কথা বললে বুঝে নিতে হবে, মুসৌরির কথা হচ্ছে। মুসৌরি থেকে ল্যান্ডোর ওঠা যত কষ্টের, ল্যান্ডোর থেকে মুসৌরি নাম ততই সোজা। নাকবরাবর নেমে যাও। অন্তত মিসেস ভাট্টি তাই বললেন।  উডসাইড থেকে নিচে নামার একটা রাস্তা আছে। পথটা সরু আর জঙ্গলে ঢাকা, তাই চোখে পড়েনি বোধহয়। চা, টোস্ট, প্রকাশের জ্যাম, আর মিসেস ভাট্টির আত্মীয়ের বানানো চিজ দিয়ে প্রাতরাশ সেরে আমরা বেরোলাম। 

বেশ খানিকটা নেমে এসেছি, এমন সময় ওপরে জঙ্গলে কীরকম সব শব্দ হতে লাগল। খসখস, ফোঁস ফোঁস, সাঁই সাঁই।  আমরা ঘাড় ঘুরিয়ে ওপরে তাকালাম। ঘন জঙ্গলের আড়ালে কিছু দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু একটা আলোড়ন বোঝা যাচ্ছে। আলোড়নটা ক্রমে বাড়ছে।  খচমচ, ফোঁস ফোঁস এখন রীতিমত জোরে। পাতার ফাঁক দিয়ে দিয়ে কালো রঙের একটা কী যেন দ্রুত সরছে। 

তারপর একটা গাছের আড়াল থেকে বস্তুটি দৃশ্যমান হল। কালো মুখের হাঁয়ের ভেতর সাদা দাঁতের সারি, লকলকে লাল রঙের জিভ। বাদামি চোখ বিস্ফারিত। ছুটন্ত চার পা যেন মাটি ছুঁচ্ছে না। আমরা হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আশেপাশে কেউ নেই। অনেক নিচে দুটো লোক বসে রাস্তা সারাচ্ছে দেখেছিলাম ওপর থেকে, এখন তাদের সাড়াও পাচ্ছি না। বরফি এত রাগল কেন? মিসেস ভাট্টি ছাতা অফার করেছিলেন, সেটাও তো আমরা আনিনি।  

বরফি শেষ মোড়টা ঘুরেছে। চোখ বন্ধ করার মুহূর্তে দেখতে পেলাম বরফি একটা প্রকাণ্ড লাফ দিয়েছে আমার দিকে।

হাতে একটা ভেজা ভেজা কী ঠেকল। বরফির নাক। চোখ খুলে বরফির চোখে চোখ ফেললাম। সেই বিস্ফারিত দৃষ্টি এখন নরম। বরং খানিকটা নালিশপূর্ণ। কেন আমাকে না নিয়ে নামলে? ওকে ওকে, নো প্রবলেম, ভুল যখন করেই ফেলেছ তখন সরি না বললেও চলবে। চল, আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বরফি ল্যাজ নাড়তে নাড়তে সামনে সামনে চলল। ওর বয়স মোটে দুই হলে কী হবে, আমার বয়স যে সাড়ে ছত্রিশ সে খেয়াল আছে, কাজেই দশ পা এগিয়ে এগিয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাটি শুঁকছে। কান খাড়া করে কী সব শুনছে। উডস্টক স্কুলের মোড়ে এসে আমরা বড় রাস্তায় পড়লাম। বরফির কাজ শেষ। বরফি ওখানেই ঘোরাঘুরি করতে লাগল। আমরা হাঁটা শুরু করলাম। । খুব এলিয়ে হেঁটেও পাহাড়, ঘিঞ্জি ল্যান্ডোর বাজার পেরিয়ে মুসৌরি পৌঁছতে মিনিট পঁয়তাল্লিশের বেশি লাগল না।

মূসৌরিতেও আমাদের যথারীতি কিছু করার নেই। এদিকওদিক উদ্দেশ্যহীন ঘোরা। ম্যালরোড ধরে হাঁটাহাঁটি। আজ শনিবার, তাই গতকালের থেকে ভিড়টা বেশি। লাভলির দোকানে অমলেটপ্রার্থীর ভিড় কালকের প্রায় তিনগুণ। হাঁটতে হাঁটতে রোপওয়ের জায়গাটায় পৌঁছোলাম। রোপওয়ে আছে, আমরাও আছি, সময়ও আছে, কাজেই রোপওয়ে চড়া হল। রোপওয়ে যায় ম্যাল রোড থেকে গান হিলের চুড়ো। ম্যাল রোড থেকে চারশো ফুট উঁচুতে এই গান হিল মুসৌরির অন্যতম উঁচু পিক, যেখান থেকে হিমালয় দেখা যায়। প্রাচীনত্বের গৌরব আছে এই রোপওয়ের, কিন্তু যাত্রাপথটি বিশেষ সুন্দর নয়। পুরোটাই শহরের ওপর দিয়ে। কিছু কিছু জায়গায় তো একেবারে ঘাড়ের ওপর দিয়ে। হোটেলের বারান্দায় ঝাঁট পড়ছে সকাল সকাল, রোপওয়ের জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখছি কালো জলের মধ্যে ভাসছে গুটখার প্যাকেট। 

গান হিলের ওপরটাও একেবারে হট্টমেলা। বন্দুক ছুঁড়ে বেলুন ফাটানো, ঘোড়ারূপী সিটওয়ালা ঘূর্ণি। দু’পা শান্তিতে হাঁটার উপায় নেই,  ইয়ারিং চাহিয়ে? ফোটো চাহিয়ে? অমুক চাহিয়ে? তমুক চাহিয়ে? এক জায়গায় আবার লিখে রেখেছে, ফেসবুক ফোটো পয়েন্ট।

মুসৌরিতে আমাদের একেবারে কোনও কর্মসূচি ছিল না বললে ভুল হবে, একটা কাজ ছিল, সেটা হল খাওয়া। বেশ কয়েকটা দোকান পছন্দ করে রেখেছিলাম, তার মধ্যে লাভলি অমলেট সেন্টার অলরেডি টিক মারা হয়ে গেছে, বাকি লিস্টের প্রথমেই কালসাং।

কালসাং এ তল্লাটের বিখ্যাত দোকান, চেনও বলা যেতে পারে, কারণ দেরাদুনেও আছে কালসাং। রংচঙে দোকান, ম্যাল রোডের একেবারে মোড়ের মাথায়। দোতলায় বসলে ভিউ চমৎকার। শনিবার দুপুরে কালসাং-এ ঠাসাঠাসি ভিড়। একতলায় জায়গা নেই, আমাদের উঠতে হল দোতলায়। 


কালসাং-এ বসে থাকতে দিব্যি লাগছিল। শনিবার হাফছুটি হয়েছে, ম্যাল রোড জুড়ে ইউনিফর্ম পরা স্কুলের ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেভেন্টারসের মিল্কশেক খাচ্ছে, কেভেন্টারস থেকে বোধহয় বেলুনও দিচ্ছিল, সবার হাতে কাঠির ডগায় বাঁধা সাদাকালো বেলুন। একদল এসেছে কালসাং-এও। অর্ডার দিয়েছে তিব্বতি রুটি টিংমো। নরম সাদা ময়দার বলে ফুলে ওঠা টায়ারের মতো বেড়। আর সঙ্গে কী একটা তরকারি/মাংস। আর কোল্ড ড্রিংকস। 

টিংমো দেখলাম আরও অনেকেই নিয়েছেন। আমাদের দুজনের কারওরই জিনিসটা বিশেষ পছন্দ নয়, তাই আমরা অন্য জিনিস নিলাম। 


মাটন মোমো। 


আর পালং শাক দিয়ে পদ্মের ডাঁটা ভাজা। মচৎকার খেতে। অবশ্য এত তেলচপচপে করে ভাজলে সবকিছুই ভালো লাগবে বোধহয়। (মুলো ছাড়া।) 

কালসাং-এর ভিউর মাঝামাঝির নিচের দিকে একটা বইয়ের স্ট্যান্ড দেখছেন? ওটা হচ্ছে কেম্ব্রিজ বুকস্টোর। এই দোকানেই রাস্কিন বন্ড শনিবার বিকেলে বিকেলে দেখা দেন, যাতে লোকজন ঠাণ্ডা থাকে, তাঁর বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া না করে। এত ছোট দোকানে এত বই চট করে দেখিনি আমি। দুই দেওয়ালে বই, মেঝেতে বই, মাথার ওপর বই। চিলতে দোকানের মাঝবরাবর আরেকটা শেলফ উপচে বই। দু’দিকে যে গলির সৃষ্টি হয়েছে তাতে গড়পড়তা অ্যামেরিকান ঢুকতে পারবে না। বেশিরভাগই দেখলাম, ইয়ং অ্যাডাল্ট। অর্থাৎ স্কুলের পড়ুয়াদের টার্গেট করা। আমরা থাকতে থাকতেই স্কুলের বাচ্চারা এসে বইখাতা পেনসিল কিনল। 


দু’নম্বর যে দোকানটায় আমরা খেলাম সেটা হল ক্যাফে বাই দ্য ওয়ে। এদিকেরটা আদালেবুমধু চা। এই চায়ের একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, কোনও কোনও জায়গায় এতে চা দেয়, আবার কোনও কোনও জায়গায় দেয় না। অর্থাৎ, নামে হানি লেমন জিঞ্জার টি হলেও, আসলে গরম জলে আদালেবুমধু। গোয়াতে এই দ্বিতীয় রকমেরটা খেয়েছিলাম, ল্যান্ডোর বেকহাউসও। ক্যাফে বাই  দ্য ওয়ে-তে দেখলাম চা দিয়েছে। অর্চিষ্মান খাচ্ছে গ্রিন অ্যাপেল সোডা। 


এই দোকানে আমরা পরদিন সকালেও বাস ধরার আগে (আর অ্যাভোমিন খাওয়ার পরে) পিৎজা দিয়ে ব্রাঞ্চ সারব। এত ভালো পিৎজা আমি কমই খেয়েছি। 

গাড়ি ধরে ল্যান্ডোর ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। কালই আমাদের ফিরে যাওয়া। ট্রেনের টিকিট নেই। বাসে যেতে হবে মুসৌরি থেকে দেরাদুন, আবার দেরাদুন থেকে দিল্লি। সারাদিন লেগে যাবে। ল্যান্ডোর ছেড়ে যেতে হবে সকাল সকাল। বেড়ানো এখানেই শেষ।

মনখারাপটাকে বাড়তে দিলাম না। সিস্টারস বাজারে নেমে প্রথমেই এক শিশি গুজবেরি জ্যাম, এক শিশি স্ট্রবেরি, এক শিশি পিনাট বাটার কিনলাম। সবগুলো আমরা খাব না। এক শিশি পাবেন বাড়িওয়ালা। আমরা না থাকাকালীন আমাদের গাছে জল দেওয়ার বদান্যতার বিনিময়ে।

তারপর হাঁটতে শুরু করলাম। চারদুকানের উল্টোদিকে। এদিকটায় আসিনি আগে। এখন পিক সিজন। মুসৌরি থিকথিক করছে দেখে এলাম, অথচ এখানে টানা কুড়ি মিনিট হাঁটার পরও একটিও মানুষের দেখা না পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।  অবশেষে উল্টোদিক থেকে এক মহিলাকে আসতে দেখা গেল। নীল সালওয়ার কামিজ, ঘোমটার মতো করে দেওয়া ওড়না। হাতে একটা বিরাট বস্তা কাপড়ের ব্যাগ। মহিলা ঠিক সুবিধে করতে পারছেন না ব্যাগটা নিয়ে, কারণ ভেতরে ভারি কিছু আছে, এবং বেঢপ কিছু। এদিক ওদিক থেকে ফুলে ফেঁপে রয়েছে। মহিলা ব্যাগ এ হাত ও হাত করছেন। একবার ঝোলাচ্ছেন, একবার বুকে জড়াচ্ছেন। ততক্ষণে দুপক্ষই একে অপরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। মহিলার চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমাদের পেরিয়ে যাওয়ার ঠিক মুখে মহিলা থামলেন। রেলিং-এর ওপর ব্যাগ রেখে বেশ করে হ্যান্ডেলদুটোয় গিঁট বাঁধলেন। তারপর চাগিয়ে একেবারে মাথায়। এক হাত দিয়ে ব্যাগ সামলে ধরে আমাদের ক্রস করে গেলেন মহিলা। দশবারো পা গিয়ে আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম। ব্যাগ মাথায় সেট করে গেছে। এখন মহিলার দু’হাতই ফ্রি। আমার নিজের কথা মনে পড়ল। দু’নম্বর মার্কেটের সামনে সন্ধ্যেবেলা যখন নামি, এক কাঁধে ব্যাগ, পিঠে ল্যাপটপ। বাজার করার থাকলে তার সঙ্গে আরেকটা ব্যাগ জোড়ে। বাঁধাকপি নয়তো লাউ, গোটা আষ্টেক টমেটো গড়াগড়ি খাচ্ছে তলায়। এক আঁটি পালং শাক। দু’প্যাকেট কাউ মিল্ক।  কোনওটার সঙ্গে কোনওটার আকৃতিপ্রকৃতিতে কোনও মিল নেই। কেউ কারও সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে না। কাজেই ব্যাগটার আকারের কোনও ছিরিছাঁদ হয়নি। আমি ব্যাগটাকে বুকের কাছে জাপটে ধরে চলেছি। এক, হাতে ঝোলালে বেশি ভারি লাগে, দুই, ভয় লাগে যদি হ্যান্ডেল ছিঁড়ে মাটিতে আলুপটল গড়াগড়ি যায়। অসুবিধেজনক যত না, হিউমিলিয়েটিং তার থেকে বেশি। দামি কুকুরগুলো আবার ঠিক ওই সময় বকলস পরে সান্ধ্যভ্রমণে বেরোয়। যদি এই মহিলার মতো স্মার্ট হতাম, বেশ মাথায় নিয়ে চলা যেত।

দামি কুকুরের কথা ভাবতে ভাবতেই একটা দামি বাড়ি এসে গেল। প্রকাণ্ড বাংলো, গেট, গেটে ট্রেসপাসারস উইল বি প্রসিকিউটেড লিখে রক্ষা হয়নি, আবার একজন সিকিউরিটি গার্ড দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। পরে জগদীশ ভাইসাবের কাছ থেকে কনফার্ম করেছিলাম ওটাই শিল্পপতি সঞ্জয় নারং-এর বাড়ি। এটা নাকি উনি ওঁর জিগরি দোস্ত তেন্ডুলকরের জন্য কিনে রেখেছেন। ঘটনাটা সত্যি হলে তেলা মাথায় তেলের এর থেকে বিকট উদাহরণ আর হয় না। যাই হোক, আমরা সিকিউরিটি ভাইয়ের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে রাস্তাটা পার হয়ে এলাম। ভাইসাব কিছু বললেন না, বলার দরকারও ছিল না, কারণ ততক্ষণে চিৎকার শুরু হয়েছে। চিৎকারের উৎসমুখে ঘাড় উঁচিয়ে দেখি, তিনতলার ছাদ থেকে একটা কুকুর আমাদের উদ্দেশ্য করে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, আর তার পাশে চুপটি করে আমাদের চোখে চোখ ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন সেই প্রথমদিনের দেখা সেন্ট বার্নার্ড। টুঁ শব্দটি না করে।  

আমরা নিচ থেকে ওপরের পরিস্থিতি আন্দাজ করতে চেষ্টা করলাম। সেন্ট বার্নার্ড বলছেন, এ কী, এ সব গরিবগুর্বো আমার বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটছে কোন সাহসে। ভালো করে পাহারা দিচ্ছিস না নাকি। পাশের কুকুরটা ভয়ে ঘেমে গেছে, না দাদা, আমি ভালো করেই পাহারা দিয়েছিলাম, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি এক্ষুনি তাড়িয়ে দিচ্ছি।

পরদিন সকালে জগদীশ ভাইসাব আর বরফি মিলে আমাদের আবার স্কুলের সামনে বড় রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে গেলেন। ওঁর এক বন্ধুর গাড়ি আছে, তিনি আমাদের নিয়ে যাবেন মুসৌরির পিকচার প্যালেস বাসস্ট্যান্ড। যেখান থেকে আমরা দেরাদুনের বাস ধরব। গাড়িতে ওঠার আগে একবার বরফির ভেজা নাকটায় হাত বুলিয়ে আসব ভেবেছিলাম, কিন্তু সে ততক্ষণে মহা উত্তেজিত কে জানে কোন অদৃশ্য চোরের পেছনে দৌড়েছে। 

May 17, 2017

ল্যান্ডোর ২/৩



পাহাড়ে, বিশেষ করে ল্যান্ডোরের মতো নিরিবিলি পাহাড়ে আমার আসতে ইচ্ছে করে দুতিনটে কারণে প্রথমত, দৃশ্যপট পরিবর্তন যা রোজ দেখি, তার থেকে অন্য দেখা আমার মুখ, তোমার মুখ, বসের মুখের বদলে গাঢ় পাহাড়, ফ্যাকাসে পাহাড়, নীল পাহাড়, সবুজ পাহাড় দুদিকে হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা থাকা পাইনের বন, লাল ছাদের সারি রোদচিকচিক মাকড়সার জাল হলুদ প্রজাপতি

দ্বিতীয় কারণ, গন্ধ বাড়িতে মোটামুটি একটা গন্ধহীন অবস্থার মধ্যে দিনরাত কাটাই বলা যেতে পারে সকালবেলা একবার ওলাক্যাবের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় কুড়া সংগ্রহের গাড়ি থেকে রাতভর জমে, ফুলে, ভেপসে ওঠা ডাল, মাছের কাঁটা, তরমুজের খোসার গন্ধবিকেলে একবার বাজারের মেছো গন্ধ। আর কিছু সিজনাল গন্ধ। জানুয়ারি মাসের রেজলিউশন সিজনে প্রায়ই অফিসের এ ডেস্ক ও ডেস্ক থেকে কাঁচা পেঁয়াজ দেওয়া স্যালাডের গন্ধ আসে। আর কখনও কখনও, অটোয় বসে থাকা অবস্থায় ছাতিমের ঘ্রাণ ব্যস।

পাহাড়ে এলে গন্ধের ভ্যারাইটি যে খুব বাড়ে তেমন নয়, মূলত গাছের গন্ধ। সেটা বর্ণনা করা খুব শক্ত ঠাণ্ডা, সবুজ রঙের গন্ধ। ল্যান্ডোরে পাইনি, অন্য অনেক পাহাড়ে অনেকসময় কাঠের উনুনের গন্ধ পেয়েছি। ল্যান্ডোরে প্রকাশের দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে টাটকা পাউরুটির গন্ধের ঝাপট নাকে লেগেছে

তিন নম্বর কারণটা আমার পাহাড় ভালোবাসার সবথেকে বড় কারণ। শব্দ। বা শব্দহীনতা। বাড়িতে চোখ বন্ধ করলে দৃশ্য আটকানো যায়, নাক টিপে ধরলে গন্ধ তাড়ানো যায়, কিন্তু শব্দের হাত থেকে রেহাই নেই লোকজন চেঁচাচ্ছে, হর্ন দিচ্ছে, কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে, মাইক বাজিয়ে টেবিলটেনিস প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করছে। আমিও কালপ্রিট, এ সব যখন কিছু হচ্ছে না, তখন নিজেই কানে গান গুঁজে রাখি।  সংগীতপ্রিয়তার হদ্দমুদ্দ মা বলেন, গান আরেকটু কম শুনে নিজে গাইলে হয় না সোনা? মা সারাদিন অনেক কথা বলেন, সব শুনতে গেলে বিপদ। সে কথা থাক পাহাড়ের শব্দের কথা হচ্ছিল, সে কথাই হোক

বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে এসে পাতা জানালার সামনে পাতা ইজিচেয়ারে বসলাম এমনি পিঠ সোজা করে বসলে দুয়েকটা পাইন গাছটাছ দেখা যায়, কিন্তু শরীর ছেড়ে মাথা পেছনদিকে হেলিয়ে দিলে আর কিচ্ছু দেখা যায় না, খালি নীল রঙের একটা চৌকো, তার মাঝে সাদা ছোপ ছোপ মেঘ আর কানের মধ্যে একটা বোঁ বোঁ শব্দ। ক্রমাগত ঘরঘর ঘুরে চলা ব্রেনের বোধহয়। তারপর খানিকক্ষণ পর ধীরে, নিচু পায়ে অন্য শব্দরা ঢুকতে শুরু করে নিচে একবার বরফি চেঁচালো কি? অনেক দূরে খট খট করে একটা শব্দ হচ্ছে একটানা কাঠ কাটছে কেউ। একতলায় মিসেস ভাট্টি হাঁটছেন কাঠের মেঝে মচমচ করছে

আমাদের কিছু প্ল্যান করা নেই। মুসৌরি যেতেও পারি, নাও যেতে পারিএখন জুতো গলিয়ে বেরোতেও পারি, আবার কিছু না করে সামনের নীল চৌকোর দিকে তাকিয়ে বসেও থাকতে পারি বই মুখে করে। 

তবু বেরোলাম।  কারণ খিদে পেয়েছেউডসাইডে দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা সাধারণত রাখেন না মিসেস ভাট্টি। ঠিকই করেন, কারণ বেশিরভাগ লোকেই সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে ডিনার হবে বাড়িতেই, বীণাজি রাঁধবেন, ভাত রুটি ডাল তরকারি মাংস, যার যেমন রুচিআমরা বেরোচ্ছি শুনে মিসেস ভাট্টি দুপুরের খাওয়ার জায়গা বলে দিলেন। আমরা কিছু রিসার্চ করেই এসেছি, তবে আমরা ঘেঁটেছি সেকেন্ডারি ডেটা, আর মিসেস ভাট্টি করেছেন প্রাইমারি ফিল্ড সার্ভে  ল্যান্ডোরে খাওয়ার তিন ধাপের ব্যবস্থা একেবারে সস্তায় সারতে হলে আছে চারদুকান চারদুকান হচ্ছে ল্যান্ডোরের বিখ্যাত মোড়, যেখানে, একটা না, দুটো না, পাঁচটা না, দশটা না, চারটে দোকান আছে ম্যাগি, চা ইত্যাদি পাওয়া যায়দেড়েকের মধ্যে দুজনের খাওয়া হয়ে যাবে দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে ক্যাফে আইভি, ল্যান্ডোর বেকহাউস ইত্যাদি। দুজনের হাজারখানেক পড়বে আর ফ্যান্সি খেতে গেলে যেতে হবে এমিলি রকেবি ম্যানর বলে এখানে একটা হোটেল আছে, তাদের দোকান মাসে এক শনিবার মিসেস ভাট্টি তাঁর বন্ধুর সঙ্গে ডেটে যান ল্যান্ডোরের কোনও এক ক্যাফেতে ক্যাফে আইভি-তেও গিয়েছিলেন, ঢালাও রেকোমেন্ডেশন দিলেন

রাস্তাও বলে দিলেন মিসেস ভাট্টিই এখন নাহয় তিনি ঘরবৈঠা, একসময় তো পাহাড় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। ল্যান্ডোরের রাস্তাঘাট সোজা নিয়মে চলে সোজা চলতে চলতে পাহাড়ের দেওয়ালে গিয়ে ধাক্কা খায়, তখন বাধ্য হয়েই তাকে দুভাগ হতে হয় হয় বাঁদিকের রাস্তা নিতে হবে, নয়তো ডানদিকের সে রাস্তা গিয়ে আবার কোথাও গোঁত্তা খেয়ে দুভাগ হবে, তখন আবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে ডাইনে যাব না বাঁয়ে সিদ্ধান্ত ভুল হলেও চিন্তা নেই, যতক্ষণ না পাহাড় থেকে একেবারে নেমে পড়ছেন ততক্ষণ আপনি সেফউডসাইড থেকে পাহাড় বেয়ে সিস্টারস বাজারে উঠে প্রথম দুমাথা থেকে বাঁদিক বেঁকে সোজা গিয়ে কেলগ চার্চ সেখানে থেকে আবার বাঁয়ের রাস্তা ধরে সোজা গেলেই চারদুকান।

হাঁটতে শুরু করলাম। এত পরিষ্কার একটা জায়গা হয় কী করে? পথের পাশে একটিও শিখরের প্যাকেট নেই, একটাও প্লাস্টিকের বোতল নেই দশ হাত অন্তর অন্তর পরিষ্কার চিহ্ন দেওয়া ডাস্টবিন, সবাই কষ্ট করে সেখানেই সব আবর্জনা ফেলেছে নাকি?

ল্যান্ডোর একেবারে অকাজের জায়গা নয়। একটা ল্যাংগোয়েজ স্কুল আছে এখানে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই বিদেশী, কারণ হয় ওঁদের সাহস বেশি, কিংবা ওঁদের দেশে নিরাপত্তা বেশি। তাই কুড়িপঁচিশ বছর বয়সের ছেলেমেয়েরা আইটি-তে ঢোকার লাইন না দিয়ে এক বছরের ব্রেক নিয়ে হিন্দির মতো একটা ভাষা শিখতে ভারতবর্ষের মতো একটা দেশে পড়ে থাকতে পারে দুদিনে এঁদের অনেকের সঙ্গেই দেখা হল রেস্টোর‍্যান্টে কোণের টেবিলে বসে মন দিয়ে পড়াশোনা করছেন, ছোট চৌকো কার্ডের একদিকে শব্দ, অন্যদিকে শব্দের মানে লিখছেন একপাশে ম্যাকবুক, অন্যপাশে ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটবুক অফ হিন্দি (বা ওইরকম নামওয়ালা কোনও বই) খোলা রাস্তাঘাটে চলতেফিরতেও ছাত্রদের সঙ্গে দেখা হচ্ছিল এদিক থেকে একজন হিপি মেম চলেছেন, ওদিক থেকে আসছেন আরেকজন হিপি সাহেব। গায়ে ঢোলা  কুর্তাপাজামামাথায় ঝুঁটি, পায়ে কিটোস, কাঁধে রুকস্যাক, বোতলে জল। ইনি বললেন আপ য়িঁহাপে কিতনে মহিনে সে রহ্‌ রহে হো?” অন্যজন চারটে আঙুল তুলেছেন কিন্তু কনফিডেন্সের অভাবে ভুগছেন। খানিকক্ষণ আঙুলের দিকে তাকিয়ে থেকে বলছেন, “তিন?” এদিকের মেম মাথা নাড়ছেন। সাহেব কনফিউজড এবং নার্ভাস ওহ ইয়াহ, চার মহিনেমেমসাহেবের মুখে হাসি ফুটেছে সাহেব জিজ্ঞাসা করছেন, “অ্যান্ড আপ?” মেম গর্বিত মুখে বলছেন, “আঠ মহিনেসাহেব বিস্ময়ে এবং অ্যাপ্রিশিয়েশনে নুয়ে পড়ছেন ওয়াওএতক্ষণে দুজনেরই ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে, (আমার বিশ্বাস, হিন্দির স্টকও শেষ) দুজনে গড়গড়িয়ে ইংরিজি বলতে শুরু করেছেন। কী বলছেন আর শোনা হয়নি।


এই হচ্ছে কেলগ চার্চ


ওই ঘিঞ্জি শহরটা হচ্ছে মুসৌরি

আর এই যে চমৎকার স্বর্গের মতো পথটা ধরে আমরা হাঁটব, এটা হচ্ছে ল্যান্ডোরএই রাস্তা ধরে সোজা গেলে চারদুকান


এই হল চারদুকান ল্যান্ডোরের অন্যতম পুরোনো বসতি ওটা ল্যান্ডোরের প্রথম পোস্ট অফিস। বেজায় পুরোনো।


চারদুকানের গায়ে সেন্ট পলস চার্চ এই চার্চে জিম করবেটেরউঁহু, জিম করবেটের নয়জিম করবেটের মাবাবার বিয়ে হয়েছিল


চারদুকানের উল্টোদিকে এই হচ্ছে ক্যাফে আইভি

যদ্দূর মনে পড়ছে আমরা খেয়েছিলাম স্যান্ডউইচ আর ইজিপশিয়ান স্ক্র্যাম্বলড এগ আর টোস্ট আর সোডা লাইম। সবক’টা খাবারই চমৎকার খেতে। কিন্তু সবথেকে ভালো ব্যাপারটা হচ্ছে খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলুভাজা।

ক্যাফে আইভি থেকে বেরিয়ে চারদুকানকে পেছনে রেখে নাকবরাবর চললে এসে যাবে নিউ লাল টিব্বা ওল্ড লাল টিব্বা কোথায় আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না, বলতে পারব না এই নিউ লাল টিব্বা হচ্ছে একটি টুরিস্ট পয়েন্ট, এবং আমার মতে বাতিলযোগ্য যদিও আমরা বাতিল করিনি, কারণ আমাদের আর কিছু করার ছিল না। একটা কোল্ডড্রিংকসের দোকানের ছাদে পাঁচটা প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা দূরবীন দুজনের কুড়ি কুড়ি চল্লিশ টাকার টিকিট কাটলে সেই দূরবীন দিয়ে আপনাকে দূরের পাহাড়ের একটা সাদা রঙের মন্দির, দিখ রহা হ্যায়? বহোৎ আচ্ছা। এবার দূরবীন বাঁদিকে ঘোরানসাদা বাড়ি দেখতে পাচ্ছেন? বহোৎ আচ্ছা। ওগুলো হচ্ছে ব্রিটিশদের বাংলো। ডানদিকে ঘোরানডানদিকে কী দেখিয়েছিল আমি অলরেডি ভুলে গেছি

টিব্বা থেকে নেমে এসে রাস্তা দুভাগ হলক্রমাগত বাঁদিকে বেঁকতে বিরক্ত লাগছিল, তাই এবার ডানদিকের রাস্তাটা নিলাম। এই রাস্তা সোজা ফিরে গেছে কেলগ চার্চ। চমৎকার রাস্তা। সামান্য ঢালু, চলতে কষ্ট নেই, বাঁদিকে নেমে গেছে পাহাড়, ডানদিকে উঠে গেছে পাহাড়, তার গায়ে মাঝে মাঝে কয়েকখানা বাড়ি। আর একটা কবরখানা রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন পাথর হয়ে যাওয়া সাহেবমেমেরা লাজবন্তী ম্যাকআর্থার, লাভিং ওয়াইফ অফ জর্জ ম্যাকআর্থার আমরা লাজবন্তীর মুখোমুখি বসলাম রাস্তার ধারের কংক্রিট রেলিং-এর ওপর চারপাশে গমগম করছে ঝিঁঝিঁর ডাক। মাঝে মাঝে একটাদুটো পাখি আর কুকুরের ডাক আরও মাঝে মাঝে একটাদুটো বাইক ভটভটিয়ে যাচ্ছে যখন অন্য শব্দরা গাছের আড়ালে লুকোচ্ছে, ভটভটানি মোড় ঘুরলেই আবার এসে বসছে রাস্তা জুড়ে

এই কবরখানার ডানদিকে নয়তো বাঁদিকে, কোনদিকে ভুলে গেছি, একটা বাড়ি আছে বাড়ি ল্যান্ডোরে আছে যথেষ্টই, গাছের থেকে সংখ্যায় অনেক কম বলে চোখে পড়ে নাভারতের যত সেলিব্রিটি আছেন, সবাই একেকখানা করে সে সব বাড়ি কিনে রেখেছেন। বিশাল ভরদ্বাজ থেকে সঞ্জয় নারং। অন্য বেশিরভাগ বাড়িরই রং সাদা বা হলুদ বা ওই গোছের, জঙ্গলের মধ্যে জেগে থাকে।

এই বাড়িটা তাদের থেকে আলাদা রাস্তা থেকে কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে বাড়ি পর্যন্ত। বাড়িটার রং কেমন শ্যাওলা শ্যাওলা, চারপাশের গাছ জঙ্গল পাহাড়ের সঙ্গে একাকার। একবার ভাবলাম একটা ছবি তুলি। তারপর সাহস হল না। এমনই ব্যক্তিত্বপূর্ণ বাড়ি। তাছাড়া অত সুন্দর বাড়িকে কি ছবিতে ধরা সম্ভব? পাহাড়ের গায়ে ফলকে বাড়ির নামটা পড়ে রাখলাম।

অনেক পর, সম্ভবত দেরাদুন থেকে দিল্লির বাসে বসে অর্চিষ্মান ফোন থেকে মুখ তুলে বলল, "ওই বাড়িটা কার বলত?"

অকারণ, তবু নামটা শুনে গর্ব হল। মনে হল, এ তো হতেই হত। বাড়ির মালিকের নাম আমি বলছি না, দুটো হিন্ট দিচ্ছি। এক, উনি আমার (এবং আরও অনেক বাঙালির) অন্যতম প্রিয় চরিত্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। আর, এঁর এই বাড়িটার গেটেই নাকি একটা বোর্ডে লেখা ছিল (যদিও আমরা দেখিনি, হয়তো সরিয়ে ফেলেছেন) “বিওয়্যার, র‍্যাবিড থেসপিয়ান”। বলুন দেখি কার বাড়ি?

সিস্টারস বাজারে ফিরে মনে পড়ল ল্যান্ডোর বেকহাউসে ব্রেকফাস্ট করব ভেবে রেখেছিলাম দিল্লিতে থাকতেই ব্রেকফাস্ট তো হয়ইনি, লাঞ্চও অন্যজায়গায় সেরে নিয়েছি তাতে অসুবিধে নেইআমাদের মতো প্রিভিলেজড লোকজনের খাওয়ার তো খিদের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নেই। ইচ্ছে হলেই যখনতখন খেতে বসতে পারি। অনেকক্ষণ হাঁটাও হয়েছে। তাছাড়া এখন যদি বাড়ি ঢুকে যাই তাহলে আবার পাহাড় ঠেঙিয়ে উঠে আসার ইচ্ছে থাকবে না কাজেই ঘোরাঘুরি আরেকটু দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য আমরা বেকহাউসে ঢুকে পড়লাম

আর পড়ামাত্র ল্যান্ডোরের একমাত্র নিন্দে করার জিনিসটা হাতে চলে এল দোষটা বেকহাউসের নয় দোষটা বেকহাউসের লোকেশনের সিস্টারস বাজারের একেবারে মোড়ের মাথায়, টুরিস্টের ভিড় লেগেই থাকে আমিও টুরিস্ট, আমিও ইরিটেটিং, কিন্তু এই টুরিস্টরা আমার থেকেও ইরিটেটিং অবশ্য লিখতে গিয়ে একটা কথা মনে হচ্ছে, এঁরা সবাই ঘুরছিলেন দল বেঁধে, একটা এস ইউ ভি-তে মিনিমাম ছ- সাত জন সে জন্যই বোধহয় অত কথা বলতে হচ্ছিল আর অত চেঁচিয়ে তার মধ্যে বেকহাউস কর্তৃপক্ষ দোকান সাজিয়েছেন ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম আর হোয়াটসঅ্যাপে দেখানোর মতো করে। সবথেকে কেলেংকারি করেছেন একখানা রাজকীয় আর্মচেয়ার রেখে, তাতে বসে ছবি তোলার জন্য আক্ষরিক লাইন পড়েছে আর কেউই তো শুধু বসছেন না, বসে, ঠ্যাং তুলে, জিভ বার করে, টুপি ঘুরিয়ে, কাঁচকলা দেখিয়ে একাকার করছেন বেকহাউসের পেছনদিকে একটা চৌখুপি মতো আছে, জানালা দিয়ে পাহাড় দেখা যায় সে জায়গাটা মোটামুটি ল্যাংগোয়েজ স্কুলের ছাত্রদের একচেটিয়া একটু পরে তাঁদের দুজন উঠে গেলে আমরা তাঁদের টেবিলে উঠে গেলাম এখান থেকেও কলরব কানে আসছে, চোখে অ্যাট লিস্ট দেখতে হচ্ছে না আমরা বসলাম, আর আমাদের খেপআর আদা লেবু মধু চা এসে গেল



দোকান থেকে বেরিয়ে বুঝলাম জানালা দিয়ে যেটাকে পাইনের ছায়া ভেবেছিলাম সেটা আসলে মেঘ বাড়ির ছাদে, বনের মাথায় ঘন হয়ে জমেছে দিল্লি থেকে বয়ে আনা ছাতা রয়ে গেছে ব্যাগের ভেতরেই জোরে হাঁটা লাগালাম উতরাই বেয়ে নামতে নামতে, অ্যালশেসিয়ানের প্রতিবাদ ছাপিয়ে মেঘের ডাক প্রবল হয়ে উঠল শেষরক্ষা হল না, শেষ বাঁকটা পেরোতে পেরোতে বৃষ্টি নেমে গেল উডসাইডের অল্প ফাঁক গ্রিল গেট তাক করে ছুটছি, গ্রিল পেরিয়ে গেছে, এবার বাগানে পাতা একেকটা লাল পাথরে একেক পা ফেলে ছুটছি, চশমার কাচ বেয়ে জলের ধারা নেমেছে। ওদিকে বারান্দা থেকে বরফি চেঁচাচ্ছে, জোরে, আরও জোরে বসার ঘরের সোফায় একগাদা খাতা পেনসিল বই স্ক্র্যাবলবোর্ড আর জুসের গ্লাস নিয়ে মিসেস ভাট্টি বসে ছিলেন, আমাদের দেখে অবাক হয়ে বললেন, "ছাতা নিয়ে বেরোওনি? পাহাড়ে বেড়ানোর এক নম্বর রুলটাই তো ভেঙেছো।"

আমরা আর লজ্জার মাথা খেয়ে বললাম না যে, আমাদের প্রকৃতিটাই রেবেলিয়াসদিনে একটা করে রুল না ভাঙলে ভাত হজম হয় না

এরপর দুটো কাজ করা যেত এক, মিসেস ভাট্টির বুককেস থেকে বই কিংবা নিজেদের ব্যাগ থেকে কিন্ডল বার করে ইজিচেয়ারে বসে টেবিলে পা তুলে, কিংবা ডিভানে উপুড় হয়ে, হাঁটু থেকে পা সিলিংপানে ভাঁজ করে, জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে, খোলা দরজা দিয়ে আসা ভেজা পাহাড়ের গন্ধ শুঁকতে বই পড়া যেত নয় তো মিসেস ভাট্টির নরম গদির ওপর নরম লেপ গায়ে দিয়ে ভোঁসভোঁস করে ঘুমোনো যেত আমরা করব ভেবে রেখেছিলাম একটা, কাজে হয়ে গেল অন্যটা

চোখ খুলে দেখি ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার জানালার বাইরেও আলো নেই, শুধু একটা ঘন নীলচে আভা সুইচবোর্ডটা মনে হয়ে দেখেছিলাম ঘরের অন্য প্রান্তে, জানালার পাশে হাই তুলতে তুলতে, অচেনা মেঝেতে পা ঘষটে ঘষটে সেদিকে চললাম সুইচবোর্ড পর্যন্ত পৌঁছোনোর আগেই থামতে হল। কারণ জানালার দিকে চোখ পড়েছে। দেরাদুন ঝলমল করছে


                                                                                                                         (চলবে)
ল্যান্ডোর ১/৩
ল্যান্ডোর ২/৩

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.