February 27, 2017

মেহনতের চানা আর দেওয়াল আলমারি



আজকাল দিল্লিতে যে রোদ্দুরটা ওঠে, সেটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। চারদিকে সবাই কাশছে খকখক, সকলেরই গলা স্বাভাবিকের থেকে দু’স্কেল নেমে গেছে, তুলসী ফ্লেভারড গ্রিন টি-র গন্ধে প্যান্ট্রি ভুরভুর। হাওয়ার থেকেও খারাপ হচ্ছে রোদ্দুরখানা। কাজ করতে করতে একবার স্ক্রিনবিচ্যুত হয়ে চোখ জানালায় পড়লেই কনসেনট্রেশনের বারোটা, খালি মনে হয় যাই একটুখানি গা সেঁকে আসি। এমনি তো ঘুরে বেড়ানো যায় না, কে কোথায় বসের কান ভাঙাবে, কোনও একটা কাজের ছুতো করে উঠতে হয়। তাই আমি আজকাল অফিসে চা খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। দিনের মধ্যে চারবার করে আন্টিজির দোকানে ভিজিট দিই।

কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সেদিন আন্টিজির একটিও খদ্দের ছিল না। জলের বাসনটা খালি উনুনে চাপিয়ে রেখে হাঁটু খুঁটির মতো জাপটে শরীরের ভার পেছনে হেলিয়ে আন্টিজি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, আংকলজির রুটির কারখানার সামনে দু’চারজন গজল্লা করছিল, মাঝে মাঝে তাদের আলোচনায় ফোড়ন কাটছিলেন। এককোণে শিখর আর রজনীগন্ধা আর আলট্রা মাইল্ড আর মার্লবরোর জাম্বো থলির পেছনে আন্টিজির বৌমা চিবুক পর্যন্ত ঘোমটা টেনে বসেছিলেন, বৌমার ডানদিকে সবুজ রঙের ছোটছোট পাতায় ভরা একগাদা প্রশাখা, বেশ শক্তপোক্ত ঝাড়ের মতো দেখতে। বৌমা একেকটা ডাল তুলে নিয়ে খুঁটে খুঁটে কী সব একটা বাটিতে রাখছিলেন। আমাকে দেখে আন্টিজি পাশ থেকে একটা ঝকঝকে সসপ্যানে খানিকটা জল ঢেলে উনুনে চাপিয়ে আঁচ জোর করলেন। সে জল গরম হবে, তাতে চা পড়বে, দুধ পড়বে, হামানদিস্তায় থেঁতো হয়ে আদা পড়বে, তারপর ফুটবে ফুটবে ফুটবে, বেশ খানিকক্ষণের ধাক্কা। আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে কথোপকথনের চেষ্টা করলাম। 

বৌমার বাঁ পাশে রাখা ঝাড়ের দিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞাসা করলাম, ও কেয়া হ্যায়? 

অমনি সব গুঞ্জন থেমে গেল।  চারদিক থেকে সবাই চেঁচিয়ে উঠে বলল, চানে, চানে, চানে নেহি জানতা? ও হ্যায় চানে। 

আমার মুখ দেখে আন্টিজি বললেন, ম্যাডাম কো দিখা দো একবার। 

বৌমা বাটি এগিয়ে দিলেন। দেখি বাটির মধ্যে পরিষ্কার বাংলা ছোলা, যেটাকে ঘোড়ার ছোলাও বলে, শুধু কালোর বদলে রং কুটকুটে সবুজ। 

আন্টিজি জোর করে আমাকে টেস্ট করালেন, জিনিসটা খেতে কাঁচা কড়াইশুঁটির মতোই। রীতিমতো মিষ্টি। আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, ছোলা এরকম গাছে ফলে? এ রকম সবুজ দেখতে হয়? তারপর নিজের বিস্ময়ে নিজেরই বিরক্ত লাগল। ছোলা কোথাও না কোথাও তো ফলেই। আর গাছে গাছে খয়েরি রঙের কুড়মুড়ে খোসাওয়ালা রোস্টেড ছোলা ঝুলে থাকার দৃশ্যের থেকে সবুজ ছোলা ঝুলে থাকার দৃশটাই কি বেশি স্বাভাবিক নয়? এতে এত অবাক হওয়ার কী আছে। সারাজীবন ধরে খোলায় ভাজা ছোলা ঠোঙায় পুরে ঝাঁকিয়ে, ঝালঝাল তরকারিতে আলুর সঙ্গে (আবার ওটা নাকি আমার ফেভারিট তরকারিদের মধ্যে পড়ে), সারারাত জলে ভিজে বাসি মড়ার মতো ফুলে ওঠা অখাদ্য বাদামের সঙ্গে, কলেজফেরতা খিদের মুখে কে জানে কবেকার কাটা পেঁয়াজ আর আধোয়া আঙুলে চেপা পাতিলেবুর রসে মিশিয়েমাখিয়ে হুমহাম করে খেয়েও ছোলার উৎস সম্পর্কে যে আমি একটি মুহূর্তের ভাবনাও খরচ করিনি, অবাক যদি কিছুতে হতে হয় তা হলে এটাতেই হওয়া উচিত। 

গ্লানিতে গলা পর্যন্ত ডুবতে গিয়েও ডুবলাম না। আমার চারপাশের আবহাওয়া ততক্ষণে পূর্বের ঝিমুনি ঝেড়ে ফেলে চনমনে হয়ে উঠেছে। এতক্ষণ কী নিয়ে কথা হচ্ছিল কে জানে, এখন সকলেই কথা বলছে, গাছপাকা, টাটকা জিনিস খাওয়ার উপযোগিতা নিয়ে। একেবারে ঠেট ভাষায় কথা হচ্ছে, সবটা ধরতে পারছি না, কিন্তু মোদ্দা কথাটা হচ্ছে দোকানে প্যাকেটে করে যা যা বিক্রি হয় সেগুলো খেতে তো জঘন্যই, স্বাস্থ্যের পক্ষেও মারাত্মক। আমাদের আমলে সব কত টাটকা, কত স্বাস্থ্যকর, কত নির্ভেজাল, কত ভালো ছিল। সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাসে আশপাশের বাতাস উদাস হয়ে গেল। 

বৌমা গল্পে যোগ দিলেন না। উবু হয়ে বসে ছোলা খুঁটতে লাগলেন। সবুজ পাতার মধ্যে সবুজ ছোলা, দেখাই যায় না প্রায়। ডানদিকের পাহাড় থেকে একেকটা ডাল তুলে গায়ে লেগে থাকা ছোলা খুঁটে খুঁটে বাটিতে রেখে পরিত্যক্ত ডালটা বাঁদিকে ফেলে দেওয়া। ডানদিকের পাহাড় বাঁদিকে ট্রান্সফার করতে যা সময় লাগবে তাতে তাঁর গল্প করলে চলবে না। 

তবু তিনি মুখ তুলে তাকালেন। অত লোক থাকতে আমার দিকেই। হয়তো আমি টাটকা জিনিসের সপক্ষে সওয়াল করিনি বলেই। ঘোমটার আড়ালে তাঁর হাসি দেখতে না পেলেও গলার স্বরে শুনতে পেলাম। তিনি বললেন, 

লেকিন মেহনত বহোৎ করনা পড়তা হ্যায়।

বৌমা কথাটা আস্তেই বলেছিলেন, কিন্তু বক্তব্যভেদে ঘোমটার সাউন্ডপ্রুফিং কমবেশি হয়। তাঁর এ মন্তব্যটি আশেপাশের কয়েকজনের কানে চলে গেল। তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, মেহনত তো করতে হবেই। ভালো খাওয়া, ভালো থাকার জন্য মেহনত তো করতেই হবে। 

বৌমা আবার মাথা নামিয়ে ছোলা খোঁটায় মন দিলেন আর আমার মনে পড়ে গেল আমাদের ঘরের দেওয়াল আলমারিটার কথা। স্মৃতির গোলমালটাই এই। বড্ড ইনএফিশিয়েন্ট। কোন কানের সঙ্গে যে কোন মাথা টেনে আনবে ঠিক নেই। 

প্রথমে দেওয়াল আলমারিটা আলমারি ছিল না। দেওয়ালের গায়ে স্রেফ কয়েকটা ধাপ। একেবারে ওপরের ধাপে গুচ্ছের বইখাতা, ডায়রি। বেশিরভাগই মাবাবার অফিসের হ্যানা ম্যানুয়াল ত্যানা ডিরেক্টরি। একটা ছিল মায়ের গানের ডায়রি, মাস্টারমশাইয়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার আগে ওই খাতা থেকে মা আমাকে সা রে গা মা শিখিয়েছিলেন, এমনকি ভৈরবের আরোহণ অবরোহণ পর্যন্ত। বেশ বড় হওয়ার পর জেনেছি মায়ের কবিতার খাতাও ছিল ওই ধাপেই।

দ্বিতীয় ধাপে, মায়ের মুখের সমান উচ্চতায় একটা ছোট আয়না ছিল, আর ছিল অফ হোয়াইট রঙের গায়ে উঁচু উঁচু ডিজাইন করা পাউডারের কৌটো, রুপোর  সিঁদুরদানি, টিপের পাতা, চুলের কাঁটা, বোরোলিনের টিউব, ডিসেম্বর জানুয়ারিতে লেবুর রস মেশানো গ্লিসারিনের শিশি। তৃতীয় ধাপে সেলাইয়ের কৌটো ইত্যাদি ছিল বোধহয়, এখন মনে পড়ছে না। যেটা মনে পড়ছে সেটা হচ্ছে একেবারে নিচের ধাপে আমার একটা খেলনা ছিল। প্লাস্টিকের হ্যান্ডেলের মাথায় দুটো তিনকোণা পতাকা। দুটো পতাকার মুখেই দুটো বল বসানো। হ্যান্ডেলটা ধরে কায়দা করে ঘোরাতে পারলে তিনকোণা পতাকাদুটো বনবন ঘুরবে। স্পিড একটু কম হলে ঘুরবে না, বেশি হলে পাশাপাশি গায়ে লেগে ঘুরবে। আর যদি একেবারে মাপমতো হয় তাহলে দুটো পতাকা আলাদা আলাদা ঘুরবে। বলদুটো একে অপরের গায়ে ঠোক্কর খেয়ে খট খট খটা খট শব্দ তুলবে।  

কিছুদিনের মধ্যেই খোলা ধাপগুলোর ওপর চকচকে পালিশ করা কাঠের দুখানা পাল্লা চড়ল। বাঁদিকের পাল্লায় একখানা প্রমাণ সাইজের আয়না সাঁটা। এক নম্বর সুবিধে হল, মা এতদিনে শাড়ি পরে নিজেকে পুরোটা দেখতে পেলেন। দু'নম্বর সুবিধে হল, এতদিনে অফিস + স্কুলটাইমে আমরা তিনজন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে চুল আঁচড়াতে পারলাম। তৃতীয় সুবিধেটা একদিক থেকে দেখলে সুবিধে, অন্য দিক থেকে দেখলে অসুবিধে। এতদিন চোখের সামনে থাকত বলে ধাপগুলো খুবই ঝকঝকে এবং ফাঁকা ফাঁকা থাকত, এখন চোখের আড়ালে জঞ্জালের পরিমাণ ক্রমে বেড়ে উঠল। আগে যত ঝট করে জিনিস খুঁজে পাওয়া যেত, এখন রীতিমত ঘাঁটাঘাঁটি করতে হত। আর সেই ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়েই (কী খুঁজছিলাম কে জানে, মোস্ট প্রব্যাবলি হজমোলার কৌটো) আমি একদিন আবিষ্কার করলাম ফসকা গেরো বাঁধা একটা পলিথিন, সেটার ভেতর আরও কতগুলো ছোট ছোট প্যাকেট। কৌতূহলী হয়ে সেটা নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে হাতে লাল, হলুদ রং লেগে গেল। গুঁড়ো মশলা। হলুদ, লাল লংকা, জিরে, ধনে ইত্যাদি।

তখন আমার কাছে আরেকটা রহস্যও পরিষ্কার হয়ে গেল। রোজ সকালে অফিসে যাওয়ার আগে রান্না করতে করতে মা কেন দৌড়ে দৌড়ে এসে আলমারি খোলেন, খুটুরখাটুর করে আবার দৌড়ে রান্নাঘরে ফিরে যান। দেওয়াল আলমারিটা মায়ের গুঁড়োমশলা লুকোনোর জায়গা।

আমাদের বাড়িতে চিরকাল শিলনোড়ায় রান্না হয়েছে, কারণ সবাই জানে বাটা মশলায় রান্নার স্বাদ ভালো হয়, ডাটা মশলায় হয় না। মা যখন শোবার ঘরের আলমারিতে গুঁড়োমশলা লুকিয়ে রেখে ব্যবহার শুরু করেছেন, তখনও পোস্ত, সর্ষে, আদাবাটা ইত্যাদির জন্য শিলনোড়াই ভরসা ছিল। তবু কাজ যতখানি কমে। 

না লুকোলেই বা কী হত? কেউ কি ‘কেন মশলা বেটে রাঁধছ না’ বলে মাকে ধরে মারত? অফ কোর্স, না। তাছাড়া ওভাবে লুকোনো যায় নাকি? আমাদের পুরোনো ধাঁচের বাড়িতে সব ঘরের মাঝে জানালা কাটা, মায়ের অত দৌড়োদৌড়ি কেউ টের পায়নি এবং টের পেয়েও কারণ বোঝেনি এটা অসম্ভব। আর যদি বাটা-ডাটার স্বাদে সত্যিসত্যিই তফাৎ থাকে তাহলে তো রান্না মুখে দিয়েই তাঁদের বুঝে ফেলার কথা। তবু মা গুঁড়োমশলা ব্যবহারে লুকোছাপা করতেন কেন কে জানে। হতে পারে এই আশায় যে তিনি প্রকাশ্যে গুঁড়োমশলা ব্যবহার না করলে বাকিরাও তাঁকে প্রকাশ্যে গুঁড়োমশলা ব্যবহার না করতে জোর করবে না। বড়জোর খেতে বসে আজকালকার গুঁড়ো মশলায় যে ভেজাল কত বেশি, এবং ওসব খেলে যে সবার শরীর খারাপ হতে বাধ্য আর গুঁড়ো মশলার রান্নার স্বাদের কথা তো ছাড়ানই দাও, এই সব পরোক্ষ খোঁচাখুঁচি চলবে। 

তবু প্রশ্নটা মাথায় আসেই। আমার এমন তেজী মা, অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন, সপাট এবং সত্যবাদী মা এই সব খোঁচাখুঁচিই বা সইতেন কেন। “আমিই যখন রাঁধছি তখন কী দিয়ে রাঁধব সে বিষয়ে আমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা, থ্যাংকইউভেরিমাচ” এই জলের মতো সোজা কথাটা মুখের ওপর সোজাভাবে বলেননি কেন? এই প্রশ্নটা, শুধু গুঁড়োমশলার নয়, আরও শতশত প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করে করে আমি মাকে পাগল করে দিয়েছি, এবং একটিবারও ধৈর্য না হারিয়ে প্রত্যেকবার মা আমাকে এর উত্তর দিয়েছেন। মা উত্তরটা পরিষ্কার বাংলাতেই আমাকে বুঝিয়েছিলেন, আমিও পরিষ্কার বাংলাতেই সে উত্তরটা এখানে লিখে দিতে পারতাম, কিন্তু পরে জেনেছি মায়ের সব বোঝানো তিনটিমাত্র ইংরিজি শব্দের একটি বাক্যে নিখুঁত প্রকাশ করা যায়।  

পিক ইওর ব্যাটল্‌স। 

হয়তো গুঁড়ো মশলার যুদ্ধে সবটা শক্তি খরচ করে ফেললে মায়ের চলত না। হয়তো আরও অসংখ্য জরুরি যুদ্ধের জন্য তাঁর শক্তি সঞ্চয় করার দরকার ছিল। হয়তো সে সব যুদ্ধের সবগুলো তাঁর একারও নয়, হয়তো তাদের অনেকগুলোই… নাঃ, এটায় কোনও হয়তো নেই। সে সব যুদ্ধের অনেকগুলোই মা লড়ছিলেন আমার জন্য। 

চা নিয়ে অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে একটা কথা টের পাচ্ছিলাম। একটু আগে মেহনতের টাটকাতাজা চানা জিভে যতখানি মিষ্টি ঠেকেছিল, আসলে জিনিসটা ততটাও মিষ্টি নয়। বরং বেশ তেতোই।


February 24, 2017

হলে গিয়ে



‘মাইন্ড সিজ হোয়াট ইট ওয়ান্টস টু সি’ হতে পারে, কিন্তু সত্যি সত্যিই আমার আর অর্চিষ্মানের মধ্যে মিল খুব বেশি। অমিলও যে নেই তা নয়। প্রচুর আছে। একজন বেগুন বলতে অজ্ঞান, অন্যজন দুচোখে দেখতে পারে না, একজন সারাদিন এন ডি টি ভি আর নিউজলন্ড্রি, অন্যজনের ব্রেকিং আর নিউজ শব্দদুটো পরপর শুনলে প্যালপিটেশন হয়। একজনের আনুগত্য আজীবন, অন্যজন মনে করে কবে ভালো শিল্প ফলিয়েছিলাম তা একজনের বাকি জীবন বাজে বকার লাইসেন্স হতে পারে না। 

কিন্তু আমার এও মনে হয় যে এই অমিলগুলো খুব একটা ম্যাটার করে না। দৈনিক মেনু থেকে বেগুন বাদ পড়লেও পুষ্টি কিছু টের পাওয়ার মতো কম পড়ে না, টিভি দেখার কমন সময়টুকুতে সংগীত বাংলা কিংবা সি আই ডি দেখলে জেনারেল নলেজে তেমন কিছু তফাৎ হয় না। সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কত বিষ উগরোলো তা নিয়ে চা খেতে খেতে টুকটাক তর্ক চলতে পারে, তার বেশি সম্পর্কে আঁচড় পড়ে না।  

কিন্তু যে বিষয়গুলোতে আঁচড় পড়লেও পড়তে পারত (ইন ফ্যাক্ট পড়তই, আমার বিশ্বাস) সেগুলোতে আমাদের প্রায় আনক্যানি মিল। মাসমাইনের কতখানি কোনদিকে যাবে, রাতে ডালভাততরকারির ফাঁদে পড়তে হবে নাকি ম্যাগিই যথেষ্ট,  জিনসের ছেঁদাটা পাঞ্জাবীর আড়ালে না হয় থাকল আর ক’দিন কিন্তু ইন্টারনেট ঢিলে হতে দেওয়া চলবে না, এই সব মরণবাঁচন সিদ্ধান্তে আমি আর অর্চিষ্মান সবসময়েই একমত। আর সে জন্যই অর্চিষ্মানের সঙ্গে সহাবস্থান বড় আরামের। 

ইদানীং সে আরামে একটি ছোট কাঁটা টের পাচ্ছি। কাঁটা বলা বাড়াবাড়ি, বরং কাঁকর বললে ঠিক হয়। সেটা হচ্ছে সিনেমা দেখা। বাড়ি বসে সিনেমা দেখা নয়, কারণ প্রতি রাতেই আমরা অনলাইন কিছু না কিছু দেখি, গোটা বা খণ্ড, তাতে রুটি তরকারির স্বাদ ডবল হয়ে যায়। 

আমার অসুবিধে হয় হলে গিয়ে সিনেমা দেখায়। এবং অসুবিধেটা নতুন। হলে গিয়ে সিনেমা আমি অন্যান্য সুস্থস্বাভাবিক মানুষের মতোই অনেক দেখেছি এবং কিচ্ছু অসুবিধে টের পাইনি।

ক্লাস ফাইভে মাখলার দীপক সিনেমাহলে গিয়ে চার্লি চ্যাপলিন দেখার কথাটাই মনে পড়ছে, তার পেছনে আর স্মৃতি এগোচ্ছে না। আমি সিনেমা দেখেছিলাম, হলের সিটে বাসা বাঁধা ছারপোকা আমাকে দেখেছিল, দেখে এত পছন্দ হয়েছিল যে আমার খয়েরি রঙের টিউনিকের সেলাইয়ের ভেতর চেপে আমার বাড়ি পর্যন্ত বাড়িতে এসেছিল। তার পর কী হয়েছিল আমার মনে নেই, তবে মা নিশ্চয় ভোলেননি। 

ছোটবেলায় এত কমবার হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ হয়েছে, যে প্রায় প্রত্যেকটি যাওয়াই স্পষ্ট মনে আছে। হল ছিল না বলে যাওয়া হত না তেমন নয়। যাওয়া হত না কারণ আমার বাবামা বিশ্বাস করতেন (এখনও করেন) সিনেমা দেখতে অ্যালাউ করা আর মেয়ের হাতপা বেঁধে জলে ফেলে দেওয়ার একই ব্যাপার। রিষড়ার হলের নাম ছিল জয়ন্তী। জয়ন্তীর পাড়াতেই ছিল বিধান কলেজ। রসিকতা চালু ছিল যে বিধান কলেজের ক্লাসগুলো আসলে হয় সব জয়ন্তীতে। শেওড়াফুলিতে ছিল উদয়ন, সেখানে আমি ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা চলাকালীন বাবামায়ের সঙ্গে লগান দেখতে গিয়েছিলাম। শ্রীরামপুরের ছিল মানসী। পিসির সঙ্গে দোতলার সিটে বসে দেখেছিলাম পারমিতার একদিন। তখন ভাষাদিবস অনেক কম লোকে পালন করত কিন্তু হলের নামগুলো সব বাংলায় ছিল। একটাই নন-বাংলা নাম মনে পড়ছে, কোন্নগরের চলচ্চিত্রম্‌। এখানে দেখেছিলাম বাবার সঙ্গে জুরাসিক পার্ক। কোন জামাটা পরে গিয়েছিলাম সেটাও মনে আছে। এই সব হলের বেশিরভাগই আর নেই। মানসী নেই, চলচ্চিত্রমও নেই বোধহয়। শুধু স্টপেজগুলোর নাম হলের নামে রয়ে গেছে। 

হলে গিয়ে সিনেমা দেখার ফ্রিকোয়েন্সি বলার মতো বাড়ল কলেজে উঠে। বেথুনের সামনে থেকে ট্যাক্সি নেওয়া হত লাইটহাউসে যাওয়ার জন্য, ড্রাইভার বাদ দিয়ে ন’জন। ভাগ্যিস তখন ট্যাক্সিগুলো অ্যামবাসাডর মডেলের হত। দরজা খুলে প্রথম দুজন পড়ে যেত, তারপর বাকিরা স্বাভাবিক ভাবে নামত। মাঝে মাঝে বাসেও যেতাম, কিন্তু তাতে কিছু বদমেজাজি মাঝবয়সীরা বিরক্তি প্রকাশ করতেন মনে আছে। তাঁদের মতে আমরা নাকি দরকারের থেকে বেশি কথা বলতাম আর দরকারের থেকে অনেক বেশি হাসতাম। একজন বলেছিলেন, উফ যেন মাছের বাজার। কলেজে ওঠার পর দেখা সিনেমার চরিত্রও বদলেছিল। এতদিনের শিশুশিক্ষামূলকের বদলে প্রকাশ্য চুম্বন। টইটম্বুর ফুটবল স্টেডিয়ামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ড্রু ব্যারিমোরের চুম্বনকৌমার্য ভঙ্গ করছেন হিরো। তাঁর নাম মনে নেই।

আমাদের কলেজের কাছে হল ছিল প্রচুর। চিত্রা, মিত্রা, রাধা, আরও যেন কী সব। ওই চিত্রা মিত্রার মধ্যে কোনও একটাতে আমি পাঁচ টাকার টিকিটে সিনেমা দেখেছি।  সেকেন্ড রো-তে বসে হাম সাথ সাথ হ্যায়। এখন মনে হয় পাঁচ টাকার  মুখ চেয়েও ওই অত্যাচার সহ্য করার কোনও মানে ছিল না।

আমার দিল্লির হলে দেখা প্রথম সিনেমাও কিছু কম অত্যাচার ছিল না। চাণক্য হল, জিস্‌ম্‌। বেরিয়ে হলের পাশের স্টলে মারাত্মক ভালো মোমো খেতে না পেলে ও দুঃখ ভোলা শক্ত হত। অর্চিষ্মানের সঙ্গে দেখেছিলাম ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ, পাশে নতুন প্রেম না থাকলে ও জিনিস পুরো বসে দেখতে পারতাম না। 

বসে দেখা যায় না এরকম সিনেমা আমি গুচ্ছের দেখেছি কিন্তু উঠে এসেছি মোটে দু’বার। দু’বারই দিল্লিতে। প্রথমবার দেখতে গিয়েছিলাম লক্ষ্য। একে হৃতিক রোশন, তায় অ্যাড ব্লকের বারান্দাটা নাকি স্পষ্ট দেখা গেছে, উৎসাহ ছিল যথেষ্ট। হলে গিয়ে বসেছি, ট্রেলর দেখাচ্ছে তো দেখাচ্ছেই। তারপর একটা সিনেমার ট্রেলর শুরু হল, নির্ঘাত দারুণ ভালো সিনেমা, কারণ তিনখানা নাম। গর্ব, প্রাইড অ্যান্ড অনার। আমরা বলাবলি করছি, খুবই ইনোভেটিভ ট্রেলর বানিয়েছে কিন্তু, ক্রেডিটসও দেখিয়ে দিচ্ছে। তারপর মনে পড়ল যে আজ শুক্রবার। কথা খরচ করতে হয়নি, আধো অন্ধকারে একে অপরের মুখের দিকে দৃষ্টিপাতই যথেষ্ট ছিল। হল থেকে বেরিয়ে খানিকটা হেঁটে এম ব্লকের বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছনোর পর সেই যে হাসতে শুরু করেছিলাম, হোস্টেলে পৌঁছনোর আগে তা থামেনি।

দু’নম্বর সিনেমা যেটার মাঝপথে আমি হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম সেটা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতির থেকে খারাপ সিনেমা আমি হলে গিয়ে দেখিনি এ হতে পারে না। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে সাহস কিংবা মোটিভেশন জোগাড় করতে পারিনি তাই বেরোয়নি। 

দুটো বেরোনোর মধ্যে একটাই তফাৎ, প্রথমটা আমি যার সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিলাম সেও আমার সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল, দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে বেরিয়েছিলাম আমি একা। আমার সঙ্গীদের কনভিন্স করাতে না পেরে যে এই সিনেমা দেখার থেকে বাইরে বেরিয়ে হাওয়া খাওয়া বেটার। 

এ সব সিচুয়েশনে একা একা সিনেমা দেখতে যাওয়ার উপযোগিতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একা একা সিনেমাও আমি এই দিল্লিতেই প্রথম দেখতে গেছি। কেউ আমার সঙ্গে যেতে রাজি হয়নি বলে নাকি একা যাব বলেই, সেটা এখন আর মনে নেই, কিন্তু সিনেমাটা মনে আছে, বিইং সাইরাস। শুক্রবার রাতের শো, পি ভি আর প্রিয়া। সিনেমাটা আমার এত ভালো লেগেছিল যে শনিবার সকালের শো-তে আমি আবার সিনেমাটা দেখতে যাই, ওই একই হলে, এবারেও একা। 

এই একা একা সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতাই আমাকে একটা খুব গুরুতর তথ্যের জোগান দেয়। সেটা হচ্ছে যে পৃথিবীর বেশির ভাগ কাজই একা করা, দোকা, তেকা কিংবা দল পাকিয়ে করার থেকে, অনেক অনেক বেশি মজার। সিনেমা দেখা, আইসক্রিম, ফুচকা, মিষ্টির দোকানে ঢুকে রাবড়ি খাওয়া, পার্কে যাওয়া, হাঁটতে বেরোনো, এই সব কাজই একা করার মজা অন্যের সঙ্গে করার মজার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, এবং কোনও অংশে কম নয়।

এবং এই মজার প্রথম স্বাদ আমাকে সিনেমা হলই চাখিয়েছিল। 

তবু আমার এখন সিনেমা হলে যেতে ভালো লাগে না। এদিকে আবার অর্চিষ্মান হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে ভীষণ ভালোবাসে। অর্চিষ্মানের সঙ্গে সময় কাটাতে আমার এত ভালো লাগে, তবুও ওর সঙ্গে হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে হবে ভাবলে আমার অল্প অল্প কান্না পায়। আলোকিত পর্দার মোহ আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে টেনে রাখতে পারে না। যতক্ষণ পপকর্ন চলে ততক্ষণ তবু একরকম, পপকর্ন ফুরোলে কেবলই মন উঠি উঠি করে, আর কে কথায় কথা বলছে, কার ফোনের রিং টোন কেমন, কে ক্রমাগত আমার সিটের পেছনে লাথি মেরে চলেছে, এ সবই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তখন শুধু মাঝে মাঝে হাতঘড়ি চশমার সঙ্গে ঠেকিয়ে সময় দেখা আর নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া, কী ভাগ্যিস আজকাল সিনেমাগুলো আর তিন ঘণ্টার হয় না। 


February 22, 2017

বার্ষিক জমাখরচ ৪/৪ঃ গত এক বছরের প্ল্যানিং থেকে আমি যা যা জেনেছি



আমি যদি কোনওদিন আত্মজীবনী লিখতে বসি (অবান্তরও একরকমের চলমান আত্মজীবনীই বটে, কিন্তু আমি বলছি রেসপেকটেবল আত্মজীবনীর কথা) তাহলে তার শুরুর লাইনটা এরকম হতে পারে। 

আই কাম ফ্রম আ লং লাইন অফ প্ল্যানারস। 

আমার পূর্বপুরুষের সকলেই প্ল্যানিং পছন্দ করতেন। আমার ঠাকুরদার বাবা, ঈশ্বর অক্ষয় বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তস্যপুত্র ঈশ্বর জগবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্ল্যানিং-এর নমুনা আমি দেখিনি, কিন্তু শুকনো কাগুজে প্রমাণের থেকে ঢের বেশি বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে রক্তমাংসের, চোখের সামনে হেঁটে চলে বেড়ানো প্রমাণ। জগবন্ধুবাবুর পুত্রের দাবিমতো যদি তিনি প্ল্যানিং করা বাবার থেকেই শিখে থাকেন,  জগবন্ধুর প্ল্যানিং-এর পক্ষে তার থেকে ভালো সার্টিফিকেট আর হতে পারে না।  

আমার বাবার মতো প্ল্যানার আমি দেখিনি। সকালের রসুন থেকে শুরু করে রাতে দুধের গ্লাস, বাবার প্ল্যান করা আছে। আজ সকালে বাবা ব্যাংকের লাইনে দাঁড়াবেন এবং তিন মাস পর বিজাপুরের গোলগম্বুজের তলায়, প্ল্যান করা আছে। জন্মে থেকে দেখছি, বিশ্বকাপ ফুটবলের সবক’টা গ্রুপ, সবক’টা ধাপ, সবক’টা গ্রুপ, সবক’টা দল বাবা ছক করে রাখেন। (সাতানব্বই সালের আগে পর্যন্ত ডায়রিতে, তারপর থেকে এক্সেল শিটে) একেকটা খেলা হয়, খোপের রং বদলে যায়, কলামের পয়েন্ট বদলে যায়। ইন্টারনেটে ওরকম ছক গণ্ডা গণ্ডা মেলে, চকচকে ছবিছাবা দিয়ে, যাকে ইনফোগ্রাফিক বলে, কিন্তু বাবা সেসবে ইমপ্রেসড হন না। বাবা নিজে হাতে প্ল্যান করবেন, কোন খেলাটা  রাত জেগে দেখবেন, কোনটা দেখবেন না।

আমিও প্ল্যানিং পছন্দ করি। প্ল্যানিং-এর মধ্যে যে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, কিংবা গোটা জীবন সুচারুভাবে কাটানোর প্রতিশ্রুতি আছে, সেটা আমার টেনশন প্রশমিত করে, মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের প্রবাহ ছোটায়। জ্ঞান হওয়া ইস্তক আমি প্ল্যানিং করে আসছি। প্ল্যানিং শব্দটা যতদিন জানতাম না বলতাম ‘রুটিন’ (তারও আগে ‘রুটিং’ বলার একটা পর্ব ছিল)। স্কুলের জন্য স্কুলের রুটিন ছিল, ছুটির জন্য আমার রুটিন। রুটিন ছিল মূলত পড়াশোনা-কেন্দ্রিক। টেস্টের রেজাল্ট দেখে চোখ মুছে কাগজে খোপ কেটে লিখতাম, সকালে ইতিহাস, দুপুরে অংক, বিকেলে বিজ্ঞান, রাতে ভূগোল। 

রুটিন করার অভ্যেস ছোটবেলায় অনেকেরই থাকে, বড় হলে অনেকেরই কেটে যায়। আমার কাটেনি। তার অন্যতম কারণ, আত্মবিশ্বাসের অভাব। আমার জীবন যে আমি নিজে অন্য কারও তত্ত্বাবধান ছাড়া (বেসিক্যালি, মা ছাড়া) চালাতে পারি এ বিশ্বাস আমার কোনওদিনও ছিল না। এবং এ অবিশ্বাসটা যে অমূলক নয়, সে আমি বারবার প্রমাণ করেছি। আর যতই প্রমাণ করেছি, ততই নিজের সময়কে রক্তচক্ষু দেখিয়ে বেঁধে রাখার চেষ্টা বেড়েছে। কী করব, কখন করব, কতক্ষণে করব। 

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, যে প্ল্যান করার মতো এত কাজ আমি পাচ্ছি কোথায়। এর উত্তর একটাই, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। রুটিন করার পথে কাজ জোগাড় বাধা হয় না। সকালে কখন দাঁত মাজব, ক’লিটার জল খাব, কখন কখন খাব, কতক্ষণ ধরে রেডি হব, কখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে কখন অফিসে ঢুকব, এই সবও প্ল্যান করার ইতিহাস আমার আছে। দৈনিক প্ল্যানিং তো আছেই, তাছাড়াও আছে নানারকম পরিস্থিতিভিত্তিক প্ল্যানিং। কোনও মাসে সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা স্বস্তির পক্ষে কম হয়ে গেলে আমি জমাখরচের প্ল্যানিং করি। রাতে দাদুর দোকানের আলুর চপ দিয়ে ডিনার সেরে সারারাত ভূগোল পরীক্ষার দিন ইতিহাস পড়ে চলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে ঘেমেনেয়ে একাকার হলে পরদিন সকালে উঠে ক্লিন ইটিং রুটিন শুরু হয়। দুধচিনি ছাড়া চা (৭), মারি বিস্কুট (২), ভাত, কুমড়োর তরকারি, ফুচকা (৬ পিস) ইত্যাদি লেখা নোটবুকে আমার বাড়ি ছয়লাপ। 

প্রতিটি প্ল্যানিং-ই শুরু হয় নতুন খাতায়। প্রতিটি প্ল্যানিং-ই এক নতুন জীবনের সূচনার আভাস আনে, কোন প্রাণে আমি তা পুরোনো খাতায় শুরু করব? খাতার রকমের বাছবিচার আমার নেই, বাঁধানো, পেপারব্যাক, রুলটানা, সাদা, পারফোরেটেড, স্পাইর‍্যাল, সেমিনারের ছাপ মারা, সবরকম খাতাতেই আমি প্ল্যানিং করতে পারি, শুধু তাদের নতুন হতে হবে। বলাই বাহুল্য, যত তেড়েফুঁড়ে প্ল্যানিং শুরু হয়, তত অগোচরেই তাদের মরণ ঘটে। দু’দিন পর আবার পুরোনো জীবনটা অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন আবার নতুন খাতা খুঁজে নতুন জীবনের নতুন নিয়ম লিখতে বসতে হয়।

এই রকমই চলছিল। নোটবুকের পাতা নষ্ট তো হচ্ছিলই, তার থেকেও খারাপ হয়ে পড়ছিল রুটিন বা প্ল্যানিং-এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আজ থেকে দশ বছর আগেও নতুন রুটিন বানাতে আমি যে উদ্যম, অনুপ্রেরণার জোয়ার অনুভব করতাম, তার কণামাত্র আর করছিলাম না। আমি মেনেই নিয়েছিলাম যে পনেরোদিনে একবার করে আমার রুটিন বানানোর ধুম পড়বে, আমি আরও একটা নোটবুকের গোটাকয় পাতা মাটি করব, এবং তার পর সে রুটিন রুটিনের মতো থাকবে, আমি আমার মতো। 

এমন সময় আমার ক্যামিলার সঙ্গে দেখা হল। ব্রাজিলের মেয়ে। সরকারি চাকরি করে। আমার মতো করে করে না, মন দিয়ে করে। রেনফরেস্টের বাঁচামরা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ক্যামিলার গলা বুজে আসে। এগ্রিকালচার বনাম এনভায়রনমেন্টের চিরন্তন লড়াইয়ে প্রত্যেকবার এনভায়রনমেন্টের হারের কথা বলতে গিয়ে ক্যামিলার মুঠো শক্ত হয়ে ওঠে। বরের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে ক্যামিলা দুই ছেলেমেয়েকে খাওয়ায় পরায়, সকার এবং ভায়োলিন প্র্যাকটিসে পাঠায়। জন্মে থেকে যত লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সবার সঙ্গে যেচে যোগাযোগ রাখে, একা চাঁদা তুলে সহকর্মীদের পিকনিকে নিয়ে যায়, ঘটকালি করে, সান্ত্বনা দেয়, ঝগড়া মেটায়, কেউ একা বসে আছে দেখলে এগিয়ে এসে পাশে বসে কথা বলে। 

আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, 'কী করে কর?' তাতে ব্যাগ হাঁটকে একটা খাটো, পেটমোটা ডায়রি বার করে ক্যামিলা বলেছিল, 'আমি করি না, করায় এ। আমি রথ এ রথী, আমি যন্ত্র এ যন্ত্রী।'

আমি বলেছিলাম, 'ওহ, প্ল্যানার। ও কোনও কাজে দেয় না।' 

ক্যামিলা বড় বড় চোখ আরও বড় বড় হয়ে গিয়েছিল। যেন আমি বলেছি গ্লোবাল ওয়ার্মিং গোটাটাই একটা ধাপ্পা। 

'নোওওওও। ইট ওয়ার্কস! ইউ হ্যাভ টু বিলিভ ইন ইট। প্রমিস মি ইউ উইল গিভ ইট অ্যানাদার ট্রাই? দিস টাইম উইথ ফুল ট্রাস্ট?' 

মূলত ক্যামিলাকে দেওয়া কথা রাখার জন্যই দু’হাজার ষোলোর শুরুতে (অ্যাকচুয়ালি, আগের বছর ঠিক এই সময় নাগাদ, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি) আমি শেষবারের মতো একটা চেষ্টা করে দেখলাম। প্ল্যানিং করার। 

ফলাফল কী হল আপনি আন্দাজ করতে পারছেন, তাই না? না হলে আমি এই পোস্টটা লিখতে বসতাম না।

দু’হাজার ষোলোয় রেজলিউশন অল্পবিস্তর রক্ষায় যে বস্তুটির অবদান আমার সমান সমান, কিংবা আমার থেকে খানিকটা বেশিই, তিনি হচ্ছেন ইনি। আমার গত বছরের প্ল্যানার। 


প্রথমেই বলি, ওই বাণীমালা অগ্রাহ্য করুন। আমি অনেক খুঁজেও এর থেকে কম খারাপ দেখতে পছন্দসই প্ল্যানার পাইনি। বাণী ছাড়া যে প্ল্যানারগুলো ছিল সেগুলো সব চামড়াবাঁধাই মোটা মোটা। ব্যাগে পুরে ঘোরা ঝকমারি। এঁর লালরং আর ভেতরের দৈনিক প্ল্যানিং-এর জন্য যথেষ্ট জায়গা আমার পছন্দ হয়েছিল। কাজেই মলাট দিয়ে ভেতর বিচার না করে কিনে ফেলেছিলাম। এঁর দ্বিতীয় অসুবিধে হচ্ছে দামটা বাড়াবাড়ি রকম বেশি। তিন নম্বর অসুবিধেটা প্ল্যানারের অরগ্যানাইজেশনসংক্রান্ত। কিন্তু প্ল্যানিং-এর ব্যাপারে আমি তখন নেহাতই নবীশ ছিলাম, কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, কোনটা আমার কাজে লাগবে কোনটা লাগবে না, সেসব বিচারের জায়গায় আমি ছিলাম না।

এখন সামান্য হলেও আছি। অন্তত আমার নিজের প্ল্যানিং কার্যকরী হওয়ার জন্য কী কী জরুরি সে সম্পর্কে আমার ধারণা আগের বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এখন অনেক স্পষ্ট। প্ল্যানিং করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু জেনেছি, তাদের মধ্যে কিছু প্ল্যানিং বিষয়ে, যেমন

দিনপিছু কাজ যথাসম্ভব কম রাখা দরকার। 
প্রতিটি কাজের বর্ণনায় যথাসম্ভব কম শব্দ খরচ করা দরকার।
প্ল্যানিং যথাসম্ভব সরল হওয়া দরকার। 
প্ল্যানিং বাবদ সময় সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট হওয়া দরকার। আমি নিজেকে সারা দিনে (সাড়ে আটটা থেকে ন’টার মধ্যে) ম্যাক্সিমাম দশ মিনিট প্ল্যানিং করতে অ্যালাউ করি। মাসিক এবং ত্রৈমাসিক প্ল্যানিং-এর ক্ষেত্রে সেটা আধঘণ্টায় দাঁড়ায়।

কিছু নিজের বিষয়ে, যেমন,
অনলাইন প্ল্যানিং আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদিও সেটা করতে পারলে আমি খুশিই হতাম। গাছ বাঁচত। অনলাইন প্ল্যানিং-এর লক্ষ লক্ষ রাস্তা আছে। সম্পূর্ণ ফ্রি গুগল ক্যালেন্ডারও যেমন আছে, মহার্ঘ অ্যাপও আছে। আমি বিনামূল্যের অ্যাপগুলো চেখে দেখেছি। এবং সিদ্ধান্তে এসেছি যে এ ব্যাপারে ইকোফ্রেন্ডলি হওয়া আমার এ জীবনে হল না। টাইপ করার থেকে কাগজের ওপর পেন দিয়ে লেখা এখনও আমার চেতনায় বেশি ছাপ ফেলে। আমার নিজের হাতের লেখা, টাইমস রোম্যান কিংবা কোহিনুর বাংলায় ছাপা অক্ষরের থেকে এখনও আমাকে বেশি উদ্বুদ্ধ করে (কিংবা অপরাধবোধে ভোগায়)। 

কিন্তু যেটা সবথেকে বেশি জেনেছি, সেটা হচ্ছে যে আগের প্ল্যানিংগুলো সব জলে যাওয়ার পেছনে আমার ইচ্ছেশক্তির অভাবই শুধু দায়ী নয়। আমার স্ট্র্যাটেজির ভুলও দায়ী। আমি এতদিন প্ল্যান করছিলাম দৈনিক ভিত্তিতে, যেটা খুব কাজের কথা নয়। যেটা কাজের সেটা হল নিজেকে একটা দীর্ঘকালীন লক্ষ্য দেওয়া, (আমার দৌড় আপাতত বার্ষিকী, সড়গড় হয়ে গেলে পঞ্চবার্ষিকী ট্রাই করে দেখব ভাবছি), তারপর সেটাকে ছোট ছোট টুকরো করে ত্রৈমাসিক, মাসিক, সাপ্তাহিক এবং দৈনিক চেহারা দেওয়া। 

ঘটা করে আমার এই আবিষ্কারটা লিখতে গিয়ে একটু লজ্জাই করছে, মনে হচ্ছে, সকলেই নিশ্চয় এটা জানতেন, কিন্তু আমি সত্যিই জানতাম না। আমি এতদিন বার্ষিক একটা রেজলিউশন নিতাম। তারপর দৈনিক টু ডু লিস্ট চলত। এই দুইয়ের মধ্যে আলাপপরিচয় প্রায় ছিল না বললেই চলে। নভেম্বর মাসে গিয়ে বেরোত, যদিও টু ডু লিস্টে বাড়ি ছয়লাপ, সেগুলোর কোনওটাই আমার বার্ষিক ইচ্ছাপূরণে অবদান রাখেনি। এবং একই ভাবে, যেহেতু দৈনিক টু ডু লিস্টও সে অর্থে কোনও বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে গাঁট বাঁধা ছিল না, সেগুলো রক্ষা করার যথেষ্ট মোটিভেশন আমি জোগাড় করে উঠতে পারিনি।

গত বছর, এবং এ বছর আরও বেশি করে, আমি সে ভুল সংশোধনের চেষ্টায় আছি। বার্ষিক রেজলিউশনের সঙ্গে সংগতি রেখে ত্রৈমাসিক, মাসিক, সাপ্তাহিক এবং আলটিমেটলি দৈনিক প্ল্যানিং করছি। সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ইত্যাদি চেকপোস্টগুলো রাখায় আরও একটা প্রকাণ্ড সুবিধে আছে। বিশেষ করে আমার মতো জন্ম-ফাঁকিবাজের জন্য, ‘আজ থাক, কাল করব” যার চরিত্রের ট্যাগলাইন। এ ধরণের প্ল্যানিং আমাকে একটা কাজ আজ না করে কাল করার প্রচ্ছন্ন অনুমতি দিয়ে রেখেছে (বা এ সপ্তাহে না হলে পরের সপ্তাহে)। 



আপাতত আমি ব্যবহার করছি এই প্ল্যানারটি। আগেরটার থেকে সস্তা এবং আমার মতে বেটার দেখতে। তাছাড়া এতে বার্ষিক, মাসিক, সাপ্তাহিক এবং দৈনিক প্ল্যানিং-এর  খোপ কাটা আছে। ইনিও পারফেক্ট নন। বার্ষিক এবং মাসিক প্ল্যানিং-এর খোপগুলো আমার মনোমতো নয়। তাছাড়া ত্রৈমাসিক প্ল্যানিং-এর ব্যবস্থাও নেই। কিন্তু গত একবছরের প্ল্যানিং থেকে আমি আরও একটা জিনিস বুঝেছি, একেবারে নিজের প্রয়োজনমতো প্ল্যানার বানাতে গেলে ডি আই ওয়াই প্ল্যানার বানানো ছাড়া গতি নেই। তার জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য বা ইচ্ছে কোনওটাই আমার নেই। কাজেই এই মন্দের ভালো দিয়েই কাজ চালাতে হবে।  

এই রকম প্ল্যানিং-এর একটা অসুবিধেও আছে। সকলের জীবনেই কিছু কিছু কাজ থাকে যেগুলো কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্যপূরণের জন্য নয়। শুধু ভালো থাকার জন্য। যেমন, গান গাওয়া। বা রোজ আধঘণ্টা খোলা আকাশের তলায় কাটানো। এই রকম লক্ষ্যভিত্তিক প্ল্যানিং-এ এই সব লক্ষ্যহীন কাজ গোঁজা মুশকিল। আমার মতে উচিতও নয়। তাহলে প্ল্যানিং অকারণ জবরজং হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এই কাজগুলো রোজ করলাম কি না সেটা পরীক্ষা করার অন্য ব্যবস্থা আছে। পরে কোনওদিন সময় হলে বলব। 

*****

এত কথা বলার পরও দুটো কথা থাকে। এক, আমি প্ল্যান না করে যদি আমি জীবন চালাতে পারতাম, তাহলে আমার থেকে খুশি কেউ হত না। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে আমার দ্বারা যা যা সম্ভব না, সে সব করার (এবং পাওয়ার) বাসনা আমাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে। ওটাই আমার টাইপ। সেটা যত তাড়াতাড়ি মেনে নেব এবং সে অনুযায়ী অ্যাকশন নেব ততই মঙ্গল।

দুই, এত প্ল্যান করে কী লাভ হচ্ছে? এখন কি আমি যা যা প্ল্যান করি সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করি? পাগল? কারণ আমি আমিই। স্বপ্ন দেখা এবং সে স্বপ্নপূরণে শ্রম না দেওয়া আমার জন্মগত অধিকার। কিন্তু এতদিন প্ল্যানিং-এর ফাঁদে ঠেকে আরও একটা জিনিস আমি বুঝেছি। যা যা করব ভেবেছিলাম তার অর্ধেকও যদি করতে পারি তাহলেই আমি সফল। আর যদি কোনও মন্ত্রবলে সে তালিকার দুই-তৃতীয়াংশ করে উঠতে পারি তবে তা সিরিয়াস সেলিব্রেশন দাবি করে। 

*****

আপনারা কি প্ল্যানিং পছন্দ করেন? নাকি ফ্রি-স্টাইলই আপনার স্টাইল?


February 19, 2017

Shopping



People swarmed through the boutiques and gourmet shops. Organ music rose from the great court. We smelled chocolate, popcorn, cologne; we smelled rugs and furs, hanging salamis and deathly vinyl. My family gloried in the event. I was one of them, shopping, at last. They gave me advice, badgered clerks on my behalf. I kept seeing myself unexpectedly in some reflecting surface. We moved from store to store, rejecting not only items in certain departments, not only entire departments but whole stores, mammoth corporations that did not strike our fancy for one reason or another. There was always another store, three floors, eight floors, basement full of cheese graters and paring knives. I shopped with reckless abandon. I shopped for immediate needs and distant contingencies. I shopped for its own sake, looking and touching, inspecting merchandise I had no intention of buying, then buying it. I sent clerks into their fabric books and pattern books to search for elusive designs. I began to grow in value and self-regard. I filled myself out, found new aspects of myself, located a person I'd forgotten existed. Brightness settled around me. We crossed from furniture to men's wear, walking through cosmetics. Our images appeared on mirrored columns, in glassware and chrome, on TV monitors in security rooms. I traded money for goods. The more money I spent, the less important it seemed. I was bigger than these sums. These sums poured off my skin like so much rain. These sums in fact came back to me in the form of existential credit. I felt expansive, inclined to be sweepingly generous, and told the kids to pick out their Christmas gifts here and now. I gestured in what I felt was an expansive manner. I could tell they were impressed. They fanned out across the area, each of them suddenly inclined to be private, shadowy, even secretive. Periodically one of them would return to register the name of an item with Babette, careful not to let the others know what it was. I myself was not to be bothered with tedious details. I was the benefactor, the one who dispenses gifts, bonuses, bribes, baksheesh. The children knew it was the nature of such things that I could not be expected to engage in technical discussions about the gifts themselves. We ate another meal. A band played live Muzak. Voices rose ten stories from the gardens and promenades, a roar that echoed and swirled through the vast gallery, mixing with noises from the tiers, with shuffling feet and chiming bells, the hum of escalators, the sound of people eating, the human buzz of some vivid and happy transaction.
                                                                                 
                                                                                            ---Don Delillo, White Noise


February 18, 2017

রুস্তম'স ক্যাফে অ্যান্ড বেকারি, খিড়কি গাঁও



সাকেতের শপিং মলত্রয়ের উল্টোদিকে খিড়কি এক্সটেনশন, তার অগোছালো, ধুলোমাখা গলির ভেতর 'খোঁজ ইন্টারন্যাশনাল আর্টিস্টস’ অ্যাসোসিয়েশন'-এর ধপধপে সাদা শৈল্পিক বাড়ির দেড়তলায় রুস্তম’স ক্যাফে অ্যান্ড বেকারি। পারসি ক্যাফের মেনুতে মাসকা পাও, বাটাটা পোহা, ভিন্দালুর দাপট। শিল্পীদের চা খাওয়ার জায়গা বলে কথা। দেওয়ালে ভিন্টেজ কাপপ্লেট, ঝাপসা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবির গ্যালারি ওয়াল। লেসের পর্দা চুঁইয়ে আসা আলো চারদিকের সাদা দেওয়ালে ঠিকরে অপূর্ব মায়া। গোল হাতল ওয়ালা কাঠের আরামকেদারার উত্তল হাতল, ফ্রিল দেওয়া কুশন। দেখলেই শখ হয় আহা আমার বাড়িতে যদি একটা থাকত। কাউন্টারের ওপর রাখা কুরুশের জামা পড়া প্রকাণ্ড কাচের বয়ামে মেলোডি চকোলেটি আর কিসমি টফির ভাণ্ডার। দেখলেই লোভ হয়, আহা আমার পড়ার টেবিলে যদি এ রকম থাকত।  

রুস্তম’স-এ এই নিয়ে আমাদের দ্বিতীয়বার। প্রথমবার খেয়েছিলাম কান্দা বাটাটা পোহা পাও দিয়ে মাটন ভিন্দালু। আর রুস্তম’স-এর বিখ্যাত উইন্টার রেমেডি অর্থাৎ মধু, লেবু, আদা দিয়ে চা। আর শেষে চকোলেট কেক। সে সবের ছবি নেই। এবারের আছে। এবারে আমরা খেলাম পারসি চা। লেমনগ্রাস আর পুদিনা দিয়ে ফোটানো পারসি চায়ের সঙ্গে গারলিক ফ্রাইস-এর টা। আলুভাজায় রসুন দিলে এমন স্বর্গীয় হয় কে জানত। আমরা এবার থেকে বাড়িতে আলু ভাজলেই রসুন দিচ্ছি, নির্ঘাত। 

চিকেন কাটলেট, পাও। 

বড়া পাও। 


রুস্তম'সে চেহারার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে রুস্তম'সের রন্ধনশিল্পীদের হাতের কাজ। 

গোটা ব্যাপারটার সেরা হচ্ছে লোকেশন। সাকেত মলে কাজে অকাজে যেতেই হয়, আর গেলে কিছু না খেয়ে ফিরতে মন চায় না। আর খেতে গেলেই হয় ফুড কোর্টের ভিড় চিৎকার গুঁতোগুঁতি, নয় দামি দোকানের ফিসফিসে ক্যান্ডললাইটের ডিনারের শেষে বাহারি এবং উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে বিলের আগমন এবং আমাদের গলা কেটে প্রস্থান। এই দুইয়ের থেকেই সেরা, তৃতীয় বিকল্প, রুস্তম। মলের কাজ সেরে রাস্তা পেরিয়ে এপারে চলে আসুন, রুস্তম’স-এ বসুন, খান, চা খান, কথা বলুন কিংবা চুপ করে থাকুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন কিংবা মগজের সুইচ নিভিয়ে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকুন লেসের পর্দার ওপারে আলোর দিকে। যাই করুন, আরাম গ্যারান্টিড।

















February 13, 2017

Fascinated by Disasters



I said to him, "Why is it, Alfonse, that decent, well-meaning and responsible people find themselves intrigued by catastrophe when they see it on television?" 

I told him about the recent evening of lava, mud and raging water that the children and I had found so entertaining. 

We wanted more, more. 

"It's natural, it's normal," he said, with a reassuring nod. "It happens to everybody." 

"Why?" 

"Because we're suffering from brain fade. We need an occasional catastrophe to break up the incessant bombardment of information." 

"It's obvious," Lasher said. A slight man with a taut face and slicked-back hair. 

"The flow is constant," Alfonse said. "Words, pictures, numbers, facts, graphics, statistics, specks, waves, particles, motes. Only a catastrophe gets our attention. We want them, we need them, we depend on them. As long as they happen somewhere else. This is where California comes in. Mud slides, brush fires, coastal erosion, earthquakes, mass killings, et cetera. We can relax and enjoy these disasters because in our hearts we feel that California deserves whatever it gets. Californians invented the concept of life-style. This alone warrants their doom." 

Cotsakis crushed a can of Diet Pepsi and threw it at a garbage pail. 

"Japan is pretty good for disaster footage," Alfonse said. "India remains largely untapped. They have tremendous potential with their famines, monsoons, religious strife, train wrecks, boat sinkings, et cetera. But their disasters tend to go unrecorded. Three lines in the newspaper. No film footage, no satellite hookup. This is why California is so important. We not only enjoy seeing them punished for their relaxed life-style and progressive social ideas but we know we're not missing anything. The cameras are right there. They're standing by. Nothing terrible escapes their scrutiny." 

"You're saying it's more or less universal, to be fascinated by TV disasters." 

"For most people there are only two places in the world. Where they live and their TV set. If a thing happens on television, we have every right to find it fascinating, whatever it is."

                                                                       ---Don Delillo, White Noise

February 10, 2017

সময় চাই, সময়?



আজ আমার ছুটি। দারুণ ভালো লাগছে। পড়ে পাওয়া ছুটি বলে আরও বেশি ভালো লাগছে। আর যখন মনে পড়ছে, এই ছুটির বিকল্প ছিল সবাই মিলে বাসে চেপে গিয়ে মহার্ঘ ফার্মের অ্যাসর্টমেন্ট অফ স্টাফড পরাঠা’র ব্রেকফাস্ট খেয়ে বুলক কার্ট রাইড অ্যান্ড আদার ফান অ্যাকটিভিটিস-এ সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যেবেলা রিসর্টের বারান্দায় নিজের নিজের সংস্কৃতিচর্চা (শায়েরি, গজল) ফলিয়ে ফেরৎ আসা, তখন ডিগবাজি খেতে ইচ্ছে করছে। 

স্টাফড পরাঠার বদলে এখন আমার কপালে ছোটবেলার স্টিলের ফুলকাটা বাটিতে দুধখই। যেন মরুভূমির ফুটন্ত বালিতে ফেলে কাঁটাওয়ালা চাবুকের মারের বদলে নন্দনকাননে পারিজাতের ছায়ায় নিদ্রাযোগ। আবার গানও শুনছি। গানটা এই মুহূর্তের পক্ষে খুবই অ্যাপ্রোপ্রিয়েট, কারণ আমারও অনেক কিছু করার আছে।  মাথার মধ্যে গুছিয়ে নিচ্ছি সামনের তিনদিন (ওয়েল, পনে তিন দিন) টু ডু লিস্ট। পেপারটা শেষ করব, তিনটে উপন্যাস পড়ব আর একটা লিখবও, আর গোটা বাড়ি এমন পরিষ্কার করে ফেলব যে বাবায়াগা এসে নোড়া পিটিয়েও এককণা ধুলো বার করতে পারবে না।

রবিবার সন্ধ্যেবেলা হিসেব কী দাঁড়াবে সেটা আপনি জানেন, আমিও জানি। কিন্তু সেই জানাকে এই মুহূর্তের ফিলিংটাকে মাটি করতে আমি অ্যালাউ করছি না কিছুতেই। এই যে “এখনও অনেক টাইম আছে”র ফিলিংটা। ষড়ৈশ্বর্যের মালিকানার থেকে কোনও অংশে কম নয় এই ফিলিং। এই মুহূর্তে আমার হাতে অনেক, অগাধ সময়। আপনাদের কারও কম পড়লে, আমার থেকে নিতে পারেন।


February 08, 2017

রেখেছ বাঙালি করে



ইন্টারনেটে দ্য ব্রিটিশ ট্যাগ বলে একটা ট্যাগ আছে। আমার এ মুহূর্তে মাথা মরুভূমি, তাই ওদের টুকে 'বাঙালি' ট্যাগ বানিয়ে অবান্তরে ছাপলাম।

*****

১। দিনে ক’কাপ চাঃ  সাত থেকে আট।

২। চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য ফেভারিট টাঃ মারি বিস্কুট। অবশ্যই ব্রিটানিয়ার। 

৩। চিরঞ্জিৎ না প্রসেনজিৎঃ চিরঞ্জিৎ

৪। ঘটি না বাঙালঃ বাঙাল

৫। প্রিয় বাঙালিঃ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

৬। পশ্চিমবঙ্গের প্রিয় বেড়ানোর জায়গাঃ যা দেখেছি তার মধ্যে বিষ্ণুপুর আর মুর্শিদাবাদ দারুণ লেগেছিল। 

৭। প্রিয় বাঙালি গুণঃ আত্মবিশ্বাসের অভাব। যদিও এটা দিনে দিনে দুর্লভ হয়ে উঠছে।

৮। প্রিয় বাঙালি দোষঃ পরনিন্দা পরচর্চা। কারণ আগেও বলেছি, যার নিন্দা করা হচ্ছে তার কোনও ক্ষতি হয় না। যে করে তার মন হালকা হয়। *তবে এ জিনিস করার সময় আমি কিছু সতর্কতা অবলম্বন করি। সাধারণত এমন কারও সঙ্গে না করার চেষ্টা করি, যে অন্যের নিন্দে আমার কাছে করে। কারণ, হান্ড্রেড পার সেন্ট সে আমার নিন্দে অন্যের কাছে করবে। খুব সম্ভবত, যার নিন্দে আমার সঙ্গে করছে, তারই কাছে। দ্বিতীয়ত, চেনা কারও চর্চা করার সময় বিশ্বস্তজনের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান করার চেষ্টা করি। গণ পি এন পি সি-র জন্য সেলিব্রিটিরা আছেন।

৯। বাঙালির কোন গুণটা আমার নেইঃ তর্কপ্রিয়তা

১০। বাঙালির কোন দোষটা আমার ষোলো আনা আছেঃ আলস্য

১১। সকালের লুচি না দুপুরের মাংসঃ সকালের লুচি। বেগুনভাজা আর সুজি দিয়ে। 

১২। বাঙালি বিশ্বসেরাঃ মিষ্টিতে। আর নিরামিষ শুক্তো, চচ্চড়িতেও। 

১৩। প্রিয় বাঙালি মিষ্টিঃ টাটকা, গরম রসগোল্লা।

১৪। কোন বাংলা শব্দের প্রতিশব্দ আর কোনও ভাষায় নেই (আমি পাইনি): তরশু  ধেই ধেই (সৌজন্যে দেবাশিস)


February 06, 2017

এ মাসের বই/ জানুয়ারি ২০১৭




উৎস গুগল ইমেজেস

হানা কেন্ট-এর বেরিয়াল রাইটস পড়ার ইচ্ছে ছিল আমার অনেকদিনের। বইটার বিষয়ই এমন যে শুনলেই পড়তে ইচ্ছে করে। আইসল্যান্ডের শেষ মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল আঠেরোশো তিরিশ সালের বারোই জানুয়ারি। মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতির ভালোমন্দ বিচার হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু সে পদ্ধতির রকম শুনলে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতে হয়। আরেকজন মানুষ, একটি কুঠার দিয়ে দণ্ডিতের মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করে ফেলবে। সে দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিল দু’জন, Agnes Magnúsdóttir আর Friðrik Sigurðsson। স্থানীয় দুই কৃষককে খুনের অপরাধে তাদের এই সাজা হয়।

হ্যানা কেন্টের গল্প শুরু হয় একটি গরিব কিন্তু সামাজিক প্রতিষ্ঠাসম্পন্ন চাষিপরিবারের কথা দিয়ে যেখানে দণ্ডের আগের কয়েকদিন অ্যাগনেসকে এনে রাখা হয়েছিল। সাধারণত তখন বন্দীদের পাঠানো হত ডেনমার্কে, সেখানেই তাদের অন্তিম দণ্ড হত, কিন্তু এখানে খরচ কমানোর ও আরও নানারকম প্রশাসনিক অসুবিধের কারণে অ্যাগনেসকে স্থানীয় এই পরিবারটির সঙ্গে শেষের ক’দিন রাখা হয়। বলাই বাহুল্য, পরিবারটি এবং তাদের প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় প্রথমে খুবই বিচলিত হয়ে পড়ে। 

কেন্টের প্রথম উপন্যাস বেরিয়াল রাইটস। লেখার হাত ভদ্রমহিলার চমৎকার। বিশেষ করে সেই সময়কার আইসল্যান্ডের ছবি তিনি বড্ড সুন্দর ফুটিয়েছেন। দারিদ্র্য, প্রতিকূল জলবায়ুর সঙ্গে সংগ্রাম, মানুষজন। অ্যাগনেসের আগমনে পরিবারটির বিভিন্ন সদস্যের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া, কারও বিদ্বেষ, কারও কৌতূহল, কারও ভয়, এবং ক্রমশ সে সব অনুভূতির বদলে যায়, ন্যায়অন্যায়, শাস্তি, ক্ষমা ইত্যাদি সম্পর্কে আজন্মলালিত ধারণাকে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ে, এ সমস্তই অতি যত্নে এবং সফলতায় ফুটিয়েছেন হ্যানা। 

সত্যি ঘটনা নিয়ে গল্প, কাজেই প্রচুর রিসার্চ করতে হয়েছে কেন্টকে। বইয়ের মাঝে মাঝে সে সবের প্রমাণও রেখে গিয়েছেন তিনি। সে সময়ের প্রশাসনিক এবং চার্চের অফিশিয়াল দলিলদস্তাবেজ থেকে রেফারেন্স দিয়েছেন, পাদরি এবং পুলিশের বয়ান তুলে দিয়েছেন। এটা করতে গিয়ে গল্পের স্রোত ব্যাহত হয়েছে বলেই আমার মনে হয়েছে। আর একটা যেটা অসুবিধে, গল্পের একটা বিরাট অংশ স্মৃতিচারণা। তার ছোটবেলা, অসীম স্ট্রাগল, লাঞ্ছনার মধ্যে বেড়ে ওঠা, তার অপরাধের কার্যকারণ ইতিবৃত্ত, সবটাই আমরা জানতে পারি অ্যাগনেসের স্মৃতিচারণায়। সেটা একটু ক্লান্তিকর। 

তবে এগুলো ছোটখাটো অভিযোগ। বেরিয়াল রাইটস নিঃসন্দেহে পড়ে দেখার মতো বই।  

*****

উৎস গুগল ইমেজেস

মাইকেল শেবন লিটারেরি সাহিত্য ঘরানায় একজন পরিচিত নাম। প্রচুর পুরস্কার পেয়েছেন তিনি, মায় পুলিতজার। আমি তাঁর অন্য কোনও গল্প পড়িনি, কিন্তু তিনি একটি রহস্যগল্পও লিখেছেন জেনে সেটা পড়ার ইচ্ছে হল। ইডিশ পোলিসমেন’স ইউনিয়ন গোয়েন্দাগল্প পাঠকদের মধ্যে এবং অপাঠকদের মধ্যেও সাড়া জাগিয়েছিল। ইন ফ্যাক্ট ‘লিটারেরি’ মিস্ট্রি নভেলের যে কটা তালিকা আমি এ যাবত দেখেছি ইন্টারনেটে, সবেতেই শেবনের ইডিশ পোলিসমেন’স আছে।

সব মিলিয়ে আমি আর পড়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। গল্পের পটভূমি অতি ইন্টারেস্টিং। যাকে বলে অল্টারনেট হিস্ট্রি। অর্থাৎ যা হয়েছে তা না হয়ে যদি অন্যরকম হত। যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আলাস্কার সিটকায় ইহুদি সেটলমেন্ট হত আর যদি উনিশশো আটচল্লিশে ইজরায়েল রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যেত, সেই প্রেক্ষাপটে রহস্য ফেঁদেছেন শেবন। ঘটনাস্থল সিটকা, আলাস্কা। ল্যান্ডসম্যান, সিটকা পুলিশফোর্সের অফিসার, বর্তমানে ব্যক্তিগত ঝামেলায় জর্জরিত, ডিভোর্সের পর একটা লজঝড়ে হোটেলে এসে থাকছেন। সেই হোটেলেই একটি মৃতদেহ আবিষ্কার হয়। এবং ল্যান্ডসম্যান, তাঁর পার্টনার শেমেটস-এর সঙ্গে রহস্যোদ্ধারে নামেন। মাত্রাতিরিক্ত ভালো দাবা খেলতে পারা ছাড়া মৃতদেহের পরিচয় সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে লোকটির আসল পরিচয় প্রকাশ পায়, যেটা আমি বলছি না, কারণ সেটা আমার মতে স্পয়লার, যদিও উইকিপিডিয়া লিখে দিয়েছে। গোটাচারশো পাতা পেরিয়ে রহস্য সমাধান হয়। 

ইডিশ পোলিসমেন’স ইউনিয়ন গোয়েন্দা গল্প বটে, কিন্তু আমি নিশ্চিত একে গোয়েন্দাগল্প বলে চালাতে গেলে শেবন, বা অন্তত শেবনের অনুরাগীরা খুশি হবেন না। কারণ সত্যিই, ইডিশ পোলিসমেন’স আরও অনেক কিছু। দাবাখেলা আর আলাস্কা তো বোঝাই যাচ্ছে, একই সঙ্গে ইহুদিসংক্রান্ত বিশ্বরাজনীতির ঘোলাজল এবং আলাস্কার ইহুদি জনজীবনের ওপর তার প্রভাব আমার মতে এ বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র। 

ইডিশ পোলিসমেন’স ইউনিয়ন আমার কেমন লেগেছে সেটা বলতে গিয়ে একটু থতমত খাচ্ছি। এ বইয়ের একেকটা অংশের প্রতি আমার প্রতিক্রিয়া একেকরকম। ইহুদি ইতিহাসের অংশটুকু সম্পর্কে আমার ধারণা এতই অস্বছ যে তার বিচার করা আমার কর্ম নয়। প্রচুর সময় লেগেছে আমার গল্পের ভেতরে ঢুকতে। হিব্রু শব্দ, বাক্য এবং ধর্মীয় রেফারেন্সে থিকথিক করেছে শেবনের লেখা। শেবন পাঠকের জন্য কাজটা সহজ করার চেষ্টা করেননি, সে নিয়ে আমার কোনও অভিযোগও নেই। শেবনের ভাষা অসম্ভব ফুলেল, অনেকেই তাঁর ভাষার প্রশংসা করেছেন, আমার খুব একটা মনে ধরেনি। ইডিশ পোলিসমেন’স ইউনিয়ন-কে গোয়েন্দাগল্প হিসেবে বিচার করলে অবশ্য আমার কিছু বলার আছে। প্রথম বলার বিষয়, গল্পের মুখ্য চরিত্র। পুলিশ প্রসিডিউর‍্যালে এই ডিপ্রেসড মাঝবয়সী পুরুষগোয়েন্দার প্রকোপ এত বেশি যে  ল্যান্ডসম্যান আলাদা করে মনে থাকেন না। তাছাড়াও রহস্যটা সমাধান করা হয়েছে খুবই দায়সারা ভাবে। মানে আপনি যদি ‘কে করেছে’ ‘কে করেছে’ ভাব নিয়ে গল্পের মধ্য দিয়ে যান তাহলে হতাশা অপরিহার্য। 

*****

উৎস গুগল ইমেজেস


ডগলাস অ্যাডামসের নিজের ভাষায় এই বইয়ের বর্ণনা হচ্ছে thumping good detective-ghost-horror-who dunnit-time travel-romantic-musical-comedy-epic. 

ছোট করে বললে, বইটা অদ্ভুত। খুবই অদ্ভুত। এতই অদ্ভুত যে গল্পে কী ঘটেছিল তা আমি অলরেডি ভুলে গেছি। খালি মনে আছে একজনের বাড়ির সিঁড়িতে একটা সোফা আটকে গিয়েছিল, সে প্রত্যেকবার সেটাকে টপকে যাওয়াআসা করছিল, আর ছিল একজন ইলেকট্রিক মংক, আর ছিল বাথরুমে জ্যোৎস্নার আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা সাদা ঘোড়া, কুবলাই খান, কোলরিজ, মোৎজার্ট, সাইন কার্ভ।

ডগলাস অ্যাডামসের লেখার সঙ্গে পরিচিতি থাকলে অবশ্য এগুলো নিয়ে চমকানোর কিছু নেই। অন্যরকম কিছু হলেই অদ্ভুত। আপনার যদি অদ্ভুতরসে আগ্রহ থাকে তাহলে পড়তে পারেন, না থাকলেও পড়তে পারেন, মোটে একশো সাতাশ পাতার বই। এই বই নিয়ে রিভিউ লেখার সাধ্য আমার নেই, আমি খালি আমার ভালোলাগা একটা অংশ এখানে তুলে দিলাম। 

The horse walked with a patient, uncomplaining gait. It had long grown used to being wherever it was put, but for once it felt it didn’t mind this. Here, it thought, was a pleasant field. Here was grass. Here was a hedge it could look at. There was enough space that it could go for a trot later on if it felt the urge. The humans drove off and left it to its own devices, to which it was quite content to be left. It went for a little amble, and then, just for the hell of it, stopped ambling. It could do what it liked.

What pleasure.

What very great and unaccustomed pleasure.

It slowly surveyed the whole field, and then decided to plan out a nice relaxed day for itself. A little trot later on, it thought, maybe around threeish. After that a bit of a lie down over on the east side of the field where the grass was thicker. It looked like a suitable spot to think about supper in. 

Lunch, it rather fancied, could be taken at the south end of the field where a small stream ran. Lunch by a stream, for heaven’s sake. This was bliss. 

It also quite liked the notion of spending half an hour walking alternately a little bit to the left and then a little bit to the right, for no apparent reason. It didn’t know whether the time between two and three would be best spent swishing its tail or mulling things over. 

Of course, it could always do both, if it so wished, and go for its trot a little later. And it had just spotted what looked like a fine piece of hedge for watching things over, and that would easily while away a pleasant pre-prandial hour or two. 

Good.

An excellent plan.

And the best thing about it was that having made it the horse could now completely and utterly ignore it. It went instead for a leisurely stand under the only tree in the field.


February 02, 2017

গোয়া ২/২



রিট্‌জ্‌ হোটেল দু’খানা আছে পানজিমে। একটা ক্ল্যাসিক একটা আধুনিক। আধুনিকটি বাসস্ট্যান্ডের একেবারে গায়ে। কিন্তু আমাদের গন্তব্য অন্যটা। ওয়াগলে ভিশন বিল্ডিং যাব বলামাত্র অটো ভাইসাব জিজ্ঞাসা করলেন, রিট্‌জ্‌ ক্ল্যাসিক? 

রিটজ হোটেলের রাস্তার নামখানা চমৎকার, আঠেরোই জুন রোড। বাইরে থেকে জাঁকজমক কিছু বোঝা যায় না। মাথা ঘুরে যায় তীরচিহ্ন ফলো করে দোতলায় ওঠার পর। গিজগিজ করছে ভিড়। ভিড়ের অধিকাংশ বাইরের বারান্দায়, খানিকটা উপচে ঢুকে গেছে রেস্টোর‍্যান্টের ভেতর যেখানে খাওয়া চলছে। আমরা ভেবেছিলাম ঘণ্টা তিনেক দাঁড়াতে হবে কিন্তু এ সব সিচুয়েশনে ছোট পরিবার নিঃসন্দেহে সুখী পরিবার। একটা চারজনের টেবিলে দু’জন বসে খাচ্ছিলেন, শেয়ার করতে চাই কি না জিজ্ঞাসা করাতে আমরা লাফ দিয়ে হ্যাঁ বললাম। তিনঘণ্টার গেসটিমেটেড অপেক্ষা হয়ে গেল তিন মিনিটের। 

ক্ল্যাসিক রিটজের হাবভাব, চালচলন ক্ল্যাসিক। গদি আঁটা চেয়ার, সাদা কালো উর্দি পরা পরিবেশক। তিন্নি-সায়ক ফিশ থালির কথাই বলে দিয়েছিল, দ্রুত আড়চোখের সার্ভেতে বুঝলাম আশেপাশের নিরানব্বই শতাংশ লোক ওটাই খাচ্ছে। আমরাও বলে দিলাম, ফিশ থালি প্লিজ। সঙ্গে অর্চিষ্মানের জন্য লাইম সোডা, আমার জন্য বাটারমিল্ক। 

যে কোনও জিনিসের ক্ষেত্রেই দু’ভাবে লোককে ইমপ্রেস করা যায়, এক কোয়ানটিটি, দুই কোয়ালিটি দিয়ে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এ দুইয়ের যুগলবন্দী ঘটে (যেমন, রবীন্দ্রনাথ) তখন একেবারে ইমপ্রেশনের হদ্দমুদ্দ। ক্লাসিক রিটজের ফিশ থালির ইমপ্রেশনের খেলায় আরও একটি ফ্যাক্টর যোগ হয়েছে, তা হল দাম। 


এই গোটা থালার দাম হচ্ছে একশো একষট্টি টাকা। কাঁকড়ার ঝোল তো দেখতেই পাচ্ছেন, এছাড়াও এখানে আছে সজনেডাঁটা দেওয়া না-দেওয়া চিংড়ি ঝোল ঝাল চচ্চড়ি, ফিশ ফ্রাই, মাছের পেঁয়াজ দিয়ে ঝুরিভাজা, ঝিনুকের ঘণ্ট (সবের মধ্যে আমার বেস্ট লেগেছে) ইত্যাদি।


আবার কবে খাওয়া হয় না হয় তাই থালির বাইরে একটা প্রন রাওয়া ফ্রাইও নেওয়া হল। মচৎকার।

এরপর আমাদের টু ডু লিস্টে ছিল পায়ে হেঁটে পানজিম ভ্রমণ। পানজিম অতি সুন্দর শহর। পরিষ্কার, ফাঁকা ফাঁকা। সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে যে যতগুলো রাস্তায় হাঁটলাম কোনওটায় সিগন্যাল দেখলাম না, অথচ গাড়িঘোড়া চলছে মসৃণ গতিতেই। কেউ হর্নে আঙুল চেপে ধরে রাগ দেখাচ্ছে না। পায়ে হেঁটে ভ্রমণ বটে, কিন্তু উদ্দেশ্যহীন নয়। গুগল ম্যাপের সার্চে লিখে রেখেছি Fontainhas, ম্যাপের দেখানো পথে ধরে আমরা চলেছি সেই দিকেই। 

পর্তুগিজ ডিকশনারিতে Fontainhas মানে ছোট ঝর্না। কিন্তু ব্যবহারিক মানে হচ্ছে কোয়ার্টার। বাংলা করে নিয়ে ‘পাড়া’ও বলা যায় বোধহয়। পানজিমের Fontainhas হল পুরোনো ল্যাটিন কোয়ার্টার। একসময়ের পর্তুগিজপ্রাধান্যের প্রমাণ। পা দেওয়ামাত্র বোঝা যায় জায়গাটা আলাদা। শহরেরই অংশ, কিন্তু স্বতন্ত্র। সরু আঁকাবাঁকা গলির দুপাশে সারি সারি গেটের গায়ে মার্বেল ফলকে পেঁচানো অক্ষরে লেখা ‘পেরেইরা’, ‘মেন্ডেস’, ‘ডিয়াজ’ ‘ফার্নান্দেজ’। এ পাড়ায় এখনও প্রধান কথ্য ভাষা পর্তুগিজ।


এ পাড়ায় আর্ট গ্যালারিরও বাড়বাড়ন্ত। সেরকমই একখানা গ্যালারি হচ্ছে গীতাঞ্জলি। গীতাঞ্জলী গ্যালারি থেকে বেরিয়েই চোখ পড়ল উল্টোদিকের গাছ, লাল ফুলের ঝাঁকের আড়াল দেওয়া একখানা বারান্দা। শুধু বারান্দা নয়, সেটা একটা রেস্টোর‍্যান্টও। দ্য ভেরান্ডা রেস্টোর‍্যান্ট। এর নামও তিন্নির কাছে শোনা ছিল। হেঁটে হেঁটে চায়ের দরকার হয়ে পড়েছিল, কালক্ষেপ না করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম। বাইরে থেকে বারান্দাখানা দেখতে যত সুন্দর, ভেতর থেকে ততোধিক। উঁচু, ঢালু সিলিং থেকে ছোট সাদা ফ্যান বনবন করে ঘুরছে। দেওয়াল আলমারির তালাহীন কাচের পাল্লার ওপারে নানা ভাষার বই। গাছের ঝাড়ের আড়াল থেকে দেখছি উল্টোদিকের বাড়ির ছায়ায় চেয়ার পেতে বসে আছেন ফুলছাপ ফ্রকপরা ঠাকুমা।  


এই হল বেবিংকা। নারকেল কেকের গোয়ান সংস্করণ। আমাদের পেটে একটুও জায়গা ছিল না, তবু শেষ করে ফেলেছি, কাজেই কেমন ভালো খেতে বুঝে দেখুন। 

ইচ্ছে করছিল না, তবু উঠতে হল। আমাদের ফিরতে হবে বাস ধরে মাড়গাঁও। মাড়গাঁও পৌঁছে শুনলাম সেদিনের মতো পালোলেমের বাস শেষ, কানাকোনার বাসে উঠলাম, কন্ডাকটর আমাদের পালোলেমের কাছাকাছি চৌমাথায় নামিয়ে দিলেন, বাকি পথটুকু অটো।

আগের দু’দিন খুবই আনন্দে কেটেছিল, কিন্তু গোয়ায় কাটানো তিনদিনের মধ্যে আমি সবথেকে গর্বিত তৃতীয় দিন নিয়ে। কারণ এই দিন আমরা কিছুই করিনি। করিনি কিছু করার ছিল না বলে নয়, দুর্গ দেখতে যেতে পারতাম, কিংবা জঙ্গলের ভেতর সাফারি ঘুরতে পারতাম, এমনকি চাইলে কানে হেডফোন গুঁজে উদ্দাম পার্টি অ্যানিম্যাল হয়ে উঠলেও কেউ কিছু বলত না, কিন্তু আমরা সে সব দেখার, ঘোরার, করার লোভ জয় করে স্রেফ বসে ছিলাম। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। মাঝে একবার তার হাতছানি না এড়াতে পেরে নেমেও পড়লাম। পুরীর সমুদ্রের যে একটা উদ্দাম, রাগী ব্যাপার আছে, ঢেউয়ের লোফালুফি খেলায় নাস্তানাবুদ হওয়ার যে পরিতৃপ্তি আছে সেটা এখানে মিসিং। এখানে মোটামুটি বুক অবধি নামলেই ঠাণ্ডা শান্ত জল। ভেসে থাক। চাইলে সাঁতারও কাটতে পার। একটা জিনিস আবিষ্কার করে দারুণ খুশি হলাম, সাঁতার সত্যিই কেউ ভোলে না। সেই পাড়ার পুকুরে বাবার ট্রেনিং, গোয়ার সমুদ্রে দিব্যি কাজে লেগে গেল। উত্তেজিত হয়ে অর্চিষ্মানকে ক্র্যাশ কোর্সের অফার দিলাম, রাজি হল না। 

স্নান সেরে ঘরের বাথরুমে যথাসম্ভব বালিমুক্ত হয়ে এসে আবার বারান্দায় বসলাম। সূর্যের রশ্মি ঘাড়ে, গলায় হাত বোলাতে লাগল। নারকেলপাতার পাখা দুলে দুলে চুল শুকোতে লাগল। ক্রমে ক্রমে শরীরের ভেতর টেনশনের গিঁটগুলো সব খুলে গেল, পুষে রাখা রাগগুলো সব ঢেউয়ের সঙ্গে বালির মতো ফিরে গেল যেখান থেকে এসেছিল। শরীরমনের সবটুকু মাধ্যাকর্ষণের নামে ছেড়ে দিয়ে, বেতের গদিআঁটা চেয়ারে বসে রইলাম দুজনে। যেন দুই ভোলানাথ, আরামের গাঁজায় দম দিয়েছি। মাঝে মাঝে সেই তুরীয় অবস্থা কাটিয়ে চেতনা ঘাই মারছিল, বিশেষ করে সামনের থালা থেকে গরম কুড়মুড়ে আলুভাজা তুলে মুখে পোরার সময়। মনে হচ্ছিল, স্বপ্ন দেখছি নাকি? অর্চিষ্মানকে খোঁচা দিয়ে জানতে চাইলাম, সত্যিই কি এত আরাম হচ্ছে? হওয়া সম্ভব? নাকি সবটাই আমার কল্পনা? ও যখন বলল ওরও এতখানিই আরাম হচ্ছে, তখন নিশ্চিত হলাম। কল্পনা নয়, ঘোর বাস্তব। দুজনে দুজনকে সাক্ষী মেনে ওই দুপুরটা মনে করে রেখেছি, দুঃখের সময় বার করে জাবর কাটব।

ব্যস, ছুটি শেষ। রবিবার অন্ধকার থাকতে থাকতে গাড়ি আসবে ডাবোলিম এয়ারপোর্ট নিয়ে যেতে, সেখান থেকে দিল্লি। প্রথমে আফসোস হচ্ছিল বিকেলের প্লেন নিইনি কেন, তারপর মনে হল ভালোই করেছি। এই আরামের সাগরে ভাসা আর সোমবারে দুঃখের পাথারে ডোবার মধ্যে একবেলার বাঁধটা জরুরি ছিল। 

নিজেকে শুধু কথা দিয়ে রেখেছি, যে মুহূর্তে অসহ্য লাগবে, দু’বার ভাবব না, দৌড়ে চলে আসব গোয়া।


February 01, 2017

গোয়া ১/২



আমার একসময় ধারণা ছিল খোনা গলা ছাড়া ফেরিওয়ালা হওয়া যায় না। অনেকদিন পর বুঝেছিলাম যে ও গলা ওঁদের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নয়, ওটা ইচ্ছে করে করা, যাতে স্বর অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছয়। এমনকি ট্রেনের দুলুনির গাঢ় ঘুম ভেদ করেও। সেই রকম গলার চায়এএএ শব্দটা ভেসে এল যেই, ঘুম ছুটে গিয়ে পঞ্চেন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। আমি সাইড আপার থেকে ঝুঁকি মারলাম, অর্চিষ্মান সাইড লোয়ার থেকে ঘাড় তুলল, দুজনে একসঙ্গে বলে উঠলাম, “খাবে তো?” 

খাব না আবার? বার্থ থেকে নেমে অর্চিষ্মানের পাশে বসলাম। এম এ পড়ার সময় পূর্বা এক্সপ্রেসের তিনতলার বার্থ থেকে সিনথেটিক সালওয়ার কামিজ ফসকে আমি সোজা মাটিতে এসে পড়েছিলাম, সেই থেকে আমি অতি সাবধানে বার্থে ওঠানামা করি। অর্চিষ্মানও সে পতনের কথা জানে, ও-ও তাড়াতাড়ি উঠে আমার পা যেখানে পড়বে সেখানকার চাদরটাদর সরিয়ে দিল। ভাইসাব দুজনের হাতে দুখানা চা ধরিয়ে টাকা নিয়ে বিদায় হলেন। 

ট্রেন থেমে ছিল। পর্দা সরিয়ে দেখি জলের ফোঁটার দাগওয়ালা কাচের ওপারে প্ল্যাটফর্ম। আমাদের কামরাটা ভালো জায়গায় পড়েছে, ওইখানেই স্টেশনের নাম লেখা বোর্ড। রত্নগিরি। প্ল্যাটফর্মের ওপাশ থেকে সবুজ জঙ্গলের দেওয়াল উঠে গেছে, ফাঁকা পরিষ্কার প্ল্যাটফর্ম, জনহীন। একটা নেড়ি, রোগা শরীরে জেগে থাকা স্তনবৃন্ত সদ্য মাতৃত্বের প্রমাণ দিচ্ছে, নীল রঙের একটা ডাস্টবিনে সামনের দু’পা দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। প্ল্যাটফর্মে কেউ নেই, যাঁরা ছিলেন তাঁরা সকলেই নানারকম লোভনীয় পশরা নিয়ে ট্রেনে উঠে এসেছেন। গরমাগরম বড়া পাও? (নাঃ, সকালসকাল অম্বল চাই না), ঘি দেওয়া ইডলি? (সাতসকালের পক্ষে একটু ভারি), মশলা ভেল? পারফেক্ট। একটা চৌকো কাগজই প্লেট, তার ওপর মুড়ি, পেঁয়াজ, টমেটো, চানাচুর ইত্যাদি ঢেলে দুই কোণা ধরে ঝাঁকানোর সময় সেটাই বাটি, আর কবজির মোচড়ে পরমুহূর্তে সেটাই তিনকোণা ঠোঙা। 

একটা চামচও ভাইসাব দিয়েছিলেন, সসম্মানে সেটা সরিয়ে রেখে ঠোঙা কাত করে ডান হাতের তেলোয় মুড়ি ঢেলে মুখে পুরলাম। এক মুঠো মুড়ি, এক চুমুক চা। চায়ে মিষ্টি বেশি, কিন্তু সেটা প্রত্যাশিত। ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল। রত্নগিরি পেছনে সরতে সরতে অদৃশ্য হয়ে গেল। 

আমরা যাচ্ছি গোয়া। এর আগে অনেক জায়গায় যাওয়ার কথা হয়েছিল। ভরতপুর, মাউন্ট আবু, অমৃতসর। এখানে গেলেও হয়, ওখানে গেলেও। আবার না গেলেও কিছু না। হঠাৎ একদিন সকালে উঠে অর্চিষ্মান বলল, উফ কতদিন সমুদ্র দেখিনি। সেই দু’হাজার নয়ে গিয়েছিলাম বাবামায়ের সঙ্গে পুরী, ব্যস। আমি ভাবার চেষ্টা করলাম আমি শেষ কবে সমুদ্র দেখেছি, মনেই পড়ল না। এক মিনিটের মধ্যে ঠিক করলাম সমুদ্র দেখতে হবে, তিন মিনিটের মধ্যে গোয়ার নাম মাথায় এল, পাঁচ মিনিটের মধ্যে মনস্থির, পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে সবকটা টিকিট বুক হয়ে গেল, তিন্নির কল্যাণে হোটেলও। 

আমরা এসেছি বম্বে পর্যন্ত প্লেনে, তারপর তিন্নির বাড়িতে একঘণ্টার ঝাঁকিদর্শন সেরে লোকমান্য তিলক টার্মিনাস থেকে রাত একটা দশের কারমালি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস। বম্বে থেকে গোয়ার ট্রেনরাস্তা নাকি ভারি সুন্দর, দুপাশে পশ্চিমঘাটের জঙ্গল আর অগুন্তি ছোটবড় টানেল। আমরা নামব কারমালি ষ্টেশনে। কারমালি ষ্টেশনটা যে আমাদের পক্ষে খুব একটা সুবিধের হবে তা নয়, কারণ আমরা যাব সেই দক্ষিণ গোয়ার পালোলেম সৈকত, কারমালিটা উত্তরঘেঁষা, আমাদের পক্ষে বেস্ট হত মাড়গাঁও নামলে। কিন্তু মাড়গাঁওয়ের ট্রেনে সিট নেই। অগত্যা কারমালি।

কারমালি স্টেশন ছোট এবং সুন্দর। প্ল্যাটফর্মের লাগোয়া অফিসবাড়ির বারান্দায় গোল থাম আর ছাদের রেলিং-এ কলসি ডিজাইন। কারমালি থেকে ট্যাক্সি নিলে পড়বে একুশশো মতো, অটো নিলে পনেরোশো চল্লিশ। দরাদরির ব্যাপার নেই, সব ভাড়া ল্যামিনেটেড হলুদ কাগজে কালো অক্ষরে লেখা আছে। বেড়ানোর শুরুতে পরিশ্রম করার উৎসাহ প্রচুর থাকে, পয়সা বাঁচানোর লিপ্সা প্রবল থাকে, আমরা অটোই নিলাম। এদিককার অটোগুলো আমাদের ওদিককারই মতো, কেবল দরজা আঁটা। আঁকাবাঁকা পথ ধরে অটো চলল। বেশিরভাগটাই বড় রাস্তা ধরে, দুপাশে জঙ্গল নয়তো ফাঁকা মাঠ, মাঝে মাঝে মাঠের ভেতর ঢুকে আসা খাঁড়ি। সে সব তো দারুণ দৃশ্যপট, কিন্তু ইন্টারেস্টিং হচ্ছে যখন অটো চলেছিল পাড়ার ভেতর দিয়ে। রংবেরঙের প্যাস্টেল রঙের বাড়ি, কোনওটা একচালা, কোনওটা দোচালা, কোনওটা একটু বড়, কোনওটা একটু ছোট, কিন্তু সবগুলোই ভয়ানক ঝকঝকে তকতকে, সবগুলোরই সামনে ছোট একফালি জমি, জমিতে নয়নতারা ফুল ফুটে আছে। 

এত বিচ থাকতে আমরা পালোলেমই বাছলাম কেন সে বলতে গেলে অনেক আগে থেকে শুরু করতে হয়। যখন থেকে গোয়া যাওয়া ঠিক হল। গোয়া বলতেই আমার মানচিত্রে দেখা পুঁচকে, প্রায় চোখে দেখা যায় না, রাজ্যটার কথা মাথায় এসেছিল, তলিয়ে দেখতে গিয়ে দেখলাম তার রীতিমত উত্তরদক্ষিণপূর্বপশ্চিম আছে। এবং সেগুলো বেশ দূরে দূরে। একবারে সব দেখে ফেলব সেরকম হবে না। হয় তোমাকে উত্তরে যেতে হবে নয় দক্ষিণে। গোয়ার বিখ্যাত বিচগুলো, বাগা, কালাংগুটে, সব উত্তরে। বিখ্যাত, অর্থাৎ ভিড়ও ওখানে বেশি। ভেবেচিন্তে আমরা দক্ষিণই বাছলাম। তিন্নি-সায়ক পালোলেম ঘুরে এসেছে, মুক্তকণ্ঠে রেকোমেন্ডেশন দিল। 


হোটেলও ওদের রেকোমেন্ডেশন। প্যাপিলন, পালোলেম। বারান্দা থেকে সমুদ্র, সমুদ্রের তীরের বাঁকা নারকেলগাছের কুঞ্জ, নৌকো, রোদপোয়ানোর রঙিন ছাতার ঘের, সব দেখা যায়। বেতের চেয়ার পাতা আছে, বসে বসে চেয়ে থাক। যতক্ষণ না চোখ ব্যথা হয়ে যায়, কিংবা পেটে ছুঁচো ডন মারে। 

ভেলপুরি হজম হয়ে গেছে সেই কখন। নেমে খাবারের খোঁজে গেলাম। খাওয়ার জায়গায় বড় বড় গদিআঁটা তক্তপোশ, ইতিউতি তাকিয়া ছিটোনো। খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে গেলে পেছন দিকে শরীর ফেলে দিয়ে বিশ্রাম করে নেওয়া যায়। ফিশ কারি আর চিকেন জাকুটির মাঝখানে তাই করলাম। খেতে খেতে গান করলে পাগল হয় বলতেন ঠাকুমা, শুয়ে পড়ছি শুনলে কী বলবেন কে জানে। 


পালোলেম বিচটা কাস্তের মতো গোল। সোনালি বালি পেরিয়ে সেই পরিধি ঘিরে সারিসারি কুটির। আর কুটিরের পেছনে নারকেল গাছের সারি। উত্তরের সৈকতের তুলনায় ফাঁকা তা বলে জনশূন্য নয়। লোকজন স্নান করছে, বোটে চড়ছে, কায়াকিং করছে। সাদারা প্রাণপণে কালো হওয়ার চেষ্টা করছে, কালোরা চেষ্টা করেও আরও কালো হওয়া রুখতে পারছে না। অর্চিষ্মান বুদ্ধি করে দুটো হাওয়াই চটি এনেছে, একটা ভেতরে পরার একটা বাইরে, আমার আবার মিনিম্যালিস্ট প্যাকিং-এর বাতিক আছে, আমার কপালে বিচে হাঁটার জন্য সেই বাটার জুতো। দু’পা ফেলতে না ফেলতে বালি ঢুকে একাকার। 

হাঁটতে হাঁটতে কাস্তের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পৌঁছলাম। পায়ের তলার বালি নরম থেকে শক্ত হয়ে আবার নরম হল, জলের নিচে বালির গায়ের ডিজাইন একবার সাপের মতো আঁকাবাঁকা হল, একবার মৌমাছির চাকের মতো খুপরি খুপরি হল, তারপর একসময় বালি ফুরিয়ে গিয়ে উঁচু উঁচু পাথর শুরু হল। সেগুলোর কোনও কোনওটার গায়ে সারিসারি মাছের আঁশ না ঝিনুক, কী জানি কী শুকিয়ে খরখরে হয়ে রয়েছে, অসাবধানে খালি পা পড়লে প্রাণ বেরোনোর জোগাড় হয়। দেখেশুনে একটা ফাঁকা পাথর দেখে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। আমাদের আশেপাশে মসৃণ পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে সাহেবমেমেরা কেউ কেউ শিরদাঁড়া টান করে, তর্জনী বুড়ো আঙুল ছুঁইয়ে স্থির নেত্রে ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে। একটু পর টের পেলাম আশেপাশের সমস্ত শব্দ, নারকেলপাতার খসখস, পাথরের গায়ে জলের ছলাৎ ছলাৎ, দৈবাৎ উড়ো পাখির ডাক, হিন্দি ইংরিজি কথোপকথনের টুকরো, সব কী অদ্ভুত রকম স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


সূর্য ডুবল। আমরা ফিরতি পথ ধরলাম। এরই মধ্যে সমুদ্র এগিয়ে এসে বালির ভেতর কোথাও কোথাও ঢুকে পড়েছে, জিনসটা প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিল, ভাঁজ করে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত তুলেও রক্ষা হল না, আবার ভিজে গেল। 

রাতে খেতে বেরোলাম। সারা সৈকত জুড়ে টেবিল পাতা হয়েছে, টেবিলের ওপর কাচের ঢাকনার ভেতর মোমবাতি জ্বলছে। বিচের মেন গেটের কাছে ‘ দ্রোপদী’ নামের গমগমে দোকান। সেখানে গিয়ে অর্চিষ্মান কী খেল ভুলে গেছি, আমি খেলাম সিফুড স্যালাড। খেতে খেতে দেখলাম সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে কারা যেন ফানুস ওড়াচ্ছে। রঙিন কাগজের ঠোঙায় পোরা আগুন, দুলে দুলে উড়ে যাচ্ছে কুচকুচে কালো আকাশের দিকে।
                                                                                                                                   (চলবে)


বাইরের আমি, ভেতরের আমি



In the home you are allowed to tell that racist joke you would never say in public. In the home, you don’t really mean it. In public it makes you look like a bad person, and you are not a bad person. In the home you are allowed to forbid your daughter from dating her black boyfriend. “It’s not personal,” you say, because you are one of those people for whom politics is not personal; the boyfriend, now dumped, is one of those people for whom it is. On the bus, you clutch your purse a little tighter when the black kids sit next to you. You are not racist. You’re just being safe. From the home, you see the black child riding his bike outside. You call the police. Maybe he has a gun? Or is it a toy? Your private thoughts, your imagination, carefully devised and tended through the centuries-long project of institutionalised racism, become a policeman’s public action, of personal consequence to the now dead child, his living family. You didn’t mean for him to die. You just can’t be too careful when it comes to those black people, those Muslims, those Mexicans. When your co-worker says this, you smile tight-lipped. Your co-worker’s racism is not your problem, is not personal. You just want to go home.

                                                                                           ---Yaa Gyasi, The Guardian


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.